Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৬

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৬

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৬
সাইদা মুন

— স্টপ! আর একটা কথা বললে এক ধাক্কায় ব্রিজ থেকে ফেলে দিবো এবার…

তাহসানের ধমক যেন কানেই নিল না মেয়েটি। ধমককে তোয়াক্কা না করে আরও জোরে বলে উঠল,
— আরে আপনি বেঁচে আছেন, আল্লাহই বাঁচাইছে। এই আপনিও কি আমার মতো আত্মহত্যা করতে এসেছেন? আমি তো পড়ার চাপে মরতে এসেছি, কিন্তু আপনি?
কথা বলতে বলতেই সে তাহসানকে ভালো করে পরখ করে।

— আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে অনেক বড়। হয়তো ভার্সিটিতে পড়েন। আপনিও কি পড়ার চাপেই মরতে এসেছেন? ভার্সিটির পড়া কি আরও কঠিন? আমি তো ভেবেছিলাম ভার্সিটিতে পড়াই নেই।
তাহসান বিরক্তিতে ‘চ্’ উচ্চারণ করে ওঠে। একে তো গায়ের ব্যথা, তার উপর মেয়েটার এই অবিরাম বকবক, মাথাও ব্যথা ধরছে যেন।
মেয়েটির নজর এবার বাইকের দিকে যায়। সামনের অংশের একদম ধ্বংস হওয়া অবস্থা দেখে আফসোসের সুরে বলে উঠল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— নিজে মরবেন মরবেন, বাইকটাকে নিয়ে মরতে আসলেন কেনো? ইশ্ আমার কত দিনের সখ একটা বাইক…
— চুপপপ!
তাহসানের রাম ধমক খেয়ে তনিমা কেঁপে ওঠে। বুঝতে পারে বেশিই কথা বলে ফেলছে। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের উপর আঙুল চেপে চুপ করে যায়। তাহসান যে বেশ রেগেছে।
এবার যখন তাকায়, তাহসানের দিকে ভালো করে নজর যেতেই মেয়েটির ভীষণ মায়া হয়। ছেলেটা ঠিকমতো নড়তেও পারছে না, ব্যথায় শরীর কাঁপছে। কপাল দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। এভাবে চললে যে কোনো সময় সেন্সলেস হয়ে যেতে পারে।
ভাবতেই টনক নড়ে। আর কিছু না ভেবে আশেপাশে তাকায়। এই খালি রাস্তায় কি-ই বা পাবে। তারপর নিজের গায়ের ওড়নার কোনা টেনে ছিঁড়তে লাগে সাথে বিরবির করছে,

— শা*লার কপাল! ভেবেছিলাম একদিন আমি গুণ্ডাদের হাতে পড়বো, তখন আমার হিরোর এন্ট্রি হবে। আমাকে বাচাঁতে ফাইট করবে। বাংলা সিনেমার মতো তার কপাল ফাটবে, আর আমি নিজের ওড়না ছিঁড়ে বেঁধে দেবো। আর আমার সুন্দর কন্ঠে গান ধরব,
সাথী তুমি আমার জীবনে…
সাথী তুমি আমার মরণে…
একটু থেমে আফসোসের শ্বাস ফেলে বলল,

—কিন্তু এই লোকটা সব ভেস্তে দিলো। আবার আমাকে বাঁচাতে নয়, যেন মেরে ফেলতে এসেছে। মাই গড…
এসব বলতে বলতে সে ওড়না ছিঁড়তে চেষ্টা করেই যাচ্ছে। কিন্তু হাত দিয়ে টেনে পারছে না। এদিকে তাহসান চোখ বন্ধ করে পরে আছে। শরীরে একটু বল আসলে উঠবে এই আশায়। আর বারবার তালহা মেহরীনের একসঙ্গের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসছে। তার ভাবনার মাঝেই মেয়েটির কণ্ঠ ভেসে আসে,

