রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ২০
ফারহানা চৌধুরী
-“শোনো, যখন দেখলে, আমরা ঝগড়া শুরুর পথে ছিলাম, তখন তোমার উচিত ছিলো যেকোনো একটা পক্ষ চুজ করে সেই পক্ষকে সাপোর্ট করা। আর আমাদের ঝগড়া করতে উৎসাহ দেওয়া। তবে তুমি, গাধার মতো ঝগড়া থামাতে আমাকে কফির অফার করলে। উদ্ভট!”
সাদাফের মন চাইলো কপাল ঠুকে মরে যেতে। এই লোকের মাথায় কি সমস্যা রয়েছে কোনো? এমন গাঁজাখুরি কথা কেউ কি করে বলে? আল্লাহ! শুভ্র তখনই ভালো একটা কথাও বলল,
-“তবে হ্যাঁ, তোমাদের দুজনকে পাশাপাশি মানিয়েছে। দাঁড়াও, একটা ছবি তুলি।”
এরপর পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নয়, বরং বেশ ক’টা ছবি তুলল। তার এমন অদ্ভুত একটা রূপের সঙ্গে পরিচিত হয়ে অরু বড়ো আশ্চর্য হলো।
রাত হলে আড্ডা বসলো। মেঝেতে চারজনে গোল হয়ে বসে জায়গা ঘিরেছে। এর মাঝে সাদাফ একবার উঠে ঘর থেকে গিটার এনে রেখেছিলো পাশে। যা নিয়ে বর্তমানে শুভ্র টুং টাং আওয়াজ করছে। গল্প-গুজবে মনোযোগ বা আগ্রহ কোনোটাই নেই তার। অবশ্য সে কোনোদিনই ছিলো না। সময় বাদে আড্ডার মাঝে মিশমি বলে উঠল,
“অ্যাই অরু, গান গাও। সেদিন তোমায় একটু গুনগুন করে গেতে শুনেছিলাম অফিসে। আজ সামনাসামনি গাও।”
অরুর প্রসঙ্গ উঠতেই শুভ্র নড়েচড়ে বসে। আড় চোখে তাকালো তার দিকে। অরু চমকেছে মিশমির প্রস্তাবে। তৎক্ষনাৎ না করলো সে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“না না, আমি গান পারি না।”
-“সেদিন আমি শুনেছি। কোনো না-টা কোরো না। গাও তো চুপচাপ।”
অরু ফ্যাকাশে মুখে চেয়ে বলল,
-“সত্যিই পারি না গান।”
সাদাফ বলল,
-“সত্যি-মিথ্যা পরে বোলো অরু। এখন গান গাও। আমরা আমরাই তো। সমস্যা নেই। লজ্জা পেও না।”
অরুর মুখ চুপসে গেল। সে আড়ে চায় লোকটার দিকে, যার চোখ তার দিকেই। অরু পলক ঝাপটালো। দু’হাতের আঙুল কচলে যাচ্ছে সমানে। তখনই পাশ থেকে খড়খড়ে একটা পুরুষালী হাত তার সামনে গিটার রাখলো। নিভৃতে বললো যেন, গান গাইতে। অরু আরেক দফা চমকে উঠে পাশে চাইলো। শুভ্র ততক্ষণে চোখ সরিয়েছে। তার কাজে এবার মিশমি আর সাদাফের জোরাজুরির হার বাড়লো বৈ কি! এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েটা কোলে গিটার তুলে নিলো। বেশ পটু হাতেই একেকটা তারে সুর তুললো। নীরবতা ভেঙে গুণগুণিয়ে উঠলো,
❝যাও বলো তারে, মেঘের ওপারে
বৃষ্টির বন্ধনা জুড়ে ধরণী তল।
যাও বলো তারে, শ্রাবণ, আষাঢ়ে
মেঘের শতজলে ছুঁয়েছে ভেজা জল….
মাতাল হাওয়ার ধ্বনি বৃষ্টি কি শুনে না?
ময়ূর পেখম তোলে ধিম তানা, দে রে না
ধিম তানা, বাজে ধিম তানা
বাজে ধিম তানা, দে রে না….
ধিম-তানা, বাজে ধিম-তানা
বাজে ধিম-তানা, দে রে না….❞
গান থামতেই হাত তালিতে আলোড়িত হলো চারপাশ। মিশমি তখন লাফাচ্ছে এক প্রকার। অরু মিষ্টি করে হাসলো সকলের উচ্ছ্বাসে। চোখ সরিয়ে পাশে চাইলো। লোকটা চেয়েই। চোখে চোখ পড়লো মূহুর্তেই। দৃষ্টিতে মিলন ঘটলে অরু বরাবরের মতোই সহ্য করতে পারলো না। চোখ জোড়া সরিয়ে ফেললো ত্বরিতে। বুকটা এতো কাঁপছে! অরু বাম হাতের নখ দ্বারা ডান হাতের পৃষ্ঠ খামচে ধরলো। অদ্ভুত অনুভূতির জোয়ারে ভেসে থম মেরে বসে রইলো। পরপর আবারও শুভ্রর দিকে চাইলে দেখলো, তার ঠোঁটের কোণদু’টো নেমে আছে। গাল দু’খানা ডেবে গিয়েছে। লোকটা হাসছে! অরু হতভম্ব হয়ে গেলো।
-“তুমি ভালোই গান পারো।”
অরু চমকায়। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই শুভ্র বলল,
-“মাঝে মাঝে গাইতে পারো তো।”
অরু হেসে ফেললো। কৌতুক করে বলল,
-“কেন? আমি গাইলে আপনি কি বসে আছে শোনার জন্য?”
শুভ্র সামনের রাস্তা থেকে চোখ ফেরায় না। স্টিয়ারিং ধরে রেখেই আনমনে বলল,
-“শুনতেই পারি। বউই তো।”
বাক্য দু’টো শ্রবণ ইন্দ্রীয়ে ধাক্কা লাগতেই অক্ষিপট প্রকট হলো মুহুর্তেই। ডান হাত দ্বারা বা’হাতের পৃষ্ঠ খামচে ধরলো। নখ দেবে গিয়ে জ্বলুনি উঠলেও, মেয়েটা হাত সরায় না। কান দু’টোর উত্তপ্ততা স্পষ্ট টের পেলো সে। লোকটা তাকে নিয়ে খেলার পায়ে তারা লাগিয়েছে। তান্ডব নৃত্য চালিয়ে যাচ্ছে রীতিমতো। শুভ্রর দিকে চাইলো না ভুলেও। মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। জানালার বাইরে চেয়ে মৃদু হাসলো।
গাড়ি জুড়ে নিস্তব্ধতা ছেয়ে তখন। শুভ্র কথা এগোতে চাইছে। চুপচাপ এমন নিরবতা বিরক্তিকর ঠেকছে তার কাছে৷ কি করবে ভেবে ঠোঁট চেপে পাশে চাইলো। গলা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“পড়াশোনা কেমন চলছে তোমার?”
আচমকা প্রশ্নে অরু ফের চায়। সোজা হয়ে বসে সিটে লেপ্টে গেলো। মিনমিনে গলায় বলল,
-“এইতো, ভালো।”
আবারও নিরবতা। শুভ্র নিজের কথা বলতে পারার অদক্ষতার জন্য বেজায় বিরক্ত। ফ্যাকাশে মুখে ছেলেটা তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। সবসময় অরুকে এড়িয়ে যেতে চাওয়া ছেলেটা আচমকা তার সঙ্গে কথা বলতে উদগ্রীব হওয়ার ব্যাপারটা নিতান্তই আশ্চর্যজনক। শুভ্রও আশ্চর্য হলো খুব। কিছু একটা ভেবেই মুচকি হাসলো। আড় চোখে অরুর দিকে চেয়ে, ক্ষনিকেই চোখ সরালো। কার স্টেরিওতে প্রেস করে নির্দিষ্ট একটি গান ছাড়লো। সুর কানে ভাসতেই অরু চমকে তাকালো। শুভ্র ফিচলে হেসে মুখ সরিয়েছে বহু আগেই। তবে বাড়িয়ে দু আঙুল ছুঁয়েছিলো অরুর। অরু হতবাক। পেটটা মুচড়ে উঠলো ভেতর থেকে। গলা থেকে বুক অবধি কেমন কেঁপে উঠলো। সমগ্র জায়গা জুড়ে তখন সুরেলা শব্দতরঙ্গ হাওয়াই মিঠাইয়ের মতোন মিলিয়ে যেতে লাগলো,
❝মেনে দেখা থা উসকো,
জাহা, বেঠা থা কাল কো।
হুর জেয়সি ওহ দিখতি…
কিউ, নাজরে না হাট’টি?
হাম নে ভি কুছ না কাহা
উসনে ভি ইয়াহা দেখা কাহা
বাতে দিলো কি রেহ গায়ি
ইয়েহ হে কাহানি উস রোজ কি……❞
শুভ্র ঘরে এসে বিছানায় ধপাশ করে শুয়ে পড়লো। পাশ বালিশ নিয়ে তাতে মুখ দাবিয়ে হাত-পা ছুঁড়লো বেগতিক ভঙ্গিতে। পরপর বালিশ সরিয়ে বুকে জড়িয়ে সিলিংয়ের দিকে চাইলো। বুকটা কেমন করছে। ধুকপুক ধুকপুক….। শুভ্রর ঠোঁট জোড়া আচমকা ছড়িয়ে গেলো দুপাশে। চাপা উল্লাসে হাত-পা ছুঁড়ে হেসে ফেললো। বাচ্চাসূলভ কাজ করছে খুব, খেয়ালে এলেও পরোয়া করলো না তেমন। উঠে বসলো। হেলান দিয়ে বসলেই হাত ধরার কথা মনে পড়লো। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে লোকটা লজ্জা পেলো ঢের। কপালে হাত ঘঁষে আচমকা শব্দ করে হেসে ফেললো।
-“সাদাফ, বিয়ে তো করলামই। এখন যদি, আঙ্কেল-আন্টি ব্যাপারটা বাজেভাবে নেয়?”
মিশমির চিন্তিত মুখের দিকে সাদাফ কপাল কুঁচকে তাকায়,
-“বাজে ভাবে কেন নিবে? তারা জানে আমরা বিয়ে করেছি। এন্ড গেস হোয়াট? তারা প্রচন্ড হ্যাপি।”
মিশমি চোখ ছোট ছোট করে ফেলল,
-“সত্যি?”
-“ইয়াপ!”
মিশমি প্রফুল্ল মুখে হাসলো,
-“আঙ্কেল আন্টিকে এখানে নিয়ে এসো না! তারা বাংলাদেশে একা কি করেবে?”
-“কথা হয়েছে। এবার, পার্মানেন্টলিই আম্মুরা চলে আসবে। ভেবো না।”
মিশমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘরময় ঘুরঘুর করে এটা-ওটা ধরে ঠিক করলো। শেষমেশ ড্রেসিং টেবিলের সামনে যেয়ে চুলগুলো আঁচড়ালো সুন্দর করে। শাড়ি পরতে অপটু মেয়েটা আজ শাড়িও পড়েছে। সাদাফ চেয়ে চেয়ে সবকিছুই দেখলো। মিশমি চুল আঁচড়ে লাফিয়ে-ঝাপিয়ে নিচে গেলো ঘর ছেড়ে। সাদাফ উঠলো না জায়গা ছেড়ে। মিশমি আবারও আসবে জানে। হলোও তাই। ঘুরে ঘুরে মিশমি আবারও ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সাদাফ বিছানায় গা এলিয়ে আয়েশ করো বসলো। মিশমি পিলপিল করে এসে দাঁড়ালো সামনে,
-“চা খাবে?”
