Home বিয়ে পাগলি বিয়ে পাগলি পর্ব ৩

বিয়ে পাগলি পর্ব ৩

বিয়ে পাগলি পর্ব ৩
নিলুফা নাজমিন নীলা

শাওন ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ নিচের ড্রয়িংরুম থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ আসতে লাগল।ঘুম ঘুম চোখে উঠে বসল। মোবাইলে তাকিয়ে দেখল বারোটা তেইশ বাজে।
নিচে তার বাবা-মায়ের তর্কের শব্দ ভেসে আসছে। বিরক্ত হয়ে শাওন বিড়বিড় করল,
“এত রাতে চেঁচাচ্ছে? ঝগড়া নাকি? কিন্তু বাবা-মায়ের তো কখনো ঝগড়া হয় না… তাহলে?”
রুম থেকে বের হয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এলো।
শাওনের মা, রেহানা বেগম বললেন,

“ওগো, সত্যি করে বলো, মেয়েটা কে ছিল?”
মোজাম্মেল সাহেব বিরক্ত স্বরে বললেন,
“আর কতবার বলব, আমি বলতে পারব না।”
শাওন এগিয়ে এসে বলল,
“কি হয়েছে তোমাদের? এত রাতে চিল্লাচ্ছো কেন?”
এমন সময় শুভ্র আর শাওনের বোন সুভা এসে হাজির হলো। তাদেরও একই প্রশ্ন,
“কি হয়েছে?”
রেহানা বেগম কাঁপা গলায় বললেন,
“আল্লাহ গো… এই বুড়ো বয়সে যে এই দিন দেখতে হবে ভাবিনি! এই দিন দেখার আগে আমার মরণ হলো না কেন!”
শুভ্র বলল,

“এটা দিন না মা রাত।”
সুভা মায়ের হাত ধরে বলল,
“প্লিজ মা, বলো তো কি হয়েছে?”
রেহানা বেগম গম্ভীর মুখে বললেন,
“রাত বারোটার সময় তোর বাপের মোবাইলে কোনো মেয়ে কল দিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করেছি কে, কি বলেছে? কিন্তু তোর বাপ কিছু বলছে না।”
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মোজাম্মেল সাহেবের দিকে।শুভ্র ধীরে বলল,
“এসব কি, বাবা?”
মোজাম্মেল গলা কষে বললেন,

“রেহানা, ছেলে-মেয়ের সামনে এভাবে কেন বলছো?”
শাওন এবার বলল,
“তাহলে বাবা, সব বলে দাও। তাহলেই তো শেষ।”
মোজাম্মেল বুঝলেন, আর লুকিয়ে লাভ নেই। তিনি ধীরে বললেন,
“কলটা আসলে আমাকে করেনি… করেছিল শাওনকে।”
রেহানা বেগম রাগে গর্জে উঠলেন,
“তোমার লজ্জা করে না? নিজের দোষ ছেলের নামে চাপাচ্ছো?”
মোজাম্মেল সাহেব ধীরে বললেন,
“সায়রা কল করেছিল… ভেবেছিল আমি শাওন।”
রেহানা বেগম রাগমাখা স্বরে বললেন,
“এটা তো আগে বললেই হতো! কি বলেছে ওই পাগলি মেয়েটা?”
মোজাম্মেল সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, যেন বলার জন্য সময় নিচ্ছেন। সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে।
শেষে মাথা নিচু করে বললেন,
“আপনাকে আমার প্রথম দেখাতেই ভীষণ ভালো লেগেছে… আপনি আমার মন চুরি করেছেন এটাই বলছে।”
এবার সবাই থতমত খেয়ে গেল! শুভ্র আর সুভা তো মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে হাসতে লাগল।
শাওনের মুখ দেখে বোঝা গেল না, সে লজ্জা পেল নাকি রাগ করল। কিছু না বলে সোজা উপরে উঠে গেল।

