Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৯

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৯

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৯
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

ভার্সিটির মাঠে জড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবাই।
তায়েবা তায়েব মাহির লামিয়াকে আঁটকে ধরে রেখেছে। রাগে ফুসফুস করছে লামিয়া। সামনে ঘাসে পড়ে আছে একটি মেয়ে। কপাল দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। মেয়েটার দলবল মেয়েটিকে ধরে ভয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।

কিছুক্ষণ আগের ঘটনা,
দুদিন পর ভার্সিটিতে প্রোগ্রাম হবে। সেখানে লামিয়া গানে আর তায়েবা নাচে নাম দেওয়ার জন্য এসেছে।
মাহির আর তায়েব কোনো কিছুতেই পার্টিসিপেট করে নি। তারপরও তাদের সাথে এসেছে।
গিটার কাঁধে নিয়ে ক্লাসরুমে ঢোকার সময়ই অধরা এসে পথ আটকালো তাদের।
অধরা এই ভার্সিটির সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। তার আরো এক পরিচয় আছে মাহিরের খালাতো বোন। কিন্তু কোনো ভালো সম্পর্ক নেই তাদের মধ্যে। এক ই ভার্সিটিতে পড়ায় প্রায় সময় দেখা হয় তাদের।
অধরা মাহিরকে অনেক পছন্দ করে। কিন্তু মাহির এসব পাত্তা দেয় না। যতোই সুন্দরী হোক না কেনো—সে এসব ছ্যাঁচড়া স্বভাবের মেয়ে পছন্দ করে না। অনেকবার অধরাকে রিজেক্ট করেছে কিন্তু তারপরও তার পিছু ছাড়ে না। এসব নিয়ে লামিয়া বেশ বিরক্ত।
অধরা সামনে এসে দাঁড়িয়ে গাঁয়ে থাকা শার্টটা টেনে ক্যাপটা ঠিক করে গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু বলার আগেই লামিয়া নাকে হাত দিয়ে বললো

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

– এই তায়েব তায়েবা মাহির, পঁচা গন্ধ আসছে কোথা থেকে?
তায়েবা নাকে হাত দিয়ে তায়েবের দিকে তাকিয়ে বললো
– তুই আবার বায়ু দূষণ করেছিস নাকি?
তায়েব রেগে বললো
– এসব কি বলছিস! আমি বায়ু দূষণ করবো কেনো?
লামিয়া সামনে ফিরে অধরাকে বললো
– গাঁয়ে কি মেখে এসেছিস? ছিঃ! গন্ধে পুরো ভার্সিটি ছড়িয়ে গিয়েছে।
অধরা ভ্রু কুঁচকে নিজের শরীরের ঘ্রাণ নিলো। কোথায়! না তো তার শরীরের তো কোনো গন্ধ নেই।
সামনে তাকাতেই দেখলো মাহির, তায়েব, তায়েবা, লামিয়া কথা বলতে বলতে চলে যাচ্ছে মাঠের দিকে।
তাকে ইগনোর করলো ভেবেই দৌড়ে আবার তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহির কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো

– কি সমস্যা তোর? এইভাবে বারবার পথ আটকাচ্ছিস কেনো?
অধরা আরো একটু সামনে এসে মাহিরের শার্টের উপরের বোতামে হাত রেখে বোতাম খুলতে যাবে তার আগেই লামিয়া থাবা দিয়ে অধরার হাত ধরলো।
অধরা রেগে গেলো মনে হলো। ঝাড়া দিয়ে লামিয়ার থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে দূরে সরে দাঁড়ালো।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো – এটা কি তোর জামাই পেয়েছিস যে এই ভরা মাঠে তুই ওর বোতাম খুলছিস? এটা কেমন অসভ্যতা।
বলেই মাহিরের কাঁধে হাত রাখলো।
লামিয়া মাহিরের কাঁধে হাত রাখতেই অধরা রেগে গিয়ে বললো

