প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৮ (২)
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
রাত ফুরিয়ে সকাল প্রায় দশটা বেজে চল্লিশ মিনিট।
বাড়ির কর্তারা সবাই চলে গিয়েছে অফিসে। প্রায় এক ঘন্টার মতো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বাড়ির বাচ্চাদের ডাকছে লতিফা বেগম। আজ একজন ও আসে নি সকালে নাস্তার টেবিলে নাস্তা খেতে। কারণ আজকে সকালে ভাত রান্না করা হয়েছে। আর এই বাড়িতে সব জমিদারের বাচ্চারা থাকে তাই তাদের গলা দিয়ে সকাল সকাল ভাত নামে না। তাদের সকালে রুটি পরোটা, ডিম, তরকারি চাই।
লতিফা বেগম বেশ কিছুক্ষণ কিছুক্ষণ ডাকার পর কারোর সারা শব্দ না পেয়ে, ঝাড়ু হাতে চললো সিঁড়ির দিকে।
প্রথমেই রাশেদের রুমে প্রবেশ করতেই দেখলো চিত হয়ে শুয়ে আছে পাশেই শুভ্র তাঁর বিড়াল নিয়ে বসে আছে। লতিফা বেগমকে দেখে শুভ্র হালকা হেঁসে দাঁড়িয়ে বললো
– মেজমা আপনি এখানে??
লতিফা বেগম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো শুভ্রর দিকে। শুভ্রর কথা শুনে রাশেদ মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখলো লতিফা বেগম হাতে ঝাটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদ লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসতেই ধাম করে ঝাটার বারি পড়লো রাশেদের পিঠে।
রাশেদ পিঠে হাত দিয়ে অসহায় চোখে তাকালো লতিফা বেগমের দিকে। লতিফা বেগম রেগে বললেন
– জমিদারের বাচ্চারা তোদের খেতে কয়বার ডেকেছি??আরো একটা বারি খাওয়ার আগে তাড়াতাড়ি উঠে নিচে যা ।
রাশেদ কোনো কথা না বলে ভয়ে দ্রুত দৌড়ে বাহিরে চলে গেলো। লতিফা বেগম রাশেদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্র হালকা হেঁসে তাকিয়ে আছে তার দিকে। লতিফা বেগম রাগি গলায় বললো
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
– তোকে ও কী বারি বসিয়ে পাঠাতে হবে নিচে নাকি এমনি এমনি যাবি??
শুভ্র লতিফা বেগমের কথায় হেঁসে পা বাড়ালো রুমের বাহিরে।
একে একে সবাইকে একটা করে ঝাটার বারি মেরে রুম থেকে বের করলো লতিফা বেগম।
সবাই মুখ লটকে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
লামিয়ার রুমের দরজা খুলতেই লতিফা বেগম চোখ বড় বড় করে ফেললো।
লামিয়া বিছানায় শুয়ে আছে তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে জ্যাকি। আবার কুকুর কে বাড়ির ভেতরে ঢুকিয়েছে আবার নিজের রুমের একবারে বিছানায় শুয়েছে দেখে লতিফা বেগম এইবার ভীষণ রেগে গেলো।
অবশ্য জ্যাকি কে প্রতিদিন ই গোসল করিয়ে পরিষ্কার করে জামা পড়িয়ে রাখা হয়। তবুও লতিফা বেগমের এসব একদম পছন্দ নয়। লতিফা বেগম রেগে চিৎকার করে উঠলো।
লতিফা বেগমের চিৎকার শুনে মাহির, তায়েবা, তায়েব, রাশেদ, আরিফ, লামহা, হামিদা, শুভ্র দৌড়ে লামিয়ার দরজায় উঁকি মারতেই চোখ বড় বড় করে ফেললো।
