Home কাছে আসার মৌসুম কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০ (২)

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০ (২)

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০ (২)
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

নিস্তব্ধ বাতাবরণে হঠাৎ মেঘ চিড়ে আসা দানবীয় বাজের ঘায়ে ভূপৃষ্ঠ যেভাবে দুভাগ হয়ে যায়,কিংবা একটা জীবন্ত মানুষের বুকের মাঝে হাত ঢুকিয়ে হৃদপিণ্ডটা খাবলে আনলে যেমন লাগে? সার্থর বোধ হয় তেমনই কিছু হলো! এক মূহুর্তের জন্যে স্থবির হয়ে পড়ল ছেলেটা। মনে হলো কানের ভেতর তপ্ত সীসা ঢুকে মস্তিষ্ক অবধি অসাড় করে দেয়ার মতো একটা বাক্য শুনল সে। ঠোঁটে শব্দ এলো না,চোখের পাতা নড়ল না। হতবিহ্বল নয়ন জোড়া মেলে অয়নের পানে চেয়ে রইল শুধু।
মুখ ঘুরিয়ে ফোস করে শ্বাস ফেলল অয়ন। ভাইয়ের সাথে ঠান্ডা মস্তিষ্কের এই লড়াইয়ে সে নামতে চায়নি। চায়নি, এইভাবে ছোটো ভাই হয়ে বড়ো ভাইকে প্রতিপক্ষ বানাতে। কিন্তু সার্থ বাধ্য করেছে। আজ আর কিচ্ছু তার হাতে নেই!
জয়নব নিজের ভারিক্কী চোখ নিয়ে দুই নাতিরই মুখচোখ দেখলেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“ রোকসানা তো সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে,আইরিনের সাথে তোমার বিয়ে তারা দেবে না। তাই অয়ন বলল,ওদের ব্যাপারটা ঝুলিয়ে রেখে লাভ কী! আগামীকাল আকদ করে রাখবে,এরপর একটা ভালো দিন দেখে ধুমধাম কোনো আয়োজন।”
সার্থ তখনো চুপ করে রইল। নিষ্প্রভ চাউনি মেঝের টাইলসে আটকে। ফুলের বুকেটা শক্ত করে চেপে রাখা মুঠোয়। কালো কাগজে খসখসে শব্দ হচ্ছে তাতে। দুটো ভাঁজ বসেছে কপালে। সাইফুল বললেন,
“ রাগ করিস না৷ আসলে এজন্যেই তোকে এত বার কল করছিলাম। বলতে গেলে এখন তুই-ই বাড়ির বড়ো ছেলে, তোকে না জানিয়ে আমরা তো কিছু ঠিক করতে পারি না। কিন্তু অয়ন এত তাড়া দিচ্ছিল। ওর নাকি কী কাজ আছে এই মাসে,দেশের বাইরে যাবে। সেজন্যেই আরকি….”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সার্থ চোখের কোণ তুলে অয়নের দিকে তাকাল। একই সময় ফিরল সেও। এক চোট নির্বাধ শক্তপোক্ত চোখাচোখি হলো দুই ভাইয়ের। যেন দৃষ্টিতে দৃষ্টিতে বহ্নি বর্ষণ! হলো নীরব কিছু বাগবিতণ্ডার আদান-প্রদান। এক নারী নিয়ে দুই ভাইয়ের চোখে চোখে লড়াইটা আরো গাঢ় হলো সাথে।
অয়ন ঠোঁট টেনে হাসল তবে। ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ কী ভাইয়া? কিছু বলবে তুমি?”
সার্থ কথা বলল না। উঠে দাঁডিয়ে ঠিক সাইফুলের মুখোমুখি হলো। ভদ্রলোক একটু বিভ্রান্ত হলেন। এক পল দেখলেন বসে থাকা শওকতকে। সার্থ বলল,
“ চাচ্চু,মেয়ে তোমার। তাই যা বলার আমি তোমাকেই বলব। তুশির সাথে অন্য কারো বিয়ে হবে না। বিয়ে ভেঙে দাও।”
শওকত বললেন,

“ কেন,কেন হবে না বিয়ে?”
সাইফুলও একই কথা বললেন। প্রশ্ন সবার মাথায়। আগে হলে যেমন তেমন,কিন্তু দুদিন আগে যে ছেলে নিজে আইরিনকে বিয়ে করতে চাইল,চাইল তুশির সাথে সব সম্পর্কের ল্যাটা চুকিয়ে দিতে তার মুখে হঠাৎ এসব শোনা আশ্চর্যের বৈকি!
সার্থ স্পষ্ট বলল,
“ কারণটা সবার জানা,তুশি এই বাড়িতে আমার স্ত্রী হয়ে এসেছিল। আর আমার স্ত্রীর বিয়ে আমি থাকতে অন্যের সাথে কেন হবে?”
অয়ন কিছু বলতে গেলে তনিমা থামালেন। বললেন,
“ স্ত্রী কীসের রে সার্থ? তুই না নিজে আমাকে সেদিন বললি,তুশির প্রতি তোর কোনো আগ্রহ নেই? তুই-ইতো আইরিনকে বিয়ে করতে চাইলি। তুই মুভ অন করতে পারলে তুশি কি তোর আশায় বসে থাকবে?”
সাইফুল বললেন,

