Home Remedy Remedy part 17

Remedy part 17

Remedy part 17
মীরা রায়াদ

ঝুম কাদঁছে, খুব কাদঁছে। আম্মার কথা তার ভীষণ মনে পরে। কতোগুলো বছর হলো আম্মাকে দেখে না। আম্মার কবর ছুঁতে পারে না। এতোগুলো দিন সে এই কষ্ট একা বয়ে বেরিয়েছে। কাউকে বলতে পারেনি। এর আগে তার আপন বলতে যে কেউ ছিল না।
শাইয়ান ঝুমকে ছেড়ে উঠে বসলো। ঝুম অবাক হলো। বড় বড় চোখ দুটোয় পানিতে পরিপূর্ণ। মনে ভয় বাসা বাঁধছে। শাইয়ান কি তাকে ভুল বুঝবে এখন? দূরে সরিয়ে দিবে? আর ভালবাসবে না? শব্দ করে নিঃস্ব মানুষের মতো কেঁদে দিলো এবার ঝুম। সেও উঠে বসলো। দুহাতে চোখমুখ চেপে ধরে বলল –

” আমি আপনাকে আগেই সব বলতে চেয়ে ছিলাম ডক্টর। আমার এই অতীতের কথা বিয়ের আগেই বলতে চেয়ে ছিলাম। আম্মাকে বারবার বলে ছিলাম আমার কিছু বলার আছে, কিন্তু সে শোনেনি। আম্মা বলে ছিল আগে বিয়ে করতে। বিয়ের পর আপনাকেও বলতে চাইলাম কিন্তু পারিনি। বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে ঠকাইনি ডক্টর। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমাকে দূরে ঠেলে দিবেন না।”
ঝুমের কন্ঠে আকুতি। শাইয়ান নির্বিকার তাকে দেখলো। হাত বাড়িয়ে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে দিলো ঝুমকে। এমনটা করায় ঝুম ভরকালো। অনেক বেশিই ভরকালো। সে পানিপূর্ণ চোখে শাইয়ানের সাথে দৃষ্টি মিলিয়ে বুঝতে চাইলো শাইয়ানের মনের খবর। কিন্তু আফসোস, বরাবরের মতো এবারও সে বুঝলো না। শাইয়ান ঝুমকে কোলে নিয়ে ওভাবেই বেডের হেড বোর্ডের সাথে মাথা এলিয়ে দিল। আলতো হাতে ঝুমের মাথাটা নিজের বুকের বা পাশে নিয়ে বলল –

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” আমি আগে থেকেই জানতাম।”
ঝুম ভীষণ অবাক হলো। মাথা তুলে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু শাইয়ান তাকে মাথা সরাতে দিলো না। বা হাতটা ঝুমের কোমরে রেখে ডান হাত দিয়ে ক্ষনে ক্ষনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল –
” যেদিন হসপিটাল থেকে বাড়িতে গেলাম ঐদিনই আপনার ব্যাপারে খোজ লাগাতে লোক লাগিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমি তখনো জানতাম না আপনি এইদেশের না। পরবর্তীতে ইনফরমেশন পাওয়া যায় আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। ভীষণ অবাক হয়ে ছিলাম। ভালো লাগলো তো লাগলো বাংলাদেশী মেয়েকেই লাগলো। কি ভাগ্য আমার। এরপর আপনাদের দেশের সেনাদের সাহায্য নিতে হয় আমার। তারাই মূলত আপনার ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সাহায্য করে। যদিও এতো ডিটেইলসে জানতাম না। তবে মেজর ব্যাপার গুলো জানা ছিল। আম্মাও জানতো সবটা( ঝুমের চোখে চোখ রেখে বলল শাইয়ান)। মূলত এই কারণেই বিয়ের দিন আপনার কথা শুনতে চায়নি। আম্মা আপনাকে ভীষণ ভালবাসে আরীবা। নিজের কাছে রাখার জন্য একটু স্বার্থপর হওয়া কি অন্যায়?”

