Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৪

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৪

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৪
জান্নাতি আক্তার জারা

তালুকদার বাড়ি, রাত প্রায় নয়টার কাছাকাছি হবে, রাহিমা সুলতানা আগে থেকে মিষ্টি রেডি করে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তালুকদার বাড়িতে। আহিন আলভী রাহিমা সুলতানার সঙ্গে ছিলো। রশ্মি রশ্মিদের বাড়িতে নিজের রুমে। সবাই বাড়ি ফিরে সর্বপ্রথম আইরা কে নিয়ে সোফাতে বসলো। হাসপাতালে আমান এসেছিল। আমান কে তালুকদার বাড়িতে আসতে বলায় আমান নাকচ করে। আমান রাফি নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছে। আইরা কে নিয়ে সোফাতে বসতেই রাহিমা সুলতানা মিষ্টির প্লেট নিয়ে হাসি মুখে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ালেন। আরাত আর আরিশা বাড়ি ফিরে নিজেদের রুমে ফ্রেশ হতে গেছে। রাহিমা সুলতানা এদিক ওদিক আনাস কে খুঁজলো। আনাস কে দেখতে না পেয়ে বলেই ফেললো।

___” নতুন বউয়ের পাশে আনাস কে দেখতে পারছিনা, আনাস কই?
আদনান তালুকদার, রাবেয়া তালুকদার,আহাদ তালুকদার, আদিবা তালুকদার, আনহা শেখ, আতিফ শেখ, ছয়জন আইরার পাশাপাশি বসে সারাদিনের ক্লান্ত শরীর টা এলিয়ে দিয়েছেন সোফাতে। রাহিমা সুলতানার কথা শুনে সোজা হয়ে বসলেন সবাই। আদিবা তালুকদার বলে উঠলেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

___” আমার ছেলে নতুন বউকে বাইকের পিছনে বসাতে পারেনি, এতে সে রাগ করেছে।
আদিবা তালুকদারের কথায় ড্রয়িং রুমে সবাই একসঙ্গে হেঁসে উঠলো, আইরা সবার মাঝখানে মাথা নিচু করে বসে আছে। নিজের আপন মানুষ রা শশুর বাড়ির মতো ট্রিট করায় লজ্জায় মাথা উপরে তুলতে পারছে না। হাসপাতাল থেকে আনাস আইরা কে নিজের সঙ্গে বাইকে নিয়ে ফিরতে চেয়েছিলো। অসুস্থ শরীরে শীতের রাতে বাইকে বাড়ি ফিরলে আইরার শরীর বেশি খারাপ হবে ভেবে। আনাস কে একা আসতে বলে আইরা কে নিজেদের সঙ্গে গাড়িতে নিয়ে এসেছে। আনাস মন ভার করে তাঁদের গাড়ি রওনা দেওয়ার আগেই বাইক নিয়ে বেড়িয়ে পরেছে। যদিও এখনো তালুকদার বাড়িতে এসে পৌঁছেনি। রাহিমা সুলতানা মিষ্টির প্লেট নিয়ে এসে আইরা কে মিষ্টিমুখ করালেন। বড়দের ছোট ছোট মসকারায় আইরা পুনরায় চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকলো। রাবেয়া তালুকদার আনহা শেখ কে মজার ছলে বলে উঠলো,

___” কী নতুন বিয়ান মেয়ের সঙ্গে মেয়ের শশুর বাড়িতে চলে এলেন?
আহনা শেষ হাসি মুখে বললেন,
___” ভাবি আমি আমার ভাতিজার বউ কে দেখতে এসেছি?
বোনের কথায় আহাদ তালুকদার হাসলেন ,
___” আমার ছেলের বউকে দেখতে হলে গিফট লাগবে। আদিবা নতুন বউয়ের মাথায় বড় করে ঘোমটা টেনে দেও।
আদিবা তালুকদার স্বামীর কথায় হাসি মুখে সোফা থেকে ওঠে আইরার মাথায় বড় করে ঘোমটা টেনে দিলো। সবার মুখে হাসি। আইরা পরিবারের হাসিখুশীর মুহূর্ত গুলো বিরক্ত না হয়ে চুপচাপ ইনজয় করছে। আনহা শেখ সোফা থেকে ওঠে এসে আইরার ঘোমটা মাথা থেকে সরিয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

___” মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ আমার ভাতিজার পছন্দ আছে বলতে হবে। এত মিষ্টি মেয়ে কে কোথায় থেকে উঠিয়ে এনেছে?
সবাই আনহা শেখের কথায় শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আনহা শেখ আইরার কপালে চুমু রেখে দিলেন। আইরা মায়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলে উঠলো,

___” আম্মু প্লিজ…
___” এই মেয়ে এখানে তোমার আম্মু কই। আমি তোমার ফুপি শাশুড়ী। এখন থেকে ফুপি বলে সম্বোধন করবে?
সবার আড্ডা দেওয়ার মাঝে আনাস কে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা গেলো। আনাস মন ভার করে একনজর সবাই কে পরক করলো। আইরা কে ঘিরে সবাই কে বসে থাকতে দেখে নিজের রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়াতে যাবে। আহাদ তালুকদারের কথায় জায়গায় দাঁড়িয়ে পরলো,
___” আদিবা আমার বৌমাকে তাঁর রুমে রেখে আসো। যতদিন পর্যন্ত বড় করে রিসিপশন না হয়েছে। ততদিন ওরা আলেদা থাকবে।
___” আমার বউ আমার রুমে চাই, রিসিপশন আপনারা বুঝে নিবেন।
আনাস বড়দের দিকে না তাকিয়ে কথাটা বলে বড়বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে গেলো। আনাস এর মুখে বউ ডাক শুনে আইরা মুগ্ধ চোখে আনাস এর সিড়ি বেয়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। আহাদ তালুকদার কে আনাস এর কথায় বেশ বিরক্ত হতে দেখে গেলো। আদনান তালুকদার ছোট্ট ভাই কে বুঝালেন,

___” তাকবীর দেশে ফিরলে দুটো রিসিপশন একসঙ্গে হবে। আইরা কে আনাস এর রুমে রেখে আসো দু’জনকে একা ছাড়া প্রয়োজন।
আদনান তালুকদার রাবেয়া তালুকদারের উদ্দেশ্য কথাটা বলে নিজের রুমে চলে গেলেন। আহাদ তালুকদার বড়ভাইয়ের মুখের উপর কথা বললেন না। রাহিমা সুলতানা এবং রাবেয়া তালুকদার, আইরা কে আনাস এর রুমে রেখে গেলেন। সঙ্গে খাবারের প্লেট সাজিয়ে দিয়েছে। আইরা আনাস এর রুমে দাঁড়িয়ে চোখ বুলিয়ে আশেপাশে দেখছে। মনের মধ্যে আনাস কে নিয়ে ছোট ছোট সপ্ন গুলো নিস্তব্ধ রুমটায় নতুন ভাবে জেগে উঠতে লাগলো। আজ থেকে এই রুমের সঙ্গে রুমের মালিক টাও আইরার। আনাস তাকে ভালোবাসে। আনাস এর সঙ্গে নতুন জীবন, নতুন পথ চলা শুরু। দুজনের সুন্দর একটা সংসার হবে। যেখানে থাকবে না কেনো বাধা। একি উপরের ভালোবাসার পূর্ণতা পেয়ে গেলো। আনাস বেলকনিতে দাঁড়িয়ে বারকয়েক তাকবীর কে ফোন লাগলো। বারবার একি কথায় ভেসে আরছে, কাংখিত নাম্বারটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না,