“ আমরা তো চাইছিলাম তোরা ভালো থাক। তুই নিজেই বিয়ে অস্বীকার করেছিলি বাবা।”
“ সেসব পুরোনো কথা। এখন তো আর চাইছি না।”
জয়নব বললেন,
“ তখন চেয়েছ তাই সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছ। এখন চাইছ না,তাই আবার সম্পর্ক জুড়তে চাইছ। প্রকৃতি এত সুযোগ দেয় না মেজো দাদুভাই। হয় না এরকম!”
রেহণুমা চুপ করে রইলেন। কী যে বলবেন বুঝতে পারছেন না।
অয়ন বলল,
“ ভাইয়া সব সময় এটাই করে এসেছে। পুরো সৈয়দ বাড়িটা ওর মগের মুল্লুক কিনা! ও যা বলবে তাই হবে,তাই করতে হবে সবাইকে। বাট আনফরচুনেটলি এবার সেটা হচ্ছে না ভাইয়া। তুমি কারো জীবন নিয়ে খেলতে পারো না।”

সার্থর মাথা খারাপ হয়ে গেল। কাকে ধরবে,কাকে বোঝাবে,কী করবে বদ্ধ উন্মাদের মতো লাগছে নিজেকে।
সেই সাথে শরীরটা খারাপ লাগছে আরো। বুকে-পিঠের ঘা গুলো চিনচিন করছে। রক্ত ভেসে উঠছে ব্যান্ডেজে। শার্টের আড়ালে থাকায় দেখল না কেউ। তবে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল ওর। অথচ তাও চ্যাঁচিয়ে বলল,
“ তুশির বিয়ে অন্য কারো সাথে হবে না,হবে না। হবে না ব্যস।”
লিস্টের কাগজটা তুলেই টান মেরে ছিঁড়ে ফেলল সে। দুহাতে ঠেলে ফেলে দিলো সেন্টার টেবিলে থাকা সমস্ত জিনিস। এত উত্তেজিত হয়ে পড়ায় পিঠের ঘায়ে টান পড়ল ফের। ব্যথায় মুখ কুঁচকে নিলো ছেলেটা। তনিমা ধড়ফড় করে ধরলেন,
“ এখানে বোস,এসব তর্কবিতর্ক পরে করবি। বোস আগে।”
মায়ের হাতদুটো ঝট করে সরিয়ে দিলো সে। জিজ্ঞেস করল,
“ বিয়ে বিয়ে করছো সবাই,বিয়েতে তুশি রাজি তো?”
অয়ন বলল,
“ অফকোর্স, ও রাজি না-হলে বিয়ে কী করে হবে?”
সার্থ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেলল। নিঃশব্দের এক ছটা হাসি। অথচ বিদ্রুপের ঐ হাস্যবান অয়নের শরীর খুঁচিয়ে যায়। দুধারের চোয়াল শক্ত হয় তার। তড়িৎ চিৎকার করে ডাকল সে,

“ ইউশা,ইউশা!”
সকলে একটু নড়েচড়ে উঠলেন। তাকালেন ভড়কানো, বিভ্রান্ত নজরে। রেহণূমা বললেন,
“ কী হলো রে, বাবা?”
অয়ন জবাব দেয় না। তবে তার
দু ডাকে স্টোর রুম হতে ছুটে বেরিয়ে এলো ইউশা। সে বলল,
“ তুশিকে ডেকে নিয়ে আয়।”
ইউশার চোখ আটকাল সার্থর দিকে। জিজ্ঞেস করল,
“ ভাইয়া কখন এলে?”
অয়ন কড়া কণ্ঠে বলল,
“ তোকে যা বললাম সেটা আগে কর।”
হঠাৎ এত রুক্ষ আচরণের আগামাথা বুঝল না মেয়েটা। একটু মিইয়ে গেল মলিন মুখ। বলল মিহি স্বরে,

“ তুশি তো ঘুমোচ্ছে।”
তনিমা বললেন,
“ থাক না,ওকে আবার ডাকছিস কেন? বিশ্রাম নিক।”
“ সব নেবে মামুনি,উত্তরটা দিয়ে যাক। নাহলে সবাই তো বিশ্বাস করবে না। যা নিয়ে আয়।”
সার্থ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। টেবিলে হাত দুটো রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে শ্বাস নেয় দ্রুত। শওকত পোড় খাওয়া আর্মির তীক্ষ্ণ চোখে ছেলেকে মাপলেন এক চোট। কোথাও কি কিছু ঘটছে! অয়নের ঘুরতে যাওয়ার কথা সেদিন,কিন্তু সার্থ ওকে মিথ্যে বলে আটকে দিলো। নিজে তুশিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল তারপর। হাসপাতালে দুই ভাই লড়ছিল এ নিয়ে। আজ আবার তুশিকে নিয়ে আরেকটা লড়াই। ছেলেটা কি তুশিকে ভালোবেসে ফেলল? নাকি ইগোর জন্যে করছে এসব?