—এই যে শুনছেন, আমি না ওড়নাটা ছিঁড়তে পারছি না। আপনার দাঁত দিয়ে একটু ছিঁড়ে দিন না?
তাহসানের মাথা যেন আরও ধরতে শুরু করেছে। একে শরীরে শক্তি নেই, আর এই মেয়ে তাকে দাঁত দিয়ে ওড়না ছিঁড়তে বলছে। কমনসেন্স কি খেয়ে বসেছে। রাগে চোখ মেলে তাকাতেই, গরম হওয়া লাল চোখ দেখে মেয়েটি ঢোঁক গিলে সাথে সাথে বোকা হাসি দিয়ে বলে উঠে,
—হে হে.. ইয়ে মানে সরি, ভুলেই গেছিলাম আমারও দাঁত আছে। নো নিড, নো নিড। আমার দাঁত দিয়েই কাজ চালাচ্ছি।
তারপর নিজের দাঁত দিয়ে ওড়নার সাইড ছিঁড়ে নেয়। তারপর ওড়নাটা নিয়ে তাহসানের দিকে এগিয়ে আসে। কোনো কথা না বলেই তার কপাল বাঁধতে শুরু করে। হঠাৎ স্পর্শে তাহসান দ্রুত চোখ খুলে তাকায়। তার তাকানো দেখে তনিমা তড়িঘড়ি বলে,

—প্লিজ, ষাড়ের মতো চিল্লাচিল্লি পরে করেন, আপাতত মাথাটা একটু তুলুন।
তাহসানও বেশি কথা না বাড়িয়ে মাথা হালকা উপরে তুলতেই মেয়েটি কাপড় কপালে পেচিয়ে পেছনের দিকে বেঁধে দেয়। তারপর কোনোমতে তাহসানকে টেনে রাস্তার ধার ঘেঁষে বসায়। মেয়েটি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেছে, একা একটা লোককে কীভাবে সামলাবে! ছেড়েও যেতে পারছে না মানবতার খাতিরে। এই এলাকায় মানুষের আনাগোনা নেই, চারপাশ নীরব। অবশ্য এতো রাতে কেই বা থাকবে।

কি করবে চিন্তা করতে করতে উঠে এদিক-ওদিক দেখতে লাগে। কিছুক্ষন পর হঠাৎ একটা রিকশার দেখা মেলে। তাদের থেকে অনেকটা দূরেই রিকশাটা, তবে এদিকেই আসছে। রিকশায় একজন প্যাসেঞ্জারও আছে। তা দেখতেই মেয়েটির চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে, আশার আলো খুজে পায়। তাদের থেকে সাহায্য চাইতে সামনের দিকে ছুটে যায়। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে ইশারা করে রিকশা এখানে এসে থামানোর জন্য।

এমনটার মাঝেই হঠাৎ রিকশাটআ আরেকটু কাছে আসতেই পেছনের সিটে চোখ পড়ে তনিমার। দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা তবে হিজাব নিকাব পড়া এক মহিলাই বসে আছে। তা দেখতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায়। চোরের মন পুলিশ পুলিশ ডেকে উঠে। হঠাৎ যেন তার মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে। তবে কি হোস্টেল থেকে পালিয়ে এসেছে সবাই জানাজানি হয়ে গেছে। তার মা তাকে খুজতেই কি তবে এসেছে। ভয়ে মেয়েটি সোজা পিছু হয়ে এক ছুটে গিয়ে তাহসানের পাশ ঘেঁষে বসে তার শার্টের হাতা টেনে ধরে, মাথা তার হাতের আড়ালে নিয়ে মুখ লুকানোর চেষ্টা করছে। একদিকে শরীরের জ্বালা, তার উপর উটকো ঝামেলার মতো মেয়েটি ঘেষাঘেষি করছে। সব মিলিয়ে চটে ওঠে তাহসান। নিঃশক্তি শরীর নিয়েও ঝাঁরা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করে চিল্লিয়ে ওঠে,

—এই মেয়ে! সমস্যা কি তোমার? তখন থেকে মাথা খেয়ে যাচ্ছো, এখন আবার টাচ, সরো…
বাকিটুকু বলার আগেই তনিমা নিজেকে আড়াল করতে মিনমিনিয়ে আকুতির স্বরে বলে উঠল,
—প্লিজ, প্লিজ, একটু এভাবে থাকতে দিন। ওই রিকশায় আমার আম্মু আছে মেভি। দেখলে তো আমি শেষ। আজকে আমার সত্যি ইন্না-লিল্লাহ হয়ে যাবে।
তাহসান তার কথা শুনে সেদিকে তাকাতেই দেখল রাস্তায় একটি রিকশা, যা তাদের দিকে আসছে। রিকশা থেমে যেতেই ড্রাইভার ও পেছনের মহিলাটি দ্রুত এগিয়ে আসে তাদের দিকে। পায়ের শব্দে তনিমা আরও গুটিয়ে বসে, পারলে যেন তাহসানের ভেতরে ঢুকে যেতো।
মহিলাটি চিন্তিত কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

