যাত্রাপথ পর্ব ৫৯
মাশফিত্রা মিমুই
ফজরের নামাজ শেষে উঠোনে হাঁটাহাঁটি করছে নাজির। চারপাশে এখনো আধো অন্ধকার, শুধু পুব আকাশে দেখা যাচ্ছে সূর্যের রক্তিম আভা। ভোরের হাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হওয়ায় রোজ ফজরের নামাজ পড়ে খোলা আকাশের নিচে ঘণ্টা খানেক সে হাঁটে বা দাঁড়িয়ে থাকে।
মিছরি খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় ধৈর্য হারিয়ে বললো,“পা ব্যথা করছে।”
“কোলে উঠবা?”
অপ্রস্তুত হলো মিছরি। নাজির হেসে এগিয়ে আসতেই দু কদম পিছিয়ে গেলো সে,“অসভ্য লোক।”
“চুম্মা দেওয়ার সময় শরম লাগে না? যত শরম খালি সোয়ামির কোলে উঠতে গেলেই?”
“আর কখনো যদি নিজ থেকে আপনার কাছে গিয়েছি না?”
নাজির হাসলো,“ভোরের হাওয়া শরীরের লাইগা ভালা।”
মিছরি মুখ ফিরিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। নীরবতা নাজিরের ভালো লাগে না। কিছু একটা ভেবে পুনরায় বললো,“ঘরের কাছে একটা পায়খানা বানাইতে হইবো।”
“কেন? যেটা আছে সেটায় কী সমস্যা?”
“বর্ষাকালে পেকের মধ্যে কেমনে অতদূর যাইবা? কয় দিন পর পেট তো আটার বস্তার লাহান হইয়া যাইবো। তহন তো হাঁটতেই পারবা না।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“আপনি যা শুরু করেছেন! দুনিয়াতে আর কারো বাচ্চা হয়নি বুঝি?”
“আমগো তো প্রথমই হইবো।”
“ঘরে গেলাম।”
“সূর্যটারে ঠিকঠাক উঠতে দেও।”
দুজনার কথার মধ্যে ফটক দিয়ে কেউ ভেতরে প্রবেশ করল। নারী দেহের আপাদমস্তক চাদর দিয়ে ঢাকা। ভ্রু কুঁচকে নিলো নাজির। জিজ্ঞেস করল,“কেডারে?”
দুয়েক পা সামনে এগোতেই স্পষ্ট হলো ফরিদার মুখ। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, অপ্রস্তুত হয়েছেন তিনি। আমতা আমতা করে বললেন,“আমি। বাতের বিষে বাঁচি না, তাই ঝাড় ফুঁকের লাইগা মেম্বরনির কাছে গেছিলাম।”
নাজির বিপরীতে একটা শব্দও ব্যয় করল না। ভালো করে আপাদমস্তক চেয়ে দেখলো। একহাতে ছোট্ট একটি সরিষার তেলের শিশি এবং কাইতন দেখা যাচ্ছে। ওতে যে তাবিজ আছে তা সে নিশ্চিত। চাদরের নিচে সেগুলো লুকিয়ে ফেললেন ফরিদা। কোনোদিকে না তাকিয়ে চলে গেলেন ঘরে।
মিছরি বললো,“ব্যথার জন্য ঝাড় ফুঁক দেওয়ার উপকারিতা আছে। আমার দাদী এসব ভালো পারে। একবার গাছ থেকে পড়ে ছোটো ভাইজানের পা মচকে গিয়েছিল। তখন দাদী সূরা পড়ে সরিষার তেল, লবন দিয়ে একটানা ঝাড় ফুঁক দিতেই আল্লাহর রহমতে ভালো হয়ে গিয়েছিল।”
নাজির ঘরের দিকে যেতে যেতে শান্ত কণ্ঠে বললো, “এই মহিলা ঝাড় ফুঁক না, কবিরাজ আর ফকির বাবায় বিশ্বাস করে। নিখোঁজ ভাইরে খোঁজার লাইগা কবিরাজের কাছে গেছিলো।”
“বুঝলেন কীভাবে?”
