Home Remedy Remedy part 30

Remedy part 30

Remedy part 30
মীরা রায়াদ

শাইয়ান যাওয়ার পর ঝুম পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে গেছে। জীবন তার নিজ গতিতে চললেও ঝুম যেন চোখের পলকে বদলে গেল। শান্ত নদীর মতো রোজকার সব বহমান। নিজের যত্ন, বাচ্চাদের সুযোগ-সুবিধা সবটাই সে গুরুত্বের সাথে পালন করছে। তবুও যেন ঝুম নেই। সে সবার মাঝে থেকেও নেই। শাইয়ান যাওয়ার পর আর কারো সাথে যোগাযোগ করেনি। কেউ তার সন্ধানও জানে না। ঝুম রোজ বহুবার ফোন দেয়, কিন্তু ওপর পাশ থেকে একটি মেয়েলি গলায় জানান দেয় নাম্বারটি বন্ধ। তবুও ঝুম চেষ্টা করে যায়। এভাবেই দিন চলে যাচ্ছে তার।
” ভাবি।”

জ্যামের মাঝে একটি বাচ্চা কিছু ফুল নিয়ে এদিক থেকে ওদিক ছুটে চলছে। পরিবেশ বৃষ্টিমুখর। তবুও বাচ্চাটি থেমে নেই। ঝুম খুব মন দিয়ে সেই দৃশ্য দেখে যাচ্ছে। আহিরের ডাকে তার হুশ ফিরল। তারা হাসপাতালে আজও চেকআপের জন্য গিয়ে ছিল। এখন তার ১৩ সপ্তাহ চলছে, অর্থাৎ চতুর্থ মাস। ঝুমের শারীরিক অবস্থা আগের তুলনায় অনেক ভালো। তাছাড়া বাচ্চাদের গ্রোথও ঠিক আছে। তবুও ডাক্তার আরও বেশি যত্ন নিতে বলল। ঝুম রিকভার করছে এটা ডেলিভারির জন্য ভালো।
চোখ ঘুরিয়ে আহিরের দিকে তাকালো ঝুম। অনেক মোটা হয়েছে এখন মেয়েটা। দেখতে এতো আদুরে। পেটটাও খানিক বেড়েছে। তিনটা বাচ্চা থাকছে ওই টুকু জায়গায় ভাবতেই কেমন অবাক লাগে আহিরের। সব ঠিক থাকলেও সেদিনের পর ঝুমের হাসিটা হারিয়ে গেছে। কেমন যেন মিইয়ে গেছে মেয়েটা। সেই পুরোনো ঝুম যেন ফিরে এসেছে। আগের মতো চঞ্চলতা নেই। আহিরের সাথে ঝগড়াও করে না, বরং যে যা বলে তাই মেনে নেয়। যা আহিরকে ভীষণ পিড়া দেয়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” কিছু খাবেন ভাবি?”
ঝুম দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বারণ করে দিলো। আজ কাল এমনটাই হয়। মেয়েটা মুখ ফুটে না পারতে কথা বলে না। বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার।
” পানি?”
মাথা কাত করে সম্মতি জানালো। এতেই যেন আহির খুশি হয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে বোতল তুলে ছিপি খুলে ঝুমের দিকে বাড়িয়ে দিল সে। অথচ ঝুম সেই ছিপি খোলা বোতলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যে দেখলো আহিরের জানা নেই। আহির তাড়া দিলো না, কিছু বললও না। বরং অপেক্ষা করলো। অনেকটা সময় পর ঝুম হাত বাড়িয়ে বোতল নিয়ে একটু খেয়ে আবার জানালার বাইরে দৃষ্টি রাখলো। ততক্ষনে জ্যাম ছেড়ে দেয়ায় আহির গাড়ি স্টার্ট দিল।
“আপনার সাথে ওনার কথা হয় ভাইয়া?”

