Home Remedy Remedy part 28

Remedy part 28

Remedy part 28
মীরা রায়াদ

কপাল কুঁচকে ঝুম শাইয়ানের অবস্থা দেখে যাচ্ছে। ভারি বিরক্ত ঝুম এই লোকের ওপর। তারা এখন হসপিটালে আছে। গতকাল বিকেলে ডাক্তার কিছু টেস্ট দিয়ে ছিলেন। সেগুলো করিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও, আজ আবার এসেছে রিপোর্ট দেখাতে। সেই কাল থেকে শাইয়ানের অস্থিরতার শেষ নেই। দু’দণ্ড শান্ত ভাবে বসছে না পর্যন্ত লোকটা। ক্রমাগত পায়চারী করে যাচ্ছে বেচারা। দেখে মনে হচ্ছে শাইয়ান নিজেই প্রেগনেন্ট। এতেই ঝুম বিরক্ত। চরম বিরক্ত। সে ছাড়াও আশেপাশে কয়েকজন গর্ভবতী মা রয়েছে। কই তাদের জামাইরা তো শাইয়ানের মতো করছে না। এভাবে করার কোনো মানে হয়? আশেপাশের সকলে কেমন করে তাকিয়ে দেখছে। উফ্! এমনকি রেসিপশনের মেয়েগুলোও তাদের দিকে তাকিয়ে গুঁজুর – ফুশুর আলাপ করছে নিজেদের মাঝে।

” ডক্টর আপনি বসবেন এখানে? বিরক্ত হচ্ছি কিন্তু আপনার কাজে?”
শাইয়ান ভালো করে ঝুমের মুখের আদল দেখে নিল। মেয়েটার মুখায়ব দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে বিরক্তের চরম সীমায় চলে গেছে। শাইয়ান পাশে এসে বসলো। তার বুকের ভিতর টিপটিপ করছে। নার্ভাসনেসের কারণে শান্তি পাচ্ছে না। রিপোর্ট সরাসরি ডাক্তারের কাছে চলে গিয়েছে। এখানের নিয়ম সম্পূর্ণ আলাদা। রিপোর্ট সে নিজে দেখতে পেলেও বুঝতে পারতো কিছু। কিন্তু এখন এখানে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। শাইয়ান পাশে রাখা পানির বোতলটি হাতে তুলে যত্নের সাথে বোতলের ছিপি খুলে ঝুমের দিকে বাড়িয়ে দিল। ঝুম বিনা বাক্য ব্যয়ে বোতলে মুখ লাগিয়ে পানি পান করে নিল। তার সত্যিই বড় তৃষ্ণা পেয়ে ছিল। খাওয়া শেষে যেভাবে নিয়ে ছিল ঠিক সেভাবেই বোতলটি ফিরিয়ে দিলো শাইয়ানের হাতে। শাইয়ান বোতলটি নিয়ে কোনরূপ দ্বিধা ছাড়া পানি পান করলো। ঝুম তাকিয়ে রইল। একবার বলতে চাইলো সে মুখ লাগিয়েছে। কিন্তু শাইয়ান সেই সময়টুকু দিলো না তাকে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” শরীর খারাপ লাগছে পাখি?”
ঝুম কপাল কুঁচকে বলল –
” আমার লাগছে না কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার শরীর খারাপ লাগছে।”
শাইয়ানের সত্যি শরীর খারাপ লাগছে। চিন্তায় সে যে কোনো সময় জ্ঞান হারাতে পারে। ঠাণ্ডা পরিবেশেও শাইয়ানকে ঘামতে দেখে ঝুম অতিষ্ট হয়ে বলল –
” আপনি শান্ত হবেন দয়া করে? দেখে মনে হচ্ছে আমি নই আপনি গর্ভবতী। অদ্ভুত!”
ঝুম চোখ উল্টে শাইয়ানকে জহুরী নজরে দেখে নিল। শাইয়ান ঝুমের কথায় এতটাই হতভম্ব হলো, যে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল মুহূর্তে। সে আর গর্ভবতী! অসম্ভব। কি সব বলে এই মেয়ে? এমনটা কি কখনো সম্ভব? শাইয়ান আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ শুনল কি না। তারপর ঝুমের দিকে কিছুটা চেপে বসে ফিসফিসিয়ে বলল –
” আমাকে নিয়ে মজা করা হচ্ছে? মান – সন্মান কিছু রাখবেন না আপনি? এভাবে বলতে হয়? আমি না আপনার স্বামী! লোকে শুনলে কি ভাববে?”
ঝুম শাইয়ানের কথায় পাত্তা না দিয়ে
বলল –

