মহাপ্রয়াণ পর্ব ৩৫+৩৬
নাফিসা তাবাসসুম খান
গতরাতে রিকার্ডোর সাথে দেখা করে আসার পর থেকে আর কারো সাথে কথা বলেনি আনাস্তাসিয়া। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পিঠজুড়ে সোনালী চুলগুলো ছড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর জোয়ান্দ্রা এসে আনাস্তাসিয়াকে ডাক দেয় নাস্তা করার জন্য। আনাস্তাসিয়া উঠে বসে জোয়ান্দ্রার হাত ধরে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে দেয়। তারপর অনুরোধের সুরে বলে,
” তোমার কাছে আমার একটা অনুরোধ ছিলো জোয়ান্দ্রা। ”
” অনুরোধ বলছো কেন? তোমার কিছু প্রয়োজন হলে বলো আমি ব্যবস্থা করছি। ”
আনাস্তাসিয়া আমতা আমতা করে বলে,
” আমি গ্রীকে ফিরতে চাইনা। আমি এখানে তোমাদের সাথে থাকলে তুমি কিছু মনে করবে? আমি মোটেও তোমাদের উপর বোঝা হবো না। যেকোনো কাজ করতে পারবো আমি উপার্জনের জন্য। পাশাপাশি বাচ্চাদের তলোয়ার চালানো এবং গ্রীক ভাষাও শিখাতে পারবো। ”
জোয়ান্দ্রা হেসে আনাস্তাসিয়ার গালে হাত রেখে বলে,
” আমি কেন কিছু মনে করবো অ্যানা? উল্টো আমি আরো খুশি হবো। আর নিজেকে মোটেও বোঝা মনে করবে না। তুমি বোঝা নও আমাদের উপর। আমাদের আর্থিক অবস্থা ততটা স্বচ্ছল না হলেও আমাদের মন এতো ছোট নয়। ”
আনাস্তাসিয়া কৃতজ্ঞতার সুরে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জোয়ান্দ্রা। তুমি আমার জন্য অনেক করছো। তোমার এই ঋণ পরিশোধ সম্ভব নয় কখনো। ”
জোয়ান্দ্রা হালকা রাগ মিশিয়ে বলে,
” যদি আমাদের সাথে থাকতে চাও তাহলে কোনো কিছুকে ঋণ মনে করা বন্ধ করতে হবে। পরিবারের সকলেই একে অপরের জন্য কিছু করাকে ঋণ নয় ভালোবাসা বলে। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে জোয়ান্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে। জোয়ান্দ্রা হেসে বলে উঠে,
” কিন্তু তুমি চাইলে আমাকে একটা সাহায্য করতে পারো। ”
আনাস্তাসিয়া সোজা হয়ে বসে বলে,
” অবশ্যই করবো। তুমি বলো। ”
জোয়ান্দ্রা বলে,
” তুমি পারলে জুন এবং জেনিকে তলোয়ার চালানো শিখিয়ে দিও। আমি চাই আমার মেয়েরা আত্মনির্ভরশীল হোক। জীবনে যে কোনো পর্যায়ে তাদের সাহায্য করার জন্য কেউ না থাকলেও যেন তারা নিজেদের আত্মরক্ষা করতে পারে। আমাদের সমাজে আত্মরক্ষা করতে না জানা মেয়েরা খুব অসহায় হয়। আমি চাই না আমার মেয়েরা কখনো নিজেদের অসহায় অনুভব করুক। উল্টো তারা যেন কারো উপকার করতে পারে সেই প্রত্যাশা করি আমি। ”
জোয়ান্দ্রার কথা শুনে মুগ্ধ হয় আনাস্তাসিয়া। তার নিজের মা বাবার কথা মনে পড়ে যায়। তার মা বাবাও সবসময় তাকে আর ক্যাথকে আত্মনির্ভরশীল বানানোর স্বপ্ন দেখতো। এই সমাজে যখন অনেক পিতামাতাই অর্থ উপার্জনের আশায় নিজেদের কন্যা সন্তানকে দাস বাজারে বিক্রি করে আসে সেখানে নিজের মেয়েদের আত্মরক্ষা শিখানোর মতো সুন্দর মানুষিকতার পিতামাতার সংখ্যা খুবই কম।
আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” তুমি চিন্তা করো না। দেখবে একদিন ওরা আমার থেকেও ভালো তলোয়ার চালানো শিখে যাবে। আর আমি শুধু তলোয়ার নয় ওদের ঘোড়া চালানো এবং অন্যান্য ভাষাও শিখিয়ে দিবো। আমি দু তিনটে ভাষা পারি। ”
জোয়ান্দ্রা হেসে বলে,
” কিন্তু তাদের এসব শিখানোর জন্য তোমার আগে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে হবে। চলো নাস্তা করতে হবে এখন। ”
আনাস্তাসিয়া বিছানা ছেড়ে নামতে নামতে প্রশ্ন করে,
” জোসেফ? ”
” ও খুব সকালেই বেড়িয়ে গিয়েছে। ফিরতে রাত হবে। মাঝে মধ্যে রাতে ফিরেও না। তখন আমরা মা মেয়েরা একা থাকি। ”
আনাস্তাসিয়া মুখ গম্ভীর করে প্রশ্ন করে,
” তুমি জানো জোসেফ কাদের জন্য কাজ করে? ”
জোয়ান্দ্রা বিছানা গুছাতে গুছাতে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
” হ্যাঁ। ভ্যাম্পায়ারদের জন্য। ”
আনাস্তাসিয়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
” তবুও তুমি ওকে আঁটকাও না? ”
জোয়ান্দ্রা আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
” কিছু প্রশ্নের উত্তর হয় না অ্যানা। আর জোসেফ তোমার ব্যাপারে সত্যিই বলেছিলো। যে তুমি আস্তো একটা প্রশ্নের ভান্ডার নিয়ে বসা জংলী বিড়াল। ”
আনাস্তাসিয়া রাগ হয়। মনে মনে বলে,