আজ সারাদিনে এটিই হয়তো ঝুমের প্রথম বলা বাক্য। আহির গাড়ি চালাতে চালাতে কিছুক্ষন নিরব থেকে বলল –
” না।”
ঝুম তাচ্ছিল্য করে হেঁসে বলল –
” মিথ্যুক।”
আহির অবাক চোখে ঝুমের দিকে তাকালেও ঝুম দৃষ্টি না ফিরিয়ে জানালা ভেদ করে বাইরে দেখতে দেখতে বলল –
” হাসপাতালে আপনি ওনার সাথেই কথা বলছিলেন তাই না?”
আহির কি বলবে বুঝতে পারল না। কাচুমাচু করে বলল –
” আসলে ভাবি।”
” সমস্যা নেই ভাইয়া। উনি না চাইলে দরকার নেই। কিন্তু আপনারা সবাই এভাবে মিথ্যা বলেছেন ভেবে খারাপ লেগেছে।”
এরপর আহিরের কি বলা উচিত তার জানা নেই। ধরা পরে গেছে সে। হ্যাঁ, তার সাথে শাইয়ানের কথা হয়। প্রতিনিয়ত ঝুমের আপডেট সে এবং মেহেরুন্নেসা শাইয়ানকে দিয়ে থাকে। তারা শাইয়ানকে বুঝিয়ে ছিল কিন্তু শাইয়ান মানে নিই। বরং তাদের হুমকি দিয়ে ছিল ঝুমকে এ ব্যাপারে কিছু জানালে তাদের সাথেও যোগাযোগ বন্ধ করে দিবে। ভয়ে, দুশ্চিন্তায় তারা শাইয়ানের ছেলে মানুষী কাজ মেনে নিয়ে ছিল। ঝুম অবশ্য তারপর আর একটি কথাও বলেনি আহিরের সাথে। আহিরও লজ্জায়, অপরাধবোধের কারণে কিছু বলতে পারেনি।

” ডক্টর,
শুনছেন? কেমন আছেন আপনি? আমাকে ছেড়ে কেমন আছেন? একবারও কি আমার কথা মনে পরে না? আমাদের বাচ্চাদের কথাও মনে পরছে না? এতো পাষাণ কি করে হয়ে গেলেন ডক্টর? আপনি না আমাকে ছাড়া থাকতে পারতেন না। তাহলে এখন কিভাবে থাকছেন? এতো অভিমান? এতো রাগ আমার প্রতি আপনার? আমার যে ভীষণ কষ্ট হয় আপনাকে ছাড়া। কোথায় আপনি? আমাকে একা ফেলে কেনো চলে গেলেন? জানেন, আমি আপনাকে খুঁজি। প্রতিনিয়ত খুঁজি। কিন্তু আপনি আসেন না। আপনাকে পাই না ডক্টর। কোথায় চলে গেলেন আমাকে একা রেখে। ওদের একা সামলাতে আমার খুব কষ্ট হয়। আপনি আসবেন না ডক্টর? আমাকে কি আর ভালোবাসবেন না? আমি যে আপনাকে ভীষণ ভালবাসি। একবার ফিরে আসুন। দেখে যান আপনার বিরহে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। দয়া করে ফিরে আসুন। আপনাকে ছাড়া সব শুন্য লাগে। আমার আপনাকে লাগবে ডক্টর। শুধু আপনাকে লাগবে।”
গভীর রাত। ঝুম সাদা কাগজের ওপর কলম চালিয়ে থামলো। লেখার তালে তালে চোখের পানি কিছুটা লেখার ওপরও পরলো। ফলে লেখার মাঝে কিছু কিছু জায়গা লেপ্টেও গেলো। তবুও চোখের পানি থামলো না। ঝুম কাগজটা হাতে নিয়ে সুন্দর করে ভাঁজ করে একটি কারুকাজ করা এন্টিকের বক্সের মাঝে রেখে দিল। যেখানে পূর্ব থেকেই আরো অনেকগুলো রংবেরঙের কাগজের উপস্থিত। দেখে বোঝা যাচ্ছে দীর্ঘ অনেকগুলো দিনের না বলা কথা সেখানে জমা আছে।

