প্রেমের ধূলিঝড় শেষ পর্ব
ফিজা সিদ্দিকী
“শিকদার বংশের সাথে আপনার সম্পর্ক কী?”
“আমরা এটা নিয়ে কোথাও বসে কথা বলি। এখান থেকে চলো।”
“এই প্রশ্নের উত্তর এটা নয়।”
“আমি সব উত্তর দেব তোমাকে। তোমার সব উত্তর জানার অধিকার আছে। কিন্তু এখান থেকে চলো প্লীজ।”
“আপনার উত্তর না পাওয়া অব্দি আমি এক পা ও নড়ব না।”
তনুজার কথায় গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাঈম। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার এতদিনের প্রচেষ্টা তাদের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে। এই শিকদার পদবিটাই বোধহয় ধ্বংসের আর নাম।
“শিকদার বংশের ছেলে আমি। লাবিব শিকদারের একমাত্র ছেলে।”
তনুজা দুই পা পিছিয়ে গেল আচমকা। সাথে সাথেই গাছের ভাঙ্গা একটা ডাল পায়ে এসে লাগলো তার। ব্যথা পেল দারুনভাবে। হয়তো রক্তও বের হচ্ছে। নাঈম তার দিকে এগিয়ে আসতে গেলে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো সে। কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,
“আমার কাছে আসবেন না আপনি। শিকদারের রক্তে পাপের গন্ধ। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।”
ঊর্ধ্বশ্বাসে গাড়ি চলছে হাইওয়ে ধরে। গাড়ির পিছনের সিটে নন্দিতার মাথা বুকে চেপে ধরে বসে আছে তুর্জয়। একেবারে শান্ত, নির্জীব। শুধু দুইহাতে শক্ত করে চেপে ধরে আছে নন্দিতাকে নিজের বুকের সাথে। ঠিক যেমনভাবে ছোটো বাচ্চারা খেলনা পুতুল আগলে রাখে বুকের মধ্যে করে, যাতে কেউ কেড়ে নিতে না পারে।
অতিরিক্ত রক্তপাত হচ্ছে নন্দিতার। তার পা দুটো কোলের উপর নিয়ে বসে আছে তনুজা। ড্রাইভ করছে নাঈম। আগে থেকেই হসপিটালে ফোন করে ওটি রেডি করতে বলা হয়েছে। বেস্ট গাইনি ডক্টর অলরেডি সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। এখন শুধু যত দ্রুত সম্ভব নন্দিতাকে নিয়ে পৌঁছানোর পালা।
যাওয়ার আগে বাবা মায়ের লাশের দিকে আঙুল তাক করে নিথর কন্ঠে তুর্জয় পুলিশকে বলেছিল,
“আমার যাবজ্জীবনের সম্পদ, সাবধানে পৌঁছে দেবেন।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
তুর্জয়ের কথামতো তুহিনা বেগম আর আশরাফ সাহেবের লাশকে এম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয়েছে হসপিটালে। হসপিটালের বাকি সব ফর্মালিটি সামলে নাঈম হাঁপাতে হাঁপাতে এলো ওটির সামনে। দুই ঘণ্টা ধরে ভেতরে অপারেশন চলছে নন্দিতার। বাইরে পাতা বেঞ্চের উপর বসে আছে তনুজা চুপচাপ। দুইহাতে মুখ ঢেকে ক্লান্ত শরীরটা ছেড়ে দিয়েছে হাতলের উপর। তুর্জয় দেয়ালে হেলান দিয়ে একঠাঁয় তাকিয়ে ওটির দরজার দিকে। সাদা শার্টের জায়গায় জায়গায় আজ রক্ত লেগে। নন্দিতার রক্ত, তার বাবা মায়ের রক্ত। জীবন থেকে দুজন মানুষকে হারিয়ে তৃতীয়জনের সংবাদের অপেক্ষা করা মানুষটার মানসিক অবস্থা বোঝার ক্ষমতা দুনিয়ায় কারোর নেই। যতই মানুষ বলুক, তোমার কষ্ট বুঝি। কিন্তু কেউ বোঝে না। যার সাথে হয় একমাত্র সে বোঝে সেই যন্ত্রণা।
পুরুষমানুষের যন্ত্রণা হয়না। যন্ত্রণা হলেও দেখাতে হয়না। পুরুষ মানুষের কাঁদতে হয়না, কষ্ট জাহির করতে হয়না। শত কষ্ট হলেও বুকে পাথর চেপে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, দায়িত্ব পালন করতে হয়। এইযে কত দায়িত্ব তুর্জয়ের। দুজন মানুষ কাফন, দাফনের অপেক্ষা করছে। কে জানে আর কতোজন অপেক্ষায়! কথাটা ভাবতে গিয়েই বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো তার। আরও লাশ! আরও শূন্যতা! শুন্যতা এবার তার ভেতরটা খোকলা করে দিয়েছে যে! কী নিয়ে বাঁচবে? সব কেড়ে নিলে তাকেও কেড়ে নিক। প্রিয়জন ব্যতিত এই জীবন বৃথা নয়তো কী?
