Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৪)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৪)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৪)
মাইশা জান্নাত নূরা

সারফারাজ তীক্ষ্ণ স্বরে বললো….
—”২ বছর আগে তুই কি মাসে কয় তারিখে জানতে পেরেছিলি তুই প্রেগন্যান্ট? আর তখন তোর কতো মাস রানিং ছিলো প্রেগন্যান্সির বলতে পারবি?”
নীরা ওর মুখশ্রী জুড়ে ভাবুক ভাব ফুটিয়ে তুলে ধীর স্বরে বললো….
—“সঠিক তারিখটা তো এখন মনে নেই ভাইয়া। তখন মানসিক অবস্থাও খুব খারাপ ছিলো। সবকিছু এলোমেলো লাগছিলো আমার। তবে আমার সব রিপোর্ট যেমন: আল্ট্রাসনোগ্রাম, ডাক্তারের ফাইল সবই কানাডার বাসায় রাখা আছে। ওগুলো দেখলে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব মাস, তারিখ ও কতদিনের প্রেগন্যান্সি ছিলো আমার।”
সারফারাজ ওর বুকের সাথে দু’হাত ভাঁজ করে নীরার দিকে না তাকিয়েই বললো…..

—“ঠিক আছে। ঐ রিপোর্টগুলো সব লাগবে আমার।
তোর প্রেগন্যান্সি কবে ধরা পড়েছিলো সেটা জানতে পারলে তার আগের তিন-চার মাসে কি কি ঘটেছিলো, কারা কারা তখন এ বাড়িতে আসা-যাওয়া করতো, তুই কোথায় কোথায় গিয়েছিলি, কোন দিন তোর শরীর খারাপ ছিলো সবকিছুতেই নজর বুলাতে হবে।”
তেজ বললো….
—”কিন্তু ২ বছর আগের এই তথ্যগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সংগ্রহ করা কিভাবে সম্ভবপর হয়ে উঠবে ভাইয়া?”
সারফারাজ বললো…..
—”আমাদের পুরো বাড়িই সিসিটিভি ক্যমেরার আওতায় আছে দীর্ঘ ৫বছর ধরে সেটা হয়তো তুই ভুলে গিয়েছিস তেজ।”
তেজ উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বললো….

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—”ওওও হ্যাঁ হ্যাঁ। রিপোর্ট দেখে সঠিক তারিখটা জানতে পারলে সেইসময়ের রেকর্ডকৃত সিসিটিভি ফুটেজগুলো চেক করলেই আসল কা*র্ল*পিটের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা অনেকটা পরিস্কার হয়ে যাবে।”
তখুনি ওদের রুমের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলে সারফারাজ ভিতরে আসার অনুমতি দিলো। একজন মহিলা সার্ভেন্ট ভিতরে এসে বললেন…..
—”আপনাদের সবাইকে নিচে আসার জন্য বলেছেন বড় সাহেব।”
সারফারাজ বললো….

—”আচ্ছা। তুমি নিচে গিয়ে বলো আমরা আসছি।”
সার্ভেন্টটি চলে গেলে সারফারাজ নীরাকে বললো….
—”নীরা তুই কুরিয়ারের মাধ্যমে তোর সব রিপোর্টগুলো কানাডা থেকে আনার ব্যবস্থা কর আজই।”
নীরা ‘আচ্ছা’ বললো। সারফারাজ এবার সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো….
—”আমাদের মধ্যে হওয়া কথপোকথন আপাতত এখানেই বন্ধ রাখা হলো। নিচে যাওয়ার পর আগের মতোই সবাই স্বাভাবিক থাকবে। কাউকে কিছুই বুঝতে দেওয়া যাবে না।”
সকলে একসাথে সম্মতি জানালো। অতঃপর ওরা রুম থেকে বের হলো নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

