না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (২)
মাইশা জান্নাত নূরা
সারফারাজ তেজ ও নির্ঝর ওদের তিন ভাইকে আগের মতো মিলে যেতে দেখে নীরার মনের গহিনে শান্তির শীতল হাওয়া বইতে শুরু করলো। কিন্তু সেই হাওয়া হলো ক্ষণস্থায়ী। নীরার মনে হলো ওর তিন ভাইয়ের সাথেই তৈরি হওয়া দূরত্বের কথা যা ওর হাসিমুখখানা মূহূর্তেই মলিনতার চাদর দ্বারা ঢেকে দিতে সক্ষম হলো। দীর্ঘ ২টা বছর ধরে নিজের বুকের উপর যে সত্যের ভার সে চেপে রেখেছে তা আজ যেনো মাথা চাড়া দিয়ে উঠার ইচ্ছে পোষণ করছে নীরার নিকট।
সারফারাজ তখনও দু’হাতে তেজ ও নির্ঝরকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছিলো। তখুনি সারফারাজের চোখ পড়লো নীরার উপর। নীরা দীর্ঘ ২বছর পর দেশে ফিরেছে। নিজবাড়ি খান ভিলাতে এসেছে সে। চোখের সামনে নিজের আদরের ছোট বোনকে ঘুরতে দেখেও মনের ভিতর থাকা চাপা রাগ-অভিমানকে উপরে রেখে তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখার পিছনে যে আলাদা কষ্টটা কাজ করে তা সারফারাজ এ ক’দিনে ভালো ভাবেই অনুভব করতে পেরেছে। আজ সেসবকে দূরে ঠেলে দিয়ে সারফারাজ নিজ থেকেই নীরাকে উদ্দেশ্য করে বললো……
—”নীরা! তোর মুখটা এমম ফ্যা*কাসে লাগছে কেনো? কিছু বলতে চাস আমাদের?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
প্রশ্নটা শোনামাত্র নীরা হক*চ*কি*য়ে উঠলো। বড় ভাই সারফারাজকে নিজ থেকে নীরার দিকে লক্ষ্য করতে দেখে ও এমন প্রশ্ন করতে শুনে নীরার বুকের ভেতরটা হালকা কম্পিত হলো। পিহু নীরার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো। সারফারাজ, তেজ ও নির্ঝর ওদের তিন ভাইয়ের-ই দৃষ্টি নীরার উপর স্থির হয়ে আছে।
পিহু নীরার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে বললো…..
—”এটাই সঠিক সময়, নীরা। নিজের ভাইদের সামনে সব সত্যের বহিঃপ্রকাশ করো। আর ভ*য় পেও না। কোনো সংকোচও করো না। এই দুটো জিনিসই তোমাকে তোমার ভাইদের থেকে দুইটা বছর দূরে সরিয়ে রেখেছিলো। তোমাদের সম্পর্কের মাঝে ফাঁ*ট*ল ধরিয়ে দিয়েছিলো। এবার আর এদের জয়ী হতে দিও না। ভয়কে জয় করে সত্যটা চিৎকার করে না বললে তোমাদের ভাই-বোনের মধ্যকার এই দূরত্ব কখনও শেষ হবে না নীর। কখনও তোমাদের সম্পর্ক আগের মতো সুন্দরও হবে না।”
পিহুর কথায় ওদের তিন ভাইয়ের মুখশ্রীর ধরণ একইসাথে বদলে গেলো ও সবার চোখে একই প্রশ্ন এবং বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠলো….
‘নীরা কোন সত্য লুকিয়ে রেখেছে ওদের সবার থেকে? আর সেই সত্যের রূপ পিহুর সামনেই বা কিভাবে খোলাসা হলো?’
নীরার চোখে-মুখে একপ্রকার অস্থিরতার ছাপ স্পট হয়েছে। একটু পর পর বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলছে সে।
ইলমার বুকের ভেতর মাথা গুঁজে কাঁদছিলো অনু। হাফরের মতো অনুর বুকটা উঠানামা করছিলো। কান্নার বেগ যদিও কিছুটা স্বাভাবিক পর্যায়ে এসেছে তবুও ইলমা ওকে নিজের শক্ত বাঁধন থেকে মুক্ত করছে না এখনও। আরো খানিকটা শান্ত হতে কিছুটা সময় লাগলো অনুর। অনুর বর্তমান অবস্থা বুঝতে পেরে ইলমা শান্ত কন্ঠে বললো…..