সার্থর সারা বুক জ্বলছে ব্যথায়। মাথা ঘুরছে এখনো। শরীর থেকে অনেকটা রক্ত যাওয়া, আবার চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই চলে আসা, এসেই এরকম পরিস্থিতিতে পড়া সব মিলিয়ে ধকল নিতে হিমশিম খাচ্ছে তার পেটানো দেহ। হঠাৎ কানে পৌঁছাল পেছনে এক জোড়া নিঝুম পায়ের শব্দ। এতক্ষণে মাথা তুলল সে। তড়িৎ ঘুরে চাইল সেথায়। ফ্যাকাশে, বিমর্ষ মুখ নিয়ে হেঁটে আসছে তুশি। চেহারায় স্পন্দন নেই, চকমকে আলো নেই চোখে, পুরন্ত ঠোঁট শুকনো খুব। মেয়েটা এসে থামল,অমনি বলল অয়ন,

“ তুশি,কাল যে আমাদে…”
কথাটুকু সম্পূর্ণ হলো না,
মাঝপথেই অধৈর্য পায়ে ওর কাছে চলে গেল সার্থ। কাউকে তোয়াক্কা না করে সোজা গিয়ে থামল তুশির সামনে। এই মুখোমুখি উপস্থিতি তুশির গলায় আটকে পড়া শ্বাসে যেন কাঁটার মতো খোঁচা। কিন্তু তাকাল না সে। না রাখল ওই চোখে স্বীয় নিস্তেজ দুটো চোখ। শুধু কানে এলো সার্থর মোলায়েম প্রশ্ন,
“ কাল তোমার সাথে অয়নের বিয়ে,তুমি জানো?”
অয়ন পেছন থেকে বলল,
“ এটা কেমন প্রশ্ন,যার বিয়ে সে জানবে না?”
ও কড়া কণ্ঠে বলল,
“ প্রশ্নটা আমি তুশিকে করেছি,উত্তরটাও ওর থেকে নেবো।”
অয়নের চুপ করল ঠিকই,তবে তার তপ্ত দৃষ্টি সরল না। সার্থর কণ্ঠ নেমে এলো আরো। কেমন আকুল হয়ে বলল,
“ তুশি,বিয়ে তোমার ইচ্ছেতে হচ্ছে?”
তুশির চোখ নিচে। তবে
সাথে সাথেই বলল,
“ হ্যাঁ।”

সার্থর মুখটা থম ধরে গেল। মুছে গেল ভেতরকার সব স্ফূর্তি,উল্লাস কিংবা এতক্ষণ তুশির মুখোমুখি হওয়ার সেই ছটফটানি আনন্দটুকুও। তার শক্ত বুকে দুম করে লাগল কোনো কিছু। হয়ত নিষ্ঠুর কোনো দায়ের কোপ,যা রুহানের ওই কোপের চেয়েও শতগুণ ভারি, বা তার চেয়েও ব্যথাতুর কিছু। কিন্তু যুদ্ধে জেতা সৈণিকের ন্যায় বিজয়ী হাসল অয়ন। ঠোঁটের কোণে খেলে বেড়াল এক টুকরো চকমকে ঝলক।
সার্থ ঢোক গিলে বলল,

“ সত্যিই তাই! নাকি কারো ওপর জেদ করে করছো?”
“ জেদ! কার সাথে করব?”
“ তোমার ইচ্ছে আছে বিয়েতে?”
“ হ্যাঁ।”
“ পরে পস্তাবে না?”
তুশির কণ্ঠে অটল তেজ,
“ পস্তাব কেন? আমি জানি আমি কী করছি।”
“ কথাগুলো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো।”
তুশি তাকাল না। এলোমেলো পাতা ফেলল মেঝেতে। সার্থ চড়া স্বরে বলল,
“ তাকাও তুশি,তাকিয়ে বলো, বিয়ে তোমার ইচ্ছেতে হচ্ছে।”
তুশি জিভে ঠোঁট ভেজাল। পরপর এক ঝটকায় মুখ তুলে রাখল চোখে চোখ। বলল কঠিন আনন নিয়ে,
“ বিয়ে আমার ইচ্ছেতে হচ্ছে।”
মেয়েটার চোখেমুখে এক অদ্ভুত গর্ব। এক অন্যরকম দীপ্তি।
সার্থ ব্যাকুল হয়ে শুধায়,

