যাত্রাপথ পর্ব ৪৪
মাশফিত্রা মিমুই
অগ্ৰহায়ণের শেষ লগ্ন। ভোর কিংবা সন্ধ্যা নামলেই শীতের কনকনে হাওয়ায় শরীর জমে যায়। দুপুরের রোদেও এখন আর গা ঝলসানো তাপ নেই। চারিদিকে শুধু শীতের আমেজ।
ঘুমকে অবজ্ঞা করে সারারাত জেগে অসুস্থ স্বামীর সেবা করেছে মিছরি। আল্লাহর রহমতে ভোর হতেই নাজিরের গা থেকে জ্বর ছেড়েছে। অথচ তাও যেন ছেলেটা বেকাবু। ঘুম থেকে উঠেই গরু, ছাগলদেরকে খাবার খাইয়ে কনকনে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল সেরে এসেছে। ভেজা লুঙ্গিটা দড়িতে মেলে গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে রান্নাঘরে উঁকি দিলো সে। জিজ্ঞেস করল,“বউ! কী রান্ধো?”
“দুধ জাল দেই। গতকালের ভাত, তরকারি সব রয়ে গেছে। আজ পান্তা ভাত খাবেন।”
“অসুবিধা নাই, পারলে দুইডা মরিচ পোড়া দিও।”
“দিয়েছি, আজ সারাদিন ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিবেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
“আইছে আমার গুরুজন। কাম না করলে সংসার চলবো কেমনে?”
“একদিন কাজ না করলে যেন অভাব অনটনে না খেতে পেয়ে মারা যাবো?”
জাল দেওয়া দুধের পাতিল চুলা থেকে নামিয়ে গ্লাসে ভরে গরম গরম স্বামীর হাতে ধরিয়ে দিলো মিছরি, “নিন, এখানে বসে পুরোটুকু খাবেন।”
নাজির দ্বিমত করল না। গ্লাস হাতে নিয়ে চুমুক দিতেই জিভে ছ্যাক লাগলো। মুখ কুঁচকে বললো,“উহ্, কি গরম!”
“ফুঁ না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে খেলে এমনই হয়।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
অপর আরেকটি গ্লাসে দুধ ঢেলে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলো মিছরি। নাজির তার পথ রোধ করে দাঁড়ালো। কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই মেয়েলি কোমল ঠোঁটে চেপে ধরলো গরমে জ্বলতে থাকা নিজের জিহ্বা। মিছরি হতভম্ব হলো, নড়ার শক্তিটুকুও যেন দেহে পেলো না। কিছু সময় অতিবাহিত হতেই নাজির সরে গেলো, তৈরি করল দুজনার মধ্যে দূরত্ব। এমন এক ভাব যেন কিছুই হয়নি। ঢকঢক করে দুধটুকু গিলে স্ত্রীর হাত থেকে অপর গ্লাসটি নিয়ে নওশাদের ঘরের দিকে যেতে যেতে বললো,“সঙের মতো দাঁড়াইয়া আছো ক্যান? পাতিলের দুধটুকু চুপচাপ খাইয়া ভাত বাড়ো। ক্ষেতে যাইতে হইবো।”
বিথী বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের কার্যকলাপ সবটাই দেখলো। ললাটে ফুটে উঠলো বিরক্তির ভাঁজ। মুখ বিকৃত করে বিড়বিড় করে কীসব বলতে বলতে যেন ফিরে গেলো ঘরে।
নাজির সোজা নওশাদের ঘরে এলো। হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় মনমরা হয়ে বসে আছে ছেলেটা। ভাইয়ের উপস্থিতি টের পেতেই মাথা তুলে তাকালো। দুধের গ্লাস তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নাজির বললো,“এমন কইরা মুখ লটকাইয়া বইয়া রইছোস ক্যান? পুরুষ মাইনষের দুর্বল হইলে চলে না।”
“তো কী করবো? এতকিছু জানার পরেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব?”