” লোকে যা ভাবছে আমি তা মুখে বলছি। একা আপনার বউ প্রেগনেন্ট না ডক্টর। এখানে আরও অনেকে আছে। দেখুন কয়েকজনের সিরিয়াস অবস্থা। কই তাদের জামাই তো আপনার মতো হম্বিতম্বি করছে না।”
” তারা আপনার মতো দুর্বল না আরীবা। তাছাড়া তারা আমার বউও না। সুতরাং তাদের ব্যাপারে আমার কিছু আসে যায় না। আপনি আমার কলিজা। আপনার কিছু হলে আমি বাঁচবো বলেন? চিন্তা তো করতেই হবে।”
” আপনি একটু বেশি বেশি….”
ঝুম বাকি কথা বলার আগে একজন মহিলা অ্যাসিস্টেন্ট ডেকে উঠলেন –
” মিসেস আনসারী।”
শাইয়ান তড়াক করে দাঁড়িয়ে পরলো। তারপর ঝুমকে খুব সাবধানে ধরে পা বাড়ালো ডাক্তারের রুমের দিকে। এক হাতে দরজা ঠেলে খুব যত্নের সাথে ঝুমকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো শাইয়ান। শাইয়ানকে দেখে মহিলা ডাক্তারটি সন্মানের সহিত হেসে দাড়িয়ে বলল –

” হ্যালো ড. আনসারী।”
একটি চেয়ার টেনে ঝুমকে বসিয়ে দিয়ে শাইয়ান ধীর কন্ঠে রয়ে সয়ে বলল –
” হ্যালো।”
” বসুন বসুন প্লিজ।”
শাইয়ান আলতো মাথা নাড়িয়ে ঝুমের পাশে বসে পরলো। মহিলা ডাক্তারটি এবার ঝুমের পানে দৃষ্টি দিয়ে বলল –
” ভালো আছেন ম্যাডাম?”
ঝুম লজ্জায় হাসফাঁস করে উঠলো। জড়ানো গলায় বলল –
” আলহামদুলিল্লাহ্। আপনি আমাকে নাম ধরে ডাকবেন দয়া করে। আমি আপনার অনেক ছোট।”
মহিলা শব্দ করে হেসে বলল –
” শি ইজ সাচ অ্যা সুইটহার্ট, ড. আনসারী।”

শাইয়ান বাক্য বিনিময় না করলেও তার ঠোঁটের কোনে হাসির ঝলক ঠিকই মিলল। ডাক্তার কথা না বাড়িয়ে ঝুমের ফাইল দেখায় মন দিলেন। দীর্ঘক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফাইলের খুঁটিনাটি দেখে চোখে পরা চশমাটি এক আঙুলের সাহায্যে ঠেলে ভালো করে পরে নিল। তার মুখভঙ্গি গম্ভীর। শাইয়ানের বুকের মাঝে তোলপাড় চলছে। সিরিয়ার কিছু বুঝতে আর তার সমস্যা হলো না। ঠাণ্ডার মাঝেও সে ঘেমে একাকার। বাম হাতে শক্ত করে শাইয়ান ঝুমের হাত আঁকড়ে ধরলো। ঝুম চোখ ফিরিয়ে শাইয়ানের দিকে তাকালো। শাইয়ানের চোখমুখের অবস্থা দেখে ঝুম মিইয়ে গেল। ঝুম জানে তার কিছু হলে শাইয়ান নিজেকে সামলাতে পারবে না। সেখানেই ঝুমের যতো ভয়। মনে মনে শুধু একটাই দোয়া, সব যেন ঠিক থাকে।
শাইয়ান আর নিশ্চুপ বসতে পারল না। সে নিজের অস্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন করলো –

