Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ২৫

যাত্রাপথ পর্ব ২৫

যাত্রাপথ পর্ব ২৫
মাশফিত্রা মিমুই

বউ ভাতের অনুষ্ঠান শেষে বাপ, ভাইদের সাথে নাইওর এসেছে মিছরি। পরিচিত ঘরে প্রবেশ করেই পোশাক না বদলে শুয়ে পড়ল সে। নরম বিছানাটা দেহের সাথে লাগতেই ঘুমে চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে এলো। পারুল উঁকি দিলেন মেয়ের ঘরে। বাইরে থেকে এসেই তাকে শুয়ে থাকতে দেখে মেজাজ খারাপ হলো।
“হাত-মুখ না ধুইয়াই শুইয়া পড়ছোস ক্যান? বাড়িত কী রোগ-বালাই ডাইকা আনতে চাস? জামাইয়ের বাড়িত এমন করলে দিন রাইত খালি উষ্টা খাবি।”

সদ্য আসা ঘুমটা চট করে ভেঙে গেলো মিছরির। ভ্রু জোড়া কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে উঠে বসলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে অভিমানী কণ্ঠে বললো,“আমার কোনো কিছুই তোমার সহ্য হয় না, তাই না? এই জন্যই ছোটো থেকে নানার বাড়ি ফেলে রেখেছিলে। এমনকি তোমার জন্য ওই শয়তান লোকটা আমায় বদনাম করার সাহস পেয়েছে, বাবা জোর করে বিয়ে দিয়েছে। এখন একটু বাড়িতে এসেছি তাও ভালো লাগছে না? থাকবো না আমি, কালই চলে যাবো। আর কখনো এই বাড়িতে আসবো না।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রাগ সরে গিয়ে হতভম্বতার দেখা মিললো পারুলের মুখখানায়। মেয়েটা একটু ডানপিঠে, অলস তা সবাই জানে। কিন্তু তাই বলে মায়ের মুখের উপরে এত বড়ো কথা! পারুল বিশ্বাস করতে পারেন না। হঠাৎ করে কী হলো এই মেয়ের? এটাই বা কেমন কথা? এসবের জন্য তিনি দায়ী? স্বামীও সেদিন এই কথাটাই বলেছিলেন। এমনকি অভিযোগ করতে ছাড়েননি নিজের মা আর ভাই বউও। বিপরীতে কিছু বলার জন্য ঠোঁট নাড়ালেও আর বলতে পারলেন না তিনি। পেছন থেকে শাশুড়ি সৈয়দুন নেছা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“তুমি তোমার কামে যাও, বউ। কয়ডা দিন ধইরা মাইয়াডার উপর দিয়া অনেক ধকল যাইতাছে। নতুন পরিবেশে কেমন আছিলো কেডায় জানে? মনমতো একটু চলতে দেও। শ্বশুরবাড়িতে ফিরলেই তো আবার বন্দী জীবন শুরু।”
শাশুড়ির নির্দেশ মেনে নিয়ে প্রস্থান করলেন পারুল। সৈয়দুন নেছা ঘরে এসে বসলেন। নাতনির বেজার মুখে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললেন,“মায়ের লগে এমন কইরা কথা কইতে নাই, বু। মায় কষ্ট পায়।”

“তাহলে সারাক্ষণ বকে কেন?”
“সন্তানের ভালার লাইগাই বকে।”
মিছরি নিশ্চুপ। বৃদ্ধা পুনরায় বললেন,“মায়েরা কহনো সন্তানের ক্ষতি চায় না। সন্তানের ক্ষতি মানে তাগো নিজেগো ক্ষতি। তোমার লগে যা হইছে তা তোমার ভাগ্য। যদিও তোমার মায় পুরাপুরি নির্দোষ না, তার উচিত আছিলো তোমারে সামলাইয়া রাখা। তবে এইসব তার ইচ্ছাকৃত আছিলো না, বু। তোমারও বিয়া হইছে, একদিন সব বুঝবা।”
দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা নেই। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা চললো। এই বাড়িতে বাপ, ছোটো ভাই, সুজাতার পর দাদী আর ভাবিই মিছরির সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। সৈয়দুন নেছা নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করলেন,“নাতিন জামাই আইয়ে নাই ক্যান? নিয়ম অনুযায়ী তো নতুন জামাইরেও বউয়ের লগে আইতে হয়।”