লাবিব শিকদার আর কামিনী শিকদারকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। পুলিশ এসে বাড়িতে জানিয়েছে সব ঘটনা। আলোর কোনো হস্তক্ষেপ প্রমাণিত হয়নি বলে ছেড়ে দিয়েছে তাকে। সবটা জানার পর আলো ছুটে গেল গেস্ট হাউজে। নওরিনকে সবকিছু জানাতেই দুজনে মিলে ছুটে গেল হসপিটালে।
বহুদিন, কয়েক বছর পর বাইরের আলো, বাতাস, রাস্তাঘাট দেখে চিনতে কষ্ট হচ্ছে নওরিনের। আজ এই দিনটা তার খুশি হওয়ার কথা ছিল। এই মুক্তির জন্য তো এতগুলো দিন মুখিয়ে ছিল সে। কিন্তু এই মুক্তি তার থেকে এতোগুলো মানুষ কেড়ে নেবে কে জানতো? যে ছেলেটাকে জন্ম দেয়নি, কোলে পিঠে করে মানুষও করেনি, তার আদর, আহ্লাদ, স্নেহ আর কখনও পাবেনা। কখনও আর তার গাল ছুঁয়ে দেওয়া হবে না। ভাবতেই গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো তার। আর যে মেয়েটাকে এই গর্ভে ধারণ করেছিল, সেও যে ভালো নেই। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, বাঁচার জন্য আকুতি করছে। এ কেমন জীবন? একটা পেলে চারটে খোয়াতে হয়। একটু সুখ পেতে একজনম দুঃখের ভার বইতে হয়।
টানা তিনঘন্টা পর ওটির লাইট অফ হলো। সাথে সাথেই লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করলো তুর্জয়। বুকে তুফান বলছে তার। হাজারো সামুদ্রিক তুফান ঝাপটে এসে পড়ছে যেন তার বুকে। যন্ত্রণায় ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে বুক। তবুও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে সমুদ্রের মাঝে দাঁড়ানো লাইটহাউজের মতো।
তোয়ালে প্যাঁচানো একটা ছেলে সন্তান। ছোটো ছোটো দুটো হাত, দুটো পা, ফ্যাকাসে মুখ। তোয়ালে প্যাঁচানো বাচ্চাটাকে তুর্জয়ের কোলে তুলে দিলো ডাক্তার। মিনমিনে স্বরে বলল,
“শেষবারের মতো দেখে নিন, ছুঁয়ে দিন। অনুভবে অনুভবে জড়িয়ে নিন।”
তুর্জয়ের মন চাইলো হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে। এ কেমন বিচার? এ বিচার মানে না সে। মানবে না। এতো কেন খোয়াতে হবে তাকে? কী এমন অপরাধ তার? অন্যায়ের প্রতিবাদ করা কী তবে অপরাধ? আপোষে এসে গেলে আজ তার নীতিবাক্য হেরে যেত, কিন্তু শূন্যতায় নিথর হতে তো হতো না। এতো যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বাঁচতে তো হতো না। এই বিষাদের তেতো স্বাদ গ্রহণ তো করতে হত না। পুরুষ মানুষের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক হলো, সে যখন কারো সন্তান, কারো স্বামী আর কারো বাবা। অথচ আজ কয়েক মুহূর্তের মাঝেই সে অনাথ হলো। হলো নিঃসন্তান। এরপর স্ত্রী! নন্দিতার কথা মাথায় আসতেই চোখ তুলে তাকালো সে। ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার ওয়াইফ?”
