Remedy part 26
মীরা রায়াদ
” কিছু না জানিয়ে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেলি কেন? কি দোষ ছিল আমার? কেন ঠকালি?”
” আমি?”
ঝুম এতটাই অবাক হলো যে কিছু বলার ভাষা পেলো না। ডিভোর্স তো নয়নদের তরফ থেকে এসে ছিল, তাহলে এখন কেন তাকে দোষ দেয়া হচ্ছে?
” হয়তো ওরা তোর ওপর অত্যাচার করতো, কিন্তু আমার জন্য আর কিছুদিন কি অপেক্ষা করতে পারতি না ঝুম? ফিরে এসে যখন জানতে পারলাম তুই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিস, কেমন লেগেছিল জানিস? অথচ দেখ বেঈমানেরা ঠিকই ভালো থাকে, সুখে থাকে।”
নয়নের চোখে জল। কন্ঠ কাপছে। এতগুলো দিন শুধু ঝুমের জন্য অপেক্ষা করে গেছে। অথচ আজ যখন পেলো তখন সে অন্য কারো বউ! হায় পরিহাস। যাকে নিয়ে এতো স্বপ্ন, আশা সেই মানুষটা এখন অন্য কারো।
শাইয়ান নিজেও অবাক হলো ভারী। ঝুম যে বললে ছিল ওর ফুপু ডিভোর্স পেপার এনেছিল। তার মানে এখানেও কোনো কারসাজি ছিল ওনাদের?
” আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে মি.। আরীবা আপনাকে ছেড়ে যায়নি। বরং তার আগে আপনার মা ডিভোর্স পেপার এনে ছিল। এবং এরপর ওরা আরীবাকে অন্য কোথাও বিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করে ছিল।”
নয়ন বিশ্বাস করলো না। তার মা তো সব জানতো। সে জানতো ঝুমকে নয়ন কতটা চাইতো। তাহলে কিভাবে সম্ভব?
” মিথ্যে। সব মিথ্যে। আপনারা আমাকে বোকা বানাতে চাইছেন।”
” বিশ্বাস না হলে আপনার মাকে প্রশ্ন করুন।”
নয়ন চুপ করে গেল। এতো দিনের বিশ্বাস , আশা, স্বপ্ন এক এক করে ভেঙে গেলো তার। আপন রক্ত তাকে ধোঁকা দিয়েছে।
সে ঝুমের চোখে চোখ রেখে কাপকাপা গলায় বলল –
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” যখন তোকে সবাই মারতো, বকতো আমার কেনো যেন খুব কষ্ট লাগতো জানিস। তোর প্রতি মায়া কাজ করতো সর্বদা। তখন সেটা ভালোবাসা ছিল কি না আমি জানি না। কিন্তু তোকে ভালো রাখতে ইচ্ছা করতো। মা বুঝতে পেরেছিল তোর প্রতি আমার অনুভূতি। একদিন সরাসরি প্রশ্ন করলো, তোর আর আমার মাঝে কিছু চলছে কি না। আমি তখনো নিজের অনুভূতি বুঝতাম না। তাছাড়া তুইও তো ভীষণ ছোট ছিলি। বলে ছিলাম কিছুই নেই আমাদের মাঝে। তার কিছু দিন পর মা বলল বিদেশে পড়তে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি কিছুতেই যেতে চাইনি জানিস। তোকে ছেড়ে যেতে হবে ভেবে কত পাগলামোই না করে ছিলাম। মা বলল আমি যদি এখন তার কথা শুনি তাহলে সে তোকে সারা জীবনের জন্য আমার করে দিবে। আমি রাজি হয়ে যাই। চোখের পলকে বিয়েটা কিভাব হলো আমি বুঝিনি। কিন্তু যখন বুঝলাম এখন থেকে তুই আমার, সে কি শান্তি লাগছিল। তোকে অনেক কিছু বলার ছিল কিন্তু বলতে পারিনি ঝুম। তোর জন্য সেদিন সারারাত আমি অপেক্ষা করেছি। তারপরের দিনও আমি তোর দেখা পাইনি। ভীষণ কষ্ট হয়ে ছিল জানিস? অভিমান হয়ে ছিল তোর ওপর।
