তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৩ (২)
তাবাস্সুম খাতুন
দেখতে দেখতে রাতের আঁধার কেটে ধরণীতে সূর্যের আগমন ঘটলো। সিমির ঘুম ভাঙলো সকাল আটটা চল্লিশের সময়। সে পাশ ফিরে দেখে নিশান নেই। কুঁচকে যাওয়া ভ্রু যেন আরো একটু বেশি কুঁচকে গেলো। বেড থেকে নেমে বেলকুনির পর্দা সরিয়ে দিলো। দরজা খুলে দিলো, আর কিছু না ভেবে আলমারি থেকে একটা কালো রং এর গ্রাউন বাহির করে ওয়াশরুমে ঢুকলো বেশ সময় ধরে একেবারে সাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে আসলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো শোকাতে লাগলো। মুখে পন্ডস ক্রিম ঠোঁটে লিপবাম আর চোখে কালো কাজল দিলো হাল্কা করে। চুলগুলো একটু উঁচু করে বেঁধে নিলো। উড়না টা গলার দুইপাশে দিয়ে ঝুলিয়ে নিলো। সে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো, ধীরে ধীরে হেঁটে সিঁড়ির কাছে আসলো। সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলো তার দৃষ্টি গেলো ড্রইং রুমে। দেখলো নিশান বসে আছে খুবই গম্ভীর মুখে সামনের টেবিলে ল্যাপটপ রাখা। সিমি হাসি মুখে নেমে আসলো সিঁড়ি বেয়ে সোজা ড্রইং রুমে গেলো নিশানের পাশে বসে পড়লো। নিশান কপাল কুঁচকে পাশ ফিরে সিমিকে দেখে নিয়ে আবারো কাজে মনোযোগ হলো। সিমি ল্যাপটপ এর দিকে তাকিয়ে বললো,
“কি করছেন আপনি?”
নিশান কোন বাক্য ব্যায় করলো না। সিমি আবারো বললো,
“আমার ক্ষুদা লাগছে। কি খাবো?”
নিশান হাতের ইশারায় ডাইনিং টেবিল দেখিয়ে দিলো। সিমি সেইদিকে তাকিয়ে দেখলো ডাইনিং টেবিলে খাবার ঢাকা আছে। সিমি এইবার রাগে ফুঁসতে লাগলো মুখে বম পড়েছে নাকি যে কথা বলতে পারছেনা!সিমি শেষ বারের মতো আবারো বললো,
“আপনি খেয়েছেন?”
সিমির কথা শেষ হতেই নিশান ধমক দিয়ে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ইডিয়েট নিজের কাজ করতে পারছিস না চুপ করে বারবার জ্বালাস কেন আমাকে? সর এই জায়গা থেকে।”
নিশানের ধমকে সিমি কেঁপে উঠলো। সে মুখ ভাঙিয়ে উঠে ডাইনিং টেবিলে বসলো। সেখানে অনেক রকমের খাবার আছে সিমি একটু একটু করে প্লেটে বেড়ে নিলো। সে আড় চোখে নিশানকে দেখছে বিড়বিড় করে বকছে আর খাচ্ছে। এইদিকে নিশান কানে থাকা ব্লুএটুথ চালু করলো। আদিল কল দিয়েছে ফোন রিসিভ হতেই আদিল বললো,
“বস আমি অনেক তথ্য পেয়েছি। আমি কি আপনাকে সেন্ড করবো কিছু?”
