Home প্রেমতৃষা প্রেমতৃষা শেষ পর্ব

প্রেমতৃষা শেষ পর্ব

প্রেমতৃষা শেষ পর্ব
ইশরাত জাহান জেরিন

হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তৃষা পিটপিট করে তাকাতেই প্রথমে যাকে দেখল তার নাম প্রেম নেওয়াজ। তৃষা চারপাশে একবার ভালো করে তাকালো। নাকে ফিনাইলের একটা গন্ধ আসছে। প্রেম তার সামনেই বসা। সে তৃষার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল,”এবার ঠিক লাগছে তো? বলো সোনা, শরীর ঠিক আছে তো? ঠিক করে খাওয়া-দাওয়া করো না। যা খাও ওই জাঙ্গ ফুড। আজ থেকে তোমার ওইসব খাওয়াও বন্ধ একেবারে।”
“আমার কি হয়েছে? এখানে কেন আমরা? ”

প্রেমের রাগ উঠল। আবার এই মেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে! সে রেগে গিয়ে বলল,” তুমি মা হয়েছো আর আমি বাবা হয়েছি। এখন তোমার ডেলিভারি করে আমি আমার আবিষ্কৃত প্রোডাক্টটা বের করতে এসেছি।”
হঠাৎ রুমের ভেতর ডাক্তার প্রবেশ করে বলল” আরে আমি তো এখনো খবরই দেয়নি। এক্ষুণি বাচ্চার খবর কি করে জেনে গেলেন? যাই হোক সবে তো ১মাসের কাছাকাছি। ডেলিভারি হতে অনেক সময়। এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই।”
প্রেম, তৃষা দু’জনেই ডাক্তারের দিকে তাকালো। প্রেম কপাল কুঁচকে তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি বলতে চাইছেন? আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“বুঝতে পারছেন না মানে? আরে আপনি বাবা হতে চলেছেন। আচ্ছা আপনি সেই আঁধার না? আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান। একটা অটোগ্রাফ দেওয়া যাবে?”
প্রেম চমকে উঠে। কি প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত আপাতত বুঝতে পারছে না। খুশিতে হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে উঠে ডাক্তারের কাছে যায়। আবার জিজ্ঞেস করে, “কি বললেন আপনি? আবার বলেন।”
“আমি আপনার ফ্যান। অটোগ্রাফ দেওয়া যাবে।”
“এর আগে?”
“আপনি বাবা হতে চলেছেন।” প্রেম খুশিতে আত্মহারা হয়ে ডাক্তারের গালে চুমু খেয়ে বসে। যখন হুঁশে আসে তখন দেখতে পায় ডাক্তার তার দিকে অবাক করা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। প্রেম কি বলবে তার আগেই, ডাক্তার তাকে বলল, ” আমিও যখন প্রথমবার আমার বউয়ের প্রেগনেন্ট হওয়ার খবর জানতে পারি তখন আমিও এরকম আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম।”

“তারপর কি ডাক্তারকে চুমু খেয়েছিলেন?”
“না ডাক্তার তো আমিই ছিলাম।”
“তো কাকে খেয়েছিলেন?”
“নার্সকে।”
“তারপর?”
“তারপর আর কি? আমার বউ আমাকে দিয়েছে?”
“কি দিয়েছে?”
“কিক মেরে ছেড়ে দিয়েছে। তাই কষ্টে নার্সকেই বিয়ে করে ফেলেছি।”
প্রেম জলদি তৃষার কাছে এসে বসে, বলে, “বউ আমায় ছেড়ো না। আমি ঠোঁটটা গঙ্গাজল দিয়ে পরিষ্কার করে আসব।”
তৃষার হাসি পেল। এই লোকও না। তবে সে তো ভুলেই গেছে। আসলেই কি সে মা হতে চলেছে? খুশিতে তৃষা প্রেমকে জড়িয়ে ধরতেই প্রেম ডাক্তারকে ইশারা করে, “ভাই টু মাচ পার্সোনাল কাজ করব। একটু যদি বাইরে যেতেন।”

ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে বের হয়। মনে মনে হয়তো একটাই প্রশ্ন, “টু মাচ পার্সোনাল কাজকারবার করে তো প্রডাক্ট অর্ডার তো দিয়েছেই। এখন আবার কি করবে?” তবে মনে মনে এসব বললেও মুখে বলল, “আমার অটোগ্রাফটা!”
প্রেম তীক্ষ্ণ চাহনিতে তার দিকে তাকাতেই সে বলে উঠল, “আচ্ছা বাবা যাই, চোখ গরম করেন কেন?”
“প্রেমের কোনো কিছু গরম করার দরকার নেই। সে নিজেই গরম।”
পাশ থেকে তৃষা হেসে বলল, “তাই তো বলি আপনার নেই কেনো সরম।”

তখন ভোর হবে হবে। পুরান ঢাকা থেকে সিদ্দিক নেওয়াজ ছুটে এসেছিলেন রাতে খবর পেয়ে। সিদ্দিক নেওয়াজ পুরো হাসপাতালে মিষ্টি বিতরণ করেছেন।
সবাই কত খুশি। প্রেমা, মোখলেস, শিমলা, অংকুর সবাই বাচ্চার খবর পেয়ে দারুণ খুশি। একে তো মাঝে হঠাৎ কনসার্ট শেষ করতে হয়েছিল বলে দর্শক চিন্তায় পড়ে গেছে। হাসপাতালে আসতেও প্যারা নিতে হয়েছে। মিডিয়া আর মিডিয়া চারদিকে। এখন কি আর প্রেম নেওয়াজ শান্তি পাবে? কি একটা অবস্থা। প্রেম যে বাবা হতে চলেছে সেই খবরটাও ট্রেন্ডে চলে গেছে। রাতটা আজকে ঢাকাতেই থাকবে। তৃষা মাঝ রাতে হাসপাতাল থেকে ফিরে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে এখনো ঘুমায়নি। প্রেমের বুকের ওপর শুয়ে আছে। প্রেমের হাতটা তার পেটের ওপর। সে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে।হঠাৎ পাশ ফিরে বলল, “ছেলে বাবু হবে নাকি মেয়ে বাবু?”

“আপনার কোনটা চাই ছেলে নাকি মেয়ে?”
” একটা হলেই হলো। আমি চাই তুমি আর আমি মিলে ছোট্ট এক ‘আমরা’ জন্ম দিই আর কিছুই না।”
“যে আমাদের প্রেমের প্রমাণ হবে?”
“না… যে আমাদের প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখবে।”
প্রেম তৃষাকে জড়িয়ে ধরল। তৃষা চোখ দু’টো বন্ধ করল। এবার যতটা সময় স্বামীর বুকে আরাম করে ঘুমিয়ে নেওয়া যায় আর কি।

আজ এক সপ্তাহ হয়েছে পুরান ঢাকা থেকে প্রেম, তৃষা সকলে ফিরেছে। আসার পর কত নিয়ম-কানুন যে এই লোকটা তৈরি করল! ঝুঁকা যাবে না, দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না। এটা খাওয়া যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না। এত নিয়ম কানুন কি মানা যায়? রাত তখন দশটা বাজে। আজকে তৃষা নেওয়াজ বাড়িতেই থাকবে। এই বাড়িতে প্রেমের দোতলায় এত বিরাট একটা রুম আছে সেটা এইতো দুইদিন আগে জানল। পুরোটা গানের সরঞ্জাম দিয়ে ভরপুর। এই কারণেই প্রেম কখনো জানতে দেয়নি এখানে যে তারও একটা রুম আছে। আর ওইযে কাঠের বাড়ির যেই রুমটায় প্রেম তৃষাকে যেতে দেয়নি কখনো সেটায়ও গানের জিনিসপত্র। প্রেম যখন প্রথম দিন জানতে পেরেছিল তৃষা প্রিমরোজ ব্যান্ডের ভক্ত। তখন থেকেই ঠিক করেছিল একদিন তাকে সারপ্রাইজ দিবে। যেই সারপ্রাইজের কথা সে কখনো ভুলতে পারবে না।