—এক্সিডেন্ট হয়েছে তো মনে হচ্ছে। আরে, তোমরা এভাবে বসে আছো কেনো? এখনি ছেলেটিকে মেডিকেলে নিতে হবে।
তার কথা কানে আসতেই তনিমা দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। কণ্ঠটা তার মায়ের নয়, মহিলাটিকে দেখতেই ফুঁস করে শ্বাস ফেলে। বুকের ভেতর থেকে ভয়টা যেন বেরিয়ে এসেছে। না, এইটা তার মা নয়, এতোক্ষণ সে কিনা মনে করেছিল এটা তার মা, ভাবতেই নিজেকে তিরস্কার করে বলল,
—ছি তনিমা, ছিইই! সেইম ওন ইউ। কেমন মেয়ে নিজের মাকেই চিনিস না। আম্মু জানলে নিশ্চয় দুইটা জুতার বারি গালে এসে পড়ত।
নিজে নিজে বকবক করছে সে, ওদিকে তাহসানকে রিকশাওয়ালা ও সেই মহিলা ধরে কোনোরকমে রিকশায় তুলে। আর তনিমাকে দাঁড়িয়ে বিরবির করতে দেখে মহিলাটি দ্রুত এসে বলল,

—কি ভাবছো মেয়ে? উঠো তুমি রিকশায়।
মহিলাটির কথায় ভাবনা থেকে বেরিয়ে সেও কিছু না ভেবে তাহসানের পাশে উঠে বসে। মহিলাটি তাহসানকে ভালোভাবে ধরে নিয়ে যেতে বলে দেয়, আর রিকশাওয়ালাকে মেডিকেলে পৌঁছে দিতে বলে ভাড়া দিয়ে নিজে হাঁটা শুরু করে। তাদের জন্য উনি বাকি রাস্তা হেঁটে বাড়ি যাবেন, আবার ভাড়াও মিটিয়ে দিয়েছেন, ভেবে তনিমা তাকে ধন্যবাদ বলতে ভোলে না। এরকম মানুষ সত্যিই এখন বিরল, যারা নিঃস্বার্থভাবে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ায়। কারণ আজকালকার এই দুনিয়ায় বেশিরভাগ মানুষই নিজের প্রয়োজন, নিজের সুবিধা, নিজের লাভকে আগে দেখে। তবে এখনো নিজের স্বার্থ, আরাম সবকিছুকে পাশে সরিয়ে কিছু মানুষ অন্যের পাশে দাঁড়ায়। এমন মানুষই আসলে সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে, আর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা আর সহানুভূতি এখনও বেঁচে আছে।

এরমধ্যে রিকশা চলতে শুরু করেছে। তনিমা তো বাইকের চিন্তায় প্রায় বেহুশ, অর্ধেক রাস্তা জুড়েই বকবক করেছে, বাইকটা রেখে চলে এসেছে, চোর যদি নিয়ে নেয়, বাইকটা কে নিয়ে যাবে, সত্যি যদি চোরের হাতে পরে, নানান কথা মেয়েটা বলেই যাচ্ছে। এদিকে তাহসানের কপালে বাধা কাপড় বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, ছেলেটা আস্তে আস্তে একদম নেতিয়ে পড়ছে। একসময় নিজের ভারসাম্য রাখতে না পেরে তনিমার কাঁধে মাথা ফেলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির মুখের কথা থেমে যায়। হঠাৎ যেন তার সারা শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠেছে, অচেনা এক স্পর্শ, তীব্র গরম কিছু যেন মেয়েলি মনকে আছড়ে ধরেছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ছোঁয়া, আর সে এক কিশোরি, এরকম প্রতিক্রিয়া হওয়াটাই স্বাভাবিক।
তাহসান মাথা ফেলে ভার সামলাতে না পেরে আস্তে বলে ওঠে,

