আরেকটি বার সারপ্রাইজ পর্ব ১
Esrat Ety
শায়মী ক’ট’ম’ট দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে শর্মীর দিকে। শর্মীও তাই। দু’জনেই দু’জনকে দৃষ্টি দিয়ে দমিয়ে ফেলতে চাইছে। অথচ কেউই দমছে না। রাওনাফ মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই মেয়ের কান্ড দেখছে,সে শুধু চুপচাপ দেখছেই,কিছুই বলছে না কাউকে। কারন বলেও কোনো লাভ হয় না।
“বোনুকে ছাড়!”
তেতে উঠে বলে শায়মী। শর্মী রাহাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাল্টা জবাব দেয়,”না।”
_তুই সন্ধ্যা থেকে রেখেছিস। আচ্ছা তোর পড়াশোনা নেই? সামনে ফাইনাল।
_তোমারও ফাইনাল!
_আমি কোচিং থেকেই এলাম। তুই বাড়িতে ছিলিস। পুরোটা সময় ওকে রেখেছিস। এখন আমার কাছে দে।
গম্ভীর কণ্ঠে বলে থাবা বসাতে যায় শায়মী,শর্মী পিছিয়ে যায়। এগারো মাস বয়সী ছোট্টো রাহা বোনের কোলে তার বুকের সাথে মিশে মুখ থেকে শুধু “তা তা তা পাপাপা” শব্দ বের করছে। তার বোঝার সাধ্যি নেই তাকে নিয়ে কি হচ্ছে রওশান মঞ্জিলের লিভিং রুমে।
দুই বোনের টানাটানি দেখে রাওনাফ চুপচাপ কিচেনে চলে যায়। উর্বী কিচেনেই ছিলো। নীল রঙের একটা মনিপুরী শাড়ি জরিয়েছে সে তার অঙ্গে, আঁচলটাকে গুছিয়ে কোমরে গুজেছে। চুলের খোঁপা আলগা হয়ে খুলে পরতে চাইছে। সে অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে এদিক ওদিক কিছু একটা খুঁজছে।
রাওনাফের উপস্থিতি তখনও টের পায়নি সে। রাওনাফ কয়েক পলকেই উর্বীকে আগাগোড়া পর্যবেক্ষন করে ইন্ডাকশনে কফির পানি বসায়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
উর্বী চকিতে ফিরে চায়। দুকদম এগিয়ে গিয়ে বলে,”আমি করে দিচ্ছি!”
উর্বীর কথার জবাবে রাওনাফ একটা অমায়িক হাসি ফিরিয়ে দেয়। পর পর বলে,”থ্যাংক ইউ! পারবো!”
উর্বী মানুষটাকে দেখে। সারাটাদিন কতটা খেটে আসে মানুষ টা,অথচ বাড়িতে ফিরলেই চোখ মুখ থেকে ক্লান্তি সরিয়ে সবাইকে ফিরিয়ে দেয় আন্তরিকতা।
উর্বী কফির ক্যান রাওনাফের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে,”ফিরলেন কখন?”
_মাত্রই! ফ্রেশ হয়ে নিচে এলাম!
_আজ মায়ের সাথে কথা হলো। কেমন অসুস্থ লাগছিলো কথা শুনে।
_হ্যা। হাটুর ব্যথার ওষুধ নেয়নি পর পর দু বেলা।
রাওনাফ ফুটন্ত গরম পানি নামিয়ে নিয়ে উর্বীকে বলে,”তুমি খাবে কফি!”
উর্বী মাথা নেড়ে বলে,”না।”
নিজের বানানো কফি খেয়ে রাওনাফ মুখ বিকৃত করে,বলে ওঠে,”সবকিছু সবাইকে দিয়ে হয়না বুঝলে। এই হাত শুধু সার্জি’ক্যাল নাইফ দিয়ে মানবদেহের চামরা কাটার জন্য….”
_থামবেন আপনি!
