বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫২
রানী আমিনা
বেজমেন্টের নিচ তলা৷
আন্ডারগ্রাউন্ড প্রিজন এরিয়ার একটি প্রিজনের ভেতর ঢাউস পেট নিয়ে সোফায় বসে আছে অরোরা, সম্মুখের টি টেবিলে রাখা কিছু খাবার। কিন্তু কিছুই মুখে তুলেনি সে।
চতুর্দিকে তাকে ঘিরে রেখে আছে তার খাস দাসী গুলো। প্রিজনের বাইরে বারান্দা জুড়ে দুরুদুরু বুক নিয়ে দাঁড়িয়ে অন্যান্য দাসীরা। প্রবেশ মুখে দাঁড়িয়ে কয়েকজন সোলজার, হাতে তাদের অস্ত্র। অন্দরমহলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা দিতে ইযান নিজে তাদের নিয়োগ দিয়েছে।
ইয়াসমিন নিজেও এখানে। অন্যান্য দাসীরা তাকে প্রিজনের ভেতর অরোরার কাছে থাকতে বললেও থাকতে রাজি হয়নি সে। মনের ভেতর কু ডাকছে তার, মন বলছে ভয়ানক কিছু ঘটতে যাচ্ছে আজ!
বাইরের রণাঙ্গনের ভয়াবহ শব্দ এই পাতালপুরী হতে স্পষ্টই কর্ণগোচর হচ্ছে সকলের। কামানের গোলার গুড়ুম গুড়ুম শব্দে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে তারা৷
অরোরার মুখখানা পাংশুবর্ণ ধারণ করেছে। সন্তান প্রসবের বেশি দিন অবশিষ্ট নেই তার। প্রাসাদের হেকিম বলেছিলো আর মাত্র এক থেকে দেড় মাস, তারপরেই তার পেটের ভেতর যুদ্ধ করতে থাকা হীরের টুকরো, তার প্রাণপ্রিয় সন্তানটি আসবে তার বুকে, এ পৃথিবীর বুকে৷
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পেটের ওপর হাত রাখলো অরোরা। বাচ্চাটা থেকে থেকে হাত পা ছুড়ছে, যেন পেটের ভেতর তার একটুও ভালো লাগছেনা, বাইরে বেরিয়ে আসতে পারলেই বাঁচে!
অরোরার চোখের সামনে ভাসলো ইলহানের চেহারা৷ সাত বছর বয়স থেকে সে এই প্রাসাদে, এখন তার বয়স একুশ। বিগত চৌদ্দ বছরে সে ক্ষমতার হাত বদল দেখেছে। প্রাসাদের নোংরা রাজনীতি দেখেছে, দেখেছে হেরেমে টিকে থাকার জন্য অন্যদের লড়াই, লড়েছে নিজেও।
বাদশাহর নৈকট্যলাভের জন্য কত পাপই না করেছে সে! কত দাসীকে নিজের হাতে খুন করেছে প্রাণপ্রিয় প্রভুর সান্নিধ্য হতে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।
কত অভিনয়, কত ষড়যন্ত্রের পর হেরেমের এত এত অপ্সরার ভেতর থেকে এগিয়ে গিয়ে নিজেকে এই স্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে!