ডং ডং শব্দে ঘড়িটি জানান দিল রাত ২ টা বাজে এখন। ঘড়িটা পূর্বে এ ঘরে ছিল না। এবার বাংলাদেশ থেকে ফিরে শাইয়ান এটা কিনে এনেছিল। কেন সেই ভালো জানে। আজ কাল ঝুম ঘুমাতে পারে না রাতে। পেটের মাঝে অস্থির লাগে। দুচোখে ঘুম কিন্তু তাও ঘুমাতে পারে না। কয়েক ঘণ্টা পর পর তার ক্ষিদে পায়। আবার বমি করে ফেলেও দেয়। তখন যে কতো বেশি খারাপ লাগে তা কাউকে বলতে পারে না। চোখ মুছে উঠে দাড়ালো ঝুম। বক্সটা ওভাবে রেখে বেড সাইড টেবিলের ওপর থেকে খাবার নিয়ে খাওয়া শুরু করলো। ক্ষুধা পেলে তার মাথা কাজ করে না। মনে হয় পেটের গুলো ভিতরে বসে ছোটাছুটি করে। খেতে খেতেই ওভাবে বেডের একপাশে শুয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল ঝুম জানেও না।

শাইয়ান মুলতান যাওয়ার ঠিক ৪৭ দিনের দিন এক সকাল বেলা সকলে মিলে নাস্তা করছিল। ঘুম ভাঙ্গার পর ঝুম মেহেরুন্নেসাকে বলল সে আজ ফ্রুট কাস্টার্ড খাবে। সেই তোড়জোড় চলছে পুরোদমে। আজ প্রায় একমাসেরও ওপর হতে চলল ঝুম নিজ থেকে কিছু বলে না, চায় না। তাই হয়তো সবার এতো তাড়া।
” খেয়ে দেখুন কেমন হয়েছে?”
ঝুমের সামনে এক বাটি ফ্রুট কাস্টার্ড রেখে প্রশ্ন করলো মেহেরুন্নেসা। সে আজ নিজ হাতে বানিয়েছে ঝুমের জন্য। ঝুম চোখ তুলে জোর করে আলতো হাসি দিল। এক চামচ মুখে দিয়ে বলতে নিল কিছু একটা কিন্তু আর বলতে পারলো না কারো গমগমে কন্ঠের জন্য।
” সকাল বেলা ভালো কিছু না খেয়ে আপনি এটা কি খাচ্ছেন আরীবা?”

মুখে খাবার নিয়ে ঝুম হতভম্বের মতো বসে রইলো। কিন্তু ফিরে চাইলো না সেই কণ্ঠের মালিকের পানে। কারণ সে জানে এই কণ্ঠের মালিক কে। ঝুম নড়চড় করলো না, শক্ত হয়ে বসে রইলো। চোখের কোণে পানি তার জানান দিল বিগত দিনগুলোর কষ্ট, অভিমান। শাইয়ান বড়বড় পায়ে এগিয়ে এলো ঝুমের কাছে। টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে খুব যত্ন করে ঝুমের মুখে লেগে থাকা কাস্টার্ডের অংশটুকু মুছে দিলো। এতক্ষনে ধরে রাখা ঝুমের কান্না এবার বাঁধ ভাঙলো। হুহু করে কেঁদে উঠলো সে। শাইয়ান হেসে দুহাতে আগলে জড়িয়ে ধরলো ঝুমকে। ঝুম বসে থাকার দরুন মাথাটা তার শাইয়ানের পেট বরাবর গিয়ে বাঁধলো। ঝুম নিজের মুখ শাইয়ানের পেটের সাথে চেপে দুহাতে কোমরের কাছের শার্ট খাঁমচে ধরে দিশেহারা কান্না শুরু করলো। তার সেই কান্নায় শাইয়ান মোটেই অস্থির হলো না, বরং তার ঠোঁটের হাসি আরও বৃদ্ধি পেলো। শাইয়ান ঝুমের মাথায় হাত বুলিয়ে
বলল –