” ইজ এভরিথিং আলরাইট ড.।”
ডাক্তার তার গম্ভীরতা ধরে রেখে বলল –
” দ্যা গুড নিউজ ইজ কনফার্মড। শি ইজ এক্সপেক্টিং।”
ঝুমের চোখে খুশির আভাস ফুটে উঠল। শাইয়ান নির্বাক। সে পূর্বের ন্যায় ঝুমের একহাত আঁকড়ে ধরে আরো কিছু জানার জন্য তাকিয়ে আছে।
” শি ইজ ইন হার টেনথ উইক এন্ড ইটস টুইন্স।”
ঝুম এক হাত পেটে রেখে হা করে তাকিয়ে রইলো ডাক্তারের মুখের দিকে। শাইয়ান একবার ঝুমকে দেখছে তো আবার ঝুমের পেটের দিকে তাকাচ্ছে। প্রেগন্যান্সির সময় নিয়ে সন্দেহ হলেও একসাথে দুজন! এমন কিছু সে একদম আশা করেনি। এতটুকু ঝুমের পেটে দুইটা বাচ্চা! কিভাবে কি?

” ড. আনসারী আপনার ওয়াইফের শারিরীক অবস্থা খুব বেশি স্ট্যাবল নয়। আপনি আমাকে আগে যে রিপোর্ট গুলো দেখিয়ে ছিলেন তাতে মিসেস আনসারীর হেল্থ কন্ডিশন বেটার হলেও এখন সে একদম ঠিক নেই। তারওপর দুইটা বেবির ধকলও কিন্তু কম নয়। আমার মতে আপনারা আরো কিছু দিন অপেক্ষা করলে ভালো হতো। তবুও দেয়ার মালিক আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা। তার ওপর ভরসা রাখুন। প্রপার রেষ্ট ও স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে আপনাকে মিসেস আনসারী। দয়া করে হেলাফেলা করবেন না। সিরিয়াস কন্ডিশন আপনার। আপনার সাথে সাথে বেবিরাও বিপদে পরতে পারে। ড. আনসারী আপনার ওয়াইফের ভিটামিন ডি এর অভাব দেখা দিয়েছে আবারও। তাছাড়া হিমোগ্লোবিন রেশিও কম। আশা রাখবো আপনি বুঝতে পারছেন তার কন্ডিশন কতটা আশঙ্কাজনক। কিছু মেডিসিন দিয়ে দিচ্ছি নিয়মিত খাবেন। আর আপনারা চাইলে আল্ট্রাসাউন্ড করে দেখতে পারেন। তার জন্য যেকোনো সময় আসলেই হবে। আপনারা বরং কাল একবার এসে আল্ট্রাসাউন্ড করিয়ে নিন।”

শাইয়ানের মাঝে বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো না। সে এখনো ঝুমের পেটের দিকে তাকিয়ে। ডাক্তার কয়েকবার শাইয়ানকে ডাকলেও শাইয়ানের তরফ থেকে ফিরতি একটি কথাও শোনা গেলো না। মনে হলো সে এখানে থেকেও নেই। ঝুম বিব্রতবোধ করলো। আলতো হাতে শাইয়ানকে ধাক্কা দিলে শাইয়ান চোখ তুলে ঝুমের চোখের দিকে তাকালো। মেয়েটাকে ক্লান্ত লাগছে ভীষন।
” আজ করানোর ব্যবস্থা করা যায় না? আসলে রোজ রোজ উনি এভাবে বাইরে বের হলে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পরে। বুঝতেই পারছেন।”