রাওনাফকে কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে উর্বী কান চেপে ধরে। তারপর বলে,”ঐ হাতের অনেক মহিমা। ঐ হাত সবকিছু শুদ্ধ করে,আগলে রাখে সবকিছু,যত্নে।”
রাওনাফ হাসে। উর্বীর কপালের রেখা মিলিয়ে যায় মানুষটার সেই হাসি দেখে। কিছুক্ষণ দেখে অস্ফুট স্বরে বলে,”আমার বাচ্চাদের হ্যান্ডসাম পাপা!”
রাওনাফ কফির মগ রেখে উর্বীর দিকে এগিয়ে আসে। দূরত্ব কমাতেই উর্বী টের পায় তার কোমরে রাওনাফের উষ্ণ হাত, পেঁচিয়ে ধরেছে তার কোমর। দূরত্ব সবটুকু ঘুচে যায়, উর্বীর হাত দু’টো রাওনাফের বুকে ঠেকিয়ে রাখে। রাওনাফ মাথাটা কিছুটা ঝুঁকিয়ে উর্বীর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে,”এবার দেখো। তোমার বাচ্চাদের চুয়াল্লিশ বছরের বুড়ো পাপা!”
উর্বী হেসে ফেলে। তারপর বলে,”আমার বাচ্চাদের চুয়াল্লিশ বছরের বুড়ো ড্যাশিং হ্যান্ডসাম পাপা।”
রাওনাফ হেসে উর্বীকে ছাড়ে। হাতে তুলে নেয় কফির মগ। উর্বী ব্যস্ত হয়ে পরে তার কাজে। কফি শেষ করে রাওনাফ বলে,”সব গুছিয়ে নিয়েছে মেয়েরা?”
_হু। নিয়েছে। বিকেলেই। শুনুন না,মা হজ্ব করে ফিরলেই কিন্তু আমরা আরেকটা ট্যুর দেবো।
রাওনাফ মুখে কিছু বললো না, শুধু ঘা’ড় কাত করলো। পর পর বলে ওঠে,”নাবিল কিছু জানিয়েছে?”
_আমি শায়মীকে পাঠিয়েছিলাম। বললো যাবে না। আপনি একটু শেষ বারের মতো গিয়ে দেখুন না! ওকে ছাড়া কি আমাদের ভালো লাগবে বলুন!
_ও ফিরেছে?
_না এখনও। গিয়ে দেখুন। আমি খাবার গরম করে আসছি!
পাঁচ মিনিটের জন্য শর্মী সদয় হয়েছিলো। রাহাকে শায়মীর কোলে দিয়েছিলো। কিন্তু পাঁচ মিনিট অতিবাহিত হতেই পুনরায় রাহার দখলদারিত্ব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে শর্মী। ফের দুবোন টানাটানি শুরু করে দিয়ে ছোট্টো,নরম, তুলতুলে,বাবা-মায়ের রূপ, সৌন্দর্য একসাথে পাওয়া পুতুলের মতো দেখতে রাহাকে নিয়ে।
রাহা কোনো শব্দ করছে না। কিন্তু তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে এবার সে কেঁ’দে ফেলবে, সে শায়মীর কুর্তীর গলার কাছের ফিতা ধরে রেখেছে। অতটুকু শরীরে এতো ঝাঁকি নেওয়া যায়? অতটুকু মন কি এতো আদর নিতে পারে? বিরক্তিতে ঠোঁট উল্টে ফেলে,চোখ ছলো ছলো,মাঝারি সাইজের টমেটোর মতো গাল দুটো লাল লাল টমেটো হয়ে গিয়েছে।
টানাটানির একপর্যায়ে অসাবধানতাবশত শায়মীর হাত ফসকে রাহা পরে নিতে গেলে বিকট শব্দে দুই বোন চিৎকার দিয়ে ওঠে। রাওনাফ পায়ের গতি বাড়িয়ে ছুটে আসে কিচেন থেকে।
মুহূর্ত কে’টে যায়। শর্মী আতঙ্কে মুখ ঢেকে রেখেছে,তার শরীরটা একটু একটু করে কাঁপছে, কাঁপছে শায়মীও,চোখ তার ঝাপসা হয়ে এলো প্রায়। বুকে হাত চেপে ধরে সে নাবিলের দিকে তাকায়।