“ আর আমি?”
“ আপনি আমার কেউ না! আপনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
সার্থ হাসল। একটা নিথর মানুষ হাসলে যেমন লাগে,অমন করে বলল,
“ আচ্ছা।
গুড লাক! ”
মাথা নাড়তে নাড়তে নিষ্প্রভ পায়ে ঘরের পথ ধরল সে। ফুলের বুকেটা অবহেলায় পড়ে রইল মেঝেতে। তুশিকে আর দেয়া হয় না ওটা।
ইউশা মলিন চোখে ভাইয়ের প্রস্থান দেখল এক পল। বিয়ের কথা শুনে ভাইয়ার মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছিল। কেন? ভাইয়া কি কষ্ট পেয়েছে? কষ্ট পাবে কেন,ভাইয়ার তো তুশির প্রতি অনুভূতি নেই।
ততক্ষণে নীরবতায় বুজেছে গোটা ঘর। সবাই নিশ্চুপ! হঠাৎ
জয়নব বললেন,

“ তুশি,এখনো সময় আছে। তুমি কি সিদ্ধান্ত বদলাতে চাও?”
অয়ন কপাল কুঁচকে বলল,
“ আশ্চর্য, ও কি একবারও বলেছে এই কথা? এসব উদ্ভট প্রশ্নের মানে কী দিদুন?”
“ আশ্চর্য তো আমার তোমাকে লাগছে দাদুভাই। তুশিকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেই তুমি এমন লাফ দিয়ে উঠছো কেন?”
অয়ন মেজাজ খারাপ করে ভ্রু গুছিয়ে রইল। জয়নব ফের বললেন,
“ তুশি,সার্থর সাথে তোমার একবার বিয়ে হয়েছিল। যদিও আইনত,বা ধর্মমতে বিয়েটা হয়নি। কিন্তু একদিনের জন্যে হলেও তাকে তুমি স্বামী মেনেছিলে…”
অয়ন এবারেও কথা কেড়ে নিলো,
“ সেটা কখন বলেছে তুশি? তোমাকে আলাদা করে বলে এসেছে? নাহলে আমরা তো কেউ শুনলাম না।”
শওকত এবার ধমকালেন ছেলেকে।

“ অয়ন,দিদুনকে কথা বলতে দাও। ইলম্যানার্ড হয়ে যাচ্ছ কেন এত?”
তুশি মুখ খুলল এবার।
বড়ো স্পষ্ট গলায় বলল,
“ দিদুন, বিয়েতে আমার অমত নেই। যা হয়ে গেছে তা আমার অতীত। এখন আমাকে ভবিষ্যতে এগোতে হবে। আমি ওসব অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চাই না।”
“ তাহলে সব ভেবেচিন্তে নিয়েছ তো?”
“ হ্যাঁ।”
অয়ন বুক ফোলাল গর্ব করে। সবার দিকে চেয়ে বলল,
“ আর কেউ কিছু বলবে? আশা করি উত্তর পেয়েছ তোমরা?”
কোনো জবাব-টবাব এলো না। নিরুত্তর রইল সকলে। সার্থ যে তুশিকে ইনিয়েবিনিয়ে পছন্দ করে ফেলেছে বড়োরা সকলেই বুঝেছেন। কিন্তু যেখানে তুশিই নারাজ এই সম্পর্ক নিয়ে,তাদের আর কী করার!
তনিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“ ছেলেমেয়ে এখন বড়ো হয়েছে,নিজের ভালোমন্দ নিজেরাই বুঝতে শিখেছে। ওরা এখন রশি আম্মা,আর আমরা হলাম রশি গলায় প্যাঁচানো বস্তু। এখন যেদিকে টানবে, সেদিকেই এগোবো।”
তুশি আর দাঁড়াল না এখানে। পাশ কাটিয়ে ঘরে ফিরে এলো। হাসনা এশার নামাজ পড়ে উঠেছেন। ওকে দেখেই বললেন,
“ কেডায় ডাকল? নাইত জামা…
থুরি পুলিশ নাতি আইছে?”
তুশি উত্তর দিলো না। খুব অন্যমনস্ক পায়ে খাটে এসে বসল। হাসনা খেয়াল করলেন মেয়েটার সারামুখ লাল হয়ে আসছে। নাকের ডগাটা ফেঁপে উঠছে জোয়ারের মতো। তসবিহ নামিয়ে রেখে এগিয়ে এলেন তিনি। কাঁধে হাত রেখে শুধালেন,
“ কী হইছে বু?”
তুশি মুখ তুলে চাইল। ওর বড়ো বড়ো চোখ দুটো টলমল করছে। কার্নিশ ডুবে যাচ্ছে জলে। এক ফোঁটা গালে পড়তেই হাসনা আঁতকে বললেন,
“ কান্দোস ক্যা?”
তুশি কেমন করে বলল,
“ দাদি,তোমার কোলে একটু মাথা রেখে শোবো?”
হাসনা তড়িঘড়ি করে পাশে বসে বললেন,
“ হ, শো বু। শো না!”