নিশান সংক্ষেপে “হুম ” বললো।আদিল কিছু তথ্য নিশানের ল্যাপটপ এ সেন্ড করে দিলো। নিশান সেগুলো গভীর ভাবে দেখতে লাগলো। অপরদিকে আদিল বললো,
“বস ওর ফোনের লোকেশন ট্যাগ করে জানতে পারলাম। ও ইতালির রোমেই আছে তাও আপনার বাড়ি থেকে বেশি দূরেও না। সামান্য দুই কিলোমিটার দূরে একটা বিল্ডিং এ অবস্থান করছে। তার সাথে অনেকে আছে সব বডিগার্ড। পার্সোনাল একাউন্ট হ্যাক করে কিছু কল রেকর্ড পেয়েছি।”
নিশান শান্ত ভাবে বললো,
“রেকর্ড গুলো প্লে কর। ”
আদিল কল রেকর্ড গুলো চালু করলো আরা নামের মেয়েটা একজনকে বলছে,
“আমাদের খুব সাবধানে কাজ করতে হবে। নিশান যখনি বাড়ি থাকবে না তখন আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো একটা একটা নতুন প্ল্যান নিয়ে।”
যাকে কথাটা বললো সে ফিরে বলছে,
“জি ম্যাম আমি সাজিয়ে রেখেছি সব। কিভাবে কি করতে হবে। এখন এই কাজটা করবে কবে?”
আরা একটু হেসে বললো,
“সবকিছু ফোনে বলতে নেই। আর খুব দ্রুতই হবে তোকে বলে দেবো।”
কল রেকর্ড শেষ। আদিল বললো,
“বস আর দুইটা আছে কিন্তু সেগুলো তেমন কিছু না। ও ওর আম্মুর সাথে কথা বলেছে আমি পাঁচবার শুনেছি সন্দেহান কিছুই নেই।”
নিশানের রাগে মাথা ফেঁটে যাচ্ছে। কি নিঘাত পরিকল্পনা সাজাচ্ছে তারা।নিশান গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ওকে ফাইন সাজাতে থাকুক পরিকল্পনা। আমিও দেখি আমার থেকে আমার ইশুকে কিভাবে ছিনিয়ে নিতে পারে সে?”
বলে কল কেটে দিলো। ল্যাপটপ এ কাজ করতে লাগলো। সিমি নিশানের মুখ মন্ডল পরিবর্তন হতে দেখলো। হঠাৎ রেগে যাওয়ার কারন সে নিজেও বুঝলো না। তবুও পাত্তা না দিয়ে খাবার খেতে লাগলো।খাবার শেষ হতে। চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলেই নিশান বলে উঠলো,
“এইদিকে আয়।”
সিমি পিছে ফিরে ভ্রু কুঁচকালো। মনে মনে বললো,
“শালা বিদেশি কুত্তা। একটু আগেই বললি দূরে যা। এখন আবার কাছে ডাকিস কেন?”
সিমিকে ঐভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিশান ধমক দিয়ে বললো,
“কানে কথা যাই না তোর? এইদিকে আয় বলছি।”
সিমি মুখ অন্ধকার করে নিশানের কাছে গেলো। সে দাঁড়িয়ে রইলো। নিশান আচমকা সিমির কোমরে হাত দিয়ে টেনে নিজের কোলে বসালো। সিমি নিশানের গলা জড়িয়ে ধরলো। আচমকা এইভাবে টানাই সে ভয় পেয়ে গেছে। নিশান সিমির ঘাড়ের কাছ থেকে চুল সরিয়ে সেখানে জোরে কামড় বসালো। সিমি ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো নিশানের জামা জোরে খামচে ধরলো। নিশান ছেড়ে দিলো কামড়ানো জায়গায় একটা গভীর চুম্বন দিলো। সিমি চোখ বন্ধ করে আছে। নিশান যেইখানে কামড় দিসে সেই জায়গা যেন অবাস হয়ে গেছে। নিশান সিমির মুখটা নিজের মুখের কাছে আনলো। মুখে আশা চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে কানে গুঁজে দিয়ে বললো,
“আমি বাহিরে যাচ্ছি। দ্রুত ফিরবো। এর মধ্যে এই বাড়ি থেকে ন। যেন কোথাও যাওয়া নাহ হয় তোর বুঝেছিস?”
