Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭১

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭১

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭১
নূরজাহান আক্তার আলো

-‘তোমাকে সাদা কাফনে মোড়া অবস্থায় দেখার সাহস আমার নেই। তারচেয়ে তোমার ভালো নিয়ে তুমি খুব ভালো থাকো। বৃষ্টির মতো সুখ বর্ষণ হোক তোমাদের উপর। ওসব সুখ টুখ আমাদের জন্য মরিচিকা, বিভীষিকার মতো অভিশপ্ত।’

একথা বলে দুই পা পেছাতেই কারো বুকের সাথে ধাক্কা খেল ইয়াসির। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন ফিরে দেখে শাহাদত চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। কখন এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়াল করে নি সে। হলুদের সাজে শীতলের মুখ দেখে ভুল বসেছিল দিন-দুনিয়া। তারই বা কি দোষ? শীতলের পুতুলের মতো মেকাবহীন স্নিগ্ধ লাজুক মুখটা দেখে নজর সরানো দায়। কি যে সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। শাহাদত চৌধুরীকে দেখেও ইয়াসিরের মধ্যে হেলদোল দেখা গেল না। আরেকবার তাকাল হলুদের স্টেজের দিকে। শুদ্ধ হয়তো কিছু বলেছে দেখে শীতল লাজুক মুখে তাকিয়ে আছে শুদ্ধর দিকে। ইস!
তার চোখের চাহনিতে স্পষ্ট শুদ্ধর প্রতি একরাম মুগ্ধতা ও ভালোবাসা।
শাহাদত চৌধুরী এবার গলা খাঁকারি দিয়ে আশেপাশ খেয়াল করে নিচু স্বরে বললেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-‘ তোমার সঙ্গে কথা বলার রুচি বা ইচ্ছে কোনোটাই আমার নেই। মানুষ যে এতটা বেহায়া হতে পারে তোমাকে না দেখতে জানতাম না। বারবার বেঁচে যাচ্ছো বড় ভাইয়ের জন্য। মানুষ আর কুকুরের মধ্যে তফাৎ জানো?’
ইয়াসির দৃষ্টি সরিয়ে তাকাল শাহাদত চৌধুরীর দিকে। ক’দিন আগেও এ কথার বলার সাহস করত না। করলে বুলেট ফুঁড়ে দিতো বুকের বাঁ পাশে।

কোনোকালে কারো বড় বড় কথা শোনার ধৈর্য্য তার ছিল না। আজকাল
ভালো মানুষের সংস্পর্শে এসে ধৈর্য্য টা বোধহয় কয়েকগুন বেড়েছে। এতে ভালো মানুষগুলো তাকে দূর্বল ভাবতে শুরু করেছে। কিন্তু সে তো এতটা দূর্বল নয়। বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি রাখে নিজের মধ্যে। শাহাদত চৌধুরী তাকে কুকুর বলল তার যে রাগ হচ্ছে তা না। সে দুই পকেটে হাত গুঁজে হাসল। বলল,
-‘কুকুর খাবার পায় না বিধায় তাড়িয়ে দেওয়ার পরও মানুষের দ্বারে ঘুরে। লাথি ঝাটা খায়। আপনার কথা মতো মেনে নিলাম আমি কুকুর।তবে পেটের ক্ষুদায় আমি কাতর নই আমি কাতর ভালোবাসার ক্ষুধায়।

আপনার ছোটো কন্যা আমার বুকে বিষের ছুরি দিয়ে জঘন্যভাবে জখম করেছে। আমার আমিটাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। আর আরেকটা কথা বললেন আপনার বড় ভাইয়ের জন্য আমি বারবার বেঁচে যাচ্ছি। হিসাব কষে দেখলাম ঘটনা উল্টো। বরং আপনার বাড়ির ছেলেরা আপনার ভাইয়ের কারণেই বেঁচে গেল। নয়তো আমার আল্লাহর কসম শুদ্ধ থাকত কবরে আজ আমি থাকতাম ওই স্টেজে আপনার মেয়ের পাশে।জামাতা
হয়ে আপনি হলুদ ছোঁয়াতে আমাদের। আমি ভীষণ খারাপ! জঘন্যতম খারাপ! আমার জানে মনে দয়া মায়া খুব কম। শুধু আমার মৃত মায়ের জীবিত স্বামীকে পুরোপুরি ঘৃণা করতে পারি না বলেই এখনো ধ্বংসস্তুপ করি নি। নয়তো আমি ইয়াসির খান কি করতাম, কী পারতাম, ক্ষমতার দাপটসহ দেখিয়ে দিতাম।’

