Home প্রেমতৃষা প্রেমতৃষা পর্ব ৫০

প্রেমতৃষা পর্ব ৫০

প্রেমতৃষা পর্ব ৫০
ইশরাত জাহান জেরিন

লোকটি দেশলাই জ্বালিয়ে তৃষার সামনে ধরতেই এবার তার গাঢ় বাদামী রঙের ফক্স আইগুলো তৃষার চোখে ধরা দেয়। তৃষা মুহূর্তেই আওরায়, “প্রেম আপনি?”
“কেন? অন্য কাউকে আশা করেছিলে নাকি সোনা?”
“ভূতের মতো ভয় দেখিয়েছেন কেন?”
“কারণ আমি তোমাকে ভয় দেখাতে ভালোবাসি। আমার ভালোবাসা খুব শক্ত আর হিংস্র বুঝলে তো। প্রেম তার নীতিতে প্রেম দিতে ভালোবাসে। সবার থেকে আলাদা সে। আলাদা ভাবেই রোমান্স করতে সে পারদর্শী।”
তৃষা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। কি ভয়টাই না পেয়েছিল। এমা প্যান্ট ভিজে যায়নি তো? আরেকটু হলে অবশ্যই যেত। শালার জীবন। প্রেমও উঠে দাঁড়ায়। তৃষার গালে আলতো করে হাত দিতেই শীতল স্পর্শে কেঁপে উঠে তার বুক, তার সর্বাঙ্গ।

“কি করছেন?”
“করলাম কোথায়? তবে করব।”
“ইশ এখন মুড নেই। আচ্ছা এত বড়লোক হয়ে লাভ কি? যদি বাসায় কারেন্ট না থাকে? আপনার বাসায় জেনারেটর বা আইপিএস নেই?”
“আমার বাসায় আমি আছি তাতে পোষাবে না? আবার জেনারেটর আর আইপিএসকে দিয়ে কি করবে? চরিত্র ঢিলা হয়ে গেল নাকি?”
“আরে যন্ত্রের কথা বলেছি। আইপিএস আর জেনারেটর মেশিন।”
“মেশিনের সুইচ বন্ধ করে দিয়েছি।”
“প্রেম।”
প্রেম সুগন্ধি মোমবাতিটা জ্বালালো। পরপর কয়েকটা। তাতেই রুমে একটা মিষ্টি ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। প্রেম তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজকে আমি তোমার দিকে তাকাবো, আর তুমি আয়নার দিকে।”
“মানে?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

প্রেম কথা না বাড়িয়ে মোমের আলতো আলোতে রুমের সুদীর্ঘ আয়নার ওপর থেকে পর্দাটা সড়িয়ে দিয়ে তৃষাকে তার সামনে দাঁড়া করালো। তৃষা তখনো বুঝতে পারছে না এই উন্মাদ প্রেম নেওয়াজ কি চাইছে। হঠাৎ আলতো করে প্রেম তৃষার চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ের কাছের সেই বাটারফ্লাইটা ছুঁয়ে দেখল। তারপর তাতে আলতো চুমু বসিয়ে দিলো। মুহূর্তেই তা মৃদু কাঁপনে বদলে গেল। তৃষার ছটফটানি, উত্তপ্ত নিঃশ্বাস প্রেমের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে তৃষাকে আরো গভীর স্পর্শে ডুবিয়ে দিলো। তৃষা তার স্পর্শে যত বেশি মরিয়া হচ্ছে প্রেমের ঠোঁটের কোণের হাসি যেন ততই বেড়ে চলেছে। তৃষার শিহরণে চোখ দু’টো বন্ধ হয়ে আসতেই প্রেম আলতো করে তার গাল চেপে ধরে তাকে আয়নার দিকে তাকাতে বাধ্য করল। তারপর হাস্কি কন্ঠে ফিসফিস করে বলল, “আয়নার থেকে চোখ সরাবে না। আজকে আমি তোমাকে দেখব, আর তুমি আয়নায় নিজেকে দেখবে সোনা।”

ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে, প্রেম তৃষা। প্রেম নেওয়াজ তৃষাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
“তো বিটারহার্ট!” প্রেমের গলায় আদরের গাম্ভীর্য, “ভালোবাসা কেমন লাগল?”
তৃষা লজ্জায় গম্ভীর মুখে বলল, “ইশরে, আপনি আবার জিজ্ঞেস করছেন? বেহায়া লোক একটা!”
প্রেম হেসে ফিসফিস করল, “বউয়ের জন্য বেহায়া হাওয়া দোষের না, গুনের। বুঝলে তো?”
“না, বুঝিনি।” তৃষার ঠোঁটে ক্ষীণ অভিমান।
“আসো তাহলে আবার বুঝাই,” প্রেম আরেকটু কাছে টানল।
“একটা দিবো ধরে!” তৃষা ধমকে উঠল।
“তুমি দিলে আমার নিতে বাঁধা কিসে?”
“প্রেম!”
“আচ্ছা আচ্ছা, সরি সোনা।” প্রেমের স্বর বদলে গেল।
তৃষা একটু চুপ থেকে বলল, “প্রেম… আপনাকে একটা কথা জানানোর ছিল।”
“সেটা একটু পরে শুনি?” বলেই প্রেম তৃষাকে নিয়ে উঠে দাড়াল। তারপর বলল, “আগে একটু চোখ বন্ধ করো। একটা জিনিস দেখানোর আছে।”

“আবার কী?” তৃষা বিরক্ত হলেও চোখ বন্ধ করল।
“আরে, একটু দেখোই না…”
তৃষা চোখ বন্ধ করতেই প্রেম তার হাতের তালুর ওপর কিছু একটা রাখল।
“এবার চোখ খুলো,” সে ফিসফিস করে বলল। চোখ মেলতেই তৃষার নিঃশ্বাস থমকে গেল। তার হাতের তালুতে ঝকঝকে দুটো ভিআইপি কনসার্ট টিকিট, সেই প্রিমরোজ ব্যান্ডের, যেটা দেখার জন্য সেই কবে থেকে সে তার বুকের ভিতর বইতে থাকা কঠিন ঝড় সামলাচ্ছিল।
তৃষার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। “এমা… এটা… এটা তো সেই কনসার্টের টিকিট!”
প্রেম মাথা নিচু করে হাসল। তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেবল বলল, “বিটারহার্টের স্বপ্ন পূরণ করাটা আমার নিজের চেয়েও বেশি জরুরি আন্ডারস্ট্যান্ড সোনা?”

কনসার্টের রাত। আকাশে ঝকঝকে তারা, বাতাসে কেমন একটা আর্দ্রতা। শহরের আলো দূরে ঝলমল করছে, কিন্তু এখানকার মঞ্চ আলোর ঝলকে যেন এক আলাদা জগৎ তৈরি করেছে। তৃষা ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে সবটুকু খেয়াল করতে লাগল। মঞ্চ সাজানো হয়েছে ঝকঝকে রঙিন লাইটে, লাল-নীল সব আলো একসাথে নাচছে, বিটের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে। ব্যান্ডের যন্ত্রপাতি ঝকঝক করছে, গিটার, ড্রাম, কীবোর্ড সবকিছু যেন পেশাদার নিখুঁত। মঞ্চের পাশে কয়েকটা বিশাল স্ক্রিনে ব্যান্ডের লোগো জ্বলজ্বল করছে। ধীরে ধীরে ভিড় জমছে। সবাই উত্তেজনায় মুখে হাসি, চোখে উদ্দীপনা।

তৃষা ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল—কেউ লাইটের দিকে তাকিয়ে, কেউ ফোনে মুহূর্তগুলো ধরে রাখছে, কেউ গান গাইছে। কনসার্ট এখনো শুরু হয়নি। তৃষা শিমলার দিকে তাকালো। অংকুরের হাত ধরে আছে সে। দু’জনের কি মাখোমাখো প্রেম। তৃষা একটা নিশ্বাস ছাড়ল। তার পাশে যে প্রেম নেই। তৃষার আজকে দুপুরের কথা মনে পড়ে গেল। দু’দিন ধরে করা পরিকল্পনা সব নষ্ট হলো। আজকে দুপুরে তৃষা জরুরি কিছু জিনিসপত্র যখন প্যাক করছিল তখন প্রেম তার সঙ্গেই ছিল। হঠাৎ তার একটা কল এলো। কথা বলে কল রাখতেই প্রেম বলল,
“বিটারহার্ট… একটা জরুরি রেসের শিডিউল পড়ে গেছে। স্পনসাররা আজই সময় দিয়েছে। মিস করা মানে পুরো টিমের ক্ষতি… আমি..”
তৃষা কথা শেষ হতে দিল না। “মানে আপনি আজ কনসার্টে যেতে পারবেন না?”
ওপাশে ভয়ানক নীরবতা। তারপর প্রেম খুব আস্তে করে বলল,“চেষ্টা করব তাড়াতাড়ি শেষ করে আসতে। প্লিজ রাগ করো না, সোনা।”