“মেন্টালি অনেক ধকল গিয়েছে ওনার উপর দিয়ে। বাঁচানো কষ্টকর ছিল অনেক। বলতে পারেন পেশেন্টের নিজেরই বাঁচার ইচ্ছে ছিল না। কোনো কারণে মেন্টালি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন উনি। সময় লাগবে পুরোপুরি সুস্থ হতে।”
নন্দিতা বেঁচে আছে শুনেই হেসে উঠলো তুর্জয়। যেন কতকাল পর শুনল কেউ বেঁচে আছে। মুখে বিড়বিড় করে বলল,
“বেঁচে আছে। বেঁচে আছে। কেউ তো বেঁচে আছে আমার জন্য।”
বাচ্চাটাকে দুইহাতে আগলে নিয়ে বসে আছে তুর্জয়। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার দিকে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে তার চোখ, নাক, মুখ, গাল। বিড়বিড় করে বলছে কিসব যেন। এরপর তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখছে অনেকটা সময়।
সামনে একজোড়া পায়ের উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ তুলে তাকালো তুর্জয়। সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে সে চেনে। নন্দিতার সাথে ছবি দেখেছে অনেকগুলো। নওরিনকে দেখে আবারও চোখ নামিয়ে নিলো। নওরিন সাথে সাথে হাত রাখলেন তুর্জয়ের কাঁধে। ভেজা কন্ঠে বললেন,
“শরীর বেশি সময় রাখতে নেই। আত্মার কষ্ট হয়। দাফনের কাজটা সেরে ফেলতে হবে তাড়াতাড়ি।”
তুর্জয় চেয়েছিল নন্দিতা অন্তত শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখুক বাচ্চাটাকে। স্পর্শ নিক তার ভেতরে এতদিনের বসবাসরত এই ক্ষুদ্র নিথর প্রাণের। কিন্তু তা সম্ভব না। ডাক্তারের কড়া নিষেধ কোনোপ্রকারে উত্তেজিত যেন না হয় নন্দিতা। এতে তার প্রাণঝুঁকি আছে।
তনুজা দাঁড়িয়ে আছে হসপিটালের এক সাইডে। চোখ তার ঠাঁয় তুর্জয়ের দিকে। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে অজান্তেই। নাঈম এসে দাঁড়ালো তার পাশে। পকেট থেকে রুমাল বের করে এগিয়ে দিলো তার দিকে। তনুজা সরে গেল খানিকটা। রুঢ় কন্ঠে জবাব দিলো,
“আমাদের যেটুকু এক হওয়ার সম্ভবনা ছিল, এ জীবনে আর সম্ভব নয়। নিজের রক্ত, মাংস বাদ দিয়ে যে আপনি, সেই আপনাকে আমি মেনে নিতে পারবো। কিন্তু এই পাপী রক্ত, মাংসে আমার ঘেন্না হচ্ছে। বিশ্বাস করুন, আমার ভীষনভাবে অরুচি লাগছে আপনার দিকে তাকাতে। আমাদের পথ আলাদা। আজ থেকে, এখন থেকে আমরা আর মুখোমুখি হতে চাইনা।”
তিনটে লাশ পাশাপাশি শোয়ানো। সামনে খুঁড়ে রাখা তিনটে কবর। দুটো বড়, আর একটা ছোট। গোসল দিয়ে কাফনে মোড়ানো হয়েছে লাশগুলোকে। ছোটো লাশটাকে একটা পুতলির মতো লাগছে। কী সুন্দর তার মুখ! এই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে খোদার মায়া হলো না কেন? কেন এই প্রানটাকে ভিক্ষা দিলো না তাকে? নাঈম এসে হাত রাখলো তুর্জয়ের কাঁধে। লোকগুলো কবর খুঁড়ে বাকি সব কাজ শেষ করে রেখেছে। জানাজাও পড়ানো হয়েছে। এবার দাফনের পালা। সবার আগে আশরাফ সাহেবকে শোয়ানো হলো কবরে। তুর্জয় তার দেহের উপর মাথা আলতো করে মাথা এলিয়ে দিয়ে মিনমিনে সুরে বলল,
“আমাকে মাফ করে দিও। মাফ করে দিও আমাকে।”
এরপর তার কবরে মাটি ভরাট করে তুহিনা বেগমকে শুইয়ে দিলো তার পাশের কবরে। শেষবেলায় তুহিনা বেগমের গালে রাখ রেখে বলল,
“তোমার অযোগ্য সন্তানকে তুমি ক্ষমা করে দিও। আমি পারিনি তোমাদের বাঁচাতে। পারিনি যোগ্য সন্তান হয়ে উঠতে।”
সবশেষে নিজের সন্তানকে দুই হাত কবরের বুকে শুইয়ে দিতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠলো তার। নিজের সন্তানকে কিছুতেই এই একাকী, শূন্য কবরের বুকে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না তার। কিন্তু উপায় যে নেই! বুকের একটা অংশ কবরের বুকে রেখে উপর থেকে মাটি চাপা দিল সে। এরপর নিজেও পড়লো তিন কবরের পাশে। সাদা পাঞ্জাবি তার কাদা মাটিতে মাখামাখি। শূন্য আকাশের গাংচিলের মতো শূন্যতা আজ তার বুকে। তৃষ্ণার্ত, চৌচির বুক নিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ালো সে। ধীর পায়ে পা বাড়ালো আর এক জীবন্ত লাশের ভরসা হতে।
নন্দিতার জ্ঞান ফিরেছে। শরীরে বল নেই। চোখ দুটো বহু কষ্টে টেনে টেনে খুললো সে। অবচেতন মনে দেখতে পেল তার থেকে খানিকটা দূরে বসে ধূসর। আগের মতই হাস্যোজ্বল, দুষ্টুমিভরা ঠোঁটের হাসি। নন্দিতাও হাসলো যার দিকে তাকিয়ে। সাথে সাথেই তার মনে পড়ে গেল ধূসরের বলা শেষ কথাগুলো। আর সেই মুহূর্তেই ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগলো ধূসর। শেষ মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৬৫
“না পাইলি কাফন, না পাইলি দাফন,
না পাইলি জগৎ, না পাইলি মোহ।
ওরে পিরিতি ডুবাইলো তোরে,
ডুবাইলো আমাকেও একসাথে সোৎ।