তায়েব মুখে হাত রেখে বললো
– আব তু গেয়া বেটা রুক দেখ তু তো গেয়া।
সকালেই নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছিলো লামিয়া। হঠাৎ এমন ভয়ঙ্কর চিৎকার শুনে লামিয়া ধরফর করে ঘুম থেকে উঠে বসেতেই দেখলো লতিফা বেগম ভয়ংকর রেগে তাকিয়ে আছে তার দিকে। লামিয়া কিছুক্ষণ এক ধ্যানে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সে কী এমন করেছে যে এমন রেগে গিয়েছে তাঁর মা জননী।
মায়ের থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখলো জ্যাকি গুটি সুটি মেরে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
সকালে নামাজ পড়ে বাগানে বাতাস খেতে যাওয়ার পর জ্যাকি কে দেখে ভয়ে ভয়ে তাঁর সাথে রুমে নিয়ে এসেছে। লতিফা বেগম দেখলে তার আর রক্ষে নেই। ভেবেছিলো কেউ দেখার আগে বাগানে দিয় আসবে। কিন্তু এখন তা আর হলো কোথায়। কথায় আছে না যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়।
লামিয়া এসব ভেবে ঢোঁক গিলে লতিফা বেগমের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকিয়ে ক্যাবলা হাঁসি দিয়ে বললো
– ওহে মা জননী, এতো উত্তেজিত হবেন না। আর যখন তখন এমন ভয়ঙ্কর চিৎকার করবেন না। আমি অবুঝ নাদান এক বালিকা যদি কিছু হয়ে যায় তখন তো এই দুনিয়া থেকে একজন ভালো লয়াল দয়াল এবং একজন সৎ হবু উকিল হারিয়ে যাবে। তাই নাআআ মা জননী।
লতিফা বেগম লামিয়ার কথা শুনে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস নিলেন। তারপর চোখ খুলে ঝাটা টা হাতে থেকে পাশে রেখে উড়না কোমড়ে গুঁজে চুল গুলো খোঁপা করতে থাকলেন।
মায়ের মতিগতি সুবিধার না তা লামিয়া খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো। পাশ থেকে আস্তে করে উড়না শরীরে দিয়ে দ্রুত বিছানার অপর পাশ দিয়ে নেমে দরজা থেকে সবাইকে ধাক্কা দিয়ে দৌড় দিলো। তার পিছন পিছন জ্যাকি ও দৌড় দিলো লেজ নাড়াতে নাড়াতে।
লতিফা বেগম চিৎকার করে বলে উঠলো
– লামিয়া দৌড়াবি না দাঁড়া বলছি নয়তো তোর খবর আছে। বলেই সে ও দৌড়।
– না দাঁড়ালেও তুমি যে আমার বিটিভি চ্যানেলের খবর করে ফেলবে । তাই দাঁড়াবো না। দৌড়াতে দৌড়াতে বললো লামিয়া।
– আমাদের পিঠে ঝাটার বারি পড়েছে ওর পিঠে না পড়লে কেমন দেখায় না ছোট্ট ভাই। বলেই তায়েব মন খারাপ করে তাকালো আরিফের দিকে।
– হ্যাঁ তাই তো সবার জন্য আইন সমান। তাই ওর ও মার খেতে হবে। বলেই আরিফ দৌড় দিলো নিচের দিকে।
– তুই আবার কোথায় যাচ্ছিস? পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললো রাশেদ।
– আইন সমান করতে। দৌড়াতে দৌড়াতে বললো আরিফ।
আরিফের কথা শুনে সবাই সয়তানি হেঁসে দৌড়াতে লাগালো নিচের দিকে।
শুভ্র ও তাদের পিছন পিছন আসলো।
হল রুমের সোফার চারদিকে ঘুরছে লামিয়া তার পিছন পিছন লতিফা বেগম।
– মা মা প্লিজ আমাকে মেরো না ভুল হয়ে গিয়েছে।
– কয়বার ভুল হয় বোঝা আমারে?