” এইতো আমি এসে গেছি। আর কাঁদে না। এবার আর যাবো না।”
ঝুম হিঁচকী তুলে কেঁদে বলল –
” আপনি পঁচা ডক্টর।”
শাইয়ান শব্দ করে হেসে বলল –
” মাঝে মাঝে পঁচা হতে হয়। আপনার বেবিরা কেমন আছে?”
ঝুম কান্না চোখে কপাল কুঁচকে বলল –
” আমার বেবি? আপনার কিছু হয় না?
শাইয়ান ঝুমের চোখের পানি মুছে বলল –
” আপনি সুস্থ থাকলে আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনি পাশে থাকলে আমি পৃথিবীর বেস্ট বাবা হয়ে দেখাবো। কিন্তু আপনার কিছু হলে আমার আর কাউকে চাই না।”
” কিন্তু আমার আপনাকে চাই ডক্টর।”
তার কন্ঠ ভীষণ করুন। শাইয়ান হেসে ফেলল। আজ যেন তার হাসি থামার নয়।
” শুধু আমাকে দিয়েই হবে? বেবিদের লাগবে না?”
ঝুম শাইয়ানকে ছেড়ে দিয়ে নাক টেনে বলল –
” সবাইকে লাগবে। আপনি পঁচা।”
তার কথায় সেখানে থাকা প্রত্যেকে হেসে ফেলল। ব্যতিক্রম শাইয়ানের ক্ষেত্রেও হলো না।

“আপনার রিপোর্ট আগের তুলনায় বেশ ভালো এসেছে। এভাবে নিজের যত্ন নিবেন। ঠিক আছে?”
” আচ্ছা।”
” কোথাও কোনো সমস্যা হয়?”
সমস্যা? হয়তো। কিন্তু ঝুম বলল না। উল্টো শাইয়ানের কাছে এসে বলল –
” এবার আমাকে নিয়ে যাবেন তো?”
শাইয়ান হাতে থাকা কাজগুলো রেখে যত্নের সাথে কোলে তুলে নিল ঝুমকে। ভীষণ ভারী হয়ে গেছে মেয়েটা। তবুও শাইয়ানের সমস্যা হলো না ওকে তুলতে। খুব সাবধানে ঝুমকে শুইয়ে দিয়ে নিজেও ওর পাশে শুয়ে পরলো। অতঃপর দুহাতের সাহায্যে বুকে টেনে নিয়ে বলল –
” এভাবে সমস্যা হচ্ছে?”
” উহুম।”
” আমি আর মুলতান যাচ্ছি না।”
ঝুম তড়াক করে মাথা তুলে অবাক হয়ে বলল –
” ডক্টর আপনি কি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন?”
শাইয়ান হেসে ঝুমের মাথাটা নিজের বুকের বাম পাশে রেখে বলল –

” না রে পাগলি। গতবার এখানে আসার আগে করাচিতে ট্রান্সফারের জন্য আবেদন করে ছিলাম। ওখানে থাকা অবস্থায় আপনার একাকিত্ব আমি দেখে ছিলাম। সারাদিন আমি হসপিটালে থাকতাম আর আপনি একা ফ্ল্যাটে। বুঝতাম আপনার ভালো লাগতো না, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারতেন না। তাই তখনই করাচিতে শিফট হওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। ভেবে ছিলাম পাকাপাকি ভাবে হয়ে গেলে আপনাকে জানাবো।”
ঝুমের চোখমুখ হঠাৎ করে ঝলমলিয়ে উঠলো। খুশি যেন উপচে পরতে চাইছে তার।
” তার মানে আমরা এখন থেকে করাচিতেই থাকবো সবার সাথে?”
শাইয়ান আদর আদর চোখে বলল –
” হুম।”
” আল্লাহ্!”
ঝুম এতো খুশি হলো যে প্রকাশ করতে পরলো না। শাইয়ান তার খুশি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিতে বলল –
” আপনার জন্য আরও একটি খুশির সংবাদ আছে।”
” আরো?”
” হুম।”