রাহাকে আগলে নিয়ে নাবিল রাহার মাথাটাকে বুকের সাথে চে’পে ধরে শায়মীর দিকে অগ্নিদৃষ্টি দেয়।
শায়মী ভাইয়ের চাহনি দেখে থিতিয়ে যায়,পর পর সে টের পায় তার কান গরম হয়ে উঠেছে।
নাবিলের দানবের মতো একটা হাতের পাঁচটা আঙুল তার কানে সপাটে এক চ’ড় কষিয়েছে কয়েক মুহূর্ত আগে।
শর্মী দ্বিতীয় দফায় চিৎকার দিয়ে নিজের কান চেপে ধরে। সে শতভাগ নিশ্চিত নাবিলের পরের নিশানা তার কান। তার কান ফাটাবে নাবিল।
শায়মীর কান ঝিমঝিম করছে। রাওনাফ এসে দাঁড়ায়। সে একে একে তার চার ছানার মুখের দিকে তাকায়। রাহা পাপাকে দেখে,”পাপাপাপাপাপা” করছে, শর্মী কান চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে,শায়মী নাবিলের দিকে তাকিয়ে আছে আর নাবিল শায়মীর দিকে। পরপর বোনের ওপর চেঁ’চি’য়ে ওঠে সে,”আহাম্মক কোথাকার। যদি ফের দেখি ওকে তোরা কোলে নিয়েছিস তাহলে কানের পর্দা পুরোপুরি ফাটিয়ে দেবো। আহাম্মকের দল। পরে গেলে কি হতো? স্টুপিড দু’টো!”
দশ বারো ধরনের ইংলিশ গালাগাল পর পর শুনিয়ে নাবিল রাহাকে কোলে নিয়ে স্থান ত্যাগ করে।
শর্মী কান থেকে হাত সরিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়, বিড়বিড় করে বলে,”থ্যাংকস আল্লাহ! আমার কান রক্ষা করেছো!”
শায়মী ক’ট’ম’ট করে বোনের দিকে তাকায়। তারপর সপাটে এক চ’ড় বসিয়ে দেয় শর্মীর কানে।
রাওনাফ হতভম্ব হয়ে দেখতে থাকে তার মেয়েদের। শর্মীর ঠোঁট কাঁপছে,সে ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকে রাখে। শায়মী ঘুরে তার পাপার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,”ঐ নাবিল আমার থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের বড় পাপা। কিন্তু ও সবসময় বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করে। ওকে কেন তুমি কিছু বলো না! দেখো আমার কান দেখো! কি অবস্থা করেছে!”
রাওনাফ মেয়ের কাছে এগিয়ে আসে মেয়েকে কিছু বোঝাতে যাবে তাই কিন্তু শায়মী পাত্তা না দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে নাবিলকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে,”খুব তো আহ্লাদ দেখাতে ছাড়িস না,কিন্তু বোনুর ডায়াপার চেঞ্জ করতে কেনো আমাকে ডাকিস? তখন তোর ভালোবাসা কই যায়?”
নাবিলের ঘরের চাপানো দরজার ওপাশ থেকে পাল্টা জবাব আসে,”আর বলবো না। এরপর থেকে আমিই চেঞ্জ করবো। যা ভাগ!”
শায়মী গটগট করে দোতলার উঠে যায়। শর্মী পাপার দিকে একপলক তাকিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে দোতলায় ওঠে।
রাওনাফ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, পরপর আনমনেই হেসে ফেলে। জীবন সত্যিই ভীষণ সুন্দর,যদি জীবনে এমন চমৎকার কিছু ফুল থাকে!