—”অনু! ঠিক আছো এখন তুমি? আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো তোমার? শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে না তো আগের মতো?”
ইলমার প্রশ্নগুলো শুনে অনু নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো ইলমার বাঁধন থেকে। অতঃপর দু’হাতে নিজের চোখে পানি মুছে নিয়ে দৃষ্টি চন্ঞ্চল রেখে বললো…..
—”হু, ঠিক আছি আমি।”
এই বলে অনু বসা থেকে উঠতে নিলে মাথা ঘুরে উঠলো ওর। ফলস্বরূপ মাথার একপাশ একহাতে চেপে ধরে অনু পরে যেতে নিলে ইলমা অনুকে ধরে নিলো। অতঃপর অনুকে নিয়ে বিছানার দিকে অগ্রসর হতে হতে বললো….
—”দেখতেই পারছি তোমার ঠিক হওয়ার নমুনা। শরীরের জোর না থাকলেও মুখের জোরটা ১৬ আনাই ঠিক আছে।”
অনুকে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসিয়ে দিলো ইলমা। অনু প্রতিত্তুরে কিছু বলতে নিলে ইলমা চোখ রা*ঙি*য়ে অনুর দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”একটা কথা বলবে না আর। তোমার শরীর এখনও অনেক দূর্বল। আমি দুধ গরম করে দিচ্ছে। চুপচাপ দুধটুকু পান করে রেস্ট করবে তুমি।”
ইলমা অনুর কোনো কথা না শুনে নিজরুমে গিয়ে ফ্রিজ থেকে ১ পোয়া পরিমাণের একটা দুধের বোতল বের করে দুধটুকু গরম করে গ্লাসে ঢেলে নিয়ে আবারও অনুর রুমে এলো। অনুর পাশে বসে ওর দিকে দুধের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলে অনুও গ্লাসটা নিয়ে ধৈর্যের সহিত সবটুকু দুধ পান করলো। অতঃপর অনু শব্দ করে একবার নিঃশ্বাস ফেলে বললো…..
—”শেষ মায়ের হাতে এতো যত্ন নিয়ে দুধ পান করা হয়েছিলো আমার। আজ মা’ও নেই আমার যত্ন করারও কেউ নেই।”
ইলমা নিজের ওড়নার আঁচল দিয়ে অনুর মুখ দিতে নিলে অনু ইলমার হাত ধরে ওকে থামিয়ে দিয়ে ছলছল নয়নে ওর দিকে তাকিয়ে কাঁপান্বিত কন্ঠে বললো….
—”এবার থামো আপা। নয়তো আবার কেঁদে ফেলবো আমি।”
ইলমা স্মিত হেসে অনুর ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা দুধটুকু মুছে দিয়ে বললো….
—”মনের ব্যথা মনে জমিয়ে রাখলে তা কখনও সারে না অনু৷ মনটা খোলাসা করে একবার সবটা বলে দেখো আমায় অনেকটা হালকা বোধ হবে তোমার তখন৷”
অনু মাথা নুইয়ে নিয়ে বললো….
—”অতীত ঘাঁ*টতে ভ*য় হয় আপা। বড্ড ভ*য় হয়। শুনেছি দেওয়ালেরও কান আছে। যদি ওরা কোনোভাবে আমার খোঁজ পেয়ে যায় তাহলে আমায় এখান থেকে নিয়ে যাবে। ধুঁ*কে ধুঁ*কে মা*রবে আমায় বাকিটা জীবন৷”
ইলমা অবাক স্বরে বললো….
—”কাদের কথা বলছো তুমি? কারা নিয়ে যাবে তোমায়? আর তখনও তুমি বললে তোমার বাবার কথা, তোমার বাবাকো তুমি খু….!”
ইলমা পুরো কথা শেষ করার আগেই অনু ঠোঁট কাঁ*ম*ড়ে বললো….
—“জানো আপা, আমার বাবা মনে করতেন আমাকে জন্ম দিয়েই তার সব দায়িত্ব শেষ হয়েছে। তারপর থেকে আমাকে বড় করে তোলার পিছনে যেই যু*দ্ধটা আমার মা’কে প্রতিনিয়ত করে যেতে হয়েছিলো সেদিকে একটাবারের জন্যও নজর বুলায় নি আমার বাবা নামক মানুষটি।”
অনুর গলায় শব্দটা আঁটকে আঁটকে আসছিলো। অনু কিছুটা থেমে আবারও বললো….
