Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৬

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৬

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৬
সাইদা মুন

সবাই রেডি হয়ে বসে আছে, মেহরীনও প্রস্তুত। সাদা একটা গাউন পরেছে, কানে তাহিয়ার দেওয়া হোয়াইট স্টোনের ইয়াররিং, হাতে একটা রিং। মুখে হালকা সাজ, তালহার কিনে দেওয়া লিপস্টিকের মধ্য থেকে নোড শেডের লিপস্টিকটা ঠোঁটে দিয়েছে। আয়নায় কয়েকবার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেছে। এখন তার খুব খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু মনটা কেমন যেন ভারী লাগছে।

–আন্টি, আমিও থাকি না প্লিজ… তাহিয়া ছাড়া ওখানে একা গিয়ে কি করবো?
তিতলি বেগম একটু কড়া গলায় বললেন,
–না যাও রিতু, ফারহা, মেহেদিরা আছে তো। ওদের ভাই-বোনরাও থাকবে, গেলে ভালো লাগবে।
তিনি ভাবছেন মেয়েটাকে তো সেই একবার সিলেট ছাড়া কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়নি। এক জায়গায় থাকতে থাকতে বড়রাই কেমন বিরক্ত হয়ে উঠে, মেয়েটারও নিশ্চয়ই একঘেয়েমি লাগে। একটু অন্য পরিবেশে গেলে সবার সাথে মিশবে মনটাও ভালো হবে তার।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

উনার কথা শুনে মেহরীন চুপসে যায়। চোখ ঘুরিয়ে তাকায় তাহিয়ার দিকে। একদিনের জ্বরে মেয়েটার মুখ কতটাই না ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। তাহিয়া অসুস্থ, তাই যাবেনা। ফলে তিতলি বেগমও থাকবেন বাসায়।
মেহরীন প্রথমে ভেবেছিলো তাহিয়া যাবে, তাই খুব খুশি হয়েছিলো। কিন্তু এখন মনটা কেমন ফাঁকা লাগছে। রিতু তো তাকে সহ্যই করতে পারে না, ফারহা আবার নিজের মতো থাকে ভালো-মন্দ কিছুই কথা বলে না। একমাত্র মেহেদির সঙ্গেই কিছুটা ভাব গড়ে উঠেছে, বয়সে ছোট হলেও বেশ পাকা।
এরই মধ্যে তালহা এসে হাজির। সাদা শার্টটা কালো প্যান্টের সাথে ইন করে পরেছে, হাতে কোট সম্ভবত পরে নেবে বেরোবার আগে। তার সবসময়ই ফরমাল লুক থাকবেই। অবশ্য এভাবেই যেন তালহাকে একটু বেশি মানায়। সে এসেই তাহিয়ার পাশে বসে কপালে হাত রাখল,

–এখন কেমন লাগছে?
তাহিয়া ভাইকে দেখেই ঠোঁট উল্টে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
–মাথা ব্যথা কমছে না…
তার কথায় মেহরীন কিছুটা চমকে তাকায়। কিছুক্ষণ আগেই তো বলছিলো, মাথা ব্যথা নেই। এখন আবার তালহাকে বলছে আছে। তালহা চোখ সরু করে তাকায়,
–কি আনলে মাথা ব্যথা কমবে বলে ফেলুন।
এই কথার অপেক্ষাতেই যেন ছিল তাহিয়া। সঙ্গে সঙ্গে উৎফুল্ল হয়ে বলল,
–আইসক্রিম, আচার , আর যদি ফুচকা পাও তাহলে এনো। না পেলে ওই দুটোতেই আজকের মতো কাজ চালিয়ে নেবো।