“মেম্বরনি কহনো তেল পড়া, তাবিজ দেয় না। শুধু সকাল, বিকাল দুইবেলা ঝাইড়া দেয়।”
মিছরি দৌড়ে গিয়ে স্বামীর হাত টেনে ধরলো। অবাক কণ্ঠে প্রশংসা করে বললো,“আপনি তো খুব বুদ্ধিমান লোক!”
“এ আর নতুন কী? অযথা লাফালাফি কইরো না।”
ভোরের আলো ফুটতে দেরি হলো না। রাতের চেয়ে এখন দিন বড়ো। এই সময়ে গ্ৰামের মানুষদের ব্যস্ততা থাকে বেশি। প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে চলে নতুন ধান তোলার কাজ। চৈত্রের খড়া পড়েছে। দ্বিগিদ্বিক পানি শূন্য খাঁ খাঁ মরুভূমি। অনেকের জমির ধান প্রায় নষ্ট হওয়ার পথে। আবার অনেকে ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছে ধান কাটার কাজ। নাজির শুরু করবে সপ্তাহ খানেক পর। তারই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাড়ির বউয়েরা উঠোন ঝাড়ু দিয়ে রোদে শুকাতে দিলো গাছের পাতা। মর্জিনা মাচা থেকে জাহিদকে দিয়ে বড়ো বড়ো মটকা আর ধান সেদ্ধ করার পাতিল নামিয়েছেন। পুত্রবধূকে তাগাদা দিয়ে বললেন,“ওই যে চুলার পাড় ছাই আছে। যাও পুসকনি থাইক্যা ডেগটি মাইজ্জান আনো।”
শিউলি মুখ ভার করল। মেয়েটা অলস, ফাঁকিবাজ। কাজের কথা শুনলেই মাথা ঘুরায়। মিনমিনে স্বরে বললো,“আম্মা, মাত্র উঠান ঝাড়ু দিছি। হাতে অনেক বিষ।”
“তোমার হাতের বিষ আমি ছুডাইমু। যাও, মাইজ্জা আনো।”
তার কোনো বাহানা কাজে দিলো না। শাশুড়ির ধমক খেয়ে বাধ্য হয়েই চলে গেলো পাতিল মাজতে। মর্জিনা মুরগির খোপের কাছে গেলেন। মা মুরগিটা এবার এক ডজন বাচ্চা দিয়েছে। হেঁড়ে গলায় বললেন,“এমন একটা পোলার বউ আনছি যে নড়লে চড়লেই ষাইট বছরের বুড়ির লাহান মাজায় বিষ করে। বিয়ার আগে ঠিকই বাপ-মা গুণগান করছে, আমগো মাইয়া সব জানে সব পারে। অযথা বাড়তি গুণগান করার কী দরকার আছিলো? কেউ কী বাড়িত পোলার বউ আইনা ঘরে সাজাইয়া রাইখা দেয়? কতগুলা বছর একলা একলা এই সংসার সামলাইছি। এহনো হেই বয়স আছে?”
শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে শালিক হাসছে। মিছরি তার কাঁধে থাপ্পড় মেরে বললো,“যদি দেখে হাসছিস, তাহলে তোকেও ধুয়ে দিবে।”
“তাও হাসি থামতাছে না। এইডা বাড়ি না রঙ্গমঞ্চ? দুই জা প্রত্যেকদিন যা শুরু করে!”