তুশি শরীর গুটিয়ে শুলো তার কোলে। হাসনা চুলে হাত বোলাতে বোলাতে টের পান একটা চাপা ফোঁপানোর শব্দ ভাসছে ঘরে। পরপর সেই শব্দটা বাড়ল। লাগাম ছুঁলো আজ। হঠাৎ-ই হুহু করে কেঁদে উঠল তুশি। মুখ গুজে দিলো কোলে। হাসনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ এত ভালোবাসোস,তাইলে আরেকজনরে বিয়া করবি ক্যান?”
তুশি কাঁদে। গুণগুণ করে বুক ভিজিয়ে কাঁদে মেয়েটা। কানের কাছে বাজে সেসব তিক্ত কথা,
“ শরীরে এ বাড়ির রক্ত থাকলে কী হবে! মানুষ তো সেই বস্তিতেই হয়েছ। কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয়? লোভী মেয়ে একটা! এত সেজেগুজে অয়নকে সিডিউস করছো তুমি? যেই আমাকে পেলে না,অমনি ওকে হাত করতে চাইছো।”
তুশির আত্মসম্মান যেন শির তুলে চায়। ভীষণ জেদে হিঁসহিঁস করে বলে,
“ ভালোবাসি, কিন্তু ক্ষমা করব না। কক্ষনো না!”

তুশি চোখে-মুখে পানি দিয়েছে। চেহারা ফুলেছে কিছু। হাসনা খেতে গিয়েছেন কিছুক্ষণ হবে। দরজা খোলা ছিল। হাতে একটা বাক্স নিয়ে মাত্রই চৌকাঠে এসে দাঁড়াল অয়ন। চোখ পড়ল সোজাসুজি আয়নার দিকে। তুশি টুলে বসে চুলে বেনুনি করছিল। চোখ-মন কোথাও আয়নায় নেই। বিরস চিত্তে মেঝের দিকে চেয়ে আছে মেয়েটা। টোকা দিতে গিয়েও থামল অয়ন। আয়নায় ফুটে থাকা তুশির স্পষ্ট বিম্বতে চেয়ে রইল মুগ্ধ হয়ে।
মেয়েটার ভেজা মুখে জলের কণাগুলো হীরের কুচির মতো জ্বলছে। অযত্নে বাঁধা বেনুনির ফাঁক গলে অবাধ্য কিছু চুল এসে মিশেছে কপালের তারায়। অসুস্থতার ধকল মুখ থেকে আভা কেড়ে নিলেও, সেই ফ্যাকাশে চেহারায়ও যেন রিমঝিমে অলৌকিক স্নিগ্ধতা।
ঠিক যেন জলরঙে আঁকা কোনো বিষণ্ণ রাজকন্যা! যার প্রতিটি কণা চিড়ে এক ঐশ্বরিক আলো এসে গাইল,

“ পালাতে পারিনি আমি যে দিশাহারা,
দুটি চোখ যেন আমায় দিচ্ছে পাহারা,
ধরা পড়ে গেছি আমি নিজেরই কাছে
জানি না তোমার মনেও কি এত প্রেম আছে!
সত্যি যদি হয় বলুক যা বলছে নিন্দুকে,
মন্দ করেছে আমাকে ঐ দুটি চোখে!”
একা একাই মাথা নুইয়ে হাসল অয়ন। ফের চাইল সামনে। এই মেয়েটাকে তার প্রথম ভালো লেগেছিল সেদিন – যেদিন ওর পকেট থেকে মানিব্যাগ চুরি করে। ওই পুরোটা দিন সাক্ষি, একটা মেয়ে পকেটমারের কথা ভেবে ভেবে অয়নের সারা মূহুর্ত কেটেছিল। আর এরপর যখন ক্লাবে বউ সাজে অয়ন সেই মেয়েকেই দেখল, তখনো ওর তেমন কিচ্ছু অনুভব হলো না। খারাপ লাগাটা ও ধরতেই পারল না।
কিন্তু তুশি যেদিন লাল শাড়িতে এক টুকরো পুতুল বউয়ের মতো এসে সামনে দাঁড়িয়েছিল,হৃদয়ের কম্পন সাগরের ওইপাড়ে শূন্যের মাথায় ফেলে এসেছিল অয়ন। এখন সেই মেয়েকে ও হারায় কী করে!
তুশির বেখেয়ালি মনোযোগ হঠাৎ পড়ল আয়নায়। চমকে পিছু ঘুরল সহসা। অবাক হয়ে বলল,

“ আপনি!”
অয়ন নড়েচড়ে দাঁড়ায়। গলা ঝেরে এগিয়ে আসে। উঠে দাঁড়াল তুশি।
জিজ্ঞেস করল,
“ কিছু বলবেন?”
“ কেন,এমনি আসতে পারি না?”
“ পারবেন না কেন!”
চেয়ার দেখে অয়ন বলল “ বসতেও পারব তাহলে?”
“ বসুন।”
বসল অয়ন। বাক্সটা রাখল সামনে। দুচোখ ছাপানো আনন্দ নিয়ে বলল,
“ তোমার জন্যে আনিয়েছি। এত তাড়াহুড়োয় বিয়ে হচ্ছে,সেভাবে কোনো আয়োজন না হোক, নতুন বউয়ের হাত তো মেহেদি ছাড়া ভালো লাগে না। তাই সন্ধ্যে বেলা অর্ডার করেছিলাম।”
তুশি চুপ করে রইল। দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার
হাতটা হঠাৎ মুঠোর মাঝে তুলল অয়ন। তুশি আজ নড়ল না,হাত ছাড়াতে ছটফটও করল না। রইল অমন মূর্তি বনে।
অয়ন নিজেই বলল,

