ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭২
তাজরীন ফাতিহা
দরজা খুলতেই তীব্র ঝাঁঝালো এক গন্ধ নাসারন্ধ্রে বারি খেল। ঘ্রাণটা খারাপ না স্যাভলন, ডেটল কিংবা অ্যালকোহল মিশ্রিত একটা ঘ্রাণ। সাধারণ মানুষের জন্য একটু অদ্ভুত লাগলেও রোগীদের জন্য ঠিকঠাক। ঠান্ডা ঠান্ডা ঝাঁঝালো গন্ধ। মনিটরের বিপ বিপ শব্দ হচ্ছে। স্ক্রিনে সবুজ রেখা ওঠানামা করছে। সামনে তাকাতেই উঁচু বেড নজরে এল। শায়িত মানুষটির দিকে তাকিয়ে ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার চোখ বেয়ে পানি গড়াতে লাগল। একমাত্র আদরের পুত্রের এহেন করুণ দশায় বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে তার। পিতৃত্ব বুঝি একেই বলে। নাহলে রাত একটা বাজে কোন পিতা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আইসিইউ রুমে এসে পুত্রকে দেখতে চায়?
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া এগিয়ে এসে ছেলের পাশে বসলেন। নার্স নিষেধ করল পাশে বসতে। চেয়ারে বসতে নির্দেশ দিল। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া চেয়ারে বসে ছেলের পানে চাইল। মাথা, হাত, পায়ে ব্যান্ডেজ। হাতের সঙ্গে ক্যানুলা সংযুক্ত, মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরিহিত। তিনি সহ্য করতে পারছেন না। উর্মি ভুঁইয়া আইসিইউ রুমে ঢুকতে চেয়েছিলেন তিনিই আনেননি। ছেলেকে দেখে মরা কান্না জুড়ে দিতো। একটু আগেই কেবিন থেকে আইসিইউতে শিফট করেছে ইহাবকে। অবস্থার নাকি অবনতি হচ্ছে। দোয়া ছাড়া উপায় নেই। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ছেলের দিকে চেয়ে শব্দহীন একনাগাড়ে অশ্রু ঝরাতে লাগলেন।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
অন্যদিকে মানহার অবস্থাও শোচনীয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, শক, ঝিমুনি এবং শ্বাসকষ্ট একসাথে হওয়ায় তাকেও দ্রুত আইসিউতে ভর্তি করানো হয়েছে। ইতোমধ্যে দুই ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়ে গেছে। আরও কয়েক ব্যাগ ইমিডিয়েটলি প্রয়োজন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া সবকিছুর ব্যবস্থা করেছেন। যতকিছুই লাগুক তার পুত্র এবং পুত্রবধূকে বাঁচানোর দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। ডাক্তারদের থেকে নিরাশমূলক ও হতাশাজনক কোনো কথা শুনতে চায়না সে।
মাহদী মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিল। বোন ও বোন জামাইয়ের জীবন আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চেয়েছে সে। আল্লাহ নিশ্চয়ই নিরাশ করবেন না। ঐটুকু দুধের শিশুকে পিতা-মাতার আদর, স্নেহ, ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবেন না। তার বুক ভেঙে কান্না আসছে। শুধুমাত্র পুরুষ দেখে আজ মায়মুনা বেগম, উর্মি ভুঁইয়া ওনাদের মতো কাঁদতে পারছে না।
একই হাসপাতালের আইসিইউ (ICU) ইউনিটে দুটি ভিন্ন কেবিনে পিতা-মাতা এবং NICU ইউনিটে তাদের সদ্য জন্ম নেয়া শিশুপুত্র ভর্তি আছে। সেখানে সন্তান অবজার্ভেশনে থাকলেও মাতা-পিতা উভয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন। কি আছে তাদের ভবিষ্যতে? একমাত্র কাঙ্ক্ষিত সন্তানের কাছে তারা ফিরতে পারবে নাকি রবের ডাকে সাড়া দিতেই তাদের এত আয়োজন?
মাহাবুব আলম মসজিদে গেছেন। ইরা, ইনাবা উভয়ই পাথরের মতো বসে রয়েছে। নিশাত সেই যে পাশের রুমে গিয়েছে আর বেরোয়নি। তারাও আর তাকে ডিস্টার্ব করতে যায়নি। মাহাবুব আলমই নিষেধ করে দিয়েছেন। কিছুক্ষণ একা থেকে নিজেকে হালকা করুক। নিশাত শুয়ে শুয়ে ডায়েরির প্রতিটা পৃষ্ঠা পরখ করে চলেছে। কোথাও কোনো লেখা বাদ পরে গেল না তো আবার? লোকটার ডায়রি লেখা কেমন এলোমেলো করে লিখেছে। কিছু লেখা সামনের পৃষ্ঠায় আবার কিছু শেষ পৃষ্ঠায়। যেন নিতান্ত অনিচ্ছায় এসব লিখেছে সে। নিশাত পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ খেয়াল করল কিছু লেখা। সে মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল,
মাহাবুব আলম এবং মায়মুনা বেগম:
“তারা আমার শ্রদ্ধেয় জন্মদাতা এবং জন্মধাত্রী। আমার মতো বিশেষ এক চিজের জনক ও জননী। মাঝেমধ্যে ভাবি, আমিও তো ফাইয়াজের মতো ছিলাম। লেংটু মেংটু ঘুরে বেড়াতাম আর আমার মা জননী আমার পিছন পিছন ছুটে ভাত খাওয়াতেন। ত্যাড়ামি করলে মাইরও দিতেন। বাবা এসে মার খাওয়া থেকে বাঁচাতেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে বড় হয়ে যাওয়ার পর আব্বা, আম্মা আমাকে আর ঘাটতেন না বেশি। ছেলে বড় হয়েছে, এত বড় ছেলেকে কি আর শাসন বারণে রাখা যায়? তাদের বয়স হয়েছে। শরীরে শক্তি কমে যাচ্ছে আমার মতো শক্ত, সামর্থ্যবান পুরুষের সাথে ওনারা কি আর পারবেন? এজন্য বোধহয় বাংলদেশের সব পিতা মাতাই ছেলে মেয়ের বয়স হয়ে গেলে ঠান্ডা হয়ে যান। আচ্ছা, সন্তানরা বড় হয়ে গেলে পিতা মাতারা বুড়ো হয়ে যায় কেন? তাদেরকে চোখের সামনে জোয়ান থেকে বুড়িয়ে যেতে দেখতে মোটেও ভালো লাগেনা।”
নিশাতের চোখ আবারও ছলছল করতে শুরু করেছে। সে পৃষ্ঠা উল্টালো,
“আব্বা, আম্মার সাথে বহু বছর ফোনে কথা বলিনি। বিশেষ করে আমার আম্মাজানের সাথে। ইচ্ছে করেই বলতাম না। এত নরম মনের একজন নারী, কথা বলা শুরু করলেই কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে যেতো। বাড়িতে যাওয়ার জন্য বারবার বলতো। এমন দরদী মায়ের কথা ফেলা যায়? এজন্য ফোন বন্ধ করে রাখতাম। জানি, কাজটা নিতান্তই খারাপ হতো। তবুও জন্মদাত্রীর কথা অমান্য করা তো আর হতো না।”
—– আজাদ
নিশাত লেখাগুলোর উপরে হাত বুলাতে লাগল। কতটা মায়া মিশিয়ে বাবা, মাকে নিয়ে লিখেছে লোকটা। সে আরও কতগুলো পৃষ্ঠা উল্টে পেল কিছু লেখা,
“কিছু ভাবনা মাঝে মধ্যেই মস্তিষ্কে ঘোরাফেরা করে। এই যেমম আমার পিতা-মাতার প্রতি আমার অবহেলা, উদাসীনতা। আমি শুনেছি, পৃথিবীতে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তান যেমন ব্যবহার করে নিজের সন্তানও নাকি ঠিক তেমন ব্যবহারই তাদের সাথে করে। এখানে কজ অ্যান্ড ইফেক্টের একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন করবে ঠিক তেমনই পাবে। প্রশ্ন হলো, আমি তো আমার আব্বা-আম্মার সাথে তেমন ভালো ব্যবহার করিনি। মানে খারাপ ব্যবহারও করিনি। কিন্তু ফোন দিয়ে তাদের খোঁজখবর নিতাম না, এড়িয়ে চলতাম এরকম কিংবা তারচেয়েও খারাপ ব্যবহার কি ফাইয়াজও আমার সঙ্গে করবে?”