তারপর নিজেকে বুঝালাম তুই তো বাচ্চা মেয়ে, এসব বোঝার বয়স হয়নি। তোকে সময় দিলাম। কখনো মা, কখনো নানীকে ফোন করে তোর খোঁজ নিতাম। তোর সাথে কতবার কথা বলতে চেয়েছি কিন্তু প্রতিবার শুনতে হয়েছে ঝুম কথা বলতে চায় না। বড্ড কষ্ট হতো রে ঝুম। ( বুকের বা’পাশে হাত রেখে) এখানে বড্ড কষ্ট হতো। তুই বুঝতি না। সেখানে থাকতে আমি প্রতিটা দিন ভেবেছি আর কিছুদিন তারপর তোর কাছে চলে আসবো। রাত হলে তোর প্রতি রাগ, অভিমান, ভালবাসায় ভেসে যেতাম আমি। ভাবতাম আমার ছোট্ট নাবালিকা বউটা এখন কতটুকু হয়েছে। বিশ্বাস কর ভালোবাসা কি আমি জানি না। কিন্তু তুই আমার কাছে মায়ার ছিলি, ভীষণ মায়ার ছিলি। ( পরপর পকেট হাতড়ে একটি আংটি বের করে বলল ) ওখানে গিয়ে ছাত্র অবস্থায় ভালো চাকরি পাইনি।
ছাত্রদের জন্য ছোট খাটো পার্ট টাইম কাজের ব্যবস্থা থাকে, তাই করতে হতো। সেই টাকা দিয়ে পড়ার খরচ, থাকা – খাওয়া খুব কষ্টের ছিল রে ঝুম। তবুও আমি প্রতি মাসে তোর জন্য কিছু টাকা জমাতাম। এই দেখ সেই টাকা দিয়ে আমি তোর জন্য এটা কিনে এনে ছিলাম ঝুম। কিন্তু এসে যখন শুনলাম তুই ডিভোর্স পেপারে সাক্ষর করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিস, আমার সেদিন মনে হয়ে ছিল আমি শূন্যে ভাসছি। কতো স্বপ্ন দেখে ছিলাম আমি তোকে নিয়ে, সব ভেঙে গেল একমুহূর্তে। তোর সাথে তো আমি বৃদ্ধ হতে চেয়ে ছিলাম ঝুম, তাহলে আমার সাথে এমন কেন হলো? আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। কারো ক্ষতি করিনি। শুধু তোকে চেয়ে ছিলাম, তাহলে আল্লাহ কেন তোকে আমার করে দিয়েও কেড়ে নিলো?”
সত্যি বড় তিক্ত হয়। আমরা যা দেখি বা শুনি সর্বদা যে তাই হবে তেমন নয়। কিছু মানুষ না চাইতেও ভুক্তভুগী হয়ে যায়। কেমন নয়ন হয়েছে। মাকে বিশ্বাস করে ঠোঁকেছে। এতদিনে জানা সকল মিথ্যে একে একে উম্মোচন হচ্ছে। ছেলেটি ভেঙে পড়েছে। না পাওয়ার যন্ত্রণা হয়তো তারাই জানে যারা হারায়।
শাইয়ানের চোখে মুখে আতঙ্ক, ভয়। সে এমনটা একদম আশা করেনি। তার ইনফরমেশন অনুযায়ী ছেলেটি বিদেশ থেকে এসেছে প্রায় ৩/৪ বছর হলো। তারপর থেকেই বিভিন্ন ভাবে নেশায় জড়িত। তাছাড়া ঝুমের অতীত বলে এর বেশি জানার আগ্রহও হয়নি শাইয়ানের। সে শুধু ছেলেটিকে এখানে ডেকে দেখাতে চেয়ে ছিল ওকে ছাড়া ঝুম অনেক বেশি ভালো আছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই ছেলেকে এখানে ডেকে ভুল করেছে। ঝুম কি তাকে ছেড়ে যাবে এখন? না না কি সব ভাবছে সে! ঝুম তাকে ভালবাসে। তাছাড়া