ডাক্তার মিষ্টি হেঁসে শাইয়ানের অস্থিরতা দেখলো। শাইয়ানের সাথে তার পরিচয় একটি সেমিনারের মাধ্যমে। রাশভারী ছেলেটি তার বড় ছেলের বয়সী। অল্প বয়সেই নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় সফলতা অর্জন করে ফেলেছে। তাছাড়া মার্জিত ভাষায় সকলের সাথে তোকেও আকর্ষণ করেছিল। সেই ছেলেটিকে এভাবে একটি মেয়ের জন্য ভেঙে পরতে দেখে তার খারাপ লাগলো। কিন্তু কিছুই যে করার নেই।
” আমি বুঝতে পরছি ড.। কিন্তু আজ আমার রোগীর ভীষণ চাপ রয়েছে। আপনাদের সময় দিতে পারবো না। কাল বা পরশু আসুন সময় নিয়ে আলোচনা করা যাবে।”
শাইয়ান কথা বাড়ালো না। মাথা নাড়িয়ে উঠে দাড়ালো। ঝুম অবশ্য আসার পূর্বে ডাক্তারের সাথে বিদায়পর্ব সেরে এসেছে।

সারাটা পথ শাইয়ান ঝুমের সাথে একটি কথাও বলেনি। পাশের সিটে বসে ঝুম চিন্তায় জুবুথুবু হয়ে ছিল। অথচ সাহসের ওভাবে কথা বাড়াতে পারেনি। শাইয়ান এক নজরে রিপোর্টের খুঁটিনাটি দেখে গেলো ভালো করে। কি এতো দেখলো ঝুম জানে না। কিন্তু ঝুম পাশে বসে ঠিকই বুঝতে পারছিল শাইয়ানের হাত অনবরত কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
বাড়িতে ফিরে শাইয়ান কারো সাথে কথা না বলে নিজের রুমে চলে যায়। বসারঘরে প্রত্যেকে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু শাইয়ানকে ওভাবে চলে যেতে দেখে সকলের মুখে আঁধার নেমে আসে। ঝুম অসহায় চোখে দেখে যায় শুধু। নিজ কর্মের জন্য অপরাধবোধ কাজ করে। সে জানে শাইয়ান তার জন্য চিন্তিত। ঈশালের মা দ্রুত পায়ে শরবত আনতে ছুটল। মেহেরুন্নেসা দুহাতে আগলে নিজের পাশে বসিয়ে একে একে প্রশ্ন ছুড়লো ঝুমের দিকে। ঝুম সবটাই বলল। সব শুনে সকলের কপালে চিন্তার ভাঁজ। মেহেরুন্নেসা একবার চোখ তুলে দোতলায় শাইয়ানের ঘরের দিকে তাকালেন। মাতৃ মন তার ছেলের চিন্তায় কেঁদে উঠলো। ঈশালের মায়ের ভরসায় ঝুমকে রেখে পা বাড়ল শাইয়ানের উদ্দেশ্যে।

” আব্বা।”
উস্কো-খুস্কো চুলে এলোমেলো শাইয়ানকে দেখে মেহেরুন্নেসা আঁতকে উঠলো। শাইয়ানের চোখ অসম্ভব লাল। সে মেঝেতে অগোছালো ভাবে বসে রয়েছে। অবুঝ বাচ্চাদের মতো মাকে পেয়ে শাইয়ান নিজ খোলস থেকে বেরিয়ে এলো। চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল।
” আম্মা।”
মেহেরুন্নেসা তড়িঘড়ি করে ছেলের কাছে ছুটে গেলেন। কাছে এসে শাইয়ানের পাশে বসে মাথায় হাত রাখলো। শাইয়ান মেঝেতে শুয়ে পরে মাথা রাখলো মেহেরুন্নেসার কোলে।

” উনি আমাকে বুঝলো না আম্মা। উনি বুঝলো না আমাকে। আমি এখন কি করব? কি হবে আম্মা? আমার তো অসহায় লাগছে নিজেকে। ওনার কিছু হয়ে গেলে আমি কিভাবে বেঁচে থাকবো? আমার কথা কেন শুনল না আম্মা? আম্মা, ও আম্মা, আমার ভয় করছে। দেখেন এখানে এখানে ( বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে) আবার ব্যাথা করছে। আম্মা আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। উনি এমন কেন করলো আম্মা?”
মেহেরুন্নেসা ডুকরে কেঁদে উঠলো। ছেলেকে ভেঙে পরতে দেখে দিশেহারা সে। সবেইতো তার ছেলেটা সুখের মুখ দেখেছিল। এখন আবার কোন বিপদের মুখে ফেললেন আল্লাহ্? আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আনহু ভাগ্যে কি লিখে রেখেছেন তাদের?

