বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৬
রানী আমিনা
সেনাঘাটির ভেতরে খাটানো অসংখ্য তাবুর সম্মুখে বনফায়ার খাটানো। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সৈন্যরা এখন অলস সময় কাটাতে ব্যাস্ত। বন্দুক গুলো খুলে পরিষ্কার করছে কেউ কেউ, কেউ অস্ত্রে শান দিচ্ছে, গান ধরেছে কেউ, অন্যেরা মনোযোগ দিয়ে শুনতে ব্যাস্ত। দলে দলে ভাগ হয়ে বনফায়ার ঘিরে আনন্দ-ফুর্তিতে ব্যাস্ত তারা।
সৈন্যসংখ্যা এই মুহুর্তে কম, অধিকাংশই অন্যান্য দ্বীপ গুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যাস্ত। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকাল সেনাঘাটি তাই একটু বেশিই নিরব।
সেনাপ্রধান রাসিন জুবের নিজের তাবুতে বসে কাজ করছিলেন। সবগুলো দ্বীপের দায়িত্ব তার একার ওপর পড়ায় এখন বেশ ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। বাকিরা কোথায় গিয়ে মরেছে সেটা খোঁজার দায়িত্বও তার ওপর। অথচ তার কোনো ধারণাই নেই এই ব্যাপারে।
কোনো জায়গা খুঁজতে বাকি রাখেনি সে, কিন্তু তাদের কারো টিকিপাত্তা নেই। ওপর মহল থেকে শুধু আদেশ এটাই যে তাদের খুঁজে বের করতে হবে, কিভাবে বের করতে হবে তারা জানেন না।
সে হিজ ম্যাজেস্টির কাছে প্রস্তাব রেখেছিলো শিরো মিদোরিও খুঁজে দেখার, হতেই পারে কোনোভাবে তারা শিরো মিদোরিতে গিয়ে মরেছে! সেখানের জঙ্গলটা মায়াবী, এমন হতে পারে সবাইকে ডেকে নিয়ে গুম করে দিয়েছে! কিন্তু হিজ ম্যাজেস্টি কোনো ভাবেই রাজি হননি, রেড জোনে ঢোকা তো সম্পুর্নই নিষিদ্ধ!
অন্যান্য দ্বীপ গুলো তন্নতন্ন করে খোঁজা শেষ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো কন্ট্রোলারগণ এবং অন্যান্য কিছু বিশেষ ব্যাক্তিবর্গ ব্যাতিত প্রায় সকলকেই পরবর্তীতে পাওয়া গিয়েছে, বেশ সহিহ সলামতেই পাওয়া গেছে, কিন্তু তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি। তারা নাকি অন্যদের ব্যাপারে কিছুই জানেনা, অথচ সকলেই একযোগে উধাও হয়েছিলো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কাজ করতে করতে এসবই ভেবে চলেছেন রাসিন জুবের৷ প্রয়াত বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ানের বেশ কাছের লোক ছিলেন তিনি। অন্যদের মতো তিনিও কিমালেবে বিশাল ব্যাবসা সামলাতেন, কিমালেবে জায়ান সাদির পর তিনিই ছিলেন দ্বিতীয় ধনী। সেই সুবাদে জায়ান সাদির সাথে বেশ সখ্যতা ছিলো তার, আসা যাওয়াও হতো। প্রয়াত বাদশাহর সাথে সেখানেই তার পরিচয়।
অমন তুখোড় ব্যক্তিত্ববান, রাজসিক, শক্তিশালী বলয়ে আবৃত ব্যাক্তি তিনি খুব কমই দেখেছেন। পরিচয়ের সুবাদেই বিভিন্ন সময়ে বাদশাহর থেকে অনেক উপকার পেয়েছেন তিনি, জায়ান সাদির মতো তাকেও বেশ সুনজরেই দেখতেন বাদশাহ।
কিন্তু সবই বদলে গেলো তাঁর মৃত্যুর পর। শেহজাদা ইলহান বাদশাহ হওয়ার পর প্রয়াত বাদশাহর কাছের লোকদেরকে একে একে চিহ্নিত করে নিশ্চিহ্ন করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন, তালিকায় রাসিন জুবেরও ছিলেন, উপরের দিকে।