তৃষা ঠোঁট কামড়ায়। চোখ হঠাৎই ঝাপসা হয়ে আসে। যে স্বপ্নটা বুকে লালন করছিল… আজ সেই দিনে প্রেম থাকবে না? কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসে। “হুম। ঠিক আছে। কাজটা আগে করা দরকার” — অন্তত একজন বাইক রাইডার হিসেবে তো এসব তৃষাকে বলতেই হতো।
তৃষা একবার টিকিটের দিকে তাকালো। টেবিলের ওপর রাখা ভিআইপি টিকিট দুটো যেন উপহাস করছে—একটি যাত্রী অনুপস্থিত।

গাড়িতে তুলে দেয় তৃষাকে প্রেম। প্রেম নিজে যেতে পারছে না বলে অংকুরকে পাঠিয়ে দিয়েছে। আর শিমলা তো আছেই। দেখা যাক পুরান ঢাকার কাজ শেষ করে ঢাকায় পৌঁছানো যায় কিনা! তৃষার কিছুই ভালো লাগছে না। এখানে এত মানুষের ভিড়! সুবিশাল একটা স্টেডিয়াম। তবে যাকে সে খুঁজছে সে তো নেই।
তৃষার আজ কিছুতেই মন বসছে না। এত মানুষের ভিড়ে তার শ্বাসরুদ্ধ লাগছে। সুবিশাল এই স্টেডিয়াম। চারদিকে আলো, ধাতব শব্দ, তীব্র উত্তেজনা। অথচ যার সন্ধান সে করছে, যে মুখটিকে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে তো নেই। প্রেমের অনুপস্থিতি তার চারপাশের উজ্জ্বলতা ধুয়ে মুছে যেন নিস্তেজ করে ফেলছে। কিন্তু ঠিক তখনই চারদিকের হট্টগোল আচমকা চূড়ান্তে পৌঁছে গেল। মানুষের ঢেউয়ের মতো গর্জন ছড়িয়ে পড়ল স্টেডিয়ামজুড়ে। শিমলা তৃষার বাহু ধরে টেনে ফিসফিস করে বলল, “আরে, পেছনে দেখ তৃষা… আঁধার আসছে!”
তৃষা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই মুহূর্তটা থমকে গেল। দর্শকসারির মাঝখান দিয়ে সোজা স্টেজ পর্যন্ত একটি সরু আলোর পথ তৈরি হয়েছে। সেই পথ ধরে এগিয়ে আসছে কালো হুডি পরা দীর্ঘদেহী এক পুরুষ। তাকে ঘিরে আছে পনেরো–বিশজন নিরাপত্তাকর্মী। হুডির নিচে তার মুখ পুরোপুরি ঢাকা। কেবল মাস্কের ওপরে থাকা চোখদুটো স্পটলাইটের আঘাতে ঝলসে উঠছে। দুইপাশে দাঁড়ানো মানুষজনগুলো তাকে ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, কেউ কেউ সিকিউরিটির বাহু এড়িয়ে সামান্য সামনে ঝুঁকে পড়ছে। ভিড়ের উত্তেজনা এতটাই তীব্র যে মনে হয়, মুহূর্তের ব্যবধানে দাঙ্গার মতো বিশৃঙ্খলা শুরু হতে পারে।