ঝুমের চোখে পানি। সে দুদিকে মাথা নেড়ে তার উত্তর বুঝিয়ে দিলো। শাইয়ান মৃদু হেসে তাকে আরো কিছুটা কাছে টেনে নিলো। নাকের ডগায় ছোট ছোট চুমু খেয়ে বলল –
” আপনি জানেন না এখানে সবাই আপনাকে কতো ভালবাসে। ঈশালকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত তাই না? সে আপনাকে সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে না আসলে আজ আমি আপনাকে এতো কাছে পেতাম কিভাবে?”
ঝুম বিস্মিত। তার চোখ তুলনামূলক বেশি বড় লাগলো।
” আপনি কি করে জানলেন? আমরা তো কাউকে বলিনি এই ব্যাপারে।”
শাইয়ান দেখলো তার অবুঝ বউকে। ঘনিষ্ট হয়ে চোখের পাতায় ঠোঁট ছুঁয়ে বলল –

” ঈশালকে একটু ভয় দেখিয়ে ছিলাম। বাকিটা সে নিজে বলেছে। এমন লাইম এক্সকিউজ বিশ্বাস করার মতো?”
সে ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো। ঝুম মুখ ফুলালো। সে আগে এমন মোটেই ছিল না। কিন্তু এই লোকের কাছে আসলে কেমন বোকা বোকা কাজ করে। প্রিয় মানুষের কাছে বুঝি সব মেয়েরাই বাচ্চা হয়ে যায়?
ঝুম অনুভব করলো শাইয়ান ধীরে ধীরে আরো ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করছে। ঝুমের খোলা চুল পিঠ থেকে এখন কাঁধ ছড়িয়ে সামনে এলোমেলো ভাবে স্থান করে নিয়েছে। শাইয়ান একের পর এক ঠোঁটের আবেশিত ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে পিঠ, কাধ, গলায়। ঝুম চোখ বুঝে অনুভব করে গেলো সবটা, কিন্তু বাঁধা দিলো না। শুরুতে শাইয়ান নরম আদরে আগলে নিলেও এখন সে রীতিমত অত্যাচার করছে ঝুমকে। ব্যাথায় ঝুমের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সামান্য আওয়াজ করে বলল –

” ডক্টর ব্যাথা পাচ্ছি।”
শাইয়ান থেমে গেলো। মাথা নামিয়ে ঝুমের পিঠের সাথে তার কপাল মিশিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে বার কয়েক নিজেকে বুঝ দিলো। তারপর চোখ তুলে ঝুমের গলা, কাঁধে চোখ বুলিয়ে দেখলো ক্ষতগুলো। আত্মতৃপ্তিতে ভোরে গেল মনটা তার। ক্ষতগুলো দেখলে মনে হয় ঝুম শুধু তার। একমাত্র তার। দিন দিন সে ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছে ঝুমের জন্য। যা ঝুমের ক্ষেত্রে বাজে প্রভাব ফেলছে। ঝুম কাদঁছে। ব্যাথা করছে জায়গাগুলোতে। লোকটা এতো জোরে কামড় দেয়, ভীষণ জ্বলে তখন। আস্তে দিলে কি হয়?
শাইয়ান তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল –
” বেশি লেগেছে?”
ঝুম যেন আদুরে বিড়াল ছানা। আল্লাদী কন্ঠে বলল –
” হুম।”
শাইয়ান মাথা নামিয়ে ঝুমের কানের সাথে ঠোঁট মিলিয়ে নিল। তার নিশ্বাসের গতি বেহাল। ঝুম বুঝলো কি! হয়তো। তাইতো মেয়েটা শাইয়ানকে জড়িয়ে ধরে আরো একটু বুকের মাঝে ঢুকে গেল। শাইয়ান নিচু স্বরে থেমে থেমে বলল –
” আর একটু ব্যাথা দিই, প্লীজ?”
ঝুম মাথা নাড়িয়ে না বলল। কিন্তু শাইয়ান বুঝি শুনবে তার কথা? কখনো না। সে শুনলোও না। ঝুমকে কিছু বলতে না দিয়ে নিজের মর্জি মতো কাজ করে গেল।