দুটো মাত্র সন্তানের মুখে চেয়ে রাসিনের বুকে ভয় জমলো, জীবন বাঁচাতে পায়ে পড়লেন বাদশাহ ইলহানের। চুক্তি হলো প্রয়াত বাদশাহর যত গোপন তথ্য সে জানতো এবং যেভাবে জানা যাবে তার খোঁজ দিলে তাকে রামাদি সামার সেনাপ্রধান পদে উন্নিত করা হবে৷
জায়ান সাদি, নওয়াস জাবিন এবং প্রমুখদের যখন টেনে হিচড়ে শিরো মিদোরির কুখ্যাত আন্ডারগ্রাউন্ড প্রিজনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তখন রাসিন জুবের হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন, বরং একটু বেশিই বেঁচেছিলেন। ব্যাবসায়ী থেকে হঠাৎ সেনাপ্রধান হয়ে গিয়ে তার আনন্দের সীমা রইলোনা৷ দুই সন্তানকে সবচেয়ে ভালোটা দেওয়ার চক্করে ধীরে ধীরে তার মন থেকে মুছে গেলো বিশ্বাসঘাতকতার গ্লানি। যে মরে গেছে তার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে কোনো সুবিধা ছিলোনা, অতীতকে পেছনে ফেলে তাই এগিয়ে গিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার কাজে মন দিলেন তিনি। এমন সময় বাইরেটা হঠাৎই শান্ত হয়ে এলো, সৈন্য দের হাসিখেলার আওয়াজ আর শোনা যাচ্ছে না৷
কপালে ভাজ পড়লো রাসিন জুবেরের। কিছুক্ষণ স্থীর বসে থেকে উঠলেন তিনি। বাইরে বেরিয়ে দেখতে গেলেন সব ঠিক আছে কিনা।
চারদিকে তাকিয়ে নিজের এক অধস্তন কে জিজ্ঞেস করলেন কোনো অসুবিধা কিনা, অধস্তন জানালো সে নিজেও জানেনা কেন সকলে চুপ হয়ে গেছে। রাসিন জুবের ফটকের দিকে তাকালেন, ইঞ্জিনের ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে এদিকে৷ চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন প্রত্যেকেই বারবার ঘাটির ফটকের দিকেই দৃষ্টি দিচ্ছে, যেন কারো উপস্থিতির আগাম সতর্ক বাণী ছড়িয়ে পড়েছে সবার মননে!
বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, দূরে পাহারায় থাকা সৈন্যরা পর্যন্ত অকারণে অস্থির হয়ে উঠছে, আস্তাবলের ঘোড়াগুলো হঠাৎ চঞ্চল হয়ে খুর ঠুকছে মাটিতে, তাদের অশান্ত হ্রেষা ধ্বনি ভেসে আসছে থেকে থেকে।
গাড়ির আওয়াজ নিকটবর্তী হলো, ঘাটির ভারী লোহার ফটক খুলে গেলো বিকট ধাতব শব্দ তুলে। ভেতরে একে একে ঢুকতে থাকলো কালো রঙা গাড়ির বহর। তার ঠিক কেন্দ্রে দৃষ্টিগোচর হলো স্বর্ণবাধানো এক রাজকীয় পিচ ব্লাক গাড়ি!
রাসিন জুবের আঁতকে উঠলেন হঠাৎ, চোখ জোড়া বড় বড় হয়ে এলো তার। এই গাড়ি…. এই গাড়ি প্রয়াত বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ানের! শেহজাদী ব্যাতিত এতে চড়ার সাহস কেউই করবে না, স্বয়ং বাদশাহ জাজীব ইলহান দেমিয়ানও নয়! তবে? কে এলেন?
পরমুহূর্তেই ঘাটির ফটকে স্থাপিত রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে ধ্বনিত হলো একটি আর্টিফিশিয়াল ভয়েস— অ্যালার্ট অ্যালার্ট…. দ্যা মাইটি কিং নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান!
মুহুর্তেই সমস্ত ঘাটি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সৈন্যরা সমস্ত ফেলে উঠে দাঁড়ালো যে যার স্থানে, তাদের বুটের একযোগ শব্দে কেঁপে উঠলো সমস্ত! পরমুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে এলো চতুর্দিক, ঘাটি জুড়ে ইঞ্জিনের গ্রুম গ্রুম আওয়াজ ব্যাতিত অন্য কোনো শব্দ কানে এলোনা!