– মাহির, তুই কেনো বারবার এমন দূরে সরিয়ে দিস আমাকে? আমি তোকে ভীষণ ভালোবাসি। আর সবসময় লামিয়া আমাদের মাঝে কথা কেনো বলে?
মাহির বিরক্ত হয়ে বললো
– কিন্তু আমি তোকে ভালোবাসি না। তাই বারবার বিরক্ত করতে আসিস না। সবসময় তোকে দেখলে আমার বিরক্ত লাগে। আর ওও আমার বোন আমার বোন বলবে না তো কে বলবে?
লামিয়া, তায়েব, তায়েবা হেঁসে উঠলো। লামিয়ার হাসি যেনো অধরার শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। এই লামিয়াকে দেখতে পারে না সে। একদম সহ্য করতে পারে না লামিয়াকে। অনেকের কাছে শুনেছে মাহিরের সাথে নাকি লামিয়ার কোনো সম্পর্ক আছে। তার জন্য আরো দেখতে পারে না তাকে।
তাই অধরা রেগে বললো

– কেনো ভালোবাসিস না? এই লামিয়ার জন্য? কি আছে এই কালো মেয়ের মধ্যে যা আমার মধ্যে নেই?
মাহির এবার বেশ রেগে গেলো। অধরা কি বলতে চাইছে সেটা সে ভালো করে বুঝতে পারছে। লামিয়া চুপচাপ তাকিয়ে আছে অধরার দিকে।
মাহির রেগে বললো
– মুখ সামলে কথা বল অধরা। আমার বোন হয়।
অধরা বাঁকা হেঁসে বললো
– মুখ সামলে কথা বলবো? কেনো? সারাদিন তোরা চিপকে থাকিস একজন আরেকজনের সাথে। মনে করিস কিছু বুঝি না? আর বোন হয় আপন বোন তো আর না, চাচাতো বোন। তোদের মধ্যে কিছু নেই এটাও মানতে হবে? এক ছাদের নিচে থাকিস, এক বিছানায় থাকিস না তার কি গ্যারান্টি আ…
আর কিছু বলতে পারলো না।
লামিয়া কাঁধ থেকে গিটার নামিয়ে অধরার কপাল বরাবর বারি বসিয়ে দিলো।
অধরা ব্যথায় ঘাসে পড়ে আছে।
লামিয়া চিৎকার করে উঠলো

– আর একটা নোংরা কথা বললে তোর জিহ্বা আমি ছিঁড়ে ফেলবো। আমার ভাই বোনদের বা আমার চরিত্র নিয়ে একটা উল্টো পাল্টা কথা বলার সাহস কে দিয়েছে তোকে?
বলেই মুখ বরাবর লাথি মারলো। তায়েব, তায়েবা, মাহির আটকালো তারাতাড়ি করে।
এই মারামারির কথা চলে গেছে টিচার কক্ষে। একজন টিচার ততক্ষণে দৌড়ে এসে অধরাকে দেখে তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে গেলো।
আর অফিস কক্ষে লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহিরকে ডেকে পাঠানো হলো।
লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির বিরক্ত হয়ে টিচার কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখলো প্রিন্সিপাল আর একজন ম্যাম একবারে পাশ ঘেঁষে হাত ধরে বসে আছে। মাহিররা ঢুকতেই তাঁরা তাড়াতাড়ি করে হাত ছেড়ে দিলো। তা দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মাহিররা। তারপর বাঁকা হেঁসে লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা ভিতরে প্রবেশ করেই চেয়ারে আড়াম করে বসলো।
তা দেখে প্রিন্সিপাল ধমকে বললো