তিতলি বেগম হেসে উঠলেন মেয়ের কান্ডে, ছোট থেকেই এমন একটু অসুস্থ হলেই ভাইয়ের কাছে নানান আবদার। কারন সে জানে তালহা এই অবস্থায় তাকে কিছুতে মানা করবে না। মেহরীনও হাসে, সে এবার বুঝেছে তাহিয়ার চালাকি আসলে অসুস্থতার অজুহাতে ভাইয়ের কাছ থেকে একটু আদর আদায় করছে। তালহাও হাসল, বোনের গালে আলতো চাপড় মেরে বলল,
–সুযোগের সৎ ব্যবহার, হু?
তাহিয়া ধরা পড়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তালহা উঠে দাঁড়ায়, মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
–আম্মু, চেষ্টা করবো দ্রুত ফিরে আসার। খালা তো থাকবেনই, আর কোনো দরকার হলে সঙ্গে সঙ্গে কল করবে আমায়।
তিতলি বেগম নেড়ে বললেন,

–আচ্ছা বাবা, সাবধানে যাস। আর মেহরীন, রিতুদের সাথে থেকো।
মেহরীন মাথা নাড়তেই তালহা সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
–চলো।
তালহা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, মেহরীনও তার পিছু পিছু হাঁটছে। তাহিয়ার রুমের দরজা পেরোতেই তালহা হঠাৎ থেমে গেল। তাকে থামতে দেখে মেহরীনও থেমে যায়। হঠাৎ কেন দাঁড়াল জানতে মুখ খুলতে যাবে, এর আগেই তালহা নিজের হাতের কোটটা মেহরীনের হাতে গুঁজে দিয়ে আবার হাঁটা ধরল।

মেহরীন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল হাতের দিকে। ঘটনা যখন বোধগম্য হলো চোখ তুলে তালহার দিকে একবার তাকাল। সঙ্গে সঙ্গেই অজান্তেই মুখে একফোঁটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। কোটটা সে দুই হাতে যত্ন করে বুকের কাছে চেপে ধরে, যেন গোটা তালহাকেই বুকে আগলে নিয়েছে। তালহা তার সঙ্গে আস্তেধীরে মিশছে, ফ্রেন্ডলি হচ্ছে, ব্যাপারটা তার ভীষণ ভালো লাগছে। সঙ্গে মনের ভেতরের অনুভূতিরাও ধীরে ধীরে গভীর হয়ে উঠছে।
গাড়িতে মাঝের সিটে বসেছে রিতু ও ফারহা, তাদের পাশে মেহরীন ঠিক জানালার ধারে। পেছনের সিটে মেহেদি আর তালহার দুই চাচি। গাড়ি চালাচ্ছে তালহা, তার পাশেই বসে আছে তাহসান। তার যাওয়ার ইচ্ছে ছিলোনা তবে মেহরীন যাবে দেখে সেও যাচ্ছে। তালহার চাচারা যাওয়ার ব্যাপারে আগেই না করে দিয়েছেন।

রিতু আজ ফারহাকে মাঝে দিয়ে সে সাইডে বসেছে। মেহরীন যদি বমি করে দেয় তার উপর, তাহলে তার সাজগোজ সব শেষ। এই ভাবনায় মেহরীনের পাশে বসেনি। গাড়ি চলছে নিজের ছন্দে। মেহেদি একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে যাচ্ছে সকলকে। বয়সে ছোট, তাই কৌতূহলও সীমাহীন। তবে কেউ তেমন পাত্তা দিচ্ছে না, এক-দুটি প্রশ্নের জবাব দিয়ে চুপ হয়ে যাচ্ছে সবাই। নয়তো তাকে উত্তর দিতে দিতে হয়রান হয়ে উঠবে যে কেউ, তাও তার প্রশ্ন শেষ হবেনা। কিন্তু মেহেদি থেমে থাকবার ছেলে নয়।
তাদের থেকে পাত্তা নে পেয়ে এবার সে উঁকি দিল মেহরীনের দিকে। মেহরীনের হাতে কালো কোটটা দেখে বলল,
–মেহু আপু, তোমার হাতে ওটা কি?
তার প্রশ্নে সবাই একবার করে মেহরীনের হাতের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিগুলোয় কৌতূহল মিশে আছে। হঠাৎই সবার দৃষ্টি নিজের হাতের দিকে টের পেয়ে মেহরীন থতমত খেয়ে তালহার দিকে তাকায়। তাকে চুপ দেখে আবারও একই প্রশ্ন করে মেহেদি।
মেহরীন মিনমিনিয়ে বলল,