তাছাড়া ওই শিমলাটাও কত শয়তান হয়েছে, অংকুর তাকে জানানোর পরও একটু বলল না। যাক ব্যাপার না। তবে মনে হচ্ছে বাংলাদেশে আর বেশিদিন থাকা হবে না। প্রেমের আমেরিকা থেকে মিউজিক অফার এসেছে। আর সে পারিবারিক ব্যবসাটাও সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে। আজকে তৃষার জরুরি কাগজ গুলো নিয়ে বাইরে গেছে প্রেম। নির্ঘাত পাসপোর্টের জন্য। তৃষা প্রেমার রুমে এক পা দুই পা করে গেল। মেয়েটাকে বেশি বেশি সময় দেওয়ার চেষ্টা করে সে। মেয়েটাও তাকে সময় দেয়। তৃষা প্রেমার রুমে যেতেই দেখল সে গান ছেড়ে নাচানাচি করছে। তৃষা আর লোভ সামলাতে পারল না। প্রেমার থেকে রিমুটটা নিয়ে সাউন্ড বাড়াতেই প্রেমা বলে উঠল, “ওমা কত সাউন্ড দিয়েছো। প্রেম ভাই শুনলে কেলাবে।”

“তার আসতে দেরি আছে। সে এখনো বাইরে। আর নাচানাচির জন্য গান একটু বাড়িয়েই দিতে হয়। চলো একসঙ্গে নাচি।”
“কিন্তু তোমার তো নাচানাচি এখন একেবারে বন্ধ। বাবুর বাবা জানতে পারলে বাবুর ফুফু সহ মার খাবে।”
“বাবুর বাবা জানলে তো? আর আমি আজকেই রিলস ভিডিওতে দেখেছি নাচানাচি করলে বাবু হেলদি হয়। এটা একটা এক্সারসাইজ বুঝলে তো ননদিনী? ”
“ওহ তাই নাকি?”
“আরে হ্যাঁ।”
“তাহলে চলো তো নাচি।”

দু’জনেই আগামাথা ছাড়া নাচ দিতে ব্যস্ত। কোনো নৃত্য শিল্পী এই নাচ দেখলে মির্কি রোগ বলে আখ্যায়িত করত সিউর। কিন্তু তাতে কি আসে যায়? যেই তিরিংবিরিং মনে আনন্দ জোগায় মূলত সেটাই হচ্ছে নৃত্য। হঠাৎ গানটা বন্ধ হয়ে যেতেই প্রেমা আর তৃষা থেমে যায়। তৃষা বিরক্তি নিয়ে বলে, “উফ, এই ঘোড়ার ডিম চুপ হয়ে গেল কেন?” হঠাৎ প্রেমা তৃষার পেছনের দিকে তাকায়। কাঁপা গলায় বলে, “মা….নে পে…ছনে দেখো।”
তৃষা বিরক্ত নিয়ে বলল, “পেছনে কে? যেমনে কাপছো যেন হারে বজ্জাত হাইব্রিড করলাটা চলে এসেছে।” বলেই তৃষা পেছনে ফিরে দেখল দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে, এক হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে প্রেম নেওয়াজ। অন্য হাতে রিমোটটা যেটা তৃষা খাটের ওপর ছুড়ে ফেলে নাচানাচি করছিল। প্রেমের শীতল দৃষ্টি দেখে তৃষার কলিজা হাতে চলে আসে। কি করবে এখন? আল্লাহ আজকে তো মার, বকা একটাও মাটিতে পড়বে না। তৃষা মেকি হাসি দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, “আ….রে আপ..নি? কখ..ন এসেছেন?”
প্রেম কিছু বলল না। কেবল বাঁকা হাসল। তবে ওই হাসি সুবিধার না। আজকে নির্গাত এই ফুটো কপালে আরো দু’টো ফুটো করবে মিস্টার প্রেম নেওয়াজ।

