Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৩১

যাত্রাপথ পর্ব ৩১

যাত্রাপথ পর্ব ৩১
মাশফিত্রা মিমুই

তখন সবে সন্ধ্যা। জাহিদ লাঠি হাতে মুরগি ঢোকাচ্ছে খোপে। নাজির বাড়ি পৌঁছেই দরজায় ঝুলন্ত তালাটা দেখে ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিলো। চিন্তার ভাঁজ পড়ল ললাটে। তার পিছুপিছু লতিফ, মিল্টন আর দুজন অচেনা লোক কিছু আসবাবপত্র বারান্দায় এনে রাখলো। তাকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্লান্ত স্বরে মিল্টন বললো,“তালা খুলেন, ভাইজান। একেবারে ঘরের ভিতরে রাইখা দিয়া যাই।”
নাজির বিরক্তি নিয়ে বললো,“চাবি আমার কাছে থাকলে কী আমি দাঁড়াইয়া থাকতাম?” পরক্ষণেই হাঁক ছেড়ে জাহিদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লো,“তোর ভাবি কই?”
মুরগিগুলো খোপে ঢুকিয়ে হারিকেনের আলোয় একে একে গুনছিলো জাহিদ। প্রশ্নটা তার গুনায় ব্যঘাত ঘটালো। খোপে তালা লাগিয়ে বললো,“জানি না। দুপুরেও তো বাড়িতেই দেখছিলাম।”

“তালা ঝুলে কহন থাইক্যা?”
“খেয়াল করি নাই।”
“তাইলে কী খেয়াল করোস, বদমাইশ? বাড়িত থাহোস কীয়ের লাইগা? তোর মায়রে ডাক।”
ধমক খেয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে সিঁড়ির কাছে গিয়ে চিৎকার করে ডাকলো সে,“আম্মা! নাজির ভাইয়ে ডাহে।”
মর্জিনা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ছেলের হাত থেকে হারিকেন নিয়ে ভালো করে সামনে দেখে প্রথমেই প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“এইগুলা কী? ও মা, এতকিছু!”
“আমার বউ কই?”
“আমি কেমনে জানমু?”
“তো কেডায় জানে?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“দুপুরেও তো দেখলাম তোর বড়ো চাচীর লগে রানছে বাড়ছে, তোর আব্বারে খাওয়াইছে। হেরপরে আমি তো গোসল সাইরা ঘরে গেলাম। বিকালে ওযু করতে বাহির হইয়া দেহি ঘরে তালা ঝুলে। আমার বারান্দা থাইক্যা চালতাগুলাও গায়েব। ফাঁক পাইয়া কেডায় জানি লইয়া গেছে। বড়োজনরে জিগা।”
উচ্চবাচ্য শুনে ফরিদাও বেরিয়ে এলেন। চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,“আমি এতক্ষণ এনেই বইয়া আছিলাম। কই যে গেলো মাইয়াডা? কাউরে দিয়া খুঁজতে পাঠামু তারও উপায় নাই।”
মর্জিনা মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করলেন,“সারাক্ষণ মুখ দিয়া মিছা কথা কয়। ফালতু মহিলা।”
ফরিদা নতুন আসবাবপত্র দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “এইগুলা আনতেই গেছিলি? এহন আবার অযথা খরচের কী দরকার আছিলো?”

নাজির এবার চিন্তায় পড়ল। তাই চাচীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। যাওয়ার আগে ভালো করে বলে গিয়েছিল, বাড়ি থেকে যাতে না বের হয়। তবুও মেয়েটা চলে গেলো কোথাও? সবচেয়ে বেশি রাগ হলো চাচীদের উপর। রাগত স্বরে বললো, “বাড়িত এতগুলা বেডি মানুষ থাকতেও একটা ছুডো মাইয়া দেইখা রাখতে পারেন না? যদি আমি আইজ বউ খুঁইজা না পাই তাইলে আমনেগো খবর আছে।”
“মাথা ঠান্ডা কর, নাজির।” ফরিদা বললেন।
নাজির লতিফের উদ্দেশ্যে বললো,“তুই এইখানেই দাঁড়া। আমি দেখি মহারানী কই গেছে।”
মিল্টন বললো,“আবার বাপের বাড়ি যায় নাই তো, ভাইজান?”
“একলা একলা যাইবো গা?”
“দেইখা আইমু?”