—আ’ম সরি.. আমি রাখতে চাইনি। বাট শরীরে শক্তি পাচ্ছি না। নিজের মাথাটুকুও বিশাল ভারি লাগছে।
তার অসহায় কণ্ঠ শুনে তনিমার ভীষণ খারাপ লাগে। সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—সমস্যা নেই, আমি কিছু মনে করিনি। বুঝতে পারছি আপনার অবস্থা।
তা শুনে তাহসান চুপ হয়ে যায়। পথ যেন শেষই হচ্ছে না। যদিও এখান থেকে মেডিকেল খুব দূরে নয়। আবার তাহসানের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে এতো রাতে একটা মেয়ে একা ব্রিজে কি করছিলো। আর কিছুক্ষনের আগের মহিলাটি তার মা হলে, মেয়েটিকে অচেনা ছেলের সাথে পাঠালো কেনো। নানান প্রশ্ন মাথায় খেলতেই হঠাৎ সন্দেহ নিয়ে তাহসান প্রশ্ন করল,

—উনি তোমার আম্মু ছিলো?
তার কথা শুনে তনিমা হালকা হেসে উঠে। মাথা এদিক-ওদিক ঝাঁকিয়ে বলল,
—না না।
—তো?
—আরে কাহিনি হলো, আমি যখন কাউকে না জানিয়ে কোনো কুকাম করতে বের হই, তখন রাস্তায় যেই মহিলাকেই দেখি তারেই মায়ের মতো লাগে। বুঝেনি ভেতরের ভয় হে হে…।
মেয়েটি একটু বেশি কথা বলে। ভীষণ দুষ্টু প্রকৃতিরও যা তার কথায় বোঝা যায়। তার কথায় হালকা হেসে উঠে তাহসান। তবে হাসতে গিয়েও যেন মাথায় চাপ লেগে উঠে, তীব্র যন্ত্রণা “আহহ..” শব্দ করে উঠতেই। চিন্তিত হয়ে তনিমা রিকশা ওয়ালাকে তাড়া দিতে থাকে। এর প্রায় পাঁচ মিনিটের মাথায় রিকশা এসে থামে মেডিকেলের সামনে। ইমারজেন্সিতে নিতেই দু’জন স্টাফ দৌড়ে আসে। তাকে ধরে নিয়ে শোয়ানো হয় স্ট্রেচারে। তৎক্ষণাৎ ইমারজেন্সিতে থাকা ডাক্তরটা এগিয়ে আসে। তাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করে, তার হাত-পা ও কপালের চোটে ড্রেসিং করানো হয়। রোগীর শরীরের অবস্থা খারাপ দেখে তাকে তৎক্ষনাৎ সেলাইন দেওয়া হয়। এসব করতে করতে বেজে যায় প্রায় ছয়টা।

শেষমেশ এবার তাকে একটা ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। সঙ্গে তনিমাও। বেচারি নিজে মরতে এসে এমন জায়গায় ফেসে গেলো। তাহসানের পিছে তারই দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। ওয়ার্ডে আসতেই আশেপাশে চোখ বোলায়, চারদিকে অনেক রোগী সাথে তাদের পরিবারের লোকজন। সকলেই ঘুমিয়ে আছে। ঘুমাবেই না কেনো রাত পেরিয়ে সকাল হতে চললো। তাহসানও ঘুমিয়ে আছে, তাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। যখন পরিবারের কাউকে কল দিতে বলে, তখন তনিমা চুপসে যায়। তাহসানের সঙ্গে কোনো মোবাইলও নেই। আর সে তাদের কারো নাম্বার কিভাবে জানবে! তাই তাদের বলে, রোগী সজাগ হলে সে নিজেই দেবে।

মেয়েটা ভয়ে গুটিয়ে আছে, একা কত কি করবে! এখন তো সে হোস্টেলে ফিরতেও পারবে না, ধরা খাবে, তার আব্বু জানবে। এমনেও সে ওই হোস্টেলে আর থাকতে চায় না। আবার তাহসানকে দেখে তার মনে কিছুটা মায়াও লাগে, লোকটার সঙ্গে কেউ নেই দেখে ভেবেচিন্তে নিজেই থেকে যায়। চুপচাপ বসে আছে তাহসানের বেডের পাশের ছোট টুলে। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে। একসময় সজাগ না থাকতে পেরে টুলে বসেই বেডে মাথা ফেলে। তখনি ঘুমে তলিয়ে যায় মেয়েটি।

সকাল ৮:০০টা বাজে।
সিকদার বাড়ির সবাই একে একে টেবিলে বসছে, আর গিন্নিরা নাস্তা পরিবেশন করছে। তালহা বসে আছে চাচাদের সামনে। চাচাদের একের পর এক প্রশ্নে তার মুখটা বিরক্ত হয়ে উঠেছে। সকাল থেকে বা হাতটা এমন ব্যথা করছে যে নড়াতেই পারছে না। ফুলে গিয়ে টনটন করছে। এর ওপর চলছে প্রশ্নের ঝড়, কি হয়েছে, কেমনে হয়েছে, আবার কোনো ভারি কিছু আলগিয়েছে নাকি!

