Home Remedy Remedy part 29

Remedy part 29

Remedy part 29
মীরা রায়াদ

শাইয়ানের এখনো জ্ঞান ফিরেনি। অত্যধিক চিন্তা ও আকস্মিক শকে শাইয়ান মিনি হার্ট এ্যাটাক করেছে। তাকে শুরুতে সিসিইউ তে রাখা হলেও এখন বেডে দেয়া হয়েছে। ডাক্তারের ভাষ্যমতে, তার হার্টের অবস্থা খুব নাজুখ। দুশ্চিন্তা করবে এমন কিছু থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দিলেন। আপাদত সে সুস্থ রয়েছে চিন্তার কিছু নেই। সেই থেকে পরবর্তী সাত ঘণ্টা কেটে গেলেও তার জ্ঞান ফেরার লক্ষণ দেখা গেলো না।পাশে একটি চেয়ারে ঝুম হতভম্বের ন্যায় বসে আছে। তার চোখে পানি। কি থেকে কি হয়ে গেলো বুঝতে পারছে না।

সে শাইয়ানকে বাবা হওয়ার সুখ দিতে চেয়ে ছিল ঠিক কিন্তু এমন কিছু চায়নি। তার নিজেরও ধারণা ছিল না এমন কিছু হবে। দুহাত পেটে চেপে চুপ করে বসে আছে, টু শব্দটি করেনি মেয়েটা। মাঝে অবশ্য ঝুমকে আরো একবার গিয়ে কিছু টেস্ট করিয়ে আসতে হয়েছে। সেখান থেকে এসেও মেয়েটি একইভাবে বসে আছে। মেহেরুন্নেসা ছেলের মাথার কাছে বসে আছেন। মহিলা যথেষ্ট শক্ত ধাঁচের হলেও ছেলে মেয়ের ব্যাপারে ভীষণ দুর্বল মনের। কিছুক্ষন পরপর তাকে চোখের জল মুছতে দেখা যাচ্ছে। ছেলেকে এভাবে হাসপাতালের বেডে অজ্ঞান অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখলে কোনো মা নিজে ঠিক রাখতে পারবে না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আহির কিছুটা দূরত্বে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভাবভঙ্গি বিশেষ বোঝা যাচ্ছে না। ঈশালও তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। অতঃপর আহির এগিয়ে একটি পানির বোতল নিয়ে ঈশালের দিকে বাড়িয়ে ইশারা করলো ঝুমকে দিতে। ঈশাল বাধ্য মেয়ের মতো পানির বোতলটি ঝুমের হাতে দিয়ে খেতে বলল। ঝুম কথা বাড়ালো না। তার ক্ষুদা-তৃষ্ণা দুই পেয়েছে। যথাযথ ভাবে বোতলে মুখ লাগিয়ে ডগডগ করে পুরোটা পানি শেষ করে থামলো। এর মাঝে একজন ডাক্তার রুমে প্রবেশ করলেন। আহির শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ালো। মেহেরুন্নেসা ছেলের পাশ থেকে উঠে সরে দাঁড়ালেন।
ডাক্তার সৌজন্যমূলক হেসে বলল –

” চিন্তার বিশেষ কোনো কারণ নেই এখন। উনি এখন ভালো আছেন। রিপোর্টে গুরুতর কোনো কিছু নেই বললেই চলে। তবু সাবধান থাকবেন। যে বিষয়গুলো ওনাকে স্ট্রেস দিবে এমন জিনিস এড়িয়ে চলাই ভালো হবে।”
আহির এগিয়ে এসে বলল –
” ওর এখনো জ্ঞান ফিরছে না কেন ডাক্তার?”
ডাক্তার হেসে উত্তর দিলেন –
” হার্ট এ্যাটাক সাধারণ কোনো ব্যাপার নয় মি.। সে যতোই মেজর বা মাইনর হোক। শরীরের ওপর দিয়েই ধকলটা যায়। চিন্তা করবেন না কিছুক্ষনের মাঝে জ্ঞান ফিরে আসবে। আমি আসছি এখন, ওনার জ্ঞান ফিরলে না হয় এসে একবার দেখে যাবো।”
আহির মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ডাক্তার বেরিয়ে গেলে আহির ঝুমের নিকট এগিয়ে এসে বলল –