” ওনাকে বারবার বারণ করেছিলাম জানেন আম্মা। বলে ছিলাম ঠিক সময় ভাবা যাবে। অথচ আমার কথা অমান্য করে নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে এখন কি সুন্দর ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি কি চেয়েছিলাম বলেন আম্মা? আমি তো শুধু ওনাকে চেয়ে ছিলাম আম্মা। আমার আর কাউকে লাগতো না বিশ্বাস করেন। এখন আমি কি করবো?”
” শান্ত হন আব্বা। ধৈর্য্য রাখেন। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা উত্তম সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। এভাবে বলবেন না। ঝুম সুস্থ হয়ে যাবে।”
শাইয়ান প্রতিত্তোর করলো না। মেহেরুন্নেসা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন বিরতিহীন ভাবে।

” ডক্টর।”
শাইয়ান কথা বলল না। এমনকি ঝুমের দিকে তাকালো ও না। সে আপন মনে ল্যাপটপে কিছু একটা করে যাচ্ছে। ঝুম সেই কখন থেকে কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু শাইয়ান নির্বিকার। সে রীতিমত ঝুমকে এড়িয়ে চলছে। ঝুম অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখছে শাইয়ানকে। শাইয়ানের চিন্তা সে বুঝতে পারছে কিন্তু এখানে তারই বা কি দোষ? আলাহ্ চেয়েছিলেন তাই দিয়েছেন।
” ও ডক্টর। কথা বলেন না।”
শাইয়ান তবুও চুপ। ঝুম না পেরে কেঁদে দিলো। একেবারে দিশেহারা কান্না। তার কান্নায় শাইয়ান কপাল কুঁচকে নিল। চোখ তুলে মনোযোগের সাথে বউয়ের নাটক দেখলো। সে জানে ঝুম তাকে কান্না দিয়ে বশ করতে চাচ্ছে। ঝুম নাক টেনে আদুরে কন্ঠে বলল –

” কথা বলেন আমার সাথে। কষ্ট হচ্ছে কিন্তু।”
শাইয়ান পারল না। হেরে গেলো ঝুমের কাছে বরাবরের মতো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল –
” বলছি।”
” কই বলছেন?”
” এই যে বলছি।”
ঝুম মুখ বাঁকিয়ে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে দেখলো শাইয়ানকে। অতঃপর শান্ত হয়ে বসলো শাইয়ানের পাশে।
” মন খারাপ?”

শাইয়ান অসহায় ভাবে তাকালো ঝুমের দিকে। ঝুম আলতো হেসে দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে দিল। শাইয়ান হয়তো এই মুহূর্তেরই অপেক্ষায় ছিল। সে একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পরলো ঝুমের বুকে। ঝুম স্বযত্নে আগলে নিল তার প্রাণপ্রিয় স্বামীকে। শাইয়ান যেন এতক্ষনে কিনারা পেয়েছে। সে আরো কিছুটা ঝুমের বুকের মাঝে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করল। ঝুম নিজের বুকের কাছে ভেজা অনুভব করলো। শাইয়ান কাদঁছে? ঝুম ব্যস্ত হয়ে শাইয়ানকে নিজের থেকে ছাড়াতে চাইলো কিন্তু পারলো না। শাইয়ান আরো শক্ত করে জড়িয়ে নিল ঝুমকে।
” ডক্টর, ডক্টর কি হয়েছে? দেখি ছাড়ুন আমাকে। কি হয়েছে? কাদছেন কেন?”
শাইয়ান ছাড়লো তো নাই বরং আরো আঁকড়ে ধরলো। ঝুম আর নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো না। সামলে নেয়ার সময় দিলো শাইয়ানকে।