-‘তুমি ছাড়ো নি ইয়াসির! ছাড়তে বাধ্য হয়েছো। শুদ্ধ-শীতল হসপিটালে
তোমার সামনে দুজন দুজনকে কবুল করেছে। তুমি দাঁড়িয়ে দেখেছোও।
ওদের ভালোবাসার কাছে তুমিও হেরে গেছো। শুদ্ধ তোমার মতো পেছন থেকে ছুড়ি বসায় নি বরং শিনা উঁচু করে ভালোবাসার কথা জানিয়েছে।
তুমি শুধু শুধু ঝামেলা না পাকালে এসব কিছুই হতো না। অবশ্য ঝামেলা করেছো বলেই, আমার মেয়েও আরো একধাপ এগিয়ে একরাতের মধ্যে সম্পর্কের পূর্নতা এনেছে। এখন বড় বড় কথা বললেও তুমি ভালো করে জানো শুদ্ধ কোন ধাঁতুর তৈরি। নাকাচুবানি খাইয়েছে সেটা ভুলে যাও নি নিশ্চয়ই? আর সেসব অপ্রকাশিত আছে তাই থাকুক। যাই হোক, আমার
ভাই মানে তোমার বাবা শারাফাত চৌধুরীর আদেশ তুমি যেন আজকে চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করো। খাওয়া দাওয়া করো। যদিও তোমাকে বাড়িতে ঢোকানোর কোনো ইচ্ছে নেই শুধু ভাই চাচ্ছে বলে বলতে বাধ্য হচ্ছি, ভাইয়া তোমার সাথে কথা বলবে। বাড়ির গেস্ট রুমে গিয়ে ওয়েট করো।’

একথা শুনে ইয়াসির তাকাল দূরে দাঁড়ানো শারাফাত চৌধুরীর দিকে। যদিও ভেবেছিল চুপচাপ এসে দেখে চলে যাবে কিন্তু হলো না শারাফাত চৌধুরীর নজরে পড়ে গেছে। আর কিছুক্ষণ থাকলে শুদ্ধ কিংবা সায়নের নজরে পড়তে পারে। তারা হয়তো তার উপস্থিতি পছন্দ না করতে পারে।
আর এজন্যই হয়তো শারাফাত চৌধুরী আড়ালে ডেকে নিচ্ছেন। বাহ কী সুন্দর ছলচাতুরী! দিনশেষে রক্তের সম্পর্কের জয়! ইয়াসিরকে তাকাতে
দেখে শারাফাত চৌধুরীর বুকটা ধক করে উঠল।সেদিনের পর ছেলেটার সঙ্গে উনার দেখা তো দূর কথাও হয় নি। ছেলেটা আগেও যেমন এড়িয়ে যেতো এখনো তাই। এই জীবনে ছেলেটা হয়তো উনাকে বাবার আসনে বসাবে না। সায়ন, শুদ্ধর মতো মনভরে বাবা বলে ডাকবে না।

তবে বেঁচে থাকাকালীন তিনি তার খোঁজ অবশ্যই রাখবেন। যদি ইয়াসির একবার বাবা বলে উনাকে ডাকে প্রাণপণে ছুঁটেও যাবেন। উনার আফসোস ভরা বুকটাতে একটাই আফসোস ছেলেটা উনাকে শুরু থেকে ভুল বুঝে গেল।
তবুও পাগল হোক, খারাপ হোক, রাগী হোক, বেপরোয়া হোক ছেলেটা এখন উনারই এবং প্রিয় মানুষটার দেওয়া শেষ আমানত। এতদিন প্রচুর চেষ্টা করেছে ছেলেটাকে শুধরানোর কিন্তু যে নিজে ভালো হতে চায় না, তাকে কিভাবে ভালো বানাবেন? তার সঙ্গে দুটো কথা বলবেন সুযোগও দেয় না। বরাবরের মতো আজও মুখ ফুটে ডাকলেন কিন্তু ইয়াসির পাশ কাটিয়ে মেইন গেটের দিকে চলে গেলে। ধীরে সুস্থে ধাপ গুনতে গুনতে গেট পেরিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল। সে যেতেই সায়ন তাকাল শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধর দৃষ্টি তখন অদূরে দাঁড়ানো তার বাবার দিকে। সায়নও ঘুরে তাকাল পুনরায় বাবার দিকে। শারাফাত চৌধুরী রুমাল চোখে চেপে ধরে ছিলেন। ভাবখানা এমন যে চোখে কিছু একটা পড়েছে। চোখ মুছে মুখে হাসি এঁটে স্টেজের দিকে তাকাতেই দেখলেন শুদ্ধ তাকিয়ে আছে উনার দিকে। এবারও ছেলের কাছে ধরা পড়ে পাথরের ন্যায় নিশ্চুপ হয়ে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