” ভাবি শাইয়ান এখন ঠিক আছে। চিন্তা করবেন না। চলুন কিছু খেয়ে নিবেন।”
ঝুম মুখ তুলে চাইলো আহিরের দিকে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মেয়েটার মুখের লাবণ্যতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। চোখমুখ শুকিয়ে বসে গেছে। আহিরের ভীষণ মায়া হলো।
” এখন খাবো না ভাইয়া। উনি আগে উঠুক তারপর খাই?”
আহির ঝুমের মাথায় হাত রেখে বলল –
” এখন খেতে হবে। বেবিরা না খেয়ে আছে।”
ঝুম মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বুঝালো খাবে না। মেহেরুন্নেসা উঠে এসে কড়া গলায় বলল –
” একদম না করবেন না। একজন অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছে এখন আপনিও অসুস্থ হতে চান? আপনার চিন্তায় দেখুন ছেলেটার কি অবস্থা। তিনটা বাচ্চা জন্ম দেয়া মুখের ব্যাপার না ঝুম। এখনই খাবেন, কোনো না শুনতে চাই না।”
ঝুমের চোখ ছলছল করে উঠলো। না চাইতেও কয়েক ফোঁটা পানি গাল গড়িয়ে পরলো। সবাই তাকে ভুল বুঝছে। সে তো এমন কিছু চায়নি। চেয়েছিল? সে শুধু শাইয়ানের কথা ভেবেছিল। একটা সন্তান চেয়েছিল। এটাকি তার ভুল? সব মেয়েই তো মা হতে চায়। সেও চেয়ে ছিল। সেখানে তার দোষ কি? সেকি জানতো একসাথে তিনটা বাচ্চা আসবে? নাকি জানতো সেই খবর পেয়ে শাইয়ান হার্ট এ্যাটাক করবে? আল্লাহ্!
মেহেরুন্নেসা বুঝলেন ঝুম কষ্ট পেয়েছে তাইতো মাথায় হাত রেখে আদরের সাথে বললেন –

” আমাকে ভুল বুঝবেন না আম্মা। খেয়ে নিন। অনেকক্ষন না খেয়ে আছেন। এই সময় ভালো – মন্দ খেতে হয় বারবার। তাছাড়া শাইয়ানের জ্ঞান ফিরলে যখন শুনবে আপনি না খেয়ে আছেন তখন কিন্তু ভীষণ রাগ করবে।”
ঝুম করুন চোখে তাকালো। চোখে মুখে একরাশ মায়া তার। অথচ ক্লান্তিতে শরীর চলছে না। শুধু ঘুম পাচ্ছে। ঝুম কথা বাড়ালো না, উঠে দরজার দিকে পা বাড়ালো। আহির নিজেও ঝুমের পিছু নিতে নিতে ঈশালকেও নিজেদের সাথে ডেকে নিল। এই সময় ঝুমের সাথে একজন মেয়ে সর্বদা থাকলে সুবিধাই হবে।

ঝুমকে বেশি কিছু খাওয়ানো গেলো না। একটু ফলের শরবত আর রুটি, তাও মুরগির বাচ্চার মতো খুঁটে খুঁটে খেয়েছে। এই জন্য অবশ্য আহির বকাও দিয়েছে, কিন্তু কাজে লাগেনি। মেয়েটা তাকে পাত্তা দিলে তো! আসার সময় আহির অবশ্য মেহেরুন্নেসার জন্যও খাবার নিয়ে এসেছে। তারা যখন দরজা ঠেলে শাইয়ানের কেবিনে প্রবেশ করলো তখন পুরো রুম জুড়ে মানুষের আনাগোনা। ততক্ষনে বাড়ির প্রতিটি মানুষ জেনে গেছে শাইয়ানের শারিরীক অসুস্থতার কথা। যার দরুন বাড়ির লোকেরা এখন এখানে। ঝুম হাঁটতে পারছিল না, তার ভীষণ মাথা ঘুরছিল। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার ফলে হঠাৎ পেটে খাবার পরায় এখন সব উগলে আসতে চাইছে।