আনাস ফোনটা কান থেকে চতুর্থবারের মতো নামালো। সারাদিনের ক্লান্তি মুখে টেনশন সবকিছু যেন এলোমেলো লাগছে। আইরার কথা মনে পড়তেই আনাস বেলকনি থেকে রুমে পা রাখলো। আইরা কে রুমের এদিক ওদিক তাকাতে দেখে আনাস এর বুকের মধ্যে ধুকপুক শব্দ হতে লাগলো। আজকের অনুভূতি টা সম্পূর্ণ আলেদা। এক পা দুপা আইরার দিকে এগুতে এগুতে মনের মধ্যে খেলে গেলো। আজকে থেকে রুমটায় একা না দুজন থাকবে। এতদিন রুমটা চুপচাপ নীরব হয়ে থাকতো। আর এখন রুমে একজন অর্ধাঙ্গিনী থাকবে। সে ক্ষণে ক্ষণে শব্দ করে হেঁসে উঠবে, সেই হাসি মুগ্ধ হয়ে দেখবে আনাস। নতুন নতুন বাহানা ধরবে সেই বাহানা খুব যত্ন করে পূরণ করবে আনাস। কথাগুলো মনে মনে ভেবে মুচকি হেঁসে আইরা কে পিছন থেকে জরিয়ে ধরলো। আইরা হটাৎ কারো ঠান্ডা হাতের স্পর্শে চমকে উঠলো। আইরা কে চমকাতে দেখে আনাস মুখে হাসি রেখেই বলে উঠলো,

___” ভয় পেয়ে গেলি?
___” উহুম।
আনাস আইরা কে নিজের দিকে করে চোখে চোখ রেখে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো ,
___” তাহলে চমকে উঠলি কেনো?
___” জানি না।
আইরা অন্য দিকে মুখ করে বলল। আনাস আইরার এক গালে হাত রেখে আইরার চোখে চোখ রেখে নেশাতূর কন্ঠে বলে উঠলো,
___” একবার বল না ভালোবাসি ?
___” আমি বলতে পারবো না।
___” কেনো?
___” আপনি তো জানের! আপনার জন্য আমি কী ফিল করি?
___” কি ফিল করিস?
___” সব কথা কী বলে বুঝাতে হবে?
আনাস আইরার কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। মুখে তৃপ্তির হাসি। চোখে এক টুকরো সুখ নিয়ে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,

___” ভালোবাসি ইরা আমি তোকে বড্ড বেশি ভালোবাসি। ভালোবাসা কত সুন্দর, তা আমি তোকে ভালোবেসেই শিখেছি। আমার প্রথম মায়া তুই, প্রথম প্রেম তুই, আমার অস্তিত্ব তুই, আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা ভালো থাকা তুই। তোর সঙ্গে সারাজীবন পারি দিতে চাই। আমার পূর্ণতা তুই।
আইরা আনাস কে জরিয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো। চোখ বন্ধ, মুখে পূর্ণতার হাসি নিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলে উঠলো,
___'”আপনি আমার সেই ভালোবাসা যাকে আমি আমার মোনাজাতে চেয়েছি। আমার রব আমার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার হিসাবে আপনাকে দিয়েছে।
দুজনের মুখে সুখের হাসি, একি উপরে জরিয়ে থাকলো কয়েক মুহূর্ত। শুধু ধীকে ধীকে দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনা গেলো। আনাস নীরবতা ভেঙ্গে আইরা কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

___” চল খাবার খেয়ে মেডিসিন নিবি।
___” আপনার হাতে খাবো!
আনাস ভ্রু কুঁচকে আইরার দিকে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড আইরা কে দেখে নিয়ে মুখে মুচকি হাসি টেনে বলল,
___” খাওয়াবো একটা শর্তে!
___” শর্ত?
___” হ্যাঁ শর্ত, যদি আগের মতো তুমি বলে সম্মোধন করিস তাহলে খাওয়াবো।
আইরা মুখ গোমড়া করে বলে উঠলো,
___” আমি পারবো না।
___” আমিও খাওয়াবো না।
___” আনাস ভাই! তোমার হাতে খাইয়ে দেও।
___” আমি তোর ভাই?
___” না।
___” এখন থেকে ওগো হে গো শুনছো , এভাবে ডাকবি। নয়তো ওগো স্বামী…..
___” ছি জঘন্য শুনতে।
আইরার নাক সিটকে বলা কথায় আনাস শব্দ করে হাসতে লাগলো। আনাস এর হাসি আইরা মুগ্ধ হয়ে খুব কাছ থেকে দেখছে। আনাস হাসতে হাসতে আইরা কে আদর করে নাক বুলে দিয়ে বলল,
___” চল আমার হাতে খাবি।