অনুর নিঃশ্বাস ভাড়ি হয়ে এসেছে। ইলমা বললো….
—”অনু! সমস্যা হচ্ছে তোমার কোনো? তোমার চোখজোড়া কেমন লাল দেখাচ্ছে।”
অনুর কানে যেনো ইলমার কথাগুলো পড়লো না। অনু কেমন ঘোর লাগা স্বরে বললো…..
—”ও-ওরা আমাদের পিছনে ধা*ওয়া করছিলো। আমি মায়ের সাথে ছুটতে ছুটতে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে দেখেছিলাম বাবার হাতে একটা দাঁ ছিলো। আর তার সাথের লোকগুলোর হাতে মোটা মোটা লাঠি ছিলো। মনে হচ্ছিলো বাবা একবার আমাদের ধরতে পারলে নিশ্চিত মে*রেই ফেলবে। বাঁচার কোনো উপায় নেই।”
অনুর চোখজোড়া আরো লাল হয়ে আসছে। ইলমার কাছে ভিষণ অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে অনুকে। অনু তৎক্ষনাৎ দু’হাটু ভাঁজ করে দু’হাতে পা দু’টো জড়িয়ে ধরে বললো…..

—”মা আমায় বললো, ‘ট্রেন এখুনি এসে যাবে। আর একটু সময় ঐ জা*নো*য়া* গুলোর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে মা। আর একটু ছুটতে হবে। একবার ট্রেনে উঠে পড়লে ওরা আর তোর নাগাল পাবে না।’ আমি ছুটতে ছুটতেই মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুমিও যাবে তো আমার সাথে মা!’
মা আমার কথার উত্তর দিলো না। আমি আরো কয়েকবার একই প্রশ্ন করলাম। ‘বলো না মা! বলো! যাবে তো আমার সাথে তুমি! যাবে না?’ মা তবুও কিছু বললো না। মায়ের এই নীরবতা আমার ভিতরে অ*শান্তির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো। আমি সামনের দিকে আর লক্ষ্য না করায় হোঁ*চ*ট খেয়ে পড়ে গেলাম সেখানেই। পায়ে প্রচন্ড ব্য*থা লাগলো। পা ধরে ‘মা গোওও’ বলে চিল্লিয়ে উঠলাম। মা থেমে আমার পায়ের কাছে বসলেন। পায়ের দিকে লক্ষ্য করতেই দেখলাম অনেকটা জায়গা আধ পাঁকা মেঝের উপর ঘষা খেয়ে ছাল উঠে গিয়েছে। র*ক্তও পড়ছে। কি ভিষণ জ্বা*লা করছিলো! মা পিছন ঘুরে দেখলেন বাবা ও তার সঙ্গীরা আমাদের অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে। কিন্তু আমার পায়ের যে অবস্থা হয়েছিলো আমার পক্ষে আর ছোটা সম্ভব ছিলো না। এই আ*ঘা*ত-ই কাল হয়ে দাঁড়ালো।”

অনু থামলো। পায়ের উপর থেকে একহাত সরিয়ে গলার উপর রাখলো। ইলমার দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”একটু পানি দিবে আপা! খুব তেষ্টা পেয়েছে।”
ইলমা তৎক্ষনাৎ বিছানা থেকে নেমে টেবিলের উপর থেকে একটা গ্লাসে পানি নিয়ে আবারও অনুর কাছে এসে বসে ওর দিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিতেই অনু এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি পান করলো। তারপর শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করলো অনু। যেনো এই পানিটুকুও পান করা ওর জন্য অনেক বড় পরিশ্রমের বিষয় ছিলো। হাপড়ের মতো অনুর বুকটা উঠানামা করছে।
অনু আবারও বলা শুরু করলো…..