” আমি ঠিক আছি ডক্টর। কিছু হবে না। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা সব ঠিক করে দিবেন। ভরসা রাখুন তার ওপর। আমরা সুস্থ থাকবো ইনশাআল্লাহ্।”
শাইয়ান নিশ্চুপ। দুহাতে ঝুমের কোমড় জড়িয়ে ধরে ঝুমের বুকে নাক-মুখ ঘষতে লাগলো। হঠাৎ সুড়সুড়ি অনুভব হওয়ায় খিলখিলিয়ে হেসে দিল ঝুম। শাইয়ান মুখ তুলে সেই হাসি দেখলো। মন দিয়ে দেখলো। এই হাসি তার ভালো থাকার একমাত্র কারণ। সেদিন সারারাত শাইয়ান ঝুমের বুকে মুখ গুঁজে রাত্রি পাড় করে দিলো। না নিজে ঘুমালো আর নাই বা ঝুমকে ঘুমাতে দিলো।

পরদিন সকাল হতেই তারা হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নামলো। ঝুম আয়েশ করে বসে ফল খাচ্ছে। শাইয়ান ধৈর্য্য ধরে ঝুমের খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছে। তাদের সাথে মেহেরুন্নেসাও আজ হাসপাতালে যাবে। কিছুক্ষন বাদে দেখা গেলো ঈশালকে বাড়িতে প্রবেশ করতে। ঈশালকে পেয়ে ঝুম যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল।
” চলো আমি তৈরি।”
আহির তৈরি হয়ে নেমে এসে বলল কথাটি।
” হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো চলো।”
আহিরের সাথে সাথে ঈশালও চেঁচিয়ে বলল।
” তোমারা কোথায় যাওয়ার কথা বলছো?”
শাইয়ানের গুরুগম্ভীর কন্ঠ। ঈশাল মিইয়ে গেলেও আহির পূর্বের ন্যায় বলল –
” কেন তোমাদের সাথে, হাসপাতালে।”

শাইয়ান কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। পাগল নাকি! হাসপাতালে এতো মানুষ কেন যাবে?
” হাসপাতাল কি তোমাদের শশুরবাড়ি?”
” এসব শুনতে চাই না। আমরা যাবো আজ তোমাদের সাথে।”
” হ্যাঁ বড় ভাইজান। আমি এই সকল বেলা ওবাড়ি থেকে চলে এলাম ঝুমঝুমির সাথে যাবো বলে। প্লিজ বারণ করবেন না।”
ঝুম ফলের প্লেটটি রেখে বলল –
” আরে ওনার কথা রাখো তো তুমি। আমি বলছি, তোমরা আমার সাথে যাবে।”
শাইয়ান বউয়ের কথার ওপর আর কিছু বলতে পারলো না। আসলে বলতে চাইলো না। মেয়েটা যা করলে খুশি থাকে তাই করুক। অতঃপর ঝুমের সাথে মেহেরুন্নেসা, আহির ও ঈশাল দল বেঁধে চলল হাসপাতালে। অথচ তাদের দেখে মনেই হলো না তারা হাসপাতালে যাচ্ছে। শাইয়ান বারে বারে অবাক হয় শুধু এদের দেখলে। এখানে সে চিন্তায় মরছে আর এরা মনে হচ্ছে পিকনিক করতে যাচ্ছে। অদ্ভুত!
” মিসেস আনসারী আপনি ভিতরে যেতে পারেন।”
শাইয়ান তাকে ধরে ধীর পায়ে আগালো। তাদের সাথে মেহেরুন্নেসা, ঈশাল, আহিরও যাওয়ার জন্য আগালে অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটি অবাক হয়ে বলল –