মর্জিনা সায় দিয়ে বললেন,“আমারো তাই মনে হয়। হয়তো বাপের বাড়ি গেছে।”
কথাটা শুনে রাগের পারদ তড়তড় করে বৃদ্ধি পেলো নাজিরের। মিল্টন ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “ভাইজান, আমি গিয়া লইয়া আইমু ভাবিরে?”
“না, তোরা দুইডাই বাড়িত যা। আমি গিয়া দেহি, যদি হাছাই ওইখানে পাই তাইলে!” বাকি কথাটুকু শেষ করল না নাজির। পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে লতিফ আর মিল্টনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে জাহিদের উদ্দেশ্যে বললো,“ঘর থাইক্যা টর্চ লাইট আইন্না দে। আমি না আওয়া পর্যন্ত এই জিনিসের কাছে বইয়া থাকবি। উল্টাপাল্টা দেখলেই ঠ্যাঙামু।”
জাহিদ দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে টর্চ লাইট এনে দিলো। নাজিরেরটা ঘরের ভেতরেই পড়ে আছে। লাইট নিয়ে ওভাবেই সে বেরিয়ে গেলো। বাকিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মায়া হলো মিছরির জন্য। মেয়েটার কপালে আজ দুঃখ আছে। ছেলেটার যা রাগ!

মাস্টার বাড়ির অন্দরে আনন্দ যেন ঠিকরে পড়ছে। বোনকে পেয়ে ভাইয়েরা কী করবে, কী খাওয়াবে তা নিয়েই হয়ে উঠেছে অস্থির। মাসুম কোত্থেকে যেন পোনা ধরে এনেছে। পোনা মাছ মিছরির ভীষণ প্রিয়। হলুদ রঙের বৈদ্যুতিক আলোতে খোলা আকাশের নিচের উনুনে সেই মাছ রাঁধতে বসেছেন দিলারা বেগম। ছেলে বুড়োরা উঠোনের মাচায় বসে খোশ গল্পে মেতে উঠেছে। সুজাতা, সিফাত করছে খেলা। সিঁড়িতে বসে জেসমিন আর পলির সাথে সাপ লুডু খেলছে মিছরি। পরপর দুইবার সাতানব্বইয়ের ঘরের সাপের মুখে পড়ে রেগে গেলো সে। অনিহা প্রকাশ করে বললো,“ধুর, আর খেলবোই না।”
“খেলতেই হইবো, গেইম না খাইয়া খেলা ছাড়লে চলবো না।”
পলির কথায় জেসমিনও সহমত পোষণ করল। তাদের এই সুন্দর মুহূর্ত থেকে ধ্যান সরাতে আচমকাই মূল ফটকের দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। নজরুল আলম ছেলে, ভাতিজাদের উদ্দেশ্যে হাঁক ছেড়ে বললেন,“দেখ তো কেডায় আইছে।”

তাদের মধ্য থেকে রুহুল উঠে গেলো। ফটকের দরজায় ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকানো। তালা ঝুলানো হয় একেবারে এশার পরে। নইলে শেয়াল ডাকে, উঠে আসে বাড়িতে। দরজা খুলতেই সামনের মানুষটিকে দেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে আঁধার নেমে এলো রুহুলের। জিজ্ঞেস করল,“কী চাই?”
“আমার বউ। কই সে?”
“জানি না।”
“কইলেই হইবো?”
ভেতর থেকে পিতার প্রশ্নে জর্জরিত স্বর ভেসে এলো, “কী রে কেডায় আইছে, রুহুল?”
“একটা পাগল।”