“জানি না। বলেছেন, কাল এসে নিয়ে যাবেন।”
“ওহ, আমার মাথা বিষ উঠায় আগে আগেই তোর মা, চাচীরে লইয়া আমি আইয়া পড়ছিলাম।” একটু থেমে স্বর নিচু করে বললেন,“বাপের বাড়িতে যা করার করছোস। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে হেইসব করার সাহস দেখাইস না। সংসারে মন দিবি, জামাইয়ের পছন্দ অপছন্দ মাইনা চলবি, সবসময় হের মন জয় করার চেষ্টা করবি।”
“আমার ঠেকা পড়েছে?”
নাতনির কথায় হাসলেন বৃদ্ধা,“মাইয়া মাইনষেগোই তো ঠেকা। সংসার নষ্ট হইলে, জামাইয়ের চরিত্রে দোষ দেখা দিলে, সন্তানের অসুখ বিসুখ হইলে আমগো সমাজ তো মাইয়া মাইনষের উপরেই সব দোষ চাপাইয়া দেয়। মাইয়া হওয়া অত সোজা না। তুই তো নিজেই দেখছোস। কী দেখোস নাই?”

“দেখেছি।”
“কিছু করার নাই। বাপের কত ধন সম্পদ আর ক্ষমতা আছে তা কেউ দেখে না। তোর বিয়া ঠিক করার পর তোর মায়ের মতামত কিন্তু কেউ নেয় নাই। তোরে নানার বাড়ি পাঠানের সময়ও তোর আব্বায় তোর মায়রে জিগায় নাই, তোমার মত কী? অথচ দশ মাস দশ দিন ওই মায়েই তোরে পেটে রাখছে।
এই যে এই সংসারে নিজের জায়গা পোক্ত করার লাইগা আমার অনেক কিছু করা লাগছে। নিজের ভাগের খাওনডা পর্যন্ত তুইল্যা দিতে হইছে তোর বাপ, চাচা, ফুফুগো পাতে। আবার কহনো তোর মা, চাচীর পাতে। তোর দাদার হ তে হ মিলাইছি, সংসারের কাম একলা করছি, হেরপরেই না সবার মন পাইছি। মাইয়া মাইনষের কষ্ট আল্লাহ ছাড়া আর কেউ দেখে না। সবাই মনে করে হেঁশেল সামলানো অনেক সহজ, বছরে বছরে পোলাপাইন জন্ম দেওয়াও সহজ। মাইয়া মানুষ ভালা মন্দ খাইবো ক্যান? হেরা কী কামাই করে? তাই কহনো নিজের দুঃখে মলম লাগানের লাইগা অন্যের মিহি চাইয়া থাকবি না। তোর বিষ তোরই, তোর দুঃখ তোর, তোর মান অপমান সব তোর। তোর বাপ, দাদায় তোরে কুমির ভর্তি খালে ফালাইয়া দিছে। হেন থাইক্যা তুই কহনো উইঠা আইতে পারবি না। কিন্তু লড়াই তো করতে পারবি, নাকি? লড়াই করতে হইবো, নিজের জায়গা নিজে তৈরি করতে হইবো। কুমিরগো মায়া, ভালোবাসা দিয়া বশ কইরাই থাকতে হইবো।

