Remedy part 27
মীরা রায়াদ
শাইয়ানদের ঘর থেকে বের হয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে গিয়ে আহির থেমে যায়। বসার ঘরে বসে শ্রাবণী খুব মনোযোগের সাথে স্নিকার পরছে। আহির ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখলো, আগের মতো মেয়েটির চুলগুলো রংবেরঙের নেই। মিশমিশে কালো এখন। আজ সকালেও তো দেখলো আগের মতো ছিল। তাহলে কালো হলো কখন? পরনে তার হালকা অফ-ওয়াইট শর্ট কুর্তি, যার মাঝে ছোট ছোট বিভিন্ন রঙের ফুল। সাথে ব্যাগি জিন্স আর জিন্সের সাথে মিলিয়ে গলায় ঝুলানো একটি স্কার্ফ। ওয়েস্টার্ন ড্রেসআপ হলেও আগের থেকে ভিন্ন লাগছে মেয়েটিকে। কোথাও কি যাচ্ছে? প্রশ্ন করবে? না থাক, আবার যদি ভুল বোঝে! আহির নিঃশব্দে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই ফিরে যেতে নেয়। কিন্তু শ্রাবণী দেখে ফেলল তাকে।
” আরে আপনি এখানে?”
আহির থেমে গেলো। ফিরে চাইলো শ্রাবণীর দিকে। চোখে চোখ রেখে বলল –
” হ্যাঁ, ওই আর কি শাইয়ানের সাথে কথা বলে ফিরছিলাম।”
” ওহ। এখন ঝুম কেমন আছে?”
” ভালো। কথা হয়নি আপনার?”
শ্রাবণী পাশে রাখা হেলমেটটি হাতে তুলে উঠে দাড়ালো।
” হয়ে ছিল অনেকক্ষন আগে।”
আহির বিশেষ কোনো ভাব প্রকাশ করল না। তার দৃষ্টি শ্রাবণীর হাতে ধরা হেলমেটে। শ্রাবণী লক্ষ্য করলো সেই দৃষ্টি। নিজ থেকেই বলল –
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” অনেকদিন বাইক চালানো হচ্ছে না। তাই ভাবলাম আজ ঘুরে আসি গিয়ে। তাছাড়া আজ ওয়েদারটাও চমৎকার।”
আহির কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। সে শান্ত ভাবে যেতে যেতে বলল –
” ওকে।”
শ্রাবণী ঠোঁট কামড়ে তাকালো অদ্ভুত ছেলেটার দিকে। তারপর হঠাৎ বলল –
” আপনি যাবেন?”
সাথে সাথে আহির থেমে গেলো। ফিরে তাকালো শ্রাবণীর দিকে। শ্রাবণী ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো। আহির কথা না বাড়িয়ে হেঁটে দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো। শ্রাবণী আহাম্বকের মতো তাকিয়ে দেখলো। আহির এতো অদ্ভুত কেন সে আজও বুঝতে পারেনি। সে হেলমেট হাতে দৌড় লাগালো আহিরের পিছে।
বাইরে মৃদুমন্দ বাতাস। আহির ঘরে পরা সাধারণ পোশাকে দাঁড়িয়ে। শ্রাবণী বাইক বের করে তার সামনে এসে থামলো। আহির একবার ভালো করে শ্রাবনীর বাইকটা দেখে নিলো। ভালই, খারাপ না। তারপর পকেটে হাত গুঁজে বলল –
” বাইক আমি চালাবো।”
শ্রাবণী ক্ষেপে গেলো। তার শখের বাইক সে কাউকে ধরতে দেয়না। আর এই ছেলে নাকি বলছে সে চালাবে? এহহ, শশুর বাড়ির আবদার!
” নো ওয়ে। আমি আমার বাইক কাউকে ধরতে দিই না। নিজের টাকায় কেনা বুঝছেন?”
” তো?”
” তো মানে কি হ্যাঁ? তো মানে কি? আমি বাইক চালাবো।”
” তাহলে আমি যাবো না।”
শ্রাবণী নাক ফুলিয়ে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল –
” তোর যাওয়া লাগবো না ভাই। আমি একাই যাচ্ছি।”
আহির অবাক হয়ে বলল –
” মিনিমাম কার্টেসি জানো না? নিজেই ডেকে এনে এখন অপমান করছো কেন?”