বাবার অসহায় মুখখানা দেখে শুদ্ধ নজর সরিয়ে তাকিয়ে রইল মাটির দিকে। বিয়ে উপলক্ষে চৌধুরী বাড়িতে অনেক মানুষের সমাগম বিধায় সেফটির ব্যবস্থাও রয়েছে, তবে নিঁখুতভাবে। ডিভিল ড্রেসআপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু সংখ্যক মানুষ। যারা সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই
ব্যবস্থা নেবে। ইয়াসির হয়তোবা ভেবেছিল তার আগমনের কথা চৌধুরী পুত্ররা জানবে না। কিন্তু ভুল, সে এটাও জানে না তার থেকেও ধুরন্ধর শারাফাত চৌধুরীর ছোটো পুত্র। তারা বোকার মতো কাজ করে নি যে
শত্রুপক্ষ আসবে, লুকিয়ে থাকবে, অথচ তারা ক্ষুণাক্ষনে জানতে পারবে না। মূলত শুদ্ধ অনুমতি দিয়েছে বিধায় এই সময়টুকু থাকতে পেরেছিল ইয়াসির।

এবং যে ক মিনিট ছিল কয়েক জোড়া চোখ তারই দিকে স্থির ছিল। চারদিকে আনন্দ- উল্লাসের মাঝে ইয়াসিরের আগমনে কেন জানি শুদ্ধর মনটা বিষিয়ে গেল। এতদিন শারাফাত চৌধুরী কারণে ইয়াসিরের পাপের রাজ্যের ক্ষতি করলেও প্রাণে ছেড়ে দিয়েছিল। তার মানে এই না পূর্বের কর্মকান্ড মাফ করেছে নতুবা কখনো করবে। সে অবশ্য ভেবেছে, অনুষ্ঠানের পর এ ব্যাপারে সরাসরি কথা বলবে শারাফাত চৌধুরী সাথে।
উনি যদি ইয়াসিরকে স্বীকৃতি দেন বা নিজের কাছে রাখতে চান; রাখতে পারেন। বাবা ছেলেকে কাছে রাখবে ভালো কথা। সেক্ষেত্রে সে শীতলকে নিয়ে অন্যত্রে চলে যাবে। প্রবাদ অনুযায়ী তেলে-জলে মিশে না। তাদের ক্ষেত্রেও তাই। তাছাড়া ইয়াসির শীতলের প্রতি দূর্বল জানার পরও এক বাড়িতে একসাথে থাকার প্রশ্নই আসে না। এতটা ভালো মানুষও সে না। তার তো আবার মনে বিষ রেখে মুখে মধু ঢালার মতো অভিজ্ঞতাও নেই।

এখন শুধু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার অপেক্ষা।
অতঃপর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হতে রাত একটা বেজে গেল। তবুও বিয়ের বাড়ির আমেজ যেন শেষ হওয়ার নয়। রাত যত বাড়তে থাকল
আনন্দ তত দ্বিগুন হলো। স্টেজ থেকে নেমে বাগানের মাঝখানে চেয়ার পেতে বসল সকলে। মেহমানরাও আছে। কামরান সিঁতারার একটা লাল ওড়না মাথায় দিয়ে সাজল শীতল আর হাসান সাজল শুদ্ধ। এরপর শুদ্ধ শীতল ঠিক যেভাবে ঝগড়া করে ঠিক সেভাবেই অভিনয় করে দেখাল।