—– আজাদ
নিশাত এপর্যায়ে আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। লেখাগুলোর উপরে হাত ছুঁইয়ে বলতে লাগল,
“মারওয়ান আজাদের ফাইয়াজ কখনো তার পিতার সাথে এমন ব্যবহার করবে না। ফাইয়াজ তার পিতাকে অসম্ভব ভালবাসবে, শ্রদ্ধা করবে।”
চোখের অশ্রুতে পৃষ্ঠা ভিজে একাকার। নিশাতের খেয়াল নেই তাতে। সে নিজেকে সামলে আবারও পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল। কি সুন্দর হাতের লেখা! নিশাত শুধু ছুঁয়েই চলছে। আবারও লেখা পেল,
“আমি জানি, কর্মক্ষেত্রে আমার জীবনটা রিস্কে থাকে। কিন্তু কিছু করার নেই। দেশের মানুষের সুবিধার জন্য আমার মতো সৎ, নিষ্ঠাবান আইনের লোকদের নিজেদের সুবিধা ত্যাগ করতে হয়। অবশ্য আমাদের দেশে বেশিরভাগ আইনের সেক্টরে দালাল, সুবিধাবাদী, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ দিয়েই ভরা। নামেই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কর্মে সাক্ষাৎ পিচাশবাহিনী। এক কথায় সরকারের পা চাটা। এই দেশ এবং দেশের মানুষ কবে যে একটু হাসবে, ভালো থাকবে জানি না? প্রতিদিন কত অফার পাই ন্যায়ের পথ থেকে সরে আসার জন্য কিন্তু আমার বিবেক ও মস্তিষ্ক আমাকে দেয়না তা করতে। ভাবি, আমি টাকার বিছানায় ঘুমালাম কিন্তু আমার দেশের জনগণ যে অশান্তির ভেতরে দিনাতিপাত করবে তার দায়ভার কোন আল্লাহর বান্দা নেবে? জানি আমার একার প্রতিবাদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ এদের অন্যায়, দুর্নীতি ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে অন্তত এইটুকু তো বলতে পারব, আমি চেষ্টা করেছিলাম আমার প্রভু কিন্তু লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারিনি। হয়তবা এই ন্যায়ের জন্য একদিন আমার বুক ঝাঁঝরা হবে কিন্তু মাথা আমি কিছুতেই নোয়াবো না। সাক্ষাৎ মৃত্যু জেনেও জুলুমকারীর সামনে মাথা নামানোর শিক্ষা আমি পাইনি।
—– আজারাক সাইফার
১৪ই আগস্ট,২০২৩
নিশাত তড়াক উঠে বসল। আজকে আঠারো আগস্ট। তাহলে চারদিন আগে এই লেখা লিখে গিয়েছিল মারওয়ান। সে কি আগে থেকেই জানতো কোনো কিছু? এটাই কি শেষ লেখা ছিল ডায়েরিতে? একটা লেখাও একটু গুছিয়ে লেখেনি। তাহলে অন্তত বুঝতে পারতো কোন লেখার পর কোন লেখা লিখেছে। শুধু এই একটা লেখাতেই তারিখ দেয়া আর কোনোটাতেই দেয়নি। বেশিরভাগ পৃষ্ঠা খালি। মাঝে মধ্যে টুকটাক লেখা। নিশাত পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখতে লাগল কোথাও কোনো লেখা পড়তে বাদ পড়েছে কিনা। বেশ মোটা একটা ডায়েরি। সব পৃষ্ঠা দেখতেও সময় লাগবে প্রচুর। সে পূর্ণাঙ্গ মনোযোগের সহিত দেখে চলেছে। উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ কিছু লেখা পেল,
“আমি কখনো বিয়ে করতে চাইনি। কারণ যে পেশায় আছি, একদিন হুট করে মৃত্যু হতে পারে। এখন এই অনিশ্চিত জীবনে কাউকে জড়িয়ে তার জীবনটা নষ্ট করার মানে হয়না কোনো। আল্লাহর পরিকল্পনা হয়তোবা ভিন্ন ছিল। নিশাতের সঙ্গে আমার যখন বিয়ে হয় আমি তখন সাসপেন্ড ছিলাম। কখনো আবার গোয়েন্দা সংস্থায় যোগ হতে পারব কিনা সেটাও অনিশ্চিত ছিল। এজন্য বিয়েতে বড় গলায় না করতে পারিনি। চাচ্চু জানতেন, আমি যদি আবারও চাকরিতে ঢুকি আর কোনোদিন বিয়ের পিঁড়িতে বসব না। এজন্য ধরে বেঁধে পরিকল্পনা করে তারা ফৌজিয়া নিশাত নামক ধৈর্যশীল রমণীকে আমার ঘাড়ে উঠিয়ে দিয়েছেন।
বিয়ের পর পরই যখন কর্মক্ষেত্রে সাসপেন্ড উঠে যাবে শুনেছিলাম নিশাতের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে চাইতাম, শুয়ে বসে খেতাম, কাজ করতাম না। খুব করে চাইতাম মেয়েটা অতিষ্ঠ হয়ে আমার সংসার ত্যাগ করুক। আমার সাথে থাকলে ও কোনদিন সুখী হতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহর এই বান্দি ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার পরেও আমার মতো ভবঘুরে, ত্যাড়া লোকের সংসার ত্যাগ করেনি। আমার কাছ থেকে ভালোবাসা, আদর, যত্ন কিচ্ছু পায়নি তবুও আমাকে ছেড়ে যায়নি। প্রায়ই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, ফৌজিয়া আমার মতো উদাসীন একটা লোককে এমন শক্ত গাঁটছড়ায় বাঁধলে কেন?”