” অপমান? এখানে অপমানের কি আছে? আর আমি কি বলে ছিলাম আসেন আমার বাইক আপনি চালান? দেখুন যেতে হলে পিছনে বসে চলুন নয়তো যেতে হবে না।”
আহির হেরে যাওয়া মুখ করে তাকালো শ্রাবণীর দিকে। মেয়েটা বড্ড বেশি জেদী। বুঝলো একে বলে কাজ হবে না। অগত্যা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে বসলো শ্রাবণীর পিছনে। লজ্জা পেলো বেশ। ছেলে হয়ে একটি মেয়ের পিছে এভাবে বসতে লজ্জা তো লাগবেই। আহির বসতেই শ্রাবণী বাইক চালানো শুরু করলো। হালকা স্পিডে কোনরূপ তাড়া না দেখিয়ে শুনশান রাস্তা ধরে ধীর গতিতে চলতে লাগলো শ্রাবণীর বাইকটি। প্রথমে আহির অপ্রস্তুত হলেও এখন বেশ ভালো লাগছে। মৃদুমন্দ বাতাসে সময়টি বেশ উপভোগ করছে সে। শ্রাবণীর চালানোর হাত দারুন মানতেই হবে।
প্রায় একঘন্টারও বেশ অনেকটা পর শহর থেকে দূরে একটি নিরালয় পরিবেশে বাইকটি এসে থামলো। জায়গাটি কোথায় আহির তা জানে না, তবে ভীষণ উপভোগ্য লাগছে। না যানজট আছে, আর নাই বা দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে। দু’ধারে ধানের জমির মধ্যিখান থেকে শুরু রাস্তা। দেখে বোঝা যাচ্ছে এটি একটি গ্রামাঞ্চল। আহির নেমে সামনে এগিয়ে গেলো। শ্রাবণী বাইক পাশে রেখে আহিরের পিছু রাস্তার পাশে একটি বড় গাছের নিচে গিয়ে দাড়াল।
” অসাধারণ।”
প্রচুর বাতাস বইছে। পাশের জমিতে বোধ হয় ধানের চারা লাগানো। বেশি বড় না হলেও বাতাসের দরুন তা হেলেদুলে উঠছে। পূর্ণিমার আলোতে চারিপাশ আলোকিত। মনোরম এই দৃশ্যে আহির অবিভূত।
শ্রাবণী রাস্তার পাশে বসতে বসতে বলল –
” ছোটবেলা আমরা এখানে বড় হয়েছি।”
আহির শ্রাবনীকে বসতে দেখে নিজেও বসে পরলো।
” আমরা!”
” আমি আর পাভেল।”
” ওহ।”
এরপর কি বলা উচিত আহিরের জানা নেই। পূর্ণিমা রাত উপভোগ করতে করতে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল পিনপতন নিরবতায়। দূর আকাশে তাকিয়ে শ্রাবণী বলে উঠলো –
” এখান থেকে কাছেই আমাদের বাড়ি। এই জায়গাতে কতশত স্মৃতি রয়েছে তার হিসেব নেই। পাভেলের সাথে প্রায়ই এখানে এসে বসতাম।”
আহির ফিরে তাকালো না শ্রাবণীর দিকে। বরং দূর অজানায় তাকিয়ে
সুধাল –
” এখানে এলে কষ্ট হয় না?”
” হয়তো।”
” তারপরও কেন আসলে?”
” গত কয়েকটি বছর ধরেই এই কষ্টের বোঝা বয়ে চলছি তো তাই এখন তেমন একটা কষ্ট হয় না।”
কথাটি বলে মিষ্টি করে হাসলো শ্রাবণী। আহির এবার ফিরে চাইলো। অথচ শ্রাবণী অনড়।
” এর থেকে মুক্তি নেই?”
” চাইলে হয়তো মুক্তি পেতে পারি।”
” তাহলে মুক্তি নিচ্ছ না কেনো?”
” ইচ্ছা করে না। বেশ তো আছি। মুক্তি নিলে ওকে ঘৃণা করতে হবে। আমি ওকে ঘৃণা করতে চাই না।”
দারুন! এমন চিন্তা কয়জন করে? পাভেল ছেলেটির জন্য আহির মন থেকে সমবেদনা অনুভব করছে। ছেলেটি জীবনের একটা সময় গিয়ে খুব করে আফসোস করবে। হীরা ভেবে কাঁচকে আপন করতে গিয়ে হীরাকে হারিয়েছে। বেচারা।
” সরি।”
শ্রাবণী দূর আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে আহিরের দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো –
” কেন?”