আজ সে হতে চলেছে বাদশাহর ঔরসজাত সন্তানের জননী, পূরণ হতে চলেছে তার স্বপ্ন। অথচ এই শেষ লগ্নে এসে কিনা তাকে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে সন্তনের প্রাণসংশয় ঠেকানোর জন্য।
ইলহানের সুদর্শন চেহারাটা ভেসে উঠলো অরোরার চোখের সামনে। আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে আসার পূর্বে ভালো ভাবে দুটো কথাও বলতে পারেনি সে হিজ ম্যাজেস্টির সাথে, ভালো ভাবে বিদায় জানাতে পারেনি। ব্যাস্ত ছিলেন তিনি, বিদায় নেওয়ার পূর্বে অরোরার ফোলা পেটের ওপর হাত রেখে কপালে ঠোঁট ছুইয়ে চলে গেছিলেন৷
অরোরা আঙুল স্পর্শ করলো ইলহানের ঠোঁট ছুঁয়ে দেওয়া স্থানে। তারপর সে আঙুল ছোয়ালো নিজের লালচে ঠোঁটে।
তার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ কানে এলো একটি ধাতব গমগমে আওয়াজ! বুক কেঁপে উঠলো অরোরার৷ দাসীদের একজনকে বলল বাইরে কি হচ্ছে দেখে আসতে৷ দাসীটি দ্রুত পায়ে লোহার দরজা ঠেলে বাইরে গেলো। কয়েক মূহুর্ত বাদেই ফিরে এলো ছুটতে ছুটতে, উত্তেজিত গলায় কেঁদে উঠে বলল
“আন্ডারগ্রাউন্ডের এন্ট্রেন্সের ওপাশে কারা জানি এসেছে, দরজা ভাঙছে!”
মীরের মেজাজ ভয়ানক খারাপ। আন্ডারগ্রাউন্ডে পৌছানোর দরজার ফিংগারপ্রিন্ট সিস্টেমে কাজ করছে না, এরর দেখাচ্ছে বারবার। হাতে লেগে থাকা রক্ত শার্টের হাতায় মুছে আরও কয়েকবার চেষ্টার পরও যখন হলোনা তখন প্রচন্ড ক্রোধে নিজের বজ্রমুষ্ঠি হানলো সে দরজার ওপর!
প্রচন্ড মজবুত ধাতব দরজার ওপর বিকট শব্দ তুলে পর পর কয়েকটা শক্তপোক্ত আঘাত করতেই দুমড়ে মুচড়ে ভেতরে ঢুকে গেলো দরজার মধ্যভাগ। ছড়ে গেলো মীরের মুষ্টির উপরাংশ।
ভ্রুকুটি করে চোটপ্রাপ্ত মুষ্টি একবার দেখে নিয়ে মীর এবার সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করলো দরজার ওপর। মুহুর্তেই দরজাটি ভেঙে তীব্র বেগে উড়ে গিয়ে পড়লো ভেতরের মেঝেতে। বিকট শব্দে কেঁপে উঠলো আন্ডারগ্রাউন্ড প্রিজন!
স্বর্ণাভ চোখ জোড়ায় রূঢ় দৃঢ়তা ফুটিয়ে সামনে এগোলো মীর। চোয়াল দ্বয় ভয়ানক শক্ত, মুখখানা অত্যাধিক শান্ত, অথচ অবয়বটি ভয়ানক! শরীর জুড়ে রক্তের ছিটে, কপাল বেয়ে ঝরছে ঘাম। ঘাড়বাবরি চুলগুলোর কয়েকটি এসে লেপ্টে আছে কপালের ওপর, কিন্তু এতে সে বিচলিত নয় মোটেও। তার শ্যোণ চোখজোড়া হন্যে হয়ে খুঁজতে ব্যাস্ত তার বড় ভাইয়ের সন্তানসম্ভবা খাস বাদিটিকে।
তার এই প্রলয়ঙ্কারী রূপ দেখা মাত্রই দাসীগুলো ভয়ে চিৎকার দিয়ে পালালো যেভাবে, যেদিকে পারলো! পালাতে ব্যর্থ হয়ে বাকি দাসী গুলো আতঙ্কে সেঁটে দাঁড়িয়ে রইলো দেয়ালের সঙ্গে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কেউ কেউ শুরু করলো কান্নাকাটি!
বৃদ্ধা ইয়াসমিন হাতের লাঠিটি শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো দৃঢ় ভঙ্গিতে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয়ে, আতঙ্কে দম বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হলো তার! মনে মনে চাইলো একটিবার ফিরে আসুক তার শেহজাদী, এই মৃত্যুপূরী থেকে, সম্মুখে দাঁড়ানো স্বর্ণাভ চোখের রক্তপিপাসু সত্তাটি থেকে রক্ষা করুক তাদের!