– প্লিজ মা এইবারের মতো ক্ষেমা করে দাও।
– অনেক ক্ষমা করেছি আর না, দৌড়াবি না এখানে আয় বলছি।
জ্যাকি ঘেউ ঘেউ করতে করতে বসে বসে লেজ নাড়ছে।
তাদের চেঁচামেচি তে রাশেদা, তাহমিনা, মনিরা বেগম ও বেরিয়ে এলেন নিজেদের রুম থেকে।
লামিয়া রাদেশা কে দেখে দৌড়ে রাশেদার পিছনে যেয়ে লুকালো। লতিফা বেগম কোমড়ে হাত রেখে রাগি গলায় বললেন
– বেরিয়ে আয় বলছি নয়তো আরো বেশি মার খাবি।
রাশেদা বেগম জা কে বোঝাচ্ছে কিন্তু লতিফা বেগম কিছুতেই বুঝবে না আজ।
হঠাৎ পিছন থেকে লামিয়া কে ঠেসে ধরলো আরিফ।
লামিয়া পিছন তাকিয়ে আরিফ কে বললো
– এভাবে ধরেছো কেনো ছাড়ো আমাকে।
আরিফ লামিয়ার দিকে তাকিয়ে সয়তানি হাঁসি দিয়ে বললো
– উঁহু, আমরাও মার খেয়েছি আর এই বাড়িতে সবার জন্য আইন সমান।
বলেই লতিফা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো
– মেজ মা তাড়াতাড়ি কয়েকটা দিয়ে আইন সমান করো।
আরিফের কথা শুনে লামিয়া রেগে আরিফের হাতে জোড়ে কামড়ে ধরলো। আরিফ ব্যাথায় চেঁচিয়ে উঠলো। হাতের বাঁধন আলগা হতেই লামিয়া ফুরুত করে আবার দৌড় দিয়ে বললো
– ছোট্ট ভাই হিসাব টা তোলা থাকলো।
লামিয়া দৌড় দিতেই সামনে তাকিয়ে দেখলো হামিদা, তায়েব, তায়েবা, মাহির, লামহা, রাশেদ তাকে ধরার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
লামিয়া তা দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো
– ওও সব রসুনের হো*গা এক হয়েছে বাহ্ বাহ্ চমৎকার।
তায়েব বলে উঠলো
– দেখ লামিয়া ধরা দিয়ে দে নয়তো আমরা তোকে জোড় করে মেজমার কাছে দিবো।
লামিয়া তায়েবের কথায় ভ্রু উঁচিয়ে শুনলো কিছু বলার আগে রাশেদ থাবা দিয়ে ধরলো লামিয়ার হাত।
লামিয়া ছোটাছুটি করতেই হাতে মোচড় লাগতেই আহ্ করে ব্যাথায় চোখমুখ কুঁচকে ফেললো।
শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে রাশেদের দিকে ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে রাশেদের পিঠ খামচে ধরলো।
রাশেদ দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা হজম করে লামিয়ার হাত ছেড়ে দিলো।
ততক্ষণে লতিফা বেগম এসে লামিয়ার হাত ধরে ফেলতেই লামিয়া ভয়ে দাঁড়িয়ে গেলো।
লাতিফা বেগ ঝাটা হাতে নিয়ে বারি মারতেই তার কামিজের অংশে টান পড়তেই মাথা নিচু করে দেখলো জ্যাকি তাঁর কামিজের অংশ কামড়ে ধরে আছে।
মায়াবী চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখ দিয়ে যেনো বলছে ওকে মেরো না।
লতিফা বেগম জ্যাকির দিকে তাকিয়ে আবার লামিয়ার দিকে তাকালো তারপর লামিয়া কে ছেঁড়ে কিছু না বলে কড়া গলায় সবাই কে বললো
– সব গুলো সোফায় বস আমি খাবার আনছি। এজন ও যদি আমার কথার নড়চড় করেছিস তখন দেখিস কী করি।
বলেই চলে গেলো রান্নাঘরের। লতিফা বেগম যেতেই লামিয়া বাঁকা চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বললো
-হিসাব টা তুলে রাখলাম সময় হলে নিয়ে নিবো। বলেই মুখ ঝামটা দিয়ে সোফায় যেয়ে বসলো।
তায়েব কপাল কুঁচকে মিনমিনে গলায় বললো
– আইন সমান সমান হলো না।
বলেই মুখ বাঁকিয়ে সেও সোফায় এসে বসলো।