–উনার কোট…
“উনার” কথাটায় সবাই ফের একবার প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে, উনি মানে কে। তবে তাহসানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে, সে বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে মেহরীন কার কথা বলছে।
ফারহা পাশ থেকে কৌতূহলী স্বরে বলে ওঠে,
–উনি টা কে?
মেহরীনের থমথমে মুখটা আরও থমথমে হয়ে উঠল। কিছু বলার আগেই তালহা ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
–ওটা আমার।
তা শুনে রিতু জিজ্ঞেস করল,
–কেনো তোমার কোট ওর কাছে কেনো?
তালহা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল,
–থাকলে কোনো প্রবলেম?

তা শুনে রিতু চুপ হয়ে গেল। তালহার মুখের সামনে আর কিছু বলার সাহস তার হলো না। তবে ব্যাপারটা ভালো লাগেনি, তাদের পরিবারের সকলে মেহরীনের সাথে এতো নরমাল ব্যবহার তার ভালো লাগেনা। তবে কি আর করার কেবল মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝিয়ে ফোনের পর্দায় চোখ রাখল।
প্রায় ত্রিশ মিনিটের পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছাল রিতুর খালার বাড়িতে। দুইতলা বিশিষ্ট সুন্দর একটি বাড়ি, উপরের তলায় রিতুর খালা-খালুদের বসবাস, আর নিচতলায় থাকেন খালার ভাসুরের পরিবার। বাড়িতে তারা পা রাখতেই যেন উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল পরিবেশ। রিতুর খালা, খালাতো ভাই-বোনেরা ছুটে এল তাদের ঘিরে। আরও কিছু আত্মীয়স্বজনও উপস্থিত, সব অচেনা মুখে ভরে উঠল ড্রয়িংরুম। অবশ্য অচেনা শুধু মেহরীনের জন্যই।
এরই ভেতর একজোড়া বয়সের ছাপ পড়া শান্ত চোখ হঠাৎই স্থির হলো মেহরীনের ওপর। মেয়েটি তখন এক পাশে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে, যেন নিজের অস্তিত্ব আড়াল করে রাখতে চায় এই অচেনা মানুষজনের ভীড়ে। বৃদ্ধা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

–ও কে রে তানিয়া?
রিতুর নানীর প্রশ্নে সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল মেহরীনের দিকে। তানিয়া বেগম সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
–ও মেহরীন, আমাদের সাথেই থাকে মা।
তার কথা শেষ হতে না হতেই জন্মদিনের সাজে থাকা রিতুর খালাতো বোন জান্নাত তাকে পরখ কফে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
–কাজের লোক নাকি?
প্রশ্ন শুনে রিতু কটাক্ষের স্বরে উত্তর দিল,
–আমাদের বাসার আশ্রিতা।
কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তালহা কঠোর গলায় ডেকে উঠল,

–রিতু!
ধমকে রিতু চুপ হয়ে গেল। একবার তালহার দিকে তাকিয়ে মাথা ঘুরিয়ে মেহরীনের দিকে রাগী চোখে তাকাল। মেহরীনের মাথা নিচু, ঠোঁট নিঃশব্দ। আমতাআমতা করে রিতু বলল,
–তাছাড়া কি পরিচয় দেব ভাইয়া? তার তো কোনো পরিচয় নেই।
পরিস্থিতি বুঝে রিতুর নানু তাদের থামিয়ে দেয়। আশেপাশের সকলেরই দৃষ্টি মেহেরীনের দিকে। মেহরীনের তেমন খারাপ লাগছে না, এমন অবহেলা, এমন ছোটখাটো আঘাত এগুলো সে ছোট থেকেই সহ্য করে এসেছে। মা-বাবা নেই, চাচা-চাচীর ছায়াতলে বড় হয়েছে। দাদী হাজার ঢাল হয়ে থাকুক উঠতে বসতে এসব কথা সে প্রতিনিয়তই শুনতো।

