শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৬৯
নূরজাহান আক্তার আলো
-‘আপু?’
-‘হুম।’
-‘এখন তো তুমি-আমি দুই জা। আমরা আমাদের মা-চাচীদের মতো মিলেমিশে থাকব, ঠিক আছে?’
-‘ঠিক আছে।’
-‘আপু?’
-‘হুম।’
-‘বিয়ের পর আমি যদি কোনো কাজ করি না তুমি কিন্তু রাগ করতে পারবা না?’
-‘করব না।’
-‘আপু?’
-‘হুম।’
-‘তুমি এমনই থেকো কিন্তু। ‘
-‘হুম।’
-‘ আর শুনো, সায়ন ভাইয়া তো আমার দুলাভাই হচ্ছে। প্রতি ইদে আমি কিন্তু তিনবার সালামি নেবো ভাইয়ার থেকে আর তুমি দিবা দুইবার?’
-‘আমি দুইবার কেন?’
-‘একবার বড় বোন হিসাবে দিবা আরেকবার বড় জা হিসেবে।’
-‘ঠিক আছে।’
এরপর পুরো রুমজুড়ে নীরাবতা। স্বর্ণ কিছুক্ষণ উল্টো ঘুরে বসা চঞ্চল শীতলের অবয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দুই ভ্রুঁ কুঁচকে শীতলের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে দেখল পাগলিটা কেঁদে চোখ-মুখ লাল করে ফেলেছে। এতক্ষণ মুখ ফিরিয়ে থাকায় বুঝতে পারে নি, তবে তার ভেজা কন্ঠস্বর শুনে বুঝেছে কিছু একটা হয়েছে। বোনকে দেখে শীতল মাথা নিচু নিলো। না চাইতেও ফুঁপিয়ে উঠল। দুচোখ দিয়ে অঝরে অশ্রু ঝরতে লাগল। স্বর্ণ তখন শীতলের চোখ মুছে দিয়ে আদুরে সুরে বলল,
-‘ভাইয়ার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?’
-‘না।’
-‘কেউ কিছু বলেছে?’
-‘না।’
-‘ তবে?
-‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আপু। কেন জানি নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।’
-‘কেন?’
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-‘ আমি আজকাল বড় আব্বুর সামনে যেতে পারি না। আগের মতো মন খুলে ডাকতে পারি না। আবদার করতে পারি না। চোখাচোখি হলে বুকটা মুঁচড়ে উঠে। কেন জানি মনে হয় বড় আব্বু আমার উপর রেগে আছে। উনার এক ছেলেকে খুশি করতে গিয়ে আরেক ছেলেকে কষ্ট দিয়েছি।কিন্তু আমারই বা কি করার আছে, বল তো আপু? এই যে এত ঘটা করে বিয়ের আয়োজন হচ্ছে। কত মানুষ আসবে। কত মানুষ খাবে, আনন্দ করবে কিন্তু বড় আব্বু আরেক ছেলেকে ডাকতে পারবে না। ডাকলে সে যদি আসে আমরা মন থেকে খুশি হবো না। এই যে, খুশি হওয়া না হওয়া নিয়ে কোথাও না কোথাও আমি দায়ী।’
-‘(….)’
-‘হসপিটাল থেকে ফেরার পর বড় আব্বুর সঙ্গে কথা হয় নি। বলা বাহুল্য আমি নিজেই পালিয়ে বেড়াই।’
-‘এটা তো ঠিক না।’
শীতল ফোঁপাতে লাগল। তা দেখে স্বর্ণ হাসল। তার বোনটা আসলেই খুব বোকা। নয়তো ভুলভাল ভেবে এভাবে কাঁদে? তাছাড়া শারাফাত চৌধুরী মোটেও রেগে নেই। নিজেই শীতলের খোঁজ রাখেন। সত্যি বলতে, উনিও বিব্রতবোধ করেন। তবে স্বর্ণ এসব কথা না তুলে শীতলের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে চোখজোড়া মুছিয়ে দিলো। মাথা নাড়িয়ে ইশারায় কাঁদতে বারণ করে বলল,
-‘একটা মানুষ সবাইকে খুশি করতে পারে না। আর সবাইকে খুশি করতে চাওয়া একধরনের বোকামি। তুই শুদ্ধ ভাইকে ভালোবাসিস। তার জন্য লড়াই করে সম্পর্কে পূর্নতা এনেছিস। বাকি সব ভুলে যা। শুধু ভাব যাকে চাস তাকে পেয়েছিস। আদায় করে নিয়েছিস। হিসাব মিলাতে হলে মিলা
যে, যার জন্য এসব সে তোকে ভালোবাসে কি না। তোকে আগলে রাখে কি না। যদি সেই মানুষটা ঠিক থাকে তাহলে বাকি সবকিছু ফিঁকে হোক।
মাঝে মাঝে কিছু জিনিস দেখেও না দেখার ভাণ করতে হয়। এখন যদি তোর ভাবনা অনুযায়ী বড় আব্বুকে খুশিও করতে চাস তবে ইয়াসিরের কাছে যেতে হবে, যাবি? সে নাকি তোকে পছন্দ করে। বিয়ে করবে এবং
মাফিয়াগিরি ছেড়ে দেবে। কিন্তু তুই থাকতে পারবি শুদ্ধ ভাইকে ছাড়া?