রাশেদ বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে সেই কখন থেকে শুভ্রর দিকে। শুভ্র রাশেদ কে চোখ রাঙিয়ে চলে গেলো সোফায়।
একে একে সবাই লাইন ধরে বসে আছে সোফায়।
কিছুক্ষণ পর লতিফা বেগম ইয়া বড় একটা বোলে ভাত নিয়ে আসলো বেশি করে।
গরুর মাংসের তরকারি দিয়ে মেখে একে একে সবাইকে খাইয়ে দিলো। লামিয়ার পাশে শুভ্র বসেছে।
তায়েবকে খাইয়ে দেওয়ার পর লামিয়াকে খাইয়ে দেওয়ার পালা। তাই লামিয়া হা করতেই লতিফা বেগম ভাতের লোকমা শুভ্রর মুখে পুরে দিলেন।
তা দেখে সবাই হেঁসে উঠলো।
লামিয়া অবাক হয়ে তাকালো মায়ের পাণে। অসহায় চোখে লতিফা বেগমের দিকে তাকাতেই লতিফা বেগম লামিয়ার মুখের সামনে ভাত তুলে দিতেই লামিয়া মুখ ফুলিয়ে ভাত মুখে পুরে নিলো।
হঠাৎ কো কো কো কো কো কোলা গান ভেসে আসতেই সবাই চোখ তুলে সিঁড়ির দিকে তাকাতেই সব গুলো বিষম খেলো। মাহিরের মুখ থেকে ছিটকে ভাত পড়ে গেলো।
রাশেদ মুখে ভাত নিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে। আরিফ হা করে থাকতে থাকতে মুখের ভাত মুখ থেকে নিচে পড়ে গিয়েছে। ওই দিকে হামিদা খকখক করে কেশে উঠলো। লামহার মুখে কোনো রিয়েক্ট নেই সে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে ভাত চিবাচ্ছে।
ততক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে গানের তালে তালে নাচতে নাচতে নেমে এলো আজমেরী বেগম। পড়নে তার গেঞ্জি আর
জিন্স প্যান্ট মাথায় লামিয়ার কালো ক্যাপ , পায়ে তার শু জুতো, ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপস্টিক, মুখ দেখে মনে হচ্ছে পুরো পাউডার এর ডিব্বা মুখে দিয়ে এসেছে
কানে ইয়া বড় ঝুমকা, হাতে ছোট্ট মিডিয়াম সাইজের একটা সাউন্ড সিস্টেম বক্স। সেখান থেকেই কো কো কো কো গান ভেসে আসছে।
সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আজমেরী বেগম নিচে নেমে এসেই গানের তালে তালে নাচতে লাগলো আর গান মিলিয়ে বলতে লাগলো
টো টো টো টো টো টো টলা, আইগে মেরে, পাইছে মেরে লারকি পুনন্টরা চোলা, টো টো টো টো টো টো টলা।
তার গান শুনে এবার সবাই মনে হতে আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে চলে গিয়েছে।
এতো জোড়ে গান বাজাচ্ছে কে তা দেখতে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলো রাশেদা, তাহমিনা, মনিরা বেগম।
তাদের শাশুড়ির এই অবস্থা দেখে তাঁরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে।
লতিফা বেগমের চোখের পলক ফেলতে মনে হয় কষ্ট হচ্ছে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাঁর শাশুড়ির দিকে।
এই দিকে আজমেরী বেগমের গান শুনে তায়েব চেঁচিয়ে বলে উঠলো
– হাই সর্বনাশ দাদী তুমি দেখি গানের হো*গা, পা*ছা মেরে দিয়েছো। ভাগ্যিস গানের গাইকা নেহা শুনে নি শুনলে হয়তো সে নিজের বামে আগুন লাগিয়ে দিতো।
তায়েবের কথা শুনে সবাই চোখ গরম করে তাকালো তার দিকে। মা চাচিরা এখানে আছে সে কী ভুলে গিয়েছে। সব ভাই বোনদের এমন চোখ গরম দেখে তায়েব চুপ হয়ে গেলো।
রাশেদা বেগম বিরক্ত কন্ঠে বললো
– আম্মা এসব কী শুরু করছেন বাচ্চাদের সামনে?
