প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৯
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
রাত প্রায় এগারোটা,
বেশ চিন্তিত পায়ে হল রুমে পায়চারি করছে হামিদ সাহেব। গম্ভীর মুখে সোফায় বসে আছে খান ও ইসলাম বাড়ির সদস্যরা । এখনো তাদের ছেলে মেয়েরা বাড়ি ফিরে নি। এতো রাত হয়েছে তবুও তাদের ফেরার নাম গন্ধ নেই কোনো বিপদ আপদ হলো নাকি এ ভেবে বেশি টেনশন করছে সবাই। হঠাৎ পায়চারি বন্ধ করে বুকে হাত চেপে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন হামিদ সাহেব।
তা দেখে সবাই আতংকে উঠলো। লতিফা বেগম দৌড়ে গিয়ে স্বামীকে ধরলেন। আনিসুল সাহেব হামিদ সাহেব কে ধরে নিয়ে সোফায় বসালেন। রাশেদা বেগম পাশ থেকে পানি নিয়ে হামিদ সাহেব কে দিতেই হামিদ সাহেব তা পান করলেন।
আজমেরী বেগম বেশ চিন্তিত গলায় বললেন
– রাশেদের ফোনে আবার কল দিয়া দেখ ধরে নাকি।
আনিসুল সাহেব আজমেরী বেগমের কথায় আবারো কল করলেন তবুও ফোন ধরছে না দেখে চিন্তা আরো বেরে গেলো।
এদিকে হামিদ সাহেব লামিয়া কে নিয়ে ভাবছে। তাঁর বড় দুই মেয়ে কে নিয়ে টেনশন না থাকলেও ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে তাঁর সবসময় টেনশনে থাকতে হয়।
এমনেই মেয়েটার উপর মানুষ লেগেছে তাঁকে মারার জন্য, তাঁর উপর দুবার হামলা হয়েছে। শুভ্র অবশ্যই তাঁর সাথে আছে তবুও তাঁর মন মানছে না।
হামিদ সাহেব অস্থির গলায় বলে উঠলো
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
– বড় ভাই চলুন আমরা ওদের খুঁজতে যাই।
ছোট্ট ভায়ের কথা শুনে আনিসুল সাহেব বিরক্ত মুখ বললো
– তুই শান্ত হ আগে, আর ওরা তো বাচ্চা না তাছাড়া রাশেদ ওরা সবাই আছে এতো টেনশন করিস না দেখবি একটু পর এসে যাবে।
বলতে বলতেই বাড়ির গেট দিয়ে রাশেদের গাড়ির প্রবেশ করার পর পর ই বাইক আরো গাড়ি এসে প্রবেশ করলো।
তা দেখে আনিসুল সাহেব বলে উঠলো
– দেখেছিস বলেছি না এসে পড়বে।
গাড়ি দেখে সবাই স্বস্তি শ্বাস ফেললো। লতিফা বেগম রেগে গিয়ে কিছু বলার আগেই দরজার দিকে তাকাতেই আতংকে উঠলো।
সবাই বেশ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।
রাশেদের কাঁধে লামিয়া ভর করে হল রুমে উপস্থিত হলো। পুরো শরীরে তার রক্ত হাত, পায়ে, মাথায় ব্যান্ডেজ করা। দেখতে ভয়াবহ অবস্থা।
লতিফা বেগম মেয়ের এমন অবস্থা দেখে কেঁদে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে পিছনে তাকাতেই দেখলো শুভ্র পাঁচ কোল তুলে কাউকে নিয়ে হল রুমে প্রবেশ করছে। লতিফা বেগম খুব ভালো করে তাকাতেই দেখলো লামিয়া গুটি সুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে শুভ্রর কোলে।
তা দেখে লতিফা বেগম ছিটকে দূরে সরে গিয়ে সামনে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে হামিদ সাহেবের দিকে তাকালো।
হল রুমে সবাই অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। তাঁরা বোধ হয় কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
তাদের সামনে হুবুহু লামিয়া রক্তাক্ত শার্ট প্যান্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে আর পাশে শুভ্রর কোলে গুটিয়ে শুয়ে আছে আরেক লামিয়া।
হামিদ সাহেব চোখ ঘুরিয়ে শুভ্রর কোলে লামিয়া কে দেখে চিনতে পারলো মেয়েকে। কারণ তাঁর মেয়ে এসব ছেলেদের পোশাক পড়তে পছন্দ করে না। তাই চিনতে পেরে এগিয়ে গিয়ে লামিয়ার মাথায় হাত রেখে শুভ্রর উদ্দেশ্য বললো
– কী হয়েছে ওর?
– কিছু হয়নি ঘুমিয়ে গিয়েছে তাই কোলে তুলে নিয়ে আসতে হয়েছে। আমি ওকে রুমে দিয়ে আসি।
বলেই লামিয়া কে নিয়ে উপরের রুমের দিকে পা বাড়ালো।
হামিদ সাহেব শুভ্রর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে পাশ ফিরে আরেক লামিয়ার দিকে তাকালো। মেয়েটি ছলছল চোখে তাকিয়ে সবাইকে দেখছে।
লতিফা, রাশেদা, মনিরা তাহমিনা বেগম একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছেন।
এটা কীভাবে সম্ভব?? লামিয়ার মতো দেখতে এই পরিবারে একজন ই ছিলো কিন্তু সে তো বছর আগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে।
আজমেরী বেগম আজ নিশ্চুপ বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। সে যাকে ভাবছে যদি সত্যি হয় তাহলে আজকে আজমেরী বেগম এর চেয়ে খুশি আর কেউ হবে না।
তাই বেশ কাঁপা কাঁপা গলায় অস্পষ্ট সুরে বলে উঠলো
– ছ…ছবি?