দরজা ভাঙার শব্দ শুনে সোলজার গুলো সরে গেছিলো প্রবেশ পথ হতে৷ দরজা ভেঙে মীরকে ভেতরে ঢুকতে দেখা মাত্রই দ্রুত বেগে তারা নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র তাক করে ধরলো তার দিকে, কে একজন জোর গলায় বলে উঠলো,
“শেহজাদা, আপনার অস্ত্র নামান, নইলে আমরা শ্য…..”
বাকিটুকু আর শেষ করতে পারলো না সে, তার পূর্বেই ক্ষিপ্র গতিতে কুড়ালটি ঘুরিয়ে ছুড়ে মারলো মীর সোলজারটির মুখ বরাবর, সেটির ধারালো অংশ গিয়ে সবেগে কোপ বসালো সোলজারটির কপাল হতে নাকের অগ্রভাগ পর্যন্ত। শিরোস্ত্রাণ ভেদ করে কুড়ালের ধারালো অংশ পুরোটাই ঢুকে গেলো লোকটির কপাল ফুড়ে!
নিথর দেহটি কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে থেকে অতঃপর আছড়ে পড়লো মেঝেতে। দাসীরা আতঙ্কে তীব্র চিৎকার চেচামেচি জুড়ে দিলো আবারো। কেউ কেউ ভয়ে জ্ঞান হারালো তৎক্ষনাৎ। ইয়াসমিন মনে মনে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা শুরু করলো, যেন কোনো জাদুবলে এবারের মতো হিজ ম্যাজেস্টির ক্রোধ শান্ত হয়ে যায়!
সোলজার গুলো ক্ষণিক দ্বিধায় ভুগে অস্ত্র নামিয়ে ফেললো ধীরে ধীরে, কিন্তু একজন তখনো তাক করে রইলো রাইফেল। মীর ঘাড় ঘুরিয়ে হিংস্র ভঙ্গিতে তাকালো দূরে দাঁড়ানো সোলজারটির দিকে। মীরের তুখোড় দৃষ্টির সম্মুখে রাইফেল তাক করে রাখা হাতখানা তার কাঁপতে লাগলো থরথরিয়ে।
ধীর, ভারী পা ফেলে মীর এগিয়ে গেলো তার কাছে। কাঁপুনির পরিমান বেড়ে গেলো সোলজারটির, রাইফেলটি ধরে রাখাই কষ্টকর হয়ে উঠলো তার কাছে, কিন্তু রাইফেল নামিয়ে ফেলার মতো সাহসও আর করে উঠতে পারলো না!
মীর গিয়ে দাঁড়ালো তার সামনে। মীরের দীর্ঘ, প্রশস্ত শরীরের সামনে যেন মাটিতে মিশে গেলো সোলজারটি। ভয়ে হঠাৎ আর্তনাদের সুরে কেঁদে উঠলো লোকটি, কিন্তু সেই মুহুর্তেই মীরের নখর যুক্ত হাতের থাবা পৌছে গেলো তার মুখে!
