অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৩+৩৪
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
মাগরিবের নামাজ আদায় করে অভ্যাস মোতাবেক আনিকার রূমের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো হীরা। পড়তে বসার আগে সে প্রতিদিনই আনিকার রুমে যায় নয়তো আনিকা তার রুমে আসে। দুজন মিলে একটু হাসি- ঠাট্টা না করলে যেনো পড়ায় মনই বসে না তাদের। হীরাকে দেখতেই মুখে হাসি ফুটলো আনিকার। সে এতক্ষন যাবৎ হীরারই অপেক্ষায় ছিলো। আরেকটু দেরি হলে সে নিজেই চলে যেতো।
“ ভাইয়া কোথায়? ”
“ আর কোথায়, যেখানে থাকার কথা। ”
বলতে বলতেই আনিকার পাশে এসে বসলো হীরা। এর মাঝেই আনিকা আবার প্রশ্ন ছুড়লো,
“ কখন গেলো? ”
“ একটু আগেই। ”
“ ওহ। ”
বসা থেকে উঠে যেতে যেতে বললো আনিকা। ওয়ারড্রপ এর উপর থেকে দু’টো ব্যাট নিয়ে হীরার কাছে ফিরে এলো। বললো,
“ চলো ব্যাড মিন্টন খেলি? ”
হীরা এক লাফে বসা থেকে উঠে পরলো। কিন্তু পরক্ষনেই আবার চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেশ করলো,
“ কোথায় খেলবো আপু? ”
“ আরে বাইরে খেলবো। ওখানে তো লাইট আছেই। ”
আর কিছু বললো না হীরা। খুশিমনে চললো দুজন।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ইট সিমেন্টের ঢালাই করা বাড়িতে ঢুকার সরু রাস্তা টায় হীরা ও আনিকা ব্যাডমিন্টন খেলছে আর বিভিন্ন কথা বলছে।
“ আরে হীরা, তোমাকে তো একটা কথা বলাই হয়নি! ”
সহসা অন্য কথার মাঝে বলে উঠলো আনিকা। তার কথায় হীরা আগ্রহ ভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
“ কী কথা? ”
“ আমাদের কলেজ এ একটা নতুন লেকচারার এসেছে। ঐ যে রীতি আপুর বিয়েতে বললাম না বিয়ের গেইটের আশিক ভাইয়ার বন্ধুটার কথা, ঐ লোকটাই। ”
“ ইয়া আল্লাহ, তোমার বিগেস্ট শত্রু এখন তোমার সম্মানিত লেকচারার! বাহ। নাম কিগো ঐ লোকের? ”
“ সাদিক। ”
শব্দটা কর্ণপাত হতেই হাত টা থেমে গেলো হীরার। খেলার মাঝে হীরাকে থামতে দেখে কপাল কুঁচকে গেলো আনিকার। ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো, “কী হয়েছে? ” তার কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই হীরার সে উল্টো প্রশ্ন ছুড়লো,
“ পুরো নাম কী ”
“ পুরো নামটা তো বলতে পারি না। উনি বলেছিলেন তবে আমি তেমন একটা পাত্তা দেই নাই। আমার তো উনাকে সহ্যই হয় না, এতো বদমাইশ ছেলে আমি এর আগে কখনো দেখি নি। ”
“ ওহ, আমাকে একদিন দেখিয় তো উনাকে। আমার তো বিয়ের দিন থেকেই লোকটাকে দেখার ইচ্ছা ছিলো। তবে তোমার ভাইয়ার জন্য তো বাইরেই বের হতে পারি নি। ”
“ তুমি দেখো নি এখনো? ”
“ নাহ। ”
“ আরে হ্যাঁ, তুমি কী করে দেখবে। ”
মনে পরার ভঙ্গিতে বললো আনিকা। আসলে হীরার স্কুল ও তাদের কলেজ এক সাথে হলেও কলেজের চারপাশে দেয়াল করা এবং কলেজের আলাদা গেইট আছে। কলেজের ভিতরের কিছু বাইরে দেখার সুযোগ নেই। আর এমনিতেও স্টুডেন্ট রা বের হবার বেশ পরে লেকচারার রা বের হয়। তাই হীরার না দেখাটাই স্বাভাবিক।