সকাল এগারোটায় সায়রার ঘুম ভাঙল। চোখ কচলাতে কচলাতে, হাই তুলতে তুলতে সোজা নিচে নেমে এলো।
“আমাকে এই বাড়িতে কাজের লোকের সম্মানটাও দেওয়া হয় না! আমি একমাত্র রাজকন্যা, তবুও রুমে কেউ এক কাপ চা দিল না।”
সায়রার মা বিরক্ত গলায় বললেন,
“আইসে রাজকন্যা! তোর বাপ কোথাকার রাজা, শুনি? তোর বাপ যদি রাজা হতো, তাহলে আমাকে সারাদিন বাড়ির কাজ করতে হতো না। আর ফালতু রাজকন্যা, তোমার চা দিয়েছিলাম, কিন্তু সেই চা ঠান্ডা হয়ে শরবত হয়ে গিয়েছে।”
সায়রা সোফায় বসতে বসতে বলল,

“ওকে, ওকে… অন্তত সকালের নাস্তাটা দাও।”
“তুই কিসের নাস্তা করবি? দুপুর হতে যাচ্ছে, আর এখন নাস্তা খেতে আসছিস? যা, গিয়ে ভাত খা।”
সায়রা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“কপালে নাই তো ঘি, ঘটঘটাইলে হইবো কি।”
মা বললেন, “শাওন কল দিয়েছিল।”
শাওনের নাম শুনতেই সায়রা উৎফুল্ল হয়ে উঠল।
“কি বলেছে গো?”
“বলেছে, তোর সাথে দেখা করতে চায়।”
সায়রা খুশিতে চোখ বড় করে বলল,
“কখন করব? টাইম কখন বলল?”
“সময়ের কথা বলেনি বলল তোকে মেসেজ করে জানিয়ে দেবে।”
সায়রা আর এক মূহুর্ত সময় নষ্ট করল না দৌড়ে আবার উপরে উঠে গেল।গিয়েই নিজের মোবাইলটা হাত নিয়ে দেখল শাওন মেসেজ করেছে দেখা করার জন্য সাথে টাইম এবং জায়গার নামও বলে দিয়েছে।

সায়রা খাওয়া দাওয়া করেই রেডি হয়ে গেল।রেডি আর কি!একটা থ্রিপিস আর চুল গুলো একটু ঠিক করল।এতটুকুই!আর কিচ্ছু করেনি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“সায়রা রে!তোরে যে কত সুন্দর লাগতাছে!”
তখনি রুমে সায়রার মা প্রবেশ করল বলল,
“নিজেকে নিজে যে কেউ প্রশংসা করে সেটা এই প্রথম দেখলাম।আর এসব কি পড়েছিস তুই?তিনবছর আগের ঈদের জামা পড়ছস। কেন রে তোর কি জামা কাপর আর নাই।আর মুখটার মাঝে একটু ক্রিম মাখতে পারতি!”
সায়রা বলল,
“তোমার মেয়ে এমনিই অনেক সুন্দর এখন যদি বেশি সাজুগুজু করি তাহলে ওই এক ডজন আবার হার্ট অ্যাটাক করবে।”

মা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এক ডজন আবার কে?”
“এক ডজন মানে বারোটি।এখনো হিসাব বুঝোনা!”
মা সায়রার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।বলল,
“না বুঝি না আল্লাহ সব বুদ্ধি তোরেই দিছে।আর একদম উলটা পালটা কিছু করবিনা বলে দিলাম।”
সায়রা বাঁকা চোখে চেয়ে হাসল তার মায়ের দিকে বলল,
“তোমার মেয়ের মতো ভালো মেয়ে একটাও খুঁজে পাবানা বুঝছো।”
বলেই সায়রা বের হয়ে গেল।
রিকশা করে যাচ্ছে সায়রা সাথে তার বেস্ট ফ্রেন্ড ঝিনুক।
ঝিনুক বলল,

“আমাকে নেওয়ার কি খুব দরকার ছিল!তোরা কথা বলবি বল আমাকে কেন শুধু শুধু কষ্ট করাচ্ছিস?”
সায়রা বলল,
“তুই আমার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড তোকে না নিলে এই দুনিয়া অশুদ্ধ হয়ে যাবে।”
“হ্যা বেস্ট ফ্রেন্ড তাও আবার ব্ল্যাকমেইল করা বেস্ট ফ্রেন্ড।”
ঝিনুক হলো একটা শান্তশিষ্ট মেয়ে।না পছন্দ করে বেশি কথা বলতে আর না দুষ্টামি। ঝিনুককে একটা ছেলে গোলাপ দিয়ে প্রপোজ করেছিল।সেই প্রপোজ এক্সেপ্ট করেনি।কিন্তু সেটার ছবি উঠিয়ে রেখেছিল সায়রা।সেই ছবি এডিট করে ছেলেটার জায়গায় ঝিনুককে বসিয়ে দিয়ে ছিল মানে বুঝিয়েছিল ঝিনুক ওই ছেলেটাকে প্রপোজ করেছে।সেই ছবি ঝিনুক কে দেখিয়ে সায়রা বলেছে “যদি আমার সাথে বেস্ট ফ্রেন্ড না করিস তাহলে পুরো ভার্সিটিতে দেখিয়ে দেব আর বড় কথা হলো আমি তোর মা বাবাকে দেখিয়ে দেব।বেচারি ঝিনুক সেই থেকে এই পাগলি সায়রার পেঁচাতে পড়েছে।
রিকশাটা গিয়ে থামে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে। তারা দুজন নেমে ভেতরে গিয়ে দেখল শাওন নেই।
সায়রা বলল,

“এসব লোকদের আমার ভালো লাগেনা সময়ের মূল্য নেই এদের কাছে।”
ঝিনুক বলল,
“তোকে কয়টায় আসার কথা বলেছিল?”
সায়রা বলল,
“বিকাল চারটায়।”
ঝিনুক রাগে দাঁত খিঁচিয়ে বলল,
“এই গাঁদি সেটা আগে বলবি না এখন দুপুর দেড়টা বাজে।”
সায়রা দাঁত খিলখিল করে হাসল বলল,
“আসলে বেশি এক্সাইটেড ছিলাম তাই গুলিয়ে ফেলেছিলাম।”
“আল্লাহ গো ও আল্লাহ তুমি আমারে এরকম একটা গরু কেন দিলা এর চেয়ে রাস্তায় কুকুরও ভালো আছে।”
সায়রা বলল,

“শুকরিয়া আদায় কর আমার মতো একজন কে পেয়েছিস।”
ঝিনুক কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে বলল,
“হ্যা তুই ঠিক বলছোস এতই শুকরিয়া আদায় করছি যে এখন আমার খুশিতে কাঁদতে মন চাচ্ছে। ”
“ট্রিসু এনে দিব?”
ঝিনুক বলল,
“দোহাই লাগে বইন মুখটা একটু বন্ধ করে রাখ।”
“এসব অসম্ভব কথা বলিস না।চল যাই!”
ঝিনুক সরু চোখে বলল,
“কোথায় যাব?”
“এখানে বসে লাভ নাই চল পাশেই একটা পার্ক আছে সেখান থেকে ঘুরে আসি।”
ঝিনুক বলল,
“যেতে পারি তবে সেখানে গিয়ে কোনো ঝামেলা বাঁধাবি না।”
তারা দুজন পার্কে ঢুকে গেল।চারদিক ছেলে মেয়ের জোড়া ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
সায়রা বলল,

“ঝিনুক এখানে খুব বেশি সবুজ ঘাস ছিল কিন্তু আজ কম কম লাগছে তাই না।”
ঝিনুক বলল,
“হ্যা ঠিকই বলছিস কিন্তু কেন?”
“আসলে এখানে মানুষ রুপে কবুতরের জোড়া গুলো আসে তারা সব ঘাস খেয়ে পেলছে।”
ঝিনুক সায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এসব অদ্ভুত কথা পাস কোথায় তুই?”
“আমার মস্তিষ্কে চার পাঁচটা ডেলিভারি ম্যান আছে তারা এসে আমার হাতে দিয়ে যায়।”
ঝিনুক বিরক্ত নিয়ে বলল,
“তোর সাথে কথা বলা মানেই ফালতু।”
অনেকক্ষণ ধরেই তারা হাঁটছে পার্কে আর সায়রা ফালতু বকবক করে যাচ্ছে।
সায়রা এবার বলল,