বলেই বিদ্রুপ করে হাসলো রুহুল। মুখের উপরেই দরজা বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়াস করল।
ছেলেটার এমন আচরণে নাজিরের মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো। বয়সে তারা সমবয়সীই হবে। হাত বাড়িয়ে শক্ত করে দরজাটা ধরে ফেলল নাজির। তাকে একপ্রকার ঠেলেঠুলেই ভেতরে প্রবেশ করল। রুহুল দাঁতে দাঁত পিষে ক্ষুব্ধ স্বরে বললো,“রাইতের বেলা মাস্তানি শুরু করছোস? আমারে ঠেইল্লা আমগো বাড়িতে ঢুকোস? ভয়ডর নাই?”
নাজির চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো,“আল্লাহ ছাড়া আর কাউরে নাজির ডরায় না।”
কথা শেষ করে দালানের দিকে তাকাতেই সিঁড়িতে বসা মিছরিকে দেখতে পেলো। দুজনের হাঁকডাকে উপস্থিত সকলেই তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এমনকি মিছরিও। ধীরে ধীরে অধরের মিষ্টি হাসিটি মিলিয়ে গেলো তার। কাশেম আলী বলে উঠলেন, “আরে, নাজির যে!”

নাজির আর সামনে এগোলো না। সেখানে দাঁড়িয়েই অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললো,“বাড়িত চলো।”
লোকটা যে রেগে আছে খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো মিছরি। তাদের এই দুই মাসের সংসারে এই লোকের রাগ সম্পর্কে ভালোই অবগত হয়েছে সে। তাই লুকিয়ে পড়ল বড়ো ভাবির পেছনে। মেয়েটির এমন কান্ডে নাজিরের রাগ আকাশ ছুঁলো। ইচ্ছে করল চুলের মুঠি ধরে কতক্ষণ পেটাতে। কিন্তু এই মুহূর্তে ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রেখে ডান হাতে নিজের ঘাড় চেপে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। সাবধান করে বললো,“ভালা কইরা কইতাছি বাড়ি চলো, বউ। মাথা কিন্তু এমনিতেই গরম।”

কাশেম আলী বললেন,“অনেকদিন পর আইছে তো তাই যাইতে চাইতাছে না। আইজকার রাইতটা এনেই থাকুক, নাজির। তুই ভিতরে আইয়া বস। মাথা ঠান্ডা কর। রাইতের খাওন খাইয়া তারপর ফিরবি।”
“আমি এনে বইতে বা খাইতে আসি নাই। আমনের মাইয়ারে জিগান, এইগুলা কোন ধরণের স্বভাব? আমি নাই এই সুযোগে কাউরে কিছু না জানাইয়া আইয়া পড়ছে। আইছে তো আইছে কিন্তু হাইনজা হওয়ার পরেও বাড়িত ফিরা যায় নাই। কত চিন্তা হইতাছিল বুঝে সে?” এবার মিছরির উদ্দেশ্যে বললো,“ঘরের চাবি কই? চাবি আর তুমি দুইডাই আইয়ো। কিছু কমু না।”
তবুও মিছরি এলো না। কাশেম আলীর কোনো কথাও নাজির শুনলো না। কথাবার্তা শুনে পারুল মাঝখানে বলে উঠলেন,“কয়দিন থাকলে সমস্যা কী? রান্না বসাইছি। দুগা না খাইয়াই যাইবো গা? আমার ছুডো মাইয়াডারে এমনিতেই তো কম অত্যাচার বাড়িত করো না।”