সিমি মাথা নাড়লো। নিশান সিমির ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেয়ে বললো,
“যদি দেখি আমার কথার খেলাপ করেছিস। তাহলে শাস্তি টা তুলে রাখবো রাতে, শুধু তৈরী হয়ে থাকিস।”
বলে সিমিকে কোল থেকে নামিয়ে সোফায় বসিয়ে দিলো। ল্যাপটপ অফ করে রেখে দিলো। ফোনটা হাতে নিয়ে আবারো সিমির দিকে তাকিয়ে বললো,
“চুপচাপ এই বাড়িতে অবস্থান করবি তুই। কোন ভাবেই বেড়োনোর চালাকি করিস না যেন মনে থাকবে?”
সিমি মাথা নাড়লো। নিশান বেড়িয়ে গেলো বাড়ি থেকে। প্রতিটা বডিগার্ড কে আরো কঠোর ভাবে পাহারা দিতে বললো। এরপর গাড়িতে উঠে আবারো চলে গেলো নিজ গন্তব্যের দিকে। সিমি কত সময় ধরে সোফায় বসে রইলো। ভালো লাগছে না এইভাবে। তার মধ্যে ঘাড় ও ব্যাথা করছে সে রাগানিত্ব কন্ঠে বললো,
“দূর বাল ঘাড় ব্যাথা করে চলে গেলো। এইখানে থাকতেও অসহ্য লাগছে। ধ্যাৎ বালের বাড়িতে এসে পড়ছি। একটা পিঁপড়াও নেই এই বাড়িতে।”
বলে উঠে সে উপরে উঠলো। সোজা রুমে ঢুকে বেলকুনির দরজা খুলে বেলকুনির কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো ব্যাস্তময় ইতালির রোম শহর।হঠাৎ তার চোখ আটকালো বাড়ির পাঁচিলের ঐপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের উপরে। মেয়েটা একটা কালো গাড়ির কাছে হেলাম দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা স্কার্ট আর একটা সবুজ রঙের কুর্তি। চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া। চোখে কালো চশমা। মেয়েটা সিমির দিকে হাত নাড়লো। সিমি ও হাত নাড়লো। মেয়েটা হাতের ইশারায় তাকে ডাক দিলো। সিমি মাথা দুইপাশে নেড়ে না বোঝালো। নিশান বারবার বলেছে বাড়ি থেকে যাওয়া যাবে না। মেয়েটা মুচকি হাসি দিয়ে আবারো ডাকলো। সিমি আবারো না করলো। মেয়েটা এইবার গাড়ির ভিতর থেকে একটা বড়ো পেপার আর কালো মার্কার পেন বাহির করলো। ডিক্কির উপরে রেখে কিছু লিখতে লাগলো। সিমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার লেখা শেষ হতেই সিমির দিকে লেখাটা ধরলো সিমি আর একটু এগিয়ে আসলো। সে চোখ বড়ো বড়ো করে দেখলো লেখাটা এমন,
“তুমি নিচে আসো। আমরা একটু ঘোরাঘুরি করবো। কেউ বুঝতে পারবেনা। পালিয়ে আসো।”
সিমি লেখাটা পরে রুমে গেলো সেও ঐরকম একটা পেজ খুঁজলো পেয়েও গেলো তারপর সেও সেখানে লিখলো,
“সরি আমি যেতে পারবোনা। আমার এই জায়গা থেকে যাওয়া সম্পূর্ণ রূপে নিষেধ। আপনি ফিরে যান, আল্লাহ হাফেজ।”
লেখা শেষ হতেই মেয়েটাকে দেখালো। মেয়েটা দেখে আবারো পেজে লিখলো। সিমির দিকে ফিরে আবারো দেখালো,
“তুমি কবে যাবে আমার সাথে ঘুরতে? আমি আবারো আসবো।তুমি বলে দাও।”