“ আমি জানি, এভাবে রাতারাতি সব হয়ে যাচ্ছে বলে সামলে উঠতে তোমার একটু সময় লাগবে। তবে আম সো গ্ল্যাড যে তুমি বিয়েতে না করোনি। একটু চিন্তায় ছিলাম এ নিয়ে। বাট
বিলিভ মি তুশি, একবার বিয়ে হোক তোমাকে আমি কোনোদিন আমার নামে একটা অভিযোগেরও সুযোগ দেবো না। তুমি হয়ত বেস্ট পেডিয়াট্রিশিয়ান অয়ন আবসারকে চিনেছ,এরপর বেস্ট হাজবেন্ড অয়নকেও দেখবে। টাকা-পয়সা, ভালোবাসা এক বিন্দুও কমতি হবে না কিছুর।”
তুশির বুকটা ফেটে গেল। অসহায় চোখ মেলে চেয়ে রইল মেয়েটা। অয়নের দৃষ্টি উথলে পড়ছে প্রেমে, চুইয়ে যাচ্ছে ভালোবাসায়। যার মাঝে কোনো খাদ নেই,কৃপণতা নেই। কিন্তু সব জেনে-বুঝেও তুশিকে কঠিন হতে হবে। কষ্ট দিতে হবে এই মানুষটাকে। ও অপারগ,ওর কিচ্ছু করার নেই!
খোলা দরজা দিয়ে ইউশা ঘরে ডুকল তখনই। ওই দুরন্ত কদম থামল অয়ন-তুশিকে এত কাছাকাছি দেখে। বুকটা থমকায় তার। থমকায় ক্ষণিকের হৃদস্পন্দন। অন্ধকার চেহারায় একবার দেখে নেয় অয়নের হাতে থাকা তুশির হাতটা। পরপর সাই বেগে ঘুরে যায় পেছনে। ওর পায়ের শব্দে অয়ন হাত ছাড়ল, বসল ঠিক হয়ে।
ইউশা নিজেই বলল,

“ সরি! আসলে আমি জানতাম না অয়ন ভাই এ ঘরে আছো। আমি বরং পরে আসব।”
ও ছুটতে নিলেই অয়ন বলল,
“ দাঁড়া।”
থামল মেয়েটা। অয়ন উঠে এলো। মেয়েলি শরীরে একটা ঝাঁকুনি উপহার দিতে পিঠ ছড়িয়ে কাঁধে হাত রাখল ইউশার। প্রফুল্ল স্বরে বলল,
“ তুশি, ও কিন্তু তোমার বোন হলেও, আমার সব থেকে কাছের মানুষ জানো! এই বাড়িতে অয়নের যদি নিজের বলে কেউ থাকে সেটা ইউশা,মাই লিটল চেরি।”
মেয়েটার চিবুক ছুঁয়ে একটু হাসল অয়ন। দুজনের এক টুকরো নির্বাধ চোখাচোখি হলো ।
ইউশার ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল অয়নের দৃষ্টিজোড়া দেখে। কাছের মানুষ!
তোমার মনে যদি এক টুকরো জমি পাই,
তবেই না কাছের মানুষ হতাম অয়ন ভাই!
তা আর হলো কই, বলো তো?
তুশি, অয়ন-ইউশাকে পাশাপাশি দেখে হাসল কেমন করে । বলল,