রাফি শীতের রাতে কুয়াশার ভীড়ে ছাঁদের রেলিং ঘেঁষে অন্ধকার রাতের আকাশের দিকে চেয়ে আছে। শীতের হিমকরা ঠান্ডা বাতাস কালো শার্ট ভেদ করে শরীর টা শীতল করে তুলছে। রেলিংএর উপর ফোন থেকে গান বেজেই চলেছে। রাফি গানের লাইনের সঙ্গে নিজের জীবন মিলাতে ব্যাস্ত,

~ মায়াবিনী…
আমার চোখে, চেয়ে দেখো
দেখো না চেয়ে
ভাঙা মনে আমারও আছে, কত আশা
ভেবোনা আর বাঁধন তোমার…
খুলে দিলাম আকাশ নীলে
ডানা মেলে দিও তোমার
ডাকে তোমার নতুন জীবন।
স্মৃতিগুলো কখনো
যদি মনে পড়ে যায়
পারবে কি ভুলতে! তুমি কখনো আমায়..?

ফোনে মিউজিক বাজার সঙ্গে সঙ্গে রাফি মলিন হেঁসে লাইন গুলো বিরবির করছে। প্রত্যেকটা লাইনে নিজের সঙ্গে না পাওয়া ভালোবাসা কে খুঁজে নিচ্ছে। আমান ছাঁদে এসে রাফি কে আকাশের দিকে তাকিয়ে গানের সঙ্গে বিরবির করতে দেখে। রাফির পাশে এসে দাঁড়ালো। রেলিং এর উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে গানটা বন্ধ করলো। রাফি গান বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আমান কে নিজের সামনে দেখে ছোট করে বলে উঠলো,

___” ঘুমাও নাই?
___” না, চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না।
___” ভাবীজান কে মিস করছো?
___” অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছে। পাশে না থাকলে পুরো রুমটা মৃত মৃত লাগে। তাই ভাবলাম তোর সঙ্গে তোর কষ্ট গুলো ভাগাভাগি করে আসা যাক।
রাফি আমানের কথায় মলিন হেঁসে বলে উঠলো,
___” আমার কষ্ট! আমার কষ্ট নেই তো, আমার আছে আফসোস। সে আমার নসিবে নেই এটার আফসোস। নিজের ভালোবাসা কে অন্যর হাতে তুলে দেওয়ার অপরাধে বুকের ভিতরে হৃদপিণ্ডটা বারবার ব্যাথা হানছে। ওদের বুঝাতে পারছি না সে আমাকে চায় নি। তোরা ওকে নিয়ে ভাবিস না। ও অন্যর ভাবনা অন্যর ভালোবাসা অন্যর অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু বার্থ হৃদপিণ্ড মানতে নারাজ।

___” বাদ দে এসব, যে নসিবে নেই তাকে মনে রাখিস না। নয়তো মনটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
___”হে আল্লাহ তাকে ভুলে যাওয়ার জন্য সাহায্য করো, একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছি। তাকে ভোলার শক্তি দেও মাবুদ। তার কথা ভেবে কষ্ট পেতে চাই না । তাকে তো আর আমার নসিবে রাখলে না। তোমার রহমত দিয়ে তাকে আমার মন থেকে ভুলিয়ে দাও আমি তাকে ভুলতে চাই মাবুদ।
___”মানুষ যদি খুব সহজে সব কিছু পেয়ে যায়। তাহলে আপসোস করবে কি নিয়ে বল।
আমান রাফি কে বুকে জরিয়ে ধরে সান্তনা সরূপ আগলে নিলো। রাফির হয়তো মনটা হালকা করার জন্য এতটুকু জায়গা এই মুহূর্তে খুব প্রয়োজন ছিলো।