শুধু শরীরের আঘাত থেকে বেচেঁছে। এখন আর এসব কথার আঘাত যেন তার হৃদয়ে তেমন গাঢ় দাগ কাটে না। জীবনের এ কঠিন মায়াজালে সে হয়ে উঠেছে এক দৃঢ়, অটল মানুষ, যে দৃষ্টিভঙ্গির তিক্ততাকেও গ্রহণ করতে জানে। এদিকে রিতুর নানি কথাবার্তা পরিবর্তন করতে এগিয়ে এসে মেহরীনের হাত ধরলেন, মমতার ছোঁয়ায় বললেন,
–অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছো এসো, এসো নতুন অতিথি। বাকিরাও আসো তো দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি।
তারপর সবাই একে একে বসার ঘরে গিয়ে বসল। তারমধ্যেই তাদের নাস্তা দেওয়া হয়, কথাবার্তায় জমে উঠল পরিবেশ। সবাই সবার সাথে গল্পে মেতে উঠেছে। শুধু মেহরীন চুপচাপ বসে আছে, অপরিচিত দৃষ্টি, অসস্থি সব মিলিয়ে সে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। তার অস্বস্তি তালহার চোখ এড়াল না। মেহেদিকে চোখ দিয়ে ইশারা করল মেহরীনের কাছে যেতে।

ভাইয়ের ইশারা বুঝে মেহেদি চঞ্চল পায়ে গিয়ে মেহরীনের পাশে বসল। আর তাতেই যেন পরিবেশ বদলে গেল। মেহেদি কথা জুড়ে দিল, একেরপর এক অদ্ভুত প্রশ্ন করেই চলছে, মেহরীনও হাসছে আবার উত্তর দিচ্ছে।
তাদের হাসাহাসি করতে দেখে একটু পরই মেহরীনের বয়সি এক মেয়ে এসে বসল তাদের পাশে। সে জান্নাতের চাচাতো বোন সামিরা। তার দেখাদেখি আরও কয়েকজন এসে যোগ দিল। যেন এতোক্ষনের জড়তা ভেঙে তারা এসেছে মেহরীনের কাছে। মুহূর্তেই জমে উঠল তাদের হাসি-ঠাট্টার আসর। মেহরীন, যে কিছুক্ষণ আগেও এক কোণে নিঃশব্দ ছিল, এখন তাদের সঙ্গ পেয়ে বাচ্চামিতে মেতে উঠেছে, হাসছে, গল্প করছে, সব সংকোচ যেন মুহূর্তে মিয়িয়ে গেল হাসির ঢেউয়ে।

তাহসানের দৃষ্টি মেহরীনের দিকে আটকে আছে, এসেছে থেকেই তাকেই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে যাচ্ছে সে। মেহরীনের উদ্দেশ্যেই তো সে এসেছে। প্রেমে পড়ার পর সে কেমন যেন নিজের ব্যক্তিত্বকেই বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে নিজের আচরণ আর কাজকর্ম দেখে নিজেই অবাক হয়, কখনও বিরক্তও হয়। এসব বাচ্চামো ব্যাপার তার বয়সে মানায় না, তবুও সবশেষে ভালোই লাগে, ভালো লাগে এই সব করতে।
তাদের কেক কাটতে কাটতে বাজবে আটটা। ওয়েট করছে আরও কাদের আসা বাকি। সামিরা প্ল্যান করেছে, এখন তারা লুকোচুরি খেলবে। সবাই রাজি, শুধু মেহরীন বাদে। কারন নতুন জায়গায় এসেছে তালহার পার্মিশন ছাড়া লাফালাফি করলে যদি বকা দেয়।

মেহরীন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় তালহার দিকে। তাকে ডাকতে যাবে তার আগেই এক মেয়ে সেখানে এসে দাঁড়ায়। ফর্সা, গোলগাল গড়নের মেয়ে, উচ্চতায় মেহরীন থেকেও দুই-তিন ইঞ্চি লম্বা হবে হয়তো। কালো শাড়ি পরিপাটি করে পরেছে, সাথে সাদামাটা সাজগোজ, চুল বেনি করে এক পাশে ফেলে রাখা। চোখে চশমা, হয়তো পাউয়ারি, দেখতে যেন কোনো স্কুল টিচার লাগছে। ভীষণ মায়াবি চেহারার মেয়েটি যে কেউ দেখলে তাকিয়ে যেতে বাধ্য।
মেহরীনও মুগ্ধ হয়ে । তার পর্যবেক্ষণের মাঝেই মেয়েটি তালহাকে ডেকে বলে,