—”আমি পায়ের ব্য*থায় কেঁ*দে ফেলেছিলাম। মা তখন আমার পাশ থেকে উঠে নিচে রেললাইন এর ধার থেকে অনেকগুলো পাথর উঠিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলে নিয়ে। আমি মায়ের কাজ অবাক চোখে দেখছিলাম। মা আমার পিছনে এসে দাঁড়ালেন। বাবা ও তার সঙ্গীরা থামলেন আমাদের থেকে ১ হাত দূরত্ব বজায় রেখে। বাবা বি*শ্রী ভাষায় মা’কে গা*লি দিলেন, ‘খা** মা*, ভরা যুবতী মেয়ে নিয়ে এই মাঝরাতে ভা*গ*তেছিস নয়া না* জুটিয়েছিস নাকি! আজ তোর না* গিরি ছু*টামু আমি। বহুত বার বাড়ছোস তুই।’ মা বললেন, ‘খবরদার এক পা বাড়াবে না সামনের দিকে। নয়তো এই পাথর গুলো দিয়ে তোমাদের সবার মাথা ফাঁ*টিয়ে ফেলবো আমি।’ বাবা বি*শ্রী ভাষায় তাঁর সঙ্গীদের বললেন, ‘কি রে এই একটা ফিলফিলে শরীরের বুড়ি মা** কথায় তোরা ভ*য় পাইয়া গেলি নাকি? ধর মা**, মা*র আগে জায়গা মতো। এমনেই কা*বু হইয়া যাবো। কিন্তু শোন মাইয়ার গাঁয়ে হাত দিবি না। এই মাইয়া আমার সোনার ডিম পাড়া হাঁস। চেয়ারম্যানের আমানত। এর গায়ে আঘাত লাগলে চেয়ারম্যান আমারে কোনো টেকা দিবো না।’ আমি ছলছল নয়নে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভাবছিলাম, ‘উনি কি আদেও আমায় জন্মটুকুও দিয়েছিলেন? যদি দিতেন তাহলে আমার জন্য আল্লাহ কেন তার মনে এতোটুকুও দয়া-মায়া দেন নাই? কেন?”
অনু থামলো আবারও। ইলমার দু’চোখ ছলছল করে উঠেছে। বুকের ভেতরটাতে যে কেমন বা*জে রকম অনুভূতি গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে তা ইলমার কাছে ভাষায় প্রকাশ করার মতো মনে হচ্ছে না৷

সারফারাজ, পিহু, নীরা, তেজ, নির্ঝর একসাথে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলো। তেজের দৃষ্টি ড্রয়িংরুমের দিকে পড়তেই তেজ ভ্রু কুঁচকে বললো…..
—”আরে, জাকির!”
বাকিরাও ড্রয়িংরুমের দিকে তাকালো। পিহু ব্যতিত ওরা ৩ জনও জাকিরকে চিনে। ওরা সকলে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ালো। মোস্তফা খান ব্যতিত পরিবারের বাকি পুরুষ গুরুজন সদস্যরা কেউ উপস্থিত ছিলেন না এখানে। মহিলা সদস্যরা আছেন বটে। জাকির সোফাতেই বসে আছে। তেজ জাকিরকে উদ্দেশ্য করে বললো….

—”তুই কখন এলি?”
জাকির হাসিমুখে বললো…..
—”এইতো একটু আগেই এসেছি। তুই তো এখন খুব ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিস আমার কফিশপে আগের মতো তোর দেখাই পাওয়া যায় না।”
তেজ বললো….
—”হুম টুকটাক কাজে একটু-আধটু ব্যস্ত ছিলাম।”
পিহু নীরার দিকে হালকা ঝুঁকে বললো….
—”কে এই লোক?”
নীরা ফিসফিসিয়ে বললো….

—”তেজ ভাইয়ার অনেক ছোট বেলা বন্ধু। ২ বছর আগে আমি যখন বাড়িতে ছিলাম তখন উনাকে প্রায়ই এখানে আসা-যাওয়া করতে দেখতাম। ভালো সম্পর্ক মেজো ভাইয়ার সাথে ওনার।”
—”ওওও আচ্ছা।”
পিহু ভ্রু যুগল কিন্ঞ্চিত কুঁচকে জাকিরের দিকে তাকিয়ে আছে। পরণে কলিজা রংয়ের শার্ট ও কালো রংয়ের প্যন্ট পরিহিত পুরুষ জাকিরের বর্ণ শ্যমলা, উচ্চতা সাড়ে ৫ ফিট হবে, স্বাস্থ্যও বেশ ভালো। নির্ঝর তেজের দিকে হালকা ঝুঁকে বললো….
—”ইলমাকে কি জাকির ভাইয়ের কফিশপেই চাকরিটা নিয়ে দিয়েছিলে তুমি ভাই?”
তেজ ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিলো। অতঃপর তেজ, সারফারাজ সহ বাকিরা সোফায় বসে পড়লো। নির্ঝরের মা শিউলি হাসিমুখে বললেন….
—”তুমিও তো এখন আর আগের মতো আসো না আমাদের বাসায় বাবা!”
জাকির বললো….

