আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৩
DRM Shohag
সন্ধ্যা ভার্সিটির মাঠের এককোণে স্কুটি দাঁড় করায়। এরপর পরনের বেল্ট খুলে স্কুটির উপর রেখে মাথার হেলমেট খুলে রাখে। তখন রে’গে পায়ের একটি চটি ছুড়ে মা’রায় আর একটি চটি রয়ে গেছে মাত্র। তাই পায়ে আর কিছু পরল না। একটি পায়ের চটি স্কুটির উপর রেখে দেয়৷ এরপর সৃজনকে কোলে নিয়ে এগিয়ে যায় বন্ধুদের দিকে। সৃজন মায়ের গলা জড়িয়ে রেখে সন্ধ্যার গালের সাথে গাল লাগিয়ে ডাকে, “মা?”
সন্ধ্যা মৃদু হেসে বলে, “জ্বি আব্বা?”
সৃজন আদোআদো স্বরে বলে,
“বাতাচ বাবু।”
নামটি শুনতেই সন্ধ্যার মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে যায়। সাথে থেমে যায় পা দু’টো। বুক টিপটিপ করে। সে জানে অরুণ আকাশের ছবি দেখিয়ে সৃজনকে এসব নাম শিখিয়েছে৷ কিন্তু বুঝল না সৃজন হঠাৎ আকাশের নাম কেন নিচ্ছে! সে বুঝতেও চাইল না।
চোখ বুজে দু’বার শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করতে চাইল মেয়েটা। গত দু’বছরে কতবার আকাশকে মন পড়ল, আজও পড়ে তবে সন্ধ্যা এড়িয়ে যায়। কতটা পারে? পারলে কি আজও সেই নাম শুনলে বুকটা ধ্বক করে উঠত? সন্ধ্যা এসব নিয়ে ভাবতে চায়না। সে নিজেকে সামলায়। শ’ক্ত গলায় বলে,
“এই নাম বলবে না।”
কথাটা বলে সন্ধ্যা চোখ মেলে সামনে এগোয়। মায়ের কথার বিশেষ পাত্তা দিল না সৃজন। ঠিক পাত্তা দিল না এমন নয়, সে বুঝল না। তাই আবারো বলতে চায়,
“মা আমি বাতাচ বাবু……
সন্ধ্যা হাঁটতে হাঁটতেই সৃজনের দিকে চেয়ে ধমকে ওঠে, “সৃজন?”
ধমক খেয়ে ভ’য় পেয়ে পায় বাচ্চা ছিলেটি। ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। মায়ের একটা ধমকেই সৃজনের চোখজোড়া ভরে উঠেছে। ভীষণ আদরে বড় হয়েছে সে। হাজারটা দুষ্টুমি করলেও সন্ধ্যা সেসব দুষ্টুমির জন্য কখনো ধমক দেয়না সৃজনকে৷ কিন্তু এই একটা ব্যাপার আসলে তার মাথা ঠিক থাকেনা। সৃজনকে ভ’য় পেতে দেখে সন্ধ্যার চোখেমুখে অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে।
সন্ধ্যার তিন ফ্রেন্ড ‘জাবির, সাইফ, সাফা’ খুব বেশি দূরে ছিল না। সন্ধ্যা সৃজনকে ধমক দিয়েছে শুনতে পেয়ে অবাক হয় সকলে। এগিয়ে আসে তারা। জাবির সন্ধ্যার দিকে চেয়ে অবাক হয়ে বলে,
“কি রে আমাদের আদুরে ছানাকে বকছিস কেন? মাথার তার ছিঁড়ল নাকি?”
সন্ধ্যা চুপ থাকলো। সৃজন মাথা নিচু করে গাল ফুলিয়ে বলে,
“মা পুচা। মা আমাকি বকিচে।”
কথাটা বলতে বলতে পানিতে টইটুম্বুর চোখজোড়া থেকে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে৷ সবসময় আদর পাওয়া মায়ের থেকে এটুকু ধমক সহ্য হয়নি তার। সন্ধ্যা সৃজনের দু’গালে টপাটপ কয়েকটা চুমু খায়। বা হাতে সৃজনের গাল মুছে দিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বলে, “আমার আব্বা! স্যরি! এই যে কান ধরেছি।”
অভিমানী সৃজন মায়ের দিকে তাকায়। সন্ধ্যা ডান হাতে তার ডান কান ধরে রেখেছে। বাচ্চা ছেলেটি মাকে কান ধরতে দেখে ফিক করে হেসে দেয়। সন্ধ্যাও হাসল। আবারও চুমু খায় সৃজনের গুলুমুলু দু’গালে৷
জাবির চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“এ্যাই সিলিকন তোকে না এই বেদ্দপ এক্ষুনি ধমক দিল! এতো তাড়াতাড়ি গলিস না বাপ গলিস না।”
জাবিরের কথা শুনে সন্ধ্যা রে’গে তাকায়। জাবির পাত্তা দিল না। সাইফ আর সাফা হাসছে। সৃজন ডান হাত উঁচু করে জাবিরকে মা’রার ভঙ্গি করে বলে,
“তুমি তুপ কল। আমাল নাম ছিলিজন। তুমি ছিলিকন বুলচ কেন?”
সৃজনের কথা শুনে সাইফ আর জাবির হো হো করে হেসে দেয়। নিজের নাম ঠিক করে দিচ্ছে, অথচ সেটাও বিকৃত। সৃজন বোকা চোখে তাকায়। ওদের হাসি অগ্রাহ্য করে সে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, “মা আমাকে চলকেত কিনে দিবে কিন্তু। তুমি যে আমাকে বুকেচ!”