ক্ষিপ্র বেগে ডান হাত খানার থাবা লোকটির থুতনির নিচে দিয়ে ধারালো নখর দিয়ে চেপে ধরলো চোয়াল। শাণিত নখরের চাপে তৎক্ষনাৎ চোয়াল ফুড়ে নখ ঢুকে গেলো লোকটির মুখের ভেতর, দাঁতের ফাঁকে। আর সেই মুহুর্তেই লোকটির নিচের চোয়াল ধরে হ্যাচকা টান দিলো মীর৷
মুহুর্তেই চোয়াল ভেঙে নিচের পাটির দাঁত, জিভ সহ খাদ্যনালী, শ্বাসনালী ছিড়ে চলে এলো মীরের হাতে। সোলজারটির স্তব্ধ দৃষ্টি তখনো আঁটকে রইলো মীরের মুখের ওপর। পরমুহূর্তেই মুখথুবড়ে পড়লো সে মেঝেতে, কালচে খয়েরী রক্তে মুহুর্তেই ভেসে গেলো সে স্থান।
বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রইলো সকলে মৃতদেহের দিকে। ইয়াসমিন চোখ খিচে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো, বিড়বিড়িয়ে প্রার্থনা করতে রইলো সে অনবরত।
অন্যান্য সোলজার গুলো অস্ত্র ফেলে দিলো মুহুর্তেই, তড়িঘড়ি বসে পড়লো মীরের পায়ের কাছে। হাত জোড় করে অনুনয়ের স্বরে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ক্ষমা করুন! এবারের মতো ক্ষমা করে দিন আমাদের! এখানেই কেউ নেই ইয়োর ম্যাজেস্টি, অন্তঃসত্ত্বা খাস বাদিটি ব্যাতিত আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি এখানে নেই ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমাদের ক্ষমা করুন, দয়া করে প্রাণ ভিক্ষা দিন!”
মীরের ক্ষুরধার দৃষ্টি ঘুরে চলল চারদিকে, শকুনি চোখ জোড়া দিয়ে দাসীগুলোর ভেতর খুজে চলল অন্তঃসত্ত্বা কোনো অস্তিত্ব কে। ওকে এভাবে তাকাতে দেখে ভয়ে, আতঙ্কে দেয়ালের সাথে মিশে পালাতে চাইলো দাসীগুলো, ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কেউ কেউ।
কিছুক্ষণ এদিক ওদিক দেখতেই চোখে পড়লো একটি বদ্ধ কারাগার, ভেতর থেকে আবছা আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে তার৷ সেদিকে তাকিয়ে মীর নিষ্ঠুর হাসলো, কুড়ালটি মৃতদেহের মাথা থেকে হ্যাচকা টানে বের করে কাঁধের ওপর তুলে এগোলো সেদিকে।
আঁতকে উঠলো ইয়াসমিন। শঙ্কিত, পান্ডুর চেহারা নিয়ে তাকিয়ে রইলো মীরের যাওয়ার পানে। অরোরাকে যেকোনো বিপদ, আক্রমণ থেকে রক্ষা করার শপথ গ্রহণ করা দাসী গুলো ছুটে এসে লুটিয়ে পড়লো মীরের পায়ের কাছে। কেঁদেকেটে অনুনয় করলো যেন অরোরার প্রাণ ভিক্ষা দেয়, নিজ গর্ভে সে দেমিয়ান সন্তানই বহন করে চলেছে!
কিন্তু মীরের কানে এলোনা কিছু, সে ভারী পা ফেলে ধাবমান হলো কারাগারটির দিকে। দাসীরা এবার ছটফটিয়ে উঠে সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরলো তার পা! মীর ভয়ানক ক্রুদ্ধ হলো তাতে, চোয়াল শক্ত করে বা হাতে ধরা তলোয়ারটি ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে কোপ বসালো হাত গুলোর কবজিতে!
বিধ্বংসী যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলো মেয়ে গুলো! রক্তের বন্যা বয়ে যেতে রইলো মীরের পায়ের নিকট, কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের পায়ের সাথে আঁটকে থাকা বিচ্ছিন্ন হাত গুলো পা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিয়ে এগোলো সে সামনের দিকে৷
পেছনের বেঁচে থাকা সৈন্য গুলো তৎক্ষনাৎ ছুটলো সেদিকে৷ কারাগারের সামনে গিয়ে মীরের পথ আঁটকে দাঁড়িয়ে পড়লো তারা, হাত জোড় করে অনুরোধ করে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি! দাসীটিকে ক্ষমা করুন, তার কোনো দোষ নেই! মেয়েটি সন্তানসম্ভবা, তাকে রেহাই দিন! আমাদের প্রার্থনা শুনুন একবার!”