“এরা এমনই। বড়োটা মিনমিনে শয়তান, ছোটোটা ঝগড়ুটে। দুদিন পরপর এর ওর সাথে ঝগড়া, হাতাহাতি না করলে শান্তি পায় না।”
“হেগো পোলার বউডির লাইগা দুঃখ লাগে। ভাগ্যিস আমগো হড়ি নাই।”
হাসতে হাসতেই রান্নাঘরে চলে গেলো সে। চুলায় পানির পাতিল বসিয়ে রেখে এসেছে। মিছরি নড়লো না। বারান্দায় চুপ করে বসে থাকলো। সকালের রান্না কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। ওপাশে ফরিদা বসে ধনিয়া বাছছেন। রোদে শুকাতে দিবেন। বিথী শুকনো নারিকেল কাঠি থেকে পাতা ছাড়াচ্ছে। মর্জিনার মুখ নামক রেডিও তবুও থামলো না। আকাশে চিল উড়ে বেড়াচ্ছে। এখন খোপ থেকে বাচ্চাসহ মুরগি বের করলে চিলে থাবা দিতে পারে। তাই খোপের দরজা আটকে ঘরে যেতে যেতে ফের বললেন,“একেকটা পাডা পয়দা করছি। সবচেয়ে বড়ো পাডা হইলো গিয়া মেজোডা। কইছি, এইবার তোর পালা। বিয়া কইরা আমারে শান্তি দে। কয়, বৈশাখের পর করমু, ধানের কাম শেষ হইলে করমু। পাডার ঘরে পাডা, ধানের কাম কী তুই আর তোর বাপে করোস? মনডা চায়, দুইবেলা ঝাঁটা দিয়া বাইড়াই। পোলাপাইন হইলেও জ্বালা, না হইলেও জ্বালা।”
নওশাদ ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে এলো। বারান্দায় উঠতেই কেউ তার সামনে ধরলো গামছা। তাকাতেই দেখতে পেলো হাসিমুখে শালিক দাঁড়িয়ে আছে। গামছা নিয়ে মুখ মুছে বললো,“এত খাতিরদারির প্রয়োজন নেই। এটুকু কাজ আমি নিজেই করতে পারি।”
গামছাটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দড়িতে মেলে দিলো শালিক। নিয়ে এলো চায়ের কাপ। হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,“জামাইয়ের খাতিরদারি করমু না তো কার খাতিরদারি করমু? কয়দিন পর পাষাণের মতন ঠিকই তো আমারে থুইয়া দূর দেশে যাইবেন গা। তহন আমি একলা একলা থাকমু কেমনে?”
“এখনি কষ্ট হচ্ছে?”
“তো হইবো না? বিয়ার পর মন দিয়া একটু সংসারও করতে পারলাম না। কবে না কবে আবার দেশে আইবেন!”
“আমি চলে গেলে তুমি বাপের বাড়ি চলে যেও। একা একা এখানে থেকে কী করবে?”
“শ্বশুর ভিটে ছাইড়া এক পাও নড়মু না। বাঁচলে এনেই বাঁচমু, মরলে এনেই মরমু। স্বামী থাকুক আর না থাকুক।” পরক্ষণেই আহ্লাদী হয়ে বললো,“আমনে তো হুনছি অনেক শিককিত। তাইলে দেশের বাহিরে যাইতে হইবো ক্যান? দরকার হইলে ডাইল, ভাত খামু তবুও আমারে থুইয়া যাইয়েন না।”
কেদারায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিলো নওশাদ। বিয়ের দু’দিন পর থেকেই সে বুঝেছে, মেয়েটা ভীষণ আহ্লাদী। সাথে মিশুকও। নওশাদ কম কথা বললেও সে নিজ থেকেই বেশি বকে। বুঝিয়ে বললো,“সবকিছু জমা দেওয়া শেষ। তাই এখন আর পিছু হটা যাবে না। ভাই অনেক টাকা খরচ করেছে।”
“তাইলে আমার কী হইবো?”
