Home Remedy Remedy part 19

Remedy part 19

Remedy part 19
মীরা রায়াদ

ভাঙা পুরনো টেবিলের ওপর রাখা ফোনটি অনবরত বেজে চলেছে। কিছুক্ষন থেমে আবার নিজস্ব স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো যন্ত্রটি। ওপর পার্শ্বের ব্যক্তি বড়ই ব্যস্ত। অথচ ফোনের মালিকের তারা নেই। সে ধীর, স্থির ভাবে ফোনটি তুলল। সাথে সাথে ওপর পাশ থেকে ঝুম হরবরিয়ে বলে উঠলো –
” ভাইয়া আপনি ফোন ধরছিলেন না কেন আমার?”

করাচি থেকে বেশ কিছুটা দূরে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় আহিরের এবারের প্রজেক্টের কাজ চলছে। তার পরনে কমলা রঙের ইঞ্জিনিয়ারিং হ্যাট, সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট। এখন আর তাকে বখাটে লাগছে না একদম। পুরোদস্তর ইঞ্জিনিয়ার লাগছে। মূলত সে কাজ করছিল। প্ল্যান নিয়ে ডিস্কাস করছিল বলে ফোনের দিকে লক্ষ্য ছিল না। ইদানিং ঝুম যখন তখন ফোন দিয়ে তাকে জ্বালাতন করে। মেয়েটা এতো বেশি চঞ্চল হয়েছে যা বলার বাইরে। শাইয়ানকে তো জ্বালাবেই সাথে আহিরের শান্তিও নাই করে দিয়েছে। সেদিন তো ফোন দিয়ে তার মাকে গম্ভীর গলায় বলল –
” ছোট আম্মা, ছেলে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে খোঁজ রাখেন? নাতি – নাতনির মুখ কি দেখতে ইচ্ছা করে না?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সেই থেকে তার বাড়িতে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছে। উঠতে বসতে তাকে বিয়ের কথা বলে সবাই। এই নিয়ে ঝুমের সাথে তার ঝগড়াও হয়েছে। শেষে ঝুম কেঁদে কেটে শাইয়ানের কাছে নালিশ দিয়েছে। শাইয়ান অবশ্য তাদের মাঝে এখন যায় না। দুই পাগল যা পারে নিজেরা করে নিক। ঝুম অবশ্য আহিরকে বকে কথা বলেনি কিছু দিন। কিন্তু তার শোধ নিয়েছে আহিরের মাকে আরো উস্ককে দিয়ে। নিজেরা শান্তিতে আছে বলে তার জীবনে অশান্তি নিয়ে আসতে চাইছে। কতো বড় অকৃতজ্ঞ মেয়ে মানুষ ভাবা যায়!
আহির দুদিন হলো বাড়ি ছাড়া। তার এক কথা সে এখন বিয়ে করবে না। অথচ সবাই তাকে এমন ভাবে চেপে ধরেছে যে কোনো উপায় না পেয়ে সে বাড়ি ছেড়েছে। এই কথা ঝুমের কানে গেলে লাগাতার তাকে ফোন দিয়ে উত্যক্ত করে যাচ্ছে মেয়েটা।

” আমরা ঝগড়া করেছি ভাবি ভুলে গেছেন?”
ওপাশ থেকে সব নীরব। কিছুক্ষন বিরবিরানোর শব্দ হলেও পরবর্তীতে গলার স্বর বাড়িয়ে ঝুম বলল –
” তো! ঝগড়া করলে কি হয়েছে? আপনার সাথে কি এটা আমার প্রথম ঝগড়া?”
” না কিন্তু আপনি বলে ছিলেন আপনি আমার সাথে আর কথা বলতে চান না।”
আহিরের কন্ঠস্বর গম্ভীর। ঝুম কষ্ট পেলো। মিনমিন করে বলল –
” কষ্ট পেয়েছেন ভাইয়া?”
” হুম।”
সে সত্যই কষ্ট পেয়েছে। মেয়েটা তাকে ব্লক করে দিয়েছিল। এটা কেমন ছেলে মানুষই? বিয়ে নিয়ে এতো কাণ্ড করার কোনো মানে হয়? যখন মনে হবে তখন সে নিজেই তো করে নিতো।
” সরি।”