মীর ধৈর্য হারালো এবার, দাঁতে দাঁত চাপলো। এদেরকে দয়া দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়াই উচিত হয়নি তার, বেশি পেয়ে গেছে এরা।
মুহুর্তেই কুড়াল ঘুরিয়ে, যে সৈন্যটি কথা বলছিলো তার মুখের ওপর কোপ বসিয়ে দিলো মীর৷ তৎক্ষনাৎ রক্তের ফোয়ারার সাথে সামনের দাঁত গুলোর কয়েকটি ছিটকে বেরিয়ে এলো তার।
হ্যাচকা টানে আবার বের করে নিয়ে এলো কুড়ালটি। দ্বিখণ্ডিত হওয়া মুখখানা নিয়ে বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রইলো সৈন্যটি, পরক্ষণেই আছড়ে পড়লো মেঝেতে। মীর এবার কাজে লাগালো দুই হাতই। তালওয়ার, কুড়াল দুটো দিয়েই ঝড়ো গতিতে একেরপর এক কোপ বসিয়ে প্রাণনাশ করলো সে সৈন্যগুলোর৷
এত এত রক্ত, নিষ্ঠুরতা নিতে পারলোনা বৃদ্ধা ইয়াসমিনের দুর্বল হৃদয়। অতিরিক্ত ভয়, উত্তেজনায় আচমকা হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়লো সে মেঝেতে। কিন্তু এগিয়ে এলোনা কেউ তার জন্য, ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো দাউরে!
নিভুনিভু চোখ জোড়া দিয়ে ইয়াসমিন তাকিয়ে দেখলো কারাগারের ধাতব দরজা ফেঁড়ে চিড়ে ফেলতে থাকা মীরের দিকে৷ দম ফুরিয়ে যাবার আগ মুহুর্তে তার স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠলো বহু বছর আগেকার সেই মিষ্টি মধুর স্মৃতি, যখন আজকের এই নির্মম, নিষ্ঠুর ব্যাক্তিই স্নেহপূর্ণ স্বরে ‘ইয়াসমিন’ বলে ডাকতেন তাকে। আর ইয়াসমিন ছোট্ট ছোট্ট পায়ে, দুরুদুরু বুকে গিয়ে দাঁড়াতো দরজার কাছে।
ভেতরে ঢোকার সাহস পেতোনা যে! বেলিন্ডা নামক মিষ্টি দাসীটির কড়া মানা ছিলো। অথচ শেহজাদীকে একটিবার দেখতে, তার আদর পেতে মনটা আঁকুপাঁকু করতো ইয়াসমিনের৷ সেটা বুঝতে পারতেন হিজ ম্যাজেস্টি, ইয়াসমিনকে রয়্যাল ফ্লোরের বারান্দায় গুটিগুটি পায়ে হাটতে দেখে ডাক দিতেন! নিজের খাবারের থালা হতে খাবার উঠিয়ে দিতেন ইয়াসমিনের হাতে। দ্বিধাভরে, ছোট্ট হাত খানা বাড়িয়ে নিতো সে সুস্বাদু, লোভনীয় খাবার গুলো!
হায় কোথায় গেলো সে দিনগুলো! কোথায় গেলো সেই বনফায়ারের রাত, সেই হাসিখুশি বনভোজন, জঙ্গল জুড়ে ভাইগুলোর সাথে ছুটে বেড়ানো, চাঁদ রাতে কালাচাঁনের সাথের খুনসুড়ি, শেহজাদীর হাতের এত্ত মজার খাবার!
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ মুহুর্তে ফিসফিসিয়ে সেই অপ্সরার ন্যায় দীপ্ত নারীটির উদ্দ্যেশ্যে ইয়াসমিন বলে উঠলো,
“ফিরে আসুন আম্মা, একটি বার ফিরে আসুন…..!”
কারাকক্ষের ধাতব দরজা ভেঙেচুরে মীর যখন ভেতরে ঢুকলো তখন অরোরাকে আগলে দাঁড়িয়ে পড়েছে ভেতরের সমস্ত দাসীরা। চোখে মুখে তাদের আতঙ্ক, ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করেছে চেহারা!