আরাত বাড়ি ফিরে রশ্মির সঙ্গে দেখা হয়নি এখনো।
ফ্রেশ হয়ে রশ্মির সঙ্গে দেখা করতে রশ্মির বাড়িতে এসে দাঁড়ালো। আজকে রাত রশ্মির সঙ্গে থাকবে। রশ্মি আগের থেকে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। আরাতের সঙ্গে সকাল থেকে টুকিটাকি কথা বলছে। আরাত রশ্মির রুমের সামনে এসে দাঁড়াতে রুমটা অন্ধকার দেখতে পেলো। দরজার পাশে হাত দিয়ে সুইচ বোর্ডে টার্চ করে ডিম লাইট জ্বালালোর সঙ্গে সঙ্গে রুমটা হালকা আলোয় পষ্টভাবে পরিষ্কার দেখা গেলো। আরাত রুমে রশ্মি কে দেখতে পেলো না। রুম থেকে বেলকনিতে এসে দাঁড়াতেই রশ্মি কে বেলকনির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকতে চোখে পরলো।

___” এত রাতে ভূতের মতো একা একা দাঁড়িয়ে কী করছিস অন্ধকার রাতে?
___” একা থাকতে দে।
___” পারবো না, এখানে এসেছি নিজের ইচ্ছার। এখান থেকে যাবোও নিজের ইচ্ছায়।
আরাত কথাটা বলতে বলতে রশ্মির পিছনে দাঁড়িয়ে ঘাড়ে মুখ রেখে উৎফুল্লতা মুখে জানতে চাইলো,
___” এই রশ্মি বল না মাহির কেমন ! ওর মুখটা খুব মায়াবী তাই-না! জানিস তো ও সবসময় লেদার জ্যাকেট পড়ে থাকে। আরিশা আপুর বিয়েতে শুধু পাঞ্জাবিতে দেখছিলাম। বাট শ্যামবর্ণ মায়াবী মুখটায় লেদার জ্যাকেটে দারুণ মানায় বল?
আরাতের উৎফুল্লতা নিয়ে বলা কথা রশ্মির উপর কেনো প্রভাব ফেললো না। আগের ন্যায় বেলকনি ভেদ করে সামনে অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে রইলো। আরাত বিরক্ত হলো এতে। বিরক্ত মুখে পুনরায় বলল,

___” কী সবসময় অন্যমনস্ক হয়ে থাকোস! যে তোকে ভালোবাসে না তাকে মনে রেখে নিজের মন কে কষ্ট দিচ্ছিস কেনো! আমি তোর জায়গায় থাকলে কী করতাম জানিস! ডিজে গান লাগিয়ে নাচতাম।
কথাগুলো বলে আরাত শব্দ করে হেঁসে উঠলো, রশ্মি রাগী গলায় বলে উঠলো,
___”সে আমাকে ভালোবাসে, হ্যাঁ সে আমাকে ভালোবাসে বুঝতে পারছিস!ভালোবাসে সে আমাকে।
রশ্মি চিৎকার দিয়ে কথাগুলো বলতে বলতে কান্না করে দিলো। আরাত রশ্মির কান্না দেখে হতবাক হয়ে গেলো। পুনরায় মুখে বিরক্ত নিয়ে রাগী গলায় বলে উঠলো,
___” তোর আজাইরা নাটক আমার ভালো লাগছে না রশ্মি। সবকিছু খুলে বলবি! পার্থ যদি তোকে ভালোবাসে তাহলে চলে আসলি কেনো। আর এসব নাটক বা কেনো?