আজমেরী বেগম এর কথায় ছবি চট করে চোখ ঘুরিয়ে আজমেরী বেগম এর দিকে টলমল দৃষ্টিতে তাকাতেই আজমেরী বেগম দৌড়ে গিয়ে ছবিকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে উঠলো
– আমার দাদু ভাই ছবি, ও আনিসুল ও হামিদ ও হাশিম,ও আজমির দেখ আমার দাদু ভাই ফিরে এসেছে তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেনো দেখ আমার দাদুভাই আমাদের ছেঁড়ে চলে যায়নি আল্লাহ ফিরিয়ে দিয়েছে আমাদের কাছে। বলেই কেঁদে উঠলো আজমেরী বেগম।
ছবি এতো বছর পর নিজের আপন মানুষ গুলোকে পেয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। আজমেরী বেগম এর বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠলো। হল রুমে সবাই কান্না করছে কিন্তু কারোর মুখে কোনো কথা নেই।
শুভ্র রুমে এসে লামিয়া কে আস্তে করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উঠতে যাবে তখনই দেখলো লামিয়ার চুল শুভ্রর শার্টের বোতামে আটকে গিয়েছে। শুভ্র বেশ যত্ন সহকারে লামিয়ার চুল গুলো বোতাম থেকে ছাড়িয়ে নিলো। লামিয়ার এলোমেলো চুল গুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে কপালে ছোট্ট ভালোবাসার পরশ এঁকে দিলো। তারপর আস্তে করে হাতের থেকে একটা একটা করে চুড়ি খুলে রাখলো। লামিয়ার শরীর চাদর দিয়ে ঢেকে আবারো চোখ বুলালো প্রেয়সীর মুখখানাতে। মুখ খানা দেখে মনে হচ্ছে কতো কষ্ট লুকিয়ে আছে মনের মধ্যে। আচ্ছা সে কী বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে তাঁর প্রেয়সীকে? এই কষ্টের কারণেই কী তাঁর প্রেয়সীর এমন ছন্নছাড়া ,অগোছালো , রাগী জেদি হয়ে উঠেছে?
ভেবেই শুভ্রর বুকে যন্ত্রণা শুরু হলো।
শুভ্র আস্তে আস্তে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে লামিয়ার হাতখানা শক্ত করে ধরে শুভ্রর গালে রেখে তাকিয়ে থাকলো কতোক্ষণ।
তারপর আস্তে আস্তে বিরবির করে বলে উঠলো
– কেনো পাল্টে গেলি? আমি তো তোকে এমন দেখতে চাইনি । এই ছন্নছাড়া, অগোছালো, বদমেজাজি মেয়েকে কেমন করে সামলাই বল তো? হ্যাঁ আমি তোর দেওয়া কথা রাখতে পারিনি পরিস্থিতির কারণে, সেটা কী আমার ভুল বল? দূরে ছিলাম তোর থেকে তবুও অন্য কোনো নারীর সাথে কোনো সম্পর্ক করি নি। কিন্তু তুই অন্য কারোর কথা বিশ্বাস করে আমাকে ভুল বুঝলি, আমাকে ঘৃণা করলি, আমাকে অবিশ্বাস করলি? এই মেয়ে তুই, তুই কি জানিস মৃত্যুর সাথে লড়াই করে কতো কষ্ট সহ্য করে আমি আজকে এখানে এসেছি শুধু মাত্র তোর জন্য। শুধু মাত্র তোর জন্য ফিরে এসেছি আমি আবার। সত্যি বলছি আমি সেদিন তোকে কষ্ট দিতে চাইনি কিন্তু তোর এক কথা বারবার শুনতে রাগ লাগছিলো কারণ অন্য কারোর কথা বিশ্বাস করে কেনো ভুল বুঝবি আমাকে? এই চিনেছিস তোর শুভ্র ভাই কে? সেদিন অনেক রাগ লাগছিলো তাই বলে দিয়েছিলাম। তবে তোকে কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছে আমার ছিলো না কোনোদিন। প্লিজ ফিরে আয়, আমাকে আমার আগের সেই বোকা স্বভাবের লামিয়া কে ফিরিয়ে দে প্লিজ। আমি চাই না এই লামিয়া কে, আমি চিনি না এই লামিয়া কে, আমাকে আমার লামিয়া কে ফিরিয়ে দে প্লিজ।
বলেই নাক টেনে উঠলো শুভ্র। চোখ থেকে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। শুভ্র লামিয়ার হাতে বেশ সময় নিয়ে চুমু খেয়ে, লামিয়ার হাত আস্তে করে নিজের হাত থেকে সরিয়ে উঠে রুম থেকে চলে যেতেই, লামিয়া ঘুমের ঘোরে বিরবির করে বলে উঠলো
– শুভ্র ভাই যাবেন না ফিরে আসুন প্লিজ। বিরবির করতে করতে আবার ঘুমিয়ে গেলো।
সোফায় বসে কখনো ছবি কে বুকে জড়িয়ে রেখেছে আজমেরী বেগম। যে আজমেরী বেগম কে কখনো কেউ কান্না করতে দেখেনি সে আজমেরী বেগম কে আজ কান্না করতে দেখেছে।
বাড়িতে আসার সময় ই রাশেদ ছবি কে ডক্টর দেখিয়ে এনেছে। মাথায় হাত পা ব্যান্ডেজ করিয়ে এনেছে।
রাশেদা বেগম চোখ মুছে ছবির মাথায় হাত রাখতেই ছবি রাশেদা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো।
লতিফা বেগম প্লেট ভর্তি ভাত নিয়ে এসে ছবির সামনে বসতেই ছবি মাথা তুলে তাকালো লতিফা বেগমের দিকে।
খান বাড়ির সবাই উপস্থিত ইসলাম বাড়িতে তবে লাবিব বাদে। তাকে সাফওয়ান আরিফ আর আবির মিলে বাড়িতে রেখে এসেছে। তাঁর জ্ঞান এখনো ফিরে নি। আর ফিরবেই বা কী করে যাকে এতো বছর মৃত ভেবে এসেছে। সেই মৃত মানুষ কে যদি হঠাৎ সামনে দেখে তাহলে কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
হল রুমে সবাই উপস্থিত শুধু লামিয়া আর লাবিব বাদে।
শুভ্রর চোখ অসম্ভব লাল হয়ে আছে। চোখ মুখে পানি দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে হল রুমে এসে উপস্থিত হলো। নিচে এসে দেখলো সবাই ছবি কে এটা ওটা প্রশ্ন করছে কীভাবে সে বেঁচে আছে, সে বেঁচে থাকলে আঁখি কোথায়। ছবি মাথা নিচু করে বসে আছে কোনো কথা না বলে।
শুভ্র তা দেখে দীর্ঘ শ্বাস নিলো তারপর হামিদ সাহেবের দিকে তাকালো।
আজকে আর কোনো কিছু লুকাতে চায় না তাই শুভ্র শুকনো ঢোক গিলে সবার উদ্দেশ্য করে বললো
– তোমাদের সবার প্রশ্নের উত্তর আমি দিচ্ছি। আজকে আমি সব বলছি।
শুভ্রর কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে তাকালো শুভ্রর দিকে। তবে লতিফা বেগম , হামিদ সাহেব , রাশেদ, সাফওয়ান, আরিফ, আজমেরী বেগম, আবির অবাক হলেন না।
আনিসুল সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললো – কী বলবে তুমি?