“ দোয়া করি, ইউশাই আপনার নিজের মানুষ হয়ে থাকুক।”
অয়নের ডাক পড়ল তখনই। সাইফুল ইসলাম ব্যস্ত স্বরে বলছেন,
“ অয়ন, কই গেলি রে…”
“ চাচ্চু ডাকছে, শুনে আসি। ইউশা, তুই ওকে মেহেদি পরিয়ে দিস তো।”
তারপর ফিসফিস করে বলল,
“ আমার নামটা তুশির হাতের তালুতে লিখে দিস। যেন দেখেই বোঝা যায় ও অয়নের বউ!”
ইউশা মাথা নাড়ল। ঢোক গিলে ছোট্ট করে বলল,
“ আ-আচ্ছা “
চপল পায়ে বেরিয়ে গেল অয়ন। তুশি খাটে বসে,দুহাতের ভর রেখে মাথা নুইয়ে শ্বাস নেয় বড়ো করে। ইউশা ঠোঁটে হাসি টেনে পাশে এসে বসল। বাক্সের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ বাপ্রে,অয়ন ভাই যে কী পাগলামি করে না। এত মেহেদি কেউ একবারে কেনে?”
তারপর একটা কোণ নিয়ে তুশির পাশে বসল সে। হাতটা নিয়ে বলল,
“ দাও,একটা সুন্দর ডিজাইন এঁকে দিই।”
তুশি চুপচাপ চেয়ে রইল ইউশার মুখের দিকে। স্বাভাবিক থাকার কী নাটকটাই না করছে!
ইউশা কোণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কত কী আঁকল। মাঝে জায়গাও রাখল একটু। এখানেই অয়নের নাম লিখবে। আচমকা মেহেদির কোনটা হাত থেকে নিয়ে গেল তুশি।
ও অবাক হয়ে বলল,
“ কী হলো?”
“ তোমার আঁকা ডিজাইন আমার পছন্দ হচ্ছে না। আমারটা আমি নিজে দেবো।”
ইউশা ঠোঁট উলটে বলল,
“ তাহলে অন্য কিছু দিয়ে দিই?”
“ না। দেখি তোমার হাত দেখি….”
ইউশার হাতের তালুতে কোণ ছুইয়ে বলল,
“ আমি কত সুন্দর আঁকতে পারি দেখো।”

তা অবশ্য ভুল। তুশি ভালো মেহেদি দিতে জানে না। যা মনে এলো,লতাপাতা এঁকে ফেলল তাই। ইউশা হাসল ঠোঁট চেপে,তবে মানা করল না। তক্ষুনি ওকে চমকে দিয়ে চটপট হাতের মাঝে একটা বড়ো সাইজের A লিখে দিলো তুশি। মুখটা থমকে বসল ইউশার। মুছে গেল হাসি। ত্রস্ত হাত টেনে এনে বলল,
“ কী করছো?”
“ কী করলাম?”
“ এটা কেন লিখলে?”
তুশি জিভ কেটে বলল,
“ ওহ,সরি! আসলে সারাদিন ওনার কথাই মাথায় ঘুরে বেড়ায় তো। তাই ভুলে লিখে দিয়েছি। তুলে ফেলো।”
ইউশা বিমর্ষ মুখে টিস্যু নিয়ে মেহেদি তুলে ফেলল। হালকা হালকা ছাপ পড়লেও, রং তো আর বসেনি। কিন্তু ভেতরটা অস্থির হয়ে পড়ল ওর। ফের সাবলীলতায় ফিরতে সময় লেগে যাচ্ছে। তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল। বলল হঠাৎ,

“ ইউশা, কটা বাজে এখন?”
“ হুঁ? এগারটা বোধ হয়।”
“ উম,তাহলে তুমি যাও। আমার ঘুম পাচ্ছে,ঘুমাব।”
“ মা বললেন আজ তোমার সাথে ঘুমোতে।”
“ না। আমি তোমাকে আমার বিছানায় নেবো না। তুমি যাও। এক্ষুনি নিজের ঘরে যাও।”
ইউশা মলিন চোখে বলল,
“ তুমি ইদানীং আমার সাথে এমন করছো কেন তুশি? আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসো না,তাই না?”
“ না।”
ইউশার মন খারাপ হলো খুব।
“ সত্যিই বাসো না।”
তুশি বিরক্ত হয়ে বলল,
“ উফ, যাও তো ইউশা। আমার ঘুম পাচ্ছে বললাম না!”
ইউশার চোখ ছলছল করে উঠল। কষ্ট পেলো ভীষণ। আস্তে করে বলল,
“ যাচ্ছি।”

মাথা নুইয়ে বেরিয়ে গেল মেয়েটা। তুশি দূর্বলের ন্যায় পিঠ খাটের কাঠে হেলিয়ে রাখল।
পরপর উঠে এসে দরজার ছিটকিনি তুলল।
আলমারির ওপর থেকে একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগ নামিয়ে, সার্থর কিনে দেয়া সেই সাদা গাউনটা ভরল ভাঁজ করে। তারপর বুক ফুলিয়ে জীবনের সেই চরম সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলো আজ।
রাত তখন গভীর। চারিদিক অন্ধকারে মাখা। বাড়িতে কাল বিয়ে,কত মেহমানরা আসবেন। অনেকদিন পর নানুবাড়ির আত্মীয়রাও পা রাখবেন নিবাসে। বাড়ির কর্তা-কর্তী প্রায় সকলেই সজাগ এখনো। হুটহাট এত রান্নাবান্নার আয়োজন,ঘরদোর সাজানো নিয়ে ব্যস্ত তারা। ইউশা বারান্দার মেঝেতে শুয়ে আছে। মাথার নিচে বালিশ নেই। হিমের তোড়ে হাত-পা ঠান্ডা হওয়ার যোগাড়। অথচ মেয়েটার নিষ্পৃহ চোখ লেগে আছে নিকষ কালো আকাশের বুকে। দুটো কার্নিশ জলে ভেসে যাচ্ছে। ভিজছে তার ঘাড়ের চুল। মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় বুকের সাথে সাথে ভেঙে যাচ্ছে ওষ্ঠাধর।