ঝুম জানে ঝুমকে ছাড়া শাইয়ান কত বেশি অসহায়। অবশ্যই এই ছেলের জন্য ঝুম শাইয়ানকে ছেড়ে যাবে না। সে ঝুমের দিকে আরও একটু এগিয়ে এলো। যতো যাই বলুক ভয় সে পাচ্ছে তা তার মুখ দেখে ভালই বোঝা যাচ্ছে। ঝুম এতকিছু জানতো না। তাকে কেউ কখনো বলেওনি। তার বয়স বেশি ছিল না। এছাড়া তার আম্মা তাকে যেভাবে আগলে রেখে ছিল তাতে তার এতকিছু বোঝার কথাও না। ঝুম শাইয়ানকে দেখে নিল একপলক। চোখের ইশারায় শাইয়ানকে আস্বস্থ করে সামনে ফিরে চাইলো। ভীষণ সুন্দর করে শান্ত গলায় বলল –
” আপনি যাওয়ার পর ওরা আমাদের জীবনটা বিষিয়ে দিয়ে ছিল। আমাদের ওপর অত্যাচার করতো খুব। আমার স্বাধীনতা যতটুকু ছিল তাও আপনার মা কেড়ে নেয়। আমার কথা ছাড়ুন, আমার আম্মা? ওরা আমার আম্মার সাথে কি কি করেছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবেন না। তাছাড়া আমাকে কেউ কখনো আপনার কথা বলেনি নয়ন ভাই। না আপনার ফোনের কথা বলেছে আর নাই বা আপনার ব্যাপারে কোনো তথ্য দিয়েছে। আমি সত্যিই জানতাম না এসব কিছু। আমার বয়সই বা কতটুকু ছিল বলুন? আপনার অনুভূতির ব্যাপারে আমি কিছু জানতাম না বিশ্বাস করুন। তবুও আমি ওই দিনের আগ মুহূর্ত পর্যত একজন বউয়ের সকল দায়িত্ব পালন করেছি। নিজেকে হেফাজতে রেখেছি। আমার তরফ থেকে কোনো কমতি ছিল না। আর যদি বলেন আপনার প্রতি কোনো অনুভূতি ছিল কি না? তবে বলবো, আমি বড় হয়েছি অস্বাভাবিক পরিবেশে। যেখানে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকতে লড়াই করতে হয় সেখানে ভালোবাসা, অনুভূতি তো বিলাসিতা তাই না? আমি আপনার অনুভূতিকে সন্মান করি নয়ন ভাই। কিন্তু এখন সবটাই অতীত। এখন আমার বর্তমান, ভবিষ্যৎ আমার স্বামী। আমি ওনার সাথে সুখে আছি নয়ন ভাই। এই নরক থেকে আমি হাজার গুণ ভালো আছি এখন। আমারও সুন্দর একটি পরিবার আছে এখন। আমি নিজের মতো বাঁচতে পারি। কেউ কটূ কথা বলে না আমায়। অতীতে আপনার বা আমার কোনো দোষ ছিল না। নিয়তি এভাবে লিখে রেখে ছিল, তাই হয়েছে। মেনে মেনে নিন।”
নয়ন ঝুমের মিষ্টি ভাষায় বলা কথাগুলো মন দিয়ে শুনল। অতঃপর দুহাতে মুখ চেপে ডুকরে উঠে বলল –
” তুই আমার কেন হলি না ঝুম? এক জীবনে আমার হলে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো? আমার এতো অপেক্ষার এই প্রতিদান কেন পেলাম আমি?”
শাইয়ানের রাগ হচ্ছে খুব। এই লোকের সমস্যা কি? যখন সময় ছিল তখন অন্ধের মতো মায়ের ওপর ভরসা করে এখন তার বউকে দোষ দিচ্ছে? অসহ্য। শাইয়ান কিছু বলতে গেলে ঝুম তাকে থামিয়ে দিলো।
” শান্ত হন নয়ন ভাই। অতীতকে ভুলে যাওয়াই ঠিক হবে। আমরা দুজন পরিস্থিতির শিকার মাত্র। নিজেকে সামলে নিন। আমি ভালো আছি।”
” সত্যিই ভালো আছিস?”