ঝুম অনুতপ্ত। তার এখন খারাপ লাগছে। কিছু মানুষ থাকে যাদের সাথে আমাদের রক্তের টান না থাকলেও আত্মিক টান এতো বেশি থাকে যে আপনা থেকেই অধিকারবোধ চলে আসে। আহির ঝুমের কাছে ঠিক তেমন একটি মানুষ। তার মায়ের পেটের কোনো ভাইবোন নেই। কিন্তু যদি তার কোনো বড় ভাই থাকতো তাহলে সে নিশ্চই আহিরের মতো হতো। ঝুমকে এভাবে আগলে রাখতো সব সময়। ঝুম সেই অধিকার থেকে চেয়ে ছিল আহিরের জীবনটা সাঁজিয়ে দিতে। কিন্তু আহির তাকে ভুল বুঝলো। সেকি আহিরের খারাপ চেয়েছে? উহু। সে আহিরের নীরব কান্না দেখেছে। সকলের সামনে হাসিখুশি ছেলেটার মন ভাঙা আকুতি দেখেছে। তাইতো চেয়েছিল কাউকে জীবনে এনে দিতে।

আহির ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো। মেয়েটা এমন কেন? কেউ এর ওপর রাগ করেও থাকতে পারে না। কিছু হলেই কেঁদে ভাসাবে অথবা এমন করে কথা বলবে যেন কতো কি হয়ে গেছে। শাইয়ানের জন্য রীতিমত তার দুঃখ হলো। এমন একটা জিনিস নিয়ে সংসার করা চাট্টিখানি কথা না।
” ভাবি।”
“হুম।”
” মনের ওপর জোর করা যায় না ভাবি।”
” কিন্তু এভাবে আর কতো দিন ভাইয়া?”
” যতদিন মনে হবে না, ভাঙা মন জোড়া লেগেছে ততদিন। এই মন নিয়ে না আমি নিজে সুখী হবো আর না কাউকে সুখী করতে পারবো ভাবি।”
” তার জন্য চেষ্টা করতে হয় ভাইয়া।”
আহির কথা বলতে বলতে সদ্য কাঠামো গোড়া বাড়িটির তিনতলায় চলে এলো। সেখান থেকে স্পষ্ট দূরের সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। সমুদ্র তার আপন গতিতে গর্জন করে যাচ্ছে। আহির একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে রইলো বহুক্ষন। তারপর ধিমি স্বরে বলল –

” এখন আর মন টানে না ভাবি।”
ঝুম থেমে গেল। কি বলবে বুঝতে পারল না। কিছু ব্যাথা একান্ত নিজস্ব হয়। তা চাইলেও কেউ হয়তো ভাগ নিতে পারে না। যার কষ্ট সেই একমাত্র অনুভব করতে পারে। কিছু কান্নার শব্দ হয় না। অথচ ভিতরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
” সে আর ফিরবে না ভাইয়া।”
আহির দৃষ্টি দূরে রেখে বলল –
” জানি।”
” নিজেকে আর কষ্ট দিয়েন না ভাইয়া।”
” এটা আমার প্রাপ্য ভাবি।”
” ভুল মানুষ মাত্রই হয় ভাইয়া। ভাগ্যে না থাকলে এতে আপনার দোষ কি?”
” সে আমার কেন হলো না ভাবি?”
” আপনার জন্য লিখে রাখলে আপনার হতো ভাইয়া। জারা আপুকে নিয়ে ভাবনা বন্ধ করুন। সে এখন অন্য কারো। এটা পাপ ভাইয়া। অনেক তো হলো, নিজেকে আরও একবার সুযোগ দিন ভাইয়া।”