সন্ধ্যার পর পর শাইয়ান ঝুমকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো। মেয়েটার শরীর একদম ভালো নেই। ২/৩ দিন ধরে তার ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে! তারওপর শাইয়ানের অত্যাচারে আরো খারাপ অবস্থা। কোনো ভাবেই সে এখন বের হতে চায়নি, কিন্তু শাইয়ান শুনল না। ঝুমের এখন হাটা চলা করা দরকার। তাছাড়া হসপিটালে গিয়ে ব্লাড স্যাম্পল দিতে হবে টেস্ট করাতে। সব মিলিয়ে জোর করে নিয়ে বের হলো। সেই থেকে ঝুম কথা বলছে না তার সাথে। এই হয়েছে আর এক জ্বালা। যখন থেকে মেয়েটা বুঝেছে শাইয়ান ঝুমকে অসম্ভব ভালবাসে, সেই থেকে এই মেয়ে কথায় কথায় মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। কথা বলে না। আর ঝুম কথা বন্ধ করলে শাইয়ান পানি ছাড়া মাছের মত ছটফট করে। জ্বালা, যন্ত্রণা যতো আছে দিয়ে যাচ্ছে ঝুম। বেচারা শাইয়ান বউকে কিছু বলতেও পারে না।

হসপিটালে ব্লাড দিয়ে তারা বেরিয়ে গেলো কাছে কোথাও ঘুরে কিছু খেয়ে নিবে তাই। ব্লাড দেয়ার সময় ঝুমের হাজারটা প্রশ্ন কেন দিবে? কি হয়েছে তার? দরকার কি? শাইয়ানের কান ব্যাথা করে দিয়েছে একদম। আগে তো এতো কথা বলতো না। তাহলে এখন বলে কেনো? শাইয়ান বুঝতে পারে না বউটা কি তার বদলে গেলো নাকি?
শাইয়ান ঝুমকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট গার্ডেনে গেল। তাদের আবাসস্থল থেকে এটি খুবই নিকটে। যেহেতু ঝুমের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল তাই শাইয়ান আর দূরে কথাও গেলো না। এমনকি বাইরে খাওয়ায় চিন্তাও বাদ দিলো। ঝুম আসলেই আর পারবে না বুঝতে পরলো। তাই জোর না করে কাছে পিঠে নিয়ে গেল। যেহেতু রাত হয়ে গেছে তাই গার্ডেনে ঢুকতে শাইয়ানকে নিজের আইডি কার্ড দেখাতে হলো। খুবই রেস্ট্রিক্টেড এরিয়া। নিরাপত্তার দিক থেকে ভীষণ সচেতন। ঝুম এতক্ষন বিরক্ত হলেও সামনে হাজারো ফুল দেখে তার বিরক্তি হওয়ায় মিলিয়ে গেল। গার্ডেনের চারিদিকে ফুলের সমহার। এতো এতো ফুল একসাথে ঝুম কখনো দেখেনি। শাইয়ানকে ফেলেই সে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে গেলো। শাইয়ান এলো তার পিছুপিছু। গার্ডেনের মাঝে বরাবর একটা বড় ঝর্না।

রাতের আধারে চারিপাশের রং বেরঙের আলোতে তা দেখতে আকর্ষণীয় লাগছে। ঝুম লক্ষ্য করলো একপাশে বাচ্চাদের জন্য খেলার স্পেস রয়েছে। সেখানে দোলনা দেখে পা বাড়ালো সে। আস্তে গিয়ে দোলনায় বসে ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো। এতক্ষন হাঁটতে তার কি ভীষণ কষ্টটাই না হলো। শাইয়ান ঝুমের পিছনে দাঁড়িয়ে হালকা হাতে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিয়ে গেলো। আরামে ঝুমের ঘুম পেয়ে গেল যেন। সে মাথাটা পিছনে শাইয়ানের পেটের সাথে এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। শাইয়ান দৃষ্টি এদিক থেকে ওদিক নিয়ে দেখলো তারা ছাড়াও গুটি কয়েক মানুষ এখানে রয়েছে। সবাই নিজের ফ্যামিলি নিয়ে এসেছে। কারো কারো সাথে বাচ্চা দেখে সে ঝুমের দিকে চাইলো। কিছু একটা ভেবে নীরবে হাসলো। মাথা নামিয়ে ঝুমের মাথায় চুমু খেয়ে আবার দোল দিতে লাগলো। শাইয়ানকে আশ্চর্যের চরম সীমায় পৌছে দিয়ে ঝুম ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছে। শাইয়ান অবাক হওয়ার অবকাশ পেলো না।