ঝুম প্রশ্ন করলো না। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করল শাইয়ানের বলার জন্য।
” শ্রাবনীরা ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য আবেদন করেছে। খুব সম্ভবত আগামী মাসের মাঝে আপনার সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যাবে আবারো।”
ঝুম বাক্যহারা হয়ে গেল। এতদিনের দুঃখ, কষ্ট যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল এক নিমিষে। এতো এতো খুশি বুঝি তার জন্য? এই জন্যই কি বলা হয়, “ধৈর্য্য ধরো, আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আমাদের জন্য উত্তম কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছেন”? ঝুম মনে মনে, আলহামদুলিল্লাহ্ বলতে ভুললো না।
ঝুম শাইয়ানের বুকে মাথা রেখে গভীর আবেশের সাথে ডাকলো –
” ডক্টর।”
শাইয়ান চোখ বন্ধ করে ছিল। সে এতোগুলো দিন ঠিক ভাবে ঘুমাতে পারেনি। শান্তি মেলেনি মনে। অস্থির অস্থির লেগেছে। অথচ আজ এই মুহূর্তে চোখ জুড়ে ঘুমের রাজ্যে নেমে এসেছে।
” হুম।”
” এখনো রেগে আছেন আমাদের ওপর?”

আমাদের! ওহ হ্যাঁ, এখন তো তারা এখানে পাঁচ জন। পাঁচ? আল্লাহ্, ভাবলেই তো কেমন কেমন অনুভূতি হচ্ছে তার। ঝুম কিভাবে সামাল দিচ্ছে ওদের? মনে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে মুখে বলল –
” উহু রেগে নেই। তবে খুব কষ্ট পেয়ে ছিলাম। যাদের আপনি কোনো দিন দেখেনই নিই তাদের জন্য আপনার আমার থেকে বেশি ভালোবাসা। বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক আমার জন্য। তাই আমিও ভেবেছি ওনাদের জন্য আপনার কিছু হলে আমিও আপনাকে আর বুকে নিবো না। ভালবাসবো না। আদর করবো না।”
শাইয়ানের কথার পরিপেক্ষিতে ঝুম মাথা তুলে শাইয়ানের চোখে চোখ রেখে
বলল –

” শুনুন, আপনি শুধু আমার ডক্টর। শুধুমাত্র আমার। আমি থাকলেও আপনি আমার, না থাকলেও আপনি আমার। আমি ব্যতীত এই বুকে অন্য কারো অবস্থান আমি সহ্য করবো না ডক্টর।”
ঝুমের চোখে রাগ,জেদ ভরপুর। শাইয়ান অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো –
” এতো ভালোবাসেন?”
ঝুম শাইয়ানের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বলল –
” অনেক ভালবাসি।”
শাইয়ান পরম শান্তিতে দুহাতের বাঁধন শক্ত করে চোখ বন্ধ করলো। আজ কতগুলো দিন পর সে ঘুমাবে। শান্তিতে ঘুমাবে। অথচ সে ঘুমাতে পারল না। দুশ্চিন্তারা তাকে ঘুমাতে দিলো না।