– তোমাদের বসার পারমিশন দিয়েছি আমি?
লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির একসাথে হাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভেঙে তাকালো প্রিন্সিপালের দিকে। তারপর তায়েব মলিন কণ্ঠে বললো
– সরি স্যার, আসলে আমরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। বাতের ব্যথা আছে আমাদের।
লামিয়া কোমড় ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো
– হ্যাঁ স্যার, সাথে কোমড় ব্যথা ফ্রি।
তায়েবা নিজের ওড়না দিয়ে নাক মুছে কান্নার অভিনয় করে বললো
– স্যার, বুড়ো হয়ে যাচ্ছি তো তাই দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ কষ্ট হয়।
পাশ থেকে ম্যাম তেজি স্বরে বলে উঠলেন
– এসব কেমন অভদ্রতা! টিচারদের সামনে বসে বেয়াদবি করছো তোমরা?
মাহির বাঁকা হেঁসে বললো

– প্রিন্সিপালের পাশে স্টুডেন্টদের সামনে বসে টেবিলের আড়ালে প্রিন্সিপালের পায়ের উপর পা রেখে এক্কা দোক্কা খেলাটাও কিন্তু ম্যাম, অসভ্যতামি।
মাহিরের কথা শুনে প্রিন্সিপাল দ্রুত পা সরিয়ে নিলো, ম্যামের পায়ের উপর থেকে।
তায়েব, তায়েবা, লামিয়া হেঁসে উঠলো।
প্রিন্সিপাল ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো মাহিরের দিকে। এ ছেলে দেখলো কীভাবে!
মাহির প্রিন্সিপালের দৃষ্টি বুঝে হেঁসে উঠলো
– আরে স্যার, কুল কুল ভয় পাবেন না। আমি হয়তো জানলাম কিভাবে ভাবছেন? আরে, আমাদের চার ভাইবোনের মধ্যে আল্লাহ অনেক প্রতিভা দিয়ে পাঠিয়েছে, যেটা আমরা দেখাই না। কিন্তু আপনি ভয় পাবেন না, আমরা কিছু দেখিনি।
বলেই লামিয়া তায়েব তায়েবার দিকে তাকিয়ে বললো

– কিছু দেখেছিস তোরা।
তারা তিনজন ভদ্রভাবে মাথা নাড়ালো মানে তারা কিছু দেখে নি।
– এই ছেলে তখন থেকে কী উল্টো পাল্টা বলছে? স্যার, আপনি চুপ করে বসে আছেন কেনো? ওদের গার্ডিয়ান ডাকুন। তোমাদের বাবাদের নম্বর দাও, আমি কল করবো। – বেশ রেগে বললো ম্যাম।
লামিয়া হাই তুলে বললো
– সরি ম্যাম, আমার বাবা বিবাহিত নম্বর দেওয়া যাবে না। আর আপনার হাব ভাব সুবিধার না নম্বর দিলে পড়ে দেখবো আমার মায়ের সংসারে আগুন জ্বলছে।
ম্যাম রক্তবর্ণ চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে।
প্রিন্সিপাল স্যার চুপচাপ নম্বর খাতা বের করে কল করলো হামিদ সাহেবের নম্বরে। সে জানে তারা ইসলাম বাড়ির ছেলে-মেয়ে—এক একটা ডাকাত। তাই তাদের কিছু না বলে তাদের গার্ডিয়ানের সাথে কথা বললেই ভালো হবে।
মিটিং রুমে বসে আছে সবাই, সাথে নাসির কায়সার ও। তাদের মিটিংয়ের মাঝে হামিদ সাহেবের ফোন আসতেই সবাই বিরক্ত হলো। ফোনের স্ক্রিনে প্রিন্সিপালের নাম দেখে ভ্রু কুঁচকে হাশিম আর আজমির সাহেবের দিকে তাকালো। তারাও তার দিকে তাকালো।
আজমির সাহেব বললেন