উর্বী শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে লিভিং রুমে এসে দাঁড়ায়। আশেপাশে তাকিয়ে রাওনাফকে বলে,”ওমা! এক্ষুনি না এখান থেকে চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পেলাম।”
রাওনাফ হেসে বলে,”হু। একটা বিরাট বড় ঘূর্ণিঝড় বয়ে গিয়েছে এখানে। এখন পরিবেশ শান্ত।”
রাহা হামাগুড়ি দিতে শিখেছে চারমাস হলো,তার কাজই হলো কোথাও ছেড়ে দিলে হামাগুড়ি দেওয়া। কিন্তু তাকে কেউ কোল থেকেই নামাতে চায়না। একমাস হলো রাহা একা একাই কোনো কিছু ধরে দাঁড়াতে পারে,তবে হাঁটতে এখনও শেখেনি। স্বাস্থ্য কিছুটা ভারী হওয়ায় সাপোর্ট থেকে হাত সরিয়ে দিলেই দুম করে বসে পরে।
নাবিল কখনোই বোনকে কোলে নিয়ে চেপে ধরে রেখে বিরক্ত করে না শর্মী শায়মীর মতো। তার কাজ হচ্ছে রাহাকে বিছানার ওপর ছেড়ে দিয়ে পাশে বসে তার কান্ডকারখানা দেখা।
সারাদিনে বাড়িতে ছিলো না নাবিল। সবে মাত্র এলো বাড়িতে। বোনকে বিছানায় বসিয়ে বলতে থাকে,”দু মিনিট লাগবে আমার শার্ট পাল্টাতে, দুমিনিট এখানে চুপ করে বসে “দাদাদাদাদা” করবি। যদি বেডের কিনারায় গিয়েছিস তো তোরও কান ফাটাবো চ’ড় মে’রে।”
রাহা কিছু না বুঝে দাদানের দিকে তাকিয়ে হাসে। তার দু’টো কি তিনটে দাঁত উঠেছে। যা তার কিউটনেস দশগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে । নাবিলের মন প্রশান্তিতে ভরে যায় বোনের ঐ হাসি দেখলে। তার মতে পৃথিবীতে এর থেকে সুন্দর কিছু সে দেখেনি।
বোনকে বিছানায় রেখে সে উঠে দাঁড়ায়, পরক্ষনেই ঘুরে বোনের দিকে তাকায়। একে বিশ্বাস নেই,দেখা যাবে বিছানা থেকে পরে গিয়েছে। নাবিল ফোন টা উঠিয়ে ওয়াইফাই কানেক্ট করে ইউটিউব থেকে কোকোমেলনের “বেবি শার্ক” গানটা ছে’ড়ে রাহার সামনে রাখে ফোনটা। রাহা এই গানটা ভীষণ পছন্দ করে, মিউজিকের তালে তালে শরীর দোলায়। নাবিল খেয়াল করেছে।
রাহা ফোন দেখছে তার টানাটানা চোখদুটো বড় বড় করে। হাত বাড়িয়ে আবার স্ক্রিনের শার্ক টাকে ধরতে চাইছে।
নাবিল নিজের পোশাক পাল্টে ওয়াশ রুমের দরজা খোলা রেখেই মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে এসে তোয়ালে খুঁজতে থাকে। আপাতত একটা ট্রাউজার পরে আছে সে,গা খালি।
সে হাত মুখ মুছে নিতে ব্যস্ত থাকায় খেয়ালও করলো না তার আদরের বোন তার ফোনের সাথে কি করছে।
রাহা এলোপাথাড়ি ফোনের স্ক্রিন টাচ করছে। তার হাতের ছোঁয়া লেগে নাবিলের মেসেঞ্জার ওপেন হয়। এবং খুবই কাকতালীয়ভাবে নাবিলের চ্যাটলিস্টের প্রথম ব্যক্তির কাছে ভিডিও কল চলে যায়।
রাহা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ফোনের দিকে। ফাবিয়া কলটা রিসিভ করে অবাক হয়ে যায়। নাবিলের ফোনটা যে পয়েন্টে রাখা সেই পয়েন্ট থেকে ফ্রন্ট ক্যামেরাতে শুধু রাহার নাকের উপরিভাগ দেখা যাচ্ছে, ফাবিয়া কয়েক সেকেন্ড রাহার টানাটানা চোখ,চুলের ঝুঁটি দেখে আদুরে গলায় বলে ওঠে,”হেই! হু আর ইউ কিউটি!”