—– আজাদ
নিশাত মুখ চেপে কেঁদে দিল। আজাদ নামের উপরে হাত ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
“কারণ আপনি যে মারওয়ান আজাদ। আমার একমাত্র ত্যাড়া বর। আপনাকে বাঁধবো না তো কাকে বাঁধবো? আপনি যে আমার ইহকাল ও পরকালের সঙ্গী।”
নিশাত বলতে বলতে আরও কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টালো। আর কোনো লেখা নেই। শেষের কয়েকটা পৃষ্ঠা আগেই পড়া হয়েছে। একটা পৃষ্ঠায় লেখা,
রেটিং:
সন্তান হিসেবে = ০০ (খুবই বাজে)
স্বামী হিসেবে= মাইনাস ডাবল জিরো ইনফিনিটি (স্বামীর কোনো দায়িত্বই পালন করিনি)
ভাই হিসেবে= ০০ (ভাই বোনের খোঁজ জীবনেও নেইনা)
পিতা হিসেবে = ১ না ২(ছেলেকে একটু আদর করার চেষ্টা করি।)
গোয়েন্দা হিসেবে= ৫ (এটায় একটু ডেডিক্যাটেড হয়ে কাজ করি)
ফলাফল: আমি একজন মানুষ হিসেবে ব্যর্থ।
নিশাত চোখের পানি মুছে নিচে কিছু লিখল।
ঘুম ভেঙে যেতেই নাহওয়ান পাশ হাতড়ালো। উঠে বসে চোখ কচলে আশেপাশে দেখলো। ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
” বাবা কুতায়?”
নিশাত এগিয়ে এসে ছেলেকে আগলে নিয়ে বলল,
“বাবা বাইরে, একটু কাজে গেছে। আপনি ঘুমান আব্বা।”
“এখনো বাইরে? আমার জন্য চক্কেট আনতে বলিও।”
“আনবে, ঘুমান।”
“আমি গুমায় গেলে বাবাকে জরিয়ে দরতে বলিও।”
নিশাত কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“বলব।”
নাহওয়ান মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“এভাবে দরতে বলিও।”
“আচ্ছা।”
“বাবা আজকে এত দেরি করে কেন? আমি গুমাই গেলে জরিয়ে দরতে হবে দেকে সবসময় দেরি করে।”
নিশাতের ওষ্ঠ কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিজেকে ভীষণ শক্ত রেখে বলল,
“আপনি ঘুমান। এলে আমি বলে দেব, আপনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। ”
“আচ্ছা গুমাই।”
নিশাত প্রত্যুত্তর করল না। ছেলের পিঠে হাত ওঠানামা করতে লাগল। নাহওয়ান কিছুক্ষণ ঘুমের ভান ধরে মায়ের কোলে পড়ে রইল। খানিক পর উশখুশ করতে করতে মায়ের মুখ ধরে বলল,
“মা শুনো, বাবাকে সবসময় দোষ দেই দেকে বাবা বোদহয় রাগ করছে? এরপর থেকে আর দোষ দেব না। জলদি চলি আসতে বলো।”
এবার নিশাত একটু কড়া গলায় বলল,
“আহ্! এত কথা বলছেন কেন? ঘুমান।”
নাহওয়ান ছলছল চোখে চেয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,
“বাবা ছাড়া গুম আসেনা।”
নিশাত ছেলেকে ঝাপটে ধরে কোলের মধ্যে নিয়ে চোখের পানি ফেলতে লাগল। ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পরে খেয়াল করল, নাহওয়ান ফোঁপাতে ফোঁপাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশাত ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মারওয়ান আজাদকে খুঁজতে চাইল। লোকটা নিজের সবচেয়ে বড় আমানত তার কাছে রেখে পালিয়ে গেছে।
নাসির উদ্দিন এসে পৌঁছেছেন ভোর পাঁচটার দিকে। রাবেয়া খাতুন, নাজিয়া সবাইকে নিয়েই এসেছেন। এত রাতে বাস পেতে কষ্ট হয়েছে। তাই ভেঙে ভেঙে এসেছেন। নিশাত বাবাকে দেখেই কেঁদে উঠে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নাসির উদ্দিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“টাউটটা তোকে এখনো শান্তি দেয়নি?”