অরোরা কাঁদছে, পেটের ওপর ঠেকানো একটি হাত। বাচ্চাটিকে পৃথিবীর আলো বুঝি আর দেখাতে পারবে না!
তিনি কি জানতে পারেননি, তার অনাগত সন্তানের এমন বিপদ? তিনি কি একটিবার আসবেন না এই বিপদ হতে অরোরাকে উদ্ধার করতে?
মীর রক্তমাখা শরীরে, হাতে কুড়াল ধরে যখন সামনে এসে দাঁড়ালো, তার ভয়াল রূপ দেখে প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম হলো সকলের। অরোরা তখনো চেষ্টায় রইলো নিজেকে প্রাণপণে আড়াল করতে, যেন মীরের খুনো দৃষ্টি তার ওপর না পড়ে, এবারের মতোন প্রাণে বাঁচে সে!
কিন্তু মীর নির্বিকার চিত্তে এগোলো সামনে, অরোরাকে সুরক্ষা দিতে থাকা দাসীদের কেউ আতঙ্কে জ্ঞানশূন্য হয়ে দিক্বিদিক ছুটে পালালো, কেউ পিছিয়ে গেলো প্রান হারানোর শঙ্কায়! বাকিরা অনুনয় করে লুটিয়ে পড়লো মীরের পায়ে।
আর মীর….. সামনে যাকে পেলো তাকেই তলোয়ার আর কুড়ালের কোপে, ক্ষিপ্র বেগে ছিন্নভিন্ন করতে করতে এগিয়ে গেলো সামনে৷
সবশেষে অরোরা দাঁড়িয়ে রইলো একা। চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় ঝরতে লাগলো পানি। ফুঁপিয়ে উঠে দুহাতে নিজের পেটটিকে আকড়ে ধরলো সে। মীর এসে দাঁড়ালো তার সামনে, তাকালো অরোরার ঢাউস পেটের পানে৷
অরোরা আর্তনাদ করে উঠলো, কান্না জড়ানো অসহায় গলায় বলে উঠলো,
“ক্ষমা করুন, ছেড়ে দিন আমাকে। আমার গর্ভে দেমিয়ান সন্তান বড় হচ্ছে, আপনার বংশের রক্ত বইছে তার শরীরে। আচ্ছা… আম্-আমাকে আর কিছুদিন সময় দিন! আমার সন্তানটি পৃথিবীতে আসুক, এ পৃথিবীর আলো দেখুক, তারপর আপনি আমাকে মারুন কাটুন যা ইচ্ছা করুন আমার কোনো অভিযোগ থাকবে না৷
দয়া করুন, এই অধমকে রেহাই দিন! আমার বাচ্চাটিকে বাঁচতে দিন…! তাকে এ পৃথিবীতে আসতে দিন!”
অরোরার আর্তনাদ, অনুনয়, অনুরোধ কিছুই স্পর্শ করলোনা মীরের পাথুরে হৃদয়। কুড়ালটির হাতল শক্ত করে ধরে এগিয়ে এলো সে, আর তার পরমুহূর্তেই বজ্র গতিতে কুড়াল ঘুরিয়ে কোপ বসালো অরোরার তলপেটে, তারপর হ্যাচকা টানে কুড়াল টেনে তুললো অরোরার বক্ষের নিম্নভাগ পর্যন্ত! মুহুর্তেই পেট ফেড়ে ফোয়ারার ন্যায় কলকলিয়ে বয়ে চলল রক্ত!