—“আমার মা, জনমদুখিনী মা আমার, নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়েছে সবসময়। অন্যের বাড়িতে কাজ করেও নিজে ছেঁ*ড়া-ফা*টা, জোড়া-তালি দেওয়া শাড়ি পরে থেকেছে বছরের পর বছর।
আর হাতে সামান্য কিছু টাকা জমলেই আমাকে ভালো কাপড় বানিয়ে দিতো।”
অনুর দু’চোখ টলমল করছে। যেনো চোখের পাপড়ি ভুলেও খানিকটা নড়ে উঠলেই ঝপ ঝপ করে জমে থাকা সবটুকু পানি ওর দু’গাল বেয়ে নিচে পড়বে।
—“মানুষ কতো গর্ব নিয়ে নিজের বাবার কথা বলে। বাবার পেশা নিয়ে বলে। আর আমার রুচিতে বাঁধে বাবা নামক এই মানুষটিকে নিয়ে একটা শব্দও বলতে। কারণ আমার বাবা ছিলেন পৃথিবীর সর্ব নি*কৃ*ষ্ট মানুষগুলোর মাঝে একজন। তার প্রধান কাজ ছিলো নেশা করা আর জু*য়া খেলা। জু*য়ার আসরে বসে বোতলের পর বোতল ম*দ খেয়ে পরে থাকতেন তিনি রাতের পর রাত। আমাকে বা আমার মা’কে কোনো মূল্যই দিতেন না তিনি। উঠতে বসতে মা’কে মা*র-ধর করতেন পা*ষ*ন্ডের মতো। আমি পারতাম না ঐ বাবা নামক জা*লি*মের মা*রের হাত থেকে আমার মমতাময়ী মা’কে বাঁচাতে। পারতাম না আপা। পারতাম না।”
অনু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। দু’হাতে নিজের মুখশ্রী ঢেকে হু হু করে কেঁদে উঠলো আবারও। ইলমার বুকের ভেতরটা কেমন মো-চড় দিয়ে উঠলো।
অনু নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললো….
—“বাবার লোভের সীমা ছিলো না আপা। নিজের ভিটা-জমি সব বন্দকে ফেলে, বেচে দিয়ে যখন আর কোথাও থেকে টাকা পাচ্ছিলেন না তখন মায়ের উপর অ*ত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। মা’কে তার বাবার বাড়ি গিয়ে নিজের বাপ-ভাইয়ের থেকে টাকা আনতে বলতেন। নগদ টাকা আনতে না পারলে যেনো তাদের থেকে নিজের অংশের জমির ভাগ আনে মা এমনটা বলতেন বাবা। আমার নানা-মামারাও গরীব মানুষ ছিলেন, আপা। নানা ছিলেন দিনমজুর। মামারা অন্যের জমি চাষ করে নিজেদের সংসার চালাতেন। মা ছিলো নানার একমাত্র মেয়ে। মায়ের কান্না ও তার অসহায় অবস্থা দেখে মামারা ধারদেনা করে কষ্টে-সৃষ্টে পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করে মা’কে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই টাকাই শেষ। তোর স্বামীকে আর কিছু দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। এরপর আর কখনও টাকার দাবি নিয়ে আমাদের দোরগোড়ায় আসিস না বোন।”
অনু থামলো আবারও। ওর ঠোটজোড়া মৃদুভাবে কাঁপছে। ইলমার মনে সর্বোচ্চ ঘৃ*ণা*রা জায়গা করে নিলো অনুর বাবার জন্য। অনু বললো…..
—”মা সেই টাকাগুলো যখন বাবার হাতে দিয়েছিলেন তখন বাবার খুশি দেখার মতো ছিলো। মায়ের দু’চোখেও ক্ষীণ আশার আলো ফুটে উঠেছিলো সেদিন। মা ভেবেছিলো, হয়তো এবার বাবা নিজেকে বদলে ফেলবেন। তাদের ছোট্ট সংসারে একটু সুখ ও শান্তিরা বাসা বাঁধবে হয়তো। কিন্তু…!”
কিন্তু শব্দটা বলতেই অনুর মুখশ্রীর বর্ণ হালকা পরিবর্তন হলো। অনু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো….