আহির চোখ সরিয়ে নিল। অন্য দিকে তাকিয়ে খুব ধিমী স্বরে বলল –
” শুরু থেকে তোমাকে ভুল বুঝেছি। তোমার মনটা না বুঝে বাহিরের রূপ দিয়ে তোমাকে বিচার করেছি।”
শ্রাবণী শব্দ করে হেসে ফেলল।
” আপনি ভারী অদ্ভুত লোক তো! ব্যাপার না। মাঝে মাঝে এমন হয়। আমি কিছু মনে করিনি। তাছাড়া মনুষ্য অনুভূতি এমনই। আমরা যেমন ভাবি তেমনটাই চাই।”
আহির এবার শ্রাবণীর চোখে চোখ রেখে বলল –
” তুমি খুব ভালো মনের মেয়ে শ্রাবণী। ভীষণ ভালো।”
শ্রাবণী চমৎকার হেসে বলল –
” আপনিও খুব ভালো। অল্প সময়ের জন্য হলেও আমি ভালো কিছু মানুষের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। ঝুমের জন্য আর চিন্তা নেই।”
আহির কিছুই বলল না। হঠাৎ করে তার আজ খুব ভালো লাগছে। পাশে বসা মেয়েটির সাথে কথা বলে মনটা হালকা লাগছে। এই যে দুদিনের পরিচিত মেয়েটির সাথে রাতের আকাশ দেখছে, অথচ মনেই হচ্ছে না মেয়েটি তার দুদিনের পরিচিত। মনে হচ্ছে কতযুগ ধরে চেনা জানা। শান্তি লাগছে অনেক গুলো বছর পর। এর কারণ কি?
” আহির।”
আহির অদ্ভুত চোখে তাকালো শ্রাবণীর দিকে। শ্রাবণী আহিরের চোখে তাকিয়ে বলল –
” ভুলে যাওয়া সহজ নয়, কিন্তু স্মৃতি ধরে বেঁচে থাকাও ঠিক না। যা হয়েছে ভুলে যান। জীবনটাকে আরো একবার সুযোগ দিন।”
” তুমি পারবে?”
শ্রাবণী ভীষণ নরম ভাবে বলল –
” মেয়েরা অদ্ভুত শক্তি নিয়ে জন্মায়। আমরা যেমন খুব সহজে ভালবাসতে পারি, তেমন খুব সহজে মানিয়েও নিতে পারি। কিছু দিন কষ্ট হবে কিন্তু আমি জানি আমিও সামনে এগিয়ে যাবো একদিন।”
” এটাই বাস্তবতা। কারো জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না। আমার মতো মানুষগুলোর জন্য তো আরো নয়।”
” আপনি ভালো ছেলে আহির। নয়তো অনুতপ্ত হতেন না। সবাই নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে না। আপনি হচ্ছেন তার মানে আপনার খুব সুন্দর একটি মন আছে। তখন সময় ঠিক ছিল না, তাই ওমন হয়েছে। তার থেকেও বড় কথা আল্লাহ্ চায়নি। নয়তো এতো ভালোবাসা কখনো বিফলে যেতো না। ঝুম আপনাকে নিয়ে বড্ড চিন্তা করে।”
” তোমার কথাগুলো ভালো লাগছে শ্রাবণী।”
শ্রাবণী চটপটে গলায় বলল –
” লাগতেই হবে। কে বলেছে দেখতে হবে না?”
আহির হেসে উত্তর দিল –
” হ্যাঁ অবশ্যই।”
” জানেন আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমার বেচারা জামাইটা কোথায়? আমাকে নিতে আসে না কেন? ওই লোকের কি আমার কথা মনে পরে না?”