রাশেদা বেগমের কথা শুনে আজমেরী বেগম বিরক্ত হলো। গান বন্ধ করে বলে উঠলো
– ইউ ফেকিং মাউথ বড় বউ, ইউ অনকালাচার। এটা হেকিং পেকিং নক সাং তুমি কী বুঝবা?
শাশুড়ির কথায় বেশ বিরক্ত হলো রাশেদা বেগম। এই মহিলার মাথায় সমস্যা আছে একদম নিশ্চিত। মাথায় সমস্যা না থাকলে কেউ এই বয়সে এসে এমন করে। এক রাশ বিরক্তি নিয়ে চলে গেলো রান্নাঘরের।
আজমেরী বেগম তা দেখে ভেংচি কেটে শুভ্রর দিকে তাকালো।
শুভ্র বেচারা পানি খাচ্ছিলো। আজমেরী বেগম কে এমন ভাবে দেখে তাঁর গলায় ভাত আটকে গিয়েছিলো। তাই গলার ভাত নামানোর জন্য পানি খাচ্ছিলো।
আজমেরী বেগম শুভ্র দিকে তাকিয়ে পান খাওয়া দাঁত বের করে হাঁসি দিয়ে হঠাৎ শুভ্রর কাঁধে হাত রাখতেই শুভ্র চমকে মুখের পানি ছিটকে ফেললো লামিয়ার উপর।
তা দেখে সবাই হো হো করে হেঁসে উঠলো। লামিয়া দাঁতে দাঁত চেপে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্র অসহায় চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে। সে ইচ্ছে করে করেনি।
আজমেরী বেগম শুভ্রর গাল টেনে দিয়ে আচমকা গালে চুমু বসিয়ে দিলো।
সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকালো আজমেরী বেগমের দিকে। আচমকা এমন হওয়াতে শুভ্র ভরকে গেলো।
নিজের দাদীর এমন কান্ডে লামিয়া তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। কেন জ্বলে উঠলো তা সে জানে না কিন্তু দাদীর এমন কান্ডে তার বেশ রাগ হলো। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নিলো।
আজমেরী বেগম হঠাৎ বলে উঠলো
– আয় নাতি আয় একটা কপাল টান্স দেই।
জীবনে শুভ্র ভয় পেয়েছে কি না জানে না কিন্তু আজমেরী বেগমের এমন কান্ডে আজ বেশ ভয় পাচ্ছে শুভ্র।
পাশ থেকে সবাই মুখ চেপে হাসছে। শুভ্রর ভয়ার্ত চেহারা দেখে লতিফা বেগম এইবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না ফিক করে হেসে উঠলো।
তারপর নিজেকে সামলে বলে উঠলো
– আম্মা ছাড়ুন ওকে, ভয় পাচ্ছে ছেলেটা। এটা কেমন মজা ছাড়ুন ওকে।
আজমেরী বেগম হেঁসে বলে উঠলো
– আগে কতো এমন….. বলেই আর কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারলো না। লতিফা বেগম চোখ দিয়ে কিছু ইশারা করতেই চুপ হয়ে গেলো।
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো – আগে কতো এমন কী দাদী বলো চুপ হয়ে গেলে কেনো??