” অসভ্য ভ্যাম্পায়ার আমাকে সকলের কাছে জংলী বিড়াল বলে প্রচার করছে। আর ওই জোসেফও আমাকে সেই নাম ধরে ডাকছে। একবার সামনে পেয়ে নেই। রামধোলাই দিয়ে ওকে ওর কাউন্টের নাম না ভুলিয়ে দিলে আমার নামও আনাস্তাসিয়া না। ”
প্রিন্স ড্রাগোসের কক্ষে প্রবেশ করতেই বেঞ্জামিন দেখে ড্রাগোস আগেই তৈরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেঞ্জামিনকে দেখেই সে বলে উঠে,
” আজকে বাজারে ঘুরতে যাবো বেঞ্জামিন। অনেকদিন হলো প্রজাদের মাঝে ছদ্মবেশে যাওয়া হয় না। ”
বেঞ্জামিন হেসে বলে,
” এজন্যই আজকে সাধারণ প্রজাদের বেশ ভূষণ ধারণ করেছেন? ”
কাপড় দিয়ে অর্ধেক মুখ ঢেকে ক্লকের হুডটা মাথায় টেনে নেয় ড্রাগোস। তারপর বলে,
” বেশি প্রশ্ন করো না। তাড়াতাড়ি চলো কেউ দেখে ফেলার আগে। ”
এই বলেই ড্রাগোস কক্ষ থেকে বের হওয়ার জন্য দরজা খুলতেই দেখে দরজার সামনে কাউন্ট লোনেল দাঁড়িয়ে আছে। বেঞ্জামিন এবং ড্রাগোসকে একসাথে বের হতে দেখে লোনেল প্রশ্ন করে,
” কোথায় যাওয়া হচ্ছে তোমাদের? ”
ড্রাগোস উত্তর দেয়,
” আমরা রাজ্যে ঘুরতে বের হচ্ছি। প্রজাদের অবস্থা কি একটু ঘুরে দেখা প্রয়োজন। ”
লোনেল তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
” রাজ্য ঘুরতে যাচ্ছো নাকি কোনো মেয়ের শিকার করতে যাচ্ছো? ”
ড্রাগোস হালকা রেগে বলে,
” তুমি আমাকে যে কারো সামনে এভাবে অপমান করতে পারো না। ”
লোনেল উত্তরে বলে,
” এই যে কেউটা তোমার সকল পাপের চিহ্ন মুছে আসে। তোমার ওর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। ”
ড্রাগোস রাগে ফোসফাস করতে করতে লোনেলকে অতিক্রম করে বেরিয়ে পড়ে। তার পিতার তাকে কথায় কথায় খোচানো তার মোটেও পছন্দ নয়। বেঞ্জামিনও মাথা নত করে ড্রাগোসের পিছু পিছু বেরিয়ে পড়ে।
লোনেল ছেলের উপর মোটেও সন্তুষ্ট নয়। রাজ্যের এবং নিজের কর্তব্যের প্রতি ড্রাগোস মোটেও দায়িত্বশীল নয়। রাজ্যের সেনারাও ড্রাগোসের তুলনায় বেশি যোগ্য। এরকম চলতে থাকলে সাম্রাজ্য ড্রাগোসের হাতে তুলে দেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ ড্রাগোস দুইদিনের মাথায়ই এই সাম্রাজ্য ডুবাবে। লোনেল নিজের আদিপুরুষের ভাগ্যক্রমে পাওয়া এই সাম্রাজ্যকে এতো সহজে ধূলিসাৎ হতে দিবে না কখনো।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে ক্ষানিকক্ষণ আগে। বুখারেস্টের বাজারে রমরমা পরিবেশ। রাস্তার দু পাশে খোলা দোকান বসেছে অসংখ্য। ক্যাথরিন এবং আরোণ একটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। দোকানে মেয়েদের বিভিন্ন অলংকার বিক্রি করছে। ক্যাথরিন এটা সেটা নিয়ে দেখছে তারপর রেখে দিচ্ছে। আরোণ এতক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে ক্যাথরিনকে দেখছিলো। যখন দেখে ক্যাথরিন নিজে কিছু পছন্দ করছে না তখন সে তাকায় অলংকার গুলোর দিকে। তেমন কিছু তার পছন্দ না হওয়ায় দোকানদারকে বলে,
” আপনার কাছে আরো সুন্দর কিছু নেই? ”
বয়স্ক লোকটা হেসে জবাব দেয়,
” অবশ্যই আছে। ”
বলে লোকটা আলাদা একটি বাক্স বের করে ছোট। বাক্সটা খুলতেই সেখানে একটি সবুজ পাথরের সুন্দর আংটি দেখতে পায় আরোণ। এটা তার পছন্দ হয়। ক্যাথরিনকে দেখিয়ে প্রশ্ন করে,
” তোমার পছন্দ হয়েছে? ”
আংটি টা দেখে ক্যাথরিনও মুগ্ধ হয়ে যায়। সে জবাব দেয়,
” এটি খুব সুন্দর। ”
দোকানদার বলা শুরু করে,
” এটি এখানকার সবথেকে সুন্দর আংটি। উপরে যেই সবুজ পাথরটি দেখছেন সেটা পান্না পাথর। এই পাথর রাশিয়া থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। রোমানিয়ার একজন নামীদামী অলংকার শিল্পী এটা বানিয়েছেন। তার থেকে খুব চওড়া দামে এটা কিনে এনেছি আমি। ”
আরোণ আরেকবার আংটি টার দিকে তাকায়। সে কোনো ভনিতা না করে প্রশ্ন করে,
” দাম? ”
” পাঁচ হাজার মুদ্রা। ”
দাম শুনে ক্যাথরিনের চোখ ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম। এমন নয় যে সে কখনো দামী জিনিস পড়ে নি। উল্টো কাভালায় থাকতে সেখানকার সবথেকে দামী জিনিসপত্রই তার বাবা তাদের ভাইবোনদের এনে দিতো। কিন্তু এই সামান্য আংটির জন্য এতো মুদ্রা খরচ তার কাছে অহেতুক মনে হয়। সে আরোণের হাত ধরে নিজের কাছে টেনে কানে কানে বলে,
” আমার এটা পছন্দ হয় নি। এখান থেকে চলো। ”