হাসানের হাতে চ্যালাকাঠ আর শীতলরুপী কামরান রংঢং করে কোমর বাঁকিয়ে দৌড়াচ্ছে। আর মুখে বলছে, ‘ আর করব না শুদ্ধ ভাই! ভুল হয়ে গেছে আমার। এবারের মতো মাফ করে দেন। জীবনেও অবাধ্য হবো না আপনার।’
এটুকু দিয়ে কামরান আর হাসানের অভিনয় শেষ হলো। এদিকে তাদের অভিনয় দেখে সকলে হাসতে হাসতে কাহিল। এরপর মাঠের মাঝখানে উঠে এলো রুবাব আর সায়ন। রুবাবের মাথায় লাল ওড়না। অর্থাৎ সে এখন শীতলের চরিত্রে আর গম্ভীর হয়ে দাঁড়ানো সায়ন এখন শুদ্ধ। হঠাৎ রুবাব ভিড়ের মাঝে গিয়ে দাঁড়াল তারপর ওড়না উড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে দাঁড়াল সায়ন অর্থাৎ শুদ্ধর সামনে। হাঁপানি রোগীর মতো বুক উঠা করার অভিনয় করল। তারপর একলাফ সায়নের কোলে উঠে সায়নের কানের দুই ইঞ্চি নিচে স্বজোরে কামড় বসিয়ে বলল, ‘শুদ্ধ ভাই আমি যদি আপনার নামে দু’একটা কলঙ্ক মাখি আপনি কি রাগ করবেন?’
একথা বলে রুবাব আরেকটা কামড় বসাল সায়নের কানের নিচে। সায়ন জবাব কি দেবে হেঁড়ে গলায় চিৎকার করে গালি দিতে লাগল,

-‘হারামজাদা ছাড়! ও মা গো আমি শেষ। আহ্হহ! আল্লাহ গো আমার গলা।’
সায়ন চিৎকার করতে করতে শুয়ে পড়েছে ঘাসের মধ্যে। রুবাব বসে আছে সায়নের বুকের উপর। এদিকে উপস্থিত সকলে হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঠলে পড়েছে। লাথি খাওয়ার ভয়ে রুবাবও উঠে পালিয়েছে। সায়ন রুবাবকে গালি দিতে দিতে উঠে বসল। এইটুকু দিয়ে শেষ হলো শুদ্ধ-শীতলের প্রেম নিবেদন। তখনো উপস্থিত সকলে হাসছে উচ্চশব্দে। শুদ্ধ মিটিমিটি হাসলেও শীতল লজ্জায় রাঙা। এরপর মাঠে নামল আজম আর স্যান্ডি। আজমের কপালে, গালে, নাকে, হাতে, পায়ে ব্যান্ডেজ আর মাথায় সেই লাল ওড়না। আজম এখন শীতলের চরিত্রে আর স্যান্ডি আছে শুদ্ধর। সায়ন মাইক্রোফোনে সবাইকে থামতে বললে বাকিরা হাসি থামাল। নীরাবতায় ছেড়ে গেল চারপাশ। তখন আজম চট করে ঘাসের উপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসল। কান্নার অভিনয় করল। তখন
স্যান্ডি রুপী শুদ্ধ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। বসল আজমের মুখোমুখি। তার কপালেও ব্যান্ডেজ। আজম তখনো কাঁদছে দেখে স্যান্ডি তার ওড়না তুলল। শীতলের চোখ মুখে দিয়ে আজলা ভরে মুখটা ধরে ভীষণ আদুরে সুরে বলল,