শুভ্র আনিসুল সাহেব এর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললো – বড় বাবাই অনেক কিছু বলার আছে।
বড় বাবাই কথাটা শুনে আনিসুল সাহেব বেশ চমকে উঠলেন। তাঁকে এই নামে শুধু একজন ই ডাকতো শুভ্র। বহু বছর পর আবরারের মুখ থেকে এই ডাক শুনে আনিসুল সাহেব অনেকটা অবাক হলেন।
শুভ্রর দিকে তাকিয়ে অবাক কন্ঠে বলে উঠলো – কী বললে তুমি?
– বড় বাবাই। বলেই শুভ্র তাকালো আনিসুল সাহেব এর দিকে।
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে।
আনিসুল সাহেব হামিদ সাহেবের দিকে তাকালো। হামিদ সাহেব বড় ভাইয়ের চোখের ভাষা বুঝতে পেরে মাথা নাড়াতেই আনিসুল সাহেব এর চোখ ছলছল করে উঠলো। এগিয়ে গিয়ে শুভ্র কে জড়িয়ে ধরলো।
হল রুমে সবার আর বুঝতে বাকি নেই যে এটা শুভ্র। সবাই এইবার অনেকটা অবাক হলো।
এতো গুলো বছর ধরে যাদের কে মৃত ভেবে এসেছে কিন্তু তাঁরা বেঁচে আছে, সে কথা কেউ জানে না।
আনিসুল সাহেব শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বেশ আশা নিয়ে জানতে চাইলো – শুভ্র আ.. আঁখি? আ..আমার আঁখি, ছহীল তাঁরা ও কী বেঁচে আছে?? আর শুভ্রা, শাহরিয়ার ?? ওরা কী বেঁচে আছে??
শুভ্র অসহায় চোখে তাকাতেই আনিসুল সাহেব বুঝে গেলেন তাঁদের আদরের বোন ছবির মা – বাবা আর শুভ্রের মা – বাবা তাঁরা কেউ বেঁচে নেই ।
আনিসুল সাহেব শুভ্র আর ছবি কে দেখে বেশ আশা করেছিলো শুভ্র আর ছবি বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁরা ও বেঁচে আছে কিন্তু তাঁরা বেঁচে নেই। ভেবেই ভেঙে পড়লো আনিসুল সাহেব।
তা দেখে শুভ্র বলে উঠলো – আমি আর ছবি এসেছি সেদিন আমাদের বাড়িতে যারা আগুন লাগিয়েছে, যারা আমাদের সুন্দর পরিবারটা ধ্বংস করেছে তাদের খুঁজে বের করতে।
শুভ্রর কথা শুনে সবাই আশ্চর্য হয়ে শুভ্রর দিকে তাকালো। তাঁরা এতো বছর জানতো কোনো দুর্ঘটনায় আগুন লেগেছিলো বাড়িতে এবং সেই দুর্ঘটনায় পুরো মারা গিয়েছিলো শুভ্র আর ছবির পরিবারের সবাই। কিন্তু এটা কেউ ইচ্ছে করে করেছে তা কেউ জানতো না এতো দিন।
হাশিম সাহেব অস্থির গলায় শুভ্র কে বললো – কী বলছিস??
– হ্যাঁ আমি ঠিক বলছি। সেদিন কোনো দূর্ঘটনায় আগুন লাগে নি আমাদের বাড়িতে বরং লাগানো হয়েছিলো।
– কিন্তু কে? আর কেনো করেছিলো ?
শুভ্র শুকনো ঢোক গিলে বললো
– ইকবাল কায়সার আর সোহেল কাজী।
শুভ্রর কথায় সবাই এইবার আরো চমকে উঠলো মনে হলো।
শুভ্র নিজেকে শক্ত করে বলতে শুরু করলো –
অতীত,
– তাড়াতাড়ি করো দেরি হয়ে যাবে তো।
– এতো তাড়া দিচ্ছো কেনো?
– তাড়া দিবো না কেনো বলো, দেরি হয়ে যাবে তাই। আর শুভ্র কোথায়?
– আর কোথায় দেখো গিয়ে পাতানো বউ তার গলা জড়িয়ে কান্না করছে আর সে শান্তনা দিচ্ছে।
বলেই হেঁসে উঠলো শুভ্রা।
শুভ্রার হাঁসি দেখে শাহরিয়ার ও হেঁসে শুভ্রা কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো
– চলো ছেলের পাতানো বউ কে ও নিয়ে চলি।
– হুম সাহেব আইডিয়াটা খারাপ নয় তবে ছেলের বউ এখনো ছোট্ট নেওয়া যাবে না এটা নিশ্চয় আমার ডিটেকটিভ অফিসার জানে না?
শুভ্রার কথায় শাহরিয়া হালকা হেসে শুভ্রা কে ছাড়িয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি ব্যাগ গোছানোর জন্য তারা দিয়ে বেরিয়ে গেলো প্রাণ প্রিয় বন্ধু হামিদ সাহেবের সাথে দেখা করতে।
এইদিকে,
– তোমার সাথে আমার কথা নেই শুভ্র ভাই তুমি আমাকে ছেঁড়ে চলে গেলে আমি কার সাথে থাকবো?
বাঁদরের মতো শুভ্রর গলা পেঁচিয়ে মুখ ফুলিয়ে বললো ছোট্ট লামিয়া।
শুভ্র বেশ কিছুক্ষণ ধরে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। অতিরিক্ত কান্নার কারণে মুখ ফুলে গিয়েছে। শুভ্র ছোট্ট থেকেই বেশ গম্ভীর স্বভাবের। কথা কম বলে দরকার ছাড়া কথা বলা বারণ মনে হয় তাঁর। কিন্তু লামিয়া বাঁচাল কথা শুরু করলে কথা থামার নাম গন্ধ নেই। সবাই তাঁর কথায় বিরক্ত হলেও শুভ্র কোনোদিন বিরক্ত হয় নি। বরং মনোযোগ দিয়ে লামিয়ার কথা শুনে যতোক্ষণ পর্যন্ত লামিয়ার কথা বন্ধ না হয় ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত।
আজ ও বেশ বকবক করছে লামিয়া। শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে কথা শুনছে।
– তুমি চলে গেলে লাবিব ভাই আমাকে মারবে অনেক তখন তুমি না থাকলে কে আমাকে লাবিব ভায়ের থেকে বাঁচাবে শুভ্র ভাই।
বেশ অভিমান কন্ঠে বললো লামিয়া।
– মারবে না আমি বলে দিবো। বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো শুভ্র।
– তবুও তুমি চলে যাবে?