তারওপর এতো মানুষ। আচমকা কেন যেন মনে হলো নিশ্বাস নিতে পারছে না। বাতাসে অক্সিজেন কমে গেছে। ঝুম টলে উঠতেই আহির আর ঈশাল আগলে নিলো। আবছায়া চোখে দেখতে পেলো শাইয়ান বেডের ওপর আধশোয়া হয়ে বসা। দৃষ্টি তার ঝুমের ওপর। তারপর কি হলো কে জানে, ঈশাল আর আহিরের হাত ছাড়িয়ে ছুট লাগালো রুমে থাকা ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে। রুমে থাকা প্রত্যেকে হকচকিয়ে উঠলো। মেহেরুন্নেসা ঝুমের পিছু গেলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারল না। কারণ ঝুম ততক্ষনে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বাইরে থেকে শুধু শুনতে পেলো ঝুমের বমি করার আওয়াজ। এতক্ষনে যা খেয়ে ছিল সবটা ফেলে দিচ্ছে মেয়েটা। সবার মাঝে উদ্বেগ দেখা গেলেও শাইয়ানের মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো না। সেই পূর্বের নেয় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওয়াশরুমের দরজার দিকে। আহির অবশ্য ভীষণ অবাক হলো শাইয়ানের এরূপ পরিবর্তনে। পূর্বে হলে এতক্ষনে শাইয়ান তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলত। অথচ সেই শাইয়ান এখনো নিশ্চুপ! কিভাবে সম্ভব?

শাইয়ান দৃষ্টি না সরিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় আহিরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো –
” আহির তোমার ভাবি খেয়েছে?”
” মাত্র খেয়ে আসলো।”
” এর আগে খেয়েছে?”
আহির উত্তর দিল না। শাইয়ান শাণিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আহিরের ওপর।
” আম্মা, এখন কি আমি না থাকলে আমার বউ, বাচ্চা না খেয়ে থাকবে?”
মেহেরুন্নেসা হতভম্ব হয়ে গেলেন ছেলের কথায়।
” এসব কি বলছেন আব্বা?”
” শুধু কয়েকটা ঘণ্টা আপনারা আমার বউকে দেখে রাখতে পারলেন না? আমি কি এখন কাউকেই বিশ্বাস করতে পারব না? কেউ কি আমার বিশ্বাসের মূল্য দিবেন না আপনারা? সেই সকালে খেয়ে বেরিয়ে ছিল আর এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, অথচ উনি কিছুই খায়নি। আমি না হয় ছিলাম না আপনারাও কি কেউ ছিলেন না? আমার বউ তিনটা বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে আম্মা। আপনারা কেউ সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না কেন? ওনার ওই টুকু পেটে তিনটা কেমন করে আছে আল্লাহ?”

শাইয়ানের শুরুর দিকের কথায় অনেকের মাঝে অপরাধবোধ কাজ করলেও শেষের কথায় হাসি আটকাতে পরলো না কেউ। ঈশাল, আয়ান শব্দ করে হেসে দিলেও বাকিরা মুখ টিপে হাসলো। আহির ঠোঁটের কোনে হাসি নিয়ে বলল –
” সেই ক্রেডিটও তোমার শাইয়ান। এক চান্সে তিনজন। বাহ্।”
শাইয়ান রাগত চোখে আহিরকে ভয় দেখাতে ভুললো না। ঝুম বের হলো মিনিট পাঁচ কি ছয় পর। চেহারার অবস্থা নাজেহাল। মুখ পুরো লাল। কেঁদেছে কি? খুব কি কষ্ট হয়েছে? বুকের মাঝে একরাশ অস্থিরতা নিয়েও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো শাইয়ান। মেহেরুন্নেসা ঝুমকে ধরে একটি চেয়ারে বসালো। ঝুম চেয়ারে বসে দৃষ্টি শাইয়ানের দিকে দিল। শাইয়ান ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল। ঝুম ছলছল চোখে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু শাইয়ান মুখ ফিরিয়ে নিলো ওর থেকে। ঝুম কি বলবে বুঝলো না। শুধু বহু কষ্টে চোখের পানি ধরে রাখলো। দরজা খোলার শব্দে সবাই সেদিকে তাকালো। ঝুমের ডাক্তার কিছু কাগজ হাতে হেসে প্রবেশ করলেন।

” এখন কেমন লাগছে ড. আনসারী?”
” বেটার।”
” আনবিলিভাবল ড. আনসারী! আপনার মতো একজন ডাক্তার এভাবে ভেঙে পরবে আমি আশা করিনি। কোথায় এমন সময় আপনি স্ট্রং থেকে সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করবেন। তা না সেখানে আপনার ওয়াইফ দারুন ভাবে শক্ত থেকেছে। জানেন কতটা ভয় পেয়েছিলেন উনি? এই সময়ে এগুলো কিন্তু শরীরের ওপর ইফেক্ট ফেলে।”
শাইয়ান ওনার কথাগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল –
” রিপোর্টে টুইন্স এসে ছিল। তাহলে আল্ট্রাসাউন্ড-এ ট্রিপলেটস কিভাবে?”