—”আসলে চাচী ব্যবসাটা এখন ভালো চলছে আমার আলহামদুলিল্লাহ। পাশাপাশি নতুন আরো দু’টো রেস্টুরেন্ট খুলেছি তো তাই সবদিক হেন্ডেল করতে করতেই কোনদিক দিয়ে যে সময়গুলো পেরিয়ে যায় বুঝতেই পারি না।”
নীরার মা আতুশি ট্রে-তে করে সবার জন্য চা-নাস্তা নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসলেন। টি-টেবিলের উপর রেখে শিউলির পাশে বসে পড়লেন আতুশি৷ তাহমিনা বললেন…..
—”তবুও বাহ্যিক কাজের ভিঁড়েও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করতে হবে তোমায় বাবা। নয়তো জীবনটা একঘেয়েমি হয়ে যাবে দ্রুতই।”
জাকির প্রতিত্তুরে কেবল হাসলো। কিছু বললো না। নির্ঝর আবারও তেজের দিকে কিছুটা ঝুঁকে বললো….
—”ভাইয়া, অনেকদিন আগে জাকির ভাইয়ের নামে আমি একটা নিউজ শুনেছিলাম। কতোটা সত্য তা জানি না। নানান তালে তা তোমার সাথে শেয়ার করাও হয় নি।”
তেজ বললো….

—”আপাতত চুপ যা, পরে শুনবো সে বিষয়ে।”
নির্ঝরও কথা বাড়ালো না। তাহমিনা সবাইকে চা পরিবেশন করলেন। আতুশি চায়ের কাপে একবার চুমুক দিয়ে বললেন…..
—”তো বাবা, একা আসলে যে তুমি? বউমাকেও সাথে আনলে পারতে।”
জাকির বললো….
—”চাচী, আমার এখনও বিয়ে হয় নি।”
আতুশি আগ্রহ এবার আরো কিছুটা বাড়লো। নড়ে-চড়ে বসে তিনি বললেন….
—”কি বলো! এতো বড় ব্যবসা তোমার, সেটেল্ড লাইফ, এখনও বিয়ে করো নি যে!”
—”মনের মতো মেয়ে পাচ্ছি না। পেয়ে গেলে অবশ্যই করবো।”
নীরার মনোযোগ এইমূহূর্তে অন্যত্র রয়েছে। নীরা ওর ফোন থেকে মেসেজে কানাডায় ওর বাসার বিশ্বস্ত কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলছিলো প্রেগ্ন্যাসির রিপোর্টগুলো পাঠানোর বিষয় নিয়ে। শিউলি ফিসফিস করে আতুশিকে বললেন…..

—”ছেলে হিসেবে জাকির কিন্তু মন্দ নয় ছোট। আমাদের নীরারও তো বিয়ের বয়স হয়েছে। একবার ওর আলাপটা ফেলা গেলে ভালোই হতো।”
আতুশি গলা খাঁ*কড়ি দিলেন তৎক্ষনাৎ। মোস্তফা খান বললেন…..
—”যদি এই বুড়োর প্রতি তোমার ভরসা থাকে তাহলে নাতবউ খোঁজার মহৎ কাজটা কিন্তু আমি করে দিতে পারি জাকির দাদুভাই।”
জাকির হেসে বললো…..