সহসা গেইটের বাইরে গাড়ির শব্দ পেয়ে টনক নড়ল হীরা ও আনিকার। দুজন কোনোকিছু না ভেবেই দৌঁড় লাগালো বাড়ির ভিতরে। বুঝতে পারলো অনিল এসেছে।
পড়ার টেবিলে বসে হাঁপাচ্ছে হীরা। বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। এর মাঝেই নিঃশব্দে রূমে ঢুকলো অনিল। অনিলের অস্তিত্ব টের পেতেই হীরা নিজের পুরো মনোযোগ বইয়ের পাতায় নিবদ্ধ করে ফেললো। ভাব এমন যেনো এই দুনিয়াতে পড়া ছাড়া হীরার কাছে আর কোনো কিছুরই গুরুত্ব নেই।
“ তোমার যে এক্সাম চলতেছে এটা কী তুমি ভূলে গেছো? ”
বুকটা ধ্বক করে উঠলো হীরার। এইরে উনি কী বুঝে ফেললো? এইবার হীরা তুই শেষ। আগের বারের মতো আবার ঠাণ্ডা পানিতে গুসল করতে বলবে নাতো- ভাবতেই একটা শুষ্ক ঢোক গিললো মেয়েটা। পরক্ষণেই আবার ভাবতে লাগলো উনি কী করে দেখবে? সে ঐ মনে হয় একটু বেশি ভাবছে। বলেনা চুরের মন পুলিশ পুলিশ এই দশা হয়েছি আর কী তার। সে একদম মাসুম লোক নিয়ে অনিলের দিক ফিরে বললো,
“ ভূলে কেন যাবো? আমার মনে তো সারাদিন পরীক্ষার চিন্তাই ঘুরে! ”
“ আর এতক্ষন ব্যাডমিন্টন ঘুরল কার মাথার উপরে? ”
লে হালুয়া, এইবার ব্যাডমিন্টন চিবিয়ে খা। এইবার তুই কী করবি হীরা। আজকে তোকে গুসল করা থেকে কেউ আটকাতে পারবে না- এইটা মাথায় গাঁইথা রাখ তুই। গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে এখন তার। তবে ইচ্ছে টা পূরণ করতে হলে আগে তাকে নিজের মান ইজ্জতের ফালুদা বানাতে হবে- যেটা সে কখনোই করবে না। তাই নিজের সাফাই গেয়ে বললো,
“ পরীক্ষার তো তিনদিন গ্যাপ আছে। তাই আজকে একটু খেলছিলাম আর কী। আর…. ”
কথাটা শেষ ও করতে পারল না মেয়েটা। এর আগেই অনিল তার মুখের কথা টান দিয়ে নিয়ে বললো,
“ তিনদিন পর তোমার উচ্চতর গণিত এক্সাম আর সে কারনেই মূলত এতদিনের গ্যাপ দিয়েছে যেনো ভালো করে প্রিপারেশন নিতে পারো অথচ তুমি ব্যাডমিন্টন খেলে প্রিপারেশন নিচ্ছ? ”
“ আপনি যেমনটা ভাবছেন তেমনটা না। আমরা তো একটু পরেই এসে পরতাম। আর এমনিতেও যে দু’দিন আছে ঐ দিন গুলোতেই রিভিও করে নিতে পারবো। সমস্যা নেই এইগুলো তো আগেই করেছি। ”
“ ওকে তাহলে আমি একটু টেস্ট করে দেখি ”
“ আরে না না, দয়া করে আপনি টেস্ট করতে আসবেন না ডাক্তার সাহেব। পরে আমাকে এই কনকনে শীতে গুসল করতে হবে। ”
“ বাহ, আগে থেকেই শাস্তির জন্য প্রস্তুত! ”
“ দেখুন আমি আপনার সামনে কোনো কিছুই পারি না। আমি ম্যাথ গুলো পারি। নয়তো আপনি স্যার দের কাছে কল করে জিজ্ঞেশ করুন। ”
“ আমার সামনে না পারার কারন কী? ”
“ জানিনা, তবে কেমন যেন হয়ে যাই আমি মুখ দিয়ে কিছু বের হয়না। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে আর খেলবো না ব্যাডমিন্টন। তাও আপনি আমায় প্রশ্ন করবেন না প্লীজ! ”
“ শিউর? ”