” হুম।”
ঝুম বুঝলো লাভ নেই। আহির মানবে না। তাই প্রসঙ্গ বদলে বলল –
” ছোট আম্মা চিন্তা করছে ভাইয়া। ফোন দিয়ে কথা বলুন। বাসায় যান এবার।”
” আগে আপনার ছোট আম্মাকে বলুন এসব বন্ধ করতে তারপর।”
” আচ্ছা সে না হয় বলবো। আপনি কথা বলুন আগে। সে চিন্তিত আপনাকে নিয়ে।”
” হুম।”
ঝুম আরো কিছু বলতে চাইলো কিন্তু বেডরুম থেকে শাইয়ানের গলা শুনতে পেয়ে থেমে গেল। আহির বলল –
” শাইয়ান ডাকছে। যান দেখুন কি বলে। পরে আবার কথা হবে।”
ঝুম হরিতরি করে ছুটল। তার ছোটার তালে তালে নুপুরের মৃদু ঝুনঝুন শব্দ কানে বাজলো আহিরের। ঝুম কোনো রকম বলল –

” ভাইয়া পরে কথা বলবো আবার। সাবধানে থাকবেন।”
বলে দ্রুত তাদের ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছালো। এতটুকুতেই মেয়েটার শ্বাস ঘণ হয়ে এসেছে। এই শাইয়ানকে নিয়ে হয়েছে এক জ্বালা। লোকটা কিছুক্ষন তাকে ছেড়ে থাকতে পারে না। একবার ডাকতে শুরু করলে যতক্ষন ঝুম সামনে গিয়ে না দাঁড়াবে ততক্ষন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে থাকবে। যেমন এখন চেঁচিয়ে যাচ্ছে। অসহ্য পুরুষ। বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে কপাল কুঁচকে বলল –
” সমস্যা কি আপনার চেঁচাচ্ছেন কেন?”
শাইয়ান কোলে ল্যাপটপ নিয়ে কিছু একটা করছিল। ঝুমের কথায় মাথা তুলে তাকালো।
” কি করছিলেন এতক্ষন? কাছে এসে বসুন।”
” ভাইয়ার সাথে কথা বলছিলাম।”
” আচ্ছা কাছে আসুন।”

শাইয়ানের কথায় ঝুম কিছু একটা ভেবে চটপটে পায়ে এগিয়ে এসে ল্যাপটপটা সরিয়ে দুম করে শাইয়ানের কোলে বসে পরলো। শাইয়ান অবাক হলেও তার মুখভঙ্গিতে তার ছাপ পরলো না বিন্দুমাত্র। বরং সে ঝুমকে আরো ভালোভাবে আগলে নিল দুহাতের মাঝে। ঝুম ওভাবে বসে খুব মনোযোগের সহিত আঙুল দিয়ে শাইয়ানের টি শার্টের ওপর থেকে বুকে আঁকিবুঁকি করতে লাগলো। মেয়েটার কিছু চাওয়া থাকলে এভাবে আল্লাদি ভঙ্গিমা করে। শাইয়ান ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো ব্যাপার কি? কারণ সে জানে তার বউ এতো ভালো না, যে কাছে আসতে বললে একেবারে কোলে উঠে বসবে। উল্টো সব সময় পালাই পালাই করে বেড়ায় মেয়েটা।

” ডক্টর।”
” হুম।”
” বাংলাদেশে যেতে চাই।”
শাইয়ানের ভালো ভালো মেজাজটা খারাপ করতে শুধু এই কথাটার অপেক্ষা ছিল। মুখ তেতো হয়ে গেলো নিমিষে। এতোগুলো দিন গেলে অথচ মেয়েটার মাথা থেকে এখনো দেশে যাওয়ার ভুত নামেনি? অভাবনীয়। সে আপাদত ঝুমের কথায় পাত্তা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। নয়তো দেখা যাবে কিছু একটা বলে বসলে কেঁদে ভাসাবে। শাইয়ান ঝুমকে আরো কিছুটা কাছে টেনে ঝুমের খোপা করা চুলগুলো খুলে দিল। দক্ষিণের জানালা থেকে হাওয়া বয়ে বেড়াচ্ছে। সেই জোর হাওয়ায় ঝুমের লম্বা চুলগুলো এলোমেলো করে দিল মুহূর্তে। শাইয়ান কোনো কিছুর পরোয়া করলো না। সে এখন ঝুমের মোহে বিভোর। ধীরে খুব সাবধানে শাইয়ান ঝুমের খোলা কাঁধে মুখ নামিয়ে টুকরো টুকরো উষ্ণ নরম ছোঁয়া দিয়ে গেল। এহেন অতর্কিত ছোঁয়ায় দিশে হারা ঝুম একহাতে শাইয়ানের কাঁধের টি শার্ট, অপরহাতে শাইয়ানের ছোট করে কাটা চুল টেনে ধরলো।