“বিয়ে কী না জেনে করেছো? তোমার বাবা জানতেন সব। স্ত্রী হিসেবে যা আবদার করার করো, কিন্তু এসব আবদার করবে না।”
শালিকের মন খারাপ হলো। মুখ বাঁকিয়ে বললো, “আমনে খারাপ লোক। বউয়ের লগে কেমন ব্যবহার করতে হয় জানেন না। এর লাইগাই আমনের বউ টিকে না।”
নওশাদ চমকে তাকালো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “কী বললে? এই মেয়ে, দাঁড়াও বলছি!”
শালিক দাঁড়ালো না। চলে গেলো মিছরির কাছে। বাড়ির আঙিনায় বেশ কতক মরিচ গাছ লাগিয়েছিল মিছরি। সেই গাছে এখন মরিচ ধরেছে। নাজির আবার ঝাল ছাড়া খেতে পারে না। বিশেষ করে মরিচ কামড়ে ভাত খেতে খুব পছন্দ করে। ঘরে ভাত বেড়ে রেখে এসেছে মিছরি। এখন গাছ থেকে মরিচ নিতে এসেছে। মরিচ তোলার সময় খেয়াল করল গাছের গোড়ার মাটি আলগা।
শালিক বললো,“ভাইজান তোরে ডাকে। এনে কী করোস?”
“মরিচ নিতে এসেছিলাম, কিন্তু মাটি আলগা কেন?”
“মনে হয় মুরগিতে খুঁড়ছে।”
“দেখে তো তা মনে হচ্ছে না।”
কৌতূহল নিয়ে সেদিকে হাত বাড়ালো মিছরি। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, নিড়ানি দিয়ে কেউ ইচ্ছে করে মাটি আলগা করে হাত দিয়ে চাপা দিয়েছে।
“কী করতাছো, মাইয়া?”
হাত গুটিয়ে সামনে তাকালো মিছরি। আতঙ্কিত ফরিদা দৌড়ে এলেন তাদের কাছে। চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন,“কী করো দুইজনে?”
“যা ইচ্ছে করি, আপনার কী?”
“মুখে মুখে তর্ক! সাহস তো কম না।”
“এই কথা তো আমার বলা উচিত। আপনার সাহস তো কম না। এত গলার জোর আসে কোত্থেকে?”
চুপসে গেলেন ফরিদা। আশেপাশে তাকিয়ে সাবধান হয়ে বললেন,“তোমার পেডে না পোলাপাইন? হঠাৎ উপোর হইতাছিলা তাই মেজাজ খারাপ হইয়া গেছিল। এই অবস্থায় উপোর হওয়া ভালা না, পোলাপাইনের ক্ষতি হইতে পারে।”
মিছরির হুঁশ ফিরলো। অজান্তেই হাত চলে গেলো পেটে। মিনমিনে স্বরে বললো,“মাটি আলগা দেখে…
“ছুডোজনের ছাগলের পারা লাইগা উল্টাইয়া গেছিল, তাই আমিই নিড়ানি দিয়া মাটি সরাইয়া ঠিক করছি।”
কথা বাড়ালো না মিছরি। ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো। শালিক ফিসফিস করে বললো,“গুরুজনের লগে এইডা কেমন ব্যবহার? আগে পিছে যা ইচ্ছা কস তাই বইল্যা সামনাসামনি দুর্ব্যবহার? খারাপ কী কইছে, চাচী?”