সে তো আর বলতে পারছে না, পিচ্চি বউয়ের সোহাগেই হাতের এই দশা। বউটাকে আলগাতেই হাতের ব্যথা আরও বেড়েছে। পিরিত করার সময় তো মনে ছিলনা, যে হাতটা পরে এমন ব্যথা দেবে। তা তো মোটেও মাথায় আসেনি। তাই কোনো রকমে এড়িয়ে চলছে সব প্রশ্ন। এরমধ্যে নিচে নেমে আসে তাহিয়া আর মেহরীন। চাচাদের এত প্রশ্ন শুনে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই তাহিয়া বলে ওঠে,
—কি ব্যাপার, ঘটনা কি? আমাকে রেখে কি হলো?

তার গলা পেয়ে তালহা সেদিক তাকাতেই চোখে পড়ে মেহরীনকে। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই মেহরীন লজ্জায় মুচকি হেসে উঠল। তবে সে হাসি বেশিক্ষন থাকল না, তালহা চোখের ইশারায় কিছু বলছে। মেহরীন বুঝতে না পেরে ভ্রু কুচকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, “কি?”। তালহা আবার ইশারায় নিজের পাশের চেয়ারের দিকে ইশারা করল। যখন বুঝলো তালহা তার পাশে বসতে বলছে। তাতে সে চোখ বড় বড় করে “না!” বোঝাতে মাথা দুদিকে নাড়ে। কিন্তু তালহা চোখ গরম করে তাকাতেই বেচারি বিপাকে পড়ে যায়। না বসলে সে রাগ করবে। আবার বসলে কে কি ভাববে। এসব ভাবনায় বসতেও পারছে না, আবার তালহা বলছে বসতে। শেষে তার রাগী দৃষ্টি ফেলতে না পেরে আমতা আমতা করে গিয়ে তার পাশে বসে পড়ল।
এরমধ্যে তাহিয়ার চাচ্চু বলতে থাকেন,

—আর বলিস না মা, তোর ভাইয়ের হাতের অবস্থা দেখ। হাত নাড়াতেও পারছে না। কত করে বলেছি, দুইদিন বাসায় রেস্ট নে। কিন্তু শুনলোই না, উল্টো অফিসে গেছে। এখন হাতের এই অবস্থা!
চাচ্চুর কথা মাঝপথে থামিয়ে তালহা বলে উঠল,
—আহ চাচ্চু, অফিসে যাওয়া নিয়ে কিছু হয়নি। কিছু হলেই কাজে ফাঁকি দিতে বলো, বিরক্ত লাগে।
—কাজের জন্য না হলে তো হাতের এই অবস্থা হলো কি করে?
তালহা আড়চোখে তাকায় মেহরীনের দিকে। মেহরীন তার হাতের দিকে করুণ চোখে চেয়ে আছে। সে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে, কাল রাতে অতক্ষণ তাকে আঁকড়ে থাকার ফলেই এমন অবস্থা হয়েছে হাতের। ভীষণ গিল্টি ফিল করছে মেয়েটি।

—রাতে পানির বালতি উঠিয়েছিলাম, তাই একটু ব্যথা বেড়েছে।
তালহার কথা শুনতেই মেহরীন দ্রুত চোখ তুলে তাকায়। দেখে সে মিটিমিটি হেসে তাকিয়ে আছে। সেই দুষ্টু হাসিটা যে তাকে খোঁচা দিয়েই, বুঝতে সময় লাগল না মেহরীনের। কাল রাতের কথা ফের মনে পড়তেই নাকে-মুখে কাশি উঠে যায় বেচারির। তাড়াহুড়ো করে চোখ সরিয়ে নেয়।
তাকে এভাবে কাশতে দেখে তানিয়া বেগম তাড়াতাড়ি পানি এগিয়ে দিলেন। পাশ থেকে তিতলি বেগম মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগেন। পানি খেয়ে একটু শান্ত হতেই জিজ্ঞেস করলেন,