___” শুনবি! শুন তাহলে, আমরা যখন প্রথম দেখা করলাম। ও আমার দিকে কেমন যেন শুধু তাকিয়ে ছিলো। এভাবে পুরো শহর ঘুরলাম দুজন। আমরা মিট করার আগে যেমন ফ্রি ছিলাম। সামনাসামনি দেখা করার পর পার্থ অন্য রকম বিহেভিয়ার করতে লাগলো। ফোনে কথা বলা কমিয়ে দিলো। আমার ফোন ইগনোর করতে লাগলো। সবকিছু মুখ বুঝে মেনে নিলাম। দুদিন পর পার্থ নিজে থেকে ফোন করে পুনরায় মিট করতে চাইলো। আমি হাসিখুশি মুখে রেডি হয়ে পার্থর লোকেশন অনুযায়ী গেলাম। পার্থ তাঁর ফ্রেন্ড দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। তাঁদের মধ্যে একটা ওয়েস্টার্ন ড্রেস পড়া মেয়ে ছিল। আমরা যতক্ষণ আড্ডা দিচ্ছিলাম মেয়েটা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে ছিলো। আমি বুঝতে পারলাম পার্থ আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছে।
রশ্মি কান্না করে কথাগুলো বলতে বলতে মেঝেতে বসে পরলো। আরাত রশ্মি কে আটকালো না চুপচাপ রশ্মির কথা গুলো শুনতে লাগলো। রশ্মি মেঝেতে বসে চোখের পানি মুছে পুনরায় বলতে লাগলো,

___” তোকে বলেছিলাম না পার্থর একটা বাঙালি ফ্রেন্ড আছে!ভাইয়া টার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। আমি যখন পার্থর সঙ্গে তৃতীয় বার মিট করার পর পার্থ কে ফোনে পেলাম না। তখন এই ভাইয়ার সঙ্গে কথা বললাম। বিশ্বাস কর ও যদি আমার সঙ্গে শুধু বেইমানি করতো। আমি মেনে নিতাম, নিজেকে সামলে নিতাম। কিন্তু ও, ও তো আমাকে..
___”দূর বাল আজাইরা চোখের পানি ফেলছিস কেনো। তারপর কী বললা?
আরাতের বিরক্তমাখা কন্ঠে রশ্মি মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালো। কান্নারত মুখটায় রাগী গলায় বলে উঠলো,
___” আমার কষ্ট কে তোর কষ্ট মনে হয় না, তাইনা! ঠিক তো বুঝবি কিভাবে। নিজের জায়গা থেকে অন্যর কষ্ট কে ফিল করবি কিভাবে! আমার মতো ঠকে গেলে বুঝবি সখের পুরুষের বেইমানিতে কেমন কষ্ট হয়।
রশ্মির কথায় আরাত পাত্তা না দিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো,
___” মাহিরের উপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। ও কখনো আমাকে ধোঁকা দিবে না। আর যদি কখনো দিয়েও থাকে এইদিন আমি ডিজে গান বাজিয়ে ডান্স করবো যা।
রশ্মি আরাতের কথা শুনে কথা বাড়ালো না। চুপচাপ রুমে যেতে লাগলো। আরাত রশ্মি কে আটকে ধরে পুনরায় বলল,

___” কই যাস বাকি টুকু শেষ কর?
___” আমি পারবো না সর সামনে থেকে। যার কাছে আমার কষ্টের মূল্য নেই। তাঁর কাছে সবকিছু শেয়ার না করায় বেটার।
রশ্মি আরাত কে রেখে রুমের ভেতরে যেতে লাগলো, আরাত পুনরায় রশ্মি কে জরিয়ে ধরে বলল,
___” আরে বোন ঝগড়া করছিস কেনো! শেষ টুকু বললা! বিশ্বাস কর এবার আমি কান্না করবো তোর সঙ্গে?
রশ্মি তাচ্ছিল্য স্বরূপ হেঁসে উঠলো। আরাত এবার সত্যি সত্যি সিরিয়াস মুখে রশ্মির দিকে তাকালো। দু’জন সামনাসামনি দাঁড়ালো। রশ্মি রাতের অন্ধকারে চোখ রেখে পুনরায় বলে উঠলো,
___” যখন জানতে পারবি, যার জন্য নিজের পরিবার নিজের দেশ ছাড়তে রাজি। সেই মানুষটা তোকে না অন্য কাউকে ভালোবেসে তোকে ঠকাছে। তখন তোর কেমন লাগবে বলবি?
আরাত নিশ্চুপ রশ্মি আরাত কে একনজর দেখে নিয়ে নিজেকে তাচ্ছিল্য করে বলে উঠলো,