তৃষা রুমের মধ্যে মাথা নিচু করে বসে আছে। আপাতত রুমের দরজা লাগানো। পালানোরও পথ নেই। এবার একেবারে জায়গা মতো প্রেম নেওয়াজের ফাঁদে পড়েছে সে। জীবনে এভাবেও কেউ বাঁশ খায়? যদিও এখন বাঁশ খেতে খেতে খাদ্যের তালিকায় তা অতি পছন্দের হয়ে গিয়েছে। প্রেমের গায়ে একটা সাদা শার্ট। তাকে দেখলে এই শীতের মধ্যেও উষ্ণতা অনুভব করে তৃষা। তাই তাকানো যাবে না। এমনিতেই ব্যাটা বাঁশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ প্রেম বলে উঠল, “লুক অ্যাট মি।” তৃষা তাকালো না। তা দেখে প্রেম তার থুতনিতে আঙুল দিয়ে মুখটা উপরে তুলে বলল, “তোমাকে নিষেধ করেছিলাম না, ওসব করতে? বলো কেন অবাধ্য হয়েছো?”

“ইয়ে মানে।”
“চুপ! যেটা বলেছি সেটার উত্তর দেও।”
“আচ্ছা আর হবে না সরি। এই যে কানে ধরছি, নাক মুলছি।”
“এত সাধারণ ক্ষমা আমার দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়। তুমি যতবার কথার অবাধ্য হবে আমি ততবারই তোমাকে নতুন নতুন ভাবে শাস্তি দিব। আর ইউ রেডি?”
তৃষা চুপ করে থাকে। প্রেম তাকে টেনে কাছে এনে তার ঘাড়ে চুমু খেল। তৃষার শরীর কেঁপে উঠল। খামচে ধরল সে প্রেমকে। স্পর্শ বৃদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ল তৃষার মরিয়া হয়ে ওঠার মাত্রাও। তবে হঠাৎ করেই প্রেম থেমে গেল। তৃষাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, “যাও ঘুমিয়ে পড়ো।”

“প্লিজ প্রেম, আমাকে ভালোবাসুন। প্লিজ, আমি শাস্তি চাই।”
“কিন্তু তুমি তো এখন প্রে…”
“কিছু হবে না।”
প্রেম মুচকি হেসে তৃষাকে কোলে তুলে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিলো। বাতি বন্ধ করে হারিয়ে গেল দুজন- দু’জনের মধ্যেখানে।

সকাল সকাল আজকে শিমলা এসেছিল। তৃষা ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলে মাত্রই ফোনটা রাখল। প্রেমের আজকে গানের রেকর্ডিং আছে। সে স্টুডিওতে গেছে। অংকুরও গেছে তার সঙ্গে। ওদের ফিরতে আজকে দেরি হতে পারে তাই শিমলাকে অংকুর তৃষার কাছে রেখে গেছে। এমনিতেও শিমলা বাসায় একাই থাকে। তৃষার বোধ-হয় এই সেমিস্টার মিস হয়ে যাবে। কাল রাতেও প্রেম ওয়াশিংটন যাওয়ার কথা বলছিল। এখন সিয়াটলে শিফট হবে নাকি ফর্কস সেটা সেই ভালো জানে। আরেকটা ব্যান্ডের সঙ্গে যে কোলাবোরেশান করেছে, একটা চুক্তি পত্র হয়েছে। চুক্তি শেষ হলে বাংলাদেশ ফিরে আসবে। তবে এতগুলো দিনতো আর মিস্টার প্রেম নেওয়াজ বউ ছাড়া বিদেশে থাকতে পারে না। আর এখন তো বউয়ের সাথে বাচ্চাও আছে। এই সময় দরকার হলে ক্যারিয়ার ছাড়বে, তবুও বউকে গর্ভবতী অবস্থায় একা রেখে কখনোই সে দূরে যেতে পারবে না।