শ্রাবনীকে ভাবুক লাগলেও আহির নির্নিমেষ শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে বলল –
” আমার সামনে অভিনয় করার দরকার নেই শ্রাবণী। তুমি কাঁদতে পারো।”
শ্রাবণীর চোখেমুখে হঠাৎ আঁধার ছেয়ে গেল। দুচোখে পানির স্রোত। দমকা হওয়ার তোরে নাকি কষ্টের জোয়ার কে জানে, শ্রাবণীর চোখ থেকে পানির ধারা বইতে লাগলো। আহির পাশে বসে চুপ করে দেখলো কিচ্ছুটি বলল না। অনেক অনেকটা সময় পর শ্রাবণী নাক টেনে বলল –
” দীর্ঘ একটা সময় পর আমি একজন ভালো বন্ধু পেলাম আহির।”
আহির হেসে বলল –
” আমিও।”
শ্রাবণী হেসে বলল –
” একজন মন ভাঙা মানুষই অন্য একজন মন ভাঙা মানুষকে বুঝতে পরে।”
আহির ঠোঁটের কোন ছড়িয়ে চোখের ইশারায় সায় জানালো।
সারাদিন তোড়জোড় করে রাত ১০ টার দিকে ওরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। প্রায় রাত ১ টায় গিয়ে তারা পৌঁছালো। ঢাকার রাস্তায় শান্তির অভাব হলেও জ্যামের অভাব নেই। কিছুক্ষন পর পর জ্যামে পরতে হয়েছে তাদের। শাইয়ান ভীষণ চিন্তায় ছিল পুরোটা সময়। একেতো রাত ৩ টায় তাদের ফ্লাইট, তারওপর ঝুম অসুস্থ। জ্যামের মাঝে এতক্ষন থেকে অসুস্থ না হয়ে পরে সেই চিন্তায় অস্থির ছিল পুরোটা রাস্তা। অথচ মেয়েটা দিব্যি সকলের সাথে হাসি মজায় মেতে ছিল সারাক্ষন। আহির, শ্রাবনীর মাঝেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখা গেল আজ। বার কয়েক চোখাচোখি, হাসি – মজা হলো দুজনের মাঝে। সেদিন রাতে প্রায় ভোরের দিকে তারা দুজন বাড়ি ফিরে ছিল। একরাতের কিছু মুহূর্ত তাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বে গড়িয়ে নিয়ে গেল। এয়ারপোর্টের বাইরে দীর্ঘ সময় বিদায় পর্বের পর ঝুমরা বোর্ডিংয়ের জন্য চলে গেল। যাওয়ার আগে বারবার করে ঝুম বলে গেলো ওদের পাকিস্তান যেতে। শাইয়ান, আহিরও যেতে বলল। শ্রাবণী জানিয়েছে পাসপোর্ট করে তারা আসবে দ্রুত।
কেঁদে – কেটে অস্থির ঝুম। শাইয়ান দিশেহারা। কি থেকে কি করবে বুঝতে পারছে না। এদিকে এতো চেষ্টার পরও ঝুমের কান্না থামাতে না পেরে সে নিজেই কেঁদে দিবে এমন অবস্থা। প্লেনে থাকা অন্যান্য যাত্রীরা অদ্ভুত চোখে দেখছে তাদের। আহির বিরক্ত হয়ে উঠে এলো। তার মন মেজাজ খুব একটা ভালো নেই। বাংলদেশে আসার পর থেকে যাওয়ার জন্য অস্থির ছিল, অথচ আজ যাওয়ার বেলা যেতে মন চাচ্ছে না। মন বলছে কিছু একটা রেখে যাচ্ছে। অস্থির লাগছে খুব। কিন্তু বুঝতে পারছে না কেন। বুক ভর্তি বেদনা চেপে বসে আছে। কেন এই মন খারাপ বোঝার ক্ষমতা নেই তার।
” সমস্যা কি তোমার শাইয়ান? ওনাকে কাদিয়েছো কেন?”