–তালহা, কেমন আছো…?
হঠাৎ মেয়েলি কণ্ঠে তালহা মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকালো। মুহূর্তে কিছুটা থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল সে, চোখে চোখে যেন অদৃশ্য আগুন জ্বলছে। মেহরীন পাশ থেকে লক্ষ্য করছিল, তালহার চাহনি আজ অন্যরকম। এমন দৃষ্টিতে তো তার দিকেও কখনো তাকায়নি। মেয়েটি সুন্দর, তাই কি এভাবে তাকালো? মেহরীনের মন হঠাৎ অচেনা এক খেয়ালপড়া ভাবায় ভরে গেল।
এ সময় মেয়েটি আবারও প্রশ্ন করল,

–কথা বলবে না?
তালহার চোখ-মুখ কাঠকাঠ ভাব ধরল, গলার গম্ভীর কন্ঠে বলল,
–তুমি এখানে?
মেয়েটি হেসে ফেলল,
–যাক, আমাকে মনে আছে?
প্রতিউত্তরে তালহা কিছুই বলল না। তা দেখে সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
–একটু আসবে? কথা ছিল প্লিজজ।
তালহা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–যা বলার এখানে বলো।
পাশে থেকেই মেহরীন তাদের কথোপকথন শুনছিল। যতটুকু বুঝল, তারা পূর্ব পরিচিত। মেহরীনের মনে আরও আধার নেমে এল। তবে পরমুহূর্তেই নিজেকে বুঝ দেয় তালহার আত্মীয়দের মধ্যেই কেউ হয়তো। তার ভাবনার মাঝেই তালহার নজর পড়ে মেহরীনের দিকে। তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল,

–মেহরীন, কিছু লাগবে?
মেয়েটির চোখও তখন সরাসরি মেহরীনের দিকে পড়ল। মেহরীন হালকা মাথা নেড়ে বলল,
–আসলে ওরা বলছে লুকোচুরি খেলবে, আমিও খেলি?
তালহা একবার তার পেছনের সবাইকে দেখে বলল,
–খেলো, তবে নিচে নামবে না।
মেহরীন মাথা নাড়তেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করল,
–ও কে?
সঙ্গে সঙ্গে তালহা বলল,
–তা জেনে তোমার কি? মেহরীন, যাও এখন।

পারমিশন পেতেই তারা বেরিয়ে গেল। মেহরীনের মনে কৌতূহল জাগল ওই মেয়েটিকে নিয়ে তবে তা ঝেরে ফেলে তাদের সাথে খেলায় মেতে উঠল। এরমধ্যে আরও অনেক অতিথি আসতে থাকে। মেহরীন অবাক সামান্য জন্মদিনে এতো বড় আয়োজন, তার তো কোনোদিন জন্মদিনই পালন হয়নি। অবশ্য কথায় আছে বড়লোকের বিরাট কারবার।
প্রথম রাউন্ডেই মেহেদি চোর হয়, আর বাকিরা ছুটে যায় লুকোতে। নিয়মমতো মেহেদিকে এক রুমে দাঁড় করিয়ে গুনতে দেওয়া হয়, আর বাকিরা যে যার মতো করে চলে যায়। বাড়িটা যেহেতু মেহরীনের কাছে একেবারেই অচেনা, তাই তাকে লুকাতে সাহায্য করবে সামিরা।

–এই তুমি কি অন্ধকারে ভয় পাও?
মেহরীন একটু ইতস্তত করে মাথা নাড়ে,
–একটু একটু।
সামিরা মুচকি হেসে বলে,
–তাহলে ভয় নেই, আমি আছি। তুমি ছাদে যাবে, আমি থাকবো সিড়ির মাথায়। যদি ভয় পাও, আমাকে ডাকবে। আর যদি আমাকে ধরে ফেলে, তুমি সাথে সাথে এসে তিল্লু দেবে, ঠিক আছে?
মেহরীন চুপচাপ মাথা নাড়ে, রাজি হয়ে যায়। সামিরা তাকে ছাদের একপাশে দাঁড় করিয়ে নিজে সিড়ির কাছে গিয়ে অবস্থান নেয়।