” জ্বি আলহামদুলিল্লাহ্। খুব ভালো আছি।”
নয়ন উঠে দাড়ালো। তার চোখে পানি। প্রতিটি মানুষ ভালোবাসার কাছে অসহায়। ভীষণরকম অসহায়। আমরা যাকে ভালবাসি তারা আমাদের ভালবাসে না। এই সত্যটি মেনে নিতে হবে। নয়ন বুঝতে পরলো, ঝুমের বিরহ তাকে সারাটি জীবন কাদাবে। তবুও সে খুশি। ঝুম ভালো আছে এতটুকুই যথেষ্ট। ভালোবাসলেই যে পেতে হবে এমন তো কোনো শর্ত দেয়া নেই। না পাওয়ার মাঝেও সুখ আছে। তার একতরফা ভালোবাসা না হয় সে একাই বয়ে নিক। ভালো থাকুক ভালোবাসার মানুষ গুলো। আজ শুধু তার মায়ের মিথ্যে স্বার্থের জন্য সে ঝুমকে পেয়েও হারালো।
নয়ন চোখ ভর্তি পানি নিয়ে হাসলো ঝুমের পানে তাকিয়ে।
” তুই ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকবো। এতো দিন শুধু তোর জন্য এইদেশে পরে ছিলাম। এখন আর এখানে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি এবার একেবারে দেশ ছেড়ে চলে যাবো। আমাদের হয়তো আর দেখা হবে না। সাবধানে থাকবি। আর কখনো কোনো প্রয়োজন পরলে আমাকে স্মরণ করিস। মনে রাখবি কেউ থাকুক আর না থাকুক আমি সর্বদা তোর সাথে আছি, থাকবো। আসি রে ছোট্ট পাখি।”
নয়ন আর দাড়ালো না। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো। তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে ঝুম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সত্যি বলতে নয়নের জন্য তার মনে কখনো কোনো অনুভূতি জন্মায়নি। সেই সময়, সুযোগ কোনটিই সে পায়নি। কিন্তু আজ সব জানার পর নয়নের জন্য একটু খারাপ লাগা কাজ করছে।
শাইয়ান ঝুমকে ওভাবে দরজার পানে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফুঁসে উঠলো। এমনিতেই নয়নের বলা কথা গুলো তার শরীরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তারওপর আবার শেষে ছোট্ট পাখিও বলেছেন ভাবা যায়! তার বউকে তার সামনে অন্য কেউ পাখি বলে গেলো আর সে কিছুই করলো না! রাগে নাক লাল করে ঝুমের মুখটি দুহাতে ধরে নিজের দিকে ফিরে বলল –
” ওদিকে কি? এদিকে এদিকে তাকাবেন। এদিক ওদিকে কি এতো? আমাকে দেখতে মন চায় না?”
ঝুম অবাক হয়ে বলল –
” মন চাইবে না কেন? আপনাকে রোজই তো দেখি ডক্টর।”
” তাই?”
ঝুম মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। শাইয়ান আয়েশ করে বসে বলল –
” তাহলে দেখতে থাকুক। যতক্ষন পর্যন্ত আমি না বলবো ততক্ষন আমাকে দেখতে থাকুন। পরপুরুষের দিকে তাকানো তাই না?”
ঝুম বিস্মিত। এই লোক এতো হিংসুটে আল্লাহ্! সে মাথায় হাত দিয়ে বলল –
” কি বাচ্চামো এসব ডক্টর। সরুণ তো। সকাল থেকে যে কিছু খাইনি ভুলে গেছেন?”
শাইয়ান ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এতো কিছুর মাঝে তার মনেই ছিল না যে ঝুম খায়নি কিছু। মেডিসিন ও তো দিতে হবে তাকে।
” আপনি একটু বসুন আমি খাবারের ব্যবস্থা করছি।”
শাইয়ান বলতে বলতে ব্যস্ত পায়ে ছুটল। পথিমধ্যে শ্রাবনীকে ডেকে ঝুমের কাছে বসতে বলে খাবার আনতে গেল।