শাইয়ান ভারী অসহায় ভাবে বলল –
” আমি কিছু করিনি আহির। সবই তো ঠিক ছিল। বাইরেও হাসি-খুশি ছিল, প্লেনে উঠেও তো কথা বলছিল ঠিক ভাবে। হঠাৎ কেঁদে উঠলো। সেই যে শুরু হলো আর থামছে না। আমাকে কিছু বলছে ও না। না বললে কিভাবে বুঝবো বলো? তুমি একটু দেখো না কি হয়েছে।”
প্লেনের প্রতিটি সিটে এয়ার কন্ডিশনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবুও শাইয়ান ঘেমে অস্থির। আহির তার কম কথা বলা, ডোন্ট কেয়ার ভাইকে দেখলো ভালো করে। যে কখনো কারো কথা ভাবেনি, কোনো কিছুতে পরোয়া করেনি, সেই ছেলে ভালোবাসার কাছে কি নিদারুণ ভাবে হেরে গেছে। আহির ঝুমের দিকে ফিরে চাইলো। কেঁদে চোখ মুখ লাল করে ফেলেছে একদম। আচ্ছা ঝুমের পরিবর্তে অন্য কেউ হলে শাইয়ান কি করতো? বিরক্ত হতো নাকি ধমকে দিতো? হয়তো কটূ ভাষায় কিছু একটা বলে বসতো ছেলেটি। কিন্তু এখন দেখ কেমন অসহায় লাগছে তাকে! এই একটি মেয়ে যার কাছে শাইয়ান বারবার হেরে যায়।
” ভাবি।”
ঝুম চোখ তুলে তাকালো। চোখ, নাক, ঠোঁট ভীষণ রকম লাল তার। দেখে মনে হচ্ছে একটি মাত্র টোকা পরলে রক্ত বের হবে। স্বাস্থ্য উন্নতির ফলে দেখতে মায়াবী হয়েছে আরো। গলুমোলু চেহারার মেয়েটিকে দেখলে যে কারো মায়া হবেই।
” কি হয়েছে ভাবি?
একটু থেমে যাওয়া ঝুম আবার ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলল। আহির অসহায় চোখে শাইয়ানের দিকে তাকালো। শাইয়ানের চোখ দারুন লাল। চোখের ভিতরের শিরাগুলো স্পষ্ট লাল হয়ে আছে। দুই পাগলের মাঝে আহির বোকার মতো ফেঁসে গেছে।
” শান্ত হন ভাবি। শাইয়ান চিন্তা করছে। দেখুন ওকে একবার।”
ঝুম চোখ তুলে শাইয়ানকে দেখে নিল। পরপর কান্না থামিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল। কিন্তু তখনো তার ফোপানোর আওয়াজ কমেনি।
” এবার বলুন কি হয়েছে।”
” ভয় করছে ভাইয়া।”
ভারি দুঃখী কন্ঠ তার। আহির বুঝলো না কিসের ভয়। তাই প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে রইলো। শাইয়ানও আগ্রহী চোখে জানতে চায় কিসের ভয়। ঝুম ডোগ গিলে পাশের উইন্ডোতে তাকালো। রাতের আকাশে ভালো ভাবে বাইরের কিছু দেখা যাচ্ছে না।
” এবার প্লেনে যেতে ভয় করছে খুব।”
আহির অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলো ঝুমকে। মেয়েটা প্রথমবার পাকিস্তান একাই এসেছিল। তাছাড়া বাংলাদেশে যাওয়ার সময়ও তো ঠিক ছিল। তাহলে এখন কেন ভয় পাচ্ছে? সে বড়বড় চোখ করে শাইয়ানের পানে তাকালো। শাইয়ান চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস নিলো। তারপর ধীরে দুহাতের মাঝে ঝুমকে টেনে নিয়ে বলল –
” ভয় নেই পাখি। আমি যতদিন বেঁচে আছি আপনার কোনো ভয় নেই। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুম দেন। চোখ খুলে দেখবেন আমরা করাচি চলে এসেছি।”
ঝুম বুকের মাঝের ঘাপটি পেরে বলল –
” ঘুম পাচ্ছে না ডক্টর।”
” তবুও চোখ বন্ধ করে রাখুন। একটা গল্প শুনবেন?”
ঝুম মৃদু মাথা নাড়ালো। শাইয়ান সম্মতি পেয়ে পৃথিবীর আজব আজব কথা শুরু করে দিলো। আহির এতটাই অবাক ছিল যে নিজের সিটে গিয়ে বসতে ভুলে গেল। শাইয়ান এসব কি গল্প বলছে? এগুলো গল্প? কোন ক্যাম্পে কি হয়? কোন অপারেশনে কি হয়ে ছিল? ছাত্র অবস্থায় ক্যাম্পিং কেমন কেটেছে? এসব অদ্ভুত গল্পের খাতা খুলে বসেছে সে। আর তার থেকেও অবাক করা বিষয়, ঝুম সে সব শুনতে শুনতে ঘুমিয়েও গেলো। আহির নিজের সিটে বসতে বসতে বলল –
” ব্যাপার কি?”