আরোণ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” এই মাত্রই না তুমি বললে এটা সুন্দর? ”
” হ্যাঁ কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না। ”
আরোণ বলে,
” তুমি দামের জন্য মানা করছো? ”
” উহু। আমার এটা পছন্দই হয় নি। এখন চলো এখান থেকে। তুমি না গেলে আমি একাই যাচ্ছি। ”
এটা বলেই ক্যাথরিন হাঁটা শুরু করে। একটু পরে আরোণও তার পিছুপিছু এসে বলে,
” আমার জন্য তো অপেক্ষা করবে। ”
ক্যাথরিন কিছু না বলে হাঁটতে থাকে। তারা বাজার পেরিয়ে এখন নীরব রাস্তা ধরে হাঁটছে। আরোণ হঠাৎ ক্যাথরিনকে হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়। ক্যাথরিন দাঁড়িয়ে ভ্রু কুচকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। আরোণ চোখের ইশারায় উপরের দিকে তাকাতে বলে। ক্যাথরিন আরোণের ইশারা অনুসরণ করে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় আকাশে চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। আরোণ সাথে সাথে ক্যাথরিনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সেই সবুজ পাথরের আংটি টা বের করে বলে,
” তোমার জন্য আকাশের চাঁদ, তারা এনে দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও এই সামান্য আংটি দেওয়ার সামর্থ্য আছে আমার। এটি গ্রহণ করলে আমি খুশি হবো। ”
ক্যাথরিন বিস্মিত হয়ে থাকে। আরোণ ক্যাথরিনের জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই তার হাত ধরে আংটিটা পরিয়ে দেয়। তারপর তার হাতের উল্টো পিঠে আলতো করে অধর ছোঁয়ায়। ক্যাথরিনকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরোণ উঠে দাঁড়িয়ে ক্যাথরিনের গালে আলতো করে হাত রেখে বলে,
” কোনো কিছুর দাম কখনোই আমার ভালোবাসার পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারে না ক্যাথ। তুমি আমার কাছে অনন্য এবং তুমি ছাড়া সব কিছুই আমার কাছে নগন্য। ”
ক্যাথরিন মুগ্ধ শ্রোতার মতো এতক্ষণ আরোণের কথা শুনছিলো। এই পর্যায়ে সে বলে উঠে,
” তুমি প্রেমিক হিসেবে যতটা চমৎকার আমি প্রেমিকা হিসেবে ততটাই জঘন্য। ”
আরোণ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” এমন কেন মনে হলো তোমার? ”
ক্যাথরিন বলে,
” তুমি এতো সুন্দর করে কিভাবে কথা বলতে পারো? আমি তোমার কথার পিঠে কোনো উত্তর খুঁজে পাই না। পরে নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত হই। ”
আরোণ শব্দ করে হেসে উঠে। ক্যাথরিন সেই হাসি দেখে ঠোঁট উল্টে বলে,
” মোটেও হাসবে না তুমি। ”
আরোণ হাসতে হাসতেই বলে,
” যাক এটা অন্তত স্বীকার করেছো যে প্রেমিক হিসেবে আমি চমৎকার। তুমি চিন্তা করো না। সময়ের সাথে সাথে তোমাকেও আমার মতো সুন্দর কথা বলা শিখিয়ে দিবো আমি। ”
এটা বলেই আরোণ আবার হাসতে থাকে। ক্যাথরিন চোখ ছোট করে প্রশ্ন করে,
” জীবনে কয়টা প্রেম করেছো বলো তো আমাকে। ”
আরোণ হাসি থামিয়ে বলে,
” কেন? ”
” নাহয় অভিজ্ঞ প্রেমিকদের মতো এতো কথা জানো কি করে তুমি? ”
আরোণ কিছু একটা মনে করার ভান করে বলে,
” ৫৭ টা হয়তো করেছি। এক দুই উপর নিচে হতে পারে। ”
ক্যাথরিনের মুখ হা হয়ে আসে। অবাক হওয়ার থেকে বেশি তার রাগ হয় আরো। সে আরোণের জীবনের ৫৮ তম নারী? মানে দুদিন পরে সে মরে গেলে আবার অন্য কেউ আরোণের জীবনে আসবে? ক্যাথরিন রাগে আশেপাশে তাকিয়ে মাটির উপর পড়ে থাকা একটি গাছের ডাল তুলে নেয়। আরোণ সেটা দেখে ভয় পাওয়ার অভিনয় করে বলে,
” কি করছো তুমি? ”
ক্যাথরিন আরোণের দিকে দৌড়ে আসতে আসতে বলে,
” তোমার প্রেমের অভিজ্ঞতা ছুটাচ্ছি। ”
আরোণ হেসে তীব্র গতিতে দৌড়াতে শুরু করে। অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পরও যখন আরোণকে আর হাতের নাগালে পায় না তখন ক্যাথরিন ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। তখনই বাতাসের বেগে আরোণ তার সামনে এসে দাঁড়ায়। আরোণকে দেখেই ক্যাথরিন পাশ কাটিয়ে সড়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আরোণ একহাত দিয়ে গাছের উপর ঠেক দিয়ে সামান্য ঝুকে সামনের দিকে। ক্যাথরিন রাগ দেখিয়ে অপর পাশ দিয়ে সড়ে যেতে নিলে আরোণ হাতের সাহায্যে সেদিক দিয়েও বাধা দেয়। ক্যাথরিন চোখ গরম করে আরোণের দিকে তাকায়। আরোণ ফিসফিসিয়ে বলে,
” তুমিই প্রথম, তুমিই শেষ এবং তুমিই একমাত্র। ”