অন্ধকার ছাদে বেশ কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থাকে মেহরীন। হালকা বাতাসে তার গাউনের প্রান্ত উড়ছে, চারপাশ নিস্তব্ধ। কারো কোনো শব্দ নেই। এবার ভয় লাগছে তার। একটু সাহস সঞ্চয় করে সামনে এগোতে যায়, ঠিক তখনই ছাদের দরজা ঠেলে কেউ ভেতরে আসে।
মুহূর্তেই সরে যায় মেহরীন, দেয়ালের সাথে লেগে দাঁড়ায়। ভেবেছিল মেহেদিই হয়তো এসে গেছে তাকে খুজতে। কিন্তু না, একটু পরেই দরজার দিক থেকে ভেসে আসে পরিচিত এক কণ্ঠ,
–মেহরীন, আছো?
চমকে ঘুরে দাঁড়ায় সেদিকে,
–তাহসান ভাইয়া, আপনি এখানে?

তার কন্ঠে সেদিকে তাকাতেই কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে যায় তাহসান। চাদের নরম আলোয় তার রূপ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সাদা গাউনটি তার শরীরের সঙ্গে মিশে চাঁদের আলোর স্পর্শে হালকাভাবে ঝলমল করছে। চোখে পড়ে তার কোমল মুখমন্ডল, উজ্জ্বল চোখ, সবকিছু মিলিয়ে যেন নবজীবনের সতেজতা ঝরে পড়ছে। মুহূর্তের জন্য লাগছে চাঁদ থেকে নেমে এসেছে কোনো অপ্সরা, যার সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। তাহসানের চোখ সরানোই সম্ভব হচ্ছে না, এতো আকর্ষণীয় লাগে কেন এই মেয়েকে? কারণ সম্ভবত মেহরীনের উঠতি বয়সের প্রাণবন্ত, সতেজ ও কোমল সৌন্দর্যের মূর্ত রূপ।
তাহসানের একধ্যানে তাকিয়ে থাকা দৃষ্টি মেহরীনের মনে অস্বস্তি জাগায়। সে নড়েচড়ে দাঁড়ায়, যেন সেই দৃষ্টিটা তাকে অজান্তেই বিব্রত করছে। ধ্যান ভাঙতে নিচু স্বরে বলল,

–ভাইয়া…
তাহসান হঠাৎ চমকে উঠল, যেন নিজের জগৎ থেকে ফিরল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
–হ…হ্যাঁ, এখানে কী করছো অন্ধকারে?
মেহরীন মাথা নিচু করে বলল,
–লুকিয়েছিলাম… বাহিরে সামিরাও লুকিয়েছে, দেখেননি?
–না তো, কাউকে দেখলাম না।
তার কথা শুনে মেহরীনের মনে সন্দেহ জাগল, হয়তো সে ধরা পড়ে গেছে, আর সে বুঝতেই পারেনি। তাই তাড়াতাড়ি দরজার দিকে পা বাড়ায়। তাকে যেতে দেখে তাহসান ডেকে উঠল,

–কোথায় যাচ্ছো?
মেহরীন থেমে পেছন ফিরে তাকায়,
–ওদের কাছে… হয়তো আমাকে খুঁজে পায়নি তারা।
তাহসান শান্ত স্বরে বলল,
–না, ওদের বড়রা ডেকেছে। খেলবে না এখন। তুমি এদিকে আসো।
তার কথায় মেহরীন পড়ে গেল দু’টানায়, মন সায় দিচ্ছে না, তবু মুখের উপর না বলতেও পারছে না। শেষমেশ নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে তাহসানের পাশে দাঁড়াল। দু’জন দাঁড়িয়ে রইল ছাদের একপাশে, তাহসান রেলিঙে হেলান দিয়ে, আর মেহরীন নীরবে চাঁদের আলোয় তার দিকেই তাকিয়ে।