এই মেয়েকে নিয়ে সে ফ্যামিলি প্ল্যানিং করার চিন্তা করছিল এতক্ষন? এ নিজেকে সামলাবে নাকি তাদের বাচ্চাকে? ঝুম ক্লান্ত জেনেও তাকে জোর করে নিয়ে এসে সে ভুল করেছে বুঝতে পরলো। তাছাড়া সে যা ভাবছে তা ঠিক না। ঝুমকে আরো সময় দেয়া উচিৎ মানিয়ে নিতে। শাইয়ান আরো কিছুক্ষন ওভাবে দোল দিলো ঝুমকে। ঘুম গাঢ় হয়েছে বুঝতে পেরে দক্ষ হাতে কোলে তুলে নিলো তার বউকে। ঝুম নিজের সব থেকে আস্থার স্থানটা পেয়ে ঘুমের মাঝে দুহাতে গলা জড়িয়ে মুখ গুঁজে দিলো শাইয়ানের গলায়। ধড়ফড়িয়ে উঠলো শাইয়ানের বুকটা। তার এখন আবার আদর আদর পাচ্ছে। মনে মনে ভেবে ফেলল কোয়ার্টারে ফিরে ঝুমকে সে ছাড় দিবে না। বদ্ধ উন্মাদ করে দিয়েছে সে শাইয়ানকে। যদিও সে ভেবে ছিল ফিরে মেয়েটার সাথে কিছু একটা করার কিন্তু পরবর্তীতে আর মন সায় দেয়নি। ক্লান্তিতে ঘুমন্ত মেয়েটাকে দেখেই তার রাত শেষ হলো। না হলো খাওয়া আর হলো ভালোবাসা। শাইয়ান পুরোটা রাত অভুক্ত রইলো। অথচ তার পাশেই পাষাণী মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমাল।

আজ শাইয়ান হসপিটালে ডিউটিতে গিয়েছে। ঝুম কোয়ার্টারের এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে বর্তমানে একা। শাইয়ান তাকে নতুন একটা ফোন এনে দিয়েছে। ফোন পাওয়ার পর পরই সে তার অ্যাসিস্টেন্টকে ফোন লাগিয়ে ছিল। ওখানকার অবস্থা খুব সচনীয় শুনে ভীষন চিন্তায় পরেছিল ঝুম। পরবর্তীতে মেহেরুন্নেসার সাথে কথা বলে কীভাবে কি করলে ভালো হবে তা নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা করেছে। তাছাড়া ঝুম তার বিথী আন্টিকে ফোন দিয়ে বিয়ের কথা জানিয়ে দিয়েছে। শুরুতে সে চিন্তিত হয়ে ছিল। তারপর যখন মেহেরুন্নেসা নিজ দায়িত্বে তার সাথে কথা বলল, তখন সে নিশ্চিন্ত হলো। ঝুমের জন্য মেহেরুন্নেসা সব সমস্যার সমাধান। আম্মা চলে গেলেও আম্মার মতো আগলে রাখার জন্য কিছু মানুষকে আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা তার জন্য ঠিকই পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ঝুম ভেবেছে সে আজ রান্না করবে। শাইয়ানকে যাওয়ার সময় বলেও দিয়ে ছিল যে আজ সে নিজ হাতে রান্না করে লাঞ্চ হসপিটালে নিয়ে যাবে। শাইয়ান দ্বিরুক্তি করেনি। ঝুমের কথা মেনে নিয়েছে। শুধু বলেছে সাবধানে করতে। তার টেস্টের রিপোর্ট আজ পেয়ে যাবে বলেও জানিয়েছে শাইয়ান। ঝুম মনোযোগের সাথে রান্না করছে। মাঝারি আকারের চিংড়ি ভুনা, ঝাল ঝাল করে গরুর গোশত, কচু শাক দিয়ে ইলিশ মাছ আর ঘন করে মুশুর ডাল। সবটাই বাঙালি খাবার করেছে সে। এখানে কচু শাক খুঁজে পেতে ভালই কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু কি বা করার ছিল? আসার পর থেকে সে এদের এসব বিরিয়ানি টিরিয়ানি খেতে খেতে অতিষ্ট। পাকিস্তানিরা বিরিয়ানি, নেহারি, কাবাব ছাড়া কিছু বোঝে না। অথচ ঝুমের তো চাই বাঙালি খাবার যা এখনে পাওয়া দুষ্কর। তাই আজ সে নিজের পছন্দের খাবার রেঁধেছে। শাইয়ানকেও ধরে বেঁধে খাওয়াবে। বাংলাদেশের জামাই হয়েছে তারও তো বোঝা উচিত বাংলাদেশীরা কি কি পছন্দ করে।