” আরে আরে আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?”
” আমি ঝুমের শাশুরি।”
” আমি ঝুমঝুমির ননদ।”
” আমি ভাবির দেবর।”
অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটি থতমত খাওয়া মুখে বলল –
” কিন্তু আপনারা যাচ্ছেন কোথায়?”
মেহেরুন্নেসা বলল –
” ঝুমের সাথে।”
” কিন্তু ম্যাম ভিতরে পেসেন্টের সাথে একজনের বেশি যেতে পারবেন না।”
ঈশাল এগিয়ে বলল –

” আরে এ কেমন নিয়ম? আমরাও যেতে চাই ওর সাথে।”
ওদের কথোপকথনে ঝুম শাইয়ান দাঁড়িয়ে গেল। ঝুম আস্তে করে বলল –
” কোনো ভাবে কি সম্ভব নয়? ওরা খুব শখ করে এসেছিল।”
” সরি ম্যাম সম্ভব হলে বারণ করতাম না।”
শাইয়ান ওদের বুঝিয়ে বলার জন্য
বলল –

” তোমরা এখানে বসো। এখন যেহেতু আল্ট্রাসাউন্ড করানো হবে সুতরাং সেখানে আহিরের এমনিও যাওয়া হবে না। আর ভিতরে যতো কম ভিড় করা হবে ততোই ডাক্তারের সাথে কথা বলতে সুবিধা হবে।”
বুঝলো ওরা তাই আর কথা বাড়ালো না। ঝুম, শাইয়ান চেকআপের জন্য ডাক্তারের রুমে চলে গেলো।
” মিসেস আনসারী ভয় পাবেন না। স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন। ড. আনসারী প্লিজ আপনি ওনাকে কিছু বলুন।”
ঝুমের চোখমুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। কেন যে সে এতো ভয় পাচ্ছে তা জানা নেই। শাইয়ান ওর পাশেই একটি টুলের ওপর বসে ঝুমের হাত আঁকড়ে ধরে রেখেছে। তাদের ডান পাশে একটি মনিটর রয়েছে। যেখানে কিছু সময় ব্যবধানে তাদের ভালোবাসার অস্তিত্ব দেখা যাবে।

” পাখি, ভয় পাবেন না। আমি আছি তো। স্বাভাবিক থাকেন।”
” ভয় পাচ্ছি না ডক্টর। কেমন একটা অনুভুতি হচ্ছে যেন।”
শাইয়ান হেসে ঝুমের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল –
” আমি আছি। শান্ত হন।”
ঝুম নিজের মাতৃ অনুভূতিকে সংযত করার চেষ্টা করলো। মিনিটের মাঝে মনিটরে চিত্র ফুটে উঠল। ঝুম চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। শাইয়ান একদৃষ্টে মনিটরে তাকিয়ে। তার হাত কাপছে তিরতির করে।
” মিসেস আনসারী, মনিটরে দেখুন আপনার বেবীদের।”

ঝুম তড়াক করে চোখ খুললো। সর্বপ্রথম দৃষ্টি পরলো শাইয়ানের দিকে। শাইয়ানের চোখে পানি, নাক লাল। ঝুম এবার দৃষ্টি দিল মনিটরে। সেখানে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। সে বুঝলো না। ডাক্তার বারবার কিছু একটা দেখে যাচ্ছেন গভীর মনোযোগের সাথে। ঝুম দেখলো মনিটরে কিছুটা দূরত্বে পরপর তিনটি বিন্দুর মতো।
” ড. আনসারী, টুইন্স নয় ট্রিপলেটস। আপনার ওয়াইফ এক সাথে তিনজন বেবি কনসিভ করেছেন।”

Remedy part 27

শাইয়ান প্রতিক্রিয়া দেখলো না। সে তাকিয়ে এখনো মনিটরের দিকে। ঝুম বড়বড় চোখ করে মনিটরে ভেসে ওঠা তিনটি বিন্দুর দিকে তাকিয়ে রইলো। সেকেন্ডের মাঝে ঝুমকে অবাকের চরম সীমানায় পৌছে দিয়ে শাইয়ান জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পরে গেল। ঝুম হতভম্ব চোখে সব দেখল। হচ্ছে কি তার সাথে এসব!

Remedy part 29