পরের মাসগুলো ঝুমের বেশ সুন্দর ভাবে কাটলো। শাইয়ান মুলতান সিএমএইচ থেকে মালির সিএমএইচ-এ চলে আসায় তার দিন যায় ব্যস্ততার মাঝে। তা নিয়ে ঝুমের অভিযোগের শেষ নেই। মুড সুইং এর কারণে প্রায়ই শাইয়ানের ওপর চড়াও হয় সে। তখন বেচারা শাইয়ানের মুখটা দেখার মতো হয়। আবার যখন ঝুম নিজের ভুল বুঝতে পারে তখন ফোন দিয়ে কেঁদে কেঁটে অস্থির করে ছাড়ে শাইয়ানকে। শ্রাবণীদের আসার কথা থাকলেও তারা আসতে পারেনি কিছু কারণবশত। তবে ঝুমকে কথা দিয়েছে খুব দ্রুত এসে চমকে দিবে।

ঝুমের এখন ছয় মাস চলছে। ভারি পেট নিয়ে সে রুমের বাইরে যেতে ভীষণ লজ্জা পায়। ট্রিপলেটস হওয়ার দরুন সাধারণ গর্ভবতী মায়েদের থেকে ঝুমের পেট তুলনামূলক দ্বিগুণ বড়। যার জন্য শশুর, দেবরদের সামনে যেতে সে লজ্জায় হাসফাঁস করে। আজকাল তো তার আহিরের সাথেও দেখা হয় না। সে নিজেকে একদম গুটিয়ে নিয়েছে। বাড়ির পুরুষরা যখন বাড়িতে থাকে না তখন সে নিচে সকলের সাথে হাসি-মজা করে। বাকিটা সময় তাদের ঘরেই কাটিয়ে দেয়। ইদানিং শাইয়ানটাও অনেক রাত করে বাড়িতে ফিরে। কখনো কখনো তাকে রাতে ফিরতেও দেখা যায় না। মুলতানের থেকে মালির সিএমএইচ-এ দায়িত্ব তার বেশি। যার কারণে চাইলেও সে ঝুমকে সময় দিতে পারে না। তেমনি আজও শাইয়ানের বড্ড দেরি হয়ে গেলো ফিরতে। তখন রাত ৩ টা যখন সে বাড়ি এলো। ঝুম ঘুমে কাদা। মেয়েটা প্রেগন্যান্সির শুরুতে ঘুমাতে পারলেও এখন একদম ঘুমাতে পারে না। তিনটিতে মিলে যা যন্ত্রণা দেয় বেচারিকে! রাতে একটু ঘুমালে আবার উঠে বসে থাকে। হয় পায়ে ব্যথা নয়তো কোমরে ব্যাথা। এমনি চলছে।

তবে খাওয়ায় তার সমস্যা হচ্ছে না। মাঝে কিছুদিন খাওয়া নিয়ে ঝামেলা করলেও এখন আবার ঠিক। যা দেয়া হয় আগ্রহ নিয়ে খেয়ে ফেলে। এই জন্যই তো দেখতে আগের থেকে বেশি সুন্দর লাগে। ফুলে ফেঁপে ওঠা শরীরটা দেখেলে শাইয়ানের চটকে খেয়ে ফেলতে মন চায়। এতো আদর আদর পায় যা বলার মতো না। এই যেমন এখন পাচ্ছে। কি সুন্দর ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। অথচ শাইয়ানের বুকে যে জ্বালা ধরেছে সে খবর কি রেখেছে? শাইয়ান নিজের মনকে প্রশ্রয় না দিয়ে ছুটল গোসল নিতে। সে বাইরে থেকে এসে নিজেকে পরিষ্কার করে নেয়। এখন আরও সতর্ক থাকে ঝুমের জন্য। হাসপাতালের যেকোন জার্ম ঝুমের কাছে ছড়াতে পারে এই ভয়ে সে সর্বদা চোখ-কান খোলা রাখে।