রাসিন জুবের স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নিজের স্থানে একটু আগে নিজের কানে যা শুনলেন তা বিশ্বাস করতে গিয়ে তার হৃৎপিণ্ড অস্বাভাবিক গতিতে ওঠানামা শুরু করলো। এটা কিভাবে সম্ভব!
সম্মুখের গাড়ি গুলো থেকে ঝটপট নেমে পড়লো কালো স্যুটে ঢাকা ভারী অস্ত্রধারী দেহরক্ষী, তাদের নেতৃত্বে থাকা লিও এবং কাঞ্জি এসে খুলে দিলো মীরের গাড়ির দরজা।
পরক্ষণেই নেমে এলো দীর্ঘদেহী মীর, গায়ের বাটনলেস সাদা, পাতলা শার্টটা শীতল বাতাসে দুলে গেলো তৎক্ষনাৎ।
ধীর, অদম্য পদক্ষেপে সামনে এগোলো সে, চোখ তার নিচের দিকে। পরনের কালো রঙা লুজ জগারের পকেট থেকে বের করলো কাগুজে চিরকুটটি, যাতে গোলাকার হস্তাক্ষরে লেখা— স্যিক দ্যা স্যোল বিনিথ ইয়্যোর নেইম। লেখাটির চুম্বকের মতোন আকর্ষণ শক্তি বার বার তাকে টানে, তাতেই চোখ বুলোতে বুলোতে এগোলো সে সামনে।
সম্পুর্ন ঘাটির নিরবতা ভেঙে শুধু শোনা গেলো তার শক্ত, ভারী বুটের শব্দ, যেন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে মৃত্যুর ঘন্টাধ্বনি!
বিশাল জনসমাগম উপেক্ষা করে এগোতে এগোতে হঠাৎ থেমে দাঁড়ালো সে৷ চিরকুটটা ভাজ করে পকেটে ভরে মাথা তুলে তাকালো সে। তার স্বর্ণাভ, তীক্ষ্ণ, শীতল দৃষ্টি সোজা গিয়ে বিঁধলো রাসিন জুবেরের চোখ জোড়ায়।
আবারও বাড়ালো কদম, ঠোটের কোণে হঠাৎ খেলে গেলো তীক্ষ্ণ, সুচারু হাসির রেখা। রাসিন জুবেরের শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হলো, চোখ জোড়ায় এসে ভর করলো প্রাণনাশের ভয়ানক শঙ্কা, প্রচন্ড শীতের ভেতরেও কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো ঘাম!চোখ ভর্তি আতঙ্ক নিয়ে একটু একটু করে পেছাতে শুরু করলো সে।
পালাবে? কোথায় পালাবে? লুকোনোর জায়গা কোথায়? ক্ষমা চাইবে? কোন মুখে? তিনি এখানে এসেছেন এর অর্থ তিনি সকল কিছু জেনেই এসেছেন। এখন কিভাবে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? এই লজ্জা থেকে সে কিভাবে উদ্ধার হবে? এই অপরাধবোধ সে কোথায় লুকোব, কোথায়?
সেই মুহুর্তেই মীরের গমগমে কন্ঠস্বরে ভেসে এলো তার নাম,
“রাসিন জুবের!”
প্রৌঢ় রাসিন হুশে এলো হঠাৎ, চোখ জোড়া ভর্তি হয়ে এলো প্রাণভয়ে। মুহুর্তেই মনে পড়ে গেলো কি কি অতি গোপন তথ্য সে ফাঁস করেছে, কত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস হস্তান্তর করেছে, কতভাবে শেহজাদা ইলহানকে অবৈধ ভাবে সিংহাসনে বসাতে সাহায্য করে গেছে! আঁতকে উঠে কোনো কিছু না ভেবেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাতে নিলো সে।
মীর হাসলো শব্দ করে, পরক্ষণেই ঝড়ের গতিতে ছুটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সে রাসিনের পথ অবরোধ করে! ঘাড় কাত করে তাকালো রাসিনের আতঙ্কে রক্তশূণ্য হয়ে যাওয়া চেহারার দিকে।
পরমুহূর্তেই ক্ষিপ্র গতিতে নিজের হাতের লম্বা, ধারালো নখর গেঁথে দিলো রাসিনের গলার নলীতে, আর তারপর এক ঝটকায় ছিঁড়ে নিয়ে এলো গলার নলী। মুহুর্তেই রক্তের ফোয়ারা ছিটকে পড়লো চারদিকে, মীরের গায়ের সাদা শার্ট লাল হয়ে উঠলো রাসিন জুবেরের রক্তে!