– কে কল করেছে মেজো ভাই?
হামিদ সাহেব চিন্তিত গলায় বললো
– ভার্সিটি থেকে প্রিন্সিপাল কল করেছে।
হামিদ সাহেবের কথা শুনে সবাই ভ্রু কুঁচকে ফেললো।
রাশেদ কপালে হাত দিয়ে হালকা হেসে উঠলো।
শারমিন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখলো প্রিয় মানুষটিকে হাঁসি।
হামিদ সাহেব ফোন তুলতেই প্রিন্সিপাল সবকিছু জানালো। দ্রুত তাদের যেতে বলেছে ভার্সিটিতে। ফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবাইকে বললো

– আজকের মিটিং কালকে হবে। এখনই ভার্সিটিতে যেতে হবে। ওই চার বানরের কার জানি মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে।
হামিদ সাহেবের কথা শুনে সবাই বেশ চিন্তিত হয়ে গেলো। যদি কোনো কিছু হয়ে যায় তখন কী হবে! তাই রাশেদ, হামিদ, হাশিম, আজমির আর লাবিব যেতে নিলেই কায়সার উঠে দাঁড়িয়ে বললো
– চলুন, আমিও যাবো আপনাদের সাথে।
– না না, তোমার যেতে হবে না। আমরা সামলে নেবো। বললো হাশিম।
– আরে না না, সমস্যা নেই। চলুন।
কায়সার কে আর কেউ মানা করলো না। তাকে নিয়েই রওনা দিলো।

– স্যার, নেহা ম্যাম আসছে আজ লন্ডন থেকে।
কথাটা শুনে শুভ্র ভ্রু কুঁচকে ফেললো। গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো
— কেনো?
— তা জানি না স্যার, কিন্তু এইটুকু জানি, এখন থেকে এখানে থেকে আমাদের সাথে কাজ করবেন।
শুভ্র চুপচাপ শুনলো আর কিছু বললো না। তারপর নিজের কালো হুডি পড়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেলো।

গাড়ি থামলো ভার্সিটির গেটের সামনে। হামিদ, হাশিম, আজমির সাহেব তাড়াহুড়ো করে হাঁটছে প্রিন্সিপালের রুমের দিকে। তাদের পিছনে পিছনে রাশেদ, লাবিব আর কায়সার আসছে। রাশেদের কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই সে দিব্যি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তা দেখে লাবিব বিরক্ত হয়ে বললো —

— ওরা এতো বড় ব্যাপার হয়ে গেছে, আর তোমার কোনো চিন্তা দেখছি না কেনো?
রাশেদ হেঁসে লাবিবের কাঁধে হাত রেখে বললো
— আমি আমার ভাইবোনদের চিনি। ওরা অকারণে কিছু করবে না বা কাউকে কিছু বলবে না। নিশ্চয়ই ওই মেয়ে কিছু করেছে, না হলে লামিয়া ওর কপাল ফাটাতো না।
লাবিব ভ্রু কুঁচকে তাকালো রাশেদের দিকে। তা দেখে রাশেদ হেসে উঠলো।
কায়সার সব শুনে বাঁকা হেঁসে আস্তে করে বললো
— ভেরি ডেঞ্জারাস, আই লাইক ইট।
হামিদ, হাশিম, আজমির, রাশেদ, লাবিব, কায়সার রুমে প্রবেশ করতেই সবাই হা করে চেয়ে রইল।
চেয়ারে উপর পায়ের উপর পা তুলে চারজন গেমস খেলছে; আর তাদের সামনেই প্রিন্সিপাল আর ম্যাম রেগে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রিন্সিপাল হাশিম, হামিদ, আজমির সাহেবকে দেখে চোখ-মুখ শক্ত করে বললো