মরণ যন্ত্রণায় স্তব্ধ হয়ে গিয়ে বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রইলো অরোরা, পরক্ষণেই বল হারিয়ে হাটু ভেঙে ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে। সাথে সাথেই চেরা ফাঁড়া পেটের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এলো প্রায় পরিপূর্ণ বাচ্চাটি, মাথার একাংশ বিচ্ছিন্ন, পড়ে আছে গর্ভথলিতে।
কড়কড় শব্দে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে রেড জোনে, লাইফট্রির চতুর্দিকে আনাবিয়াকে ঘিরে বয়ে চলেছে বিদ্যুতের ঝলকানি। আনাবিয়া বসে আছে পূর্বের মতোন, চোখ জোড়া খোলা৷ তা হতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে উজ্জ্বল সাদা আলোচ্ছটা, দৃষ্টি গোচর হচ্ছে না তার হীরকখন্ডের ন্যায় চক্ষুমণি।
পুড়ে শেষ হয়ে গেছে তার শরীরের অধিকাংশ আবরণ, উন্মুক্ত হয়ে আছে তার উদর, উরু, গ্রীবা। অবশিষ্ট পোশাকে কোনো রকমে ঢেকে আছে তার বক্ষ, কোমরের নিম্নাংশ। সফেদ চুল গুলো যেন স্বয়ং হয়ে উঠেছে বজ্র আলোক, ডালপালা মেলে তারা সেঁটে আছে লাইফট্রির শক্ত বাকলের ফাঁকফোকর গলিয়ে৷
ঠোঁট নড়ছে তার অনবরত, যেন বিদ্যুৎ গতিতে বলে চলেছে সে কথা, কারো সাথে৷ কমান্ড দিয়ে চলেছে একের পর এক।
হঠাৎ লাইফট্রির আশেপাশে এসে উপস্থিত হলো একটি অবয়ব। দূর থেকে আনাবিয়ার প্রায় উন্মুক্ত, মোলায়েম, লোভনীয় শরীরের প্রতি নিজের মুগ্ধ, কামুক দৃষ্টি স্থাপন করে এগিয়ে এলো সে।
দাঁড়ালো লাইফট্রির সম্মুখে, নির্দিষ্ট দুরত্বে, যেন বিদ্যুতের উদ্দাম নৃত্যরত রেখা গুলো তাকে স্পর্শ করতে না পারে। তারপর নিজের মাদকতা পূর্ণ দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে চলল আনাবিয়ার উন্মুক্ত কোমর, নাভি, বক্ষমঞ্জরী, বক্ষের সুগভীর সুডৌল খাজে।
যন্ত্রের ন্যায় বসে থাকা আনাবিয়া যেন টের পেলো তার শরীরে ঘুরে চলা নোংরা, লোলুপ দৃষ্টি৷ দৃষ্টি কাঁপলো তার, মাথাটা কিঞ্চিৎ ঘুরিয়ে নিজের আলোচ্ছটায় পূর্ণ শূন্য দৃষ্টি স্থাপন করলো সে সম্মুখে দাঁড়ানো থিয়োডরের দিকে।
চতুর্দিকের খেলে যাওয়া বিদ্যুতের গতিবেগ বাড়লো হঠাৎ, বাড়লো আওয়াজ, যেন ধূলিসাৎ করে দিবে এই শিরো মিদোরি!
থিয়োডর ভড়কালো, পিছিয়ে যেতে নিলো আনাবিয়ার নাগাল হতে। সেই মুহুর্তেই লাইফট্রির শরীরে সেঁটে থাকা আনাবিয়ার চুল গুলো নড়ে উঠলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে, প্রতিটি সফেদ চুল পরিণত হলো সুক্ষ্ম, ধারালো ধাতব তন্তুতে! ফুসে উঠে সর্পের মতোন যেন ফণা তুললো তারা থিয়োডরের দিকে ফিরে!