পরদিন ভোর হতেই তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। ঝুমের মামা অনেক করে বললেন তাদের বাড়িতে যেতে। কিন্তু ঝুম রাজি হলো না। যে বাড়িতে তার আম্মার ঠাঁই হলো না সেখানে সে যেতে চায় না। পরবর্তীতে অবশ্য ঝুমের নানাবাড়ির লোকেরা তার সাথে দেখা করতে আসতে চাইছিল। কিন্তু সময় স্বল্পতার জন্য পারেনি। ঝুম বলেছে পরের বার বাংলদেশে আসলে দেখা করবে তাদের সাথে। ঝুমের আম্মার বাড়িতে এখন জলিল শিকদারের দুই ছেলে – মেয়ে ও এক দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা রয়েছে। তাদের শাইয়ানই বাড়ি ও বাচ্চা দুজনকে দেখা – শুনার জন্য রেখেছে। ঝুম আসার আগে বারবার করে বলে দিয়েছে তার আম্মার কবর যেন প্রতিদিন পরিষ্কার করা হয়।
তাছাড়া গতকাল বিকেলে ঝুম শাইয়ানকে দিয়ে কোথা থেকে যেন কিছু ফুলের গাছ আনিয়েছে। সেগুলো যত্ন করে আমীরার কবরেও লাগিয়েছে। আগেও লাগিয়ে ছিল কিছু গাছ, ঝুম যখন ছিল তখন রোজ যত্ন নিতো কিন্তু তার যাওয়ার পর কেউ আর যত্ন নেয়নি। অযত্নে গাছগুলো মরে গেছে। গাড়ির জানালা দিয়ে ঝুম একদৃষ্টিতে কবরটা দেখছিল। মনে মনে ভাবলো কবরটা যদি সাথে করে নেয়া যেতো কতই না ভালো হতো। কিন্তু কিছু জিনিস আমাদের মনের ছেলেমানুষী ভাবনা ছাড়া কিছুই না। এমন অবাস্তব জিনিস কখনো সম্ভব না। ঝুম দেখলো ঐতো দূরে তার আম্মা দাঁড়িয়ে হাসছে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কথা বলার ভাষা পেলো না। যে মারা গেছে তাকে কিভাবে দেখছে সে? সে দ্রুত শাইয়ানের হাত ধরে এক আঙ্গুল তাক করে অদূরে দেখিয়ে বলল –
” ডক্টর… ডক্টর আম্মা। দেখুন ওখানে আম্মা দাঁড়িয়ে হাসছে।”
শাইয়ান জানালা দিয়ে দেখলো। কেউ নেই ওখানে। ধীরে শ্বাস ফেলে ঝুমকে জড়িয়ে ধরে বলল –
” শান্ত হোন। আবার নিয়ে আসবো কেমন? আম্মাকে আমরা আবার দেখতে আসবো।”
” কিন্তু ওখানে আম্মা কি করে সম্ভব? বিশ্বাস করুন আমি সত্যিই দেখেছি।”
” উত্তেজিত হবেন না পাখি। আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। আসুন ঘুমাবেন। ঘুম থেকে উঠলে বুঝিয়ে বলবো।”
ঝুম কথা বাড়ালো না। ওর মাথা ব্যাথা করছে খুব। ঘুম দরকার। শাইয়ানের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করার কিছু মুহূর্তের মাঝে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পেলো শাইয়ান। চিন্তায় অস্থির শাইয়ান ঝুমকে আগলে নিয়ে ব্যাক সাইডে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করলো। আহির, শ্রাবণী দুজনই খুব অবাক হয়েছে ঝুমের কথায়। আহির নিজের অবাকতা কাটিয়ে উঠতে না পেয়ে প্রশ্ন করলো –
” কি হচ্ছে এসব শাইয়ান? ভাবি কি বলছিল।”
শাইয়ান সময় নিয়ে বলল –
” হেলুসিনেশন হচ্ছে।”
শ্রাবণী চিন্তিত হয়ে বলল –
” কি?”
” হুম। মানসিক চাপ, অতীত অভিজ্ঞতা, ওনার আম্মাকে নিয়ে না জানা সত্যগুলো প্রভাব ফেলেছে। আমাদের যতো দ্রুত সম্ভব পাকিস্তান ফিরতে হবে। ওনাকে ট্রিটমেন্ট করাতে হবে। নয়তো প্রেগন্যান্সি টাইমটা ভীষণ রিস্কে থাকবে উনি ও বেবি।”
“কিহ!”
আহির, শ্রাবণী উভয়ই হতবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো। ঝুম প্রেগনেন্ট, অথচ তারা জানেনই না?
শাইয়ান ওদের চাঁচানোতে বিরক্ত হলো। মেয়েটা সবেই ঘুমিয়েছে। উঠে গেলে এই বাদর দুটোকে আস্তো রাখবে না। গম্ভীর গলায় বলল –
” আস্তে, ঘুমাচ্ছে উনি।”
তারা দুজন একে অপারের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে আঙুল চাপলো। আহির পিছন থেকে সামনে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল
” কবে জেনেছো তুমি? আমাকে কেন বললে না? বাড়িতে জানিয়েছো?”