” ডক্টর।”
“উম্ম।”
” ডক্টর শুনুন না।”
” এখন না পরে। বিরক্ত করবেন না পাখি।”
শাইয়ানের কন্ঠে নাখোশ। ভারি বিরক্ত সে। এই মেয়ের এহেন সময় জ্বালাতন করা আর নেয়া যাচ্ছে না। শাইয়ান আবারও তার কাজে মনোযোগী হলো। দুনিয়াতে এখন ঝুম ছাড়া আর কিছু নেই তার সামনে, এমন ভাবে হামলে পরলো। কিন্তু ঝুম থেমে নেই। এখন যদি কথা না আগায় তাহলে এই অসভ্য লোক আর শুনতে চাইবে না।
” ডক্টর আমি বাংলাদেশে যেতে চাই।”
শাইয়ানের মেজাজ খুব খারাপ হলো। সে ঝুমকে ছেড়ে চড়া মেজাজে বলল –

” সমস্যা কি আপনার আরীবা? সময় বুঝেন না? শুরু থেকে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ করেই যাচ্ছেন। এখানে সমস্যা কি? কেন যেতে হবে ওখানে? কি আছে ওখানে বলবেন? কেন আমার সাথে থাকতে চান না আপনি? এতো কিছু করি চোখে পড়ে না? একটা জীবন কি আমার সাথে এখানে কাটিয়ে দেয়া যায় না?”
শাইয়ান এভাবে এর আগে কখনো কথা বলেছে কি ঝুমের সাথে? উহু বলেনি। ঝুম রীতিমত ভড়কে গেল। অবাক চোখে শাইয়ানকে দেখলো। ঝুমের চোখে পানি টলমল। সেতো একবারে যাওয়ার কথা বলেনি। এভাবে রিয়েক্ট করার কি হলো? তাদের বিয়ের ১ বছরের বেশি হয়ে গেল। সেই এসেছে আর যেতে পারেনি। শাইয়ান তার পাসপোর্ট কোথায় রেখেছে তার খোঁজ নেই। সে কখনো নিজ উদ্যোগে দেয়নি। ঝুম ও চায়নি। এতটুকু বিশ্বাস কি করা যায় না ঝুমকে?

” আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? আমি কি একবারও বলেছি একেবারে যাবো? ওটা আমার দেশ। আমার জন্মভূমি। কিছু না থাক তাও টান কাজ করবে এটা কি অস্বাভাবিক? তাছাড়া আমার আম্মার কবর ওখানে। খুব ইচ্ছা করছিল গিয়ে একবার দেখে আসতে। আম্মার কাছে গিয়ে আপনাকে একটু দেখিয়ে আনতে। আপনাকে নিয়েই যেতাম, একা যেতাম না শাইয়ান।”
‘ শাইয়ান ‘! আজ প্রথম নামটা নিল না ঝুম? শাইয়ান স্থির নয়নে তাকিয়ে ঝুমের পানে। মেয়েটা আজ কাদঁছে না। চোখে একরাশ অভিমানী জল টলমল করছে। ঝুম তার দিকে চাইলো না। উঠে ধীর পায়ে হেঁটে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে না ফিরে বলল –

” সম্পর্কে বিশ্বাস থাকা জরুরি। যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে টেনে নেয় বোকামি।”
ঝুম আর দাড়ালো না। অথচ শাইয়ান শূন্য দরজার পানে স্থির তাকিয়ে। তার শরীরটা পাথরের মতো ওজন লাগছে। কিছু কি ভুল করে ফেলেছে? মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে ফেলল আবার? সে কি ঝুমকে অবিশ্বাস করেছে? শাইয়ানের মাথা কাজ করছে না একদম।
আজ তিনদিন হলো ঝুম নীরব। আগের মতো চঞ্চলতা নেই। নেই বললে ভুল হবে। আছে, সকলের সাথে সে আগের মতো কথা বললেও শাইয়ানের ক্ষেত্রে ঠাণ্ডা বরফ। শাইয়ান প্রশ্ন করলে উত্তর করে নয়তো চুপচাপ নিজের কাজ করে। শাইয়ানের খেয়াল রাখছে, সকল কাজ করে দিচ্ছে। কিন্তু তারপরও মেয়েটা থেকেও যেন নেই। শাইয়ান বহু চেষ্টার পরও ঝুমকে আগের মতো করতে পারেনি। এখন শাইয়ান শুধু অসহায় ভাবে দেখে যায়। চোখে তার কি নিদারুণ ব্যাথা! অথচ পাষাণ মেয়েটা বুঝলো না। একটা কথা ধরে তাকে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে।