তৃষার ভিআইপি সিটটি ঠিক সেই পথের একেবারে সামনে। তাই আঁধারকে এত কাছ থেকে দেখার ভাগ্য তারও হলো। স্পটলাইটের কঠিন আলোয় কালো হুডির ছায়া আরও গভীর হয়ে ওঠে, আর সে যখন কাছে আসে, তৃষার চারপাশের সমস্ত শব্দ এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তবে এত নিরাপত্তাকর্মীর ভিড় ঠেলে তার দেখা পাওয়া আসলেই অনেক মুশকিল।
স্টেজের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে। চারপাশে গাঢ় নীল অন্ধকারের ঢেউ নেমেছে। কেবল মাঝখানের স্পটলাইটটি ধীরে জ্বলে উঠছে। একটি সূক্ষ্ম, রুপালি আলোর সরু স্তম্ভ, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে কালো হুডি পরা আঁধার। তৃষার নিশ্বাস আটকে যায়। পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে অতল নিস্তব্ধতা। হাজার মানুষের ভিড় থাকা সত্ত্বেও কারও গলা থেকে শব্দ পর্যন্ত বেরোচ্ছে না। যেন সবাই একসাথে শ্বাস রোধ করে বসে আছে এই মুহূর্তটির অপেক্ষায়। হঠাৎই স্টেজের পেছন থেকে মৃদু সাউন্ডের কম্পন উঠল। ড্রামের ধুকধুক শব্দ বাজল। আঁধারের গায়ের সঙ্গে একটা গিটার। সেই ইলেকট্রিক গিটারের ধোঁয়াটে সুর বেজে উঠল। আঁধার স্পটলাইটের নিচে তার ইলেকট্রনিক গিটার বাজিয়ে গান ধরল,

~ প্রেমেরই আবেশে আমার বারেবার
বুক ভাসে….
তোমারই উষ্ণ প্রেমতৃষায়
আমি হারিয়ে ফেলি শুধুই আমায় ~
গানটা শেষ হলো নিভে যাওয়া মোমের শিখার মতো। মুহূর্তেই সেই নীরবতা ভেঙে ছুঁড়ে ফেলল পুরো স্টেডিয়াম। একসাথে হাজার কণ্ঠ ফেটে পড়ল, “মুখটা দেখাও! আঁধার! মুখটা দেখাও!!” “ফেস রিভিল! ফেস রিভিল!” “একবার হুডি খুলে দেখাও!” “মাস্ক ওপেন!!”

চিৎকার, করতালিতে মুখরিত চারদিক। মিডিয়ার ক্যামেরার আলোর ঝলকানিতে পুরো স্টেজ ঝলসে উঠল। তৃষার ভেতরটাও দুলে গেল। আঁধার এতক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের মূর্তির মতো ছিল। চিৎকারে তার হুডির ছায়া মৃদু দুলে উঠল। মাস্কের নিচে তার ঠোঁটের রেখা দেখা যায় না, কিন্তু তবুও মনে হলো যেন সে মৃদু হাসল—নাকি তৃষাই ভুল দেখল? তবে যদিও আলোর কারণে ভালো করে চোখটাও দেখতে পাচ্ছে না। তবুও চেনা লাগছে, খুব চেনা। স্টেডিয়ামের আলো আবার কিছুটা ম্লান হল। আঁধার মাইকের সামনে এগিয়ে এসে গলা পরিষ্কার করল। নিঃশব্দতা নেমে আসার আগেই তৃষার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। এবার কি সে মুখ দেখাবে? নাকি আবার অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে? আঁধার মাস্ক মুখের ওপর থেকে সরানোর আগে হুডি নামিয়ে দিলো। তার কানের ইয়ারপিসটা এখন স্পষ্ট। তবে তৃষার বুকের আতঙ্ক যেন আরো বেড়ে গেল। কী আন্দাজ করছে সে? হঠাৎ শীতল সেই কণ্ঠস্বর ভেসে এলো মাস্কের নিচ থেকে, “এই গানটা আমার নিজের লেখা, নিজের সুর করা। গানটি আমার ভালোবাসার চিহ্ন। তাই যাকে ঘিরে এই গান তাকে গানটি উৎসর্গ করলাম। এতদিন আপনারা অন্ধকারের গায়ক আঁধারকে চিনেছেন, আজকে আঁধারকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনা আলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব।” বলেই সে তৃষার দিকে তাকায় এবং মুখ থেকে মাস্ক খুলে বলল—

“মাই বিটারহার্ট, মাই প্রিমরোজ… কাম হিয়ার।”
তৃষা এখনো বুঝতে পারছে না— সে কি জেগে স্বপ্ন দেখছে নাকি বাস্তব?
এখনো কি ঘুমের মধ্যে আছে?
তার শরীর অবিশ্বাসে কাঁপছে।
কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে।
যা বলে বোঝানোর মতো নয়।