পুরুষ মানুষ সহজে আটকায় না। মা, চাচীরা কইতো পুরুষগো নাকি আঁচলে বাইন্ধা রাখতে হয়। ডাহা মিছা কথা। বান্ধা যায় মাইয়াগো—সংসারের শিকলে। কিন্তু পুরুষ বান্ধা যায় না।”
মিছরি মনোযোগ দিয়ে শোনে সেসব কথা। কী বোঝে কে জানে? তবুও তার আনাড়ি মস্তিষ্ক জুড়ে সেসব ঘুরে বেড়ায়। ভাবে, প্রচুর ভাবে, ভাবনার শিকড় গভীরে গিয়ে আবারো ফিরে আসে।
রাতে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। দাদা নিজের পাত থেকে মাছের মাথাটা তুলে দিলেন নাতনির পাতে। মৃদু হেসে বললেন,“আস্তে আস্তে খা, গলায় আটকাইবো।”
খেতে বসে মিছরির যত্ন আত্তি আজ একটু বেশিই হচ্ছে। সবার মধ্যে অস্বস্তি লাগছে মেয়েটার। কাশেম আলী খেতে খেতে বললেন,“আমিরুল শয়তানডা আর ভালা হইলো না। জোয়ান কালেও ইতর আছিলো, বুইড়া কালেও তাই। নাজির না আইলে কিন্তু আমি আর আমার মাইয়া ওই বাড়িতে পাডামু না কইয়া দিলাম, আব্বা।”
নজরুল আলম মাথা নাড়িয়ে বললেন,“পোলাডার কান দুই ভাইয়ে মিল্যা ভাঙাইছে, না হইলে পোলায় শ্বশুর বাড়ি আইবো না ক্যান?”

সুজনের দুই পাশে সুজাতা আর সিফাত বসা। প্রতিদিন রাতের খাবারটা বাবার হাতে না খেলে তাদের চলে না। সুজনও ছেলে-মেয়েদের খাইয়ে দিতে শান্তি পায় যেন। মুখের খাবার শেষ করে সে বললো, “বিয়া দেওনের আগেই এসব ভাবা উচিত আছিলো। ছুডো বেলাত্তে যাগো রে শত্রু জাইন্না বড়ো হইছে তাগো বাড়িতে থাকতে আইবো ক্যান? নাজিরে কী বলদ?”
আকবর মিয়া এতক্ষণ নীরব ছিলেন। সবার আলোচনা শুনে এবার মুখ খুললেন,“বউ থুইয়া পোলায় যাইবো কই? ঠিকই আইয়া লইয়া যাইবো, তোরা দেহিস।”
চটপট খাবার খেয়ে তাদের মধ্য থেকে উঠে ঘরে চলে এলো মিছরি। বউ, জামাই শব্দ দুটো শুনলেই লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে যাচ্ছে। খাওয়া শেষে কিছুক্ষণ পর সুজাতাও ঘরে এলো। বিছানায় উঠে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। যতদিন বাড়িতে ফুফু থাকে ততদিন ফুফুর সাথেই সে ঘুমায়। জিজ্ঞেস করল,“তোমাকে নাজির ফুফা মারেনি?”

“মারবে কেন?”
“দুস্তামির জন্য।”
“কবে দুষ্টমি করেছি?”
“অনেক আগে।”
“আমি করিনি, তুই করেছিস। তারপর নিজে বাঁচতে আমার নাম দিয়েছিস। যাস শুধু বাড়ির কাছে, পিটিয়ে ছাল তুলে দেবে।”
“কেন দেবে? তুমি আছো না? তুমি বাঁচাবে।”
“আমার কথা শুনবে কেন?”
“তুমি এখন বউ না?”
“তো, বউয়ের কথা শোনে?”
বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ালো সুজাতা। মিছরি ভ্রু কুঁচকে সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। পুনরায় প্রশ্ন ছুঁড়লো,“তুই জানলি কীভাবে, পাকনি?”

“আমার বাবাও মায়ের কথা শোনে। মেজো চাচীকে বলার পর বলেছে, জামাইরা নাকি বউয়ের কথা শুনে উঠবস করে।”
“জিজ্ঞেস করার আর মানুষ পেলি না?”
সুজাতা দুদিকে মাথা নাড়াতেই মিছরি তাকে বালিশে ঠিক করে শুইয়ে ঘুম পাড়ালো।
রাত বাড়লো। খাওয়া-দাওয়া, গল্প গুজব শেষে যে যার ঘরে গিয়েছে। পলি বিছানা গুছিয়ে ঘর থেকে বের হতে যাচ্ছিলো, তখনি মুখোমুখি হলো স্বামীর। তালেব পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করল,“তাড়াহুড়া কইরা যাও কই?”