রান্না শেষে গোসল করে সে তার শরীরে সিদুর রঙ্গা একটি শাড়ি জোড়ালো। লাল রংটা মেয়েটার গায়ে এতো বেশি সুন্দর মানিয়েছে বলার বাইরে। শাইয়ান দেখে কি বলবে? ঝুম জানে, সে শাড়ি পরলে শাইয়ান নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। তাইতো এই বেশ নিয়েছে। সারাদিন তাকে জ্বালানো তাই না? আজ দেখবে হসপিটালে কিভাবে নিজেকে সামলায়। নিজের মনে ভেবে মিটিমিটি হাসলো সে। চোখে গাঢ় করে কাজল টেনে ভেজা চুল গুলো বেঁধে ফেলল। আঁচলটা ভালো করে কাঁধের ওপর জড়িয়ে খাবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শাইয়ানের উদ্দেশ্যে। বেশি দূরে না হলেও ঝুমের যেতে যেতে ১৫ মিনিট লেগে গেল। এখন সে মোটামুটি হসপিটাল, ক্যান্টনমেন্ট এরিয়া ও কাছের কিছু স্থান সম্পর্কে অবগত। শাইয়ান তাকে নিজ দায়িত্বে চিনিয়েছে। আজ আর হসপিটালের গার্ড তাকে বাধা দিল না। উল্টো সন্মান প্রদর্শন করে ভিতরে যেতে দিলো। হসপিটালের রিসিপশনে ২ জন মেয়ে ও ২ জন পুরুষ বসে। ঝুম গিয়ে একটি মেয়ের কাছে শাইয়ানের চেম্বারের কথা জানতে চাইলে সে দেখিয়ে দিলো। ধন্যবাদ দিয়ে ঝুম পা বাড়ালো ৩ তোলার দিকে। সাদা দেয়ালের মাঝে ৭ ফুটের একটি সাধারণ দরজা। তার ওপর বড় বড় করে লেখা –

“Maj. Dr. Shaiyaan Rehman Ansari
MBBS (AMC), FCPS (Psychiatry)
Consultant Psychiatrist
Specialist in PTSD, Trauma & Combat Mental Health
Pakistan Army Medical Corps”
গর্বে ঝুমের চোখে পানি চলে এলো। লোকটা ছোট থেকে একা একা লড়ে গেছে তাও পথভ্রষ্ট হয়নি। যেখানে অন্য ছেলে – মেয়েরা বাবামায়ের ছত্র ছায়ায় থেকেও ভূল পথে পা বাড়ায় সেখানে শাইয়ান একা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। চোখের কোণের পানি মুছে ঝুম পাশে রাখা চেয়ারগুলোর একটিতে বসলো। শাইয়ান এখনো রোগী দেখছে বলে সে বিরক্ত করলো না। খাবারের বক্সটা কোলের ওপর রেখে এদিক ওদিক দেখতে লাগলো। আশেপাশের স্টাফরা তাকে দেখে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে। যা ঝুমকে অসস্তিতে ফেলল। কিছুক্ষন পর শাইয়ানের অ্যাসিস্টেন্ট ছেলেটি বেরিয়ে এলো। সাথে তার আরো দুজন লোক। এরা বোধ হয় পেশেন্ট। ছেলেটি কিছু কাগজ তাদের বুঝিয়ে দিয়ে অন্য একজন রোগীকে ডেকে ভিতরে পাঠিয়ে দিল। নিজেও ঢুকতে গিয়ে ঝুমকে দেখে সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে বলল –