-‘ কি হয়েছে ব্যাঙাচি কাঁদছিস কেন তুই?’
আজম তখন চট করে স্যান্ডির কোমর জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখল। তারপর স্যান্ডির পিঠ খামছে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-‘আমার কাউকে দরকার নেই। কারো ভালোবাসার দরকার নেই।আমার আমার শুধু আপনাকেই চাই মানে শুধুই আপনাকে।’
স্যান্ডি এবার অসহায় সুরে জবাব দিলো,
-‘আমি তো শুধু তোর, তোরই। থাম না,, প্লিজ দোহায় লাগে একটু শান্ত হো।’
এইটুকুতে পুরো মাঠ থমকে গেছে। ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে পাশাপাশি বসা শুদ্ধ-শীতলের দিকে। মজার ব্যাপার হলো শুদ্ধর দৃষ্টি শীতলের মুখপানে স্থির থাকলেও শীতল মাথা নিচু করে বসে আছে। টপটপ করে তার অশ্রু ঝরে পড়ছে তার হাতের কব্জিতে। তখন সাম্য সেদিনের ডাক্তারের মতো সেজে সেখানে উপস্থিত হলো। স্যান্ডির কাঁধে হাত রেখে বড়দের মতো করে বলল,

-‘ইয়াং ম্যান যা চাচ্ছে সম্ভব হলে রাজি হয়ে যাও। ওর শারীরিক মানসিক দুটোই বাজে ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গুলির আঘাত কারেন্টের শকের পর ও যে বেঁচে আছে এটাই তো শুকরিয়া। যতটুকু বুঝছি ওর হার্টেও সমস্যা করছে। যার কারণে বারবার নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে! ওকে স্বাভাবিক করো নয়তো যা লক্ষণ দেখছি হার্ট অ্যাটাক করতে পারে যখন তখন।’
সাম্য কথা শেষ করতেই আজম স্যান্ডির বুকে কপাল ঠেঁকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। তখন স্যান্ডি তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অসহায় সুরে বলল,

-‘ আমি তোর। প্রমাণ চাস, হ্যাঁ? সকালটা হোক সকালেই বিয়ে করব।’
তখন আজম অস্পষ্ট সুরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে লাগল,
-‘আমি আপনার বউ হবো শুদ্ধ ভাই। এখনই হবো,,এই মুহূর্তেই হবো। হয় আপনি আমায় এখনই বিয়ে করবেন নয়তো আমাকে মেরে ফেলবেন। আপনি ছাড়া অন্য কারো অযাচিত স্পর্শ আমার শরীরে এসে লেগেছে।
আমি সহ্য করতে পারছি না। আমি মানতে পারছি না। আপনার পবিত্র ছোঁয়ায় হয় আমাকে পবিত্র করুন নয়তো আজই আমার কবর খোঁড়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন।’

এইটুকুতে যেন থমকে গেল পুরো মাঠ। তাদের অভিনয় দেখে উপস্থিত সকলে ভেবেছিল খুব মজার কিছু হবে। কিন্তু শেষে অভিনয় দেখে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে পরিবেশটা পুনরায় মাতিয়ে তুললে শুদ্ধর বন্ধুরা মিলে ফানি ফানি গানে নাচল। নাচ নাকি বাদর নাচ বোঝা গেল না যদিও। তাদের কর্মকান্ডে সকলে হাসতে হাসতে কাহিল। হলুদের ডালাতে থাকা ফল মিষ্টিগুলোর সকলে কাড়াকাড়ি করে খেলো।
আগামীকাল বিয়ে। সারাদিন অনেক ধকল যাবে বিধায় নতুন বউদের ফ্রেশ হতে পাঠিয়ে দিলেন সিরাত। ঘড়ির কাঁটা তখন দুই এর ঘরে স্থির।
বড়দের তাড়া পেয়ে ছেলেরা হইহই করে করে গেল সায়নের রুমে। রুমে গিয়ে সকলের মধ্যে আজকেও দুষ্টু পানি খাওয়া নিয়ে হইহই বেঁধে গেল। রেড ওয়াইন দেখে আজম আনন্দের চোটে ধরতে গেলে সায়ন বলল,

-‘শুধু ধরেই দেখ, এরপরের কাহিনি পরে বলছি।’
আজম অসহায় চোখে সবার দিকে একবার করে তাকিয়ে সরে বসল।
ঢোক গিলল পরপর। কামরান লুকিয়ে এক ছিপি আজমের দিকে দিলে সায়ন রুবাবের কোলের উপর পা তুলে দিয়ে বলল,
-‘কামরান তোর পেছনে লাথি দিলে তুই কি রাগ করবি ভাই?’
-‘হে, হে, এত জায়গা থাকতে পেছনে ক্যান ভাই?’
-‘যাতে বসতে না পারিস।’
-‘দিলে আস্তে দিয়েন প্রথমবার তো।’
তখন আজম সায়নের দিকে হাত পেতে করুণ সুরে বলল,
-‘ভাই একটু দেন না চেটে চেটে খাব।’