রক্তের কলকল ধ্বনি ব্যাতিত টু শব্দটি হলোনা কোথাও, আতঙ্কে শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলো আশেপাশের সকলে, রাসিন জুবেরের বিস্ফোরিত দৃষ্টি তখনো আঁটকে রইলো মীরের হিংস্র মুখপানে!
মৃত লাশটাকে ঘৃণাভরে ছেড়ে দিলো মীর, রাসিন জুবেরের নিস্পন্দ দেহ শব্দ করে আছড়ে পড়লো নিচে। লিও তড়িতে এসে রুমাল এগিয়ে দিলো মীরের দিকে, সেটি হাতে নিয়ে রগড়ে রগড়ে হাত মুছলো মীর। কাঞ্জি এক সেট নতুন পোশাক নিয়ে হাজির হলো মুহুর্তেই। কিন্তু মীর হাত নাড়িয়ে ওকে পরে আসতে বলল।
চারদিক নিস্তব্ধ। রাসিন জুবেরের রক্তমাখা লাশ তিরতির করে কেঁপে চলেছে মেঝেতে। সেই আদিভৌতিক নীরবতা চিরে মীর এগিয়ে এলো সামনে। চোখদুটো জ্বলে উঠলো আগুনের লেলিহান শিখার ন্যায়!
সমবেত সৈনিকদের উদ্দ্যেশ্যে সে বজ্রকণ্ঠে ডেকে উঠলো,
“সোলজার্স!”
সৈনিকরা সম্বিত ফিরে পেয়ে একত্রে বুক সোজা করে দাঁড়িয়ে পড়লো, তাদের বলিষ্ঠ, স্থীর মুখের দিকে তাকিয়ে মীর গর্জে উঠে বলল,
“তোমরা আমার সৈনিক, আমার অস্ত্র। আমার রাজ্যে তোমরাই আমার ছায়া! আমার রাজত্বে আমার অনুমতি ছাড়া একটি পাতাও কোথাও নড়বে না। আমার নামে শত্রুর বুক কাঁপানোর দায়িত্ব তোমাদের কাঁধে!
আমি চাই আনুগত্য, অটল বিশ্বস্ততা! তবেই আমি তোমাদের জন্য আমার প্রাণোৎসর্গ করবো!
কিন্তু— যে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তার পরিচয় স্থান, কাল, পাত্র কিছুই বিবেচ্য হবে না! বিশ্বাসঘাতকের শুধু একটাই পরিণতি, মৃত্যু!
এই পঞ্চদ্বীপ আমার, আর আমার সাম্রাজ্যে আমিই আইন, আমিই রায়, আর আমিই মৃত্যুদণ্ড।”
মুহূর্তেই পুরো ঘাটি গর্জে উঠলো একসাথে, সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠলো,
“লং লিভ দ্যা কিং…. লং লিভ দ্যা কিং…!”
মীর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাশটনের দিকে, জিজ্ঞেস করলো,
“আমার সেনা প্রধানের খোঁজ পেয়েছো?”
“নেগেটিভ ইয়োর ম্যাজেস্টি, যতদূর জেনেছি তিনি আর বেঁচে নেই। শেহজাদা ইলহান তাকে অনেক আগেই মেরে ফেলেছেন।”
মীর ভেতরের দিকে এগোতে এগোতে বলে উঠলো,
“কোকোকে ডাকো।”
কোকোর সাথে ফ্যালকনের বর্তমানে কথা বন্ধ আছে। কোকো তাকে রেখেই শেহজাদীর সাথে দেখা করে এসেছে আবার তার হাতের খাবারও খেয়ে এসেছে শোনার পর থেকে সে উলটো ঘুরে গেছে, কথাই বলবে না৷ আনাবিয়া ওর জন্য কোকোর সাথে খাবার পাঠিয়ে দিয়েছিলো, সেটা ফ্যালকন ঠিকই নিয়েছে।
কথা বলছেনা তাহলে ওর বয়ে নিয়ে আসা খাবার কেন খাচ্ছে এই নিয়ে কোকো তাকে বার বার খুচিয়ে চলেছে, যদি রেগেমেগে ফ্যালকন দুটো কথা বলে!
