Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৫

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৫

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৫
রানী আমিনা

বুকের ওপর কোনো চতুষ্পদ প্রাণীর উপস্থিতি অনুভব করে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো বাহার। চোখ মেলতেই মুখের ওপর একটি শেয়ালের অত্যন্ত মনোযোগী চেহারা দেখা মাত্রই ভয়ে চিৎকার দিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো সে৷
হঠাৎ চিৎকারে ভয়ে পেয়ে ফক্সি লাফিয়ে উঠলো, পরক্ষণেই উর্ধশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। বাহার দম ফেলতে শুরু করলো জোরে জোরে, তাকিয়ে দেখলো চারদিকে। এ কোথায় সে?
কাঠের ওপরের সুনিপুণ খোদাইকর্ম দেখতে দেখতে বিছানা ছেড়ে নামলো সে। মাথার ভেতর টলে উঠলো সামান্য। মনে করার চেষ্টা করলো এর আগে সে কোথায় ছিলো। কারাগারের সেই ভয়ানক চিত্র আর অত্যাচারের কথা মনে পড়তে শিউরে উঠলো। সেখান থেকে এখানে কখন, কিভাবে এলো?

বাইরে থেকে নানা প্রাণীদের চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ ভেসে আসছে, একটি ঘোড়ার হ্রেষা ধ্বনিও কানে আসছে থেকে থেকে। একটু একটু করে এগিয়ে কামরার বাইরে আসতেই চোখে পড়লো বিরাট হলরুম। ছাদের মাঝবরাবর ঝুলতে থাকা ক্রিস্টালের তৈরি বিশাল ঝাড়বাতিটি জ্বলতে দেখে বাহার বুঝলো সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ঝাড়বাতির আলো কাঠের পালিশ করা মেঝেতে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে এসে লাগছে ওর চোখে৷
এতক্ষণ আঁধারে থেকে ওর চোখ এই অল্প আলোও নিতে পারছে না। চোখ কুচকে আসছে। মার্বেল পাথরের ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে, চারদিক বেশ উষ্ণ।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বাহারের খুব ভালো লাগলো। ছোট ছোট পায়ে ডাইনিং এরিয়া পেরিয়ে সে এগিয়ে গেলো বিরাট সদর দরজার দিকে৷
দুহাতে সর্বশক্তি দিয়ে দরজা টেনে বেরিয়ে এলো সে। বেরোতেই গোধুলির রাঙা আলো এসে পড়লো ওর চোখে। আলো চোখ সওয়া হতেই দেখলো সামনেই ওক কাঠের লম্বা, প্রশস্ত সিড়ি৷ সিড়ির নিচেই বিরাট খোলা চত্বর। সেখানে খরগোসের মতো লম্বা লম্বা কান ওয়ালা, ছোট্ট ছোট্ট, গোল গাল লোমশ প্রাণী ছুটে খেলে বেড়াচ্ছে।
একটু আগে ওর বুকের ওপর উঠে বসে থাকা শেয়ালটাও এখানে ছুটছে৷ এক ঝাঁক বিড়াল সদৃশ ছোট্ট ছোট্ট প্রাণী ছুটে চলেছে মহাসমারোহে। তাদের ভেতর লাফিয়ে চলেছে একটি মাঝারি আকৃতির চিতা। পরক্ষণেই ওর চোখ পড়লো মাটিতে পা ভাজ করে বসে থাকা একটি ঘোড়ার দিকে, ঘোড়ার ডানা নড়ে উঠতেই চমকালো সে।
দ্বিধায় পড়লো তৎক্ষনাৎ, এ সে কোথায় এলো! সে কি মারা গেছে? আকাশের দিকে তাকালো সে এবার, মেঘের সারি যেন অনেক নিচে নেমে এসেছে। ওই পাহাড়ে উঠলেই তুলোর পেজার মতোন মেঘের ভেতর লাফ দেওয়া যাবে। একবার লাফ দিতে পারলে মন্দ হতোনা।
অবাক চোখে চারদিকে তাকাতে তাকাতেই তার কানে ভেসে এলো একটা মেয়েলি কন্ঠস্বর, দূর থেকে কে যেন ডেকে উঠলো,

“বাহার….”
শব্দ অনুসরণে তাকাতেই দেখলো দূরে লেক পেরিয়ে দাঁড়িয়ে একটি নারী মূর্তি, হাতে একটি ধাতব হারপুন। দীর্ঘ সফেদ চল গুলো পোনিটেল করা, বাতাসে রেশমসম শুভ্র চুল এদিক ওদিক বাক নিচ্ছে৷ গোধূলির নরম আলোতে তার চোখ জোড়া ভোরের তারার মতোন জ্বলজ্বল করছে।
বাহার তাকাতেই আনাবিয়া দূর থেকেই উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
“নেমে এসো, আমরা বাইরে যাচ্ছি।”
বাহার এলোমেলো পায়ে নামলো সিঁড়ি বেয়ে, মাথার ভেতর এখনো টলে উঠছে৷ হাত দিয়ে চুল ধরতেই টের পেলো তার লম্বা চুল নেই! পিঠের মধ্যিখানে পড়া লম্বা চুল এখন ঘাড় পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের।
আঁতকে উঠে লেকের কাছে দৌড়ে লেকের পানিতে নিজেকে দেখলো সে। টমবয় কাট দেওয়া, ফুলে ফেপে আছে তার চুল গুলো। খুব একটা খারাপ দেখাচ্ছে না যদিও।
উঠে আনাবিয়ার কাছে পৌঁছে আনুগত্য জানিয়ে মোলায়েম গলায় সম্বোধন করলো,

“শেহজাদী…”
“তোমার চুল গুলোতে রক্ত মাটি জমে ভয়ানক জট বেঁধে গেছিলো, ভাবলাম তোমাকে একটা নিউ কাট দিয়ে দিই৷ কেমন হয়েছে বলো৷”
কোমরে হাত দিয়ে বাহারের চুল গুলো অন্য হাতে এলোমেলো করে দিয়ে বলল আনাবিয়া৷ ওর স্পর্শে চমকিত হলো বাহার, মাথা তুলে তাকালো আনাবিয়ার মুখপানে। আনাবিয়া নিজেও তাকালো বাহারের দিকে। আনাবিয়ার বাহুর নিচে পড়েছে সে, সর্বক্ষণ লম্বা লম্বা ছেলেমেয়েদের সাথে থেকে আনাবিয়ার ওর দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে, হাসিও লাগছে। এমন পিচ্চি লোকজন এদিকে কম।
রুথও এমন পিচ্চি ছিলো, যদিও সে বাহারের থেকে আরও একটু লম্বা ছিলো৷ বাহার একটু বেশিই পিচ্চি৷
বাহার এখনো ওভাবেই তাকিয়ে আছে দেখে আনাবিয়া নরম স্বরে বলল,
“কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? খারাপ লাগলে ম্যানরে ফিরে যাও, বিশ্রাম নাও৷”
বাহার তড়িতে বলে উঠলো,
“না না, শেহজাদী, আমি ঠিক আছি। আপনি আমাকে স্পর্শ করেছিলেন….. তাই…. চমকে গেছিলাম। ক্ষমা করবেন।”

আনাবিয়া হাসলো মিষ্টি করে, খোলা চত্ত্বরে খেলতে থাকা লায়রা আর ফক্সি কে ডাকলো সে৷ তারপর পাহাড় সারির পাদদেশে তৈরি করা একটা দরজা সদৃশ সুড়ঙ্গ দিয়ে এগিয়ে গেলো।
লায়রা ফক্সি ডাক শুনে উর্ধশ্বাসে ছুটে এলো, বাহারকে পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে এগিয়ে গেলো আগে আগে। বাহার ভয়ে পেয়ে এক পাশে সরে চিপকে গেলো পাহাড়ের দেয়ালের সাথে। বুকে হাত দিয়ে নিজেকে শান্ত করলো সে, তারপর এগোলো আনাবিয়ার পেছন পেছন৷
সুড়ঙ্গপথটি পূর্বে ছিলোনা, কোকো তার দলবল নিয়ে এসে এই পথ তৈরি করে দিয়েছে যেন তার আম্মাকে বার বার সম্পুর্ন পাহাড় পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন না হয়।
লায়রা ফক্সি সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় গিয়ে লাফালাফি শুরু করলো বাইরে বের হওয়ার জন্য৷ আনাবিয়া এগিয়ে এসে খুলে দিলো কাঠের দরজা। দরজা খুলতেই বাইরের নোনা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগলো ওদের চোখে মুখে। লায়রা ফক্সি আনন্দে চিৎকার দিতে দিতে ছুটে গেলো সমুদ্রের দিকে, পিঠের ওপর থেকে মাছ বহনের ঝুড়ি পড়ে গেলো ছোটাছুটির চোটে।

বাহার বিস্মিত হয়ে বেরিয়ে এলো আনাবিয়ার পেছন থেকে। তাকিয়ে দেখলো চারদিকে। ছোট বেলার বইয়ে পড়া রূপকথার সমুদ্র পাড় যেন! এমন মনোহরী সমুদ্র তীর সে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়লো না।
আনাবিয়া হাতের হারপুনখানা নিয়ে এগিয়ে গেলো সমুদ্রের দিকে। বাতাসে ছেড়া পালের মতোন উড়তে লাগলো ওর চুল। বাহার বাতাসের সাথে এক প্রকার যুদ্ধ শুরু করলো, বাতাস তাকে কোনো ভাবেই সামনে এগোতে দিচ্ছে না, মনে হচ্ছে ঠেলে তাকে পাহাড়ের গায়ে আছড়ে ফেলবে!
আনাবিয়া বাতাস কেটে নির্দ্বিধায় এগিয়ে গেলো সমুদ্রের দিকে। ট্রাউজার ভাজ করে হাটু অব্দি পানিতে নেমে লম্বা হারপুন শক্ত হাতে উঁচিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো স্থীর হয়ে৷ সন্ধার আগে আগে এদিকে বেশ বারাকুডা আসে, ঝাঁকে ঝাঁকে৷ তার ভেতর থেকে একটা দুটো শিকার করতে পারলে আজকের রাত বেশ ভালোভাবেই চলে যাবে৷
আদীমের ন্যায় এই জীবন যাপন আনাবিয়ার কাছে বেশ উপভোগ্য, পূর্বে মীরের সাথে কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে এভাবেই বেড়াতো দুজনে, যেন এই পৃথিবী ফিরে গেছে শত সহস্র বছর পূর্বে, যেখানে নেই কোনো মানুষের অস্তিত্ব, না কোনো সভ্যতা, শুধুই তারা দুজন!

শিকারের উপর তীব্র, স্থির দৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়ে রইলো আনাবিয়া, ধীরে ধীরে পায়ের কাছে এসে ঘোরাফেরা শুরু করলো কয়েকটি বারাকুডা, পানির নিচে খেলে গেলো তাদের রুপালি শরীরের ঝিলিক। আনাবিয়ার শরীর হঠাৎ প্রতিক্রিয়া করলো বজ্রপাতের মতোন! তড়িতে হারপুনের ফলা উঁচিয়ে ধরলো আকাশে, পরমুহূর্তেই বিদ্যুৎ গতিতে ছুড়ে মারলো পানিতে!
ঝটিতি জল ছিটকে উঠলো চারপাশে। আনাবিয়া টেনে তুললো হারপুন, ধারালো ফলায় আঁটকে একটি দীর্ঘ, ছিপছিপে শরীরের, চকচকে আঁশ ওয়ালা বারাকুডা, মুখভর্তি তার ধারালো দাঁত, ছটফট করছে প্রাণপণে৷
আনাবিয়ার মুখে বিজয়ীর হাসি, ঘুরে দাঁড়িয়ে বাহারকে দেখালো সে, বাহার খুশিতে হাততালি দিলো। লায়রা বালিতে ফেলে রাখা মাছের ঝুড়িটি মুখে ধরে নিয়ে এলো আনাবিয়ার কাছে। আনাবিয়া ফলা থেকে মাছটা ছাড়িয়ে রাখলো ঝুড়িতে। আরও কতক গুলো মাছ ধরে ঝুড়িতে রাখলো, কয়েকটি আবার ফক্সির ঝুড়িতে রাখতে হলো, নইলে তিনি তেজ করবেন।

এমন সময় বাহারের চোখ গেলো আনাবিয়ার পেছনে, সমুদ্রের দিকে৷ মুহুর্তেই মুখের হাসি উড়ে গেলো তার৷ ফ্যাকাসে মুখে আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে রইলো সে। আনাবিয়া হঠাৎ ওকে সাদা হয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হিয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”
বাহার কোনো কথা বলতে পারলো না, কাঁপা কাঁপা হাতে আঙুল উঁচিয়ে দেখালো সমুদ্রের পানিতে। আনাবিয়া ঘুরে তাকাতেই দেখলো সমুদ্রের নীচ দিয়ে সাঁতরে আসছে কোনো বিশাল প্রাণী, তার আগমণের কারণে উঁচু হয়ে আছে সমুদ্র পৃষ্ঠ।
আনাবিয়া হাসলো শব্দ করে, বাহারের দিকে ফিরে ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

“ভয়ের কিছু নেই, ওইটা আমার বড় ছেলে, কোকো।”
সেই মুহুর্তেই পানি ফুড়ে মাথা বের করলো কোকো, মুখে ধরা এক বিশাল ব্লু ফিন টুনা৷ লায়রা ফক্সি ভয়ে ডাকাডাকি করতে করতে ছুটে পালিয়ে গেলো কোনো একদিকে, বাহার ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে ছুটে গেলো সুড়ঙ্গপথের দরজার নিকট। ওদের কান্ডকারখানা দেখে আনাবিয়া ফেটে পড়লো হাসিতে।
তীরের কাছাকাছি এসেই কোকো নিজের হিউম্যান ফর্মে ফিরে এলো। ছটফট কিরতে থাকা টুনা মাছটিকে এক হাতে তীরে ছুড়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো আনাবিয়ার কাছে, আনাবিয়ার হাত জোড়া ধরে নিজের মুখে ঠেকিয়ে চোখ বুজে নিয়ে বলল,

“আম্মা, আপনাকে কতদিন দেখিনা!”
“তুমি তো আর আমাকে দেখতে আসোনি, এসেছো আমার হাতের টুনা মাছের স্টেক আর স্ট্যু খেতে।”
ধরা পড়ে গিয়ে চোখ নিচু করে অন্যদিকে তাকিয়ে গলাখাকারি দিলো কোকো। আনাবিয়া ওর বাহুতে একটা চাপড় মেরে বলল,
“থাক, আর নাটক করে কাজ নেই, আসুন ভেতরে।”
আনাবিয়া এগোলো সুড়ঙ্গপথ ধরে, লায়রা মাছ শুদ্ধ ঝুড়িটা মুখে ধরে এগোলো আনাবিয়ার পেছন পেছন। ফক্সি কোকোর দিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে দূর দূর দিয়ে লায়রার পিছে ছুটলো। প্রবেশমুখে তখনো দাঁড়িয়ে বাহার।
বাহারকে দেখা মাত্রই কোকোর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, কেন জানেনা এই মেয়েটিকে দেখলেই ওর মেজাজ গরম হয়, ওর মনে একটি বদ্ধমূল ধারণা এই মেয়ের আগমনের পর থেকেই ওদের জীবনে একের পর এক অধপতন ঘটে গেছে।

টুনাটি হাতে তুলে কঠিন দৃষ্টিতে বাহারের দিকে চেয়ে এগিয়ে গেলো কোকো, বাহার সিঁটিয়ে গেলো ওর এমন হিংস্র চাহনি দেখে৷ বাহারের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“আপনাকে আমি পছন্দ করিনা, আপনি আমার আম্মার আশেপাশে থাকুন তাও চাইনা৷ আমার আম্মা নেহাত মায়াময়ী, দয়াদ্র, স্নেহশীলা বলে আপনাকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন। সেদিন যদি আম্মা আমাদের সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড প্রিজনে না যেতেন তবে আমি আপনাকে সেখানেই পঁচে মরার জন্য রেখে আসতাম!
আমি আপনাকে আমার আম্মার আশেপাশেও দেখতে চাইনা, আপনি যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে কেটে পড়বেন। কোথায় যাবেন আমি জানিনা, কিন্তু আমার আম্মার কাছে নয়।”
বাহারের দিকে কিছুক্ষণ শিকারী চোখে চেয়ে থেকে সুড়ঙ্গ ধরে ভেতরের দিকে এগোলো কোকো, আর বাহার আতঙ্কে পাংশুবর্ণ হয়ে স্তব্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে।
কোকো ছুটে আনাবিয়ার কাছাকাছি এসে পৌছুলো। আনাবিয়া জিজ্ঞেস করলো,

“এই শীতে সমুদ্রে নামতে গেছিস কেন? এখনি যদি জ্বর ঠান্ডা লেগে বসে!”
“কিচ্ছু হবেনা আম্মা, আমার কুমিরের চামড়া।”
“ওদিকের কি অবস্থা?”
“যেমন হওয়ার কথা ছিলো তেমনই হচ্ছে আম্মা৷ হিজ ম্যাজেস্টি সবদিক সামলে নিয়েছেন, শেহজাদা ইলহান কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বলা যায়। শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের খাদ্য ভাণ্ডার থেকে তিনি প্রজাদের জন্য প্রোভাইড করেছেন৷। তাতে এক সপ্তাহও চলবে বলে মনে হয় না, আবারও প্রোটেস্ট শুরু হলো বলে। আর্মি গার্ড দিয়ে তিনি ওয়ারদিচা থেকে কাঁচাবাজার পৌছে দিচ্ছেন অন্য দ্বীপ গুলোতে। কিন্তু এভাবে কতদিনই বা পারবেন! রামাদি সামাতেও সেনারা খাদ্যাভাবে আছে বলা যায়, এমন চলতে থাকলে ওরাও প্রোটেস্ট শুরু করে দিবে যখন তখন৷”

“তুই এদিকে কেন? তোকে না মীরের আশেপাশে থাকতে বলেছি?”
ক্ষনিক বিরতি দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলো,
“মীর কোথায় আছে এখন?”
“জানিনা সঠিক, হিজ ম্যাজেস্টি কাউকে নিজের পরিকল্পনা বা অবস্থানের ব্যাপারে কিছুই জানান না। উপযুক্ত সময় এলেই শুধু আদেশ করেন, আর আমরা তার আদেশের অপেক্ষাতে থাকি। আপনার চিন্তার কারণ নেই আম্মা, লিও কাঞ্জি হিজ ম্যাজেস্টির বডিগার্ডের দায়িত্ব পেয়েছে আবারও। জীবন দিয়ে হলেও ওরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে।”
আনাবিয়া আশ্বস্ত হলো, কোথাও কাউকে সে বিশ্বাস করেনা নিজের এই বাচ্চা গুলোকে ছাড়া৷ সন্তর্পনে স্বস্তির শ্বাস ফেললো সে। কোকো বলে গেলো,
“আমাকে আর ফ্যালকনকে বর্ডারের দায়িত্ব দিয়েছেন, সেখানে গিয়ে আগের দায়িত্বে বহাল হতে হবে৷ তাই আপনার সাথে দেখা করতে এলাম। আর কবে আপনাকে দেখতে পাবো জানিনা। আপনার হাতের খাবার না খেয়ে গেলে শান্তিতে নিজের কাজে মনোনিবেশ করতে পারবোনা আম্মা, তাই চলে এসেছি।

“ফ্যালকন এলোনা?”
আনাবিয়ার প্রশ্নে কোকো অপরাধী ভঙ্গিতে বলল,
“ওকে জানাইনি আম্মা, ওকে বলেছিলাম ওর মতো যেতে, আমি একটু কাজ সেরে আসবো।”
“তুই তো ভারী দুষ্টু হচ্ছিস দিনে দিনে! ছেলেটাকে নিয়ে এলে কি হতো?”
নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল আনাবিয়া। কোকো ফিচেল হেসে বলল,
“কারণ আপনার রান্না আমি একাই খাবো, আর কাউকে দিবো না৷ এত কষ্ট করে মাঝ সমুদ্রে গিয়ে এই বেটাকে ধরে এনেছি কি ওই হাঁসটাকে দিয়ে খাওয়ানোর জন্য? মোটেও না৷”
হাতের মাছটা উঁচিয়ে দেখিয়ে বলল কোকো। আনাবিয়া আশাহতের ন্যায় তাকালো ওর দিকে, ছেলেটাকে আর মানুষ করতে পারলো না। জিজ্ঞেস করলো,

“রেক্সা কোথায়?”
“ওই বেয়াদব মেয়ের নাম নিবেন না আম্মা, শ্লীটাকে বললাম এই জঙ্গলে থাকার প্রয়োজন নেই, সমুদ্রে না গেলে জীবনের আসল থ্রিলই মিস করবা, বলে কিনা সে সমুদ্রকে ভয় পায়! চিন্তা করুন আম্মা! ওয় কুমির জাতির কলঙ্ক।
এলোইনা…..!”
“খুব জোর করেছিস মনে হচ্ছে!”
“তা করিনি? পায়ে ধরতে বাকি ছিলো বোধ হয়, শ্লীটা বুঝলোনা যে ওর ওই থোবড়া না দেখলে আমার……”
বলেই থেমে গেলো কোকো। কি বলে ফেলতে যাচ্ছিলো বুঝতে পেরে জিভে কামড় দিলো। আনাবিয়া খিলখিল করে হেসে উঠলো। পরক্ষণেই উৎফুল্ল গলায় উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
“ছেলে আমার প্রেম করছে!”
“প্রেম আর করতে পারছি কই আম্মা, ওই গাধীটার কাজে কর্মে আমার মন চায় দুটো চটকানা দিয়ে বসিয়ে রাখি৷ ওর ওই মোটামাথায় এসব ঢুকলে তো! ঢুকলে ঠিকই আমার সাথে আসতো, তা না! উনি শার্লটের সাথে জনম জনমের সাথী পাতিয়েছেন, হাতি কে ছেড়ে আসবেন না৷”
আনাবিয়া শব্দ করে হাসলো ওর কথায়, ক্ষণিক পরেই ওরা প্রবেশ করলো খাদের ভেতরে৷ কোকো আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো আনাবিয়ার হাসিমাখা মুখ। ভেবেছিলো তার আম্মা হয়তো কান্নাকাটি করে ভাসিয়ে ফেলবেন, কিন্তু তার কোনো আশঙ্কা না দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেললো সে।

“জায়ান চাচাজান কোথায় আছেন এখন?”
লেকের পাশে অবস্থিত ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসতে বসতে শুধোলো আনাবিয়া। কোকো খাবারের প্লেটে তাকিয়ে ছিলো, সামনে তার ধোঁয়া ওঠা স্টেক। আনাবিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো সে, কিন্তু লোভ সামলে উঠতে পারছিলোনা। প্রশ্ন শুনে মাথা তুলে উত্তর দিলো,
“উনি এখানেই আছেন, কয়েকদিন আগেই ফিরে এসেছেন কিমালেবে৷ শরীরের বেশ উন্নতি ঘটেছে, পুষ্টিহীনতায় ভুগছিলেন ওনারা দুজনেই। জাওয়াদ আর জেসার সাদি এসেছিলেন তাকে নিতে। ফারিসজ জাবিনও নওয়াস জাবিনকে নিয়ে গিয়েছেন কুরো আহমারে।
আমি জায়ান সাদিকে জানিয়েছিলাম সম্পুর্ন ঘটনা। উনি বলেছিলেন আপনার সাথে দেখা করতে আসবেন৷ আপাতত আপনাকে এই দ্বীপ হতে বের হতে মানা করেছেন৷ তাঁর ধারণা শেহজাদা ইলহান নিজে বাঁচতে আপনাকে বেইট হিসেবে ব্যাবহার করতে পারেন।
যেহেতু হিজ ম্যাজেস্টি….. মানে….. আপনাকে যেহেতু উনি এখন চিনবেন না…… তাই জায়ান সাদী আপনাকে নিয়ে চিন্তিত। উনি বলছিলেন আপনাকে উনার ম্যানসনে গিয়ে থাকার জন্য, কিন্তু আমি বলেছি আপনি এইখানেই সেইফ আছেন৷”

“ভালো করেছিস। আমি দেখি…. সময় পেলে দেখা করে আসবো।”
বাহার ভেতরে আছে, ভেতরেই তাকে খেতে বলে এসেছে আনাবিয়া৷ লায়রা আর ফক্সি দূরেই লাফালাফি করতে ব্যাস্ত, ওদেরকে খাবার দেওয়া হয়েছিলো৷ শেষ করতে দুই মিনিটের বেশি সময় লাগেনি। গোগ্রাসে গিলে আবার খেলায় নেমেছে।
কোকো প্লেটের স্টেকটা দুইহাতে তুলে একটা বিশাল কামড় বসালো, এক কামড়ে স্টেকের অর্ধেকটা ঢুকে গেলো ওর মুখে। আনাবিয়া কাটাচামচের মাথায় টুকরো করা স্টেক গেঁথে মুখে পুরতে পুরতে বলল,
“আস্তে খা হতচ্ছাড়া!”
কোকো সেটুকু কোনোরকমে চিবিয়ে গলাধঃকরণ করে বলে উঠলো,
“আম্মা, আপনি এখানে একা একা কিভাবে কি করবেন? আপনি বললে কয়েকজন দাসীর ব্যাবস্থা করে দিই?”
“প্রয়োজন নেই, আমি নিজের কাজ নিজেই করতে পারবো৷ এখানে কেউ এলে বরং আমারই শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটবে৷
তুই রাতে থাকবি তো?”

“থাকতে খুব মন চাইছে আম্মা৷ কিন্তু ফ্যালকন ওদিকে অপেক্ষা করবে। যদিও ওর সমস্যা হবে না, সেখানে অনেক সোলজার্স আছে, তাছাড়া ওর স্বজাতিরা বর্ডারে আছে, ওর সময় কেটে যাবে৷ কিন্তু ওকে যদি জানাই আমি আপনার কাছে এসেছি, ওকে বাদ দিয়ে তখন ভয়ানক রাগারাগি করবে।”
“ওকে বল তুই কাজে আটকে গেছিস, আগামীকাল সকালে রওনা করবি। এখানে নেটওয়ার্ক নেই, বাইরে যেতে হবে। বাইরে গিয়ে ফ্যালকনের সাথে কথা বলবি প্লাস আশেপাশের লোকালয়ে গিয়ে কোনো ভালো বাসা পেলে কিনে ফেলবি। বাহারকে সেখানে রাখবো। এখানে আমার সাথে কেউ থাকুক আমি চাইনা, তাছাড়া জায়গাটা আমার জন্য অনেক স্পেশাল।”
কোকো চুপ রইলো, আনাবিয়ার সিদ্ধান্তে মনে মনে খুশি হলো সে। পানিতে ঢকঢক করে চুমুক দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে আম্মা, আমি খাওয়া শেষ করেই বাইরে যাচ্ছি।”
“বাসাটা ভালো মানের হওয়া চাই, সেখানে শুধুই বাহার থাকবে না।”
“তাহলে? আর কে থাকবে?”
“সময় এলেই জানতে পারবি, এখন দ্রুত খাওয়া শেষ কর।”

“কুরো আহমারের খবর বলো ইযান।”
প্রাসাদের বারান্দার সোফাতে বসে সন্ধ্যাতারা দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলো ইলহান। ইযান দাঁড়িয়ে ছিলো পাশেই, আনুগত্যের সাথে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপাতত শহর অনেকটাই শান্ত। তবে বেশিক্ষণ তাদের ধরে রাখা যাবে না। কারণ খাদ্যসঙ্কট আবারও শুরু হবে। আমাদের সৈন্যরা এইভাবে গার্ড দিয়ে কাঁচাবাজার আর কতদিন নিয়ে আসবে? তাছাড়া নতুন করে খাদ্যশস্য ফলিয়ে জোগান দিতেও অনেক সময়ের প্রয়োজন। প্রাসাদের গোডাউনও খালি হতে শুরু করেছে। এই অল্প পরিমাণ থেকে যদি আবার জনগণের জন্য বিলিয়ে দেওয়া হয় তবে আমাদের প্রাসাদের এত দাস দাসী, কর্মীদের খাবারের জোগাড় কিভাবে হবে?”
ইযানের কথা শুনে চুপ করে রইলো সে। ক্ষণিক পর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বসলো সোজা হয়ে, বলল,
“পরিস্থিতি ভালো নয় ইযান, আমাদেরকে যেকোনো অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমার ধারণা মীর সবকিছুর জন্য প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছে, সে যখনি দেখবে শহর শান্ত তখনি নতুন কোনো ফাঁদ পাতবে আমাদের জন্য।
সেই ফাঁদে আমরা ধরাও দিবো, কারণ তার চাল বুঝে ওঠা কষ্টকর৷ কখন কোন দিক থেকে কি করে বসবে জানানেই।
শহরে আরও গার্ড বাড়িয়ে দাও, প্রতিটি প্রধান পয়েন্টে যেন গার্ড থাকে, কেউ যেন কোনো ধরণের অরাজকতা করার সুযোগ না পায়।

প্রজারা নতুন করে প্রোটেস্ট শুরু করার পায়তারা করলে তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করবে এবার, এভাবে ভালো সেজে বসে থাকার সময় আমার হাতে নেই।
আমি তাদের জন্য হাজার ত্যাগ স্বীকার করলেও তারা শুধু নিজেদের স্বার্থই দেখবে, আমারটা দেখবে না। মানুষ এমনই। তাই আমাদেরকেও স্বার্থপর হতে হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে তখন আবার গুড কিং এর ফর্মে আসা যাবে। টিল দ্যেন আ’ল বি আ ব্যাড রুলার।”
নিরবতা নেমে এলো আবার। ইলহান দূর পাহাড়ের সারির দিকে তাকিয়ে রইলো, ভাবলো কিছুক্ষণ। শুধোলো,
“কারো কোনো খোঁজ পেয়েছো?”

“ক্ষমা করবেন ইয়োর ম্যাজেস্টি, কোনো কন্ট্রোলারেরই পাত্তা নেই। শুধুমাত্র রামাদিসামার সেনাঘাটিতে মিলিটারি চিফ রাসিন জুবের এখনো অক্ষত আছেন৷ আমি তাকে সতর্ক থাকতে বলেছি। যদিও তার সমস্যা হবার কথা নয়, কারণ সে চারদিক থেকে নিরাপদ। আমাদের হাজার হাজার সোলজার্স দের ভেতর সে অবশ্যই নিরাপদ থাকবে৷”
“ভালো কথা মনে করেছো, তুমি আজকেই রামাদিসামার উদ্দেশ্যে রওনা করবে৷ যেকোনো মূহুর্তে, যেকোনো দিক থেকে আমাদের ওপর মীরের আক্রোশ নেমে আসতে পারে, সকল পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে হবে৷
রাসিন জুবেরের সাথে বসে সেনাদের কে প্রস্তুত করার ব্যাপারে কথা বলবে৷ যারা শহর সামলাতে ব্যাস্ত আছে তাদেরকে না হলেও যারা এখনো সেনাঘাটিতে অবস্থান করছে তাদেরকে যেন মীরের সাডেন অ্যাটাক সামলানোর ফুল প্রিপারেশন নেওয়ার ব্যাবস্থা করে৷ যে কোনো মূহুর্তেই তাদেরকে আমার প্রয়োজন হতে পারে, তাই সেভাবেই যেন তাদের ট্রেইনিং স্টার্ট হয়। আ’ ডোন্ট হ্যাভ অ্যা সিঙ্গেল সেকেন্ড টু ওয়াস্ট।”
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি। আমি আজ রাতেই রওনা করবো।”
বলে ইযান প্রস্থান করলো। ইলহান সেভাবেই বসে রইলো সোফাতে, রাতভর!

ইযান যখন রামাদিসামাতে এসে পৌছোলো তখন রাতের শেষ প্রহর৷ এত স্পিডে গাড়ি চালিয়েও প্রায় ছ ঘন্টা লেগে গিয়েছে তার। তাছাড়া সেনাঘাটি দ্বীপের অনেক ভেতরে। একটি আস্ত শহরের সমান আয়তনের দ্বীপে সেনাঘাটি অতো দূরে তৈরির কি প্রয়োজন পড়েছিলো মাথায় আসেনা ওর৷
সেনা ঘাটিতে পৌছতে এখনো ঘন্টা দুই লাগবে৷ শেষ রাতে এখানে কনকনে শীত। কোথাও কোনো বসতির চিহ্ন নেই৷ দ্বীপের বুক জুড়ে শুধুই বিস্তীর্ণ খোলা চত্বর—মাইলের পর মাইল জুড়ে সবুজ তৃণভূমি। ইযান শুনেছে সেখানে শত শত বুনো পঙ্খিরাজ হাওয়ায় উড়ে ফেরে, তাদের খুরের শব্দে কখনো কখনো কেঁপে ওঠে মাটি। মাঝে মাঝে দেখা যায় হরিণ নয়তো বুনো ষাঁড়ের ঝাঁক।
এরই মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে বিরাট হাইওয়ে। ইযানের গাড়ি সবেগে ছুটে চলেছে সেনাঘাটির দিকে। বাতাসে কাঁচের জানালাতে অদ্ভুত রকম শব্দ হচ্ছে। ইযানের কেমন ভয় ভয় লাগছে। ড্রাইভারকে দ্রুত ড্রাইভ করতে বলে সিটের সাথে লেগে বসে রইলো সে৷

রেড জোনের মতো ভয়ানক না হলেও এখানেও একটা বেশ বড়সড় জঙ্গল বিদ্যমান। সেখানের উঁচু উঁচু বৃক্ষরাজি আকাশ ছোয়ার জোগাড়। এত ঘন যে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়। ইযানের ভয় করে, ও জঙ্গলে কেউ যায়না৷ সেখানে কি আছে সেটা শুধুমাত্র দেমিয়ান পরিবারের সদস্যরা ব্যাতিত কেউ জানেনা৷
ইযান একটিবারের জন্যও জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো না, চোখ কান বুজে পৌছোলো সেনাঘাটিতে। দূর থেকে বিস্তৃত সেনাঘাঁটির আলোকসজ্জার ঝলকানিতে প্রাণ ফিরে পেলো সে৷
ইযানের গাড়ি থামলো মিলিটারি চেকপয়েন্টে, রাস্তার দুপাশে উঁচু উঁচু কয়েকটি টাওয়ার, সেখানে দাঁড়িয়ে প্রহরীরা চতুর্দিকে নজরদারিতে ব্যাস্ত। ড্রাইভার আর্মি দের সাথে কথা বলতে ব্যাস্ত হয়ে গেলো।
ইযান উঁকি দিয়ে দেখলো সামনে, উঁচু পাথুরে প্রাচীর ঘেরা সেনাঘাটির লোহার ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন। রাস্তায় গাড়ির চাকার স্পষ্ট দাগ, একটু আগেই কেউ এসেছে এখানে৷
ইযানের গাড়ি ছাড়পত্র পেয়ে সামনের দিকে এগোলো। ফটকের সামনে গিয়ে থামলো গাড়ি, কিন্তু কেউ দরজা খুলে দিচ্ছেনা দেখে জানালার গ্লাস নামিয়ে বাইরে তাকালো সে, মুখে এসে ঝাপটে পড়লো ঠান্ডা বাতাস। ফটকের সম্মুখে অস্ত্রহাতে দাঁড়িয়ে থাকা আর্মি দের উদ্দ্যেশ্যে উচ্চস্বরে বলে উঠলো,

“কি ব্যাপার, দরজা খুলতে দেরি হচ্ছে কেন?”
কিন্তু কেউ গুরুত্ব দিলোনা তার কথায়, যন্ত্রের মতোন দাঁড়িয়ে রইলো। এমন সময় ফটকের অন্য দিক থেকে এগিয়ে এসে ইযানের জানালার পাশে দাঁড়ালো দুজন, গায়ে তাদের মোটা শীতের পোশাক, মুখ ঢাকা। ইযান বিরক্তি নিয়ে তাকালো তাদের দিকে।
ইযানকে এভাবে তাকাতে দেখে মুখ অনাবৃত করে ফিচেল হাসলো তারা। ইযান থমকে গেলো হঠাৎ, এদেরকে সে দেখেছে কোথাও!
হ্যাঁ মনে পড়েছে, শেহজাদী ডার্ক প্যালেসে আটকা পড়েছে শুনে যখন তাঁকে উদ্ধারে পাতালপুরীতে গেছিলো তখন কোকো নামক বজ্জাত ছেলেটার সাথে এই ছেলেটাও ছিলো! আর পাশের ছেলেটা…… পাশের ছেলেটা অ্যানিম্যাল টাউনে থাকে, হাইনা না কি যেন নাম!
ওরা এখানে কি করছে?
ইযানকে এত ভাবনা চিন্তা করতে দেখে আলফাদ এগিয়ে এসে ওর পিঠে একটা চাপড় মেরে কৌতুকপূর্ণ গলায় বলে উঠলো,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৪

“এত ভেবে লাভ নেই মশাই, বাড়ি চলে যান। ভেতরে একটা বাঘ ঢুকেছে, নেংটি ইঁদুরের থোবড়া দেখলে ক্ষেপে যাবে।”
ইযানের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো যেন! পাংশু মুখে হতভম্ভের ন্যায় সে তাকিয়ে রইলো আলফাদের দিকে। ভাবতে লাগলো ফিরে গিয়ে কিভাবে সে হিজ ম্যাজেস্টির সামনে দাঁড়াবে, কিভাবে এই মুখ দেখাবে তাঁকে?
হাইনা হাত বাড়িয়ে ইযানের ঠান্ডায় লাল হয়ে যাওয়া ক্লিন শেভড থুতনি ধরে নাড়িয়ে দিলো, সাথে একটি উড়ন্ত চুমু ইযানের দিকে ছুড়ে দিয়ে চোখ টিপ দিয়ে বলে উঠলো,
“বাইরে খুব শীত, বাড়ি ফিরে ব্লাংকেটের তলায় ঢুকে ঘুমিয়ে যাও বেইবি গার্ল, তোমার ড্যাডিরা এদিক সামলে নিচ্ছে।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৬