–তোমার ড্রিম কি মেহরীন? লাইফে কি হতে চাও?
তাহসানের প্রশ্নে তপ্ত নিশ্বাস টেনে মেহরীন বলল,
–আমার স্বপ্ন… অনেক বড়লোক হওয়া।
তাহসান হালকা অবাক হয়ে তাকালো। বড়লোক হওয়াই সবার স্বপ্ন থাকে, উদ্দেশ্য থাকে, কিন্তু এত খোলাখুলিভাবে কে বলে? সাধারণত সবাই অর্ধেক কথা বলে, বাকিটা বোঝায় ইঙ্গিত দিয়ে, অল্পভাষায়। কিন্তু মেহরীন? সে সোজাসাপটা বলে দিল। কথার মাঝে যেন ব্যর্থতার আভাস, না পাওয়ার ক্ষুদ্র আক্ষেপ মিশে আছে। মেহরীনের চোখে চোখ রাখতেই তার চোখে ভেসে উঠল এক মৃদু বিষাদ, নীরব শোকের মতো। তাহসানের মনে জন্ম নিল প্রশ্নের ঝড়, মেয়েটির এই স্বপ্নের পেছনে কি লুকিয়ে আছে রহস্য। কপাল কুচকে সে জিজ্ঞেস করল,

–বড়লোক হয়ে কি করবে?
মেহরীন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরে ধীরে বলল,
–প্রথমে, প্রচুর জায়গাজমি কিনবো, সেখানে ক্ষেত-খামারি করবো। তারপর সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াবো। একটা হাসপাতাল বানাবো, যেখানে চিকিৎসা হবে পুরোপুরি ফ্রি। যাতে কেউ চিকিৎসার অভাবে মরে না যায়। আর একটি সবজি বাজার খোলব, যেখানে অভাবী মানুষরা একটাকা দিয়েও একবেলার খাবার কিনতে পারবে। তারপর সবশেষে একটা সুখ মঞ্চিল বানাবো।
তাহসান অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। বিস্ময় আর কৌতূহল একসাথে জাগছে তার মনে। মানুষ সাধারণত নিজের জন্য চিন্তা করে, আর এই ছোট্ট মেয়েটির চিন্তা মানুষের জন্য। হালকা হাসি ফোটে ওঠে মুখে, চোখে অদ্ভুত মুগ্ধতা। পরক্ষণেই মাথায় খেললো ছোট বেলায় তো আমরাও কতো এমন স্বপ্ন দেখতাম। তারপর জিজ্ঞেস করল,

–বাহ, খুব ভালো। তা, সুখ মঞ্চিলে কার সঙ্গে থাকবে?
মেহরীন এবার চঞ্চল হেসে বলল,
–আমার ভাই-বোনদের সঙ্গে।
তাহসান প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে বলল,
–তোমার ভাই-বোন আছে?
মেহরীন মাথা নেড়ে বলল,
–নাহ। তবে হবে, আমার মতো এতিম বাচ্চাদের নিয়ে আমি আমার সুখ মঞ্চিলে সুখের সঙ্গে বসবাস করব।
তাহসান বিস্ময় চোখে তাকিয়ে একটু ভেবে বলল,
–ও, এতিমখানা বানাবে বলছো?
মেহরীনের চোখে যেন সামান্য ক্ষোভ আর বিরক্তি ফুটে উঠল। সে বলল,