আজমেরী বেগম কথা পাল্টে বলে উঠলো
– আরে ছেমড়ি আগে কতো চুমা দিছি তোগো রে ভুইলা গেছোছ?
তারপর একটু থেমে বললো – হুন সবাই আমি নাচ শিকতাছি হামিদা আর লামহার বিয়ায় নাচুম দেইখা। হিংকি পংকি টান্স বুঝছোস। দাঁড়া তোগো একটা নাচ দেখাই।
বলেই হাতে থাকা সাউন্ড বক্সে গান চালু করতেই দেখলো গান চলছে না। আজমেরী বেগম বিরক্ত হয়ে বললো
– দেখছোস চার্জ যাওয়ার সময় আর পাইলো না। দাঁড়া মুখে কই তোগো।
বলেই গলা পরিষ্কার করে গেয়ে উঠলো
– দুম্বা চলে দুম্বা চলে দুম দুম দুমদুম দুমমম হেই হেই দুম্বা চলে দুম্বা চলে দুম দুমদুম দুমমম।
বলেই নাচতে লাগলো।
তা দেখে সবাই হেঁসে উঠলো। লতিফা বেগম হেঁসে সবাইকে একে একে ভাত খাওয়াতে লাগলো।
সময়টা সন্ধ্যা ছয়টা,
রাশেদের রুমে গোল করে বসে আছে ইসলাম ও খান বাড়ির ছেলেমেয়েরা। সবাই প্লান করছে কীভাবে কীভাবে বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে এবং বউকে তুলে আনবে। প্লান মাফিক সবাইকে বুঝিয়ে দিতেই সবাই বুঝে যে যার মতো তৈরি হতে চলে গেলো।
ছেলেরা সবাই ইন করে সাদা শার্ট , কালো প্যান্ট।
আর মেয়েরা সবাই কালো কামিজ পড়েছে। এদিকে লামিয়া তন্নতন্ন করে খুঁজেও কালো কামিজের দেখা মেলে নি। তাই আলমারি থেকে নতুন কালো এর মধ্যে গোল্ডেন এর কাজ করা ধুতি সেট বের করে পড়ে নিলো। কোমড় ছেঁড়ে যাওয়া চুল গুলো বেণী করে কালো ফিতে দিয়ে বেঁধে দিলো। এক হাতে গোল্ডেন রঙের ঘড়ি, আর আরেক হাতে চুড়ি পড়লো, ঠোঁটে লিপবাম লাগিয়ে উড়না গাঁয়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই ভাবলো কাজল পড়লে মন্দ হয়না। যে ভাবা সেই কাজ চোখে হালকা কালো কাজল পড়ে নিলো।
পায়ে নাগড়া জুতো পড়ে সে একদম রেডি হয়ে রুম থেকে বের হতেই দেখা হলো লাবিবের সাথে।
লাবিব লামিয়া দিকে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লামিয়ার দিকে লামিয়া তা দেখে লাবিবের মুখের সামনে তুরি মারতেই লাবিবের হুস ফিরলো।
– ক্যাবলার মতো হা করে আমাকে দেখে শেষ হলে রাস্তা ছাড়ুন আমি যাবো।
লাবিব লামিয়ার কথায় সরে দাঁড়ালো। লামিয়া মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো।
লাবিব লামিয়ার চলে যাবার দিকে তাকিয়ে আনমনেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বুকে হাত চেপে চোখ বন্ধ করে বলে উঠলো
– ফিরে আয় আবার আমার কাছে, তোকে ছাড়া থাকতে বদ্দ কষ্ট হয় আমার।
বলেই চোখ থেকে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। লাবিব হাতের উল্টো দিক দিয়ে চোখ মুছে নিচের দিকে হাঁটা ধরলো।
হল রুম বসে আছে সবাই। লামিয়া সিঁড়ি বেয়ে নামতেই
রাশেদ লামিয়া কে বলে উঠলো
– লামু আমার ফোন টা ঘরে রেখে এসেছি নিয়ে আয়।