“মিছরির কাছে।”
“এত রাইতে?”
“উনেই আইজ ঘুমামু।”
“ক্যান?”
“আবার কবে না কবে আইবো, তাই।”
“একই গেরামে থাকবো অথচ এমন ভাব না জানি কোন বিদেশে গেছে গা।”
“একই গেরাম হইলে কী হইবো? আমনে বুঝি যাইতে দেন কোনো হেনে? আম্মা, চাচী ছাড়া বাইরে যাওন তো নিষেধ।”
“ভালার লাইগাই যাইতে দেই না। আমার সুন্দর বউয়ের উপরে কারো নজর লাগলে?”
“গেলাম আমি।”
“ওই না, আমি কেমনে থাকমু? জামাইয়ের লাইগা মায়া লাগে না?”
“না, লাগে না।”
“দাঁড়াও, আমি অনুমতি দেই নাই।”
“রাক্ষস।” বলেই দৌড়ালো পলি। তালেব হতভম্বতার সহিত তাকিয়ে রইল দরজার দিকে। মেয়েটা আসলেই একটা বাচ্চা। সব পাকা কথা শুধু ননদদের সাথে।
সুজাতা ঘুমিয়ে পড়েছে। মিছরি দরজা আটকাতে যেতেই তাকে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল পলি। হেসে বললো,

“আইজ তোমার লগে ঘুমামু।”
“ভাইজান কোথায়?”
“ঘরে।”
“আসতে দিলো?”
“দিবো না মানে? আমি দৌড়াইয়া আইয়া পড়ছি।”
তপ্ত শ্বাস ফেলে দরজা আটকে দিলো মিছরি। পলি ওড়নাটা একপাশে খুলে রেখে বিছানার মাঝখানে পা ভাঁজ করে বসলো। ননদকে দেখে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,“‌তাড়াতাড়ি বাসর রাইতের গপ্পো শুরু করো। শোনার লাইগা মনডা সারাডা দিন ধইরা আনচান করতাছিল।”
“এই জন্যই তুমি এত রাতে আমার ঘরে এসেছো?”

“হ, কও।”
“কী বলবো?”
“কী কী হইছিলো?”
“কী হবে?”
“যা হয়।”
“আমি অতশত জানি না।”
“হায় আল্লাহ, কী কও! জানো না মানে? বও এনে। বিস্তারিত হুইন্না তারপর ধাপে ধাপে তোমারে শিখামু।”
পাঁশুটে মুখে কিছুক্ষণ ভাবির দিকে তাকিয়ে থেকে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল মিছরি। মেয়েটা একদম যা তা।

আরেকটি সুন্দর রৌদ্রজ্জ্বল দিনের সূচনা। নিত্যদিনের মতো গৃহস্থের কাজ শেষে অবসর সময় কাটাচ্ছে বাড়ির গৃহিণীরা। নাজির নওশাদকে ডাকলো,“আয়, আব্বারে গোসল করাইয়া আনি।”
বারান্দায় বসে নলেন গুড় দিয়ে মুড়ি খাচ্ছিলো নওশাদ। বড়ো ভাইয়ের কথায় কিছুটা বিরক্তি ফুটে উঠলো তার কপালে,“কাল না করাইলাম? আবার আজ?”
“তুইও তো কাইল গোসল করছিলি, আইজ কী তাইলে করবি না?”
“আমি আর আব্বায় এক?”