আনাবিয়ার দীর্ঘ চুলের দিকে দৃষ্টি যেতেই থমকালো থিয়োডর, পরক্ষণেই তীব্র আতঙ্কে উর্ধশ্বাসে পালাতে চাইলো ছুটে! কিন্তু কয়েক কদম বাড়ানো মাত্রই ধাতব ঝমঝম শব্দ তুলে ঝড়ো গতিতে তার পিছু ছুটে গেলো আনাবিয়ার সফেদ কেশগুচ্ছ, পরমুহূর্তেই থিয়োডরের পৃষ্ঠদেশ ভেদ করে শরীরে বিঁধলো সূঁচের ন্যায় হাজার হাজার তীক্ষ্ণ তন্তু।
থিয়োডর স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ, এতটুকু নড়তে সক্ষম হলোনা আর! পিঠ ভেদ করে তন্তু গুলো শরীরে প্রবেশ করা মাত্রই এক অদ্ভুত, সুক্ষ্ম যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়লো তার সমস্ত দেহে! তীক্ষ্ণ তন্তু গুলো ক্রমশ ঢুকে যেতে লাগলো আরও গভীরে; মাংস, পেশী ছিদ্র করে একটু একটু করে ভেতরে এগিয়ে যেতে রইলো তার।
থিয়োডরের যেন সময় লাগলো যন্ত্রণাটা পুরোপুরি বোধ করতে, ক্ষণিক পর হঠাৎই বড় বড় হয়ে এলো তার নীল বর্ণের চোখ জোড়া, পরক্ষণেই তার বিকট বিধ্বংসী চিৎকারে কেঁপে উঠলো রেড জোন।
কয়েকটি তন্তু হঠাৎই দিক পরিবর্তন করে ধাবিত হলো থিয়োডরের মস্তিষ্কের দিকে, আর তারপর পৌঁছে গেলো মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স, অ্যামিগডালা, হিপোক্যাম্পাসে! তন্তু গুলো সেখানে স্থাপিত হওয়া মাত্রই থিয়োডর অনুভব করতে শুরু করলো সেই সমস্ত অসহনীয় যন্ত্রণা, ভয়, আতঙ্ক যা অনুভব করেছিলো তার দ্বারা নিষ্ঠুর, নির্মম, জঘন্য ভাবে অত্যাচারীত হওয়া প্রতিটা মেয়ে!
পিঠ ভেদ করে আসা তন্তু গুলো গভীরে যেতে যেতে ক্রমশ মাটি থেকে শূন্যে উঠে গেলো থিয়োডর! সেগুলো একসময় বেরিয়ে এলো থিয়োডরের বক্ষ, উদর ভেদ করে। থিয়োডরের তীব্র যাতনা পূর্ণ চিৎকার তখনো কাঁপিয়ে চলল জঙ্গল!
আচমকা উগ্র হয়ে উঠলো তন্তুগুলো, পরক্ষণেই সম্মুখে এগোনোর পরিবর্তে জোর গতিতে চতুর্দিকে সরে মেলে যেতে শুরু করলো তারা। ধাতব তন্তুগুলোর পার্শ্ব চাপে ক্রমে ক্রমে উদর হতে ফেঁড়ে চিড়ে যেতে শুরু করলো থিয়োডরের শরীর, ফাঁড়তে ফাঁড়তে একসময় হঠাৎ করেই তন্তুগুলো তীব্র বেগে ছিড়েখুঁড়ে বেরিয়ে এলো থিয়োডরের শরীর! তার ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত, সুক্ষ্ম মাংস টুকরো গুলো ঝড়ো বাতাসে উড়ে চলে তুলোর মতোন একের পর এক আছড়ে পড়লো মাটিতে!
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫১
আনাবিয়া মনোযোগ সম্পুর্ন ভাবে আবার ফিরলো যুদ্ধ ক্ষেত্রে, চুলগুলো আবার ফিরে গেলো পূর্বের স্থানে৷ থিয়োডরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিন্ন টুকরো গুলোতে জমতে শুরু করলো পিঁপড়ে, ক্রমে ক্রমে জড় হলো আরও অনেকে। রেড জোনের নানা প্রান্তে একটু একটু করে বয়ে বয়ে নিয়ে গেলো তারা মাংস টুকরো গুলো।
বাচ্চাদের সাথে সংযুক্ত হয়ে, তাদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা, শক্তি দিতে যন্ত্রের ন্যায় বসে থাকা আনাবিয়া কেঁপে উঠলো হঠাৎ, পাতলা ঠোঁটে অস্ফুটে উচ্চারণ করলো,
“কোকো….”