ঝুম বর্তমানে কাপড় ঘুচাচ্ছে। তারা করাচি যাচ্ছে ২ মাসের জন্য। শাইয়ান বাৎসরিক ছুটি পেয়েছে। আজ দুপুরেই সে ফোন করে জানাল যা যা নেয়ার নিতে তারা কাল করাচি যাবে। শুনে ঝুম খুশি হলেও বুঝতে দিল না। শাইয়ান গালে হাত দিয়ে দেখছে তার বউকে। মেয়েটার এতো অভিমান কেন? সেই যে রাগ করলো এখনো কথা বলেনি। ঝুম সব কিছু গুছিয়ে, বিছানা ঠিক করে তার জায়গায় শুয়ে পরলো। শাইয়ান তাকে শুয়ে পরতে দেখে আলো নিভিয়ে নিজেও ঝুমের একদম শরীর ঘেঁষে শুয়ে পরলো। ঝুম কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না। আর নাই বা দূরে সরে গেল। যে ভাবে ছিল ওভাবেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। শাইয়ান ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে দুহাতের সাহায্যে টেনে নিলো মেয়েটাকে। কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল –

” আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন পাখি। আমি ওভাবে বলতে চাইনি। তারপরও আমার ভুল হয়েছে। এবারের মতো ক্ষমা করে দিন। এবার করাচি গিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে যাবো, কেমন? কিন্তু বেশি দিনের জন্য না। এবার রাগে কমান।”
ঝুম কিছু বলল না। নীরবে মুচকি হেসে মাথাটা এগিয়ে শাইয়ানের বুকের বাপাশে রাখলো। শাইয়ান হয়তো বুঝলো ঝুমের নীরব সম্মতি। সে ঝুমের কপালে, গালে, নাকে একের পর এক চুমু দিয়ে শক্ত করে ঝুমকে নিজের সাথে আঁকড়ে ধরলো। আজ কতগুলো দিন পর যে তার বুকে শান্তি লাগছে সেটা সে কাউকে বুঝাতে পারবে না।

টানা ১৫ ঘণ্টা পর ওরা করাচি পৌঁছালো। শাইয়ান তার ব্যক্তিগত গাড়িতেই এসেছে। তার জন্য উপর মহল থেকে স্পেশাল ফোর্স দেয়া আছে। ভীষণরকম নিরাপত্তার সহিত তাদের করাচি পৌঁছে দেয়া হলো। যদিও শাইয়ান একা হলে এতকিছুর প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু সাথে ঝুম ছিল বলে রিস্ক নিতে চায়নি। ঝুম গাড়িতে ওঠার কয়েক মিনিট পরই শাইয়ানের বুকটাকে বালিশ বানিয়ে ঘুম দিয়ে ছিল। সেই ঘুম তার মিনিট ২০ আগে ভেঙেছে। শাইয়ান মেয়েটাকে যতো দেখে ততোই অবাক হয়। আগে তো এমন ঘুমকাতুরে ছিল না। ঝুম অবশ্য সেসব পাত্তা দিল না। তার শরীর এখন ভীষণ রকম চাঙ্গা, মন ফুরফুরে। কতোগুলো দিন পর সবাইকে দেখবে ভেবেই তার অস্থির লাগছে। গাড়ি বাড়ির সামনে থামার পর ঝুম এক দন্ড না দাঁড়িয়ে চঞ্চল পায়ে ছুটে লাগালো। শাইয়ান পেছন থেকে চেঁচাল, কিন্তু মেয়েটা শুনলে তো? ঠিকঠিক শাইয়ানের ভয় সত্যি করে মুখ থুবড়ে পড়ল। শাইয়ান হচকচিয়ে উঠলো। পা বাড়িয়ে যাওয়ার আগে ঝুম উঠে আবার ছুটল।