নাবিল বুঝতে পারে অঘটন একটা ঘটেছে। সে ছুটে গিয়ে রাহার সামনে থেকে ফোনটা উঠিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে যায়।
ফাবিয়া আর নাবিল একে অপরের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। নাবিলকে ওভাবে খালি গায়ে দেখে ফাবিয়া তার চোখ নামিয়ে নেয়। নাবিলের সেদিকে খেয়াল নেই। সে তোতলাতে তোতলাতে বলে ওঠে,”রাহা…রা রা রাহা!”
ফাবিয়া চোখ তুলে তাকায় না। শুধু নিচুস্বরে বলে,”আমি ভেবেছি তুমি। বাই দ্য ওয়ে সি ইজ ঠু মাচ কিউট। ছবিটে এতোটা ফুটে ওঠে না।”
নাবিল তখনও খেয়াল করেনি সে খালি গায়ে। সে ফাবিয়ার দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসি হাসে। পরমুহূর্তেই স্ক্রিনে নিজেকে দেখে চোখ কপালে তুলে “ওহহ শীট!!!” বলে ফোনটাকে বিছানায় ছুড়ে ফেলে।
ফাবিয়া ওপাশ থেকে বলতে থাকে,”হোয়াট হ্যাপেন্ড! নাবিল।”
নাবিল তড়িৎবেগে একটা টি-শার্ট চাপিয়ে নিয়ে রাহার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,”আজ মানসম্মানের ফালুদা করেই ছাড়লি!”
ওপাশে ফাবিয়া শুনতে পায় নাবিলের কথা,সে হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসছে।
টিশার্ট পরে নাবিল ফোনটা হাতে তুলে পুনরায় তোতলাতে তোতলাতে বলে,”ফাবিয়া আ আ আ’ম সরি! আমি আসলে বুঝে পারিনি আ’ম সরি”
_ওকে ওকে। ইটস ওকে। নেভার মাইন্ড!
নাবিলের চোখে মুখে ছেয়ে আছে অস্বস্তি। ফাবিয়া অস্বস্তি কাটাতে বলে,”রাহাকে দেখাও। ভালো করে।”
নাবিল মাথা নে’ড়ে বোনকে উল্টে পাল্টে দেখাতে থাকে। বোনের কটা দাঁত উঠেছে সব ফাবিয়াকে গুনে গুনে দেখায়। ওপাশ থেকে ফাবিয়া এক একটা প্রশংসাসূচক শব্দ বের করে বিপরীতে।
নাবিল ফোনটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। ফাবিয়া বলে ওঠে,”ও এত্তো কিউট আল্লাহ। অবশ্য হবে নাই বা কেনো। আংকেল মাশাআল্লাহ,আন্টি কিউট, দাদী কিউট, শর্মী কিউট, শায়মী কিউট আর তুমি…!”
থেমে যায় ফাবিয়া। লজ্জায় লাল লাল হয়ে গিয়েছে তার গাল দু’টো। ঠিক একই অবস্থা নাবিলের। কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না সে। ফাবিয়া দম নিয়ে বলে,”তোমরা সবাই কিউট। তাই রাহাও কিউট।”
নাবিলের খুব মন চাইলো বলতে ফাবিয়াও ভীষণ সুন্দর,কিন্তু পারলো না,আটকে গেলো,কিছু একটা আটকে দিলো তাকে, বরাবর যেটা আটকায়,যার কারণে বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্ক অন্যদিকে ঘোরানো হয়ে ওঠেনি নাবিলের।
“নাবিল!”