ক্যাথরিন হালকা অভিমানী স্বরে প্রশ্ন করে,
” তুমি নিজেই মাত্র বলছিলে আগে আরো ৫৭ টা প্রেম করেছো। ”
” মজা করছিলাম বোকা। ”
ক্যাথরিন কিছু বলতে নিবে তখনই আরোণ ক্যাথরিনের মুখে হাত দিয়ে তাকে পুরোপুরি গাছের আড়াল করে ফেলে। ক্যাথরিন প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালে আরোণ চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলে তাকে। তারপর গাছের আড়াল হতে পিছনের দিকে তাকায়। ঝোপঝাড়ের আড়ালে একটি যুবক একটি জ্ঞানহীন মেয়েকে কাধে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সাথে আরেকটি যুবক তাদের পিছে পিছে যাচ্ছে এবং আশেপাশে নজর রাখছে যে কেউ দেখছে নাকি। তাদের উদ্দেশ্য কি তা আন্দাজ করতে পারে আরোণ। ক্যাথরিন দেখে ফেললে নিশ্চিত প্রতিবাদ করতে যাবে। আরোণ মোটেও চাচ্ছে না ক্যাথরিন কোনো ধরনের ঝামেলায় জড়াক। এসব ভাবতে ভাবতে সে সামনে আবার তাকায়। সামনের যুবকটি এক মুহূর্তের জন্য পিছনের দিকে তাকালে আরোণ অবাক হয়ে যায়। সে অস্ফুটে বলে উঠে,
” প্রিন্স ড্রাগোস হেনরিকস। ”
রাতে অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পরও আনাস্তাসিয়ার ঘুম আসছে না। উঠে বসে সে। নতুন কোথাও এলে তার ঘুমাতে অসুবিধা হয় সবসময়। তার দুপাশে শুয়ে থাকা জুন এবং জেনির দিকে তাকায় একবার সে। বেঘোরে ঘুমোচ্ছে তারা। আনাস্তাসিয়া ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। বিছানা থেকে নেমে বাচ্চা দুটির গায়ে চাদর টেনে দেয় ভালো মতন। দিনের দিকে মোটামুটি শীত থাকলেও রাতের দিকে প্রায়ই তুষারপাত হয় এখানে। তাই ঠান্ডাও লাগে খুব। আনাস্তাসিয়া বিছানার একপাশে পড়ে থাকা একটি চাদর নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নেয়। জোসেফ আজ রাতে বাসায় ফিরে নি। জোয়েন্দ্রা তার অপেক্ষা করতে করতে অনেক আগেই নিজের কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আনাস্তাসিয়া নিশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাসার মূল দরজা খুলে বের হয়। মূল দরজা দিয়ে বের হতেই একটা লম্বা বারান্দা আছে। তার মাঝ দিয়েই চারটি সিড়ি পেরিয়ে উঠোনে যেতে হয়।
আনাস্তাসিয়া কিছুক্ষণ বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতে থাকে। তার মনে পড়ে রিকার্ডোর কথা। মুখে যতোই বলে আসুক সে আর রিকার্ডোর পিছু করবে না কখনো কিন্তু মন সে কথা মানে না। আনাস্তাসিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠে,
” পাষাণ কোথাকার। ”
সাথে সাথেই তার মনে পড়ে যায় রিকার্ডোর তাকে ডাকা জংলী বিড়াল শব্দটা। মিছে রাগ দেখিয়ে আপন মনেই সে বলতে থাকে,
” দোষ তোর আনাস্তাসিয়া। তুই ওই সাদা টিকটিকির প্রেমে পড়েছিস। এখন তুই নিজে এর ঠেকা সামলা। কি অসভ্য! আমাকে জংলী বিড়াল বলে! নিজে আস্ত এক রক্তচোষা পিশাচ হয়ে আমার মতো নিষ্পাপ মানুষকে এসব নাম দিয়ে বেড়ায়। থাকুক ও ওর রক্তের নেশা নিয়ে। ঈশ্বর করুক যেন ওর এই রক্তের নেশা পরিবর্তন হয়ে অন্য কোনো নেশাতে রূপ নেক। ”
এটুকু বলেই আনাস্তাসিয়া বারান্দার এক কোণে রাখা একটি আরামকেদারার উপর বসে পড়ে। পা দুটি ভাজ করে উপরে উঠিয়ে পিঠ এলিয়ে দেয় পিছনের দিকে। বারান্দায় নিভু নিভু মশালের আলোয় বাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ে সে৷
কিছু সময় পাড় হওয়ার পর বারান্দায় নিভু নিভু করা মশালটা নিভে যায়। হীম শীতল বাতাসের সাথে একটি ছায়া এগিয়ে আসে আনাস্তাসিয়ার দিকে। ছায়াটি এগিয়ে এসে আনাস্তাসিয়ার সামনে হাঁটুুগেড়ে বসে। আনাস্তাসিয়ার মুখের উপর পড়ে থাকা সোনালী চুলগুলোকে আলতো হাতে সড়িয়ে দেয়। আনাস্তাসিয়ার গায়ের চাদরটা একদিকে মেঝেতে পড়ে ছিলো। সেটা তুলে নিয়ে আনাস্তাসিয়ার গায়ে দিয়ে দেয়। তারপর সবুজ নেত্র জোড়া মেলে তাকিয়ে থাকে আনাস্তাসিয়ার দিকে। তাকিয়ে থাকা অবস্থায়ই সে বলে উঠে,
” রক্তের নেশা থেকেও বড় নেশা পেয়ে গিয়েছি আমি। ”
এটুকু বলেই সে আনাস্তাসিয়ার গালে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
” রক্তের তৃষ্ণা আমায় এতোটা কাতর করে তুলছে না যতটা তোমাকে দেখার তৃষ্ণা কাতর করছে। এই নীলকান্তমণি, এই স্বর্ণকেশ আমায় যতটা মাতোয়ারা করছে কোনো মানব রক্তের ঘ্রাণও আমায় ততটা মাতোয়ারা করে নি। বড্ড জ্বালাচ্ছো নাসিয়া। ঠিকই নিজের পিছু নিতে বাধ্য করেছো আমায়। এভাবে চলতে থাকলে রক্ত নেশা ছেড়ে নাসিয়া নেশায় মত্ত হতে হবে আমার। ”
আরোণ এবং ক্রিয়াস একসাথে বসার ঘরে বসে আছে। ক্যাথরিন উপরে ঘুমোচ্ছে। তারা এখনো বুখারেস্টে রয়েছে। আরোণ চিন্তিত স্বরে বলে,
” আমার মনে হয় ক্যাথরিন সেদিন রাতে জঙ্গলে যাকে দেখেছিলো এবং যে ক্যাথরিনের পিছু নিয়েছিলো সে ড্রাগোসই ছিলো। ”
ক্রিয়াস বলে,
” আমাদের এই ব্যাপারে নাক না গলানোই ভালো হবে আলফা। সাম্রাজ্যের প্রিন্স কি করে বেরাচ্ছে তা দিয়ে আমাদের কিছু আসে যায় না। যতক্ষণ না সে কোনোভাবে আমাদের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে ততক্ষণ আমাদেরও এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। ”
আরোণ বলে,
” আমি চার্চে গিয়েছিলাম ক্রিয়াস। ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি। ক্যাথ বিশ্বাস করে আমাকে সম্পূর্ণ রূপে। চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখেও মেনে নিবো? ”
ক্রিয়াস প্রথমে অবাক হয় আরোণ চার্চে গিয়েছে শুনে। তবুও নিজের বিস্ময় দমিয়ে সে বলে,
” অন্যায়ের শাস্তি একটাই আলফা। সেটা হলো মৃত্যু। আপনি যদি রোমানিয়ান প্রিন্সকে হত্যা করেন তাহলে সাম্রাজ্য হুমকির মুখে পড়বে। এতে আরেক বিপত্তি বাধবে। ”
আরোণ কোনো কথা বলে না। দু হাতের উপর মাথা ঠেকে চোখ বুজে ফেলে সে। মন এবং মস্তিষ্কের যুদ্ধে মানসিক পীড়া হচ্ছে খুব৷ মন বলছে তার ড্রাগোসকে শাস্তি দেওয়া উচিত আর মস্তিষ্ক বলছে শুধু শুধু এই ঝামেলায় না জড়ানোই উত্তম। ধীর স্বরে সে প্রশ্ন করে,
” মার্থা এবং জ্যাকসনের কোনো ঠিকানা পেয়েছো? ”
ক্রিয়াস জবাব দেয়,
” ভাসলুই গ্রাম এবং তার পাশের জঙ্গলের দিকটা খুঁজে দেখা বাকি শুধু। কালকে সেদিকটাও খুঁজে দেখবো। ”
আরোণ মাথা তুলে তাকায় ক্রিয়াসের দিকে। সে প্রশ্ন করে,
” ট্রান্সিলভেনিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে না ভাসলুই গ্রাম? ”
ক্রিয়াস সম্মতির সহিত মাথা নাড়ায়। আরোণ কিছু একটা চিন্তা করে। তারপর বলে,
” আমিও কালকে তোমার সাথে যাবো। ”
ক্রিয়াস প্রশ্ন করে,
” ক্যাথরিন? ”
” ক্যাথরিনও যাবে আমাদের সাথে। ওকে একা রেখে যাওয়ার থেকে আমার সাথে নিয়ে গেলেই আমি বেশি নিশ্চিত থাকতে পারবো। ”
ক্রিয়াস মাথা নাড়ে শুধু। কিন্তু মনে মনে হালকা ভয়ও হয় তার।
টেবিলে হরেক রকমের নাস্তা সাজানো। প্ল্যাকিন্টা অ্যারোমানা, মামালিগা কু ল্যাপ্টে, গোগোসি, বুলজ সহ আরো কিছু নাম না জানা খাবার টেবিলে এনে সাজাচ্ছে জোয়ান্দ্রা। নাস্তার টেবিলে বসে আনাস্তাসিয়া জোয়ান্দ্রাকে বলে,
” জোয়ান্দ্রা, আমাকে রোমানিয়ান খাবার রান্না শিখাবে? ”
জোয়ান্দ্রা অবাক সুরে বলে,
” তুমি রান্না শিখে কি করবে? ”
আনাস্তাসিয়া বলে,
” কখনো তুমি বাহিরে গেলে বা ব্যস্ত থাকলে আমি তাহলে রান্না করতে পারবো। যদিও আমি কিছু রান্না পারি। কিন্তু ওগুলো গ্রীক খাবার। তোমাদের পছন্দ হবে নাকি আমি নিশ্চিত নই। ”
জুন এবং জেনি পাশ থেকে বলে উঠে,
” আমরা গ্রীক খাবার খেতে চাই। ”
জোয়ান্দ্রা হেসে বলে,
” কোনো সমস্যা নেই। আমাদের গ্রীক খাবার খেতে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে আবার খাওয়ায় মনযোগ দেয়। খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই সে এবং জোয়ান্দ্রা মিলে সব গুছিয়ে রাখে। গুছানো শেষ করে আনাস্তাসিয়া আমতা আমতা করে প্রশ্ন করে,
” তুমি অনুমতি দিলে আমি কি বাহিরে ঘুরে আসতে পারি একটু? আসলে অনেকদিন ধরে বাসায় বসে আছি তাই। ”
জোয়ান্দ্রা আনাস্তাসিয়ার মনের অবস্থা বুঝতে পারে। সে বলে,
” যেতে পারো কিন্তু সাথে জুন এবং জেনিকে নিয়ে যাও। তুমি এখানে নতুন। ওরা মোটামুটি রাস্তা কিছুটা চিনে। আর বেশি দূরে কোথাও যেও না। ”
আনাস্তাসিয়া খুশি হয়ে জোয়ান্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
” অনেক অনেক ধন্যবাদ জোয়ান্দ্রা। চিন্তা করো না আমি দূরে কোথাও যাবো না আর বাচ্চাদেরও খেয়াল রাখবো। ”
ক্যাথরিন, আরোণ দুটি ঘোড়ায় করে ভাসলুই গ্রামে পৌঁছায়। আরোণ ক্যাথরিনকে আসার আগে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে যেন এক মুহূর্তের জন্য আরোণের চোখের আড়াল না হয়। ক্রিয়াস নেকড়ে রূপে জঙ্গলের ভেতর হয়ে অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। ক্যাথরিন চারিদিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