-“উঁহু।”
-“কফি?”
-“উঁহু।”
-“পাস্তা করি? খাও?”
এ যাত্রায়ও মাথা নাড়ালো সাদাফ। মিশমি কপাল গুটিয়ে ফেললো,
-“কি খাবে তাহলে? কিছু তো খাও?”
-“তোমাকে খাই?”
মিশমির গোটানো কপাল মসৃণ হলো। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“অসভ্যতামো বাদ দিবে কবে? আক্কেল নেই তোমার একদম!”
সাদাফ হেসে ফেলল। হাত টেনে মিশমিকে সামনে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“কি হয়েছে? এতো অস্থির হচ্ছো কেন?”
-“ভালো লাগছে না।”
-“কেন? শরীর খারাপ?”
-“তা না। এমনিতেই।”
-“ঘুরতে যাবে?”
-“কে নিবে?”
-“আমি, আর কে?”
-“ভূতে।”
সাদাফ হাসে,
-“তাই? পেত্নী নিলে ভালো হতো। তুমিও পেত্নী, সেও পেত্নী। বেস্ট ফ্রেন্ড যেহেতু, একসঙ্গে যেতেই পারো।”
মিশমি ভোঁতা মুখে চাইলো। সাদাফ তা দেখে বলল,
-“আচ্ছা, যাও রেডি হও।”
-“যাবো না আমি।”
সাদাফ উঠে দাঁড়ালো। মিশমির হাত টেনে বসা থেকে উঠালো। মিশমি এবার প্রচন্ড বিরক্ত মুখে চাইলো। হাত ঝাড়া মেরে বললো,
-“যাবো না বললাম তো।”
-“এতো রাগ কেন তোমার?”
-“আমি এমনই। হয়েছে? মুখ বন্ধ করো। যাবো না বলেছি, যাবো না। সরো তো।”
মিশমি তাকে ঠেলে ঠুলে সরিয়ে নিচে চলে গেলো। সাদাফ উপায়ান্তর না পেয়ে অসহায় মুখে বৌয়ের পিছু ছুটলো।
-“অরু? কেমন আছো?”
এরিনার গলা পেয়ে তাকালো অরু। কি-বোর্ড থেকে হাত সরিয়ে মিষ্টি হেসে প্রত্যুত্তর করলো,
-“ভালো। তুমি কেমন আছো?”
মেয়েটা কিঞ্চিৎ হাসলো,
-“ভালো।”
এরিনার ফ্যাকাশে মুখের দিকে চেয়ে অরু কপাল কুঁচকায়,
-“কি হয়েছে? মুখ এমন লাগছে কেন?”
এরিনা হাসার চেষ্টা করলো,
-“রাতে ঘুম হয়নি তেমন। ঐ জন্যই বোধহয়।”
-“ওহ। আচ্ছা, বলো এবার; তোমার কাজ কতদূর?”
এরিনা ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো,
-“কিসের কাজ?”
-“আরে, নিকোলাস নামের ঐ ছেলেটা। কথা হয়েছে তোমাদের? পটেছে সে?”
-“এতো সোজা হলে তো হতোই।”
এরিনা চেয়ার ঘুরিয়ে তার দিকে বসলো আচমকা। কৌতুহলী চোখে চেয়ে ডাকল,
-“অ্যাঁই অরু?”
অরু তাকালো,
রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১৯
-“হ্যাঁ?”
-“তুমি কি প্রেম করছো?”
হঠাৎ প্রশ্নে বিব্রত বোধ করলো অরু,
-“কেন?”
-“এভাবেই জিজ্ঞেস করলাম। বলো না!”
অরু মুচকি হাসে,
-“আ’ম মেরিড।”
-“কি?”
এরিনা হতবাক হয়ে চাইলো।