“বাপের ভাগের জমি নিতে আইয়ো, একেবারে জায়গা মতন ভইরা দিমু। বদমাইশ একটা, আয়।”
ধমক খেয়ে মনমরা হয়ে উঠে এলো নওশাদ। লিলি ঘরে বসে আছে বোধহয়। বাবাকে দুই ভাই মিলে বের করে নিয়ে গেলো পুকুর পাড়ে।বসালো বাঁধানো সিঁড়ির উপর। সুবহান আলী শাহ খুশিতে হাত নাড়াচ্ছেন। চোখ ঘুরিয়ে দেখছেন প্রকৃতি। তাঁর খুশিতে নাজির হাসলো। ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,“শ্বশুরের পায়ের কাছে পইড়া থাকলে কোনো লাভ নাই। লাভ হইছে এই জায়গায়। বাপের সেবা করলে জান্নাত পাবি, বদমাইশ। শরীর মাইজ্জা দে।”
ভাইয়ের কথামতো বাবার শরীর মেজে দিতে লাগলো নওশাদ। সুবহান আলী শাহ আধ ফালি জিভ দিয়ে শব্দ বের করতে লাগলেন,“নওয়া… নওয়া…কওওয়া..
নওশাদ কিছু না বুঝে ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল মুখের দিকে। নাজির বাবার ফাটা গোঁড়ালি মাজতে মাজতে বললো,“কইতাছে, নওশাদ কই আছিলি?”
নওশাদ উত্তর দিলো,“বাড়িতেই আছিলাম। কাইল না তোমারে ভাইয়ের লগে মিল্যা গোসল করাইলাম? ভুইল্যা গেছো?”

লোকটা দুদিকে মাথা নাড়ালেন। নওশাদ কিছুই বোঝে না। তাকিয়ে থাকে ভাইয়ের মুখের দিকে। গোসল শেষে নতুন লুঙ্গি পরিয়ে উঠোনের রোদের মধ্যে বসানো হলো বাবাকে। মুমিনুল শাহ সিঁড়িতে বসে আছেন। তাদের কান্ড দেখে অনিহা নিয়ে বললেন, “হেরে আবার ঘর থাইক্যা বাহির করতে হইবো ক্যান? ঢং! বাপের লাইগা এত পিরিত আইয়ে কেমনে রে, নাজির?”
“ক্যান, আমনের জ্বলে? কোনে জ্বলে? লুঙ্গি খুলেন দেহি।”
“মুখ সামলাইয়া কথা ক, হারামজাদা।”
“আমনেগো দেখলে সামলাইতে পারি না, পিছলা খায়।”
“তুই আর ভালা হইলি না। বউ আনতে যাবি না?”
“হ, আইজ বিকালে গিয়াই আনমু। কীসব নিয়ম যে মাইনষে বানাইছে! বিয়ার মধ্যে এইসব নিয়ম ক্যান পালন করতে হয়?”

“কী জানি? ওই মাতারির পোলারে পাইলে আমিও ইচ্ছামতো পিডাইতাম কতক্ষণ। তিন কবুল কইয়া বিয়া করলেই তো হইলো।”
“এইডাই তো।”
“শ্বশুরবাড়ি যাবি, ভালা দেইখা মিষ্টি লইয়া লইস লগে। ভোজন বাবুর রসগোল্লার স্বাদ অনেক! বেশি বেশি বাজারও কইরা নিবি। বিরোধী পক্ষের যাতে তাক লাইগা যায়।”
“ওইডা কইতে? মিল্টনরে কইয়া দিছি বেলাইয়ের বড়ো বড়ো মাছ পাইলে যাতে লইয়া আইয়ে। আমনের পুব পাড়ার ক্ষেতে দেখলাম ভালা মিষ্টি কুমড়া আর বরবটি হইছে?”
“নজর দিবি না, নাজির। তোর চাচী খাইতে অনেক পছন্দ করে।”
“নজর দিয়া লাইছি, চাচা। আমনের আর আমার কী? আমনেগো যা আমারো তা। আর আমার যা তার সব আমারই।”