” আমরা ভীষণরকম দুঃখিত ড. আনসারী। প্রথমে আমিও বুঝতে পারিনি কিভাবে সম্ভব। তাই মিসেস আনসারীকে আবারও চেকআপ করাই। বারবার করিয়ে এবার সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়েছি। প্রথমবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রিপোর্ট ভুল এসেছে। তাছাড়া ফিটাস গুলো এখনো যেহেতু ছোট তাই ভুলটা হয়ে গেছে। এ জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”
শাইয়ান গম্ভীরমুখে বসে রইলো। কথা বাড়ালো না। যান্ত্রিক ত্রুটি যেহেতু তাই হতেই পারে। এখানে কারো হাত নেই। ডাক্তার রিপোর্টগুলো এগিয়ে দিল শাইয়ানের দিকে। শাইয়ান হাতে নিয়ে একে একে দেখে নিলো। আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করা রয়েছে তিনটি বাবুর কথা। সাথে এক কর্নারে ফিটাস গুলোর আল্ট্রাসাউন্ড ছবিও যুক্ত। বুকের মাঝে মনে হলো কেউ খাঁমচে ধরেছে। ধড়াস ধড়াস শব্দে হার্টটা বেরিয়ে আসতে চাইছে। শাইয়ান ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির সাহায্যে ছুয়ে দিলো সেই ছবিগুলো।

” ড. আনসারী।”
শাইয়ান নিজেকে কঠিনভাবে সামলে নিলো। এখন অনুভূতির জোয়ারে ভাসার সময় নয়। চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালো ডাক্তারের দিকে। মহিলা ডাক্তার রয়ে সয়ে বললেন –
” একজন ডাক্তার হওয়ায় আপনি বুঝতে পারছেন আপনার ওয়াইফের কেসটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ওনার রক্ত শূন্যতা রয়েছে। এমন অবস্থায় একটি বেবি ডেলিভারি অনেক সময় রিস্কের হয়ে যায়। সেখানে দুজনও মানা যেতো। কিন্তু এখন যে অবস্থা..”
তিনি থেমে গেলেন। ইতস্তত করলেন। শাইয়ান দৃষ্টির নড়চড় না করে শান্ত স্বরে বলল –
” আপনি কন্টিনিউ করুন ড.।”
” আমাদের দেশে গড়ে আট হাজারে একটি ট্রিপলেটস হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আপনি তো জানেনই এমন কেইসে মা ও বেবিদের লাইফ রিস্ক থাকে। আপনার ওয়াইফের কন্ডিশন অনুযায়ী আমি সাজেস্ট করবো আরো একবার ভেবে দেখুন। ম্যাডামের লাইফ রিস্ক বেশি। আমার মতে এবরশন করিয়ে ফেলা ভালো হবে। এখনো ফিটাস গুলো আকারে ছোট আছে।”
ডাক্তারের কথায় আতঙ্কে ঝুম দুহাতে পেট জড়িয়ে নিল। যেন বাচ্চাদের সে আগলে রাখতে চাইছে এভাবে। শাইয়ান শান্ত দৃষ্টিতে সবটাই দেখলো। নিরবে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসিও উকি দিল। চোখের কোণের পানিটা আর কেউকে দেখতে দিলো না। ঝুম অসহায় চোখে শাইয়ানের দিকে তাকিয়ে মিনতি করলো যেন। রুমের প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে আতঙ্ক স্পষ্ট। ডাক্তার তার কথাগুলো শেষ করে চলে গেলেন। অথচ রেখে গেলেন বুক ভরা আতঙ্ক আর ভয়।