পরেরদিন সকালবেলা,
আজ ১৪ই নভেম্বর। রোজ বৃহস্পতিবার। দেখতে দেখতে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি অবশেষে চলেই এলো। সকাল থেকে সকলে ব্যস্ত। সকালের নাস্তা সেরে নিয়েছে সকলে। ঘড়ির কাঁটা তখন দশের ঘরে। চারজোড়ার গায়ে হলুদ লাগিয়ে গোসল করানো হবে। সিঁতারা তড়িঘড়ি চারটে সাদা লুঙ্গি রুবাবের হাতে ধরিয়ে দিলেন। চার বরকে পরে বাগানে আসতে বললেন।নতুন বউরা গায়ে হলুদের হলুদ শাড়ি পরে বাগানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। গোসল পর বিয়ের বেশে বউরা তৈরি হতে হবে। তারা যেন দ্রুত আসে। রুবাব ফোনে কথা বলতে বলতে ইশারায় বোঝাল আসছে তারা। তারপর কিছুক্ষণ কথা বলে লুঙ্গি নিয়ে উপরে যাওয়ার পথে দেখা হলো সায়নের সাথে। আরেকটা জরুরি কল আসায় সে সায়নের হাতে লুঙ্গি ধরিয়ে দিয়ে কথা সারতে গেল এককোণে। সায়ন চারটে লুঙ্গি উল্টো পাল্টে দেখে শুদ্ধর কাছে গেল। বলল,

-‘লুঙ্গি! আরাম দায়ক পোশাক, পরবি ভাই? ফুরফুরাইয়া বাতাস ঢুকবে ঘামাচি হওয়ার ভয় নাই।’
শুদ্ধ কোলের উপর থেকে লেপটপ সরিয়ে রাখতে রাখতে বলল,
-‘আমার অভ্যাস নাই যেহেতু রিক্স নিতে চাচ্ছি না, তুমি পরো।’
-‘ আমারও অভ্যাস নাই যদি খুলে যায়? ‘
-‘গেলে গেল তাতে কি? চট করে খুলে পড়ে গেলে ফট করে তুলে আবার গিট্টু লাগিয়ে নিবা।
-‘মন্দ বলিস নি তবে লুঙ্গি পরানোর বুদ্ধি কার জানিস?’
-‘ সম্ভবত বাবার।’
-‘ওরে বাবার ঘরে বাবা! এখন যাই, বাবার সঙ্গেই মুলাকাত সেরে আসি।’
-‘হুম।’
সায়ন এবার লুঙ্গি হাতে গেল শারাফাত চৌধুরীর কাছে। তখন তিন কর্তা ড্রয়িংরুমে বসেছিলেন। উনাদের সঙ্গে কথা বলে ফেরার পথে দেখা হলো সিঁতারার সাথে। সিঁতারা ছেলের বাহুতে একটা মেরে বললেন,
-‘কিরে লুঙ্গি পরতে দিলাম পরিস নি কেন?’
-‘ওই দেখো বাবা পরে বসে আছে। কত রিকুয়েষ্ট করলাম বাবা এটা আমার বিয়ের লুঙ্গি আমাকে দাও, দিলোই না। এমন ছোঁচা মার্কা বাবা জীবনেও দেখি নি।’
-‘তোর বিয়ের লুঙ্গি তোর বাবা পরবে কেন? এ লোকের মাথা কি পুরোটা গেল নাকি?’
-‘সম্ভবত।’

একথা শুনে সিঁতারা গেলে কর্তাদের কাছে। সায়ন, শুদ্ধ, রুবাবের জন্য কেনা লুঙ্গি শারাফাত, সাফওয়ান, শাহাদত চৌধুরী পরে বসে আছেন। একে তো দেরি হয়ে গেছে তার উপরে এরা কাহিনি শুরু করেছে। উনি এবার বেশ বিরক্তি নিয়ে খ্যাকঁ করে বললেন,
-‘ছেলেদের লুঙ্গি তোমরা পরে বসে আছো কেন? খোলো বলছি।’
-‘মানে কি? কেবলই তো সায়ন লুঙ্গি এনে দিয়ে বলল বাড়ির সব ছেলেরা নাকি লুঙ্গি পরে ফটোসেশন করবে। এখনিই যেন লুঙ্গি টা পরি।’
-‘কখন বলল?’
-‘কেবলই। ‘
সিঁতারা বিরক্তি নিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখলেন আশেপাশে সায়ন নেই। বাবাদের ফাঁসিয়ে দিয়ে পালিয়েছে সে। কেমন হাড়ে বজ্জাত ছেলে ভাবা যায়! সিঁতারা এবার বকতে বকতে চলে গেলে বাকিদের ডাকতে। সায়ন তখন সিঁড়ি নিচ থেকে দাঁত বের করে হেসে বলল,
-‘ রাগ করে না লক্ষীটি আমরা আমরাই তো।’

একথা বলে সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে চলে গেল। সিঁতারা শুদ্ধর রুমে গিয়ে দেখে রুবাব আর অর্ক বসে আছে। চারজনের কেউই লুঙ্গি পরবে না। এত বুঝিয়েও লাভ হলো না। অগত্যা গতকাল রাতের সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে তারা যেতে রাজি হলো। তবে শর্ত একটা মা-চাচী বাদে বাইরে কেউ আজ গায়ে হলুদ ছোঁয়াতে পারবে না। বিশেষ করে দূর সম্পর্কের ভাবিরা। ওদিকে মেয়েগুলো টানা রোদে দাঁড়িয়ে আছে দেখে ঘাড়ত্যাড়া ছেলেদের কথায় অগত্যা রাজি হতেি হলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসার কথা বলে উনি বেরিয়ে গেলেন। তারপর বররা সহ বাকি ছেলেরা সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে একে একে বাগানে গিয়ে উপস্থিত হলো। বড় এক একটা পিঁড়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে সাদা ফুলের
গয়না পরে দাঁড়িয়ে আছে শখ, স্বর্ণ, ঐশ্বর্য, শীতল। সিরাত তখন এগিয়ে এসে রুবাবের কান টেনে বলল,

-‘দেখ তো রোদে মেয়েগুলোর মুখ লাল হয়ে গেছে। ড্রেস চেঞ্জ করতে এত সময় লাগে? যা গিয়ে যার যার বউয়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়া।’
-‘ পিঁড়ার উপর?’
-‘হুম।’
তারপর বউদের পেছনে দাঁড়াল। তখন মা-চাচীরা আগে বউয়ের গায়ে হলুদ লাগিয়ে সেই হলুদ ছেলেদের গায়ে ছোঁয়ালেন। ভাবিরা খিলখিল করে আসতে গেলে সিঁতারা বারণ করলেন। এতে অনেকেই মুখ গোমরা করে দূরে সরে গেল। ঘাসের উপর সামনে সাজিয়ে রাখা ছোট বড় বেশ কয়েকটা কলসে পানি ভর্তি করা। সম্ভবত সাত পুকুরের পানি। কলসের মুখে আমপাতা ডুবানো।এসব কোথাকার কীসব নিয়ম কানুন কে জানে! ছেলেরা বিরক্ত মুখে যেতে গেলে তাড়াহুড়ো করে কাজ সারতে বললেন সিমিন। আরো কিছু কাজ করার থাকলেও ছেলেগুলোর কারণে সেসব বাদই থাকল। তারপর সেই কলসের পানি একে একে ছেলেদের মাথায় ঢালা হলো। সেই পানিতে ভিজলো ঠিক বুকের কাছে দাঁড়ানো যার যার সহধর্মিণী। অতঃপর কোনোমতে নিয়ম পালন করে ওয়াশরুমে গিয়ে ভালো করেরগোসল সেরে নিতে বললেন সিঁতারা। ভাবিরা একপ্রকার খোঁচা মেরে বললেন, গতরে দম থাকলে যার যার বউকে কোলে করে ওয়াশরুম অবধি পৌঁছে যেতে। উনাদের বলতে দেরি সায়ন স্বর্ণকে চট করে কোলে তুলে নিলো। যেতে যেতে ফিসফিস করে স্বর্নের কানে কানে বলল,