—ঠিক আছিস তো?
মেহরীন মাথা নেড়ে উত্তর দিতে যাবে, ঠিক তখনই টেবিলের নিচে পায়ে কারো স্পর্শ পায়। সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে তাকাতেই দেখে তালহা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে খাচ্ছে। যেন কিছুই করছে না। অথচ সে তার পায়ে পা দিয়ে স্লাইড করছে। লোকটা তাকে এভাবে জব্দ করছে ভাবতেও পারছে না। লজ্জাশরমে আবারও কাশি উঠে যায়।
তা দেখে তিতলি বেগম চিন্তিত হয়ে উঠলেন,
—এতো কাশছে মেয়েটা। তালহা, সময় করে ডাক্তার দেখিয়ে আনিস তো। ঠান্ডা লাগিয়েছে নিশ্চয়।
তালহা মাথা নেড়ে গম্ভীর গলায় উত্তর দেয়,
—আচ্ছা, ভালো একটা প্রাইভেট ডাক্তার দেখাবো। সব রোগ ঠিক হয়ে যাবে।
মেহরীন মাথা নিচু করে আছে, এ নতুন তালহাকে হজম করতে পারছে না৷ এদিকে তাহিয়া সন্দেহের চোখে তাকিয়ে তার দিকে। মেয়েটা প্রতিদিন তার পাশে বসে, আর আজ সরাসরি তার ভাইয়ের পাশে? “ডাল মে কুছ কালা হে” মনে মনে ভেবে চুপচাপ খেতে থাকে সে।

খাওয়ার মাঝে তালহা একবার মেহরীনের প্লেটের দিকে তাকায়। একটা ছোট্ট মাংসের পিস আর কয়েকচামচ ঝোল নিয়ে পরোটা খাচ্ছে মেয়েটি। মেয়েটা যেন খাবার নিতে গেলে মেপে মেপে নেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের পাতে তরকারি নেওয়ার বাহানায় সকলের আড়ালে দু’টুকরো মাংস তার পাতে তুলে দিল। তা দেখে মেহরীন আটকাতে গেলে, তালহা কড়া চোখে তাকাতেই। মেয়েটা চুপ হয়ে যায়।
মেহরীন কোনোরকমে খাবার গিলছে। তালহার পাশে বসা যেন আজ বিশাল ভুল হয়ে গেছে। দেখতে যত ভদ্র আর গম্ভীর, কাজকর্ম যেন ততই বেয়াদব মার্কা। লোকটা কি এক রাতেই পুরো বদমাইশ হয়ে গেলো নাকি। একটু পর পর এটা-ওটা তুলে দিচ্ছে খেতে, আর টেবিলের নিচ দিয়ে পায়ে স্লাইড করছে। এক এক করে জ্বালিয়ে যাচ্ছে।

—তাহসানকে দেখেছিস কেউ? সকাল থেকে দেখছি না ছেলেটাকে। কখন বের হয়ে গেলো বলেও গেলো না।
তিতলি বেগমের কথায় তালহা কপাল কুঁচকে তাকায়,
—তাহসান বাসায় নেই?
—না।
—বলে যায়নি?
—না তো। কেউ জানিও না কখন বেরিয়েছে। আবার মোবাইলটাও রেখে গেছে। হয়তো নিতে ভুলে গেছে।
টুকটাক কথা বলতে বলতে সকলে খেতে ব্যস্ত।
এরমধ্যে তালহার মোবাইলে বড় মামার কল আসে। সে রিসিভ করে সালাম দেয়,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৫

—আসসালামু আলাইকুম বড় মামা, কেমন আছো?
কিন্তু ওদিকে থেকে কান্না মেশানো গলা ভেসে আসে। তার বড় মামি কাঁদছে। তালহা ভড়কে গিয়ে হাতে থাকা খাবার মুখে নিতে গিয়েও আটকে যায়। চিন্তিত গলায় দ্রুত প্রশ্ন করল,
—কি হয়েছে মামি? কাঁদছো কেনো? কি হয়েছে বলো তো! সবাই ঠিক আছে..?

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৭