কিন্তু ফ্যালকন কোনো জবাব দেয়নি, কাগজে লিখে দিয়েছে খাবার যেহেতু শেহজাদী ওর জন্য পাঠিয়েছেন, খেতে কোনো সমস্যা নেই।
কোকো যদিও ফ্যালকনের হাতে পায়ে ধরেছিলো খাবারে থেকে ওকে যেন অন্তত একটু ভাগ দেয়। কিন্তু ফ্যালকন রহস্যময় ভঙ্গিতে খাবারের বক্স সুদ্ধ উধাও হয়ে গেছিলো চব্বিশ ঘন্টার জন্য। লুকিয়ে চুরিয়ে সব খাবার একাই শেষ করে তবেই সে দেখা দিয়েছে। কিন্তু এক কামরাতে থেকেও সে এখনো কোকোর সাথে কথা বলেনি।
বর্ডারে, সমুদ্র তীরে অবস্থিত লাইট হাউজের ভেতর নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলো কোকো। পাশেই ফ্যালকন টেবিলে বসে ল্যাপটপে কাজ করতে ব্যাস্ত। বর্ডারের সমস্ত সার্ভিলেন্স ক্যামেরা ওর নখদর্পনে, কিন্তু কয়েকটিতে হঠাৎ ত্রুটি দেখা দিয়েছে, সেগুলোই দেখার চেষ্টা করছে সে৷ কিন্তু কোকোর নাক ডাকার শব্দে কিছুতেই মনোযোগ নিয়ে আসতে পারছে না।
শেষ মেশ অধৈর্য হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ও। টেবিলের ওপর থেকে একটি মোটাসোটা বই ছুড়ে মারলো কোকর দিকে। তাতে কোকোর কোনো হেলদোল হলোনা, সে বইটা কোলের ভেতর টেনে নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো, ফ্যালকন মনে মনে কয়টা ভয়ানক গালি দিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,
“শালা গন্ডার!”
এমন সময় যান্ত্রিক শব্দে ফ্যালকন ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকালো। অ্যাশটনের থেকে মেইল। ক্লিক করে পড়তেই লাফিয়ে উঠলো সে। অভিমান ভুলে ছুটে কোকোর কাছে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি করতে করতে বলল,
“কোকো ভাইজান, উঠো, তোমার তো প্রমোশন হয়ে গেছে!”
ডাকাডাকি করেও কোকোকে উঠানো গেলোনা। ফ্যালকন অবশেষে ওয়াশরুম থেকে এক বালতি পানি নিয়ে এসে ছুড়ে মারলো কোকোর মুখের ওপর। কোকো ধড়মড়িয়ে উঠে বসতেই ফ্যালকন বালতিটা বগলদাবা করে নিয়ে ভ্রু তুলে উত্তেজিত স্বরে বলল,
“তুমি নাক ডেকে ঘুমোচ্ছো, ওদিকে সর্বনাশ হয়ে গেছে! দ্রুত উঠে রেডি হও, রেক্সার কার সাথে জানি এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে!”
কোকো সাথে সাথে বিছানা থেকে নেমে আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলিস? কখন? কার সাথে?”
পরক্ষণেই তড়িঘড়ি করে বালিশের তলায় রাখা ম্যাশেটি ছুরিটা খুঁজতে শুরু করলো। ফ্যালকন ওকে তাড়াতাড়ি থামিয়ে দিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলল,
“আরে আস্তে! কিছু হয়নি, মজা করছিলাম, আসলে অ্যাশটন খবর পাঠিয়েছিলো, তোমার প্রোমোশন হয়েছে, হে হে!”
কোকো ম্যাশেটিটা তখনি হাতে নিয়েছিলো, ফ্যালকনের কথা শুনে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
“শালা হাঁসের বাচ্চা, ভাতের হোটেল নিয়ে মজা করা তোর বের করছি দাঁড়া!
ফ্যালকন বালতি ফেলে দৌড়ে কোকোর চোখের আড়াল হয়ে গেলো মুহুর্তেই !
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, কোকোকে সেনাপ্রধান করার ব্যাপারটি কি আরেকবার ভেবে দেখবেন? না…. মানে…. আমি বলতে চাইছি ইতোপূর্বে রেড জোনের কোনো লাইকানকে এমন উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি, এতে যদি কন্ট্রোভার্সি সৃষ্টি হয়?”