– হুম।
– আমাকে ছেঁড়ে থাকতে তোমার কষ্ট হবে না?
– না।
– কেনো?
– জানি না।
– আমি জানি তো, তুমি ওইখানে গিয়ে ছবির সাথে থাকবে, তখন আমাকে ভুলে যাবে। তারপর ছবি কে বিয়ে করবে বড় হলে। তখন আমার কথা মনে করবে না আমি জানি তো , তাই আমাকে ছেঁড়ে থাকতে তোমার কষ্ট হবে না। বলেই শুভ্রর গলায় মুখ গুঁজে কেঁদে উঠলো লামিয়া।
একটু থেমে শুভ্রর থেকে সরে দাঁড়িয়ে অভিমান কন্ঠে বলে উঠলো
– ঠিক আছে ছবি কেই বিয়ে করো বড় হলে আমি ও আর তোমাকে কিছু বলবো না। আমি ও বড় হয়ে লাবিব ভাই কে বিয়ে করবো তখন তুমি ও কান্না করবে।
লামিয়ার বলতে দেরি শুভ্রর রেগে গিয়ে লামিয়ার গালে থাপ্পড় মারতে দেরি হলো না।
লামিয়া থাপ্পড় খেয়ে কেঁদে উঠলো। শুভ্রা পাশের রুম থেকে দৌড়ে এসে দেখলো লামিয়া কান্না করছে। শুভ্রা শুভ্রকে কিছু বলতেই শুভ্র লামিয়া কে বলে উঠলো
– থাক তুই তোর লাবিব কে নিয়ে। লাবিব কে বিয়ে করে নিস। বলেই রেগে হনহন করে চলে গেলো।
শুভ্রা ছেলের দিকে তাকালো তার শান্ত ছেলে হঠাৎ রেগে গেলো কেনো? ভেবেই লামিয়া কে কোলে তুলে জানতে চাইলে লামিয়া সব বলে দিতেই শুভ্রা হেঁসে বললো
– তোকে ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে আমি আমার ছেলের বউ করবো না।
– সত্যি বলছো শুভ্রা মা?
– তিন সত্যি।
লামিয়া আর কিছু না বলে শুভ্রার কোলে লেপ্টে শুয়ে রইলো। শুভ্রা লামিয়া কে কোলে তুলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
রুমের দরজায় উঁকি ঝুঁকি মারছে লাবিব। পিছন থেকে হঠাৎ একটা থাপ্পড় এসে পড়তেই লাবিব পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখলো পিংক কালারের ফ্রোক পড়ে চুল গুলো দুটো ঝুঁটি করা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লাবিব বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো এটা লামিয়া নাকি ছবি।
বাচ্চা মেয়েটির ঠোঁটে বেশ ভালো চোখ বুলিয়ে ঠোঁটের নিচে লাল রঙের তিল দেখতে পেয়ে লাবিব বুঝতে পারলো এটা ছবি তাই দ্রুত ছবির হাত ধরে রুমে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে বেশ শক্ত গলায় ছবি কে বললো
– ওইখানে যেয়ে আমাকে ভুলে যাবি তাই না?
– হ্যাঁ।
ছবির এমন কথায় লাবিবের রাগ হলো। তাই আর কিছু না বলে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। এই মেয়ে এমন ঘাড়ত্যাড়া কেনো সে বোঝে না। সবসময় একটা প্রশ্ন করলে তার উল্টো টা বলবে। যাওয়ার সময় ও ছবির এমন কথা শুনে বেশ রাগ হলো তার।
লাবিবের এমন গাল ফুলানো দেখে ছবি হেঁসে লাবিবের গালে চিমটি কেটে দিতেই লাবিব বিরক্ত হয়ে বললো
– উফ ছবি ব্যাথা পেয়েছি।
ছবি হেঁসে বললো
– ব্যাথা পাবার জন্য দিয়েছি।
লাবিব মুখ ফুলিয়ে বললো
– ওইখানে যেয়ে ওই শুভ্রর সাথে মিশে আমাকে আরো ব্যাথা দিবি আমি জানি।
– তুমি শুভ্র ভাইকে নিয়ে এতো চিন্তা করো কেনো?
– করি কারণ তোর পাশে ওকে আমার সহ্য হয় না।
– কিন্তু শুভ্র ভাই তো আমার পাশে ঘেঁষে না আমি তো যাই সবসময় তার কাছে।
– হ্যাঁ এইটাই সমস্যা। তুই কেনো যাস ওর কাছে?
– কারণ তাঁর পাশে ঘেঁষলে লামিয়া রাগ হয় কান্না করে আর ওকে আমার কান্না করাতে খুব ভালো লাগে।
– তাই বলে শুভ্রর সাথে মিশে থাকবি?
– হ্যাঁ, লামিয়া কে কষ্ট দিতে আমি তাই করবো।
লাবিব ছবির মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো
– বড় হয়ে কী আমাকে বিয়ে করবি না?
– জানি না।
– কেনো?