—”তুমি যদি দায়িত্বখানা নাও তাহলে আমি বড্ড নিশ্চিন্ত হবো দাদু। জীবনসঙ্গিনীকে নিয়ে আর কোনো চিন্তাই থাকবে আমার।”
অতঃপর ওরা আরো কিছুসময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প গুঁজব করলেন। কিয়ৎক্ষণ পর বড়রা নিজ নিজ রুমে চলে গলেন। সারফারাজও জরুরি কাজে বাহিরে চলে গিয়েছে। পিহুকে নিয়ে নীরা ওর রুমে গিয়েছে। নির্ঝর সোফাতেই বসে আছে বাবুসাহেব হবে। কোলের উপর গরম গরম ভাঁজা পিঁয়াজু-সিঙারা আর ৩ রকম রঙের মিক্সড ছানার মিষ্টির প্রিচগুলো নিয়ে রেখেছে। খাবার গুলোর উপর লোভনীয় দৃষ্টি স্থির করেছে নির্ঝর। জাকির আর তেজ মূল দরজার দিকে হাঁটছে। জাকির বললো…..

—”তুই যে নতুন মেয়েটাকে আমার কফিশপে কাজে ঢুকিয়ে দিলি সে তো ভিষণ টাইম-ইনসেনসিটিভ মেয়ে। গতকাল ১ম দিন ছিলো ওর। কাজে এসেছিলো প্রায় ১ঘন্টা দেড়ি করে। এখানে আসার আগে একবার গিয়েছিলাম কফি-শপে। আজ তো কাজেই আসে নি মেয়েটা। এভাবে চললে কি হবে তুই বল ভাই!”
তেজ মনে মনে বললো….
—”সবকিছুর ভিঁড়ে ইলমার খোঁজই নেওয়া হয়ে উঠে নি আমার। কোনো স*মস্যা হয় নি তো ওনার? আর ঐ নতুন মেয়েটা ওনার পাশের রুমের! কেমন না কেমন তাও তো ক্লিয়ারলি জানা হয় নি। আজ একবার যেতে হবে ওখানে।”
ভাবনা থেকে বেড়িয়ে তেজ জাকিরকে উদ্দেশ্য করে বললো….
—”আমি ইলমার সাথে কথা বলে দেখছি কি হয়েছে ওনার, কেনো কাজে যায় নি আজ। নতুন তো একটু ছাড় দে না হয়।”

—”হুম, তোর রেফারেন্সে কাজে নিয়েছি জন্যই আমি ওর প্রতি কঠোর হই নি। নয়তো অন্য কেউ হলে বুঝতো এই জাকির কি জিনিস!”
—”ওনার প্রতি কঠোরতা দেখালে সেইসব নিয়ে কোনো অভিযোগ উনি আমায় করলে তোর কফিশফ এর ব্যবসা লাঁ*টে উঠিয়ে দিবো ব্যটা।”
জাকির হেসে বললো….
—”বাপরে, আমি তো ভ*য় পেয়ে গেলাম বন্ধু। বাই দ্যা ওয়ে, কোনো চক্কর-টক্কর চলছে নাকি ওর সাথে তোর? ভাবী বানানোর নিয়ত করছিস নাকি!”
তেজ বললো….

—”আরে নাহহ, কি যে বলিস তুই। ওসব কিছুই নেই আমাদের মধ্যে।”
—”তোর থেকে যদি না হয় তেমন কিছু তাহলে বরং চান্সটা আমিই নেই। মেয়েটা কিন্তু হেব্বি সুন্দরী আছে।”
জাকিরের বলা এই কথাটা তেজের কেনো যেনো একটুও ভালো লাগলো না। বুকের ভিতরটাতেই ধপ করেই যেনো কিছু একটা আগুনের ফুলকির জ্ব*লে উঠলো। তেজ ওর হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে বললো….
—”ইলমাকে সামলানো তোর পক্ষে সম্ভব না। তোর জন্য ভালো হবে ওনার থেকে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে চলা। ভিষণ সাং*ঘা*তিক মেয়ে উনি।”
—”মেয়ে তো মেয়েই। একজন পুরুষ মানুষের থেকে বেশি সাং*ঘা*তিক কখনও মেয়ে হতে পারে নাকি! তবুও তুই যখন বলছিস তখন ভাবছি না আর ওকে নিয়ে। থাকবো দূরেই।”
তেজ আর কিছু বললো না। অতঃপর জাকির চলে গেলো।
অনু বললো…..