তৃষা ভেবেছিল প্রেমের বাড়ি ফিরতে হয়তো অনেক দেরি হবে। তবে সে বিকেলের আগেই বাড়ি ফিরে আসে। প্রেমের কাঠের বাড়িতে আন্ডার পার্কিং এর জায়গা আছে। যা পেছন দিকে অবস্থিত। প্রেমকে আরো অনেকবার সে এ পথে আসতে দেখেছে, তবে আসতেই পারে। মাথায় উল্টাপাল্টা কিছু আসেনি। আজকে প্রেম তৃষাকে সেই পার্কি লডে নিয়ে আসে। এখানে এসে তৃষার চোখ ছানাবড়া। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব দামি বাইকগুলোকে কালেকশন করে আস্ত একটা গোডাউন বানানো হয়েছে এখানে। তৃষা বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেই বাইকগুলোর দিকে। শেষে প্রেম তুরি বাজাতেই সে হাসতে বাধ্য হয়। প্রেম হাঁটু গেঁড়ে তৃষার সামনে বসল। পেটে একটা চুমু দিয়ে বলল, “তোমাকে অনেক ভালোবাসি বিটারহার্ট, মাই প্রিমরোজ।”
তৃষা প্রেমের থুতনিতে আঙ্গুল স্পর্শ করিয়ে তাকে দাঁড় করিয়ে বলল, “চলুন আরো একবার বাইক রাইড হয়ে যাক?”

“মোটেও না।”
“একবার প্লিজ। যদি বাইক রাইড না করতে দেন তাহলে বুঝবো আপনি আমাকে কম ভালোবাসেন।”
“শালীর ঘরের বউ, এগুলোই তো খালি করতে পারো। যাও গিয়ে জামা বদলে এসো। তবে গুনে গুনে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করব। ততক্ষণে যদি না আসতে পারো তাহলে তোমার বাইক রাইড করার সুযোগ শেষ হয়ে যাবে। তখন…” প্রেম পুরোটা শেষ করার আগেই তৃষা দৌড়ে বাড়ির দিকে দৌড়ায়। প্রেম চিন্তায় পড়ে যায়। পেছন থেকে বলে, “আরে আস্তে বউ, তুমি এখন আর বাচ্চা নও।”
তৃষার তৈরি হয়ে বের হতে পাক্কা আধঘন্টা সময় লাগে। তৃষা আসতেই প্রেম হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চোখে সানগ্লাসটা লাগিয়ে বাইকে বসে পড়ল। তৃষা চারপাশে একবার তাকিয়ে বলল, “আমার বাইকটা বের করেননি? একটু করলে কি এমন হতো?”

“পেছনে উঠে বসো।”
“মানে কি?”
“পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছিলাম, তুমি আমার এক্সট্রা পঁচিশ মিনিট খরচা করেছো। তোমাকে যে এই শীতের মধ্যে বাইরে নিয়ে যাচ্ছি এটাই অনেক।”
তৃষা হাবার মতো বাইকে উঠে সে। বাইক বাড়ির সীমানা ছেড়ে হাইওয়েতেই পৌঁছাতেই তৃষা পেছন থেকে প্রেমকে খোঁচা দিতে শুরু করল। একটু পর পর এখানে, ওখানে স্পর্শ করা। প্রেম বার বার নিজের আত্মরক্ষার জন্য তৃষার হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছে। যা দেখে তৃষা আরো মজা পাচ্ছে, তার দুষ্টুমির মাত্রা বাড়ছে। শেষে প্রেম হেলমেটের নিচ থেকে বলল,” ছিঃ জুনিয়র আমার মতো শুদ্ধ পুরুষকে একা মান ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা করছো? বলে দিচ্ছি একেবারে মামলা করব। মানহানির মামলা।”