– কারণ জানি না।
– আমাকে কী তোর ভালো লাগে না? দেখছিস লামিয়া শুভ্র বলতে পাগল আর তুই কি না এমন।
– ঠিক আছে তাহলে লামিয়ার কাছেই যাও আমার কাছে আসতে হবে না।
বলেই বিছানা থেকে নেমে চলে গেলো। লাবিব মন খারাপ করে আবার দৌড়াতে লাগলো ছবির পিছন পিছন।
হল রুমে বসে আছে খান আর ইসলাম বাড়ির সবাই। হামিদ, শাহরিয়ার আর ছহীল সাহেব তিনজন ই সেই স্কুল লাইফ থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড।
সব বিপদ আপদে তিন বন্ধু একে অপরের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। হামিদ সাহেব লেখা পড়া শেষ করে ভাইদের সাথে নিজেদের কম্পানিতে যোগ দিয়েছেন।
শাহরিয়া আর ছহীল সাহেব দুজন ই ডিটেকটিভ হওয়ায় কাজের সুত্রে বছর খানিকের জন্য দেশের বাইরে যেতে হবে। পুরানো দিন গুলো ভেবেই হাসা হাসি করছিলো তিন বন্ধু। তখনই সেখানে উপস্থিত হলো লতিফা,শুভ্রা আর আঁখি।
আঁখি ইসলাম, ইসলাম বাড়ির একমাত্র মেয়ে এবং চার ভায়ের এক মাত্র আদরের ছোট বোন আঁখি। ছহীল সাহেব হামিদ সাহেবের বন্ধু হওয়ায় বাড়িতে আশা যাওয়া লেগে থাকতো। তখন থেকেই দুজন দুজকে পছন্দ করতো হঠাৎ আনিসুল সাহেব তাদের সম্পর্ক জানার পর ছহীল সাহেব তার পরিবার নিয়ে আখির জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিতেই আনিসুল, হামিদ, হাশিম, আজমির সাহেব রাজি হয়ে তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলো।
শাহরিয়ার শুভ্রা কলেজ লাইফ থেকে দুজন দুজনকে ভালোবাসতো। কিন্তু তাদের পরিবারের কেউ তাদের বিয়েতে রাজি ছিলো না দেখে তারা পালিয়ে বিয়ে করেছিলো বলে দুই পরিবার থেকে কাউকে মেনে নেয় নি কোনোদিন। তাই তাঁরা হামিদ সাহেবের বাড়ির সাথে কয়েক কাঠা জমি কিনে সেখানেই বাড়ি তুলে সংসার পেতেছিলো। বিয়ের এক বছর পর ই তাদের ঘর জুড়ে শুভ্র এসেছে। দুই থেকে তিনজন হয়েই তাঁরা তাঁদের ছোট্ট সংসার নিয়ে সুখী জীবন যাপন করছে।
হঠাৎ একদিন খবর এলো লতিফা বেগম আর আঁখি বেগম একসাথে প্রেগন্যান্ট হওয়ার কথা। তাদের কথা শুনে ইসলাম বাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে গিয়েছিলো।
আনিসুল সাহেব বেশ করে চেয়েছিলো তার ফুটফুটে দুটো মেয়ের আছে এইবার জানি ছেলে হয় আল্লাহ জানি পরিপূর্ণ করে দেয় তাঁর আশা।
সবার কাছে বলে বেড়াতো তাঁর ছেলে হবে।
লতিফা বেগম স্বামীর কথায় বেশ বিরক্ত হতো সে বলতো আল্লাহ যা দিবে তাই নিয়ে খুশি হতে। কিন্তু আনিসুল সাহেব এর সেই এক কথা তাঁর ছেলে চাই।
লতিফা বেগমের বাবু হবে শুনে শুভ্র সবসময় লেগে থাকতো লতিফা বেগমের সাথে। তাঁর ছোট্ট ছোট্ট হাত
দিয়ে লতিফা বেগমের পায়ে তেল মালিশ করে দিতো, বেশ দেখে শুনে রাখতো লতিফা বেগমকে।
শুভ্রর এমন পাগলামী দেখে সবাই হাঁসতো ছোট্ট শুভ্র কে নিয়ে।
আস্তে আস্তে যতোদিন যাচ্ছে ততই লতিফা বেগম আর আঁখি বেগম এর ডেলিভারির দিন এগিয়ে আসছে।
হঠাৎ একদিন রাতে আঁখি বেগম এর পেটে ব্যথা উঠতেই তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতেই ডক্টর বলে উঠলো এখন ই ডেলিভারি করাতে হবে।
সেদিন রাতে ই জন্ম নিলো উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের এক মেয়ে শিশু। শিশুর বাবার নাম মিলিয়ে নাম রাখা হলো ছবি। আজমেরী বেগম নাতনী কে পেয়ে খুশি তে আত্মহারা হয়েছিলো সেদিন।
আঁখি মেয়ে হয়েছে জানার পর খান বাড়ির সবাই সেদিন হসপিটালে দেখতে গিয়েছিলো আঁখির মেয়েকে।
বাচ্চা দেখে ছোট্ট লাবিব ভীষণ খুশি হয়ে ছোট্ট ছোট্ট হাতে ছবি কে কোলে নিতেই ছবি লাবিবের কোলে প্রস্রাব করে দিয়েই চিৎকার করে কান্না করে উঠেছিলো। সেদিন লাবিব ছবির ওপর বেশ রেগে গিয়েছিলো। মুখ ফুলিয়ে শুধু তাকিয়ে আছিলো ছবির দিকে।
শুভ্রা বেগম শুভ্রর দিকে ছবিকে দিতেই শুভ্র মুখ ফুলিয়ে বলেছিলো সে এই মেয়েকে কোলে নিবে না, সে মেজ মামুনির বাবুকে কোলে তুলে নিবে।
কতো শত জোড় করার পর ও শুভ্রর কোলে ছবি কে দিতে পারে নি।
তাঁর দুদিন পর ই ঝড়ের রাতে হসপিটালে ভর্তি করানো হলো লতিফা বেগম কে।
শুভ্র সেই রাতে লতিফা বেগমের সাথে হসপিটালে যাবে তাঁর সে কি বায়না।
উপায় না পেয়ে তীব্র ঝড়ের বৃষ্টির রাতে শুভ্র কেও নিয়ে গেলো হসপিটালে।
তীব্র বৃষ্টির রাতে জন্ম নিলো উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের আরেকটি মেয়ে। সবাই তা দেখে বেশ চমকে উঠেছিলো সেদিন। আঁখির মেয়ের মতো আরো একটি মেয়ে দেখে সবাই বেশ আশ্চর্য হয়ে দেখছিলো বাচ্চাটিকে। ছবি আর তাঁর মধ্যে এইটুকুই পার্থক্য ছিলো যে ছবির ঠোঁটের কোণে লাল তিল আছে কিন্তু এই বাচ্চাটার তিল নেই। আশ্চর্যজনক ঘটনায় সবাই প্রথমে ভয় পেলেও পরে আজমেরী বেগম বলেছে আল্লাহর সব ইচ্ছে। বড় হলে চেহারা ঘুরবে দুজনের। বলে শান্তনা দিয়েছিলেন।