“গুরুজন না ছাই, আস্ত একটা রাক্ষসী।”
“মুখ সামলা, মিছরি। কি অধঃপতন! আমি খারাপের কিছু তো দেখলাম না। শুরু থাইক্যাই তো ভালা।”
“তুই কয়দিন হয়েছে এসেছিস? আমিও প্রথম প্রথম একে খুব ভালো মনে করেছিলাম। যা বলতো তাই শুনতাম। তারপর দেখলাম আসল রূপ। ছিঃ, কি ভয়ংকর! অমানুষ, চরিত্রহীন মহিলা। নিজের স্বামীকে জিজ্ঞেস করিস। মনে রাখবি, দুষ্টু লোকেরাই মিষ্টি কথা বলে।”
শালিক কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। বিয়ের পর থেকে মিছরিকে চিনতে তার অসুবিধা হচ্ছে। মেয়েটা বদলে গেছে। স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটেছে, খাওয়ায় মন নেই, খেতে বসলেই গা গুলিয়ে ওঠে।
নাশতা খেয়ে নওশাদকে নিয়ে ধানমিলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল নাজির। কিছুক্ষণ পর গামছা ভর্তি বরই নিয়ে একাই ফিরে এলো। মিছরি পিঁড়িতে বসে পালংশাক বাছছিলো। এসেই তার কোলের উপর রেখে বললো,“তোমার লাইগা কত্ত বড়ো গাছে উঠতে হইছে। এহন পানি খাওয়াও।”
“আমি চেয়েছি?”
“কাইল না কইলা, খালি টক খাইতে মন চায়?”
“পুরোপুরি পাকেনি, তবে দেখতে সুন্দর লাগছে।”
“লবণ দিয়া খাইবা।”
মিছরি কাজ ফেলে উঠে গেলো পানি আনতে। পানি খেয়ে গোয়ালের গরুদের ভুসি দিয়ে নাজির আবার চলে গেলো। পালংশাক বাছা শেষে শালিক সেগুলো নিয়ে গেলো রান্নাঘরে। এখন রান্নাবান্নার দিকটা সে-ই সামলায়। মেয়েটার রান্নাবান্নার হাত ভালো। গতকালই তো নওশাদ খেতে বসে খুব প্রশংসা করেছিল। কী যে ভালো লেগেছিল তার!
আজকাল আমিরুল শাহর দুই ছেলেকে বাড়িতে কম দেখা যায়। সামিউল বাবার বিভিন্ন কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে। পারভেজ ঘুরে ভাইয়ের পিছুপিছু। দুপুরে নওশাদ খেতে এলেও নাজির এলো না। তার ব্যস্ততা এখন আকাশচুম্বী। ধানমিল আবার জমজমাট হয়ে উঠেছে। সেখানেই সারাদিন পড়ে থাকে। সাথে তো আবার ধানের জমিও রয়েছে।
নওশাদ এসেই গোসলের জন্য কলপাড় গেলো। স্ত্রীকে দেখে অবাক হলো। শালিক কল চেপে বালতি ভরছে। এতক্ষণে একটা বালতি ভরা শেষ, এখন দ্বিতীয় বালতি ভরার কাজ চলছে। জিজ্ঞেস করল,“এখনো তুমি গোসল করোনি?”
“না।”
“কেন?”
“আমি গোসল করলে আমনেরে গোসলের লাইগা পানি ভইরা দিবো কেডায়?”
“এই পানি আমার জন্য?”
“হ।”
“আমি ভরতে বলেছি?”
“কইতে হইবো ক্যান? ছুডো থাইক্যা দেইখা আইছি আমার আম্মায় প্রত্যেকদিন আব্বার লাইগা বালতির পর বালতি গোসলের পানি ভইরা রাখতো, যতক্ষণ না আব্বার গোসল শেষ হয় ততক্ষণ কলপাড়ের সামনে দাঁড়াইয়া থাকতো, পিঠ মাইজ্জা দিতো। গোসল শেষে কাপড় ধুইয়া শুকাইতে দিয়া হেরপর নিজে গোসলে যাইতো। এক দুই বালতিতে আব্বার আবার হয় না, কমপক্ষে তিন চাইর বালতি তো লাগেই। পুসকনি বা কুয়োর পানিতে আব্বার খাজ্জানি উঠে, তার উপরে রাগী কিনা!”