যদি যেতে চাস শুদ্ধ ভাই কিছু বলবে না তবে এ জীবনে তোর মুখদর্শন
করবে না। না তুই কখনো তোর বিশুদ্ধ পুরুষের কাছ ঘেঁষতে পারবি। তা সইতে পারবি তো প্রিয় পুরুষের ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে বাঁচতে?’
বোনের কথা শুনে শীতল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। একথা তো সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। তাই ভেজা কন্ঠে বলল,
-‘শুদ্ধ ভাইকে ছাড়ার কথা ভাবতে গেলে দম আঁটকে মারা যাব। তাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে যাওয়ার কথা তো বহুদূর।’
-‘তাহলে যা হচ্ছে হতে দে। সবার ভালোর কথা ভাবতে গেলে নিজের ভালো থাকতে পারবি না। অথচ আমরা সবাই চাই তুই ভালো থাক। ‘
শীতল বোনের হাত আঁকড়ে ধরে মাথা নিচু করে কিছু ভাবল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
-‘নীল চোখওয়ালা আমাকে একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। ওখানে শুদ্ধ ভাই ঐশ্বর্য আপুর বাবাকে..।’
-‘কথা গোপন করতে শিখ বোন। সব কথা আওড়াতে নেই। ভিডিওসহ চ্যাট ডিলিট করেছিস?’
-‘করেছি।’
-‘আর কেউ জানে?’
-‘না।’
-‘তুইও কিছু জানিস না, মনে থাকবে?’
-‘থাকবে।’
-‘কিন্তু..! ‘
এটুকু বলতেই স্বর্ণ শীতলের মুখ চেপে ধরে চোখ টিপ দিয়ে কিছু বলতে বারণ করল। তড়িৎ হাতটা সরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। কারো পায়ের পদধ্বনি দরজার কাছে থেমে গেল। নক পড়ল দরজায়। স্বর্ণ ওপাশের মানুষটাকে প্রবেশের অনুমতি দিলে ধীর পায়ে ঐশ্বর্য রুমে প্রবেশ করল। হাসিমুখে তাকিয়ে বলল,
-‘বিরক্ত করলাম?’
ঐশ্বর্যকে দেখে শীতল হাসল। এই মেয়েটার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ সে। তবে ঘটনা করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না। তবে মানুষ হিসেবে ভীষণ পছন্দ করে। তাকে দরজায় দেখে শীতল উঠে গিয়ে ঐশ্বর্যের হাত টেনে বিছানায় বসিয়ে দিলো। নিজেও পাশে বসে বলল,
-‘কী যে বলো না ভাবি। আমার রুমে আসতে অনুমতি নিতে হবে নাকি?’
-‘হবে তো।’
-‘হবে না। বাইরের কেউ হলে কথা ছিল তুমি আমার পরিবারের একজন।
আমার সুইট কিউট দুই নাম্বার ভাবি। তা বড় ভাবি আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।’
শেষের কথাটা স্বর্ণকে বলে হেসে ফেলল শীতল। স্বর্ণ হাতে চিরুনি নিয়ে শীতলের চুলের বিনুনি খুলে আঁচড়ে দিতে থাকল। দু বোনের মিল দেখে
ঐশ্বর্য হাসল। শীতলের চোখ মুখ দেখে বুঝল কোনো কারণে কেঁদেছে। তবে কেন কেঁদেছে প্রশ্ন করাটা ঠিক হবে না তাই কিছু বলল না তবে স্বর্ণ বুঝল। তাই নিজেই বলল,
-‘বয়সেই বড় হয়েছে বুদ্ধিতে না। শুদ্ধ ভাই সঙ্গে নেয় নি তাই কেঁদে কেঁটে একাকার অবস্থা। বুঝতে হবে তো এখন বাড়ির ছেলেরা কত ব্যস্ত। কত কাজ তাদের।’
বোনের কথায় সায় দিতে শীতল মুখ ভেংচি দিলো। ঠোঁট ফুঁলিয়ে বলল,
-‘বালের কাজ। সঙ্গে নিলে কি আর এমন হতো?’
ঐশ্বর্য মুখ টিপে হেসে শীতলের ফুলো ফুলো গাল দুটো এবার টেনে দিয়ে বলল,
-‘আপনাকে নিয়ে যায় নি বলে আপনার মহারাজ গিয়েও ফিরে এসেছে। আমাকে বলল, আপনাকে ডেকে দিতে দ্রুত যান বাইকে বসে আছে।’
-‘ফিরে এসেছে?’
-‘হুম।’
-‘কখন?’