সেদিন সেই অসুস্থ শরীরেই শাইয়ান হসপিটাল ছাড়লো। তাকে শত বলেও রাখা গেলো না। ঝুম ভয়ে ধারে কাছেও ঘেষলো না শাইয়ানের। মনের মাঝে তার ভয় উঁকি দিলো। শাইয়ান যদি তার বাচ্চাদের মেরে ফেলে? হাহ, বোকা মেয়েটা এখনো শাইয়ানের ভালোবাসা বুঝলো না। স্বার্থপর। কষ্ট, অভিমানে শাইয়ান ঝুমের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো। এমনকি ঝুমের দিক থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিল। ঝুম কি করছে না করছে তাতে তার বিশেষ আগ্রহ দেখা গেলো না।

এর ঠিক এক সপ্তাহ পরের কথা। বাড়িতে ঝুমের এবরশন নিয়ে কথা উঠলো। তখন সন্ধ্যার নাস্তা পর্ব চলছিল বসার ঘরে। সকলের একই কথা আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা চাইলে আবারো দিবেন। কিন্তু ঝুমের জীবনের ওপর দিয়ে তাদের কিছু চাই না। শাইয়ান অবশ্য বিশেষ কিছুই বলল না। সে চুপ করে সবটাই শুনে গেলো। কিন্তু ঝুম থেমে থাকলো না। সে কোনো ভাবেই তার বাচ্চাদের কিছু হতে দিবে না। সবাই বুঝালেও ঝুমকে শান্ত করা গেলো না। সে রীতিমত উত্তেজিত হয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা বার করেক তাকে বুঝালেন। শাইয়ানের জন্য হলেও মেনে নিতে বললেন কিন্তু ঝুম তো মা। মায়েরা কি সন্তানের ক্ষতি চাইতে পারে? সে যতোই নিজের জীবনের ঝুঁকি থাকুক না কেন। মা তো নিজেকে মারলেও সন্তানের গায়ে আঁচড়ও লাগতে দিতে চায় না। শাইয়ান কঠিন চোখে হাত মুঠো করে ঝুমকে দেখে যাচ্ছিল। তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেলো যখন ঝুম বলল,

” থাকবো না আমি এখানে। আমি আমার সন্তানদের নিয়ে চলে যাবো এই বাড়ি ছেড়ে, এই দেশ ছেড়ে।”
ব্যাস, এরপর বিকট শব্দে সব একদম নিশ্চুপ। ঝুম ভয়ে বসে পরলো। তার পুরো শরীর থরথর করে কাপছে। শাইয়ান রাগে ফোঁস ফোঁস করে যাচ্ছে। সামনে রাখা কাচের ছোট টেবিলটা তখন ক্ষতবিক্ষত। টেবিলে রাখা খাবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেঝেতে পরা। শাইয়ান রাগ নিয়ন্ত্রণে এদিক সেদিক পায়চারী করে যাচ্ছে। সে চেষ্টা করলো নিজের ভয়ংকর রূপ ঝুমকে না দেখানোর কিন্তু পারল কই। ঝুমের ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দে তেড়ে গেলো ঝুমের দিকে। দুহাতে খাবলে ধরলো ঝুমের দুবাহু। না চাইতেও ঝুমের মুখ থেকে “আহ্” শব্দটি বেরিয়ে এলো।
” সমস্যা কি আপনার? বলেন সমস্যা কি? এতো জেদ কেন? কি করেছেন এখনো বুঝতে পারছেন না? সব শেষ করে দিয়েও কি শান্তি হয়নি? আর কি চাই আপনার?”
বলতে বলতে ঝুমের পাশে থাকা বড় ফ্লাওয়ার ভাসটাতে পায়ের সর্ব শক্তি দিয়ে লাঠি মারল। মুহূর্তে ঝনঝনিয়ে ভেঙে গেল। ভয়ে হিঁচকি তুলে কেঁদে ফেলল ঝুম। শাইয়ানের এমন রূপ পূর্বে কখনো দেখেনি সে। যার দরুন সে অত্যন্ত ভয় পেয়েছে। এই শাইয়ানকে সে চিনতে পরছে না। অন্যরা সবাই নিশ্চুপ। কেউ কথা বলল না। আসলে সাহস পেলো না। সবাই জানে শাইয়ান সহজে রাগ করার মতো ছেলে না। আর একবার রাগলে তখন কাউকে আমলে নেয় না। তবুও মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এলেন।