“বড়ো ভাইজানের স্বভাব কেমনে পাইছোস?”
“পাই নাই, অর্জন করছি। ছুডোত্তে তো হেরে দেইখাই বড়ো হইছি।”
“আবার ভাইয়ের জমি মাইরা খাইস না।” বলেই হো হো করে হাসলেন তিনি।
“ভাইয়ের জমি? ওই তো পাইবো মাত্র এক বিঘা। তার উপর খরচা তো আর কম করি নাই হের পিছনে। জমি মাইরা খাইলে চাচাগোডা খাওন যায়। কেমনে খাওয়া শুরু করমু, ছুডো চাচা? আমার বাপের লাহান অবস্থা কইরা?”
হার্ট অ্যাটাক করার জো হলো মুমিনুল শাহর। হাসি ঠাট্টার ফাঁকে কী একটা কথা বলে দিলো ছেলেটা! নাজির তাঁর ভয়ার্ত মুখখানা দেখে হাসলো,“মশকরা করছি, চাচা। আমনে অল্পতেই ডরাইয়া যান। ধুর, আমনে দুধ ভাত।”
মুমিনুল শাহ আর কিছু বললেন না। এই ছেলে একটা বারুদ। যখন তখন ফেটে গিয়ে দুই ভাইকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। নাজির আনত স্বরে ছোটো ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,“কথা এমন কইরা কইতে হয় যাতে আশেপাশের মাইনষেগো কইলজা কাইপ্পা ওঠে। মিনমিন করলে মাইনষে তোরে পাইয়া বইবো, বুঝছোস বলদা?”
উপরনিচ মাথা নাড়ায় নওশাদ। যদিও এতটা ক্ষমতা তার নেই। সে তো নিজের ভাইয়ের হাত নাড়ানো দেখেই ভয়ে কাঁপে। স্ত্রীর অশ্রু দেখলে বরফের মতো গলে যায়।

বিয়ের ব্যস্ততায় নাজিরের সমস্ত কাজ সামলানোর দায় ভার পড়েছে মিল্টনের উপর। সেই দায়ভার গুরুদায়িত্ব সহকারে মাথা পেতে নিয়ে পালন করছে ছেলেটা। বিকেলের দিকে বাবু সাহেবটি সেজে বাজারে গেলো নাজির। মন ভরে বাজার করল। সামাদ মিয়াকে আগেই জানিয়ে রেখেছিল, বড়ো বড়ো বোয়াল কাতলা লাগবে। কাতলা তিনি পাননি, তাই বিশাল আকৃতির বোয়াল আর রুই ধরিয়ে দিলেন তিনটা। সাথে গলদা চিংড়ি আর ভোজন বাবুর তৈরি সুস্বাদু রসগোল্লা তো আছেই। মিল্টন আর লতিফ সেসব বহন করছে। নাজির তাদের আগে আগে হাঁটছে।
মাস্টার বাড়ির সামনে এসেই থমকে দাঁড়ালো নাজির। আচমকা অস্বস্তি তাকে জোঁকের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে ধরলো। ভেতরে যাবে কী যাবে না দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। বুড়ো ছাড়া যে বাড়ির কেউই মন থেকে বিয়েতে রাজি ছিল না তা আর জানার বাকি নেই তার। তবুও নিজের দুর্বলতা দেখানোর ছেলে তো নাজির নয়। মিল্টন পিছু থেকে বললো,

“ভাইজান, ঢুকবেন না?”
“হ, আয়।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরে প্রবেশ করল নাজির। কারুকার্য খচিত ফটকের দরজাটির পাশে টিনের চালা ঘর। সেই ঘরে এতকাল ছিল জিন্নত আলীর বাস। জিন্নত আলী আকবর মিয়ার দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয়। বন্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পর আকবর মিয়াই ঠাঁই দিয়েছিলেন তাকে নিজের বাড়িতে। এখানে কাজ করেই তিনি সন্তানদের পড়াশোনা শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শেষে বাড়ির মানুষদের মায়ায় পড়ে আর যাননি কোথাও। তবে এবার ছেলেরা তাকে জোর করেই নিয়ে গিয়েছে নিজেদের সাথে। তাদের সাথে যোগ দিয়ে আকবর মিয়া নিজেও অনেক বুঝিয়েছিলেন লোকটাকে।
সুজাতা, সিফাত উঠোনে খেলছিল। মিছরি বসেছিল বাইরের সিঁড়িতে। তাকে দেখে নাজির হাসলো,“বিবি জান, আসসালামু আলাইকুম।”
চকিতে মুখ তুলে তাকাতেই আঁতকে উঠলো মিছরি। ঘোমটা ঠিক করে উঠে দাঁড়ালো। লতিফ আর মিল্টনও সালাম দিয়ে এগিয়ে দিলো বাজারের ব্যাগটা। মিছরি সালামের জবাব নিলো। একটা বাজারের ব্যাগ হাতে নিতেই উল্টে পড়ার উপক্রম হলো। নাজির চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বিদ্রুপ করে বললো,“বউ আমার দেখতে মোডা হইলেও কামে দুর্বল।”