“ওরে আমার শুদ্ধ পুরুষ। শুদ্ধতা দিয়ে বাচ্চা পয়দা করে ফেলেছেন আপনি, এখন শুদ্ধ গিরি দেখাচ্ছেন?”
“তোমার বিশ্বাস হয় না আমি যে শুদ্ধ পুরুষ? তাহলে চলো আশেপাশে কোথাও থেমে তোমায় প্রমাণ দেখাচ্ছি।”
“ইশ ওইযে আপনার সুই ঘুরে ফিরে এক জায়গাতেই আটকায়।”
“হ্যাঁ আমার সুই, ঘুরে ফিরে তোমার সুতোয় গিয়ে থেমে যায়। তবে গবেষণা মোতাবেক, সুই কিন্তু মেয়ে।”
“আরে হ্যাঁ, সুই মেয়ে আর সুতো ছেলে। তাই সুইয়ের মধ্যে মানুষ সুতোকে ঢুকিয়ে দু’টোর বিক্রিয়ায় সেলাই কার্য করে। সুই আর সুতোর বিক্রিয়া না হলে বউ সেলাইয়ের জন্ম কি করে হতো বলোতো? বিষয়টা চিন্তার কিন্তু।”
তৃষা হঠাৎ পিছন থেকে প্রেমের পিঠে আস্তে করে একটা চিমটি কাটল। প্রেম একটু চমকে তাকাতে না তাকাতেই তৃষা দু’হাত দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রাস্তায় গাড়ির আলো লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে যাচ্ছে। সামনেই পোস্তগোলা ব্রিজের লালচে আলো জ্বলজ্বল করছে।

প্রেমের চোখ সে আলোতে আটকে নেই। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় তার মন নেই আজ। ব্রিজের নিচ দিয়ে চলে যাওয়া নদীর দিকে কোনো এক টান তাকে টেনে নিচ্ছে যেন।
“চলো, অন্য কোথাও যাই,” প্রেম নিচু স্বরে বললে তৃষা ভ্রু কুঁচকায়, “কোথায়?” প্রেম হাসে, জবাব না দিয়েই হাত ধরে টেনে নেয়। ব্রিজের পথ তারা এড়িয়ে চলে, সোজা নেমে যায় সদরঘাটের দিকে।
সদরঘাটে নদীর সোঁদা জল, মানুষের ভিড়, আর রাতের অদ্ভুত চঞ্চলতা। কোলাহলের মাঝে প্রেম তৃষাকে নিয়ে উঠে পড়ে একটি লঞ্চে। সেই পুরনো রাতটার পুনরাবৃত্তি হয়। সেই একই লঞ্চ এটা, একই যাত্রী তারা। তবে সেইদিন আর আজকের দিনের মধ্যে কতখানি পার্থক্য!

লঞ্চ ছাড়তেই ক্রমে শহরের আলো ছোট হয়ে আসে, শব্দগুলো থেমে যেতে থাকে। খোলা ছাদের ওপরে উঠে আসে তারা। আকাশ অসীম নীল-কালো, আর তারারাও আজ যেন একটু বেশি উজ্জ্বল। নদীর জলে লঞ্চের কাটতে থাকা ছোট ছোট ধাক্কা, বাতাসের ঠান্ডা আঁচ সব মিলিয়ে রাতটা গভীর হয়ে উঠছে। তারা দু’জন পাশাপাশি দাঁড়ায়, হাত অদৃশ্যভাবে ছুঁয়ে থাকে। বাতাস তৃষার চুল উড়িয়ে দেয়, প্রেমের গালে শীতল স্পর্শ লাগে।

“বাইরে কি ঠান্ডা!” তৃষা কাঁপা গলায় বলে। প্রেম হালকা হাসে, নিজের জ্যাকেট খুলে তার কাঁধে জড়িয়ে দেয়।
নদীর জল কালো আয়নার মতো, আর সেই আয়নায় তারাভরা আকাশ দু’জনের অনুচ্চারিত অনুভূতিকে প্রতিফলিত করছে। এই রাত, এই নদী, আর এই বাতাস সেদিনের মতোই, কেবল তারা দুজন আজ একটু বেশিই কাছাকাছি।
নদীর বাতাস থেমে থেমে এসে তৃষার মুখে লাগে, চুলের গোছা উড়িয়ে যায়। প্রেম পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে—চোখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু যেন অগণিত কথা জমে আছে। লঞ্চ নদীর বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
তৃষা আস্তে করে বলল, “প্রেম… আপনি কি পুরোটা জীবন এভাবেই পাশে থাকবেন? শুধু ভালো দিনে না… খারাপ দিনেও?”