” ম্যাম আপনি এখানে? বাইরে বসে আছেন কেন ম্যাম? স্যার জানতে পারলে রাগ করবে আমার ওপর। আপনি এসেছেন আগে বলবেন তো আমায়?”
প্রথম যেদিন হসপিটালে এসেছিল ঝুম সেদিন এই ছেলেটিকে দেখেছিল শাইয়ানের সাথে। দেখে মনে হলো বয়সে তার থেকে ছোট কিংবা সমান হবে। ঝুম মিষ্টি হেসে বলল –
” আমি ঠিক আছি ভাইয়া। সমস্যা হচ্ছে না। আপনি দয়া করে ব্যস্ত হবেন না। ওনার কাজ শেষ হলেই না হয় আমি ভিতরে যাবো।”
মেয়েটা দারুন মিষ্টি করে ভাইয়া ডাকতে পারে। যে কারো মন জুড়িয়ে যাবে এই ডাকে। ছেলেটি তৃপ্তির সাথে বলল –
” ম্যাম ভিতরে চলুন প্লীজ। স্যার যদি জানতে পারে আপনি বাইরে বসে আছেন, তাহলে আমার কপালে দুঃখ আছে। এমনিতেই সারাদিন ঝাড়ির ওপর রাখে।”
ঝুম বিস্মিত হয়ে বলল –

” আপনার স্যার ঝাড়ি ও দিতে পারে?”
ছেলেটি মাথা নাড়ালো। ঝুম হেসে বলল –
” সমস্যা নেই ভাইয়া। আমি থাকতে আপনাকে বকা শুনতে হবে না। আপনি কিছু বলবেন না ওনাকে। উনি ওনার কাজ শেষ করুক, কেমন?”
” ঠিক আছে ম্যাম। আপনি এখনে বসুন। আর কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে বলবেন।”
তারপর একটা মেয়ে স্টাফকে ডেকে বলল –

” ডক্টর শাইয়ান স্যারের ওয়াইফ। চিনতে পেরেছেন নিশ্চই? খেয়াল রাখবেন।( ঝুমের দিকে তাকিয়ে বলল) ম্যাম কিছু প্রয়োজন হলে ওনাকে বলবেন। আপনি চা খাবেন?”
ঝুম মাথা নাড়িয়ে বুঝাল খাবে না। যা গরম মুলতানে। সে সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। হসপিটালে এয়ার কন্ডিশন থাকার পরও সে ঘামছে। বিশ্রী অবস্থা। আজ কি একটু বেশি গরম পড়েছে না কি?
ছেলেটি চলে গেলো। আর ঝুম অপেক্ষা করতে লাগলো শাইয়ানের জন্য। প্রায় ৪০ মিনিট পর শাইয়ান বেরিয়ে এলো। গায়ে তার আকাশি রঙের হসপিটালের পোশাক। তারওপর সাদা অ্যাপ্রন। দারুন লাগছিল। শাইয়ান কোনো দিকে না তাকিয়ে হেঁটে চলেই যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে রিনরিনে গলার ডাকে তার পা থেমে গেলো। পিছু ফিরে ঝুমকে দেখে যতটা না অবাক হয়েছে, তার থেকে ঝুমের সাঁজ দেখে সে বেশি অবাক হয়েছে। শুকনো ডোক গিলে এদিক ওদিক চাইল। ঝুম তার দিকে মিষ্টি হেসে দাঁড়িয়ে। শাইয়ান নিজেকে সামলে এগিয়ে গেল ঝুমের দিকে। সামনে দাড়িয়ে ঝুমের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে বলল –

Remedy part 16

” কখন এসেছেন?”
” প্রায় ঘন্টা খানেক।”
শাইয়ান চোখ গরম করে অ্যাসিস্টেন্ট ছেলেটির দিকে চাইল। ছেলেটি কাচুমাচু মুখ করে ঝুমের দিকে তাকিয়ে চোখের চাহনিতে বুঝাতে চাইলো, ‘ম্যাম প্লীজ সেইভ মি।’
” ওনার দিকে ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন? আমিই বলতে বারণ করে ছিলাম। আপনি কাজ করছিলেন বলে ডিস্টার্ব করতে চাইনি। পার্সোনাল আর প্রফেশনাল লাইফ আলাদা রাখা উচিত মি. আনসারী।”
” আই নো দ্যাট। বাট ইয়ু ম্যাটার মোর দ্যান এনিথিং মিসেস আনসারী।”
শাইয়ানের কন্ঠ স্পষ্ট, দৃঢ়। ঝুমের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি।
” আচ্ছা, চলুন এবার, অনেকক্ষন হলো ক্ষুধা পেয়েছে।”

Remedy part 18