সিমি লেখা পরে আবারো রুমে গেলো। সে লিখলো,
“আমি জানিনা। আমি কবে যেতে পারবো। আমার হাসব্যান্ড আমাকে কখনো বেরোতে দেবে না তুমি ফিরে যাও।”
লেখাটা মেয়েটাকে দেখালো। মেয়েটা দেখে আবারো একটা পেজে লিখলো। সেইটা সিমিকে দেখালো,
“********* এইটা আমার নাম্বার। তুমি যখন সুযোগ পাবে আমাকে কল দেবে। আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাবো। এই রোম শহর ঘুরে দেখাবো।”
সিমি কি মনে করে নাম্বার টা লিখে নিলো। মেয়েটা মুচকি হাসি দিয়ে হাত নাড়িয়ে চলে গেলো। সিমিও হাত নাড়লো। মেয়েটা চোখের পলকে গাড়ি নিয়ে বহু দূর চলে গেলো। এইদিকে সিমি নাম্বারটা লুকিয়ে রাখলো যেন নিশান কোন ভাবে না পাই। তার এই শহর ঘুরে দেখার ইচ্ছা। নিশান নিজের কাজে ব্যাস্ত নিয়ে যাবে বলে মনে হয় না!কোনোদিন সময় পেলে সে ফোন দেবে। পালিয়ে যাবে ঘুরে আবারো নাহয় বাসায় ফিরবে।
নিশান নিজের গোপন সুড়ঙ্গে পৌঁছালো মাত্র। আদিল এগিয়ে আসলো নিশানের কাছে। বলে উঠলো,
“বস এখন কি করবো?”
নিশান শান্ত কন্ঠে বললো,
“কিছু না। চুপচাপ শুধু নজর রাখ।”
আদিল মাথা নাড়লো। নিশান আবারো বললো,
“সাদিক কোথায়?”
“বস ও আমাদের পুরো TN টিম পরিচালনা করছে। কোন দরকার আছে কি? আমি কি ডাকবো?”
“নো ও যা করছে করুক। আমাকে নিচের অন্ধকার কারাগারের চাবি দে।”
আদিল চাবিটা দিয়ে দিলো নিশানকে আর বললো,
“আপনি কি একা যাবেন বস?”
নিশান কিছু না বলেই এগিয়ে গেলো। সরু গলি দিয়ে নিচে যাওয়ার সিঁড়ি বেয়ে নামলো। ঘন অন্ধকার। নিশান নিজের ফোনের ফ্লাশ অন করলো।
ধীরে ধীরে নামতে লাগলো। সিঁড়ি শেষ হতেই একটা দরজা পড়লো। সে সেই দরজায় থাকা তালা হাতে থাকা চাবি দিয়ে খুললো। দরজা খুলে যেতেই ভিতরে ঢুকলো। সেখানে নিচে যাওয়ার সিঁড়ি। নিশান নামলো সিঁড়ি বেয়ে। সিঁড়ি শেষ হতেই আরো একটা দরজা। হাতে থাকা চাবির মধ্যে আরো একটা চাবি দিয়ে তালা টা খুলে দিলো। মড়মড় শব্দ তুলে দরজাটা খুলে গেলো। নিশান ভিতরে ঢুকলো।
তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৩
ভিতর থেকে কেমন গুমোট আওয়াজ ভেসে বেড়াচ্ছে। এইখানে আরো গভীর আঁধার ছড়িয়ে আছে। নিশান ফ্লাস নিয়ে সামনে এগোলো। এইখানে থাকা দেওয়াল ফ্লোর সব রক্তের ছাপ। বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ। কয়েকটা হিংস্র পশুর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সাথে মানুষের চিৎকার ও ভেসে আসছে। নিশান হাঁটতে লাগলো। সামনের দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা কারাগারের সামনে তার পা দুটো থেমে গেলো। ফ্ল্যাশ অফ করে দিলো। আচমকা কেউ একজন হুহংকার ছেড়ে বললো,,,,,