“ একদম পাক্কা। আপনার একান্ত রুগী সাহেবা কথা দিয়ে কথা রাখতে জানে। ”
“ গুড, আর রুগী সাহেবা কথা না শুনলে তার ডাক্তার সাহেব ও কিন্তু ইনজেকশন দিতে পারে। ”
মনে মনে অনিলের উপর বেশ বিরক্ত হলো হীরা। এই ইনজেকশন কথা শুনতে শুনতেই তার জীবনটা তেজপাতা হয়ে যাচ্ছে। জীবনটা মনে হয় তার ইনজেকশন খেতে খেতেই যাবে- ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। আর কিছু না ভেবে খাতা খুলে উচ্চতর গণিতের ম্যাথ করা শুরু করে দিলো সে।
আনিকার এখন নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে গেছে সাদিক কে জ্বালানো। সাদিককে না জ্বালাতে পারলে যেনো তার মন টা সারাক্ষণ খুঁত খুঁত করে। এই যে আজ সাদিক কে জ্বালাতে না পেরেও এই দশা। অলস ভঙ্গিতে টেবিলে বসে মোবাইল স্ক্রোল করছে সে। ঐদিন সাদিককে নাম্বারে এড করার পর ফেসবুক এ এখন সাদিকের আইডি টা সাজেসড ফ্রেন্ড রূপে তার সামনে প্রায়ই উদয় হয়। আজকে সাদিকের আইডি টা সামনে আসতেই মেয়েটার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি ভর করলো। তাকে বাস্তবায়ন করতে সাথে সাথেই একটা ফেইক আইডি খুলতে শুরু করলো। আইডি খোলা শেষ হতেই সাদিকের আইডি টা সার্চ করে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠালো। একটা ইমুজি পাঠিয়ে দেখলো ফ্রেন্ড না হওয়া অব্দি মেসেজ যায় কিনা। ভাগ্য বসত মেসেজটি সেন্ড হলো। খুশিতে চিকচিক করে উঠলো তার মুখটা। পরপরই মেসেজে পাঠালো,
“ হ্যালো জানু, তোমার তো কোনো খবরই নাই…! ”
মুখে হাত চেপে হাসছে মেয়েটা। কিছুক্ষনের মধ্যেই ওপাশ থেকে রিপ্লাই এলো,
“ বলো মনু, দাঁড়াও দাঁড়াও বউ পাশে আছে একটু চিপায় যাইয়া নেই তারপর টাটকা খবর দিচ্ছি তোমাকে। ”
ভরকে গেলো আনিকা। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল মেসেজটির দিকে। প্রথমত “মনু” দ্বিতীয়ত “বউ” শব্দ দুটি মেয়েটাকে একদম অবাকের সপ্তম আকাশে পৌঁছে দিয়েছে তাকে। এর মাঝেই ওপাশ আবারও নোটিফিকেশন আসলো,
“ এইবার বলো মনু, কী কী খবর চাই তোমার? ”
অসার হয়ে আসা হাত দুটো নিয়ে সে লিখলো,
“ আপনি কী বিবাহিত? ”
“ হুম। ”
হাত থেকে গেলো আনিকার। চুপ মেরে গেলো একদম মেয়েটা। কতক্ষণ এভাবেই কাটার পর সহসা স্ক্রিনে সাদিকের আইডিতে আরেকটি মেসেজ ভেসে উঠলো,
“ মানলাম আবার বউ আছে একখানা, তাই বলে কী তুমি প্রেম দিবেনা! ”
না চাইতেও উচ্চস্বরে হেসে ফেললো আনিকা। এতো দেখছি ডিপজলের ফ্যান রে ভাই! সেও তো মাঝে মধ্যে একটু আধটু ডিপজলের ডায়লগ মারে- ভেবেই হাসি আরও বাড়লো তার।
ওপাশে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে যখন সাদিক দেখলো তার বন্ধু রাকিব তার ফোন হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে লোটপুটি খাচ্ছে। কপাল কুঁচকে গেলো তার। বললো,
“ কিরে এইভাবে মেন্টেলের মতো হাসছিস কেন? ”
“ মানলাম আমার গার্লফ্রেন্ড নেই এক খানা, তাই বলে কী বন্ধুদের যে প্রেমিকা আছে তার জানতে পারবো না। ”