— আসুন আসুন, প্লিজ দেখুন আপনাদের গুণধর ছেলেমেয়েগুলো! একজনের মাথা ফাটিয়ে কী সুন্দর প্রিন্সিপালের রুমে বসে পায়ের উপর পা তুলে আছে। দেখুন।
লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা প্রিন্সিপালের কথায় দরজার দিকে তাকাতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। দরজার মধ্যে দিয়ে একে একে সবাই কক্ষে প্রবেশ করলো।
হামিদ কড়া চোখে চারজনকে দেখলো।
প্রিন্সিপাল হাসিম, হামিদ, আজমির সাহেব কে চেয়ারে বসতে বললে তারা বসলো। তাদের পিছনে চারজন দাঁড়ালো। তাদের পাশে রাশেদ, লাবিব, কায়সার দাঁড়ালো। কায়সার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো তার রাতের ঘুম চুরি করা শ্যামবর্ণের মেয়েটাকে।
লামিয়া চোখ ঘুরিয়ে পাশে তাকালেই কায়সার কে দেখে চোখ কুঁচকে ফেললো তারপর আবার সামনে তাকালো।
প্রিন্সিপাল সোজা চাহনি দিয়ে হামিদ সাহেবের দিকে বললো
— আপনার মেয়ে কত বড় ক্রাইম করেছে, জানেন আপনি? এখন যদি ওই মেয়ের কিছু হয় । এর দায় কে নিবে?
হামিদ সাহেব খুব শান্ত গলায় বললো

— দেখুন, আমি যতটুকু আমার মেয়েকে চিনি, সে অকারণে কাউকে কিছু বলবে না। নিশ্চয়ই ওই মেয়েটি আগে ওদের কিছু করেছে।
লামিয়া বড় বড় করে তাকালো । মাহির, তায়েব, তায়েবা অবাক হয়ে দেখলো, হামিদ সাহেব কি শান্তভাবে কথা বলছেন। অন্য সময় হলে তো লামিয়া প্রিন্সিপাল স্যারের কথা শুনেই তৎক্ষণাৎ চড় বসাতো।
প্রিন্সিপাল ভ্রু কুঁচকে বললো
— আপনি বলতে চাইছেন আপনার মেয়ে কোনো কারণে মেরেছে?
হামিদ সাহেব মাথা নাড়িয়ে বললো

— হ্যাঁ, আমার মেয়ে কোনো না কোনো কারণে মেরেছে; আর যদি প্রমাণ দিতে পারেন যে আমার মেয়ে অকারণে মেরেছে, তাহলে আমি নিজ হাতে আমার মেয়েকে শাস্তি দিবো। ওই মেয়েটিকে নিয়ে আসুন, দু’পক্ষের কথা শুনবো, তারপর কার দোষ আগে পরে, তখন দেখা হবে।
হামিদ সাহেবের কথা শুনে প্রিন্সিপাল আর ম্যামের মুখ চুপসে গেলো।
কিছুক্ষণ পর অধরাকে নিয়ে এলো তার কিছু ফ্রেন্ড সার্কেল ধরে।
অধরা দেখা মাত্রই হাশিম সাহেব বেশ বিরক্ত হলো।কিন্তু প্রকাশ করলো না। সে জানে এই মেয়ে তার ছেলেকে ভালোবাসে এবং বিয়ে করতে চায়, আর কেনো ওই কথাও সবাই জানে।
হামিদ সাহেব অধরাকে জিজ্ঞেস করলেন

—কি হয়েছিলো সব বলো।‌
অধরা প্রথম থেকেই সব দোষ লামিয়া ওদের ওপর চাপাতে লাগলো। লামিয়া রেগে অধরার দিকে তেড়ে গেলেই লাবিব হাত ধরে ধরলো।
লামিয়া রেগে বললো
— ছাড়ুন! লাবিব ভাই, ওর মিথ্যা বলা বাহির করছি। সাহস থাকলে সত্যটা বল। মিথ্যার আড়ালে লুকাচ্ছিস কেন?
হামিদ সাহেব লামিয়াকে ধমক দিলেই লামিয়া চুপ হয়ে গেলো।
হামিদ সাহেব অধরার পাশে থাকা মেয়েটিকে বললেন
— তখন তোমরা ওখানেই ছিলে, তাই না?
মেয়েটি ভয়ে মাথা নাড়ালো।