লামিয়া এক রাশ বিরক্তি নিয়ে পা বাড়ালো রাশেদের রুমের দিকে। রুমে গিয়ে আশেপাশে না তাকিয়ে রাশেদের ফোন খুঁজতে খুঁজতে গুন গুন করতে লাগলো লামিয়া। বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অগ্নি চোখে রাগি গলায় কাউকে শাসিয়ে ফোনে কথা বলছিলো শুভ্র। হঠাৎ কাঁচের চুড়ি ঝুনঝুন শব্দ শুনে বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে রুমে তাকালো শুভ্র। লামিয়া কে দেখে অগ্নি চোখ ধীরে ধীরে শান্ত হলো। হালকা দমকা গরম হাওয়া যেনো শুভ্রর শরীর ছুঁয়ে গেলো।
শুভ্র মুহূর্তেই ঘেমে উঠলো। শুকনো ঢোক গিলে ঠোঁট গুলো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নরমাল হতে চাইলো কিন্তু এই মেয়েকে দেখে নরমাল হওয়াটা মুশকিল।
চুড়ির ঝনঝন শব্দে যেনো আরো মাতাল করে দিচ্ছে শুভ্র কে।
লামিয়া ফোন খুঁজতে খুঁজতে চোখ ঘুরিয়ে বারান্দার দিকে তাকাতেই আতংকে উঠলো। তারপর বুকে থুতু দিয়ে বললো
– মুখে কি কথা নাই?? নাকি কথা বলতে পারেন না?
শুভ্র লামিয়ার কথা কানে না নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
তা দেখে লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো
– কথা কানে যায় না?? যখন দেখি তখন ই চুপচাপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, হাসতে বা কান্না করতে জানেন না?? আর এইভাবে ভুতের মতো দাঁড়িয়ে থাকার মানে কী??
শুভ্র এক পা দু পা করে এগিয়ে আসতে আসতে বললো
– হাসতে ও পারি কাঁদতে ও পারি, পারি তো অনেক কিছুই কিন্তু করি না। তবে আপনি যদি চান তাহলে করে দেখাতে পারি।
– কী দেখাবেন?
– আপনি যা চাইবেন মিস!
– এভাবে কাছে আসছেন কেনো? বলেই লামিয়া এক পা দু পা পিছিয়ে যেতে লাগলো।
– আমি কাছে যেতে চাই না কিন্তু!
– কিন্তু কী? ভ্রু কুঁচকে লামিয়া বললো।
– কিন্তু আমাকে আপনার কাছে টানছে।
– ভুলে গিয়েছেন সেদিন রাতের কথা?
– উহু , সেদিন রাতের কথা কীভাবে ভুলবো বলেন তো মিস? সেই মধুর রাত কী ভোলার মতো।
বলেই বাঁকা হাসলো শুভ্র।
– মধুর রাত মানে কী বলতে চান?
লামিয়া এক পা দু করে পিছিয়ে আসতে আসতে একদম ড্রেসিং টেবিলের সাথে এসে বারি খেলো। পিছন ঘুরে দেখলো পিছনে যাবার আর জায়গা নেই। সামনে তাকাতেই দেখলো শুভ্র তার একদম মুখের সামনে এসে পড়েছে।
লামিয়া কিছু বলার আগেই শুভ্র লামিয়ার চোখের লেপ্টানো কাজল আঙুল দিয়ে মুছে কানের পিছনে দিয়ে দিলো। শুভ্রর এমন কান্ডে লামিয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।
শুভ্র ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
তা দেখে লামিয়া শুকনো ঢোক গিললো।
হার্ট টা মনে হয় এখনি লাফাতে লাফাতে বাহিরে বের হয়ে আসবে। এই লোক সামনে আসলেই লামিয়ার সব শক্তি, সাহস সব ধুলোয় মিশে যায়। লামিয়া শুভ্রর দিকে ভালো করে খেয়াল করে দেখলো অস্বাভাবিক ভাবে ঘামছে শুভ্র। লামিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো
– আ.. আপনি এমন ঘামছেন কেনো??