শাইয়ান ঝুমের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল –
” প্রেগন্যান্সি অবস্থায় কিছু পরিবর্তন আসে। মুড সুইং, নার্ভাসনেস, বাচ্চামো করা, এগুলো নরমাল।”
আহির বুঝতে পেরেছে এমন করে মাথা নাড়ালো। কয়েক সিট পিছন থেকে একটি মেয়েলি গলায় শুনতে পারল –
” দেখেছো ভাইয়াটা আপুটাকে কতো ভালবাসে, যত্ন করে? দেখে শিখতে পারো তো কিছু।”
আহির পাশ ফিরে তাকিয়ে শাইয়ানকে দেখে নিল। তার ভাই আসলেই ঝুমকে অত্যন্ত ভালবাসে। তার ভালোবাসার সাথে কারো তুলনা হবে না। ঝুম কি জানতো তার জন্য এতো গভির ভালোবাসা অপেক্ষা করছে? মেয়েটা বড্ড বেশি ভাগ্যবতী। আহির আলতো হেসে সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করলো। মাথায় চলছে অনেক রকমের চিন্তা। ঝুম কি আদোও ভালো আছে?
” আপনি একদম আমার সাথে কথা বলবেন না।”
” কিন্তু আমি সত্যিই কিছু করিনি আরীবা।”
ঝুম আগুন চোখে ভস্ম করে দিবে এমন ভাবে তাকালো শাইয়ানের দিকে। শাইয়ান রীতিমত ভড়কে গেলো ঝুমের রাগ দেখে। ঝুম তার হালকা উচু হওয়া পেটটা নিয়ে তেড়ে গেলো শাইয়ানের দিকে।
” কিছু করেননি? তাহলে আমি মিথ্যা বলছি? অসভ্য লোক। মেয়ে মানুষ দেখলেই দাঁত কেলাতে হবে কেন?”
রাগে ফোঁস ফোঁস করছে ঝুম। শাইয়ান কি বলবে বুঝতে পারছে না। তারা করাচি এসেছে গোটা পাঁচেক দিন হয়েছে। এই কয়দিন চাইলেও ঝুমকে চেকআপের জন্য হাসপাতালে নিয়ে পারেনি। সে তার বিভিন্ন অজুহাত। কখনো দুর্বল লাগে, তো কখনো বমি পায়। বাড়ির সকলেও যখন থেকে জেনেছে প্রেগন্যান্সির কথা তখন থেকে শাইয়ানের কথা কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। বিশেষ করে তার মা – বাবা। এদের আস্কারায় ঝুমকে হাতের নাগালে পাওয়াও দুষ্কর। অগত্যা আজ বহু বুঝিয়ে হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ছিল।
সেখানে আশ্চর্যজনক ভাবে ড. ইউসরার সাথে দেখা। বিশেষ কিছু কারণে সে করাচি এসেছিল। যেহেতু ড. ইউসরা একজন গাইনিকলজিস্ট, তাই শাইয়ান ভেবে ছিল ঝুমের ব্যাপারটা তার সাথে আলোচনা করলে ভালো হবে। কিন্তু সেটিই শাইয়ানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। ড. ইউসরার সাথে শাইয়ানের ওমন হেসে হেসে আলাপ করা ঝুমের একদম পছন্দ হলো না। অগত্যা শাইয়ানকে না জানিয়ে সে একাই বাড়ি চলে এসে ছিল। কি ভয়ানক ছেলেমানুষী! এদিকে জলজ্যান্ত ঝুম চলে এলো অথচ শাইয়ান কথায় এতটাই মসগুল ছিল যে ঝুমের খোঁজ টুকু নিলো না। রাগে, দুঃখে সারাটা রাস্তা ঝুম কেঁদেছে। অথচ মেয়েটা বুঝলো কি, তাকে নিয়ে শাইয়ান কি ভীষণ চিন্তায় ছিল? ড. ইউসরার সাথে কথা বলে ডাক্তারের রুমে যাওয়ার জন্য ঝুমকে ডাকতে এসে দেখলো ঝুম নেই। তখন তার কি অবস্থা হয়ে ছিল মেয়েটা কি জানে? জানলে বুঝি এমন কাজ করতো কখনো? পুরো হসপিটাল খুঁজেও যখন ঝুমকে পেলো না, তখন যে শাইয়ান অসহায়ের মতো কেঁদে ছিল তা কি দেখেছে মেয়েটা? বোকা মেয়েটা শুধু রাগ করতে পারে, শাইয়ানের ভালোবাসা দেখে না।
” আপনি মিথ্যা বলছেন না পাখি। আচ্ছা আমি দোষী। আপনি শান্ত হন। এখানে বসুন।”