হাসি থামিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে বললো রাকিব। তার কাণ্ডে বেশ বিরক্ত হলো সাদিক। বললো,
“ ভাই মানলাম তুই ডিপজলের ফ্যান তাই বলে কী পদে পদে এর প্রমাণ দিতে হবে! ”
“ তুমি লুকাইয়া লুকাইয়া প্রেম করবা আর আমি যদি বলি “বন্ধু তো দেওয়ানা হে” তাইলেই দোষ! ”
“ এই দেখ তুই মাইর খাইস না আমার থেকে। আমার গার্লফ্রেন্ড আছে তোরে কে কইছে? ”
“ তগো মতো নিমকহারাম ডি জীবনে কইবি আমার গার্লফ্রেন্ড আছে। ভাগ্যিস আজকে তোর জানু ঠিক সময়ে মেসেজটা দিসিলো। ”
“ কোন কুত্তাছুন্নি এ মেসেজ দিছে? দে তো ফোন দে দেহি আমি। ”
বলেই রাকিবের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো সে। নিয়ে সবগুলো মেসেজ পরতে পরতেই একবার রাকিবের দিক অগ্নিচোখে তাকাচ্ছে তো আরেকবার মেয়েটাকে বকছে। মেসেজগুলো পরা শেষ হলে কিছু একটা টাইপিং করলো সাদিক। তবে মেসেজটি সেন্ড হলো না। বুঝতে পারলো ওপাশ থেকে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। রাগে গজগজ করতে করতে সেও এপাশ থেকে ব্লক করে দিলো। তবে তার মনটা এখনো শান্ত হচ্ছে না ঐ মেয়েটাকে কিছু টাটকা কথা শুনাতে পারলে শান্তি পেতো সে।
দেখতে দেখতে হীরার টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো। সে এখন একা ঘরে বসে থাকে আর অনিলের কাছে বিভিন্ন আবদার করে বসে। যা আগে কখনোই করতো না সে। তবে এখন কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে অনিলের কাছে আবদার করে আর অনিল তা পূরণ না করলে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। যদিও অনিল তার সব আবদারই পূরণ করে তবে কিছু কিছু বাদে।
বিছানায় ফোন হাতে ঘামটি মেরে বসে আছে হীরা। সকাল থেকে শুধু পড়েছে সে। এখন আর পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না তার। বেশি করে টক দিয়ে এক প্লেট ফুচকা খেতে ভীষন ইচ্ছে হচ্ছে তার। স্কুল এ গেলে প্রায়ই খেতো সে ও আনিকা। যেদিন গাড়ি আসতে দেরি হতো সেদিন খেতো। কেননা অনিলের জন্য বাড়িতে কেউই ফাস্টফুড খেতে পারে না। তার এই ডাক্তারি পনায় ঘরের সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কেউই কখনো কোনো প্রয়োজন ছাড়া ফাস্টফুড খায় না। তবে হীরার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন, মেয়েটা গ্রামে থাকতে প্রতিদিন পড়া না শিখলেও প্রতিদিন ফুচকা খাওয়া বাদ দিতো না। সেজন্য এখানে এসেও নিজের লোভ সামলাতে না পেরে সুযোগ পেলেই আনিকাকে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে খাওয়া শুরু করে দেয়। তবে এখন তো সে স্কুল এ যেতে পারছে না। কিছুদিন পর থেকে কোচিং শুরু হবে তার। তখন আবার যাওয়া হবে। তাই অনিলকে ফুচকা আনার কথা বলবে ভাবছে আবার ভয়ে কলও দিতে পারছে না। এক পর্যায়ে সব ভয়, দ্বিধা সাইডে রেখে অনিলকে কল দিয়েই ফেললো সে। একবার রিং হতেই কল রিসিভ করে নিলো অনিল। ফোন কানে গুঁজে বরাবরের মতোই বললো,