দীর্ঘ সময় গোসল করে সে রোজকার নিয়ম অনুযায়ী তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করতে বসে পরলো। ঝুমের প্রেগন্যান্সির শুরু থেকে এটি শাইয়ানের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল সে আল্লাহর দরবারে ঝুমের সুস্থতার জন্য কেঁদে কেঁদে ভিক্ষা চায়। ছেলেটা ভীষণ ভয়ে থাকলেও প্রকাশ করে না। সকলের সামনে নিজেকে শক্ত রাখলেও দিন শেষে যখন রাত নামে তখন আল্লাহর কাছে সে নিজেকে মেলে ধরে। আল্লাহর কাছে ঝুম ও বাচ্চাদের সুস্থতা কামনা করে। শাইয়ান নামাজ শেষে উঠে এসে বসলো ঝুমের পাশে মেঝেতে। ঝুম একহাত পেটে রেখে ঘুমিয়ে। তার বড় বড় নিশ্বাসের শব্দ বলে দিচ্ছে গভীর ঘুমে সে। শাইয়ান এগিয়ে এসে সেই মায়াময়ী মুখটাতে কতকগুলো চুমু খেলো। তারপর নেমে এলো ঝুমের বাড়ন্ত পেটের নিকট। শাইয়ান হালকা করে পেটে হাত দিলো। যেন বাচ্চারা ব্যাথা না পায়। অতঃপর এগিয়ে এসে চুমু খেলো পরপর তিনটি।

” জানপাখিরা কেমন আছেন আপনারা? এতটুকু জায়গাতে থাকতে কষ্ট হচ্ছে? ছোট লাগছে না? কিভাবে থাকছেন আপনারা এখানে? আপনাদের সাথে আপনাদের আম্মিও কষ্ট পাচ্ছে। পরপর এলেও তো পারতেন আপনারা। কেন সবাইকে এক সাথেই আসতে হলো? একটু অপেক্ষা করতে পারলেন না? আপনাদের জন্য আমি ঘুমাতে পারি না। কি ভীষণ চিন্তায় ফেলেছেন বুঝতে পারছেন? আপনাদের আম্মির কষ্ট দেখলে আমি যে ভালো থাকি না।”
” আহ্!”
শাইয়ান তার বাচ্চাদের সাথে কথা বলছিল। এর মাঝেই ঝুমের আর্তনাদ ভেসে এলো। শাইয়ান বিচলিত হয়ে
বলল –

” কি হয়েছে? কি হয়েছে পাখি?”
ঝুম ঘুমে চোখ খুলতে পারছিল না। সে কোনরকম চোখ টেনে উঠে বসলো। শাইয়ানকে নিচে বসে থাকতে দেখে বলল –
” এখানে কি করছেন ডক্টর? উঠে বসুন ঠাণ্ডা লাগবে।”
” আপনার কি হয়েছে? ব্যাথা পেয়েছেন?”
ঝুম হাসলো। ঘুমু ঘুমু চোখে পেটে হাত বুলিয়ে বলল –
” ব্যাথা দিয়েছে।”

Remedy part 29

শাইয়ান অবাক চোখে তাকিয়ে। বাচ্চারা বেশ অনেকগুলো সপ্তাহ হলো অল্প অল্প নড়াচড়া করছে। ধীরে ধীরে তাদের নড়াচড়া বাড়িয়েছে এখন। তিনজন যখন একসাথে জ্বালাতন করে তখন ঝুম কেঁদে কূল পায় না। শাইয়ানের তখন অসহায় চোখে দেখা ছাড়া উপায় থাকে না আর। মাঝে মাঝে রেগে সে বাচ্চাদের বকেও দেয়। তখন তাকে অবাক করে দিয়ে বাচ্চাগুলো আরও ব্যাথা দেয় ঝুমকে। শেষে ঝুম আবার শাইয়ানকেই বকে দেয়। তাও আগে ভালো ছিল কিন্তু এখন পাঁজি হয়েছে সবগুলো। জোরে জোরে হাত পা ছোটাছুটি করে। একজন খুব বেশি করে। আর বাকি দুজন কম। শাইয়ানের মনে হয় দুষ্টুটা তার মেয়ে। একদম ঝুমের মতো হবে। তাকে যেমন ঝুম নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে, এই মেয়েও তাই করবে।

Remedy part 31