” আব্বা।”
” কেউ আমাদের মাঝে আজ কথা বলবেন না। কেউ না।”
এরপর আর কারো কিছু বলার ছিল না। শাইয়ান এদিক ওদিক পায়চারী করতে করতে বলল –
” বলে ছিলাম ধৈর্য্য ধরুন। বলিনি? বলে ছিলাম কি না? এই এখন কথা বলছেন না কেন? এতক্ষন তো ঠিকই অনেক কথা বলতে পারলেন এখন উত্তর দিচ্ছেন না কেন? উত্তর দিন।”
শাইয়ান এমন ভাবে তেড়ে গেলো যে ঝুম ভয়ে চেয়ারের সাথে সেঁটে গেলো। ভয়ে, উত্তেজনায় বারবার মাথা নেড়ে বুঝাল বলে ছিল।
” তারপরও কেন করেছেন? আমার থেকে বেশি বোঝেন? আমি বলিনি সুস্থ হোন সব হবে? বলেছিলাম না মেডিসিন ঠিক মতো খেতে? তাও, তাও আমার কথা শুনলেন না। আহ্।”
দুহাতে নিজের চুল টেনে চিৎকার করে উঠলো। ঝুম শাইয়ান উম্মাদনায় ভয়ে জোরে কেঁদে ফেলল।

” এই এই একদম শব্দ করবেন না। চুপ।”
ঝুম মুখে হাত চেপে ধরলো। এতে কান্নার শব্দ না হলেও ফোপানোর শব্দ ঠিকই হলো।
” তিন মাস চলছে। বুঝতে পারছেন? তিন মাস। আমি কি বোকা? হ্যাঁ বোকাই তো। আপনি ঠিক কবে থেকে মেডিসিন খাওয়া বন্ধ করে ছিলেন মিসেস আনসারী? এভাবে ধোঁকা না দিলে চলতো না? আমার কি দোষ ছিল? কেন করলেন এমন? বেশি ভালোবাসা দোষ ছিল আমার? নাকি আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না এটা আমার দোষ? কেন করলেন? কেন এই জেদ? এই দুদিনের না দেখা ভ্রূণ গুলো আমার থেকে আপন হয়ে গেলো আপনার কাছে? ওদের জন্য আমাকে ছেড়ে যেতে চান?”
শেষের কথাগুলো বলতে বলতে শাইয়ান কেঁদে ফেলল। ঝুম মাথা নেড়ে বুঝাল এমন করবে না। সেতো তখন রেগে বলেছিল। সত্যি তো সে শাইয়ানকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। শাইয়ান দুহাতে চোখ মুছে অসহায় ভাবে বলল

” কি করেছেন জানেন? আমি এখন কিভাবে আপনাকে বাঁচাবো? আমি.. আমি কি করবো এখন?”
শাইয়ানের কান্না যেন বাঁধ ভেঙেছে। এতদিনের দুঃখ-কষ্ট সব উগলে দিলো সে। ঝুম হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইলো, কিন্তু শাইয়ান দূরে সরে গেল।

” উহুম ছোঁবেন না আমায়। আমাকে ছেড়ে ওদের চেয়েছেন না আপনি? আমাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছেন না? ঠিক আছে। ( উঠে দাড়িয়ে পিছিয়ে যেতে যেতে বলল) তাই হবে। থাকতে হবে আপনাকে আমার সাথে। তবে হ্যাঁ, কান খুলে শুনে রাখুন। আপনার কিছু হলে আপনার বাচ্চাদের দিকে আমি ফিরেও তাকাবো না।”
শাইয়ান আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। ঝুম ডাকলো কিন্তু শাইয়ানকে আজ থামানো গেল না। ভীষণ কষ্টে পেয়েছে কি না ছেলেটা। ঝুম মুখে হাত চেপে কেঁদে গেলো। মেহেরুন্নেসা এসে জড়িয়ে ধরলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কি বলল বোঝা গেলো না। আহিরকে দেখা গেলো ফোন হাতে স্তব্দের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতে। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সকলের উদ্দেশ্যে বলল –

Remedy part 28

” শাইয়ান মুলতান চলে গেছে।”
ঝুমের মাথায় যেন বজ্রাঘাত ঘটলো। চলে গেছে? তাকে ছেড়ে? এতো অভিমান? চোখে পানি নিয়ে একদম শান্ত হয়ে গেলো মেয়েটি।

Remedy part 30