—”বাবার ঐ বি*শ্রী ভাষায় বলা কথাগুলো মা নিতে পারলেও বাবা যখন আমায় চেয়ারম্যানের কাছে টাকার বিনিময়ে একপ্রকার বিক্রিই করে দেওয়ার মতো কথাটা বললেন তখন তাঁর মাথায় মনে হয় র*ক্ত চেপে বসেছিলো। মা তাঁর পেটের কাছে আঁচলের মাঝে জমানো পাথরগুলো সমানে বাবা ও তাঁর সঙ্গীদের দিকে ছুঁ*ড়*তে শুরু করলেন। মায়ের আকস্মিক এমন কাজে ওনারা সবাই পিছিয়ে যেতে থাকলেন। মাথায়, বুকে শরীরের আরো বিভিন্ন জায়গায় পাথর গুলো লাগছিলো তাদের৷ ফলস্বরূপ ক্ষ*তের সৃষ্টি হচ্ছিলো। কেউ এগিয়ে এসে মা’কে থামানোর সাহস পাচ্ছিলো না। তখুনি জোর শব্দে স্টেশনের মাটি কাঁপিয়ে ট্রেনটা আসলো। আমাদের পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে ট্রেনটা যেতে শুরু করলো।

মা চিৎকার করে আমায় বললেন, ‘উঠ অনু, উঠ, ছুট যা। ট্রেন যে আইসা পড়ছে। আমরা অনেকটা আগাইয়া আইসা পড়ছি। ট্রেন যে উল্টোদিকে থামবে। ওখানে আবারও যেতে হবে। নয়তো ট্রেনে উঠতে পারবি না। উঠ অনু।’ আমি বললাম, ‘মা, আমি তোমায় ছাইড়া যামু না। তুমিও চলো আমার সাথে।’ মা ধ*মকে উঠলেন। অনুরোধ করে বললেন, ‘জিদ করিস না মা। আমি তোর লগে গেলে এই জা*নো** গুলোর হাত থেকে তোরে বাঁচাতে পারমু না। আমার জীবন তো শেষ-ই। তোর জীবনের কেবল শুরু। তোরে যে বাঁচতে হইবো। উঠ তুই। আর দেড়ি করিস না।’ আমি কয়েকবার, ‘না’ করলেও মা শুনলো না।

মায়ের আঁচলে জমা পাথরগুলো ফুরিয়ে এসেছে। বাবা ও তাঁর সঙ্গীরা পাথরের আঘা*তের ব্য*থায় নিচে কেউ বসে পড়েছে তো কেউ সেন্স হারিয়ে শুয়ে পড়েছে। ওনারা আবারও উঠে দাঁড়াতে সময় লাগবে না। আমি ক*ষ্টে-সৃষ্টে উঠে দাঁড়ালাম। তখুনি বাবাও উঠে দাঁড়ালেন। উনি মায়ের দিকে দাঁ নিয়ে এগিয়ে আসলেন। আমি সামনে না এগিয়ে মা’কে বাবার কোঁ*প থেকে বাঁচাতে তাঁর দিকে এলাম। একপ্রকার ধ*স্তা-ধ*স্তি শুরু হলো আমাদের মাঝে। আর তখুনি, তখুনি……!”

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৩)

অনু থামলো। ইলমার সর্বশরীরের লোপকূপ দাঁড়িয়ে গিয়েছে। গা হিম করার মতো এই অনুভূতি। ইলমার মনে হচ্ছে অনুর বলা কথাগুলো সে চোখের সামনেই হতে দেখছে। অনুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। চিপের আগাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা ঘাম।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৫)