পাপার ডাক শুনে নাবিল হকচকিয়ে ওঠে। ব্যস্ত হয়ে ফাবিয়াকে বলে,”পাপা এসেছে! আই উইল টেক্সট ইউ লেটার।”
রাওনাফ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই নাবিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,”ব্লাশ করছো কেনো এভাবে!”
নাবিল আমতা আমতা করে বলে ওঠে,”গরমে।”
_ওহ।
একশব্দে বলে রাওনাফ নাবিলের বিছানায় বসে রাহাকে কোলে তুলে নেয়। সারাদিন পরে পাপার কোল পেয়ে রাহা আকরে ধরে পাপাকে।
নাবিল বলে,”কিছু বলবে!”
রাহার ঝুটি ঠিক করে দিতে দিতে রাওনাফ বলে,”ব্যাগ গুছিয়ে নাও। কাল তুমি আমাদের সাথে যাচ্ছো।”
নাবিল নিশ্চুপ। রাওনাফ বলে,”জেদ করো না।”
নাবিল বলে ওঠে,”ইচ্ছে করছে না পাপা। তোমরা যাও না!”
_তোমার আন্টির জন্য যাচ্ছো না? ইয়াং জেন্টেলম্যান! আমি তো জানি আমার ছেলে বড় হয়েছে!
_তেমনটা নয় পাপা। ওনাকে নিয়ে আমার সমস্যা নেই। আমি শুধু। আমি শুধু! পাপা তোমার মনে পরে ছোটোবেলায় তুমি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলে,তখন আমাদের সাথে মাম্মা ছিলো। সেই একই যায়গায় আমরা সবাই আবার যাচ্ছি। ওখানে গেলে মাম্মাকে ভীষণ ভাবে মিস করবো ব্যস! পাপা আই থিংক তুমি আমাকে বুঝবে!
রাওনাফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে,নাবিলও চুপ। শুধু রাহা “পাপাপাপাপাপা” করছে।
কিছুটা সময় নিয়ে রাওনাফ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,”তোমার মাম্মাকে আমি, শর্মী, শায়মীও খুব মিস করবো নাবিল।”
রাওনাফ কথাটা বলে কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে বলে,”উর্বী কিন্তু তোমার কাছে বরাবর আন্টির জায়গাটাই চেয়ে এসেছে বাবা। ও আমাকে সবসময় বলে ওর খুব ইচ্ছে শর্মী ওকে মা ডাকুক কিন্তু ও এই কথাটা শর্মীকে কখনও বলেনি,ইনফ্যাক্ট তোমার দাদু শর্মীকে জোর করলেও ও বিরোধীতা করে। কারন ও চায় তোমরা সবাই তোমাদের মতো করে ওকে গ্রহণ করো। কিছু একটা ডাকো,শুধু ডাকটাতে যেন অধিকার মিশে থাকে। তুমি একটা অধিকার দিয়েই দেখো। নাবিলের মনে অনেক যায়গা আমার জানামতে।”
নাবিল নিশ্চুপ। রাওনাফ বলতে থাকে,”উর্বী পাঠিয়েছে আমাকে। যদি যাও তবে উর্বী ধরে নেবে তুমি তাকে কিছু একটা অধিকার দিয়েছো। আর যদি না যাও সেক্ষেত্রে ইটস ওকে বেটা। টেইক ইয়র টাইম!”