-‘পাঁচ মিনিট হবে। যাও তাড়াতাড়ি নয়তো রেগে যাবে।’
একথা শুনে শীতল গরু খোঁজা করে ফোনটা খুঁজতে লাগল। বালিশের নিচে ফোন বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এই রে ফোন দিয়েছিল বোধহয়। কখন থেকে বসে অপেক্ষা করছে কে জানে। শীতল কিছু বলার আগে বাইকের হর্ন শুনতে পেল। একের পর এক হর্ন বাজতেই আছে। তা দেখে পরনের ড্রেস বদলাতে ওয়াশরুমের দিকে ছুঁটল। তারপর মুখ মুখে কিছু দেওয়ার আগে আবার হর্ণ বাজল। কোনোমতে চুলে খোঁপা করে হিজাব জড়িয়ে ওড়না নিয়ে নিচের দৌড়ে গেল। এতক্ষণ স্বর্ণ আর ঐশ্বর্য বসে বসে তার তাড়াহুড়ো দেখে হাসছিল। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক শুদ্ধ যদি ডাকে আর শীতল যদি সেই ডাক শুনতে পায় তাকে আঁটকে রাখা সম্ভব নয়।
যতই মারুক, বকুক, অভিমান করুক শুদ্ধ ডাকলে শীতল যাবেই; যাবে।
এটা আজকের ঘটনা নয় আগে থেকে এমন। এদিকে বাইকের হর্ন শুনে সিঁতারা বের হলেন। কিছু ফেলে গেছে নাকি জানতে চাইলে, শুদ্ধ বলল,
-‘পাফার ফিশকে আসতে বলো। দেরি হচ্ছে যাচ্ছে। ‘
-‘পাফার ফিশ কে?’
ছেলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে কিছু একটা বুঝে সিঁতারা হেসে ফেললেন।
এই বাড়িতে এসব নামের অধিকারিনী তো একটাই। তাই তিনি যেতে যেতে বললেন,
-‘ তোরা পারিসও বটে।’
তারপর উনি চেঁচিয়ে শীতলকে ডাকতে লাগলেন। শীতল রেডি হয়ে গুঁটি গুঁটি পায়ে বের হয়ে শুদ্ধর কাছে গেল। তবে মুখ টা গোমরা করে আছে।
শুদ্ধ তাকে দেখে বিরক্তির সুরে বলল,
-‘ একটু তাড়াতাড়ি আসা হয়ে গেল না? আমি ভাবলাম নিমন্ত্রণপত্র না পাঠালে আজ আর নামবেনই না।’
শীতল জবাব দিলো না বাইকের পেছনে উঠে বসল। তবে শুদ্ধকে ধরল না। মাঝখানে কিছু জায়গা রেখে বসেছে যেন গায়ে না ঠেঁকে। শুদ্ধ ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকিয়ে বলল,
-‘ধর বস।’
-‘(…..)’
-‘বিয়ের আগে বউ মারতে চাচ্ছি না। যা বলছি শোন।’
-‘(…..)’
-‘কালার ঘরের কালা কানে শুনিস না? ধাপ এক কানের উপর লাগাব নাকি?’
তবুও শীতল জবাব দিলো না। ধরলও না। কাহিনি বুঝে শুদ্ধও কথা না বাড়িয়ে চোখে ব্ল্যাক সানগ্লাস পরে বাইক স্টার্ট করল। পরনে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট। গা থেকে ভুরভুর করে বের হচ্ছে চিনচেরা পারফিউমের ঘ্রাণ। এই ঘ্রাণটা শীতলের খুব পছন্দের। অন্যকিছু হলে চেটে চেটে খেতে ফেলত এতদিনে। পরীক্ষাস্বরুপ একদিন টেস্ট করে বুঝেছে পারফিউম তিতা স্বাদের হয়। শুদ্ধ বাইক ততক্ষণে মূল ফটক পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
কাজ ফেলে কেউ বউ নিয়ে বের হয়? কিন্ত কথা শুনলে তো? সঙ্গে নেয় নি বলেই তো মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। রাগ দেখাতে ধরেও বসে নি। এত রাগ দেখার সময় নেই বাইকে যখন বসেছে তখন তাকে ধরতে হবে। একথা ভেবে শুদ্ধ ইচ্ছে করে ব্রেক কষলো। শীতল হুমড়ি খেয়ে পড়ল শুদ্ধর পিঠের উপর। পিঠের সাথে নাকে বারি খেয়ে কিছু বলার আগে শুদ্ধ খেঁকিয়ে বলল,
-‘মাঝরাস্তায় হুমড়ি খেয়ে সিডিউস করা হচ্ছে? তা বলি হারি যায় বাসায় কি আপনার বাপ-ভাই নাই? ছিঃ! ছিঃ! এই ঘোর কলিযুগ নয়তো এমন কেউ করে?’
শীতল হাবাকালার মতো নাক ধরে বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। পাগল টাগল হয়ে গেল নাকি এই লোক? সে তো কিছু করে নি নিজেই ফাঁকা রাস্তায় ব্রেক কষলো। আচমকা ব্রেক কষলে হুমড়ি খেয়ে তো পড়বেই!