” না এখনো কাউকে জানায়নি। আগেই বিষয়টি লক্ষ্য করে ছিলাম কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম না। তাই অপেক্ষা করছিলাম। এখানে যেদিন আসলাম সেদিন নিশ্চিত হয়েছি। এখনো প্রপার টেস্ট করানো হয়নি। আহির, আরীবা এখানে আর থাকতে চাচ্ছে না। কাল রাতে আমি ফেরার টিকিট কেটে ফেলেছি। দুদিন পর আমাদের ফ্লাইট। ভীষণ কষ্টে অ্যারেঞ্জ করেছি টিকিট গুলো। এতো দ্রুত সাধারণত পাওয়া যায় না।”
আহির এক পলক শ্রাবণীর দিকে চাইলো। শ্রাবণী মন খারাপ করে বলল –
” আর কিছু দিন থাকলে ভালো হতো না ভাইয়া? এলেন তো মাত্র কিছু দিন হলো।”
শাইয়ান পিছু ফিরে শ্রাবনীকে দেখে আবার সামনে ফিরে বলল –
” আরীবার শরীর ভালো নেই বেশি। তাছাড়া যতো দ্রুত সম্ভব ওনার চেকআপ করাতে হবে। আমি ভীষন চিন্তায় আছি ওনাকে নিয়ে। শরীর খুব দূর্বল দেখতেই তো পাচ্ছেন। আর উনিও এখানে থাকতে চাইছে না। কালকের ঘটনা নিয়ে এখন পর্যন্ত একটি কথাও বলেনি, কাদেনি পর্যন্ত। যা খুবই অস্বাভাবিক। আশা রাখছি আপনি বুঝতে পারবেন।”
শ্রাবণী বুঝলেও তার মন মানছে না। ঝুমকে আবার কবে দেখতে পাবে কে জানে। মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেলো। পুরো রাস্তায় কেউ আর কথা বলল না।
” ভাবি সোনু – মনু আসছে এই খবর আমাকে আগে কেন দেয়া হলো না?”
রাত প্রায় ৯ টা। শাইয়ান শ্রাবণকে নিয়ে বাইরে গিয়েছে কিছু মেডিসিন আনতে। আসার পর থেকেই ঝুমের খুব বমি পাচ্ছে। তাছাড়া পেগনেন্সি সিকনেসও কাজ করছে আজ খুব। তাই শাইয়ানের বাইরে যাওয়া। ঝুম বসে বসে ফোন টিপছিল। অনলাইনে বেশ সুন্দর বড় বড় দোলনা দেখাচ্ছে। শাইয়ান ফিরলে তার ইচ্ছা দোলনা দেখিয়ে একটি কিনে ফেলা। হঠাৎ আহিরের উক্ত কথায় ফোনের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি তুলে আহিরের পানে চাইলো। ছেলেটি বেজায় চটে আছে। এতো বড় সংবাদ তাকে না দিয়ে কিভাবে পারল?
ঝুম হেসে ফেলল আহিরের ছেলেমানুষী কথায়।
” ভিতরে আসুন ভাইয়া। বসুন এখানে।”
” উহু। আপনিও আপনার স্বামীর সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করা শুরু করেছেন। আই হেইট ইট।”
” আমরা জেনেছি মাত্র দুদিন হলো।”
আহির রুমে প্রবেশ করতে করতে বলল –
” হ্যাঁ তো আমি কেন দুদিন পর জানলাম?”
” আরে ভাইয়া….”
বাকি কথা শেষ হওয়ার আগে শাইয়ানের গমগমে সুর ভেসে এলো।
” আমার বউকে জ্বালাবে না আহির। যাও নিজের রুমে যাও।”
” হ্যাঁ হ্যাঁ। তোমারই তো বউ। আমাদের কিছু হয় নাকি? সব তো তোমার। মনে রেখো এসব। আবার যখন দুজন ঝগড়া করবে আমাকে একদম বলতে আসবে না। চললাম।”
যেতে যেতে থেমে গিয়ে আবার বলল –
Remedy part 25
” আমার বোনের দিকে খেয়াল রাখবে। খবরদার অযত্ন করবে না। তাহলে বড় চাচী আম্মাকে বলে ঝুমকে করাচিতেই রেখে দিবো।”
কথা গুলো বলতে বলতে সে মিলিয়ে গেলো। শাইয়ান বিরক্তের চরম সীমায় চলে গেছে। বিয়ের পর থেকে এই এক ডায়লগ শুনতে শুনতে তার কান পঁচে গেলো। বাচ্চার বাবা হতে চলেছে কিন্তু এদের হুমকি শেষ হলো না। ঝুম শাইয়ানের কুঁচকে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে স্বশব্দে হেসে ফেলল।