” ক্রিয়াসকে এখন কোথায় খুঁজে পাবো আমরা? ”
” গ্রামটা আরেকটু পাড় করলেই সামনে আরেকটা জঙ্গল আছে। সেখানেই ক্রিয়াস আছে। ”
এটা বলেই আরোণ ঘোড়ার লাগাম টেনে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ক্যাথরিনও তার পিছু পিছু যেতে থাকে।
জঙ্গলে থাকা পাইন গাছ গুলোকে ক্যাথরিনের কেন যেন খুব ভালোলাগে। জঙ্গলের আশেপাশে তাকিয়ে এগোতে এগোতে হঠাৎ ক্যাথরিন ভ্যালেন্টাইনের লাগাম টেনে দাঁড়িয়ে পড়ে। আরোণ পিছনে ফিরে প্রশ্ন করে,
” কি হলো ক্যাথ? ”
ক্যাথরিন কোনো উত্তর না দিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ে। আরোণও সাথে সাথে নেমে ক্যাথরিনের দিকে এগিয়ে যায়। ক্যাথরিন আরোণের দিকে তাকিয়ে মুখে আঙুল রেখে ইশারা করে কোনো শব্দ না করতে। আরোণ ভ্রু কুচকে বুঝার চেষ্টা করে কি হচ্ছে। ক্যাথরিন হাতের ইশারায় দূরে একটি পাথরের উপর বসে থাকা একটি খরগোশকে দেখায়। খরগোশটা এক পাথর হতে আরেক পাথরের উপর লাফালাফি করছে। ক্যাথরিন বিনা শব্দ ব্যয়ে এগিয়ে যায় খরগোশটার দিকে। ক্যাথরিন ধরতে নিবে তার আগেই খরগোশটা দৌড়ে ঝোপঝাড়ের ভেতর হয়ে অপর পাশে চলে যায়। ক্যাথরিনও তার পিছু পিছু দৌড় দেয়। আরোণ পিছন থেকে বলে উঠে,
” ক্যাথ ওদিকটায় যেও না। ”
কিন্তু ক্যাথরিনের কান পর্যন্ত সেই কথা পৌঁছায় না। তাই আরোণ বাধ্য হয়ে নিজেও ক্যাথরিনের পিছু নেয়। ঝোপঝাড় পেরিয়ে অপর পাশে আসতেই ক্যাথরিন আশেপাশে তাকিয়ে আর সেই খরগোশটাকে কোথাও দেখে না। আরোণ পিছু পিছু এসে বলে,
” কি করছো তুমি? ”
ক্যাথরিন মন খারাপ করে বলে,
” হারিয়ে গেলো খরগোশটা। ”
আরোণ তাড়া দেখিয়ে বলে,
” এখন মন খারাপ করো না। বাসকোভ প্রাসাদে ফিরে আমি তোমার জন্য বনের সবচেয়ে সুন্দর খরগোশটা এনে দিবো। ”
ক্যাথরিন মাথা নাড়িয়ে আরোণের সাথে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়৷ কিন্তু হঠাৎ সে পিছন হতে দুটি বাচ্চার ফিসফিস করার শব্দ শুনতে পায়। সাথে সাথে সে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। আরোণও সেই শব্দ শুনতে পায়। আরোণ ক্যাথরিনকে চোখের ইশারায় নিষেধ করে। ক্যাথরিন সেদিকে তেমন একটা পরোয়া না করে সেই বাচ্চা দুটির ফিসফিস আলাপের শব্দকে অনুসরণ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। আরোণ মনে মনে বলে,
” এই জঙ্গলের মাঝে কোনো বাচ্চা কি করতে এসেছে? ”
এটুকু বলে সে নিজেও ক্যাথরিনের সাথে সেই শব্দ অনুসরণ করে এগিয়ে যায়। কিছুটা সামনে এগিয়ে ডানে মোড় নিতেই ক্যাথরিন দেখতে পারে একটি মেয়ে সেই খরগোশটা কোলে নিয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার দু পাশে দুটি ছোট বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে কি যেন বলছে। খরগোশ কোলে নিয়ে থাকা মেয়েটির পিছন থেকে পিঠ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটির কোমর সমান সোনালী চুল দেখে ক্যাথরিনের মনে খটকা লাগে। মেয়েটি তার দু পাশের বাচ্চা দুটিকে ধীর স্বরে বলে উঠে,
” জুন জেনি আস্তে কথা বলো। খরগোশটা হয়তো আমাদের কথার শব্দে ভয় পাচ্ছে। ”
ক্যাথরিনের শরীর বরফের ন্যায় জমে যায়। এই কণ্ঠস্বর তার পরিচিত। তার দু পা আপনাআপনি সামনে এগিয়ে যায়। ক্যাথরিনকে হঠাৎ সামনে এগোতে দেখে আরোণের ভ্রু জোড়া কুচকে আসে। সে মনে মনে ভাবে ক্যাথরিন হয়তো ওই খরগোশটার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। সে নিজের স্থানেই দাঁড়িয়ে রয়। ক্যাথরিন সেই মেয়েটার কাছে এগিয়ে গিয়ে কাপা কাপা হাতে তার কাধে হাত রাখে। সাথে সাথেই মেয়েটা ঘাড় তুলে ক্যাথরিনের দিকে তাকায়। বিস্ময়ে ক্যাথরিন দু হাতে মুখ ঢেকে ফেলে। অস্ফুটে বলে উঠে,
” অ্যানা। ”
আনাস্তাসিয়ার হাতের বাধন আলগা হয়ে আসে। খরগোশটা তার হাত থেকে ছুটে এক লাফে পালিয়ে যায়। সাথে সাথে জুন এবং জেনি বলে উঠে,
” অ্যানা খরগোশটা পালিয়ে যাচ্ছে। ”