মেয়ে হয়েছে দেখে হামিদ সাহেব বেশ গম্ভীর মুখ করে বসেছিলো। তাকে মেয়েকে কোলে দিতেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলো। হঠাৎ বাহির থেকে মেঘ গর্জন করতেই শিশুটি চিৎকার করে উঠতেই শুভ্র দৌড়ে গিয়ে আজমেরী বেগমর কাছে ঘেঁষে বসে শিশুটির দিকে তাকাতেই খিলখিল করে হেঁসে উঠলো। নাক মুখ কুঁচকে কান্না করছে। হাঁসি শুনে শিশুটি কান্না থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শুভ্রর দিকে। শুভ্র হাত বাড়িয়ে শিশুটির হাত ধরতেই শিশুটি আঁকড়ে ধরলো শুভ্রর হাত। আজমেরী বেগম হেঁসে শুভ্রর কোলে দিয়ে বললো – নে দাদু ভাই আজ থেকে এইটা তোর পাতানো বউ, এখন থেকে সবসময় চোখে চোখে রাখবি তোর পাতানো বউ কে।
শুভ্র পাতানো বউ কি তা জানে না কিন্তু দাদী যখন বলেছে এটা আমার পাতানো বউ তাহলে এইটা আমার পাতানো বউ।
লতিফা বেগমের জ্ঞান ফেরার পর সন্তান কে দেখে বেশ অবাক হয়েছিলেন। তারপর যখন জানতে পারলেন হামিদ সাহেব মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন তখন বেশ রাগ করেছিলেন স্বামীর উপর।
লতিফা বেগম তার নামের সাথে মিলিয়ে বাচ্চাটির নাম রেখেছে লামিয়া।
তারপর থেকে হামিদ সাহেব যখন ই লামিয়া কে ধরতে গিয়েছেন তখনই লতিফা বেগম সরিয়ে নিয়েছেন তাঁর কাছ থেকে। এতে হামিদ সাহেব কষ্ট পেতেন।
এইদিকে লাবিব লামিয়া আর ছবির মধ্যে গুলিয়ে ফেলতো কে ছবি আর কে লামিয়া। ছোট্ট লাবিব ছবির অপর বেশ রেগে থাকতো তাই সুযোগ বুঝে ছবি ভেবে লামিয়াকে চিমটি কাটতো আর লামিয়া কান্না করতেই শুভ্র রেগে যেতো। তারপর শুভ্র আর লাবিবের মধ্যে ইচ্ছে মতো মারামারি হতো। হঠাৎ লাবিব একদিন মুখ ফুলিয়ে বলে উঠলো শুভ্রর পাতানো বউ আছে তাহলে লাবিবের নেই কেনো? এই নিয়ে লাবিব কান্নাকাটি শুরু করতেই সবাই ভাগ করে দিয়েছিলো লামিয়া শুভ্রর পাতানো বউ আর ছবি লাবিবের পাতানো বউ।
এইভাবেই দিন যাচ্ছিলো বেশ। লামিয়া শুভ্র বলতে অজ্ঞান ছিলো। শুভ্রর প্রতিটা কথা মেনে চলতো লামিয়া। সারাদিন শুভ্র ভাই শুভ্র ভাই করে মুখের ফ্যানা তুলে ফেলতো।
অপরদিকে, লাবিব আর ছবির কাহিনী বেশ উল্টো। লাবিব ছবির পিছন পিছন ঘুরে ঘুরে অতিষ্ঠ হয়ে যেতো লাবিব। এই মেয়ে বেশ ত্যাড়া হওয়ায় লাবিব বেশ বিরক্ত হতো।
লামিয়া আর ছবি একরকম হলেও স্বভাব চরিত্র ছিলো বেশ ভিন্ন। ছবি বেশ চঞ্চল আর লামিয়া চঞ্চল থাকলেও বেশ ভীতু ছিলো। তবে তাদের দুজনের সম্পর্ক আগুন আর কেরসিন তেলের মতো। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। সবসময় দুজন দুজনকে খোঁচা মেরে কথা বলে ঝগড়া মারা মারি বাধাবেই।
এই দুজনের ঝগড়ায় লাবিব আর শুভ্রর বেশ ধকল পোহাতে হয় তাদের দুজনকে। কারণ লামিয়া ছবি কে কিছু বললে তা লাবিব সহ্য করতে না পেরে লামিয়ার গালে থাপ্পড়ে দেয় নয়তো চিমটি কাটে। এই নিয়ে লামিয়া কান্না করলে শুভ্র তা সহ্য করে না। লামিয়ার উপর সে ছাড়া অন্য কেউ তাঁকে স্পর্শ করলে তা শুভ্র কোনো কালেই সহ্য করতে পারতো না। এই নিয়ে শুভ্র আর লাবিবের মধ্যে মারামারি হয়ে যেতো।
এসব ভেবেই সবাই হাসাহাসি করছিলো। তখনই বাড়িতে প্রবেশ করলো তখন ই বাড়িতে হাতে ট্রলি নিয়ে প্রবেশ করলো সোহেল কাজী আর ইকবাল কায়সার।
তাঁরা দুজন হামিদ, শাহরিয়ার ও ছহীল সাহেব এর কলেজ ফ্রেন্ড ছিলো। তাঁরা বেশ প্রভাবশালী লোক।
কাজের সুত্রে তাঁরাও আজ লন্ডন পাড়ি জমাবে এক সাথে।
তাদের দেখে হামিদ সাহেব হাসিমুখে সোফা থেকে উঠে এসে জড়িয়ে ধরলো বন্ধুদের। তারপর একে একে সবার সাথে কৌশল বিনিময় করে সোফায় বসে টুকটাক কথা বলতে লাগলেন।
ধীরে ধীরে বিকেল সন্ধ্যা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসতেই সবাই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো এয়ার পোর্টে এর উদ্দেশ্যে।
লামিয়া কে থাপ্পড় মারার পর থেকে শুভ্র লামিয়ার সাথে আর কথা বলে নি। আর না ছবি লাবিবের সাথে কথা বলেছে।
লামিয়া শুভ্রার কোলে বসে কান্না করতে করতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। যা শুভ্রর কাছে বিরক্ত লাগছে।
এই মেয়ের কান্না সে দেখতে পারে না এই মেয়ে কি বুঝে না ভেবেই শুভ্র পাশ ফিরে তাঁর মায়ের কোলের দিকে তাকাতেই দেখলো ছোট্ট লামিয়া কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে গিয়েছে। তাই সে বেশ সাবধানে শুভ্রার থেকে লামিয়া কে নিজের কোলে তুলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। শুভ্রা ছেলের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেঁসে বললো
– বাবা তুমি বললে তোমার বউ কে আমাদের সাথে নিতে পারি।