“ বলুন রুগীসাহেবা? ”
“ ডাক্তার সাহেব আমার না… ”
“ তোমার না…? ”
“ আমার না ফুচকা খেতে ভীষন ইচ্ছে করছে। আপনি শুধু আজকেই আমাকে ফুচকা এনে দিন। পরিবর্তে আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো দরকার হয় একটা ইনজেকশন ও দিয়েন। তাও আনবেন প্লিজ। সত্যি বলছি আর কখনো বলবো না শুধু আজকেই। একদিন খেলে তো আর কিছু হবে না। ”
“ এসব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই বাজে জিনিস বাদে অন্য কিছু চাওয়ার থাকলে বলো। ”
“ অন্য কিছু চাইনা আমার। শুধু ফুচকা খেতে মনে চাচ্ছে আমার। আজকে ফুচকা না খেতে পারলে আমি মরেই যাবো। ”
“ ফোন রাখছি আমি। ”
“ আনবেন কিন্তু নইলে আমি আর কোনোদিন আপনার কোনো কথা শুনবো না আর নাতো আপনার সাথে কথা বলবো। ”
উত্তরে কিছুই বললো না অনিল। কল কেটে কাজে মনোযোগ দিলো। আর এইদিকে হীরা ছটফট করতে লাগলো। একবার মনে হচ্ছে অনিল তার আবদার ফেলবে না তো আরেকবার মনে হচ্ছে অনিল আনবে না। এভাবেই ভাবতে ভাবতেই একসময় মাথা এলিয়ে ঘুমিয়ে পরলো সে।
কলেজে ছুটির ঘণ্টা বাজতেই সবার বেরোনোর পর অলস ভঙ্গিতে সিড়ি দিয়ে নামতে লাগলো আনিকা। মনটা আজ ভীষন খারাপ তার। এক তাপসি কেলেজ না আসার কারনে আরেক সাদিকের কারনে। গতকাল রাতে তার শরীরটা বেশ খারাপ লাগায় কলেজের কোনো পড়া শিখতে পারে নি সে। যার দরুন আজকে সাদিকের ক্লাসে পড়া দিতে সক্ষম হয়নি সে। তাই সাদিক আজকে তাকে পুরো ৪৫ মিনিটের ক্লাসে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো। মেয়েটা আজ অব্দি কখনো এতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে নি পা দুটো পুরো ব্যাথা হয়ে গেছে তার। হাঁটতেও পারছে না ঠিক মতো। চারতলায় ক্লাস হয় তাদের নামতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে তার।
সবসময় সাদিকের উপর রাগ হলেও আজকে কেনো জানি রাগের পরিবর্তে অভিমান হলো আনিকার। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে আর কোনোদিন সাদিকের ক্লাসে কোনো কথাই বলবে না আর নাতো কোনো দুষ্টামি করবে। এসব ভাবতে ভাবতেই শক্তিহীন পায়ে হেঁটে চললো সে। কোনোমতে তিন তলায় আসতেই মেয়েটার পা টা হঠাৎ ভেঙ্গে পরলো। মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পরতে নিবে তার একটা পুরুষালী হাত এসে তার হাত আকড়ে ধরলো। তিনতলায় ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস নিয়ে সবাই বের হওয়ার পর মাত্র বের হয়ে আসতে নিচ্ছিলো সে। ক্লাস থেকে বেরোতেই আনিকার বেহাল দশা চোখে পরেছে। তবে এভাবে পরে যাবে সে নিজেও ভাবে নি, বেশ ভয় পেয়েছে সে নিজেও। বুকটা এখনো ধুকপুক করছে তার। কোনোমতে আনিকাকে টেনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ তুমি ঠিক আছো? ”