“অসম্ভবও না, এত পাপ করার পরে ওই অমানুষগুলা ভালা মাইনষের মুখোশ পইরা সুখে শান্তিতে থাকতে পারলে তুই ক্যান পারবি না? আমরা বাপ-মা ছাড়া বড়ো হইছি, নওশাদ। অসময়ে আল্লাহ ছাড়া আমগো আর কেউ আছিলো না। সেসব কহনো ভুলবি না। অতীত যে ভুলে সে-ই নিজের লক্ষ্য থাইক্যা সইরা যায়, তাই শক্ত হো। এমন শক্ত হো যাতে কেউ আঘাত কইরাও ভাঙতে না পারে।”
“পারছি না, ভাই।”
“পারতে হইবো। একলা শুইয়া, বইয়া থাকলে কষ্ট কমার বদলে বাড়বো।তোর ভাবির রান্না শেষ। আমার লগে আয়, খাইয়া ক্ষেতের মিহি যাই। এক লগে এত কাম আমার একলার পক্ষে সম্ভব?” থেমে দম ছেড়ে পুনরায় বললো,“শহরে যাবি কবে? ভূমি আফিস ঘুইরা হেরপরে পাসপোর্ট আফিসে যাবি।”
“পাসপোর্ট অফিস কেন? আমি দেশ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।”
“ওইডা পরে দেহা যাইবো, আয় আমার লগে। মনের কথা মনেই রাইখা দে। কেউ খোঁচাইলেও কহনো কাউরে কিচ্ছু কইবি না। পিঠপিছে আপন মানুষেরাই কিন্তু ছুরি দেয়, তা তো জানোসই।”
নওশাদ চুপচাপ মাথা নাড়ালো। ভাইয়ের পিছুপিছু খাবার ঘরে এসে কোনোমতে খেয়ে পেট ভরালো। তারপর কারো সঙ্গে কথা না বলে নাজিরের সাথে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো।
সকালে দাদার সাথে কথা বলা শেষে নাজিরের খোঁজে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে তালেব। মাঠঘাট ঘুরে শাহ বাড়ির সামনে এসে থামলো সে। ভেতরে ঢুকবে কী ঢুকবে না দ্বিধায় পড়ল। সেই দ্বিধা কাটিয়ে উঠার পূর্বেই হঠাৎ দেখতে পেলো এদিকেই আসতে থাকা মিল্টনকে। কাল বিলম্ব না করে সোজা জিজ্ঞেস করল,“নাজির কই রে? ডাক দে তো।”
অতীতে মাস্টার বাড়ির লোকেদের সঙ্গে সরাসরি আক্রমণাত্মক সম্পর্ক থাকলেও এখন আর তাদের সঙ্গে কোনোরূপ খারাপ আচরণ মিল্টন করে না। নাজির নিষেধ করে দিয়েছে। প্রত্যুত্তরে ভদ্রভাবেই বললো,“ভাইজানে বাড়িত নাই। একটু আগে পুব পাড়ার হউড়া ক্ষেতে যাইতে দেখছি। আমারে পাঠাইছে কিটনাশক লইয়া যাইতে।”
তালেব আর কথা না বাড়িয়ে সেদিকে হাঁটা ধরলো। পৌঁছাতে বেশ সময়ই লাগলো। একেবারে পুব পাড়ার শেষ মাথায় জমি।
নাজির ওই পাড়ার সেলিম মোল্লার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সাথে আরো দুজন অচেনা লোক। দেখে বুঝাই যাচ্ছে না, এই ছেলেটাই যে গতকাল অসুস্থ ছিল। স্ত্রীর সেবা শুশ্রুষা তবে ভালোই কাজে দিয়েছে। শরীরের তাপমাত্রাও এখন স্বাভাবিক। তাই বিশ্রামকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির কাজ শেষ করে খাবার খেয়েই চলে এসেছে চাষের জমিতে।
তালেব সামনে আর এগোলো না। কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রইল। ততক্ষণে মিল্টন বাড়ি থেকে চলে এসেছে। ফসলি জমির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে হাঁক ছেড়ে ডাকলো,“ভাইজান, আমনের সম্বন্ধি আইছে।”
মিল্টনের ডাকে তাদের আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটলো বলেই মনে হলো।নাজির দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তালেবের দিকে একপলক তাকালো। তালেব অপ্রস্তুত হলেও মৌন রইল। লোকগুলোকে বিদায় দিয়ে গলার গামছা ঝাড়তে ঝাড়তে তার সামনে এসে দাঁড়ালো নাজির। নাটকীয় ভঙিতে বললো,“আসসালামু আলাইকুম সম্মানিত, সম্বন্ধি। হঠাৎ কী মনে কইরা?”
“আজকাল তোর দেখা পাইনা, থাকোস কই?”
“বাড়িতই, আমনের বোইনও ভালা আছে।”
“ফাইজলামি ছাড়।”
“আইচ্ছা।”
“দাদাজান যাইতে কইছে।”
“একটু কাম আছে, পরে যামু।”
“দাদাজানের এইবার অনেক অসুখ। পায়ে পানি উঠছে, সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। কয়দিন ধইরা তোর লগে দেহা করার লাইগা বেচান হইয়া উঠছে। আয়, একবার দেহা কইরা যা। বাড়িত এহন আব্বা ছাড়া তেমন কেউ নাই। কহন কী হইয়া যায়?”
তালেব ভেবেছিল, নাজিরকে বুঝিয়ে রাজি করাতে তাকে আরো শব্দ ব্যয় করতে হবে। কিন্তু তা প্রয়োজন হলো না। ছেলেটা কী ভেবে যেন সহজেই রাজি হয়ে গেলো। মিল্টনকে ডেকে জমিতে কিটনাশক ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললো,“এই দিকের কাম শেষ হইলে নওশাদরে লইয়া মিলে গিয়া হিসাবের খাতাডা ধরাইয়া দেইস।” তারপর তালেবকে তাড়া দিয়ে বললো,“চলো।”
সকাল আর দুপুরের খাবার পর বাড়ির বউদের হাত ফাঁকাই থাকে। দিলারা বেগম রোদে আচার শুকাতে দিয়ে পিঁড়ি পেতে বসলেন। পাশের বাড়ি থেকে দুজন মহিলা এসেছে। তাদের সঙ্গেই দুই জা মিলে হেসে গল্প করছেন। সৈয়দুন নেছা আজ আর ঘর থেকে বের হননি। অসুস্থ স্বামীর পাশে বসে আছেন। বুড়োর প্রতি তিনি বরাবরই কৃতজ্ঞ। তাঁর জন্যই তো এই জীবনে এত সুন্দর একটা ভরা সংসার আর সম্মান পেয়েছেন বৃদ্ধা। নইলে কী হতো তাঁর? যৌবনকাল তো মোটেও ভালো ছিল না।
নাজির বাড়িতে প্রবেশ করেই শাশুড়িকে দেখে লম্বা একটা সালাম দিলো,“আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আম্মাজান।”
পারুল ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। আমতা আমতা করে সালামের জবাব নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। নাজির হাসিমুখে তালেবের দেখিয়ে দেওয়া কক্ষে প্রবেশ করল। সে যেতেই ছেলের উদ্দেশ্যে পারুল জিজ্ঞেস করলেন,“অসময়ে জামাই আইলো যে? মিছরি ঠিক আছে?”
“দাদাজানের লগে দেখা করতে আইছে।”
দিলারা বেগম উঠে গেলেন। বাড়িতে জামাই এসেছে বলে কথা! আপ্যায়নের জন্য কিছু না কিছু সামনে তো দিতেই হয়। ছোটো জাকে তাড়া দিয়ে বললেন, “আয়, তাড়াতাড়ি চা জাল দে, আমি বিস্কুট বাহির করতাছি। আইজ আবার জামাইয়ের সামনে বেশি কথা কইয়া ফেলাইস না। ভালা ব্যবহার করবি।”
ঘরে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে উপস্থিত মানুষদের সালাম দিলো নাজির। আকবর মিয়া তাকে দেখে বেজায় খুশি হলেন। সেই খুশি নাজিরের সহ্য হলো না। সৈয়দুন নেছা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন,“এনে বও, নাতজামাই। তুমগো দাদায় এতক্ষণ তোমার কথাই কইতাছিল।”
“কী কথা কইতাছিল? নিন্দা করতাছিল বুঝি আমার নামে?”
আকবর মিয়া হাসলেন। বললেন,“হ, অনেক নিন্দা করতাছিলাম।”
“হায় হায়, সামনের দাঁত দেহি পইড়া গেছে!”
“বয়স হইছে না? নাতির ঘরে পুতি দেখছি। আর কয়দিন?”
নাজিরের চোখ গিয়ে স্থির হলো ফোলা পায়ের দিকে। জিজ্ঞেস করল,“পায়ের এই অবস্থা ক্যান?”
“জানি না, হঠাৎ কইরা পানি উঠছে। কয়দিন ধইরা অসুখ। মনে হয় আর বাঁচমু না।”
“এত তাড়াতাড়ি মরবেন না। এহনো কতকিছু দেহা বাকি!”
কিছুক্ষণ পর কাশেম আলী এসেও বসলেন সেখানে। নাজির কী বলবে বুঝতে পারলো না। আগের মতো রসকস, ফুর্তি তার মনে নেই। বাহ্যিকভাবে যা দেখায় সবই অভিনয়। কাশেম আলী বললেন,“হুনলাম নওশাদের নাকি তালাক হইছে? গেরামে কী এইবার একেবারেই আইয়া পড়ছে?”
আকবর মিয়ার হাসি প্রদীপের শিখার মতো নিভে গেলো। বিস্ময় নিয়ে বললেন,“সে কী! ওয় না নিজে পছন্দ কইরা বিয়া করছিল?”
“সব পছন্দে কী আর সুখ থাকে? একলগে থাকতে পারবো না মনে হইতেই দুইজনের ইচ্ছাতে ছাড়াছাড়ি হইয়া গেছে।”
“তারপরেও, পরিবারের লগে বইয়া কথা কওয়া উচিত আছিলো। বিয়া তো আর ছেলেখেলা না যে চাইলাম, করলাম আবার ভাইঙা ফেলাইলাম।”
“বইছিলাম কিন্তু মাইয়ার পরিবারের মানুষ একটু বেশিই অহংকারী। তারা চায় তাগো মাইয়ারে লইয়া মাইয়া জামাই শ্বশুরবাড়ি ঘরজামাই থাকবো, তাগো কথায় উঠবস করবো। আমার আবার এইসব পছন্দ না। পুরুষ মানুষ পুরুষ মাইনষের মতোই ঘাড় উঁচা কইরা বাঁচবো। অন্যের দাসত্ব মানবো ক্যান? নওশাদে যদিও কম চেষ্টা করে নাই। কিন্তু মাইয়াও তেমন জোর দেয় নাই। তাই আরকি বেশি দূর সম্পর্ক আগায় নাই। যা হইছে ভালাই হইছে।”
আকবর মিয়া মাথা নাড়ালেন।কাশেম আলী বললেন, “তা ঠিক করছে। বেশি দাঁতওয়ালা মাইয়া দিয়া সংসার হয় না। মাইয়ার সংসারে বাপ-মা ক্যান নাক গলাইবো?”
চট করে মেঝে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শ্বশুরের মুখের দিকে তাক করল নাজির। কাশেম আলী ভড়কে গেলেন। আকবর মিয়া কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “এহন ওয় কী করবো? একলা একলা তো দিন চলবো না। ভালা মাইয়া দেইখা বিয়া দিয়া দেওয়া উচিত। আমি দিমু নাকি? দুই ভাইয়ে আকবর মিয়ার নাতিন লইয়া সংসার করবি না হয়। বোইনে বোইনে মিল মোহাব্বত থাকবো।”
সৈয়দুন নেছা জিজ্ঞেস করলেন,“কার কথা কন?”
“আবেদার মাইয়া শালিকের। ভালাই ডাঙর হইছে, আমগো মিছরির সমানই তো।”
“মিছরির থাইক্যা বছর দেড়েকের বড়ো, আব্বা।” কাশেম আলী বললেন।
এই আলাপ নাজিরের পছন্দ হলো না। বললো,“মাত্র তালাক হইছে। এহনি বিয়া করবো না। ভাবতাছি দেশের বাহিরে পাঠাইয়া দিমু। দেশে থাইক্যা লাভ কী? হেরপরে না হয় ভালা মাইয়া দেইখা বিয়া দিয়া দিমু।”
“বিদেশ পাঠাবি?”
“ভাবতাছি কিন্তু সে রাজি হয় না। এহন দেহি, কী করা যায়। লেখাপড়া তো শেষই। চাইলে চাকরি- বাকরি করতে পারবো। কিন্তু ভালা চাকরির লাইগাও তো আজকাল ঘুষ লাগে।”
মাথা নাড়ালেন সবাই। নাজির এবার তাড়া দিয়ে বললো,“ডাকছিলেন ক্যান? কিছু কওয়ার থাকলে কন, একটু কাম আছে আমার।”
দিলারা বেগম আর পারুল চা, বিস্কুট, ফলমূল নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। দুটি চেয়ার একসঙ্গে জুড়ে তার উপরে রাখলেন সব। দিলারা বললেন,“বেশি কিছু আয়োজন করতে পারি নাই, বাবা। দুপুরে কিন্তু না খাইয়া যাওয়া চলবো না।”
“কথা শেষ হইলেই আমি চইলা যামু, চাচী। না হইলে বউ আবার রাগ করবো।”
“তা তোমার বউয়ে সংসার কেমন করে?” দিলারা জিজ্ঞেস করলেন।
“ভালাই, আস্তে আস্তে শিখতাছে। তবে আগে থাইক্যা বোঝদার, সংসারী হইছে।”
কাশেম আলী বললেন,“ওয় এমনিতেও বোঝদারই। আদর কইরা বুঝাইলে সব বুঝবো কিন্তু ধমক দিয়া কিছু কইলেই করবো ঘাউড়ামি।”
বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা শেষে সবাই একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। এখন শুধু রয়েছেন আকবর মিয়া আর সৈয়দুন নেছা। সময় সুযোগ পেয়ে বৃদ্ধ প্রশ্ন করলেন,“তুই তো আমারে কোনো খবরই দিলি না। আমার কী সত্য জানার অধিকার নাই?”
“কোন সত্য?” নাজির বুঝলো না।
“তোর মামার বাড়ি গেছিলি?”
“হ, আব্বা মরার আগেই গেছিলাম।”
“পাইছোস তোর মায়ের খোঁজ?”
“মরা মাইনষের খোঁজ পাওয়া যায়?”
বুড়োর হাস্যোজ্জ্বল মুখখানায় আঁধার নেমে এলো। ঘরের কানায় কানায় নিস্তব্ধতা ভর করল। সৈয়দুন নেছা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“মরা মানুষ মানে? নাসরিন মইরা গেছে?”
বৃদ্ধার প্রশ্নের উত্তর দেবে কী দেবে না বুঝতে পারছে না নাজির। আকবর মিয়া অস্থির হয়ে উঠলেন। উঠে বসার চেষ্টা করে বললেন,“কিছু লুকাইস না, দাদা। যা সত্য জানতে পারছোস সব আমারে ক।”
নাজির একপলক বৃদ্ধার দিকে তাকালো। আকবর মিয়া আশ্বস্ত করে বললেন,“এইডা আমার সহধর্মিণী। জীবনে এমন কিছু নাই যা আমি তার কাছে কই নাই। দেহ আলাদা হইলেও আমগো আত্মা এক। তাই চিন্তা নাই।”
নাজির দীর্ঘশ্বাস ফেলল,“আমনের কথাই ঠিক। যেই নারীর স্বামী, সন্তানের প্রতি এত ভালোবাসা সেই নারী কহনো ভরা সংসার রাইখা পলাইতে পারে না। আমার মা সাড়ে একুশ বছর আগেই এই পৃথিবী ত্যাগ করছে, খুব যন্ত্রণা নিয়া নিজের সম্মান খুয়াইয়া এই পৃথিবী ছাড়ছে। আমার মায়রে রাইতের আঁধারে ওরা…” গলার স্বর তার এলোমেলো হয়ে যায়। নোংরা শব্দটা উচ্চারণ করতে পারে না। তবুও কথা শেষ করার উদ্দেশ্যে বলে,“নিজেগো স্বার্থের লাইগা তারা আমার মায়রে মাইরা ফেলাইছে। আব্বা দেইখা ফেলানোয় আব্বারেও তারা মাইরা ফেলাইতে চাইছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে শেষমেশ বাইচ্চা গেছে। হেরপরে গেরামে ছড়াইছে মা নাকি পলাইয়া গেছে। এত্তগুলা বছর ধইরা আমরা তাই বিশ্বাস করছি, আমার মায়রে আমি ঘৃণা করছি।”
বিভৎস সত্যটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আকবর মিয়া জানেন, ফতেহ আলী শাহর দুই পুত্র খারাপ, অমানুষ। কিন্তু তাই বলে নিজের ভাই আর ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে! অসুস্থ বৃদ্ধ যেন সেই কথার ভার নিতে পারেন না। নাজির আজ কিছুই লুকালো না। মনের মধ্যে কথা জমিয়ে রাখলে মানুষ ভালো থাকতে পারে না, অস্থির লাগে, কাজেকর্মে মন বসে না। সামনে বসা বুড়োকেই এই শেষ সময়ে নাজিরের ভীষণ বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। তাই গোপন কথাগুলো বলে দিলো। সৈয়দুন নেছার চোখ জোড়া ভিজে উঠলো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন,“কত্ত খারাপ! আল্লাহ, এই দুনিয়াতেই তুমি হেগো বিচার কইরো। লোভের কারণে এমনে কেউ কারো প্রাণ নেয়! এই শত্রু গো মাঝখানে কেমনে এতকাল থাকছোস তুই?”
আকবর মিয়া ছটফট করতে করতে বললেন,“ওই বাড়ি, ওই বংশ তুই ছাইড়া দে। ওগো মধ্যে থাকার আর দরকার নাই। যদি তগো দুই ভাইয়ের লগেও এমন করে? আমি তো এতকিছু জানতাম না, আঁচও করতে পারি নাই। আমার নাতনিডার এহন কী হইবো? আইয়া পড়। আমি আছি, আমার পোলারা তোরে সাহায্য করবো।”
নাজির উঠে দাঁড়ালো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“বিপদ থাইক্যা পালায় ভীতুরা কিন্তু নাজির শাহ তো ভীতু না। মাথার উপরে আল্লাহ আছেন। কিছু হইবো না। কারো সাহায্যের আমার আর দরকার নাই। মানুষের সাহায্য ছাড়াই আমি নাজির শাহ এতদূর পর্যন্ত আইছি। মুখোশ পড়া বাপ, দাদা, মায়ের খুনি গো লগে বাস করছি। এহন আর কী করবো তারা? এর শেষ আমি দেইখাই ছাড়মু।”
কথা শেষে সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না নাজির। আকবর মিয়া তাকে ডাকলেন, তবুও পিছু ফিরে তাকালো না সে। বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। বুকে তার জমে আছে সহস্র দিনের প্রতিশোধের আগুন। আকবর মিয়ার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। স্ত্রীর চামড়া কুঁচকে যাওয়া হাত জোড়া ধরে বললেন,“লোভের মতন প্রতিশোধও খুব খারাপ জিনিস, দুনা। কাউরে সুখে থাকতে দেয় না। দুনিয়ায় হেরা রাজা হইলেও পরকালে ভিখারি। হেগো বিচার আল্লাহ করবো। ওরে তুমি থামাও। জীবন নষ্ট কইরা লাভ নাই। ওয় একলা পারবো না।”
যাত্রাপথ পর্ব ৪৩
স্বামীকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পেলেন না সৈয়দুন নেছা। তাঁর মনের অবস্থাও তো আহামরি ভালো নয়। পিতার কণ্ঠস্বর শুনে ছেলেরাও এসে উপস্থিত হলো ঘরে। অথচ এই কান্না, অস্থিরতা, বিলাপের পেছনের সত্য কাহিনী জানতে পারলো না কেউ। সারাদিন এভাবেই চললো। নাতিরাও দুপুরের দিকে ফিরে এলো বাড়ি। পুত্রবধূরা মাথায় পানি ঢাললো। ছেলে, নাতিরা হাতে পায়ে তেল মালিশ করে দিলো। দুই পুত্রকে পাশে বসিয়ে কী কী যেন বললেন তিনি। আর তারপর! এই নিষ্ঠুর পৃথিবীকে চিরবিদায় জানিয়ে দীর্ঘদিন একসঙ্গে পথচলা স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বৃদ্ধা সঙ্গী হারানোর ব্যথা সহ্য করতে পারলো না, চিৎকার দিয়ে ওখানেই জ্ঞান হারালো।
পরিশেষে মাস্টার বাড়ির প্রাণ, কর্তা, বনখড়িয়া গ্ৰামের কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারী আকবর মিয়ার অধ্যায়ও ফুরোলো।