– দরকার নেই। বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো শুভ্র।
দেখতে দেখতে এয়ার পোর্টে এসে গাড়ি থামতেই সবাই গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলো।
লামিয়া শুভ্রর কোলে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সবার চোখে পানি। লতিফা বেগম ভাঙা গলায় লামিয়া কে ঘুম থেকে তুলতে নিতেই শুভ্র বারণ করলো। ঘুম ভাঙলে সে বায়না ধরবে শুভ্রর সাথে যাবে কান্না কাটি করবে তাঁর চেয়ে ভালো ঘুমিয়ে থাকুক।
সবার থেকে বিদায় নিয়ে শুভ্র লামিয়া কে লতিফা বেগমের কোলে দিতেই লামিয়া ঘুমের ঘোরে শুভ্রর টিশার্ট টেনে ধরলো। শুভ্র আস্তে করে ছাড়িয়ে নিয়ে লামিয়ার গালে হাত বুলিয়ে চুমু দিয়ে চলে গেলো মায়ের হাত ধরে। একটু এগিয়ে যেতেই পিছন ঘুরে আবার দৌড়ে লাবিবের কাছে এসে শীতল দৃষ্টিতে তাকালো লাবিবের দিকে তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো
– কোনোদিন লামিয়ার গায়ে হাত দিবি না। যদি আমি শুনেছি দিয়েছিস তাহলে তোর হাত কেটে রেখে দিবো।
বলেই প্রেয়সীর মুখখানাতে শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে চলে গেলো মায়ের হাত ধরে। লাবিব ভ্রু কুঁচকে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আবার ঘুমন্ত লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বেশ বিরক্ত হলো।
এই মেয়ে বা লাবিব কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে নি কোনো দিন।
সবাই সেদিন এয়ার পোর্টের থেকে ফিরে এসে মন ভার করে যে যার রুমে চলে গিয়েছে। পরদিন সকালে লামিয়ার সে কি কান্না তাকে না বলে তাঁকে না নিয়ে চলে গিয়েছে শুভ্র। এই নিয়ে চিল্লাচিল্লি করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রেখেছিলো।
লন্ডন পৌঁছে সব কিছু গুছিয়ে উঠতে উঠতে শুভ্র আর ছবি দের বেশ কয়েকদিন লেগেছে। শুভ্রর পরিবার আর
ছবির পরিবারের সদস্যরা এক বাড়িতেই থাকতো।
লতিফা বেগম শুভ্রা কে কল করলে সবাই ফোনে কথা বললেও শুভ্র লামিয়ার সাথে কথা বলতো না। এইদিকে শুভ্রর সাথে কথা না বলতে পেরে লামিয়া কান্না করতো তবুও শুভ্র কথা বলতো না।
আস্তে আস্তে সব কিছু ঠিকঠাক ছিলো। আস্তে ধীরে শুভ্র লামিয়ার সাথে কথা বলতো এটা ওটা বলে বোঝাতো। তবুও লামিয়া ছবি কে নিয়ে মনে খুঁত খুঁত থেকে ই গিয়েছিলো।
দিন যায় দিন আসে, বছর যায় বছর আসে।
আস্তে আস্তে সবাই বড় হতে শুরু করলো। শুভ্র আর ছবি কে একসাথে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতেই শুভ্র আর ছবির মধ্যে আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব শুরু হয়। কিন্তু ছবি কে তেমন শুভ্র তার আশে পাশে ঘেঁষতে দিতো না।
সবকিছু মিলিয়ে ভালোই দিন কাটছিলো সবার।
হঠাৎ বেশ কিছুদিন ধরে শুভ্র খেয়াল করলো ছহীল আর শাহরিয়ার বেশ চিন্তিত হয়ে থাকতো।
একদিন মাঝ রাতে হঠাৎ তাদের বাড়িতে আগমন করে ইকবাল কায়সার আর সোহেল কাজী। মাঝ রাতে তাদের দেখতে পেয়ে শাহরিয়ার আর ছহীল বেশ রেগে গিয়েছিলো। তাদের মধ্যে কিছু নিয়ে তর্কাতর্কি চলছিলো
আঁখি আর শুভ্রা বেগম শুভ্র আর ছবি কে নিয়ে ঘরের মধ্যেই ছিলেন।
হঠাৎ বিকট কিছুর শব্দ পেতেই শুভ্র দৌড়ে বাহিরে এসে দেখলো তাঁর বাবা আর ছবির বাবা রক্তাক্ত অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে আছে। শুভ্রর পিছন পিছন ছবি ছুটে আসতেই চোখের সামনে এই অবস্থা দেখে চিৎকার করে উঠলো। ইকবাল আর সোহেল পিছনে তাকিয়ে দেখলো শুভ্র,ছবি, আঁখি আর শুভ্রা দাঁড়িয়ে আছে।
ইকবাল হেঁসে সোহেলের দিকে তাকিয়ে বললো
– এইগুলো কে ও সরিয়ে দে কোন প্রমাণ থাকবে না।
সোহেল নিজের হাতে থাকা রড তুলে তাদের কাছে এগিয়ে আসতেই আঁখি আর শুভ্রা ছেলেমেয়েদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ালো। আঁখি পিছন ঘুরে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে কান্না গলায় বলে উঠলো
– পালা বাপ, ছবি কে নিয়ে পালা পিছনে কী হবে তাকাবি না পালা।
আঁখির কথা শুনে শুভ্র কি করবে বুঝতে না পেরে ছবির হাত ধরে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে দৌড়ে উপরের দিকে চলে গেল।
ইকবাল পা বাড়িয়ে উপরের দিকে যেতে চাইলে শুভ্রা সামনে দাঁড়িয়ে আকুতি ভরা কন্ঠে বললো
– ভাই প্লিজ ওরা বাচ্চা ওদের ছেঁড়ে দাও দয়া করে তোমার পায়ে পড়ছি দয়া করে ছেঁড়ে দাও ভাই।
ইকবালের কাজে বাঁধা দেওয়ায় পাশ থেকে ফুলদানি তুলে শুভ্রার মাথায় সজরে আঘাত করতেই শুভ্রা লুটিয়ে পড়লো ফ্লোরে।।
আঁখি চিৎকার করে উঠতেই তাঁর গলা চেপে ধরলো সোহেল।
কোমড় থেকে নাইফ বের করে আঁখির গলা বরাবর টান দিতেই লুটিয়ে পড়লো আঁখি।