সাদিকের কন্ঠে মনটা যেনো আরও বিষাক্ত হয়ে উঠলো আনিকার। সে ভদ্র ভাবেই সাদিকের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পিছন ফিরে হাঁটা ধরলো। সাদিক ভীষন অবাক হলো আনিকার কাণ্ডে। সে অবাক দৃষ্টিতে আনিকার যাওযার পানে তাকিয়ে রইলো। ঠিকমতো হাটতে পারছে না মেয়েটা, থেমে থেমে হাঁটছে। সাদিক এইবার বড়ো বড়ো পা ফেলে আনিকার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বললো,
“ এইগুলো কী ধরনের বেয়াদবি! আমার কথার উত্তর দিলে না কেন তুমি? ”
“ আমার ভূল হয়ে গেছে সম্মানিত স্যার, আমাকে ক্ষমা করে দিন। ”
বলেই সাদিক এর পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। সাদিক শুধু অবাক দৃষ্টিতে আনিকার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাঁটার পানে চেয়ে রইলো। পরক্ষণেই কিছু একটা মনে পরতেই বলে উঠলো, ” ওহ শ্যিট ”। সে তো ভুলেই বসেছিলো যে, সে আজকে আনিকাকে পুরো ক্লাস দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো। আসলে সে ভেবেছিল কিছুক্ষন দাঁড় করিয়ে তারপর বসিয়ে দিবে তবে ম্যাথ করাতে করাতে তার আর খেয়ালই ছিলো না। যার দরুণ পুরো ক্লাসই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিলো আনিকাকে। প্রথমে একটু খারাপ লাগলেও পরবর্তী তে আনিকার অভিমানী মুখটা চোখে ভাসতেই রহস্যময় হাসলো সে। বিড়বিড়িয়ে বললো,
“ প্রেমে পড়ার প্রথম লক্ষণ! ”
বাড়িতে এসে কোনোমতে ফ্রেস হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো আনিকা। ভীষন কষ্ট হচ্ছে তার, পায়ে তো হচ্ছেই সাথে আবার মন টাও বিষিয়ে আছে। এখন কারো উপর নিজের রাগ না ঝাড়া অব্দি শান্তি পাবে না সে। আর সেই শান্তির পথ হিসেবে বেছে নিলো তাপসিকে। ডিরেক্ট কল দিলো সে। একবার বেজে কল কেটে গেলো। তবে রিসিভ হলো না। রাগ মাথায় চড়ে উঠেছে আনিকার। আবারও কল লাগালো সে। এইবার কিছুক্ষণ বাজার পর কল রিসিভ হলো। কল রিসিভ হতেই সে তাপসিকে কিছু বলতে না দিয়েই দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো,
“ এই তুই কই থাকছ রে আজকাল? ফোন দিলে ফোন ধরস না, ঠিকমতো কলেজ যাস না। আবার জাবি না যে অন্তত একবার বললেও পারিস আমাকে! এখন কী আমার সাথে আর চলার ইচ্ছে নেই তোর? আচ্ছা যা আর চলতে হবে না তোকে আমার সাথে। ”
“ আমার জ্বর, ঠান্ডা। ”
ছোটো করে ভাঙ্গা গলায় জবাব দিলো তাপসি। বান্ধবীর এমন ভাঙা গলায় আনিকার রাগটা নিমিষেই উড়ে গেলো। সে চিন্তিত স্বরে বলল,
“ এখনও জ্বর আছে? আগে বলিস নি কেন আমায়? ”
আনিকার কথায় মলিন হাসলো তাপসি। বললো,
“ ফোন ধরতে পারি নি। এখন একটু কমই জ্বর। ”
“ আচ্ছা, কালকে কলেজ আসবি কিনা জানাইস। ”
“ আচ্ছা। ”
এখানেই কথা শেষ করলো তারা। দুজনেরই শরীর ভালো না থাকায় আগের মতো বেশি কথা বলল না।