মহিলার কণ্ঠ থেকে যেন রাগ ঝরে পড়ল। কাশেম আলী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। বোকা মেয়ে মানুষ। কোথায় কী বলতে হয় জানে না। নাজির তার স্বরেই বললো,“কী অত্যাচার করছি আমনের ছুডো মাইয়ারে? কী রে, মিছরি? কী অত্যাচার করছি তোমারে? মারছি? নাকি না খাওয়াইয়া রাখছি?”
মিছরির এবার কান্না পেলো। তার মা টা একটু বেশিই বোঝে। এখন বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সত্যি সত্যি যদি মারে? তখন কে রক্ষা করবে তাকে? সেই ভয়ে আরো চুপসে গেলো জেসমিনের গায়ের সাথে। জেসমিন এক হাতে তাকে আগলে ধরলো। ননদের জন্য ভীষণ খারাপ লাগছে। তালেব বললো,“ঝামেলা করিস না, নাজির। মাইয়া বিয়া কইরা নিছোস দেইখা মগের মুল্লুক পাইয়া বসোস নাই। নাইওর শেষে সেই যে গেলি আর আইতে দিলি না আমার বোইনরে। বাড়ি থাইক্যা বাহির হইতে দেস না, আমগো কাউরে দেখা করতে দেস না। পাইছোসটা কী? এক গেরামে থাইক্যা নেতাগিরি দেহাইলে তো আর চলবো না।”

“বাড়ি থাইক্যা বাহির হইবো ক্যান? পাড়া বেড়ানির লাইগা? আর তগোরে কেডায় যাইয়া দেখা করতে নিষেধ করছে? মিছা মিছা দোষ দিবি না। মাইয়ার কথা মনে পড়লে ঠিকই যাইতি। বাহানা মারায়। এহন বাড়তি প্যাঁচাল না পাইড়া আমার বউ দে, যাইগা। না হইলে চুপ থাক। আমি নিজেই এই ইন্দুররে লইয়া যাইতে পারমু।”
মাসুম বসা থেকে গর্জে উঠলো,“আমগো বাড়ির মাইয়া দিমু না। যা তুই। যা করার কর গিয়া।”
“হ, সাজাইয়া গুছাইয়া শোকেজে ভইরা রাখ। কাবিন তো পরিশোধ করাই আছে। এহন শুধু তালাক দিয়া যাইগা।”
“দিয়া দে। এমনিতেও তোরে আমার পছন্দ না। আরো ভালা ঘরে ওর বিয়া দিমু।”

নাজিরের চোয়াল শক্ত হলো। কড়া কিছু বলার পূর্বেই আকবর মিয়া এসে হাজির হলেন সেখানে। চাপা হুঙ্কার দিয়ে নাতির উদ্দেশ্যে বললেন,“জবান সামলা, মাসুম। বেশি কথা কওয়া ভালা না।” দাদার গলা শুনে থেমে গেলো মাসুম। বৃদ্ধ এবার পুত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন,“আর কয়দিন পর এই বাড়ির কর্তা হবি অথচ পোলাগো দুইডা ধমক দিয়া থামাইতে পারোস না? কোনে কী কইতে হইবো হেইডাও তো জানোস না দেহি। আমার তো এহন বংশ লইয়া চিন্তা হইতাছে।”
নজরুল আলম মাথা নিচু করে বসে রইলেন। কাশেম আলী সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করলেন কিন্তু আকবর মিয়া হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন তাঁকে। নাতনির উদ্দেশ্যে বললেন,“বাপের বাড়িত আইছো ভালা কথা। না জানাইয়া আসা, স্বামী ডাকনের পরেও অন্যের পিছনে লুকাইয়া থাকা কোন ধরণের শিক্ষা? তোমার স্বামী কী তোমার গায়ে হাত তোলে?”

দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায় মিছরি।
“খাওনের কষ্ট দেয়?”
এবারো এক উত্তর। আকবর মিয়া রেগে গেলেন বোধহয়,“তাইলে এমন কইরা আছো ক্যান?”
মিছরি এবার বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো। তা দেখে নাজিরের ভেতরটা ক্ষোভে কাঁপলো। সে ডাকার পর মেয়েটা অন্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল। আর দাদার কথায় দাঁড়িয়ে গেলো? তাও সবার সামনে? তার মানে স্ত্রী তাকে ভয় পায় না, গুরুত্বও দেয় না!
মেয়েটার সাথে কী একটু বেশিই কোমল আচরণ করে ফেলেছে নাজির? হয়তো। নইলে সবার সামনে নাজির শাহকে অপমান করার দুঃসাহস কোথায় পেলো সে? শত্রু বাড়ির মেয়ের জন্য মায়া দেখানোটা হয়তো তার জীবনের আরেকটি ভুল ছিল। যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো মিছরি। আকবর মিয়া নাজিরের উদ্দেশ্যে নরম হয়ে বললেন,“মাইয়া মানুষ, বয়স কম। তাই একটা ভুল কইরা ফেলাইছে, নাজির। রাগ করিস না। তুই তো ওর থাইক্যা বড়ো, একটু মানাইয়া নে। যাইস না, কথা আছে তোর লগে। রাইতে একলগে খামু।”