শুভ্র উপর থেকে লুকিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে সব দেখলো। চোখে থেকে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে তা মুছে নিয়ে দৌড়ে চলে গেলো আলমারির ভেতরে। সেখানে চুপচাপ বসে ফুঁপিয়ে কান্না করছে ছবি। শুভ্র ছবির মথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ছবি মুখ তুলে বলে উঠলো
– শুভ্র ভাই লাবিব ভাইয়ের সাথে কী আর দেখা হবে না আমার। আমরা কী আজ মারা যাবো শুভ্র ভাই?? আমরা মারা গেলে লাবিব ভাই আর লামিয়া জানতে পারবে না কোনোদিন তাদের আমরা কতোটা ভালোবাসি।
এই অবস্থায় ছবির কথা শুনে শুভ্রর বুকটা কেমন জ্বলে উঠলো। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তাঁর প্রেয়সীর মুখ। এক সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে তাঁর ছোট্ট প্রেয়সী তার সাথ কথা বলে না। প্রেয়সী যে অভিমানে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে তা সে জানে। তবে আজ যদি তাঁর কিছু হয়ে যায় তাঁর তাহলে আর কোনোদিন তাঁর প্রেয়সীর এই অভিমান ভাঙতে পারবে না। বরং উল্টো তাঁকে আরো ভুল বুঝবে হয়তো। ভেবেই ছবির দিকে তাকালো শুভ্র। চুপচাপ বসে আছে দুজন।
দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো সোহেল আর ইকবাল। শুভ্র দ্রুত ছবির মুখ চেপে ধরে ইশারা করে বোঝালো শব্দ না করতে।
সোহেল, ইকবাল পুরো ঘর খুঁজে তাদের না পেয়ে ইকবাল সোহেলকে আলমারির দিকে এগোতেই ইশারা করলো আলমারির দিকে। সোহেল তা বুঝতে পেরে সয়তানি হাঁসি দিয়ে। রুম থেকে বেরিয়ে দরজা লাগিয়ে
গাড়ির থেকে পেট্রোল এনে পুরো বাড়িতে ছিটিয়ে দিলো।
তারপর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দুজন বাঁকা হেঁসে সিগারেট মুখে পুরে গ্যাস লাইট দিয়ে সিগারেট জ্বালিয়ে ছুঁড়ে দিলো বাড়ির দিকে। সিগারেটের আগুন পেট্রোল এ পড়তেই ধাউ ধাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়লো পুরো বাড়িতে। ততক্ষণে ইকবাল আর সোহেল গাড়ি নিয়ে চলে গিয়েছে তাদের গন্তব্যে।
শুভ্র আস্তে করে আলমারি থেকে বেরিয়ে দেখলো পুরো রুম ধোঁয়ায় চারদিক ভরে উঠেছে। শুভ্র রুমের বাহিরে পা দিতেই দেখলো জ্বল জ্বল কর আগুন জ্বলছে চারদিকে। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই এই রুম ছাড়া। শুভ্র অসহায় এর মতো চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো। নিজেকে কেমন অসহায় লাগছে আজ। ভেবেই দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো শুভ্রর চোখ থেকে।
ছবি আলমারি থেকে বের হতেই কেশে উঠলো।
শুভ্র ছবির দিকে তাকিয়ে দ্রুত ছবির হাত ধরে দৌড়ে বেলকনিতে নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো। এই দিকটায় এখনো আগুন তেমন আসে নি তবে আসতে দেরি হবে না।
শুভ্র ছবি কে বেলকনিতে রেখে দৌড়ে গিয়ে আলমারি থেকে শুভ্রার একটা শাড়ি বের করে বেলকনির রেলিংয়ে বেঁধে নিয়ে ছবিকে আগে নিচে নামার জন্য বলতেই ছবি ভয়ে কেঁদে উঠলো।
শুভ্র উপায় না পেয়ে ছবিকে পিঠে নিয়ে শাড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো। ছবি ভয়ে লেপ্টে আছে শুভ্রর পিঠে হাত দিয়ে শুভ্রর গলা জড়িয়ে ধরে আছে।
বেশ কিছু নিচে নেমে আসতেই শাড়ির গিঁট খুলে যেতেই শুভ্র আর ছবি নিচে পড়ে গেলো।
তখনই বাড়ি থেকে বিকট শব্দ করে গ্যাস সিলিন্ডার ব্লাস্ট হতেই একটুকরো আগুনের ফুলকি শুভ্রর পিঠে এসে পড়লো। ছবি তাড়াতাড়ি কর হাত দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করলেই ছবির হাত পুরে যায়। তবুও শুভ্র পিঠের আগুন নিভাতে সক্ষম হয়।
আর কিছু না ভেবে শুভ্র ছবির হাত ধরে দৌড়াতে শুরু করলো।
ছবি কান্না করতে করতে জ্বলন্ত বাড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো
– শুভ্র ভাই মা – বাবা, আংকেল – আন্টি?
শুভ্র হঠাৎ থেমে গিয়ে ঘুরে তাকালো পিছনে। তারপর কন্না গিলে শক্ত গলায় বললো
– ভুলে য তাদের। তাঁরা আর বেঁচে নেই তবে কথা দিলাম যে বা যারা আমাদের পরিবার কে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে তাদের আমি ছাড়বো না।
ছবি শুভ্রর হাত ধরে বললো
প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৮ (২)
– আমাদের তো কেউ নেই এখন শুভ্র ভাই আমরা কোথায় যাবো? কী খাবো? বাংলাদেশে কীভাবে যাবো?
আমি নানুমা, মামি, লাবিব ভায়ের কাছে কীভাবে যাবো শুভ্র ভাই?
ছবির কথার জবাব শুভ্রর কাছে নেই। সে এখন কোথায় যাবে তা তারা জানে না। তবুও ছবির হাত ধরে পিছনে আর না তাকিয়ে দৌড়াতে লাগলো অজানা পথে।
পিছনে রেখে গেলো জন্মদাত্রী মা – বাবা কে। তাদের এই অচেনা শহরে কোথায় ঠাঁই পাবে তা তারা জানে না।