তৃষার ভেতর ঢেউয়ের মতো কাঁপুনি উঠল। চারপাশের মানুষ যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকাল। কেউ আশ্চর্যে, কেউ উত্তেজনায়, কেউ অবিশ্বাসে। পরমুহূর্তে জনতার ভিড় চেয়ারে ঠুকঠুক আওয়াজ তুলে, হাত উঠিয়ে, গলা ভেঙে চিৎকার করে তাকে স্টেজে যেতে বলতে লাগল। পাশ থেকে শিমলা ঠেলে দিয়ে বলল, “আরে যাহ জলদি। দুলাভাইয়ের সারপ্রাইজ দেওয়ার লেভেল তুঙ্গে।” তৃষার হাঁটু কাঁপতে কাঁপতে সে এগিয়ে যায় মঞ্চের দিকে। লাইটগুলো সরে গিয়ে পথ তৈরি করে দেয় তার জন্য। যেন পুরো কনসার্ট তার এক পা সামনে বাড়ানোর অপেক্ষায়। মঞ্চে পা রাখা মাত্র প্রেম নেওয়াজ তৃষার হাত নিজের মাইকের সামনে তুলে ধরে নরম গভীর কণ্ঠে বলল,
“এই হল আমার আলোর উৎস, আমার স্ত্রী তৃষা নুজায়াত। যাকে এক অসীম ভালোবাসায় ভালোবাসি আমি।”
তৃষার চোখে জল জমে, গলার কাছে ঢেউয়ের মতো কিছু আটকে যায়। সে এখনো ভাবতে পারছে না… এটা কি সত্যি ঘটছে? নাকি সে এখনো কোনো অপার স্বপ্নে ডুবে আছে? কিন্তু প্রেমের হাতের উষ্ণতা, তার চোখের গভীরতা, আর সেই ঘোষণা, যে তাকে পুরো বিশ্বের সামনে “স্ত্রী” বলে পরিচয় করিয়ে দিল। সবই বলে দিচ্ছে… এটা আর স্বপ্ন নয়।
এটা তার জীবনের সবচেয়ে বাস্তব মুহূর্ত।
প্রেম তৃষার চোখের জল আলতো করে মুছে দিয়ে বলল,

“এই দিনটার জন্যই আমার এত অপেক্ষা ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো তৃষা। কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বলো তো? তৃষা! তোমাকে ভালোবাসি। এই যে আজ সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি—তোমায় আমি আমার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি। তুমি এভাবেই এই আঁধারের জীবনে আজন্ম, জন্মদাগের মতোই থেকে যাবে তো?”
তৃষা আর নিজেকে থামাতে পারল না। হাজারো মানুষের সামনে হুড়মুড় করে আঁধারের বুকে ঢুকে গেল। চারদিকে দর্শকের চিৎকার, করতালি, আলো–ঝলমলে উন্মাদনা… পুরো পরিবেশ মুহূর্তেই আরও মুখরিত হয়ে উঠল। প্রেমও অবাক না হয়ে পারে না, তবে সেই অবাকের মাঝেই সে তৃষাকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। তৃষার চোয়ালে আলতো হাত রেখে গভীরভাবে চোখে চোখ মিলায়। সেই দৃষ্টির পরেই এক ঝটকায় হাজারো মানুষের সামনে তৃষার ঠোঁটে চুমু এঁকে দিল প্রেম। দু’জনের ঠোঁট এক হয়ে যায়, স্টেডিয়াম যেন নিঃশ্বাস ফেলে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু ঠিক সেই সময়
তৃষার শরীর ঢলে পড়ে।

প্রেমতৃষা পর্ব ৪৯

“এ কী!” প্রেম ধরে ফেলে তাকে। স্টেজের সামনে মানুষ হাহাকার! প্রেমের চোখে বিস্ময়। ওমা, চুমুর পাওয়ারে তার বউটা সত্যিই অজ্ঞান হয়ে গেল নাকি? হাঁ করে গেল প্রেম। আয় হায়, সর্বনাশা কাণ্ড! এখন কি সবাই বলবে স্বামীর চুমু সহ্য করতে না পেরে বউ স্টেজেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল? প্রেমের মনে মনে আফসোস।
হায়রে প্রেম, কাল সকালের ব্রেকিং নিউজের জন্য তৈরি হয়ে যা বাপু!

প্রেমতৃষা শেষ পর্ব