আনাস্তাসিয়ার কানে সেই কথা পৌঁছায় না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে ভূত দেখার মতো চমকে আছে। ক্যাথরিন বিস্ময় কাটিয়ে কাছে এগিয়ে দু’হাতে আনাস্তাসিয়াকে জড়িয়ে ধরে। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না সে স্বপ্ন দেখছে নাকি সত্যি। সে কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠে,
” তুই বেঁচে আছিস? ”
আনাস্তাসিয়া বুঝতে পারছে না এসব কি হচ্ছে। এই প্রশ্ন তো তার করা উচিত। আনাস্তাসিয়া কণ্ঠে বিস্ময় মিশিয়ে বলে উঠে,
” ক্যাথরিন? ”
ক্যাথরিন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
” হ্যাঁ। আমি ক্যাথরিন। তোর বোন। ”
বলতে বলতে ক্যাথরিন কেদে ফেলে। দূর হতে এই দৃশ্য দেখে আরোণ প্রথমে বোকার মতো তাকিয়ে ছিলো। হঠাৎ আনাস্তাসিয়ার চেহারা ভালো করে লক্ষ্য করতেই তার মনে পড়ে যায় এই মেয়েকে সে ক্যাথরিনের সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময় দেখেছিলো। আরোণ অবাক হয়। এটা ক্যাথরিনের বোন? কিন্তু ক্যাথরিনের ভাইবোন তো মারা গিয়েছিলো। তাহলে কি ক্যাথরিন ভুল তথ্য পেয়েছিলো? আরোণ কয়েক কদম এগিয়ে যায় আরও।
আনাস্তাসিয়া বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করে,
” তুই বেঁচে আছিস? ”
ক্যাথরিন কোনো কথা বলতে পারে না। সে উপর নিচে মাথা নাড়ায় কেবল। আনাস্তাসিয়ার চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে। সে বলে উঠে,
” তুই রোমানিয়ায়? কিভাবে? সেদিন রাতে কি হয়েছিলো? আমি ওই জঙ্গলে তোকে খুঁজেছি কতো। কিন্তু তোকে পাই নি। ”
ক্যাথরিন কোনোমতে বলে,
” এসব উত্তর পড়ে দিবো। লিয়াম? লিয়াম কোথায়? একটা কাস্টোরিয়ার ছেলে আমাকে ভুলভাল কি বলে বেড়াচ্ছিলো। বলে কিনা আমার পরিবার সেই যুদ্ধে মারা গিয়েছে। এইতো আমার বোন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমার ভাইও আছে। লিয়াম কোথায় আর তুই এখানে কি করছিস? ”
আনাস্তাসিয়া অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জবাব দেয়,
” লিয়াম নেই। ওরা গ্র্যানি আর লিয়ামকে মেরে ফেলেছে। আমি বাঁচাতে পারি নি ওদের। ওই রোমানিয়ান সৈন্যরা আমার চোখের সামনে আমার ভাইকে মেরেছে। আমি ওকে বাঁচাতে পারি নি। ”
ক্যাথরিনের শেষ আশাটুকুও ভেঙে যায়। সে কাদতে কাদতে আনাস্তাসিয়াকে জড়িয়ে ধরে। আনাস্তাসিয়াও ক্যাথরিনকে জড়িয়ে ধরে কাদতে থাকে। হঠাৎ তার চোখ পড়ে ক্যাথরিনের পিছনে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরোণের দিকে। আরোণও বিস্ময় নিয়ে তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। আরোণকে দেখে আনাস্তাসিয়ার কান্না থেমে যায়। সে ক্যাথরিনকে ছেড়ে ভ্রু কুচকে আরোণের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হচ্ছে সে আরোণকে আগে কোথাও দেখেছে। কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করতেই আনাস্তাসিয়ার মনে পড়ে যায়। আনাস্তাসিয়া চকিতে ক্যাথরিনের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে আরোণের দিকে তাকায়। এই লোকই তো সেদিন রাতে ক্যাথরিনকে আটকে ছিলো। কিন্তু তখন তার চোখ রক্তিম লাল ছিলো। এখন তার চোখের মণির রঙ স্বাভাবিক কালো। আনাস্তাসিয়া বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। ক্যাথরিন বুঝতে পারে আনাস্তাসিয়ার মনে কি চলছে। সে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে আস্বস্ত করে বলে,
” আমি তোকে সব খুলে বলছি। ”
আনাস্তাসিয়া মাথা নাড়িয়ে জুন এবং জেনির দিকে তাকায়। ওদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলে,
” আমি তোমাদের বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসছি। কিন্তু তোমরা আমাকে কথা দাও এখানে আমার কারো সাথে দেখা হয়েছে এই কথা কাউকে বলবে না। ”
জুন এবং জেনি মাথা নেড়ে বলে,
” তুমি আমাদের সাথে বাসায় যাবে না অ্যানা? ”
” অ্যানা আসবো। তোমরা জোয়ান্দ্রাকে বাসায় গিয়ে বলবে যে অ্যানা বলেছে কিছুক্ষণের মাঝেই ফিরে আসবে। ঠিক আছে? ”
জুন এবং জেনি আবারও মাথা নাড়ায়। আনাস্তাসিয়া মনে মনে ভাবে জুন এবং জেনিকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এসে তার ক্যাথরিনের সাথে কথা বলা জরুরি। তার মনে অনেক প্রশ্ন জমে আছে। সবথেকে বড় প্রশ্ন হলো ক্যাথরিনের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এই সুঠাম দেহের পুরুষের পরিচয় কি?