শাইয়ান অস্থির এই মেয়েকে নিয়ে। এই দুরন্ত মেয়েকে নিয়ে সে চিন্তায় থাকে সর্বদা। সে লাগেজ গুলো নিয়ে ভিতরে যেতে যেতে ভাবলো কোথায় কোথায় ব্যাথা পেয়েছে দেখতে হবে আগে। নয়তো মুখ ফুটে কখনো বলবে না ফাজিলটা। শাইয়ানের চোখেমুখে অসন্তোষের ছায়া স্পষ্ট। সে ভিতরে এসে দেখতে পায় ঝুমের সাথে বাড়ির অন্যরাও হুলুস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে বসে আছে, এমনকি তার মা ও। শাইয়ান হতবাক। ঝুম মেহেরুন্নেসার বুকের সাথে নাকমুখ ঘষে বিড়াল ছানার মতো পরে আছে। আর মেহেরুন্নেসা মাথায় হাত বুলিয়ে নানারূপ প্রশ্ন করছে। আহির বাদে মোটামুটি সকলেই উপস্থিত আছে। গতকাল শাইয়ানের থেকে করাচি যাওয়ার কথা শোনার পর ঝুম নিজ দায়িত্বে সকলকে ফোন করে বলেছে এবং বাড়িতে উপস্থিত থাকতে বলেছে। যার দরুন সারা আর ঈশালও বর্তমানে এখানে। আহির প্রজেক্টের কাজে ব্যস্ত বলে সে আজ আসতে পারবে না, কিন্তু কাল সে আসবে বলে জানিয়েছে। তাছাড়া শাইয়ান আহিরকে জানিয়েছে সে ঝুমকে নিয়ে বাংলাদেশ যাবে। সেটা শুনে আহির নিজেও সেখানে যাওয়ার আগ্রহ জানিয়েছে। তাই আহির মোটামুটি সব কাজ শেষ করে একেবারে আসতে চাচ্ছে।

শাইয়ানকে দেখে মেহেরুন্নেসার বুক থেকে উঠে ঝুম সোজা হয়ে বসলো। মেহেরুন্নেসা ছেলেকে দেখে হেসে কাছে ডাকলেন। শাইয়ান কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। মেহেরুন্নেসার চোখে পানি। ছেলেটা বদলে গেছে কি? আগে এমন করে জড়িয়ে ধরতো না।
” কেমন আছেন আম্মা।”
মেহেরুন্নেসা যত্নের সাথে ছেলেকে জড়িয়ে নিলেন। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বললেন –
” আলহামদুলিল্লাহ্। আপনি কেমন আছেন আব্বা।”
শাইয়ান মৃদু হাসলো।
” জ্বি আলহামদুলিল্লাহ্।”

ঝুম তাদের দিকে মুচকি হেসে তাকিয়ে। শাইয়ান আড় চোখে সেই হাসি দেখে নিলো একফাঁকে। তাদের আগমনে বাড়িতে একপ্রকার জান ফিরে এসেছে যেন। মুহূর্তেই হৈচৈ শুরু করে দিলো ছোটরা। শাইয়ান হাত বাড়িয়ে সারার মেয়েকে কোলে নিল। নাদুস – নুদুস বাচ্চাটা হাতপা নাড়িয়ে অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলছে। কখনো হাত বাড়িয়ে শাইয়ানের মুখে খাঁমচে দিচ্ছে। শাইয়ান হেসে দিল। ঝুম সবটাই নীরবে পর্যবেক্ষন করলো। মনে মনে কিছু একটা ভেবেও নিল হয়তো।