ঘরময় পায়চারি করছে হীরা। অপেক্ষা করতে করতে তার অবস্থা বেহাল। আনিকার ঘরেও একবার গিয়ে এসেছে তবে আনিকা ঘুমাচ্ছে বিদায় আর ডাকে নি। একলা একলা রূমে বসে অনিলের আশায় বসে আছে সে। সহসা বাইরে গাড়ির আওয়াজ কানে পৌঁছাতেই তড়িঘড়ি করে নিচে নামলো হীরা। তবে নিচে এসে অনিলকে খালি হাতে ঘরে ঢুকতে দেখে মুহূর্তেই মুখে আঁধার নেমে এলো তার। অনিলকে এতো অনুরুদ করা সত্বেও তার জন্য এক প্লেট ফুচকা আনতে পারলো না- ভাবতেই ভীষন কষ্ট লাগলো তার। চোখ জোড়া দিয়ে পানি আসতে চাইলেও আসতে দিলো না সে। ফুচকা যেমন তেমন অনিলকে এতো বলার পরেও যে, অনিল তার কথার মূল্যই দেয়নি- এটা ভেবে সত্যিই চোখ ভিজে উঠছে তার। সে তো বলেছিলো ফুচকা না আনলে সে কখনো কথা বলবে না। তার মানে অনিলের কাছে সে কথা না বললেও কিছু আসে যায় না। আর দাঁড়ালো না সে ছোটো ছোটো পায়ে যতটা দ্রুতগতিতে ছুটে এসেছিল এখন ঠিক ততটাই ধীরে ধীরে চলে গেল রুমে। সবটাই দেখলো অনিল তবে বললো না কিছুই।
কোনো শব্দ ব্যয় না করেই রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নিলো সে। ফ্রেস হয়ে এসে দেখলো হীরা আগের মতোই চুপচাপ টেবিলে বসে পরছে যেনো কিছুই হয়নি এখানে। অনিল হীরার অভিমানী মুখপানে চেয়েই গায়ে একটা টি শার্ট জড়িয়ে নিলো। তারপর হীরার সামনে এসে চেয়ার টেনে হীরাকে নিজের মুখোমুখি করলো। ফ্লোরের দিক তাকিয়ে আছে হীরা। সহসাই অনিল হীরাকে পাঁজাকোলে তুলে নিলো। ভরকে গেলো হীরা, চকিত চাইলো অনিলের মুখ পানে। আগে হলে এখন চিৎকার করে উঠতো তবে আজকে যাই হয়ে যাক সে অনিলের সাথে কথা বলবে না। তাই একদম চুপটি করে রইলো সে।
রান্না ঘরে এসে হীরাকে কোল থেকে নামিয়ে পাশে দাঁড় করালো অনিল। তারপর নিজে হাতে ছুড়ি নিয়ে পেঁয়াজ, মরিচ বের করে কাটতে লাগলো। কাটা শেষ হলে আটা বের করে তা ঠিকমতো গুলিয়ে পাতলা করে রুটি বেলতে বেলতে শুরু করলো। রুটি বেলার মাঝেই চুলোয় কিছু একটা বসিয়ে একটু পর পর নাড়তে লাগলো। হীরা পাশ থেকে কপাল কুঁচকে আনিলের দক্ষ হাতের কাজ দেখতে লাগলো। রুটি বেলা শেষ হতেই অনিল বোতলের মুখ এর থেকে সামান্য বড়ো একটা বাটি নিয়ে রুটিগুলো ফুচকার সাইজে কাটতে শুরু করলো। মাঝে মাঝে আনিকা ঘরে ফুচকা বানিয়ে খেতো যার দরুণ সব উপকরণই বিদ্যমান। এইবার আর মুখ বন্ধ করে থাকতে পারলো না হীরা। চট করে বলে উঠলো,
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩১+৩২
“ আপনি কী ফুচকা বানাচ্ছেন? ”
“ এতক্ষনে মুখে কথা ফুটলো তবে তোমার!”
কিছু বললো না হীরা। খুশি মনে অনিলের ফুচকা বানানো দেখতে লাগলো। কখনো বা অনিলের ঘর্মাক্ত মুখের দিক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। একটু আগে শাওয়ার নেওয়া সত্বেও ঘেমে গেছে অনিল। আর এমনিতেও এখন তো শীতকাল তাহলে এভাবে ঘামছেন কেন উনি। চিন্তায় পড়ে গেলো মেয়েটা। সহসাই পা দুটো উঁচু করে নিজের উড়না দ্বারা অজান্তেই অনিলের ঘাম মুছতে লাগলো। অনিলের হাত থেমে গেলো। নাকে প্রবেশ করলো সুপরিচিত সেই মিষ্টি ঘ্রাণ।