— গুড। এখন বলো কি হয়েছে আর দোষ কার আগে ছিল? সত্যি করে বল—মিথ্যা বললে খুব খারাপ হবে।
মেয়েটি ভয় পেয়ে গলগল করে সব বলে দিলো দোষ অধরার ওই আগে ওদের পথ আটকিয়ে ছিলো আর এটাও বললো লামিয়া আর মাহিরকে নিয়ে নোংরা কথাও বলা হয়েছে। তাই লামিয়া ওর গায়ে হাত তুলেছে।
এই কথা শুনে হাশিম সাহেব আর শান্ত থাকতে পারলেন না।
তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা দুষ্টুমি করলেও অন্তত তারা ভাই বোনদের অনেক সম্মান স্নেহ করে । কোনো খারাপ বা নোংরা কোনো কাজ করতেই পারে না। আজ পর্যন্ত কেউ বলে নি। আর তাদের নামে নোংরা কথা বলার সাহস অধরার মতো মেয়েটা দেখালো এটাই হজম হয়নি।
হাশিম সাহেব লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো

— ওর কপাল ফাটানো টা উচিত হয়নি তোর। তোর উচিত ছিলো হাত-পা ভেঙ্গে দেওয়ার । দ্বিতীয়বার আর এমন ভুল করবি না। আগে ইচ্ছে মতো দিয়ে নিবি তারপর যা হবে আমি দেখে নিবো।
হাশিম সাহেবের কথায় প্রিন্সিপাল, ম্যাম, অধরা সবাই বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো।
লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবার মুখে হাসি ফুটলো।
হামিদ সাহেব প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে বললো
— এখন অন্তত আপনি বুঝতে পেরেছেন কার দোষ। আর আমার মেয়ে অকারণে গাঁয়ে হাত তুলেনি। এখন তাকে কী শাস্তি দিবেন, এটা আপনার ইচ্ছে। আর হ্যাঁ দ্বিতীয়বার আগে যাচাই-বাছাই করে দোষ দিবেন। আসি।
বলেই বেরিয়ে গেলেন।
তায়েব, তায়েবা, মাহির, লামিয়া হাত কপালে তুলে লম্বা সালাম জানিয়ে বললো

— আপনারা এখন এক্কা দোক্কা খেলতে পারেন, আমরা আসি স্যার আবার দেখা হবে।
বলেই বেরিয়ে গেলো।
লাবিব ভ্রু কুঁচকে বললো
— এক্কা দোক্কা মানে?
লামিয়া হেঁসে উত্তর দিলো
— আরে লাবিব ভাই, এক্কা দোক্কা বুঝেন না? আপনি তো এই দুনিয়ার সবচেয়ে ইনোসেন্ট ছেলে আপনাকে তো জাদুঘরে রাখা উচিত।
বলেই হেসে উঠলো সাথে রাশেদ, তায়েব, তায়েবা, মাহিরও। কায়সার মুচকি হাসলো।
গাড়ির সামনে আসতেই লামিয়া হামিদ সাহেবকে নিচু গলায় বললো

— বাবা, একটা কথা বলবো।
হামিদ সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন
— হ্যাঁ বলো।
— আমার গিটারটা ভেঙে গেছে, বাবা। পরশুদিন গানের প্রোগ্রাম আছে একটা গিটার কিনে দিবে?
হামিদ সাহেব কিছু বলার আগে হাশিম সাহেব হেসে বললেন
— চল, আজ তোকে আমি গিটার কিনে দিবো। চল আমার সাথে।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৮ (২)

লামিয়ার চোখ চকচক করে উঠলো। হাশিম সাহেব তায়েব, তায়েবা, লামিয়া, মাহিরকে নিয়ে মার্কেটের দিকে রওনা দিলো।
হামিদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন।
কায়সার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লামিয়ার দিকে। মিনমিন করে বললো
– আজকে ও ঘুম হবে না এই মেয়ের জন্য। বলেই ঠোঁট কামড়ে হাসলো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ২০