হঠাৎ চোখ মুছে উঠে বসল ইউশা।
ওরনা গায়ে প্যাঁচিয়ে,চুল ঠিকঠাক করে,গোটা মুখ ডলে বেরিয়ে এলো বাইরে।
রয়েসয়ে টোকা দিলো অয়নের ঘরের দরজায়। মিনিটেই খুলল সে। ইউশা জানতো অয়ন ঘুমোয়নি। কাল তো অয়ন ভাইয়ের আনন্দের দিন,তার ভালোবাসা পাওয়ার দিন,এত আগে কী আর ঘুম আসে!
অয়ন বলল,
“ ঘুমোসনি?”
ইউশার ভাঙা গলা,
“ একটু ভেতরে আসব?”
অয়ন অবাক হলেও,সরে দাঁড়াল সাথে সাথে ।
“ আয়।”
ঢুকল ইউশা। তাকাল চারপাশে।
ও বলল,
“ কী হয়েছে?”

ইউশা চেষ্টা করল অয়নের না দিকে না তাকাতে। অগোছালো ভঙ্গিতে বলল,
“ তো-তোমার গিটার-রটা এখন লাগবে অয়ন ভাই? আমি একটু নিতাম।”
“ গিটার! এই এত রাতে গিটার দিয়ে কী করবি?”
ইউশা মাথা নুইয়ে বিড়বিড় করল,
“ বা-বাজাব।”
“ তুই তো বাজাতে পারিস না।”
ও ঠোঁট টিপে চুপ করে রইল। এখন বুকের এত হাহাকার ছাপিয়ে কী বলবে ও?
অয়ন প্রশ্রয়ের সুরে বলল,
“ বাজাতে ইচ্ছে করছে?”
ঘাড নাড়ল মেয়েটা। অয়ন দেওয়ালের বুক হতে ঝুলতে থাকা গিটারটা নামিয়ে আনে। এটা সার্থর ছিল ওদের সেই ভার্সিটির দিনে। পরে ও আর ব্যবহার না করায় নিজের কাছে এনে রেখেছিল অয়ন।
গিটার নিয়ে এগিয়ে আসতেই,নিতে হাত বাড়াল ইউশা। অয়ন বলল,

“ আমি শিখিয়ে দিই,আয়।”
“ আমি পারব।”
“ আয় তো।” মেয়েটাকে টেনে এনে কাউচে বসল অয়ন। গিটারটা কোলের ওপর দিয়ে বলল,
“ এই তারে আঙুল থাকবে,আর এই দুটোতে আঙুল প্রেস হবে।”
সাথে পাশে বসল সে। কিন্তু ইউশা শুনল না। উত্তাল ঢেউয়ের মতো বুক কাঁপছে ওর । অয়নের পারফিউমের গন্ধ,শরীরী উত্তাপ সব অনুভূতিদের আবার ছিঁড়েখুড়ে বের করছে যেন। ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়ল ও। চেয়ে রইল অশান্ত চোখে।
অয়ন ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ কী? বাজা।”
ইউশা কিছুই তো শোনেনি। ভুল আঙুল ভুল তারে রাখল।
ও বলল,

“ হয়নি ইউশা। এইভাবে, এই যে দ্যাখ আমি যেভাবে দেখাচ্ছি।”
দুই পাশ থেকে মেয়েটার দুইহাত তুলে গিটারে রাখল অয়ন। ইউশার ক্ষুদ্র শরীরটা মূহুর্তে বন্দি হলো ওর বাহুর মাঝে। পিঠের সাথে মিশল তার বুক। ঘাড়ে এসে লুটিয়ে পড়ল ওর শ্বাস। থরথর করে উঠল ইউশার গোটা দুনিয়া। এলোমেলো হয়ে গেল সব। অয়ন
গিটারে সুর ধরে বলল,
“ গা। ইউশা?”
“ হ-হুঁ?”
“ গা কিছু…”
ইউশার ভেতরটা তো দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। অয়ন এত কাছে,এত! ও কী করবে? পালাবে? কোন দিক থেকে পালাবে? কোথায় লুকোবে? এই ঘনিষ্ঠতায় ওর জমিন আরো ধ্বসে গেল, আরো ক্ষয়ে পড়ল বুকের কোষ। যে মানুষ ওর না,সে মানুষের ধারেকাছে থাকা ধারালো অস্ত্রের ঘা পড়ার মতো। বা তার চেয়েও নিদারুণ কিছু হবে।
অবসন্ন চিত্তে চোখ দুটো বুজে নিল সে।
চিকণ কণ্ঠ গলে ভেসে এলো এক করুণ সুর,

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০

“ ghair ke humnawa ho gaye,
Kyun khafa ho gaye?
Ki tumse juda hoke hum,
Tabaah ho gaye…
Tabah ho gaye!”

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬১