Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৩+১৪

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৩+১৪

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৩+১৪
সাইয়্যারা খান

— সামনের মাসে পরিক্ষা শুরু। আপাতত সব থেকে বিরত থাকব। হয়তো দেখা হবে না অনেকদিন। আশা করি আমার জন্য হলেও নিজের খেয়াল রাখবেন৷ অবশ্য আমি জানি আপনার আব্বু আপনার জন্য যথেষ্ট তবুও আমার জন্য নিজের প্রতি যত্ন নিবেন। ভার্সিটি আসবেন। পড়বেন। চলে যাবেন। কারো সাথে কোথাও ঘুরতে যাবেন না। ঠিক আছে? আর হ্যাঁ উজ্জ্বল আর হিমু তো আছেই ওদের সাথে থাকবেন। আমি কি বুঝাতে পারলাম?
মৃত্তিকা’র কান কথাগুলো শুনতেই মস্তিষ্কের নিউরনে উদ্দীপনা সৃষ্টি হলো। এক ঝটকায় বুঝে গেলো একমাস। টানা একমাস পূর্ণ’র দেখা মিলবে না। এটাই শেষ বর্ষ তার। এককথায় বলা যায় ছাত্র জীবনের সমাপ্তি। যদিও মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছাত্র থাকে। শিক্ষা মানুষ আমৃত্যু গ্রহণ করতে থাকে। কিন্তু ধারাবাহিক শিক্ষার সমাপ্তি এখানেই পূর্ণ’র। মৃত্তিকা’র বেজার হওয়া মুখটা দেখে পূর্ণ গম্ভীর কণ্ঠে শাঁসালো,

— আমি কি আপনার মন খারাপ করতে এসব বলেছি মৃত্ত?
মৃত্তিকা মাথা নাড়লো। পূর্ণ এবার কিছুটা রাগ চাপার চেষ্টা করলো। ঠান্ডা স্বরে বুঝাতে চাইলো,
— বেশি দিনের ব্যাপার না মৃত্ত। আসলে আমি সারাবছর তেমন পড়াশোনা করি না। এত কাজের চাপে হয়ে উঠে না। পরিক্ষার আগে যথেষ্ট সিরিয়াস হয়ে যাই।
— তাতেই এত ভালো সিজিপিএ আসে?
— আসে তো। একেকজন একেকভাবে পড়াশোনা করে মৃত্ত।
— হুম।
— আচ্ছা। আমার পূর্ণময়ীর মন ভালো করতে এই পূর্ণ কি করতে পারে?
— ঘুরতে চলি?
— প্রেম করতে চাইছেন। কিন্তু আমি তো আগেই বলেছি আমার দ্বারা প্রেম হবে না।
মৃত্তিকা থতমত খেলো। সেই ভাব কাটিয়ে উঠতে নিলেই পূর্ণ আবার বলে উঠলো,
— আপনার অনেক সখ প্রেম করার অথচ কপালে জুটলাম কি না আমি। আফসোস হয় মৃত্ত? হলেও লাভ নেই। আমাকে নিয়েই থাকতে হবে। অন্য কোন চিন্তা থাকলে তার দাফন দিন নাহয় আমি দিয়ে দিব৷ কথাটা জানি মনে থাকে।
মৃত্তিকা মুখ হা করে বসে রইলো৷ কি থেকে কি বললো পূর্ণ? প্রথম প্রথম নরম গলায় বললেও পরেরগুলো দিলো ধমক। কিন্তু কেন? কাকেই বা দাফন দিবে? মৃত্তিকা থতমত খেয়েই জিজ্ঞেস করলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— ক..কি বলছেন? কে থাকবে আমার মনে?
— কু*ত্তা*র বাচ্চা চিনেন মৃত্ত? ঐ কাব্য ও তেমন। একবার যেমন রুটি খাওয়ালে কুকুর পিছ ছাড়ে না তেমনই কাব্য ও পিছ ছাড়বে না আপনার। কি ভেবেছেন আমি টের পাব না? পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির এই শরীর নিয়ে আমার থেকে কথা লুকান? কতটা বড় কলিজা আপনার মৃত্ত? কিভাবে বড় করলেন? নিশ্চিত কারো আস্কারা পেয়েই বড় হয়েছে? আস্কারা টা কে দিলো? কে দিলো? কাব্য? ঐ ****বাচ্চা কাব্য! এই কথা বলুন? কথা বলুন বলছি? আমার রাগ কিন্তু মাথায় উঠে যাচ্ছে মৃত্ত। বলুন ওর সাথে আপনার কি?

পূর্ণ ঠান্ডা স্বরে বললো প্রথম টুকু অথচ চেঁচিয়ে উঠলো শেষ দিকে। মৃত্তিকা সেই প্রথম প্রথম পাওয়া ভয়টা আজ পেলো। দীর্ঘদিন পর আবারও পূর্ণ’র সেই চেহারা তার সামনে। আগে অবশ্য তার সামনে গালি দিত না। আজ বিশ্রী দুটো গালিও দিলো তার সামনে। গাছের গুড়ি খামচে ধরলো মৃত্তিকা। বুকের ভিতর ধ্রীম ধ্রীম শব্দ হচ্ছে। উঠার চেষ্টা করলেও লাভ হলো না। শক্তি কুলাচ্ছে না উঠতে। পূর্ণ সজোরে এক আঘাত করে বসলো মোটা গাছটায়। ছাল বাকল উঠানো হওয়াতে হাতে লাগলো বেশ। মৃত্তিকা ঝট করে উঠলো। নিজের দুই হাতে ধরে ফেললো পূর্ণ’র শক্ত সেই হাতটা। ছাড়িয়ে নিতে চাইলো পূর্ণ কিন্তু হলো না।

তার মৃত্ত থেকে নিজেকে কিভাবে নিজেকে ছাড়াবে সে? এটা অসম্ভব। মৃত্ত’র এই ছোঁয়া পাওয়ার জন্য তার হাতের আত্নহুতি দিতেও সক্ষম সে। মৃত্তিকা পূর্ণ’র হাতটা চেপে ধরলো। কোন প্রকার জড়তা ছাড়া একটা চুমু খেয়ে নিলো সেই শক্ত হাতে। ঠান্ডা বরফের খন্ড তখন পূর্ণ। রা নেই মুখে। চোখে মুখে তার অন্ধকার হানা দিয়েছে। মাথা নামানো। মস্তিষ্ক বললো, ” দে পূর্ণ ধমকে দে এই মৃত্ত’কে। কত সাহস! যেখানে তুই ছোঁয়া দিস না সেখানে সে চুমু খায়”। মস্তিষ্ক একথা বললেও প্রেম লোভী মন বললো ভিন্ন কথা। সায় দিলো সে মৃত্ত’কে। পূর্ণ’কে বুঝিয়ে বলতে লাগলো, ” থাক না একটু। একটুই তো। তোরই তো। একটা চুমুই তো। খাক। তুই তো ধমকালি বিনিময় হিসেবে চুমুটা রেখে দে পূর্ণ। যত্নে রেখে দে”।
পূর্ণ যখন মন মস্তিষ্কের ঝগরা থামাতে মশগুল তখন মৃত্তিকা ব্যাগ থেকে পানি বের করে তার হাতে ঢালতে ব্যাস্ত। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বলেও যাচ্ছে,

— ভুল ভাবছেন আপনি। ঐ ভাইয়াটা আমাকে নোটস দিতে চাইছিলো। তার সাথে কোথাও যাই নি আমি। কোথাও না। বিশ্বাস করুন। তিনি আমাদের সাথে গিয়েছিলেন। সে সাথে থাকায় আমি ফুচকাও খাই নি। বাসায় চলে গিয়েছিলাম। আমি আব্বুর সাথে ছিলাম। বিশ্বাস না করলে উজ্জ্বল আর হিমু’কে জিজ্ঞেস করুন।
— বিশ্বাস করলাম।
ঠান্ডা স্বরে বললো পূর্ণ।

মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে পূর্ণ। মনোযোগ সম্পূর্ণ তার বইয়ের পাতায়। পাশেই ওর বাবা বসা। ভদ্রলোক টিভির সাউন্ডটা একদম শূণ্যতে দিয়ে খবরের চ্যানেল দেখছেন। পূর্ণ বারকয়েক আওড়ালো বাবা’কে যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সাউন্ড দিয়ে দেখে কিন্তু তিনি তা করেন নি। ছেলে পড়ছে তাই ডিসটার্ব করতে নারাজ তিনি। পূর্ণ’র মা ছেলের মায়াবী মুখটাতে তাকিয়ে রইলেন। পরপর নিজেকে নিজে বলতে লাগলেন, “এভাবে দেখা ঠিক না যদি নজর লাগে তার সোনার টুকরোর”?

পূর্ণ প্রায় আড়াই ঘন্টা ওভাবেই পড়েছে। এটা তার একটা অভ্যাস। এভাবে এতবড় হয়েও বাবা-মায়ের বেড রুমে তাদের খাটে তাদের প্রাইভেসি নষ্ট করে সে পড়ে। যদিও অন্য ছেলেপুলে’রা বাবা-মা’কে প্রাইভেসি দেয় কিন্তু পূর্ণ দেয় না। পরিক্ষা’র সময় তো মোটেই না। বাবা কতবার বলে, এত বড় ছেলে হয়োছো দুই দিন পর বিয়ে করবে এখনও কি না মা-বাবার বেডরুমে শুয়ে থাক? পূর্ণ তখন দুষ্ট হেসে বাবা’কে বলে উঠে, আমার মৃত্ত অনেক আদুরে আব্বু। সে আসলে তোমরাই তখন তাকে আদর করে কুল কিনারা পাবে না।
পূর্ণ বাবা-মা’কে মৃত্তিকা সম্পর্কে জানিয়েছে। জানিয়েছে বললে ভুল হবে। সোজা সোজা বলেছিলো,”আব্বু একটা পূর্ণময়ী পেয়েছি। ভালো একটা কালক্ষণে তাকে বিয়ে করে নিব”। ছেলে তাদের বরাবরই বাবা-মা’কে জানিয়ে কাজ করে। মৃত্তিকা সম্পর্কে ও তারা জানে। পূর্ণ জানায়। রোজ জানায়। কিন্তু দেখা হয় নি চোখের। পূর্ণ’র কাছে কোন ছবি নেই মৃত্তিকা’র।
আড়মোড়া ভেঙে পূর্ণ সোজা হলো। বাবা’র দিকে তাকিয়ে বললো,

— নাও তোমার বউ তোমাকে দিয়ে গেলাম। একটু পরই আসছি আবার।
ওর বাবা ছেলের কথায় হাসলেন। বুঝেন না এমনটা না। ছেলের এমন সব কান্ড তার বরাবরই জানা। পূর্ণ যেতে যেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
— আম্মু ক্ষুধা লেগেছে খেতে দাও।
ওর মা তারাতাড়ি বিছানা ছাড়লেন। পেছন থেকে স্পষ্ট শুনা গেলো বাবা’র কন্ঠ,
— কোথায় দিলি আমার বউ? সেই তো তোর কাছেই নিয়ে গেলি।
পূর্ণ’র মা স্বামী’র দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। মৃদু ধমকের সুরে বলে উঠলেন,
— বুড়া হচ্ছো অথচ পাগলামি ছুটলো না। এতবড় ছেলেকে কিসব বলো তুমি?
— কই কি বললাম। হায় আল্লাহ! এই ছেলে বাসায় থাকলেই আমি বউহীনা ভুগি আর তুমি কি না আমাকেই দোষ দাও?

ওর মা আর স্বামী’র কাছে থাকলো না৷ গটগট পায়ে চলে গেল খাবার গরম করতে।
এতসবের আড়ালে হাসে পূর্ণ। অতিসূক্ষ্ণ হাসিটুকু যা পরিবার বাইকে কাউকে সে দেখায় না। রাখে একদম আড়ালে। আবডালে। বাবা-মায়ের রুমে পড়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাদের সময় দেয়া। তাদের বুঝানো এখনও তারা অতটাই গুরুত্বপূর্ণ সন্তানের কাছে। তাদের ভূমিকা কমে নি বরং বেড়েছে। মা’কে একটু বেশি আগলে রাখে পূর্ণ। বাবা’কে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখে এতসব উদ্ভব কথা বলে।

— আব্বু মায়ের কথা শুনো। এসব ছেড়ে দাও। ভালো না এসব আব্বু। নোংরা এসব।
— কিচ্ছু হবে না আম্মু। তুমি ভয় পাচ্ছো খামাখা। আমি নিজেকে নোংরা হতে দেব না।
পূর্ণ’র মা ছেলের পাতে মাছ বেছে আরেকটু দিলেন। পূর্ণ’টা মাছ বাছতে পারে না। আবারও বললেন,
— ড্রেন দিয়ে ময়লা গেলেও সেটা নোংরা তেমনি দুধ গেলেও নোংরা আব্বু। ছেড়ে দাও। মা ক্লান্ত এসবে।
পূর্ণ নিজের প্লেট থেকে এক লোকমা ভাত তুলে দিলো মায়ের গালে। পরপরই টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বললো,
— দেখ আব্বু কিভাবে হিংসাত্মক ভাবে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। হিংসুটে আব্বু।
ওর বাবা মুখ সিটকে বলে উঠলেন,
— আমার বয়েই গেছে।
— গেছেই তো।
বলেই পূর্ণ হাসলো। প্রতিবারের ন্যায় অতিসূক্ষ্ণ ভাবে এরিয়ে গেলো মায়ের কথা। রাজনীতি সে ছাড়তে নারাজ। যেকোনো ভাবেই নারাজ। এই রাজনীতি তার লাগবেই। হোক সেটা নোংরা তবুও চাই। এই নোংরা রাজনীতি করেই দম নিবে পূর্ণ। কিছু মানুষকে দেখিয়ে ছাড়বে নোংরা রাজনীতি করেও কিভাবে নিজেকে শুদ্ধতম রাখা যায়।

শোয়েব মির্জা বরাবরই হতাস হচ্ছেন। কোন দিকেই কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। এভাবে কিভাবে হবে? মাহিন মিয়া তাকে সাহস দিয়ে বলে উঠলো,
— স্যার চিন্তা করবেন না। চাল পাল্টা খেতে কতক্ষণ?
— আমি নিজের উপর অবাক মাহিন। দুই দিনের চিনেপুটি আমাকে চিন্তায় ফেললো? চুল আমি….
— রাজনীতি করে সাদা করেছেন।
মাহিন মিয়া তার স্যারকে থামিয়ে বলে উঠলো। শোয়েব মির্জা মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি দিলেন। মানে আসলেই এই চুল সে রাজনীতি করে করেই সাদা করেছেন। এই হাতে হাতড়েছেন প্রিয় জনের র*ক্ত। আর যাই হোক রাজনীতি করতে পিছু পা হবেন না তিনি।
মাথাটা ইজি চেয়ারে রেখে বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
— সাফারাত’কে ডাকো।
— ছোট বাবা তো বাসায় নেই।
শোয়েব মির্জা’র বৃদ্ধ কপালে চিন্তার ভাজটা স্পষ্ট দেখা দিলো।

সাফারাত নরম গদিতে গড়াগড়ি খেলো। শরীর বেশ ক্লান্ত তার। পড়নে তার একটা টাউজার শুধু। খালি গায়ে বিছানায় লেপ্টে আছে তার দেহ। এখন একটা নারী হলে মোটেও মন্দ হতো না। তাকে এই বুকে নিয়ে গড়াগড়ি খেতো সে। ফর্সা বুকে তার লোমের আনাগোনা। অতি আকর্ষণীয় তার বলিষ্ঠ দেহখানা৷ নিঃশ্বাসের দরুন পেটটা উচু নিচু হচ্ছে বারংবার। অলস ভাঙ্গিতে পাশ থেকে ফোনটা হাতড়ে নিলো। ডায়াল লিস্টে তিন নাম্বার নামটায় চাপ দিয়ে কল লাগালো। একবার দুইবার তিনবার রিং হতেই শুনা গেলো নারী কন্ঠ। এই কন্ঠ খুবই সুন্দর। অতি সুন্দর। সাফারাত নিজের হাতটা বুকে বুলাতে লাগলো। আওড়ালো গভীর কন্ঠকে খাদে ফেলে,
— বড়ই ভয়ংকর এই কন্ঠ। শক্ত পুরুষকে ঘায়েল করার মতো ভয়ংকর। বুকে খঞ্জর চালানোর মতো ভয়ংকর। ভয়ংকর সুন্দর তোমার কন্ঠ নারী।

দিন গুলো বিষাদময়। বড্ড বেদনাদায়ক। এত সুন্দর জ্বলজ্বল করা রাতের গোল ভরাট চাঁদ। আকাশ জুড়ে তাঁরা’র আনাগোনা। দিন ভরা সুন্দর এই প্রকৃতি। শরৎ এখন বিদায় নেয় নি। আসে নি হেমন্তের সকাল। মাঝেমধ্যে কাশ ফুলের পাপড়ি উড়ে এসে জানান দেয় আমরা এখনও আছি। চাইলে কোন প্রেমদীপ্ত নর-নারী ছুটে আসতে পারো। উদার মনে তোমাদের প্রেম নিবেদন এ হাত বাড়াব আমরা।

এতোসবের মাঝে কেউ কি মন মরা থাকতে পারে? কেউ কি মনের গহীনে লুক্কায়িত অনুভূতিগুলো কবর দিয়ে রাখতে পারে? উহু পারে না তো। একদম ই পারে না। মৃত্তিকা ও পারে না। পারছে না। আজ বড্ড আফসোস হচ্ছে। কেন নিজের বিড়াল সমান মনটা দিতে গেলো ঐ পাষান্ড পুরুষকে? এখন মৃত্তিকার এই উত্তপ্ত কয়লা পোড়ানো মনটাকে কে ঠান্ডা করবে? সেই পাষাণ পূর্ণ ভাই তো তাকে মনেও করে না। পাগল পাগল লাগে নিজেকে মৃত্তিকা’র। হ্যাংলার মতো পূর্ণ’র অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে তার ডিপার্টমেন্টের বাইরে। অথচ পূর্ণ যেন দেখেও দেখে না। সময় নেই তার। পড়াশোনায় বেশ চাপে আছে সে। মৃত্তিকা’কে কিভাবে সময় দিবে। হাজার হোক দিন শেষে গভীর হাতে একটা কল ও দেয়া যায় না। আফসোস! নাম্বার নেই সেই পাষান্ড পুরুষের। নাহলে মৃত্তিকা নিজেই ছেঁচড়া সাজতো। কল করতো রাত দুপুরে।
বিষাদে ভরপুর মৃত্তিকা বাবা’র রুমে শুয়ে আছে। এখন ও আসে নি তিনি। কিছুক্ষণ বাবা’র জিনিস পত্ত হাতাহাতি করলো। বই আর বই। এত জ্ঞান কোথায় রাখে সে? হঠাৎ চিরপরিচিত ডাক পরলো,

— কি করেন আমার ছানা?
— বই দেখি তোমার হুলো বিড়াল।
বাবা চমকালেন। আচর্য স্বরে বলে উঠলেন,
— হুলো বিড়াল?
— আমাকে ছানা বললে কেন?
কথাটা বলেই বাবা’র হাতে থাকা ব্যাগটা নিলো। বিছানায় গোল হয়ে বসে ব্যাগ হাতালো। কিছু না কিছু তো এনেছেই বাবা। তখনই পেয়ে ও গেলো। এক বক্স চকলেট। খুলে মুখে দিতেই শুনা গেলো,
— আমি কি বলেছি বিড়াল ছানা আপনি?
— এটাও তো বলো নি যে পাখির ছানা।
বাবা হাত উঠালেন সমর্পণ করার ভঙ্গিতে। মৃত্তিকা ঝলমলিয়ে হাসলো। উঠে বাবা’র মুখে একটা চকলেটের টুকরো পুরে দিয়ে বললো,

— ফ্রেশ হও তারাতাড়ি। ক্ষুধা লেগেছে তো।
বাবা মাথা দুলিয়ে চলে গেল। মৃত্তিকা মিঠি’র মা’কে ডাকতে ডাকতে নিচে নামলো। বাবা আসতেই একসাথে খেতেও বসলো। মৃত্তিকা খাবার খাচ্ছে কম নাড়ছে বেশি। বাবা লক্ষ্য করলেন সেটা। নিজের প্লেট রেখে হাত রাখলেন মেয়ের প্লেটে। মৃত্তিকা চমকাতেই বাবা বলে উঠলেন,
— হা করুন।
চুপচাপ মুখ খুলে বাবা’র হাতে খেয়ে নিলো সে। আজকাল খাওয়াতেও অরুচি ধরেছে। গুণে ধরেছে তার আধ ঘন্টার প্রেমে। কত অপেক্ষা করে সেই বট তলায়। এই বুঝি পূর্ণ আসে কিন্তু মৃত্তিকা’কে বরাবরই নিরাশ করে পূর্ণ আসে না। প্রেমে পড়েছে নাকি বেকায়দায় তা মৃত্তিকা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না।
নিজের রুমেই বসে ছিলো মৃত্তিকা। হঠাৎ বাবা এসে ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরলো। মৃত্তিকা আলতো হাতে বাবা’র চুল টেনে দিচ্ছে। বাবা ওর একটা হাত নিজের দুই হাত দিয়ে ধরলেন। তাতে চুমু খেয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

— মন খারাপের কারণ কি আম্মা?
নিরদ্বিধায় উত্তর এলো,
— পূর্ণ ভাই এর এক্সাম চলে। অনেক দিন দেখা হয় না।
— দেখা হয় না?
— উউউ… আসলে দেখা হয় কিন্তু কথা হয় না।
— একটুও না।
— না আব্বু।
দীর্ঘ সময় পর বাবা বললেন,
— আশা করা ভালো কিন্তু আসক্তি ভালো না আম্মা।
— সে আমার আসক্তি?
— আপনার মনটাকে জিজ্ঞেস করুন।

রাত প্রায় এগারোটা। চারদিকে মানুষের আনাগোনা এখনও সচল। হিমু দাঁড়িয়ে আছে একটা কলোনির সামনে। বেশ বড়সড় এরিয়া এটা। বস্তি বললে ভুল হবে না। আশেপাশে সবাই ব্যাস্ত। একদিকে মহিলারা হইচই করছে কলের পানির জন্য। লাইনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ পানি নিচ্ছে কেউ বা আগে নেয়ার জন্য পারাপারি করছে। হাতাহাতি লেগে যাবে যাবে ভাব।
হিমু দৃষ্টি ঘুরালো। এমন জায়গায় আগে আসে নি সে। গ্রামে তাদের বাসা হলেও অবস্থা এমন না। যথেষ্ট ভালো এর থেকে। অথচ ঢাকা’র মতো প্রাণকেন্দ্রে কি না এমন পরিবেশ?
সময় নেই তাই পা বাড়ালো হিমু৷ হাতে তার একটা লিস্ট। অনেকগুলো সংখ্যা লিখা তাতে। একশত বাইশ নাম্বার লিখা দরজায় ঠকঠক শব্দ করলো। জং ধরা সিটকিনিটা খুলে মধ্যবয়স্ক এক লোক কোমড়ে লুঙ্গি বেঁধে বের হলেন। দানবীয় শরীরটা দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে যায় হিমু। পরপর হাতে থাকা কাগজটা এগিয়ে দেয়। লোকটা হিমু’কে একপলক দেখে নিলো। গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

— খাড়ান আইতাসি।
কন্ঠ শুনেই নড়ে উঠলো হিমু’র রোগাপাতলা শরীর। লোকটা মিনিটের মাঝেই আবার এলো। একটা খাম ধরিয়ে দিলো হিমুর হাতে।
প্রায় বিশটার উপরে ঘর থেকে এমনি কাগজ দেখিয়ে খাম তুললো হিমু। কিছু কিছু ঘরে আবার খাম দিলো না। বললো পরের সপ্তাহে একবারে দিবে।
হিমু বুঝলো না কিছুই। কি আছে খামে তাও অজানা তার।
তাকে এই কাজটা রুপা দিয়েছে। বলেছে যাতে এই বস্তিতে এই কাগজ দেখায় তাহলেই তারা খাম দিবে। রাত তখন বারোটা বেজে সাত। হিমু কপালের ঘাম মুছে নিলো৷ রুপা’র বলা জায়গায় যেতেই দেখলো রুপা সহ দুই জন মেয়ে আর তিনজন ছেলে৷ এরা সবাই ই ভার্সিটির। একজন ছেলে শুধু বাইরের। রুপা হিমুকে দেখেই এগিয়ে এলো। হিমু খামগুলো দিতেই রুপা মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ দিলো। হিমু যেন তাতেই শান্তি পেলো। রুপা’র এই হাসিটাই তার শান্তি লাগায়।
রুপা খামগুলো এগিয়ে দিলো একটা ছেলের কাছে। একটু রাগরাগি করলো কারণ খাম কম। কেউ কেউ খাম দেয় নি। হিমু অবাক হলো তখন যখন দেখলো সেসব খাম ভর্তি টাকা। এত এত টাকা গুণে সেখান থেকে রুপা সহ বাকিদের দিতেই রুপা এগিয়ে এসে হিমু’কে সেখান থেকে এক হাজার টাকার তিনটা নোট দিলো৷ হিমু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

— কিসের টাকা?
— এই যে তুমি কাজ করলে।
— মানে বলছি টাকাটা কেন দিলো তারা?
রেগে যায় রুপা। তেঁজি গলায় বলে,
— এত কথা না বলে টাকাগুলো নাও। পকেট তো ফাঁকা। ফকিরের মতো কত ঘুরবা আর?
ব্যাস হিমু চুপ করে গেলো। স্বভাব সুলভ হাসিটাও আজ দিতে পারলো না। কোথায় যেন বাঁধা লাগছে।

বইতে মুখ গুজে আছে পূর্ণ। পাশেই বাবা আধশোয়া হয়ে আছেন। নজর তার সম্পূর্ণ টিভির পর্দায়। কোন একটা নিউজ চলছে। কারওয়ান বাজারে কেউ বা কারা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। সরকারি অনুমোদন ছাড়া টাকা আদায় করে রাত বিরাতে। সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসাবাদ করলেও লাভ মেলে না। মুখ খুলতে নারাজ সকলে। এর পেছনে যে বড় নেতাদের হাত আছে তা স্পষ্ট। পাতি নেতারা কিছুই বলছে না। এর আগেও অভিজান চালানো হয়েছিলো। ফলাফল শূন্য। টাকা খেয়েই কেটে পড়েছিলো সাংবাদিকরা। এবার ব্যাপারটা কিছুটা জটিল। জনগণের দুর্ভোগ সবার নজরের সামনে৷
পূর্ণ’র বাবা ছেলের দিকে একপলক তাকিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে বললেন,
— কিছু জানো এ বিষয়ে? এর আগে না তুমি তোমার দলের সাথে লাগালাগি হলো ওখানে?
পূর্ণ বই থেকে নজর সরালো না। গম্ভীর ও ভারী কন্ঠে উত্তর দিলো,
— আমি স*ন্ত্রা*সী না আব্বু যে এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখব।
ব্যাস এক কথায় চুপ করে গেলেন তিনি। তখনই ওর পা ছেলের পাশে বসে মাথায় হাত বুলালো। পূর্ণ একপলক মা’কে দেখে নিলো। বুঝে নিলো মাতৃহৃদয়ের সকল ভাবনা। ঠোঁটে বড় একটা হাসি ফুটিয়ে বাচ্চা বাচ্চা ভাব নিয়ে বিচার দিলো মা’কে,

— আম্মু তোমার জামাই আমাকে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে খোঁচা খোঁচি করছিলো। দেখে যে পড়ছি তবুও এসব নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
কথাটা বলেই কেটে পরলো পূর্ণ। যতটুকু দেখেছে মা চোখ দিয়েই বাবা’কে ভস্ম করে দিচ্ছিলো। বেশ লাগে নিরিহ বাবাটাকে ফাঁসাতে। পেছন থেকে মায়ের গলা শুনা যাচ্ছে। বাবা’কে ঝারছেন কেন ছেলেকে এসব জিজ্ঞেস করে রাজনৈতিক কাজে উৎসাহ দেয়? বাবা বেচারা ভেজা বিড়ালের মতো মিউ মিউ করে বলার চেষ্টা করছে সে শুধু মাত্র জিজ্ঞেস করেছে তাও খবর দেখে। বউ কি তার আর মানে। ছেলে ভক্ত মা ছেলের কথায়ই স্বামী’কে একদফা ঝেঁড়ে দম নেন।

বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে আছে পূর্ণ। এসিটা একদম কমিয়ে গায়ে পাতলা একটা কম্বল টেনে রেখেছে। শরীর আবার উদাম। ফর্সা চওড়া বুকটা যেন কোন নারীর একমাত্র ভরসা স্থল হলে নারীটি ধন্য হতো। না চাইতেও মৃত্তিকা’র চিন্তা ভাবনা গুলো মনে মস্তিষ্কে জেঁকে বসেছে। পূর্ণ চেয়েও দমাতে পারছে না সেই অনুভূতি। মৃত্তটাকে দেখা হয় না ঠিক কতদিন? রোজ কেমন চাতকিনী’টা অপেক্ষা করে তার জন্য। কিভাবে বিরস মুখে তাকিয়ে থাকে পূর্ণ’র দিকে। চেয়েও নিরুপায় পূর্ণ তাকায় না ঠিক মতো। এই মৃত্ত’কে দেখলেই মন চাবে তাকে সময় দিতে। মৃত্তিকা’কে নিয়ে বসে থাকলে কিভাবে পড়াশোনা হবে? পড়াশোনা না হলে কি আর মৃত্তিকা’র বাবা তাকে মৃত্ত দিবে? মোটেও দিবে না। এই মৃত্ত’কে হালাল ভাবে চায় পূর্ণ। একদম নিজের মতো করে চায়। চোখ দুটো বন্ধ করে নিন্দ্রা আনার চেষ্টা চালালো। হচ্ছে না।

বারবার ষষ্ঠইন্দ্রিয় বলছে তার মৃত্ত’টাকে সে উপেক্ষা করে যাচ্ছে দিন কে দিন।
একদিকে পূর্ণ অন্য দিকে মৃত্তিকা। নিশুতি রাতটাকে তারা করে রেখেছে বিষাদময়। বাবা’র বুক ভিজিয়ে এখন ঘুমাচ্ছে মৃত্তিকা। মৃন্ময় হাওলাদার একবার তাকালেন মেয়ের দিকে পরপর বুকের ভেজা অংশে। এভাবেই ভিজে নি এতখানি। তার কলিজা টুকরো মেয়ের চোখের পানি দিয়ে ভিজেছে। একটা দুই দিনের ছেলের জন্য এই পানি? মেয়েটা যে মনমরা হয়ে থাকে তা ভালোই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি। মৃত্তিকা বাবা থেকে লুকায় নি কিছুই। স্বাভাবিক বাচন ভঙ্গিতে বাবা’কে জানিয়েছে পূর্ণ’র সাথে তার কথা হয়। এতদিন যাকে মেয়ে সিনিয়র ভাই বলে এসেছে সেই সিনিয়র ভাই’য়ের প্রেমে যে মেয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে তা সে জানে। মেয়েটা এই প্রথম বাবা বাদে অন্য একজন পুরুষের কাছে গিয়েছে। ভরসা করেছে। হয়তো মন হৃদয়ের কিছুটা অংশ ও দিয়ে ফেলেছে।

দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন তন্ময় হাওলাদার। কবে বড় হলো তার আদুরে ছানাটা? তিনি তো বুঝলেন ই না। আজও মনে হয় সেই তো তার ছোট্ট মৃত্তিকা বাবা বাবা বলে দৌড়ে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গলা জড়িয়ে কাঁদে যখন কেউ তাকে কিছু বলে। বুকে মাথা রেখে ঘুমায় এই যেমন এখন ঘুমাচ্ছে। মেয়েটা চলে গেলে কিভাবে থাকবেন উনি? বাঁচবেন কি নিয়ে? কথাগুলো ভাবতেই দম আটকে আসে যেন।

সকাল সকাল আজ ফুঁড়ফুঁড়া মনে আছে মৃত্তিকা। আজ শেষ পরিক্ষা পূর্ণ’র। মন চাইলো একবার শাড়ী পড়ে রেডি হতে আবার ভাবলো পূর্ণ বলেছে শাড়ীতে পূর্ণ ব্যাতীত তাকে কেউ দেখলে পূর্ণ তার খবর বানিয়ে ছাড়বে। বলবে, কতবড় কলিজা আপনার মৃত্ত? কলিজা ছোট্ট করুন। নিজে নিজে কথাগুলো ভেবেই ফিক করে হেসে ফেললো মৃত্তিকা। লোকটা জেলাস হয় তাকে নিয়ে। জেলাস সিনিয়র ভাই মৃত্তিকা’র। গুনগুন শব্দ তুলে একটা গোল ফ্রোক পড়ে সুন্দর করে গলায় উরণা পেচিয়ে নিলো। খোলা চুলগুলো একত্রে করে একটা বেণী করে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বের হলো রুম থেকে। বাবা’কে দেখেই একটা সিটি মে-রে বললো,
— কত কি সাজে আমার হ্যান্ডসাম আব্বু?
তন্ময় হাওলাদার হেসে দিলেন মেয়ের বাচ্চামিতে। গলার টাইটা এনে মেয়ের হাতে দিতেই মৃত্তিকা টুলে দাঁড়িয়ে বেঁধে দিলো। বাবা’র মতো এতটা লম্বা না সে। না এতটা ফর্সা বাবা’র মতো। বাবা তো এত সুন্দর সেখানে মৃত্তিকা শ্যামলা। বাবা’র গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বললো,
— লাভ ইউ মাই হ্যান্ডসাম আব্বু।
— লাভ ইউ ঠু মাই বাচ্চা।

মৃত্তিকা’র বাবা মেয়েকে ভার্সিটি রেখেই রওনা দিলেন কাজে। এদিকে মৃত্তিকা সোজা চলে গেল নিজের ক্লাসে। পূর্ণ’দের পরিক্ষা শেষ হতে আরো তিনঘন্টা। ক্লাসে ঢুকেই দেখলো গোমড়া মুখে বসে আছে উজ্জ্বল। মৃত্তিকা খুশি মনে পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো,
— কি হয়েছে তোর? মুখটা পেঁচা’র মতো করে রেখেছিস কেন?
— যা তো **ল। ভালো লাগে না। ঐ হিমুর বাচ্চা’র কাছে যা।
মৃত্তিকা বুঝলো না এতটা কেন রেগে আছে উজ্জ্বল। নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
— বলবি না কি হয়েছে?