“তুই এনে কী করোস?”
প্রশ্নটি শুনে সামনে তাকাতেই মাসুমের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হলো তার। অবাক হওয়ার ভান ধরে বললো, “তার আগে ক, তুই আমার শ্বশুরবাড়িত কী করোস? কামকাজ নাই, আকাইম্মা?”
খেয়ে ফেলবো, মেরে দেবো এমন চেহারা করল মাসুম। নাজির ভীষণ মজা পেলো। মিল্টনের উদ্দেশ্যে বললো,“আমার বউয়ের হাত নরম। শালার হাতে মাছগুলা ধরাইয়া দে।”
মিল্টন এগিয়ে গিয়ে তাই করল। মাসুম কিছু বলতে চাইলো, তবে পারলো না। সিফাত দৌড়ে গিয়ে আসল জায়গায় খবর পৌঁছে দিয়েছে। সেই খবর পেয়ে আকবর মিয়া বাইরে এলেন। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন,“আরে, আমার নাতজামাই আইয়া পড়ছে যে! জামাইরে বাহিরে দাঁড় করাইয়া রাখছোস ক্যান? ঘরে নিয়া বসা, শরবত দে।”
বুড়োর হম্বিতম্বি দেখে নাজিরের মুখ বাঁকাতে ইচ্ছে করল। ভাবখানা কি! সুন্দর করে বললো,“বসমু না। বউ দেন, লইয়া যাইগা। এই বউ, যাও তৈয়ার হইয়া আইয়ো।”

মনটা খারাপ হয়ে গেলো মিছরির। ওই বাড়িতে তার যাওয়ার ইচ্ছে নেই। একদম না। ভেবেছিল কয়েকদিন এখানেই থাকবে, অথচ! মাসুম বললো,“মাইয়া এহন দিমু না, যা গা।”
“তুই দেওয়া না দেওয়ার কেডা? কবুল বলার পর থাইক্যা ওর অভিভাবক আমি। তোর বাপ নিজে কাবিন নামায় স্বাক্ষর কইরা অনুমতি দিছে। তাই আমার বউয়ের উপরে শুধু আমার হুকুম চলবো। কী ঠিক কইছি না, বুইড়া?”
আকবর মিয়া মাথা নাড়ালেন,“বুইড়া কী? দাদাশ্বশুর লাগি। দাদাজান ডাক।”
“ডাকমু না, বউ দেন তো।”

“আগে ভিতরে আইবি, জামাই আদর করমু। তারপর বউ নিয়া যেনে ইচ্ছা যাইস। এই মিছরি ঘরে গিয়া তৈয়ার হ। যতক্ষণ না ডাকমু ততক্ষণ পর্যন্ত বাহির হইবি না।”
দাদার নির্দেশ মোতাবেক ঘরে চলে গেলো মিছরি। যাওয়ার আগে একপলক স্বামীর দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না। এতে নাজির ভারি অসন্তুষ্ট হলো। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এর শাস্তি দেবে বলে প্রতিজ্ঞাও করল। বাধ্য হয়েই তাকে প্রবেশ করতে হলো মাস্টার বাড়ির অন্দরে।
বসার ঘরে বসলো। সৈয়দুন নেছার তত্ত্বাবধানে শুরু হলো জামাই আদর। তার আংশিক অবশ্য লতিফ আর মিল্টনও পেলো।

যাত্রাপথ পর্ব ২৪

তবে নাজিরের খারাপ লাগছে না। শত্রুর বাড়িতে ঢুকে আপ্যায়ন নিচ্ছে। কজন পারে এমন করতে? মাসুম চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেসব দেখছে আর রাগে ফুঁসছে। তার রাগটাও নাজিরের ভালো লাগছে। তাই সেই রাগকে আরো বাড়িয়ে দিতে মিষ্টিতে কামড় বসিয়ে চোখ টিপ মারলো। মাসুম হনহনিয়ে চলে গেলো ভেতরে।

যাত্রাপথ পর্ব ২৬