–উহু, এটা এতিমখানা নয়। এতিমখানা নামটা শুনলেই মানুষ কেমন অবহেলিত, ভীতসঙ্কুল জায়গা মনে করে। কিন্তু আমার সেটা হবে আনন্দ আর সুখের স্থান। আমার সুখ মঞ্চিলে যখন কোনো এতিম ছেলে-মেয়ে যাবে, সে আনন্দের সঙ্গে যাবে, আশা আর মধুর স্বপ্ন নিয়ে প্রবেশ করবে। যেখানে কোনো আফসোস থাকবে না জীবন নিয়ে।
তাহসান অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। বিস্ময়, মুগ্ধতা, কৌতূহল, সব মিলেমিশে তার মনে হালকা ঝড় তুলল। এসব ভাবনা তার মাথায়ও কখনো আসেনি। অথচ মেহরীনের চিন্তাধারায় এগুলো। তার দৃষ্টিভঙ্গিতে কেমন যেন ম্যাচিউর ম্যাচিউর ছোয়া। বয়সে ছোট হলেও, হয়তো বাস্তবতার স্পর্শ তাকে বুঝের দিকে অনেক বড় করে তুলেছে।
এখানেই মানুষের পার্থক্য। সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের সন্তানরা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও জীবনের কঠিন বাস্তব বোঝে না, আর সুবিধাহীন পরিবারের ছেলে-মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই কষ্ট আর সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞাবান হয়ে ওঠে। সীমিত সুযোগের মধ্যেও তারা শেখে ধৈর্য, বিচক্ষণতা আর জীবনের আসল মানে।
তাহসান আর কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক দৃঢ় গলা, তালহার। দু’জনেই ঘুরে তাকায়। তালহা দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে কঠিন দৃষ্টি। কখন এলো সে? কেউ টেরই পায়নি।
মেহরীন দু’পা এগিয়ে গেল তার দিকে, তখন তালহা আবারও প্রশ্ন করল,

–এখানে কী করছো?
মেহরীন তৎক্ষণাৎ বলল,
–লুকাতে এসেছিলাম…
তালহা এবার তাহসানের দিকে তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলল,
–এই তোমার লুকানো?
মেহরীন একবার তাহসানের দিকে তাকায় তার মুখে মুচকি হাসি। তা দেখে মেহরীন দ্রুত ব্যাখ্যা দিতে চাইল,
–আমি এখানে লুকিয়েছিলাম, এর মধ্যে তাহসান ভাইয়া এসেছিল…
কথা শেষ হওয়ার আগেই তালহা তাকে থামিয়ে দিল। ঠান্ডা কিন্তু রাগী স্বরে বলল,
–এক্ষুনি নিচে নামবে।

তার কণ্ঠের রাগী সুরে মেহরীনের হালকা কেঁপে উঠল। বুঝতে পারছে, কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে তাকে দিয়ে, কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস নেই। মাথা নিচু করে সোজা এগোতে লাগল সে।
পেছন থেকে ভেসে আসছে ভারী পায়ের শব্দ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তালহাও তার পেছনেই আসছে। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় হঠাৎ তালহা কঠিন গলা ধমকের ন্যায় বলল,
–নিচে গিয়ে আমার পাশে দাঁড়াবে। আর এদিক-ওদিক পা গেলে, পা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে রাখব।
তার এমন শান্ত হুমকি শুনে মেহরীন থমকে দাঁড়ায়। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই আলোতে ফুটে ওঠে তালহার লালচে চোখ, রাগে উষ্ণ, যেন আগুনে পুড়ছে। এতো রেগে আছে কেনো সে? আর কার উপর রাগ? তার উপর? কিন্তু কেন?
ভাবনার মাঝেই তালহার আরেকটি ধমক ভেসে আসে,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৫

–কি হলো? দাঁড়িয়ে আছো কেন? হাঁটো!
মেহরীন চমকে উঠে ভয়ে পা চালায় দ্রুত। আর তাতেও যেন তালহা আরও রেগে যায়। আবারও ধমকে উঠে,
–স্টুপিড! আর এক’পা এভাবে ফেললে এখনই পা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দেব!
মেহরীন এবার প্রায় কেঁদেই ফেলবে ভাব। ভয়ে ভয়ে পা ধীরে ফেলে নিচে নামছে, এক পা, দুই পা, প্রতিটি পদক্ষেপে যেন কাঁপন। বলা যায়না আবার কি ভুল করে ফেলে আবার যদি ধমন দেয় সেই ভয়ে। তালহা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে সামনে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে মেহরীনের বাম হাতটা নিজের ডান হাতে দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে এগোতে লাগল।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৭