নাজিরের ধারালো দৃষ্টি এখনো মিছরির দিকেই স্থির। অনিহা প্রকাশ করে বললো,“সারাদিন পর এইমাত্র বাড়িত ফিরছি। ঘরে তালা দেইখা এইডারে খুঁজতে খুঁজতে এনে আইছি। এহন বসা বা খাওয়ার সময় নাই। অনেক জিনিসপাতি বাহিরে রাইখা আইছি। হেইগুলা ঘরে ঢুকাইতে হইবো। হেরপর আরো কাম আছে আমার।”
আকবর মিয়া আর জোরাজুরি করলেন না। এই বয়সী ছেলেদের বেশি জোরাজুরি করা ভালো না। হিতে বিপরীত হয়। সৈয়দুন নেছা সব কথা শুনেছেন। নাতনির উদ্দেশ্যে বললেন,“সোয়ামির লগে বাড়িত যাও। আবার দিনের বেলা অনুমতি নিয়া আইয়ো। তহন অনেকদিন থাকবা।”
মুখ ভার করে এগিয়ে এসে সম্মুখে দাঁড়ালো মিছরি। ওড়নার আঁচল থেকে চাবিটা খুলে বাড়িয়ে দিলো নাজিরের দিকে। নাজির সেটা ধরলো না। ফটকের দিকে যেতে যেতে বললো,“চলো।”

পারুল পুনরায় বলে উঠলেন,“অত্যাচার না করলে আমার মাইয়ার হাত পুড়ছে কেমনে? এই কয় মাসে এমন শুকাইয়া গেছে কেমনে? শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর সময় তো তরতাজা মাইয়া পাঠাইছিলাম।”
পথিমধ্যে থেমে দাঁড়ালো নাজির। ঘুরে তাকালো শাশুড়ির দিকে। পুত্রবধূর কথায় সৈয়দুন নেছা চোখ রাঙালেন। কিন্তু পারুল আজ যেন আর ভয় পেলো না। এই বিয়েটা নিয়ে ছেলেদের মতো তাঁরও শুরু থেকেই অমত ছিল। বিশেষ করে, ভাইয়ের শিক্ষিত যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলে রেখে কেন শত্রুর ঘরের চাষাভুষার কাছে মেয়েটাকে বিয়ে দিতে হবে? ভেবে পান না তিনি। নাজির শান্ত ভাবেই প্রত্যুত্তরে বললো, “সংসারের কাম করতে গেলে কতকিছুই হয়। আমনেগো কহনো পুড়ে নাই? এত দরদ উতলাইয়া পড়লে বিয়া দিছিলেন ক্যান? আমি বা আমার চাচারা আইছিলাম?”
“আমি চাই নাই। এর থাইক্যাও ভালা ঘরের লাইগা আমার মাইয়ার সম্বন্ধ আইছিলো।”

“তো দেন নাই ক্যান? দিলেও কী তারা ঘাড়ে বসাইয়া খাওয়াইতো নাকি? মা হইছেন কিন্তু মাইয়া দেইখা রাখতে পারেন না, ঘরে ডুইকা আরেক ব্যাডায় খারাপ ভাবে ছুঁইয়া যায়, গেরামের সব ব্যাডার মাঝখানে দাড়ঁ করাইয়া চরিত্র লইয়া প্রশ্ন ওঠে, গোষ্ঠীর থাইক্যা আলাদা কইরা দিয়া রাখছিলেন নানার বাড়ি, ঘরের কোনো কাম পারে না, সংসার কী বোঝে না, কেউ মুখের উপর কিছু কইলে কান্দে। আবার আমার উপরে অভিযোগ তোলেন? বিয়া হইছে মানে বাপের বাড়ির সব অধিকার শেষ। এহন নাজিরের বউ নাজির কী করবো না করবো সেইসব নাজিরের ব্যাপার।”
নজরুল আলম বললেন,“মানলাম দোষ আমগো। কিন্তু এহন তুই বিয়াইত্তা, বউ আছে। সংসার কী আলাদা করার দরকার না?”

“সংসার তো আলাদাই।”
“হাঁড়ি তো আলাদা না। এহনো চাচাগো লগেই খাস।”
নাজির বিদ্রুপ হাসলো। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললো, “দেহো কী কয়! বাপের বাড়ির কথায় ফাল পারলে জীবনেও সংসার করতে পারবা না।”থেমে নজরুলের কথার উত্তর দিলেন,“আমনের কথায় এহন যদি হাঁড়ি আলাদা করি তাইলে আমনেগো এই আকাইম্মা মাইয়া খাইতে পারবো? একটু হাত পুড়ছে তাতেই গা জ্বলতাছে, পরে তো শরীর পুড়বো। কোনো কামকাজ পারে না। মাছ ভাজতে কী লাগে তাও জানে না। তাই এইসব জ্ঞান আমারে দিয়েন না। ঘর, বাহির কেমনে সামলাইতে হয় নাজির শাহ খুব ভালা কইরাই জানে।”

কথা শেষ করে নাজির আর দাঁড়ালো না। ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেলো। মিছরিও স্বামীর পিছুপিছু দৌড়ালো। সৈয়দুন নেছা পুত্রবধূর উপর চেঁচালেন,“কেমন লাগছে জবাব? মাইয়া বিয়া দেওয়ার লাইগা তোমারও কম কুড়কুড়ানি আছিলো না। মাইয়া জামাইয়ের লগে কেমনে কথা কইতে হয় জানে না। এহন সেই ঝাল মাইয়ার উপরে মিটাইলে কী করবা? বাড়িত পুরুষ মানুষ থাকাকালীন হেগো উপরে দিয়া কথা কওনের স্বভাব বাদ দাও। আগেই কইছিলাম, মাইয়াডারে সংসার শিখাও। কিন্তু না! বেশি আদর দিয়া ফার্মের মুরগি বানাইছে।”

তিনি ঘরে চলে গেলেন। পারুল কাঁচুমাচু মুখ করে বসে পড়লেন জায়ের পাশে। একপর্যায়ে আকবর মিয়াও আর দাঁড়ালেন না সেখানে। মুহূর্তেই আনন্দঘন পরিবেশটা হয়ে উঠলো অত্যন্ত গম্ভীর।
বাড়ি ফিরে হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো মিছরিকে। নাজির কাউকে বাঁধা দিলো না। তালা খুলে জাহিদ আর নাজমুলকে নিয়ে জিনিসপত্রগুলো ভেতরে ঢুকিয়ে জায়গা মতো রাখলো।
মাস দেড়েক আগে স্ত্রীর আবদারে তার কয়েকদিন পরেই নতুন আলমারি আর ড্রেসিং টেবিলের বায়না দিয়ে এসেছিল সে। শোকেজের বায়না অবশ্য বিয়ের আগেই দিয়ে এসেছিল। শুধু সময়ের অভাবে আনতে যেতে পারেনি। মিছরি সেসব দেখে বেশ অবাক হলো। জিজ্ঞেস করল,“এগুলো আনতেই তবে শহরে গিয়েছিলেন?”