শুভ্র হাত বাড়িয়ে লামিয়ার সামনে থাকা এলোমেলো চুল গুলো কানের পিছনে গুজে দিয়ে একটু ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো
– ঘামছি না বরং ধ্বংস হচ্ছি। আপনার এই আয়োজনে আমি ধ্বংস হচ্ছি তা কী বুঝতে পারছেন না? আমাকে ধ্বংস করতে আজকে এতো আয়োজন মিস?
শুভ্রর এমন ফিসফিস কন্ঠে লামিয়া কেঁপে উঠলো। শুভ্র তা খেয়াল করলো।
লামিয়া শুকনো ঢোক গিলে আবারো কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো
– স.. সরুন প্লিজ, আমার ভালো লাগছে না।
– ভালো আমার ও লাগছে না, কী করি বলেন তো?
বেশ ঘোর লাগা কন্ঠে বলে উঠলো শুভ্র।
– যা ইচ্ছে করুন কিন্তু সামনে থেকে সরুন নয়তো ভালো হবে না।
– কী করবেন??
– কামড়ে দিবো আমি সরুন বলছি।
বলেই শুভ্রর বুকে ধাক্কা দিলো কিন্তু শুভ্র এক চুল ও নড়লো না। উল্টো লামিয়ার দু হাত চেপে ধরলো।
লামিয়া ছটফট করে উঠলো। তার অস্বস্তি লাগছে। শুভ্র কে আজ অন্যরকম লাগছে। লামিয়া উপায় নেই পেয়ে সত্যি শুভ্রর হাত কামড়ে ধরলো। শুভ্র তা দেখে বাঁকা হেঁসে বললো
– ছোট্ট বাচ্চাদের মতো হাতে কামড়া কামড়ি কেন করছেন মিস?
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া শুভ্রর হাত ছেঁড়ে দিয়ে বললো
– ছাড়ুন আমার হাত আর সরুন আমি যাবো।
– কীভাবে যেতে দেই বলেন তো? আমাকে যে কামড়েছেন সেটা ফিরিয়ে দিয়ে নেই। আমি আবার কারোর ঋণ রাখি না।
বলেই হুট করেই লামিয়ার গলায় মুখ গুঁজে কামড়ে ধরলো লামিয়ার গলা। হঠাৎ এমন হওয়ায় লামিয়া থ মেরে রইল কিছুক্ষণ। হঠাৎ ব্যাথা অনুভব হতেই লামিয়া ছটফট করে উঠলো। ধাক্কা দিয়ে ও সরাতে পারলো না শুভ্র কে। দাঁতে দাঁত চেপে জোড়ে ধাক্কা দিতেই শুভ্র ছেঁড়ে দিলো লামিয়া কে।
লামিয়া রেগে কিছু বলার আগেই রাশেদ কিছু বলতে বলতে ঘরে ঢুকতেই শুভ্র আর লামিয়া কে দেখে থমকে গেলো।
লামিয়া রেগে শুভ্র কে ধাক্কা দিয়ে চোখ দিয়ে শাসিয়ে চলে গেলো।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৮
শুভ্র তা দেখে হেঁসে উঠলো। তারপর রাশেদের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো।
রাশেদ লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শুভ্র কে বলে উঠলো
– আমার কী দোষ ভাই?? আমি কী জানতাম তোরা এখানে মারামারি করছিস?? সব বাদ দিয়ে এখন তাড়াতাড়ি নিচে আয়। বলেই আলমারি থেকে ফোন বের করে হাঁটতে লাগলো দুইজন।