নিশাত কথা বলল না। শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। আশেপাশের কোনো কথা কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না তার। মেয়ের কান্নায় রাবেয়া খাতুনও কেঁদে দিলেন। ইরা, ইনাবা, নাজিয়া সকলেই একপাশে দাঁড়ানো। এত কষ্ট তারা দেখতে পারছে না। নাসির উদ্দিন বললেন,
“কখন নিয়ে গেছে?”
নিশাত কান্নার মাঝেই বলল,
“জানি না।”
নাসির উদ্দিন মেয়েকে থামালেন না। কাঁদলে কষ্ট কমে। কষ্ট গুলো কান্নার সঙ্গে ভেসে যায়। তাই কাঁদতে দিলেন। মাহাবুব আলম ফজরের নামাজ পড়ে বাসায় এলেন। নাসির উদ্দিন তার সঙ্গে হালকা কুশলাদি বিনিময় করলেন। মাহাবুব আলম বেশ মুষড়ে পড়েছেন। বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে। ছেলে, মেয়ে দুজনই মৃত্যুর মুখে। এই অসহায় পিতার মুষড়ে পড়াটাই তো স্বাভাবিক। সকলের মুখ থমথমে হয়ে আছে। ইতোমধ্যে বাসার সকলে নামাজ পড়ে নিয়েছে। নিশাত নামাজের বিছানা থেকে ওঠেনি। আল্লাহর সঙ্গে তার অনেক আলাপ আছে। মানুষের সঙ্গে শুধু শুধু কথা বলে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। সৃষ্টিকর্তার কাছে তার তিনটা সৃষ্টির জীবন ভিক্ষা চেয়ে চলেছে অবিরাম। একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামীনই ভরসা।
জনগণের তোপের মুখে পড়েছে সরকার। যে রেকর্ডটি ভাইরাল হয়েছে তার ভিত্তিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, আল জাজিরা সব আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খবর ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে। সকলেই একযোগে প্রচার করছে,
“মন্ত্রীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে তথ্য দেয়ায় একজন বাংলাদেশী গোয়েন্দাকে তুলে নিয়ে গেছে তারই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।”
উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া। মার্ভ জেন একজন কর্নেলের সাথে গতকালই যোগাযোগ করেছেন। কর্মক্ষেত্রে থাকাবস্থায় এই আর্মি অফিসারের সাথে তার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেও সহযোগিতা করছে সাইফারকে ছাড়িয়ে আনতে। কর্নেল রফিক তার উচ্চপদস্থ অফিসারকে তথ্য ও প্রমাণ দেখানোর পর তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসে এবং তাকে উদ্ভূত পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে চাপ প্রয়োগ করে। পরবর্তীতে কর্নেল রফিকের নেতৃত্বে তাদের একটা ফোর্স সাইফারকে উদ্ধার করতে পাঠায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের উত্তাল পরিস্থিতি এবং সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে মুমূর্ষ সাইফারকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। তাকে উদ্ধার করে কর্নেল রফিক দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করেন।
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭১
মার্ভ জেন সাইফারকে উদ্ধারের খবর মাহবুব আলমকে জানিয়ে দিয়েছেন। শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। অত্যন্ত সংকটাপন্ন। সে অতি দ্রুত মাহবুব আলমকে হাসপাতালে আসার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। ডাক্তাররা জানিয়েছেন বেশ জখম হয়েছে সাইফারের। জখম গুলোই বলে দেয় সে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মাহাবুব আলমের কাছে মারওয়ানের এহেন খবর শুনেই নিশাত সিজদায় চলে গেছে। টপটপ করে গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে জামনামাজে। আল্লাহ যেন মারওয়ান আজাদকে ফিরিয়ে দেয় তার কাছে। কি এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও বিভীষিকায় দুটো দিন কাটছে তাদের!