ক্যামিলোর ইদানীং কেন জানি ড্যানিয়েলের ব্যবহার রহস্যময় লাগছে। সারাক্ষণ কি যেন চিন্তায় মগ্ন থাকে সে। আবার বেশিরভাগ সময়ই সে দূর্গের বাহিরেই কাটাচ্ছে। আগে তো ড্যানিয়েল বাহিরে গেলে সাথে ক্যামিলোকেও নিয়ে যেতো। যেদিন রাতে জ্যাকসন ক্যামিলোকে বন্দী করে সেদিনও ড্যানিয়েল নিজ থেকে ওকে নিয়ে জঙ্গলে গিয়েছিল। ক্যামিলো এসব ভাবতে ভাবতে তার কক্ষের জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। দূর্গের মূল ফটকের দিকে তাকাতেই সে দেখতে পায় ড্যানিয়েল ক্লকের হুড টেনে মাথায় দিতে দিতে অগোচরে বেড়িয়ে যাচ্ছে। ক্যামিলো সিদ্ধান্ত নেয় আজ সে ড্যানিয়েলের পিছু নিয়ে দেখবে ড্যানিয়েল এতো লুকোচুরি করে প্রতিদিন কোথায় যায়। সেও তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ে ড্যানিয়েলের পিছু করার জন্য।
জঙ্গলে এক গুহার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাকসন। তার পাশেই মার্থা দাঁড়ানো৷ মার্থা কণ্ঠে বিরক্তি মিশিয়ে প্রশ্ন করে,
” আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে আমাদের? ”
” এসে পড়বে হয়তো এক্ষুনি। ”
জ্যাকসনের কথা শেষ হতেই সেখানে পাঁচজন ভ্যাম্পায়ার এসে হাজির হয়। তাদের দিকে তাকিয়ে জ্যাকসন মুচকি হাসে। এর কিছুক্ষণ পরই দুজন নেকড়ে এসে হাজির হয়। তারপর পরই সেখানে কালো ক্লক পড়া একজন লোক আসে। জ্যাকসন তার দিকে তাকিয়ে বলে,
” বেশ দেরি করে ফেলেছো আসতে ড্যানিয়েল। ”
ড্যানিয়েল মাথা থেকে হুড ফেলে বলে উঠে,
” সবার চোখ ফাকি দিয়ে আসা কোনো চারটি খানি কথা নয়। ”
এটুকু বলেই ড্যানিয়েল সেখানে উপস্থিত ভ্যাম্পায়ার এবং নেকড়েদের দিকে তাকায়। তারপর তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
” মাত্র এই কয়জন ভ্যাম্পায়ার এবং নেকড়ে নিয়ে তুমি আরোণ এবং রিকার্ডোকে হারাতে চাও? আরোণ এবং রিকার্ডো একাই এই সবগুলোর অস্তিত্ব নিঃশেষ করার জন্য যথেষ্ট। ”
মার্থা বিরক্তির সুরে বলে উঠে,
” আরোণকে হারানো সহজ হবে। ওর দূর্বলতা কিসে সেই সম্পর্কে আমি ভালো করেই জানি। তোমাকে এখানে ডাকা হয়েছে আমাদের রিকার্ডো সম্পর্কে জানানোর জন্য। রিকার্ডোর কোনো দূর্বলতা থাকলে সেই সম্পর্কে আমাদের জানাও। ”
ড্যানিয়েল ভ্রু কুচকে তাকায়। সে মনে মনে ভাবে কিছু একটা। তারপর গম্ভীর মুখ করে বলে,
” রিকার্ডো সম্পর্কে একটা সত্যি আছে যা জানলে এইখানের সকলেই অবাক হয়ে যাবে। ”
ড্যানিয়েল এটুকু কথা বলতেই হঠাৎ কিছুটা দূর থেকে কিছু একটার শব্দ হয়ে উঠে। সকলেই সাথে সাথে সেদিকে তাকায়। জ্যাকসন এগিয়ে গিয়ে চারিদিকে একবার নজর বুলিয়ে নেয়। কেউ নেই সেখানে। তাহলে কিসের শব্দ হলো এইমাত্র?
তড়িঘড়ি করে দূর্গে ফিরে নিজের কক্ষে যায় ক্যামিলো। ক্যাবিনেট খুলে সেখান থেকে একটা ছোট কাঠের বাক্স বের করে সে। তারপর হন্তদন্ত হয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এক দাসীকে জিজ্ঞেস করে,
” কাউন্ট রিকার্ডো কোথায়? ”
” তিনি নিজের কক্ষেই আছে কোভেন ক্যামিলো। ”
ক্যামিলো আর কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সোজা রিকার্ডোর কক্ষের দিকে অগ্রসর হয়। কক্ষের দরজার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে পুরুষালি স্বরে জবাব আসে,
” এসো। ”
ক্যামিলো কক্ষে প্রবেশ করে দেখে রিকার্ডো বসে আছে ডিভানে। ক্যামিলোকে দেখে বলে,
” আজ হঠাৎ এই সময় আমার কক্ষে? কিছু প্রয়োজন মা? ”
ক্যামিলো কোনো কথা না বলে এগিয়ে গিয়ে রিকার্ডোর একহাত ধরে বলে,
” কোনো প্রশ্ন করবি না। চুপচাপ আমার সাথে চল। ”
হঠাৎ ক্যামিলোর এতো তাগদা দেখে রিকার্ডোর ভ্রু কুচকে আসে। সে প্রশ্ন করে,
” কি হয়েছে? ”
ক্যামিলো উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠে,
” তোর সকল প্রশ্নের উত্তর দিতেই এসেছি। চল আমার সাথে। ”
এটুকু বলেই রিকার্ডোর হাত ধরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে ক্যামিলো। রিকার্ডো আর কোনো প্রশ্ন করে না। সে বুঝতে পারছে জরুরি কিছুর জন্যই হয়তো ক্যামিলো এতো উদ্বেগ নিয়ে তার কাছে এসেছে।
পাতালপুরীর গুপ্ত কক্ষের সামনে আসতেই রিকার্ডোর চোখ কুচকে আসে। এই গুপ্ত কক্ষ এক শতাব্দী ধরে বন্ধ পড়ে আছে। না কেউ এখানে এসেছে কখনো আর না এই কক্ষের তালা খুলেছে। ক্যামিলো তাড়াহুড়ো করে একটি চাবি দিয়ে তালা খুলে রিকার্ডোকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে প্রবেশ করতেই একটা বাজে উটকো গন্ধ এসে লাগে তাদের নাকে। কক্ষের ভেতর কয়েকটা বড় ইদুরও দৌড়ে ছুটে পালায় এদিক ওদিক। এতো বছর এই কক্ষ বন্ধ থাকার ফলস্বরূপ এর অবস্থা অনেক বাজে হয়ে আছে। রিকার্ডো বলে উঠে,
মহাপ্রয়াণ পর্ব ৩৩+৩৪
” এই কক্ষে এক মুহূর্ত থাকাও সম্ভব না আমার পক্ষে। ”
এটুকু বলেই রিকার্ডো বেরিয়ে যেতে নিলে ক্যামিলো তার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। তারপর রিকার্ডোর চোখে চোখ রেখে বলে উঠে,
” নিজের সত্য না জেনেই চলে যাবেন কাউন্ট রিকার্ডো আলবার্ট? ”