ঝুম হাঁপাচ্ছে, তবুও শাইয়ানকে ছুঁতে দিলো না। শাইয়ান বড্ড কষ্ট পেল। মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এসে একগ্লাস পানি পান করালো। অতঃপর কিচেনে যেতে যেতে ছেলের পানে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে ভুললেন না। শাইয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে ঝুমের পায়ের কাছে বসলো।
” আরীবা।”
ঝুম কথা বলল না। অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নিল। শাইয়ান জানে ঝুম যা করছে তা ইচ্ছাকৃত না। কিছুক্ষন পর নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঠিকই ক্ষমা চাইবে। অথবা এই কাহিনী ভুলে বসবে। এমনই হয়ে আসছে কিছুদিন ধরে। শাইয়ান চোখ তুলে ঝুমের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। তখনকার কথা মনে পরলে বুকের মাঝে কেমন শূন্যতা কাজ করে। আচ্ছা বাসায় ঠিক ভাবে না আসতে পারলে কি হতো? এতো অবুঝ হলে চলে? তার তো উচিত ছিল মেয়েটাকে বকে দেয়া কিন্তু সে কিছু বলতে পরছে না কেন?
” তাকান আমার দিকে মেরিজান।”
ঝুম শান্ত ভাবে ফিরে চাইলো। শাইয়ান ওর চোখে চোখ রেখে ফিচেল স্বরে
বলল –
” আমার জীবনে আপনি ব্যতীত অন্য কেউ নেই। আমার দরকারও নেই কাউকে। আমার শুধু আপনাকে দরকার। ব্যাস আর কিছু লাগবে না। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি দুঃখিত আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য।”
ঝুম তখনো শান্ত চোখে তাকিয়ে। তার মনে কি চলছে কে জানে। শাইয়ান আবারও বলল –
” দেখুন পাখি, আপনি এখন একা নেই। রাগ হলে এভাবে হুট করে সিদ্ধান্ত নিবেন না। নিজের সাথে বেবির কথাও ভাববেন। আমার কোনো ভুল হলে আমাকে বলবেন। আমরা আলোচনা করব সেই বিষয়ে। আপনি বুঝতে পারছেন, যে এভাবে এসে আপনি ভুল করেছেন?”
” হুম।”
” আর যেন এমন না হয়, ঠিক আছে?”
” আচ্ছা।”
ঝুম এখন একদম শান্ত। কিছুক্ষন আগের সেই মেয়েটা আর নেই। ক্ষণ বাদেই মেহেরুন্নেসা হাতে করে কিছু ফল নিয়ে এলো। তাকে দেখেও শাইয়ানের মাঝে বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো না। সে একই ভাবে বসে রইলো ঝুমের পায়ের কাছে। ঝুম নিজ উদ্যোগে ফলের প্লেটটি নিয়ে এক এক করে খেতে লাগলো। ঢাকা থাকা সময়ও ঝুমের খাওয়ার প্রতি অনিহা দেখা যেতো। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে করাচি এসে সেসব দেখা যায়নি। উল্টো খাওয়ার প্রতি তার অন্যরকম উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়। ইদানিং খেতে খুব পছন্দ করছে সে। ক্ষুধা একদম সহ্য করতে পারছে না। যেমন খাচ্ছে তেমন বমিও করছে। তবুও সারাক্ষনই কিছু না কিছু খেতে থাকে। স্বাস্থ্যও মাশাআল্লাহ অনেক বেড়েছে। কে বলবে এই সেই রোগা পাতলা গড়নের মেয়ে! অদ্ভুত ভাবে ঝুমের পেট হালকা বাড়ন্ত লাগছে। যা ভীষণরকম অস্বাভাবিক। গতকাল রাতে তো ঝুম বারবার বলছিল, দেখেন ডক্টর পেট উঁচু লাগছে। শাইয়ান বুঝতে পারছে না ঠিক কবে থেকে এই মেয়ে কনসিভ করে বসে আছে।
Remedy part 26
” আরীবা।”
ঝুম খেতে খেতে উত্তর দিল –
” জ্বি।”
” বিকেলে আবারো এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছি।”
” আচ্ছা।”