নওশাদ তাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজে কল চাপতে লাগলো। চমৎকার হেসে বললো,“আমি তোমার আব্বার মতো রাগী মানুষ নই, এদিক ওদিক হলে বউয়ের গায়ে হাত তোলার মতো মানুষও নই। তাই আমার ভয়ে এত কষ্ট করতে হবে না। রান্নাবান্না শেষে সময়মতো গোসল করে নেবে, ক্ষুধা পেলে খেয়ে নেবে, এত অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। আমি মোটেও তোমার উপর রাগ করবো না।”
“ক্যান করবেন না? স্বামী সেবা করা সওয়াবের কাম।”
“নিজের উপর জুলুম করে স্বামী সেবা করার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু যতটুকু বলবো ততটুকুই করবে। আমার উপরে অযথা কেউ মাতব্বরি করবে, অবাধ্য হবে এটা আমার পছন্দ নয়। আমি যাকে খুব করে চেয়েছিলাম, ভালোবেসেছিলাম তাকেও ছেড়েছিলাম শুধুমাত্র অবাধ্যতার কারণে। আশা করি, তুমি তার মতো হবে না।”
“তো কার মতন হমু?”
“নিজের মতো।”
“নিজের মতো?”
“হ্যাঁ, কখনো অন্যের প্ররোচনায় পড়ে কোনো কাজ করবে না, সিদ্ধান্ত নেবে না। যা করবে নিজের মস্তিষ্ক, বিবেক দিয়ে ভেবে করবে। সর্বদা আল্লাহকে ভয় করবে। এটাকেই বলে নিজের মতো। যারা অন্যের মিষ্টি কথায় ভুলে যায়, অন্যের সিদ্ধান্তকে নিজের সিদ্ধান্ত বলে মেনে নেয়, আল্লাহকে ভয় করে না, অন্যায় করতে পিছপা হয় না, মিথ্যাবাদী, ঝগড়ুটে তারা কখনো ভালো থাকতে পারে না। দুনিয়ার জীবনেও নয়, পরকালেও নয়।”
শালিক চুপ হয়ে গেলো। তাকে কলের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নাকের ডগায় আঙুল দিয়ে খোঁচা দিলো নওশাদ। বললো,“কী হলো? যাচ্ছো না কেন? গোসল করা দেখবে?”
“দেখলে সমস্যা?”
“ভারি নির্লজ্জ মেয়ে তো! আগে তুমি গোসল করে বের হও। আমি বাইরে আছি।”
নওশাদ বেরিয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে শালিক নিজেই সর্ব প্রথম গোসল সারলো। তারপর করল নওশাদ। মিছরির আবার এসবে আগ্ৰহ নেই। আগে নাজিরের জন্য কখনোই সে অপেক্ষা করেনি। একা একা গোসল করে, খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তো। তবে এখন আর তেমন করে না। গোসল আগে সারলেও খাবার খায় স্বামীর সাথে বসেই। দেরি হলে অপেক্ষা করে।
নাজির এলো বিকেলে, ঘামে জুবুথুবু হয়ে। ফিরেই নিত্যদিনের মতো অস্থির হয়ে পুকুরে গিয়ে ইচ্ছেমতো ডুব দিলো, সাঁতার কাটলো। আবার কলপাড় গিয়ে শরীর মেজে ঘরে ফিরলো। মিছরি গামছা নিয়ে এগিয়ে আসতেই সে বসে পড়ল বিছানায়।
স্বামীর ভেজা চুল মুছে দিতে দিতে মিছরি শাসন করে বললো,“আমার একটা কথাও শুনেন না। পেটে কিছু পড়েছে? নাকি সেই সকালে বাড়ি থেকে যা খেয়ে বেরিয়েছিলেন তাই?”
“না, চা বিস্কুট খাইছি।”
“এসবে পেট ভরে? আপনি দিনদিন অসহ্যকর হয়ে যাচ্ছেন। নিজের কোনো খেয়াল নেই।”
“আমার লাইগা তুমি আছো না?”
মিছরি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রোজ এককথা কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করলেও লোকটা শোনে না, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে থামিয়ে দেয়। নাজির তাকে যেতে দিলো না। কাছে বসিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি ঠেকালো। শরীর ভীষণ ক্লান্ত। কয়েক ক্রোশ পথ হেঁটে মিলে গিয়েছে, আবার এসেছে। বাইরে কি রোদ!
কিন্তু তাদের সেই সুখ কারো হয়তো সহ্য হলো না। যখনি নাজির একটু সুখে থাকতে চায়, উপরে উঠতে চায় তখনি তার আপন মানুষেরা টেনে হেঁচড়ে তাকে নিচে নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
চৈত্রের সপ্তাহ খানেক পরের কথা। ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি চলছে। হঠাৎ একদিন রাতের আঁধারে ক্ষেতে ভয়াবহ আগুন লেগে ফসলগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে গেলো, সেই রাতেই ধানমিলেও মুখোশধারী কিছু লোক আগুন লাগাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে মিল্টন আর লতিফকে গুরুত্বর জখম করে পালালো।
লোক মারফত ভোর হতেই সেই খবর পৌঁছে গেলো শাহ বাড়ির অন্দরে। নাজির সকালের নাশতা ফেলে ছুটলো। চারিদিকের সোনালী ফসলের মাঝে তার এক টুকরো জমি বিধ্বস্ত হয়ে আছে। ছাই ছাড়া দেখা যায় না কিছু। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কালো ধোঁয়া। নাজিরের হাত-পা অবশ হয়ে এলো। ওখানেই সে বসে পড়ল। জীবনে বহু চড়াই উৎরাই পার করে আসা নাজির সত্যি সত্যি এবার ভেঙে পড়ল। তার অর্ধেক জমি সামাদ মিয়ার কাছে বন্ধক রাখা, যা পুঁজি ছিল সব চাষাবাদের পেছনে খরচ করেছে। এই ধান থেকে নিজেদের জন্য বছরের চাল ঘরে তুলতে হবে, বাকি ধান বিক্রি করে মহাজনের ঋণ এবং কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করে লাভ রাখতো নিজের কাছে। এটাই তো এতকাল করে এসেছে সে। এবার কতটা ক্ষতি হয়ে গেলো! এই ক্ষতি কীভাবে পোষাবে?
চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছে নাজির। নওশাদ পাশে এসে বসলো। নাজির তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই উঠে দাঁড়ালো। বললো,“হাসপাতালে যাইতে হইবো। ওগো কী অবস্থা কেডা জানে? তুই বাড়িত যা, বাহির হওয়ার দরকার নাই। পরিবেশ, পরিস্থিতি এহন আমগো বিপক্ষে।”
“এবার ওরা সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছে।”
“অনেক আগেই করছে। তবে এমন কিছু যে করবো আশা করি নাই।”
“এখন কী হবে? অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো। সংসার কীভাবে চলবে? আমি চলে গেলে তোমাকে একা পেয়ে তো ওদের সাহস আরো বেড়ে যাবে।”
“তুই না গেলে আমারে এইবার পথে বসতে হইবো। কত লস হইছে জানোস? বাড়িত যা, তোর ভাবি আর বউ বাড়িত একলা। বাড়িও এহন আর নিরাপদ না। ক্ষমতা থাকলে ওইখান থাইক্যা সইরা যাইতাম। কিন্তু একলা আর কত?”