সেনা ঘাটির সুসজ্জিত ভবনের বারান্দায় বসে বাইরে দেখছিলো মীর। পাশেই দাঁড়িয়ে জায়ান সাদি। তার কথা শুনে মীর উত্তর দিলো,
“আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা জায়ান। আমি আমার প্রজাদের যা বোঝাবো ওরা তাই বুঝবে, যা দেখাবো তাই দেখবে। এর বাইরে কিছু দেখবেনা, বুঝবেনা।”
জায়ান চুপ হয়ে গেলো।
শরীরের বেশ উন্নতি হয়েছে তার, বুকের হাড় গুলো মাংসে ঢেকে গেছে আবার, কিন্তু দুর্বলতা কাটেনি। তবুও আজ মীরের আদেশে সে এসে উপস্থিত হয়েছে। সেনাপ্রধান নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে মীর সবাইকেই এখানে চায়। ইতোমধ্যে অনেকেই এসে উপস্থিত হয়েছে বাকিরা খুব শীঘ্রই এসে পড়বে৷
কোকোকে খবর পাঠানো হয়েছে, তার শূন্যস্থানে অন্য কাউকে পাঠানো হবে। কোকো এসে উপস্থিত হলেই যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে৷
মাথার ওপর ঝা চকচকে সূর্য। শীতের ভেতর সূর্যের আলো বেশ আরাম দিচ্ছে। মীরের মুখের ডান দিকে আলো এসে পড়ছে, বেশ সুদর্শন দেখাচ্ছে তাকে৷
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, গোপন সূত্রে জানতে পেরেছি শেহজাদা ইলহানের কোনো এক দাসী গর্ভবতী। এবং খুব শীঘ্রই সন্তান ভূমিষ্ট হবে।”
“হবে না।”
কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলে উঠলো মীর, শকুনি চোখ তার সেনা ঘাটির সৈন্যদের ওপর ঘুরে ফিরে চলেছে। উত্তর শুনে জায়ান ঢোক গিললো, তারপর আবার চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মীরের পাশে।
সমুদ্রের নীল ঢেউয়ে ঢেলে পড়েছে সূর্যকিরণ। তারই বুক চিরে এগিয়ে চলেছে একটি বিলাসবহুল ইয়ট, সূর্যের আলোতে চকচক করছে তার ধাতব অংশ গুলো।
ইয়টের এক প্রান্তে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আনাবিয়া, চোখ জোড়া তার সমুদ্রের দিকে। অটোপাইলট মোডে সেট করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে সে। পিঠময় ছড়ানো সফেদ চুল বাতাসে উড়ে চলেছে। সূর্যের নরম, মিষ্টি রোদ এসে পড়ছে ওর চোখেমুখে।
আকাশে বাজপাখির তীক্ষ্ণ আওয়াজ শোনা গেলো তখন, আনাবিয়া তাকাতেই তড়িতে ইয়টের ওপর এসে নামলো বার্ডি। আনুগত্য জানিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“শেহজাদী, আমি আপনার কাছেই যাচ্ছিলাম। পথে আপনার ইয়ট দেখে এখানে চলে এসেছি।”
“কিছু হয়েছে?”
“জ্বি শেহজাদী, কোকো ভাইজানকে হিজ ম্যাজেস্টি বর্ডার থেকে ডেকে পাঠিয়েছেন, তাকে সেনাপ্রধানের দায়িত্বে বহাল করেছেন। ইতোমধ্যে হয়তো ইভেন্ট শুরু হয়ে গেছে। আমি একটু আগেই খবর পেয়ছি। লিও ভাইজান জানালেন।”
“ভালো খবর, কোকো এমন শক্তিশালী একটা জায়গা দখল করে রাখলে ইলহান চাচাজিকে বেশ ঝামেলায় পড়তে হবে৷ কোকোর লিডারশীপ স্কিল সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।”
“জ্বি শেহজাদী।”
বিরতি দিয়ে বার্ডি জিজ্ঞেস করলো,
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী, আপনি…. মানে এখন কোথায় যাচ্ছেন….. জানতে পারি?”
“রামাদিসামা তে।”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৫
দূর সমুদ্র অয়ানে তাকিয়ে উত্তর দিলো আনাবিয়া। বার্ডি আঁতকে উঠলো, শঙ্কিত গলায় বলল,
“কিন্তু সেখানে তো হিজ ম্যাজেস্টি আছেন, আপনি গেলে যদি কিছু হয়!”
“আমি তাঁর আশেপাশে যাচ্ছিনা বার্ডি, আমি যাচ্ছি ওয়াইল্ড শেডে, রামাদিসামার জঙ্গলে। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে।”