—“মায়ের এই আশার ঘরে ছাই পড়তে সময় লাগে নি খুব বেশি দিন। মদের টান আর জুয়ার নেশায় বাবা সেই পঞ্চাশ হাজার টাকাও উড়িয়ে দিলেন। টাকা শেষ হতেই উনি আরো পাগল হয়ে গেলেন যেনো। আবার টাকা চাই তার। অনেক টাকা চাই।
কিন্তু এবার তো মা আর কোথাও থেকে টাকা এনে তাকে দিতে পারবে না! তাই বাবা নতুন পথ খুঁজতে শুরু করলেন।”
অনুর কন্ঠ ভার হয়ে এলো। দু’চোখের মণির চারপাশে থাকা সাদা অংশ হালকা লালচে বর্ণ ধারণ করেছে অনুর। ইলমা এক দৃষ্টিতে অনুর দিকে তাকিয়ে আছে। অনু বললো…..
—“আমার গ্রামের চেয়ারম্যান খুব প্রভাবশালী লোক ছিলেন। তার বড় ছেলে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ও প*ঙ্গু ছিলেন। বয়স ৪০ এর ওপারে হবে। গ্রামে তখন আমাকে নিয়ে অনেক চর্চা হতো।
গরিবের ঘরে আল্লাহ অতো রূপ নিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন আমায় যা লোক চক্ষু থেকে আড়াল করার মতো ছিলো না। চেয়ারম্যান নিজ থেকে বাবাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার মেয়েকে আমার ছেলের সাথে বিয়ে দাও। বদলে তুমি যে পরিমাণ টাকা চাইবে আমি তোমায় তাই দিমু।”
অনু ঢোক গিললো। মনে হচ্ছে ওর গলার ভিতর অনেক কিছু একত্রে এসে ভীর জমিয়েছে। কিন্তু অনু তাদের হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে আসার স্বাধীনতা দিচ্ছে না। খুব সাবধানে বিচার-বিবেচনা করে কিছুজনদের বের করে আনছে অনু নিজে। অনু দু’চোখের পলক না ফেলে ভা*ঙা কন্ঠে বললো….
—”এমন প্রস্তাব শুনে বাবার চোখ লো*ভে চকচক করে উঠলো। যেনো তিনি তার সামনে আমার বিনিময়ে যে সোনার পাহাড় হাতে পাবেন সেই দৃশ্যখানা দেখতে পারছিলেন। আমার বাবা আমায় মেয়ে হিসেবে যে কখনই দেখেন নি তা সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম যেদিন স্কুল থেকে ফেরার পর মা’কে নি*র্দ*য়ের মতো বাবার হাতে মা*র খেতে দেখেছিলাম। আর কারণ হিসেবে জানতে পেরেছিলাম বাবা আমার সাথে চেয়ারম্যানের ছেলের বিয়ে পাকাপোক্ত করে এসেছেন মা সে খবর জানা মাত্র সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন জন্যই মায়ের বেহাল অবস্থা করেছেন বাবা।
মা‘কে মা*র খেয়ে নি*স্তেজ হয়ে যেতে দেখে আমি বাবার পায়ে ধরে অনুরোধ করেছিলাম মা’কে আর না মা*রার জন্য। বাবা বিনিময়ে আমার বিয়েতে মত আছে এই কথাখানা শুনতে চাচ্ছিলেন। আমি দিক-বেদিক শূন্য হয়ে বিয়েতে রাজি আছি তা বলেছিলাম। বাবা মা’কে ছেড়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন তারপর।”
অনু থামলো। ইলমার বুকের ভিতরে জ্বা*লা করছে ভিষণ রকম। অনুর বলা প্রত্যেকটা শব্দ ওর বুকটাকে ক্ষ*ত-বি*ক্ষ*ত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। ইলমার মন ওর মস্তিষ্কের দিকে প্রশ্ন ছুড়ছে…..
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬
“এমনও বাবা হয় কারোর যে কিনা সামান্য ক’টা টাকার বিনিময়ে নিজের ফুলের মতো সুন্দর ও নিষ্পাপ মেয়েকে ওমন লোকের হাতে তুলে দিতে চায়! এমন পুরুষকে কি বাবা নামক শব্দ দ্বারা সম্বোধন করা যায়? নাকি পুরুষ বলা যায়?”