-‘আর কয়েক ঘন্টা তারপর,,তারপর আজ পাশা খেলব রে শ্যাম।’
তাকে দেখে রুবাব ঐশ্বর্যকে কোলে নিলো। সেও ফিসফিস করে বলল,
-‘ ভালোবাসি হলুদিয়া পাখি।’
তাদের যেতে দেখে অর্ক ঘুরে একবার শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে পুনরায় তাকাল শখের দিকে। নিচু স্বরে আমতা আমকা করে বলল,
-‘ উঠবে? আমার কোলে?’
শখ লজ্জায় মুখ কাঁচুমাচু করলে অর্ক বলল,
-‘ তাহলে আমাকে নাও। ‘
শখের ঠোঁটে হাসি খেলে গেল। তখন এক ভাবি বলল,
-‘কি রে শখ তোর জামাই ভয় পাচ্ছে নাকি?’
শখ জবাব দেওয়ার আগে অনুভব করল সে অর্কের কোলে। চোখ তুলে বিষ্ময় নিয়ে তাকাতেই দেখা মিলল হলুদ ভর্তি গালের অর্ককে। তাকে তাকাতে দেখে অর্ক নিচু স্বরে বলল,
-‘খাও না? ওয়েট নেই বললেই চল। ব্যাপার না, আমার কাছে গেলে এক মাসেই,,। ‘
বাকি তিনজন গেলেও শুদ্ধ শীতলের মাঝে হেলদোল নেই। তখন শীতল বলল,

-‘ কি হলো? কোলে নিচ্ছেন না কেন?’
-‘খেয়ে খেয়ে তো কুমড়ো পটাশ হয়েছিস। এখন কোলে নেওয়া বললে নেওয়া নাকি?’
শীতল চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে বিষ্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
-‘ আপনি আমাকে মোটা বললেন? এজন্যই খেতে চাইতাম না আমি। নিজে বেশি বেশি খাইয়ে মোটা বানিয়ে এখন খোঁটা দিচ্ছেন। চড়বোই না আপনার কোলে।’
তারা যাচ্ছে না দেখে বাকিরা যে যার মতো পঁচাতে লাগল। তবে তারা দুজনই চুপ। সিঁতারা, সিমিন, সিরাত ভাবলেন লজ্জা পাচ্ছে তাই উনারা যাওয়ার জন্য জিনিস গোছাতে লাগলেন। তখন শুদ্ধ নিচু স্বরে শীতলকে বলল,
-‘ এইটুকু পথ সামলে নে সিঁড়ির অবধি গিয়ে আমার সামলে নেবো।’

শীতল মনে মনে হাসল। সে জানত এমন কিছু বলবে শুদ্ধ। কারণ সে যতটুকু চেনে তার বিশুদ্ধ পুরুষের রোমান্টিকতা সব চার দেওয়ালের মাঝে। মা-চাচীদের সামনে জীবনেও কোলে নেবে না তাকে। আফসোস নেই তার। তার উপরে আবার বাড়ি ভর্তি মানুষ। তবে এমন কিছু করতে হবে যেন কেউ আঙুল তুলতে না পারে। তাই ঘুরে দাঁড়ালো শুদ্ধর দিকে।
তারপর তার হলুদ শাড়ির লাল আঁচল দিয়ে শুদ্ধর এক হাত বেঁধে হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে। এমন দৃশ্যে সকলে হইহই করে উঠল। কামরান সিটি বাজাল। তাদের সিটি বাজানোর সুরে সায়ন, রুবাব, অর্ক পেছনে ঘুরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা আধভেজা গায়ের শুদ্ধর হাত বাঁধা শীতলের শাড়ির আঁচলে। এমন রোমান্টিক এক মুহূর্তে তারাও হইহই করে উঠল। সেই মুহূর্তে কে যেন সাউন্ড গান ছেড়ে দিলো,

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭০

আঁচলে বান্ধিয়া রাখিবো গো তোমারে
আঁচলে বান্ধিয়া রাখিবো।
চোখের কাজল করিবো গো তোমারে
চোখের কাজল করিবো।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭২

2 COMMENTS

  1. প্রিয় প্রনয়নী ১ গল্পের সারপ্রাইজ পর্ব গুলো দেন

Comments are closed.