নাজির উত্তর দিলো না। রাগলে তার মুখের ভাষা ঠিক থাকে না। মাঝেমধ্যে হাতও চলে। কিন্তু নারীদের গায়ে সে হাত তোলেনি কখনো। তাই পরনের পোশাক বদলে একটা লুঙ্গি পরল। গামছাটা নিয়ে কলপাড় চলে গেলো গোসলের উদ্দেশ্যে। মিছরি মুখ ভার করে দেখতে লাগলো সব। লোকটার পছন্দ আছে বলতে হয়। এসব সে নিজের মতো করে গোছাবে। তার আগে হারিকেনে কেরোসিন তেল ভরে আগুন জ্বালালো। শ্বশুরের ঘরে আলো দেওয়া হয়নি। তার আগমনের পর এসমস্ত কাজ থেকে সকলে যেন অবসর নিয়েছে।

সেই রাতটা কোনোভাবে কাটলো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো কথা হলো না। সকালে কথাটা তুললেন আমিরুল শাহ।
“তোর বউ নাকি কাইল বাপের বাড়ি পলাইয়া গেছিলো?”
সাদা ছাগলটা দুদিন আগেই তিনটা বাচ্চা দিয়েছে। সেগুলোই এখন বাড়ি জুড়ে লাফালাফি করে। নাজির তাদের জন্য ফিডার কিনে এনেছে। সেটা দিয়েই কোলে বসিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছে একটাকে। মা ছাগলটা কোনো কারণে বাচ্চাদেরকে পর্যাপ্ত দুধ দিচ্ছে না। খাওয়াতে খাওয়াতে জবাব দিলো,“পলাইবো ক্যান?”
“না কইয়া যাওয়া তো পলানোই কয়।”
“বাড়তি কথা কইয়া মেজাজ খারাপ কইরেন না।”
“তোর সব মেজাজ তো আমগো লগেই। আমার কথা হুনলে ভালা একটা মাইয়া বিয়া করতে পারতি। এহন বইয়া বইয়া আফসোস কর।”

“আমনের কাছে গিয়া আফসোস করছিলাম?”
“তা কী আর করবি? লজ্জা আছে না।”
“বাড়িত কী করেন? কাজকাম নাই?”
“সামিউলের লগে পারভেজরে পাঠাইছি। আইজ আমার ছুটি।”
এই লোকের সাথে তর্কে জড়ালো না নাজির। চেঁচিয়ে ডাকলো,“মিছরি!”
মিছরি দৌড়ে এলো,“বলেন।”
“সারাক্ষণ ঘরে বইয়া থাকোস ক্যান, জমিদারের মাইয়া? তোর জামাই কী মহারাজা যে বইয়া বইয়া খাবি? গোয়াল ঘর পরিষ্কার কর গিয়া।”

“আমি?” অবাক হলো মিছরি।
“তো কেডা? আমি? যা দৌড়া। ওই যে ঝাটা আছে। প্রথমে ঝাড়ু দিয়া সব গোবর ওই পাতিতে উঠাবি। পশ্চিম পাশে একটা গর্ত দেখছি। ইন্দুরে করছে নাকি সাপে করছে বুঝতাছি না। ওই গর্তে বেশি বেশি মাটি ভইরা লেইপা দিবি‌। সবশেষে গোবর দিয়া গইট্টা দিবি।”
“গইট্টা কী?”
“শুদ্ধ ভাষায় কী কয়? মনে হয় ঘুঁটে।”
গা গুলিয়ে এলো মিছরির। এসব কাজ সে করবে? কখনোই না। নাক সিঁটকে বললো,“ছিঃ! এসব আমি করতে পারবো না। অন্যকিছু বলেন।”

যাত্রাপথ পর্ব ৩০

“যা কইছি তাই করবি। না করলে কপালে দুঃখ আছে। অত্যাচার কারে কয় আইজ তোরে দেখামু। আদর, সোহাগে রাখছিলাম তো তাই ভালা লাগে নাই। এহন বুঝ মজা। এই চাচী! ওরে লইয়া যান। সব কাম বুঝাইয়া দেন।”
টিনের চাল থেকে কাস্তে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো নাজির। মিছরি মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তার অবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসলেন কলিমের মা। তাড়া দিয়ে বললেন,“আইয়ো, তোমারে কাম বুঝাইয়া দিয়া আমার আবার ভিটার পিছনের দিক লেপতে হইবো। ফাডল ধরছে।”

যাত্রাপথ পর্ব ৩২