হতাশার শ্বাস ফেলে হাঁটতে হাঁটতে মহাসড়কের দিকে চলে গেলো নাজির। পথে গাড়ি পেলে উঠে পড়বে। নওশাদের চোখ ঘোলাটে হয়ে ওঠে। কী করবে সে? কী করার আছে? তবুও তাকে আর দুর্বল হলে চলবে না, আবেগ দেখালেও চলবে না। সবকিছু সমাধানের দায়িত্ব কাউকে না কাউকে তো নিতেই হবে। বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো সে। পৌঁছেও গেলো কিছু সময়ের মধ্যে। খবরটা পাওয়ার পর থেকেই স্বামীর জন্য চিন্তা হচ্ছে মিছরির। দেবরকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,“সব কী পুড়ে গেছে? উনি এলেন না যে? কোথায় উনি? না খেয়েই বাড়ি থেকে বের হয়েছে।”
“ভাইয়ের জন্য চিন্তা করবেন না, ভাবি। মিল্টন, লতিফকে দেখতে হাসপাতালে গেছে।”
“একা ছাড়লেন কেন? এমনিতেই লোকটা মুখ ফুটে কিছু বলতে চায় না। তার উপর…” বিড়বিড় করতে করতে ঘরে চলে গেলো মিছরি। কান্নারা গলায় দলা পাকিয়ে আছে।
সদর হাসপাতালে নাজির এসে উপস্থিত হলো দুপুরের কিছু সময় পর। তাকে দেখেই মিল্টন উঠে বসার চেষ্টা করল কিন্তু পারলো না। লতিফের তুলনায় তার জখম বেশি। হাত গলায় ঝুলে আছে, কপালের ব্যান্ডেজের উপর দিয়ে রক্ত ভেসে আছে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের দাগ স্পষ্ট। লতিফের শুধু পিঠে আঘাত লেগেছে, পা মচকে গিয়েছে। ডাক্তার বলেছে, নিয়মিত ওষুধ খেলে, বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যাবে। নাজির জিজ্ঞেস করল,“ওরা তগোরে অনেক মারছে না? খুব দুঃখ লাগতাছে?”
মিল্টন লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো,“মিলে ব্যস্ততা বাড়ছে, ভাইজান। তাই রাইতে আর বাড়ি ফিরি নাই। বাজার থাইক্যা বিড়ি খাইয়া আইতেই দেহি মশাল আর হারিকেন হাতে কিছু লোক দাঁড়ানো। মুখ গামছা দিয়া বান্ধা। আশেপাশে কেউ নাই, সব খালি। আমি ডরে জিগাইলাম, এই কেডারে! ওরা উত্তর দিলো না। লতিফ আমার ডাক হুইনা বাহির হইয়া আইলো। দেহি কেরোসিন তেল ঢালতাছে। লগে লগে আমি তাগো মতলব বুইঝা গেলাম। চিপা থাইক্যা একটা বাঁশ লইয়া হেগো মিহি দৌড়াইয়া আইলাম। লতিফে ভিতর থাইক্যা আনলো লোহার লাঠি। শেষ পর্যন্ত হেগো লগে আর পারি নাই, ভাইজান। চাইর, পাঁচজনের লগে আমগো মতন দুইজন কেমনে পারবো?”
“থাক, কষ্ট পাইস না। তোরা না থাকলে এতক্ষণে মিলও জ্বইলা যাইতো। আমি একেবারে নিঃস্ব হইয়া যাইতাম। আল্লাহ তগো রক্ষা করছে।”
“কিন্তু ক্ষেত তো শেষ, ভাইজান! কত খাটছি আমরা! সব শেষ।”
“কারো মুখ দেখতে পারছোস? একটাও পরিচিত?”
লতিফ বললো,“সবার মুখ ঢাকা। কেমনে চিনমু?”
যাত্রাপথ পর্ব ৫৮
নাজির আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও খুঁজে পেলো না। ডাক্তারের সাথে কথা বলে তাদের কিছু খাবার কিনে দিয়ে গেলো। ফেরার পথে মিল্টন তার হাত টেনে ধরতেই নাজির নিকটে এসে বসলো। মিল্টন ফিসফিস করে বললো,“মুখ না দেখলেও একজনরে আমি ঠিকই চিনছি, ভাইজান। আমার চেনায় কোনো ভুল নাই। শত্রু হইলো ঘরের।”
নাজিরের ললাটে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। শোনার জন্য কান পেতে রাখলো। মিল্টন সতর্কতা অবলম্বন করে বললো,“সামিউল ভাই।”