“দোস্ত আমার এভাবে আর ভালো লাগছেনা কিছু একটা করতে হবে বুঝলি।”
“দোহাই তোর কিছু করিস না তোর কিছু করা মানেই আবার বিপদ।”
সায়রা বলল,
“আইডিয়া!কোনো বিপদ হবেনা দেখ কি করি।”
বলেই সায়রা সামনে গাছের নিচে বসে প্রেম করতে থাকা ছেলে মেয়ের দিকে গেল।গিয়েই সায়রা কাঁদো কাঁদো মুখ করে ছেলেটাকে বলল,
“ওগো!তুমি আমার সাথে কেন এমন করলে?”
মেয়েটা উঠে বলল,

“আপু আপনার কি হয়ছে?”
“তুমি আমার সাথে পনেরো বছর প্রেম করে বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে আরেকটা মেয়ে নিয়ে পার্কে ছি ছি!”
মেয়েটা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“পলাশ!মেয়েটা যা বলছে তা কি সত্যি।”
ছেলেটা বলল,
“বাবু বিশ্বাস করো সব মিথ্যা কথা এই মেয়েটা মিথ্যা কথা বলতেছে।”
সায়রা কাঁদার অভিনয় করে বলল,
“আপনার প্রমান চাই দাঁড়ান প্রমান দিচ্ছি” বলেই ঝিনুককে ডেকে বলল,
“এই তুই বল এই ছেলে আমার সাথে পনেরো বছর প্রেম করেছে।”
ঝিনুক হা করে তাকিয় আছে সায়রা ধমক দিয়ে বলল,
“কি হলো বল।”
ঝিনুক ভয়ে বলল,

“হ্যা হ্যা।”
মেয়েটা ছেলেটার গালে ঠাস করে একটা চ’ড় বসিয়ে দিয়ে চলে গেল।
ছেলেটা এবার সায়রার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো।সায়রা একটা মুচকি হাসলো ছেলেটার দিকে।
সায়রা ওখান থেকে চলে আসতে চাইলে ছেলেটা সায়রার হাত চেপে ধরে বলল,
“কোথায় যাচ্ছো তুমি আমার প্রেমটা ভাঙলে এবার তোমাকেই আমি বিয়ে করব।”
ঝিনুক ভয়ে কাঁপা শুরু করে দিছে।সায়রা ছেলেটার পায়ে আঘাত করে দৌড়ে চলে গেল।কিছু দূর যেতেই বুঝতে পারল তার সাথে ঝিনুক নেই।পেছনে তাকিয়ে দেখল ঝিনুক এখনও ওইখানেই দাঁড়িয়ে কাঁপছে।
সায়রা আবারো দৌড়ে গিয়ে ঝিনুকের হাত ধরে দৌড়ে চলে আসলো।
অনেকটা দৌড়ের পর তারা দৌড় থামিয়ে একটা গাছের নিচে দাড়ালো। সায়রা বলল,
“আহ!এখন একটু মজা লাগতাছে।”
ঝিনুক বলল,

বিয়ে পাগলি পর্ব ২

“হ্যা ঠিকি বলছিস এতই মজা লাগছে যে আরেকটু হলে পায়জামা নষ্ট করে ফেলতাম।”
সায়রা বলল,
“কেন তোর কি ডায়াবেটিস আছে ?”
ঝিনুক কাঁদো কাঁদো মুখ করে মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“আমি পারিনা আর পারিনা,
আমি ক্যান মরিনা?
আজরাইল কি মোরে চিনে না?”

বিয়ে পাগলি পর্ব ৪