উজ্জ্বল বিরক্ত হলো। এই মেয়ের সাথে চেয়েও রাগ করে থাকা যায় না। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,
— ঐ রুপা নকল এটা হিমু শ্যালাকে বুঝাতে বুঝাতে পাগল আমি। একদিন এই রুপা’র জালে আটকে শ্বাস আটকে ম’রবে ও। মিলিয়ে নিস আমার কথা।
মৃত্তিকা নিজেও চিন্তিত হলো। হিমুটা বুঝে না কিছু। যদিও এতসব প্যাঁচগোজ মৃত্তিকা নিজেও বুঝতে পারছে না। তখনই হিমু সব সময়ের মতো মুখ ভর্তি হাসি নিয়ে ওদের কাছে এলো। উজ্জ্বল মুখটা ঘুরিয়ে নিলেও মৃত্তিকা পারলো না। হিমু উজ্জ্বলের কাঁধে হাত রাখতেই এক ঝটকায় তা সরিয়ে দিলো। হিমু কিছু বলার আগেই উজ্জ্বল উঠে যেতে নিলো। ওমনি ওর কাঁধে ঝুলে গেলো হিমু। রোগা টাইপের শরীরটার হাড্ডি বাদে কোন ওজনই পেলো না। ওদের কান্ডে ক্লাসের বাকি সবাই হেসে উঠলো। উজ্জ্বল ও হেসে দিলো এক সময়। এই ছেলের সাথে কথা না বলে উপায় নেই।

প্রায় ঘন্টা খানিক মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে রইলো পূর্ণ’র ডিপার্টমেন্টের সামনে। একে একে সবাই বের হলেও পূর্ণ হলো না। সে বেরুলো প্রায় দেড় ঘন্টা পর। মৃত্তিকা কথা বলতে এগিয়ে যাবে তখনই তাকে পাশ কেটে হাতা গুটাতে গুটাতে পূর্ণ কয়েকজন ছেলে নিয়ে চলে গেল। মৃত্তিকা’র বুঝতে সময় লাগলো না পরিক্ষা শেষ করেই মারামারি তে লেগেছে পূর্ণ। সে ও দাঁড়ালো না। চলে গেল বট তলায়। এখানে আসবেই পূর্ণ। তার মৃত্ত’কে দেখতে আসবে। আর কত অপেক্ষা করাবে?
অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও যখন পূর্ণ এলো না তখনই চোখ টলমল করে উঠলো মৃত্তিকা’র। একটা দলের ছেলে এসে শুধু জানালো,
— আপনাকে পূর্ণ ভাই বাসায় যেতে বলেছে। আর এই সপ্তাহ দেখা করতে পারবে না। ব্যাস্ত তিনি। আমি কি এগিয়ে দিব আপনাকে?
— লাগবে না। আপনি চলে যান।
ছেলেটা চলে গেল। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা নতুন মাটির গড়া মনটা ভেঙে গেলো মৃত্তিকা’র একদম শব্দহীন ভাবে।

ওকে চলে যেতে বললেও ততক্ষনাৎ গেলো না মৃত্তিকা। আস্তে ধীরে উঠে সামনে পা বাড়ালো। সে কি একটু বেশিই ভাবতে লেগেছে পূর্ণ’কে নিয়ে। ছেলেটা কি আদৌ মূল্য দিচ্ছে মৃত্তিকা’র অনুভূতির?
হঠাৎ বড় সড় একটা ট্রাক সামনে দিয়ে চলে গেল। একটুর জন্য মৃত্তিকা তার নীচে পড়ে নি। কেউ একজন তাকে বুকে আগলে নিয়েছে। মৃত্তিকা’র বুকটা তড়িৎ গতিতে উঠানামা করে যাচ্ছে। মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো সুন্দর একটা লোক তাকে ধরে আছে। সুন্দর মুখটার ঠোঁটে গুজা একটা সিগারেট। লোকটা ঠোঁট থেকে সিগারেটটা সরিয়ে ধোঁয়াগুলো একদম মৃত্তিকা’র মুখে ছেড়ে দিলো। মুহূর্তেই গলগল করে লোকটার বুকে বমি করে দিলো ও। নাক মুখ কুঁচকে মৃত্তিকা’কে সরিয়ে দিলো বুক থেকে। কিছুটা ছুঁড়েই মেরেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আবারও কেউ তাকে আগলে নিলো। সেকেন্ডের জন্য। পূর্ণ ছিলো এবার। সামনে’র লোকটাকে তখন দুই দিন জন ছেলেপুলে পানি দিয়ে বুকের দিকের পাঞ্জাবি পরিষ্কার করে দিচ্ছে। মৃত্তিকা তখনও হতভম্ব হয়ে আছে। সাফারাত নাক মুখ কুঁচকে বললো,
— জান বাঁচালাম আমি। বুকে ঠাই দিলাম আমি। আর বমি করে নোংরা ও করলা কি না আমারই বুক। দিস ইজ আনফেয়ার মিস…

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১১+১২

— কু*ত্তা*র বাচ্চা! ওর নাম মুখে নিবি না। জিভ কেটে নিব আমি।
পূর্ণ’র এহেন আচরণে থেমে গেলো সাফারাত। শুধু আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো পূর্ণ’র দিকে। পূর্ণ তখন কোনদিকে না তাকিয়ে মৃত্তিকা’র হাত ধরে টেনে একটা রিক্সায় তুলে দিলো। রাগী কন্ঠে শুধু বললো,
— বলেছিলাম বাসায় যেতে। শুনেন নি আমার কথা। এর ফল খুব শিঘ্রই পাবেন মৃত্ত।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৫+১৬