রাত তখন গভীর। অথচ ঝুমের খোঁজ নেই। আসার পর থেকে তার ব্যস্ততার শেষ নেই। মুলতান থাকতে তারা যখন কোথাও ঘুরতে যেতো বা কেনাকাটা করতে যেতো, ঝুম সর্বদা বাড়ির সকলের জন্য কিছু না কিছু কিনে শাইয়ানের পকেট ফাকা করে আসতো। সেই সব নিয়ে সে এই রাতের বেলা মেলা বসিয়েছে ঈশালের ঘরে। একে একে সকলকে তাদের জিনিসগুলো বুঝিয়ে দিলো খুশি মনে। শাইয়ান সবটা পর্যবেক্ষন করে বুঝতে পারল আজ আর তার বউকে কাছে পাওয়া হবে না। তাই সে বিরক্ত না করে নিঃশব্দে চলে গেলো। ঝুম এলো আরো ঘন্টা খানেক পর। শাইয়ান অপেক্ষা করছিল তার জন্য। শাইয়ানকে তখনো জেগে থাকতে দেখে ঝুম চোরা হেঁসে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইল। শাইয়ান ঝুমকে দেখে নিল ভালো করে। মেয়েটার ওজন বেড়েছে। গোলগাল মুখটা পূর্বের তুলনায় গৌরবর্ণের হয়েছে বেশ। দেখতে দারুন লাগে।

” নিজেতো সারারাস্তা ঘুমিয়ে এসেছেন বলে এখন চোখের পাতায় ঘুম নেই। কিন্তু আমার কথা কি একবার ভাবা উচিত ছিল না ম্যাম? এতটা জার্নি করে এসে ভীষণ ক্লান্ত আমি। কাছে আসুন ঘুমাবো।”
ঝুমের খারাপ লাগলো। এখানে এসে শাইয়ানের কথা মাথা থেকে বেরিয়ে গেল কিভাবে বুঝলো না। কথা না বাড়িয়ে শাইয়ানের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো।
” আরীবা।”
” জ্বি।”
” আমি একটা কথা ভাবছিলাম।”
ঝুম মাথা তুলে শাইয়ানের চোখে চাইল। তার চোখে প্রশ্ন, কিন্তু করলো না।

” আপনার long term visa এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবে কিছু দিনের মাঝে। তাই দ্রুত আবার করাতে হবে।”
” আচ্ছা।”
” আরীবা।”
” জ্বি।”
শাইয়ান কিছু মুহূর্ত নিশ্চুপ রইল। নিজের মনে কথাগুলো সাজিয়ে নিল। ঝুম কিভাবে রিয়েক্ট করবে ভেবেই চিন্তা হচ্ছে তার।
” কি হয়েছে ডক্টর? কিছু বলতে চান?”
” আসলে আমি ভেবে ছিলাম বারবার এভাবে বছরে বছরে রিনিউ না করে পাকিস্তানি নাগরিত্বের জন্য আবেদন করলে ভালো হতো না?”

ঝুম নিশ্চুপ। ভয়ে, চিন্তায় শাইয়ান ঘেমে একাকার। ঝুমের দেশের প্রতি টান অত্যধিক, সে জানে। কিন্তু বারবার রিনিউ করাটাও বিরক্তের। তাছাড়া নিরাপত্তা বিষয়ক কিছু ব্যাপার আছে। ঝুম পাকিস্তান আছে প্রায় দেড় বছরের মতো। তার ভিসার মেয়াদ ছিল মাত্র ৬ মাস। এখন ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে কোনো ভাবে যেতে পারবে না। এর জন্য বাংলাদেশ থেকে ভিসা লাগবে আবার। অথবা বাংলাদেশ হাইকমিশনারের অনুমতি। শাইয়ান চেষ্টা করলে পারবে কিন্তু তাতে সময় লাগবে প্রচুর। আইনি জটিলতা আছে। কিন্তু এসবের জন্য তাদের হাতে সময় নেই।

Remedy part 18

” আচ্ছা।”
মেনে নিল ঝুম? এতো সহজে? শাইয়ান অবাক হলো। ঝুম হেসে আবার বুকে মাথা রেখে বলল –
” এই মানুষটাকে ছেড়ে তো আর যেতে পারব না। এই দেশেই থাকতে হবে আমাকে। তাহলে শুধু শুধু এসব করে লাভ কি বলুন ডক্টর। তার থেকে আপনার চিন্তা, ভয় দূর করে দিই।”
শাইয়ান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জড়িয়ে ধরলো ঝুমকে। মেয়েটা যে তাকে ভুল বুঝেনি এইতো অনেক।

Remedy part 20