কথা শেষ করে রাওনাফ রাহাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নাবিল বোনের হাত টেনে ধরে। রাওনাফ ঘুরে তাকায়। নাবিল এগিয়ে গিয়ে রাহাকে গুডনাইট পাপ্পি দেয়। তারপর অভ্যাসমতো বোনের হাত নিয়ে নিজের গালে বুলায়।
রাওনাফ ছেলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে। রক্তের সম্পর্কে সৎ বলে কিছুই হয়না। যার উদাহরণ তার সেদিনের পুঁচকে নাবিল আর তার প্রানপ্রিয় বোন রাহামনি।
সন্তর্পনে ঘুমন্ত রাহাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উর্বীর দিকে তাকায় রাওনাফ। উর্বী ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুলে চিরুনি বসিয়ে গুনগুন করে গান গাইছে, হাতে পায়ে লোশন মাখছে।
রাওনাফ বিছানায় বসে উর্বীর কান্ডকারখানা দেখছে। মস্তিস্কে তার জট লেগেছে কিছুক্ষণ আগে, সেগুলো ছাড়াতে ব্যস্ত রাওনাফ করীম। উর্বীর দিকে ঝুঁকে যাওয়াটাকে মৃত শিমালার প্রতি অসম্মান কিংবা শিমালার স্মৃতিকে অসম্মান করার গ্লানি নিয়ে উর্বীর সাথে সংসার করাটা স্রেফ সমঝোতা, এই স্নায়ুযুদ্ধে বরাবর রাওনাফ ক্ষতবিক্ষত হলেও শেষে চোখ মেলে যখন ঐ রমনীকে দেখে তখন রাওনাফ একটা জিনিসই দেখতে পায়। সে ভালো আছে।
শিমালার মতো জীবন সঙ্গী, বাচ্চারা কিংবা উর্বীর মতো জীবনসঙ্গী,বাচ্চারা সবটাই তার ভালো থাকার কারণ। কাকে অসম্মান করলো,কার সাথে সমঝোতা করলো এতো যুক্তিতর্কে রাওনাফ জড়াতে চায়না। সে একটু ভালো থাকতে চায়,যতটা ভালো থাকলে অন্যদের ভালো রাখা যায়।
উর্বী মাথা ঘুরিয়ে রাওনাফের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, বিনিময়ে রাওনাফ নির্মল হাসি ফিরিয়ে দেয়। অথচ ঐ রমনী টেরও পায়নি রাওনাফের মস্তিস্কে এই মাত্র একটা যুদ্ধ শেষ হয়ে জয়ী হয়েছে রাওনাফ, ভীষণ ক্লান্ত তার স্নায়ু! নামাজ আদায় করতে হবে।
উর্বী উঠে মেয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পরে। রাতে উর্বী সুতি কাপড়ের নাইটি পরে শোয়,এতে রাতে মেয়েকে বারবার উঠে দুধ পান করাতে সুবিধা হয়।
ঘুমের চোটে বারবার হাই তুলছে সে। রাওনাফ মা-মেয়ের গায়ে চাদর টেনে দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে ওযু সেরে নামাজে দাড়ায়।
আরেকটি বার শেষ পর্ব
রাত তখন সাড়ে বারোটার বেশি। মোনাজাত শেষ করে জায়নামাজ যথাস্থানে রেখে রাওনাফ বিছানার কাছে যায়।
ঘুমন্ত উর্বী আর রাহাকে দেখে নিজের অজান্তেই সে মনে মনে বলে ওঠে,”মাশাআল্লাহ।”
মা মেয়ে দুজনই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উর্বীকে মাঝখানে রেখে রাওনাফ উর্বীর পাশে শুয়ে পরে। একটু কাছে ঘেঁষতেই ঘুমের মধ্যে উর্বী রাওনাফকে আকরে ধরে। উর্বীর ভারী নিঃশ্বাস আছরে পরছে তার গায়ে, আন্দোলিত হচ্ছে তার রোমকূপ। হাত দিয়ে উর্বীর এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল সরিয়ে দিয়ে রাওনাফ তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে,মনে মনে বলে ওঠে,”জীবন যেখানে যেমন,জীবন সুন্দর। আলহামদুলিল্লাহ।”