___”পুরো শরীর কাঁপছিল যখন জানতে পারি, আমি ছাড়াও সে অন্য কারো সঙ্গে কথা বলে। ও আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে রে। মেয়েটার কথা বললাম না, মেয়েটা পার্থর ফ্রেন্ড না গার্লফ্রেন্ড ছিলো। এমনকি ওরা লিভিং রিলেশনশিপে..
রশ্মি আর কিছু বলতে পারলো না কান্না করতে করতে আরাত কে জরিয়ে ধরলো। আরাত রশ্মি কে সান্তনা সরূপ পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে পুনরায় জানতে চাইলো,

___” তাহলে তোর সঙ্গে রিলেশনশিপে যাওয়ার কারণ?
___” ফ্রেন্ড সার্কেলের সঙ্গে বাজি ধরে আমার সঙ্গে রিলেশনশিপে এসেছিলো। আমাকে ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে কানাডা নিয়ে যেতে পারলে পার্থ জিতে যাবে। হ্যাঁ ও জিতে গেছে আমাকে শেষ করে ও জিতে গেছে। আমার সঙ্গে দেখা করে সবকিছু বলতে চেয়েছিলো বাট ও আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে নিজেই ফেঁসে গেছে। আমাকে সামনাসামনি দেখার পর আমাকে ওর ভালো লাগতে শুরু করছিলো। এই কারণে প্রথমে আমাকে ইগনোর করেছে। দ্বিতীয় বার আমাকে সঙ্গে নিয়ে পুরো দিন ঘুরছে। তৃতীয়বার ওর ফ্রেন্ডদের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছে। সেদিনের পর থেকে পার্থর দেখা নেই। না ওর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সংযোগ রেখেছে। না রেখেছে ওর গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে। ফোনে পাওয়া যায় না। এখন বল কী করবো আমি! আমি তো ওর কাছে আমাকে ঠকানোর কৈফিয়ৎ টুকুও চাইতে পারছি না। আমি তো ওকে সত্যি সত্যি ভালোবাসতাম বল।

রশ্মির দৈর্ঘ্যকথায় আরাত বড় করে নিঃশ্বাস নিলো। রশ্মির চোখের পানি দুহাতে মুছে দিতে দিতে আরাত বলল,
___” ওই পার্থর বাচ্চা আমার সামনে পরলে আমি সালারে দুনিয়াতে জাহান্নাম দেখাবো। জানোস তোর উপর রাগ লাগছে। উমম প্রেম দেখে বাঁচি না যতসব ফাউল পোলাপান। রাগ লাগছে আমার, আরে যা না রুমে গিয়ে কান্না কর। আমার সামনে একদম চিটারের জন্য ফেচফেচ করবি না।
আরাত রেলিংএর হাত রেখে নিজের কপালে হাত ঘুষতে লাগলো। রশ্মি আরাতের উপর অভিমান করে গাল ফুলিয়ে রুমে চলে গেলো। আরাত বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে রাতের অন্ধকার ভেদ করে তালুকদার বাড়িতে একটা গাড়ি ঢুকতে দেখলো। আরাতের রাগী মুখ নিমেষেই চুপসে গেলো। মনে পড়ে গেলো তাকবীরের আকস্মিক নরম ঠোঁটের ছোঁয়া। আরাত গাড়ির দিকে তাকিয়ে বিরবির করল,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৩

___” দুরু, সবকিছু আমার সঙ্গে কেনো হয়। আবারো লুকিয়ে চলতে হবে।
আরাত কথাটা বলে রেলিং এর মাথা রাখতেই। মাথায় ব্যথা পেলো। মাথায় হাত রেখে বিরক্ত মুখে বলে উঠলো,
___” উফফ ফাটা কপাল।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৫