প্রেম সোজা তাকায় তার চোখে, দীর্ঘ শ্বাস নেয়, “আমি পাশে থাকব। কেবল তোমার সুখের সাথী হয়ে নয় তোমার কান্নার দায়িত্ব নিতেও।”
তৃষা ভ্রু কুঁচকে হালকা হেসে ওঠে, “যদি কখনও আমি আপনাকে ক্লান্ত করে ফেলি?”
প্রেম কাঁধে হাত রেখে বলে, “ক্লান্তি হয় কাজের, ভালোবাসার নয়।”
তৃষা নিঃশব্দে বলল, “তাহলে যদি আমি বদলে যাই? যদি আমরা বদলে যাই?”
প্রেম উত্তর দেয়, “সময় বদলাবে, রঙ বদলাবে, স্বভাব বদলাবে… শুধু একটা জিনিস বদলাবে না—তুমি আমার ‘আপন’ হওয়ার সত্যি।”

তৃষা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ নামিয়ে বলে, “আপনি এত নিশ্চিন্ত কেন?”
প্রেম তার হাত ধরে দৃঢ়ভাবে বলল, “কারণ তোমাকে পাওয়ার পর জীবনটা আর প্রশ্ন নেই, সবই এখন উত্তর।”
তৃষা তার হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরে। “তাহলে আমরা একসাথে? শুধু এখন নয়…”
প্রেম হাসে, থমকে গিয়ে ফিসফিস করে, “সময় যত দূরেই যাক, শ্বাস যতদিনই থাকুক… আমরা দু’জন একই পাশে থাকব। হয়তো পথ বদলাবে, বয়স বদলাবে, স্মৃতি বদলাবে… কিন্তু হাতটা নয়।”
তৃষার চোখ ভিজে ওঠে। “আপনি কি সত্যিই আমার পাশে পুরো একটা জীবন কাটিয়ে দিতে চান?”
প্রেম কপালে চুমু খেয়ে বলে,“আমি শুধু জীবন কাটাতে চাই না… তোমার জীবনের অংশ হিসেবে আজীবন থাকতে চাই।”

তৃষা নদীর জলের দিকে তাকালো। পেটে একবার হাত দিয়ে বলল, “তাহলে বলুন তো এখন ভালোবাসা কী?
“ভালোবাসা এখন আর দুজনের আবেগ না…
তিনজনের দায়িত্ব।”
“দায়িত্ব?”
” হ্যাঁ। হৃদয়ের সাথে আরও একটা ছোট্ট প্রাণকে সুরক্ষার প্রতিজ্ঞা।”
“আমরা কি সত্যিই জীবনভর এমনই থাকব?”
“হ্যাঁ। আমরা ‘দুজন’ হয়ে পথ শুরু করেছিলাম…

এখন আমরা ‘তিনজন’ হয়ে জীবন শেষ করব।” প্রেম ঝুঁকে বসল। তৃষার পেটের ওপর আলতো করে হাত রেখে চুমু খেল। বলল, “এই যে নেওয়াজ বাড়ির নতুন সদস্য, পাপ্পা এখন একটু তোমার মাম্মাকে আদর করবে। তুমি লক্ষী বাচ্চার মতো ঘুমু দাও তো।” তৃষার সেই কান্ড দেখে হাসি পেল। সে লজ্জায় এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। যেই শীত কেবিনে যেতে হবে। সে হাটা শুরু করতেই প্রেম তার যাওয়ার পথে চেয়ে রইলো। সাদা প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে নিজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে গান ধরল,

~কি আবেশে তারে বারে বারে….
দেখি তবু যেনো মেটেনা তৃষা……
সে যে পথ চলে বুকে ঝড় তোলে….
জেগে ওঠে ঘুমোনো আশা~
প্রেম আর অপেক্ষা করল না। দৌড়ে গিয়ে শক্ত করে ধরল তৃষার হাত। কপালে চুমু দিয়ে বলল,

প্রেমতৃষা পর্ব ৫০

“আমার শেষের গল্পে থেকে যাও,
এক অসীম গল্পকার হয়ে।
গল্পের পর গল্প জুড়ে যাক,
তোমায় পাওয়ার আমৃত্যু প্রেমতৃষা নিয়ে।”

সমাপ্ত