তার চালাকি বুঝে শীতল অন্যদিকে তাকাল। রাগে ফুঁসতে লাগল। তবুও কথা বলল না দেখে শুদ্ধ মিটিমিটি হাসলেও আর ঘাটল না। তবে একটা দোকানের সামনে গিয়ে তিনটে কোণ আইসক্রিম কিনে হাতে ধরিয়ে বলল,
-‘চুপ আছেন চুপই থাকেন। যদি কথা রাখেন ফেরার পথে আরো তিনটা কিনে দিবো।’
শুদ্ধ বলল ঠিকই কিন্তু হলো এর উল্টোটা। আইসক্রিম পেয়ে শীতলের অভিমান চট করে গলে পানি। সে আইসক্রিম খেতে খেতে শুরু করল রাজ্যের গল্প। শুদ্ধ মনে মনে হাসল। যাক এবার মনে হচ্ছে সঙ্গে তার ব্যাঙাচি আছে। তারপর তারা ফল কিনল, মিষ্টি কিনল, মোক্ষম সুযোগ
বুঝে শীতল অনেকগুলো চকলেট নিলো। বাড়ির গাড়ি নিয়ে সাফওয়ান
,সায়ন আর রুবাব অন্যকাজ বেরিয়েছে। কাজ শেষ কিছুক্ষণের মধ্যেই রওনা হবে বিধায় তারা একটু অপেক্ষা করল। গাড়িটা এলে সেগুলো চট করে গাড়িতে তুলে দিয়ে তারা ছুঁটল অজানার উদ্দেশ্যে। বিকেলের রোদ মরে গেছে। মাথার উপর স্বচ্ছ সুনীল আকাশ। চলন্ত বাইকে বসে শীতল শুদ্ধর পিঠে কপাল ঠেঁকিয়ে বসে আছে। মনে অনাবিল খুশির রেশ।কেন
জানি চেঁচিয়ে নিজের খুশিটুকু সারা পৃথিবীকে জানাতে ইচ্ছে করছে। এ খুশির রেশ ধরে ভালো লাগছে বেসামাল বাতাস। শুদ্ধর বাইকে বসলে পূর্বে যা করতো এখনো একটু একটু সেই মন কেমন করা গন্ধ নিঃশ্বাসের সঙ্গে টেনে নিচ্ছে। ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।
মাগরিবের আজানও হলো কিছুক্ষণ মধ্যেই। দিন পেরিয়ে রাত নামছে।
নিগূঢ় আঁধার গ্রাস করতে চাচ্ছে দিনের শেষ আলোটুকু। সিঁতারা ফোন করে জানালেন নতুন বউ নিয়ে এভাবে ঘুরতে নেই।তারা যেন তাড়াতাড়ি
বাড়ি ফিরে। মায়ের কথা শুনে শুদ্ধ ফেরার কথা জানিয়ে কলটা কাটল।
শীতলকে বলল,
-‘মন ভরেছে?’
-‘উহুম, আরো ঘুরব।’
-‘আরেকদিন।’
-‘না, আপনি সহজে বের হতে চান না।’
কথা বলতে বলতে ফিরতি পথের নির্জন এক স্থানে বাইক থামাল শুদ্ধ।
জায়গাটা সুন্দর তবে নিরিবিলি। শীতল নেমে দাঁড়ালে শুদ্ধ বাইক স্ট্যান্ড করল। তারপর আচমকা শীতলকে বুকে জড়িয়ে নিলো। বিষ্মিত শীতল
কিছু বলার আগে শুদ্ধ বলল,
-‘স্ট্যাচু! নড়লেই মার।’
শীতলের পেট ফেটে হাসি পেলেও অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই বিশুদ্ধ পুরুষটা খুব চালাক। সে জানে, বাড়ি ফিরলে শীতলকে আজ আর পাবে না। এজন্য এখনই এই ব্যবস্থা। তবে শুদ্ধর অজানায় রয়ে গেল ব্যাঙাচি
এখন চালাক হয়ে গেছে। বুঝে গেছে কিছুটা। তাই সেও আঁকড়ে ধরেছে প্রিয় পুরুষটাকে। নিঃশ্বাসের সঙ্গে টেনে নিচ্ছে প্রিয় সুঘ্রাণ। বুকের মাথা রেখে ডাকাতি করে লুফে নিচ্ছে মনের শান্তি। অথচ তার বুকে চলমান
টালমাটাল অনুভূতি। কি আশ্চর্য, তারা বৈধ সম্পর্কে আবদ্ধ তবুও একটু দূরে থাকার বিরহ সইতেও নারাজ তারা। অথচ মুখে কেউ বলবে না এক জন আরেকজনের জন্য কতটা কাতর। কতটা ব্যাকুল। কতটা উন্মাদ।
তখন শুদ্ধ শীতলের কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
-‘ রাতে রুমের দরজা খোলা থাকবে। ডাকতে যেন না হয়।’
-‘মেজো আগেই বলে দিয়েছে আমাদের নাকি তালাবদ্ধ করে রাখবে।’
-‘কেন?’
-‘আমরা মেয়েরা হলাম সুস্বাদু মিষ্টি। আর বাড়িতে নাকি পিঁপড়ের সংখ্যা বেশি। খোলা জায়গায় রাখলে নাকি পিঁপড়ে খেতে ফেলতে পারে।’
একথা বলে শীতল ফিক করে হেসে ফেলল। শুদ্ধর ঠোঁটের কোণেও মৃদু হাসি। সে আজলা ধরে শীতলের মুখটা ধরে কিছুক্ষণ দেখল। তারপর বলল,
-‘ তাহলে আমার ভাগের মিষ্টির স্বাদ কেমন একটু টেস্ট করে দেখি?’
একথা শুনে শীতল তার বুকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দুপা পিছিয়ে গেল। মিনমিনে সুরে বলল,
-‘দিন দিন বড্ড বেশি অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন আগে তো এমন ছিলেন না।’
-‘ আগে তো মধু খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না। টেস্ট কেমন জানতাম না।
এখন জানি তাই সুযোগ খুঁজি।’
লাগামছাড়া জবাব পেয়ে শীতল মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। সামনে একটা নদী। বাতাস বইছে। আকাশে জ্বলজ্বল করছে সন্ধ্যাতারা। শীতল
দু’পা এগিয়ে নদীর ধারে দাঁড়াল। মন দিয়ে তারা দেখতে দেখতে অনুভব করল কেউ তাকে পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছে। পরক্ষণে
শক্ত করে গাল চেপে ধরে পরপর বেশ কয়েকটা চুমু খেলো। ফোনের রিংটোন বেজে উঠলে শুদ্ধ কানে ফোন চেপে বাইকের দিকে যেতে যেতে বলল,
-‘হ্যাঁ ছোটো মা বলো। তোমার মেয়ে যেতে চাচ্ছে না। বলে কী না তার নাকি বাড়ি ফিরতে ভালো লাগছে না। হ্যাঁ বোঝাচ্ছি শুনলে তো? এখন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে।’
মায়ের কল বুঝে শীতল দৌড়ে এসে বাইকের পেছনে বসল। দুপুরে বের হওয়ার সময় সিমিন বার বার বারণ করেছিল দেরি না করতে। বাড়িতে অনেক মেহমান মন্দ কথা বলবে এভাবে ঘুরে বেড়ালে। সে দ্রুত ফেরার কথা দিয়েছিল কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে ভুলে বসেছে। অতঃপর বাড়ি ফিরতে
ফিরতে অনেককিছু খেলো। ফুল কিনে দিলো। শুদ্ধর এই গুনটা বেশ যে ঘুরতে বের হলে বলার আগে পছন্দের খাবার কিনে দেয়। আজও হলো।
বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেজে গেছে আটটা। চার বউয়ের হাতে মেহেদি পরানোর জন্য চারজন মেয়ে এসেছে। চারজনকেই বাসন্তী রঙের নতুন
সুতি শাড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গান বাজছে ধুমধাড়াক্কা। একটুপরেই
সায়ন, শুদ্ধ, রুবাব আর অর্ককে উপস্থিত হওয়ার কথা জানাল সিরাত।
বিয়ের আগে হঠাৎ তলব পেয়ে অর্ককে আসতেই হলো। দেড় আধঘন্টা পর চারজন উপস্থিত হলে সম্পর্কে ভাবি এমন কয়েকজন তাদের চার জনের হাতে চারটে মেহেদির টিউব ধরিয়ে দিলো। বলল,
-‘নাও যার যার ফুলের হাতে স্ট্যাম্প ছেপে দাও।’
সায়ন মেহেদি চাপতেই পিচিক করে একদলা মেহেদি বের হয়ে তার হাত মেখে গেল। সে হতবাক হয়ে বলল,
-‘এই টিকটিকির গু দিয়ে নাম লিখব কিভাবে? হয় কলম দাও নয়তো আমার দাঁতই যথেষ্ট স্ট্যাম্প ছাপার জন্য।’
ভাবিদের দল অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। একজন সায়নের বাহুতে থাপ্পড় মেরে বলল,
-‘বাসর রাতে দাঁত কাজে লাগিও আপাতত মেহেদি দিয়ে লিখ দেবরজি।’
সায়ন যেহেতু বড় তাই সে আগে লিখতে বসল। হাতে মাখা মেহেদিটুকু আগে টিস্যু দিয়ে মুছল। হাত কাঁপছে। তার হাতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সিরাত ফট করে বলে বসল,
-‘খাৎনার সময়ও এত কাঁপিস নি বাপ আজ কাঁপছিস কেন? বউকে এত ভয় পেলে চলবে? তুই আমার বীর পুত্র ফটাফট লিখে দে নাম’
সিরাতের কথা শুনে সায়ন কলার উঁচিয়ে সবার দিকে তাকাল। সিমিন কিছু নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে দেখে ফট করে বলে বসল,
-‘ছোটো মা, জীবনে প্রথমবার বউয়ের হাতে নাম লিখতে চাচ্ছি দোয়া কোরো। তা পুত্রবধু পছন্দ হয়েছে তো? এদিকে এসো পরিচয় করিয়ে দেই?’
একথা শুনে সিমিন থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। কি বলবেন বুঝতে না পেরে ফট করে বলে বসলেন,
-‘যাও বাবা, কাজ সেরে বীরসন্তানের মতো ফিরে এসো।’
একথা বলামাত্রই সকলের উচ্চশব্দে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে একেক জন মেঝেতে বসে পড়ল। সিমিন গতিবিধি না পেয়ে ছুটলেন রান্নাঘরের দিকে। এরপর কাঁপা হাতে স্বর্নের হাতে সায়ন নিজের নাম লিখে দিলো। শুদ্ধ লিখতে গিয়ে থেমে গেল। চোখ তুলে তাকিয়ে একবার তাকিয়ে ঘস ঘস করে কিছু লিখে উঠে পড়ল। রুবাব বসল,,সেও লিখল। এরপর অর্ক এসে বসতেই শখ দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। শখ হাত বাড়িয়ে দিলে অর্ক কাঁপা
হাতে ধরল শখের হাত। মজার ব্যাপার হচ্ছে দুজনেরই হাত কাঁপছে। এই নিয়ে একদফা হাসাহাসি হলো আর ক্যামেরাম্যান প্রতিটা মুহূর্তের ছবি ক্যামেরাবন্দী করল।
অতঃপর ড্রয়িংরুমে গান বাজনা, হইচই, খানাপিনাসহ মহিলাদের নানান
আড্ডাবাজি চলতে থাকল। হাতে মেহেদি পরা হলে সিরাত চারজনকেই নিজের হাতে খাইয়ে স্বর্নের রুমে রেখে তালা আঁটকে দিলো। এই নিয়েও হাসাহাসি হলো কিছুক্ষণ। বউয়ের হাতে নাম লিখে বাড়ির ছেলেরা চলে গিয়েছিল বাইরে। ফিরল, রাত বারোটার পর। খাবার টেবিলে মা-চাচীর কথার ইঙ্গিতে বুঝল আজকে আর বউয়ের দেখা পাবে না। তখন একেক
জনের মুখ টা দেখার মতো হলো। বেচারা সায়ন স্বর্নের রুমের দরজার সামনে ঘুরঘুর করল। রুবাব জোরে কথা বলে শুনিয়ে শুনিয়ে রুম পার হলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। আর এই দুঃখে তিন ভাই ছাদে গিয়ে বসল। ছাদে বসে চৌধুরী নিবাস দেখতে বেশ লাগছে। তখন ফোনে কল
এলো শুদ্ধর। কামরান, হাসান, স্যান্ডি এসেছে ব্যালেচর পার্টি করতে। সে
নিচে গিয়ে তাদেরকে ছাদে আনলে ছাদের দরজা বন্ধ করে শুদ্ধ, হাসান, কামরান, সায়ন, রুবাব, স্যান্ডি বসার পর আজম বসল। অর্ক নেই দেখে সায়ন তার কথা জিজ্ঞাসা করলে কামরান বলল,
-‘সে আসবে না। বউয়ের ভাইয়ের সামনে দুষ্টু পানি খাওয়ার সাহস নেই তার। এমনিতেও খায় না, খেলে বমি করে।’
সায়ন হাসল। তাকাল শুদ্ধর দিকে। বোঝার চেষ্টা করল আসলেই সত্যি নাকি নতুন সম্পর্কের জন্য এমন করল। শুদ্ধ জানাল, অর্ক বিয়ার খায় তবে মাঝে মাঝে। একদিন জোর করে এক পেগ গিলিয়েছিল তারপর বমি টমি করে একাকার অবস্থা। অন্যকোনো নেশা নেই। তবে চুইংগাম চিবায় সব সময়। একথা শুনে তখন সায়ন বলল,
-‘ কেউ আমাদের এক ঠা’প দিতে আমরা তাকে চার ঠা’প দিয়ে আসি।
কেউ একটা টোকা দিলে আমরা মুখ ফাটিয়ে শাসিয়ে আসি যেন বাড়ি অবধি বিচার না আনে। আমরা সুযোগ পেলে এক পেগ না বোতল ধরে গলায় ঢালি। আমরা দৃষ্টে আমাদের বোন জামাই বেশি ভদ্র হয়ে গেছে।’
তার কথা শুনে সবাই একচোট হাসল। তখন হাসান জানাল, অর্কের যে মা উনি অন্যরকম মহিলা। যেমন ভালো তেমন রাগী। উনার ভালোবাসা পেয়ে অর্ক নিজেকে ওইরকম ভাবে গড়ে তুলেছে যেন তাকে নিয়ে তার বাবা-মায়ের মধ্যে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়। এসব শুনে বেশ কিছুক্ষণ সবাই চুপ থাকল। তখন শুদ্ধ বলল,
-‘অর্কের আপন মা নেই। সৎ মায়ের কাছে মানুষ হলেও মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। আর ও বরাবরই সম্পর্কের বিচ্ছেদ ভয় পায়। যার মধ্যে এ ভয় থাকে সে প্রতিটা সম্পর্ক যত্নে রাখতে জানে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার বোন ভালো থাকবে। আমার বোনকে কষ্ট দেওয়ার আগে দশ বার ভাববে কারণ সে জানে আমার বোন কষ্ট পেলে আমিও কষ্ট পাব।’
স্যান্ডি আসার সময় চার বোতল ব্রান্ডের লাল পানি এনেছে। আজমও এনেছে। কামরান এনেছে বিয়ার। ছাদের দরজা বন্ধ করে যে যার মতো পছন্দ সই জিনিস হাতে তুলে নিলো। শুদ্ধ একটা বিয়ারের বোতলে সিপ নিচ্ছিল তখন শারাফাত চৌধুরী তাকে কল করে দেখা করতে বললেন।
কোনো এক হিসাব মিলাতে পারছেন না সেটার জন্য। অগত্যা যেতেই হলো। ওদিকে শাহাদত চৌধুরী এসেছে উনার সঙ্গে কথা বলে দশ মিনিট পর শুদ্ধ ফিরে এলো। খোলা বিয়ারের বোতলে সিপ নিয়ে গিয়ে ভীষম খেলো। কাশতে কাশতে অবস্থা খারাপ তার। একটু পর বিয়ার ধীরেসুস্থে শেষ করল। শেষ করে কয়েকবার মাথা ঝাঁকি দিতেই সায়ন বলল,
-‘ভাই, কোনো সমস্যা? ‘
-‘মাথা ব্যথা করছে।’
-‘রুমে যা তাহলে।’
-‘সমস্যা নেই ঠিক আছি।’
কথাটা জোর দিয়ে বললেও শুদ্ধ একটু পর বুঝল তার খুব শরীর খারাপ
করছে। দরদর করে ঘামছেও। শার্টের তিনটে বোতাম খুলে পিঠের দিকে ঠেলে দিয়ে চুপ করে বসে রইল। বাকিরা তখনও কিসব নিয়ে হাসাহাসি করছিল। শুদ্ধ তখন কিছু উপলব্ধি করে কিছুটা খেঁকিয়ে উঠে বলল,
-‘ আমার ক্যানে কে কি মিশিয়েছিস?’
তার ধমকানির শব্দে বাকিদের হাসি বন্ধ হয়ে গেল। হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তখন রুবাব বলল,
-‘ আমরা আবার কি মেশাবো? কেন কি হয়েছে?’
-‘ শরীর খারাপ করছে কেন হঠাৎ?’
-‘ কেমন শরীর খারাপ? বউকে কাছে পেতে ইচ্ছে করছে বুঝি?’
শুদ্ধ উঠে দাঁড়াল। সে নন-অ্যালকোহলিক বিয়ার ছাড়া বাড়তি কিছুতে হাত লাগায় নি বিধায় নেশা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। এরাই কিছু একটা মিশিয়েছে। তবে কথা না বাড়িয়ে রুমের দিকে হাঁটা ধরল। তাকে যেতে দেখে বাকিরা হো হো করে হেসে উঠল। তাদের হাসিতেই প্রমাণ সর্ষের মধ্যেই ভূত। বাড়ির অনেকে এখনো জেগে আছে দেখে শুদ্ধ সোজা রুমে চলে গেল। ঠান্ডা পানিতে শাওয়ার নিয়ে এসে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে নেত্রজোড়া বন্ধ করে নিলো। কিছু একটা ভেবে পুনরায় চোখ খুলে হাসানকে ফোন করে বলল আজ এখানেই থেকে যেতে।
রাত বাড়ছে। গিন্নিরা মেহমানদের ঘুমানো ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এসব সামলে নিজেরাও যার যার রুমে চলে গিয়েছেন। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক আওয়াজের সাথে চৌধুরী বাড়ি ধীরে ধীরে শান্ত হতেই সায়ন চুপিচুপি ছাদ থেকে নামল। পকেট থেকে চাবি বের করে স্বর্নের রুমের তালা খুলে দরজা নক করল। শখ আর ঐশ্বর্য ঘুমিয়েছে। শীতল স্বর্ণের কাঁধে মাথা রেখে এতক্ষণ বেলকনিতে বসে গল্প করছিল। দরজা নক হতেই স্বর্ণ বেরিয়ে এলে সায়ন বলল,
-‘শীতল ঘুমিয়েছে?’
-‘না, ওর ঘুম পাচ্ছে না তাই আমাকেও ঘুমাতে দিচ্ছে না। গল্প করছিলাম দুইবোন।’
-‘ওহ, শখ আর ঐশ্বর্য? ‘
-‘দশ মিনিট হলো ওরা ঘুমিয়েছে।’
-‘শুদ্ধর নাকি খুব শরীর খারাপ করছে। বাড়িভর্তি মেহমান বাবা-মাকে ডাকতে গেলে জানাজানি হলে আরেক ঝামেলা। শীতলকে শুদ্ধর রুমে পাঠিয়ে তুই আমার রুমে আয় তো, জরুরি কথা আছে।’
একথা বলে সায়ন থমথমে মুখে চলে গেল। স্বর্ণ গিয়ে শীতলকে কথাটা জানাতেই শীতল শাড়ি সামলে উঠে দাঁড়াল। হাতভর্তি মেহেদি শুকিয়ে গেছে। শীতল শুদ্ধর রুমে ঢুকলেও স্বর্ন মিটিমিটি হেসে সায়নের রুমের দিকে তাকাল। তারপর রুমের দরজা ভালোভাবে আঁটকে শুয়ে পড়ল। সে বুঝে গেছে সায়নের চালাকি। এখন গেলে কি হতে পারে তাও জানে। এতদিন ধৈর্য্য ধরল আর তো মাত্র একটায় রাত। এদিকে সায়ন খুশিতে ডগমগ। স্বর্ণকে জাপটে ধরার জন্য হাতের তালু নিশপিশ করছে তার। কিন্তু যখন দশ মিনিট পেরিয়ে গেলেও স্বর্ণ এলো না তখন রুমের বাইরে এলো। দরজা ঠেলে বুঝল ভেতর থেকে লক। সে রাগে গজগজ করতে করতে ছাদের দিকে হাঁটা ধরল। যেতে যেতে স্বর্ন এমন এমন মেসেজ করলে স্বর্ণ রাগা তো দূর ঠোঁট কামড়ে ধরে কোনোমতে হাসি আঁটকাল।
শুদ্ধ যাওয়ার পর হাসান, স্যান্ডি, কামরানও চলে গেল। অর্ককেও সময় দেওয়া দরকার। ছাদে রইল রুবাব, সায়ন আর আজম। অনেকটাই লাল পানি রয়ে গেছে এখনো।আজম ইচ্ছে মতো গলায় ঢালল। সায়ন, রুবাব যতটুকু খাক কনট্রোলে থাকলেও আজমের নেশা চড়ে গেছে। রাত তখন তিনটা। সায়ন টলতে টলতে বোতলগুলো জঙ্গলের দিকে ছুঁড়ে মারল। ফজরের আজানের আগে আগে রুমে যেতে হবে নয়তো কে কখন দেখে কাহিনি শুরু করে দেবে। সায়নের কথা শুনে রুবাব ধরে উঠে দাঁড়ালেও আজম একেবারেই উঠতে পারল না। সায়ন তাকে ধরে উঠালে আজম নেশার চোটে চোখ বন্ধ করে হাত সামনে দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে হাঁটছে।
সিঁড়ির কাছে গিয়ে সে আর নামবে না। সে নাকি সিঁড়ির জায়গায় বাঁশ ঝাড় দেখছে। বাঁশঝাড়ে আবার বাঁশের থেকে কালো কালো গরিলার সংখ্যা বেশি। এখন কথা হচ্ছে, বাঁশঝাশ এলো কোথা থেকে? এলো তো এলো কিন্তু এতসব গরিলার আমদানি হলো কোথা থেকে? সায়ন তাকে ঠেলে নামাতে গেলে আজম সায়নের দুই পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বলল,
-‘ভাই আমি বাঁশঝাড়ে যাইতাম না। গরিলা গুলান কেমন কইরা জানি তাকাইতেছে। আমি গরিলার চুমু নিতাম না ভাই। বাঁচান ভাই।’
সায়ন নিজেও কিছুটা টলছে। সে এবার নিজের কোমরের টাউজার চেপে ধরে বিরক্তির সুরে বলল,
-‘হারামজাদা টাওজার ছাড়। বউয়ের আগে আমি কাউকে দেখব না।’
একথা শুনে রুবাব গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
-‘তোমার কালো ছা/পা দেখতে আমাদের বয়েই গেছে। যাও সরো যেতে দাও।’
কথাখানা সায়নের মোটেও পছন্দ হলো না। সে থমথমে মুখে বলল,
-‘ আমারটা কালো আর তোর টা বুঝি মেকাব করা?’
-‘ভাই তুমি খুব ন্যাস্টিমার্কা কথা বলো।’
-‘ওই তো উচিত কথা বলি যে।’
রুবাব মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল। কি জবাব দেবে বুঝতে পারল না। তবে
আজম ভয়ে ভয়ে বলল,
-‘ভাই, বাঁশবাগানে গরিলা আইলো কেমন?’
-‘আজম্য! পা ছাড় নয়তো তোদের বাপের বাঁশবাগানের বাঁশ তোর পেছনে দেবো, শালা। যত বলি গালি টালি দেবো আমার মুখ না ছুটালে হয় না।’
-‘রাইগেন না ভাই নতুন বররে রাগতে নাই।’
-‘ হ তুমি আমার প্যান্ট টানাটানি কইরা ল্যাং/টা করার ধান্দা করতেছে আর আমি আবাল সাইজ্জা চুপচাপ দাঁড়াইয়া থাকব। সর শালা, নয়তো এক উস্টা দিয়া প্রতিবন্দী বানায় দিমু।’
আজম নেশায় টাল। পা ছাড়লেই সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়ে মরবে নিশ্চিত।
তাই সায়নের পা ছাড়লই না। অগত্যা সায়ন আজমের হাত আর রুবাব পা ধরে দোলাতে দোলাতে সিঁড়ি দিয়ে নামাতে থাকল। নামতে নামতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-‘শালা গদা ভারি কত রে? শালা আজ থেকে তোর খাওয়া বন্ধ। ‘
একথা বলে সে রুবাবকে বলল
-”দোল দোল দুলুনি’ ছড়া টা বল তো ভাই। ছড়া বলতে বলতে নামলে বোধহয় তাড়াতাড়ি নামতে পারব।’
রুবাব এবার মাথা চুলতে আমতা আমতা করে বলল,
-‘ভাই কবিতার সুর মনে আছে কবিতা মনে নাই।’
-‘ওহ, তাহলে আমি যা বলছি আমার সাথে তাল মিলা।’
-‘হ্যাঁ শুরু করো।
অতঃপর সায়ন গুনগুন করতে ছড়া বলতে লাগল,
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৬৮
দোল দোল দুলুনি
রাঙা মাথায় চিরুণী।
আজরাইল আসবে এখনই
আজম্যকে নিয়ে যাবে সখনই।