সৃজনের কথা শুনে সন্ধ্যা হেসে সৃজনের গালের সাথে গাল লাগিয়ে হেসে বলে,
“বকলে চকলেট কিনে দিতে হয়?”
সৃজন ঠোঁট উল্টে বলে, “হু হু।”
আবারো সকলে হাসল। জাবির কোমরে হাত রেখে বলে, “ওরে চলকেট লোভী কোথাকার! একে কোনো বুদ্ধি দিয়ে লাভ নেই। এর সব বুদ্ধি তো বে’য়া’দ’ব চকলেট খেয়ে নেয়।”
সৃজন রে’গে বলে,
“তুমি বিদপ৷ চলকেত বালো।”
সৃজনের কথায় আবারো সকলে হাসে। সন্ধ্যা সাফার দিকে চেয়ে বলে,
“লামিয়া কই?”
সাফার আগেই সাইফ প্রফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“ও আজ স্পেশাল ডিশ আনছে। সবাই অপেক্ষা কর।”
সন্ধ্যা উল্টোদিকে যেতে যেতে বলে,
“আমাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলে ওরই খোঁজ নেই। ক্লাসে আয় তোরা।”
জাবির কিছু বলার জন্য সন্ধ্যার কাঁধ হাত রেখে বলতে নেয়,
“এ্যাই সন্ধ্যা…..
সাথে সাথে সন্ধ্যা উল্টোফিরে জাবিরের গালে একটা থা’প্প’ড় মে’রে দেয়। জাবির গালে হাত দিয়ে সন্ধ্যার দিকে কটমট চোখে চেয়ে বলে, “মা’রলি কেন?”
সন্ধ্যা চোখ পাকিয়ে বলে,
“বলেছি না, আমার থেকে সবসময় দুই ইঞ্চি দূরত্ব রাখবি?”
জাবির কটমট চোখে চেয়ে বলে,
“এই বে’দ্দ’প ছেমড়ি, দরকারেই তো ডেকেছি৷ তোর দরকারে যখন কোলে উঠে আসিস সেই কথা মনে থাকে না?”
সন্ধ্যা আঙুল উঁচিয়ে বলে,
“একদম মিথ্যে বলবি না। আমি কবে তোর কোলে উঠলাম?”
জাবির মেয়েদের মতো মুখ বাঁকিয়ে বলে, “কেলে না উঠলি, প্রয়োজনে কথার তালে কখনো না কখনো টাচ তো করিস!”
সন্ধ্যা থতমত খায়। নিজেকে সামলে বলে, “আমি মেয়ে, আমি টাচ করতেই পারি। কিন্তু তুই ছেলে তাই মেয়েদের থেকে সবসময় দুই হাত দূরত্ব রাখবি। সহজ হিসাব।”
জাবির কটমট চোখে চেয়ে বলে,
“বা’লের হিসাব! আমি সিইওর তুই ব্রিটিশের এক নানি। ব্রিটিশরা তোর মতো বা’ল হিসাবকারীর উপর চরম বিরক্ত হয়ে এক লাথি দিয়েছিল, সেই লাথি খেয়ে তুই আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের উপর এসে পড়েছিস।”
সন্ধ্যা রে’গে বলতে নেয়, তুই…
সন্ধ্যার পাশ থেকে সাইফ বলে,
“আরে তোরা থাম তো৷ একটা পাইলেই হয়।
এরপর সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে বলে,
রে’গে আছিস কেন? আসার পথে কিছু হয়েছে না-কি?
সন্ধ্যা কোনো কিছু নিয়ে রে’গে থাকায় এমন রিয়েকশন দিচ্ছে,, এটা শুধু সাইফ নয়, সাথে সাফাও বুঝেছে। সাইফ জিজ্ঞেস করায় এবার জাবিরও বুঝল। থা’প্প’ড়টা সে আরেকজনের জন্য খেয়েছে। ফ্রেন্ডদের এই এক জ্বালা, এক ফ্রেন্ড অন্যের রা’গ তার আরেক ফ্রেন্ডের উপর এসে ঝেড়ে দেয়। জাবির হতাশার শ্বাস ফেলে৷ কপাল খারাপ বলে বন্ধুর রা’গের স্বীকার আজ সে হলো।
এদিকে সাইফের প্রশ্নে সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আকাশের ব্যাপারটি চেপে যায়। রাস্তায় ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে করে বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“আসার পথে একটা অ’স’ভ্য লোক আমার স্কুটির সাথে তার বাইক দিয়ে ধাক্কা দিয়েছিল। পড়তে পড়তে বেঁচেছি। পড়ে গেলে আজ সৃজনের কি হত ভাব তো! বে’য়া’দ’বটাকে চিনতে পারলে বোঝাবো আমি কি জিনিস!”
জাবির কেবলা হেসে বলে,
“তুই যে জাতির নানি, এটাই বোঝাবি জানি! দাঁড়া দেখাচ্ছি কিভাবে বলবি,
এরপর জাবির এক্টিং করার ভান করে বলে,
এই শুনে রাখ, আমি জাতির নানি। তাই তোরও নানি। আমাকে সম্মান দিয়ে চলবি।
এরপর সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বলে,
ঠিক বললাম তো জাতির নানি?”
জাবিরের এক্টিং দেখে সবাই জোরে হেসে দেয়। সন্ধ্যা কটমট দৃষ্টিতে চেয়ে বলে, “তুই আমাদের চৌদ্দ গুষ্টির দাদা। আইছে আমাকে নানি বানাতে!”
সৃজন জাবিরের দিকে তাকিয়ে আছে৷ তার মায়ের হাতের থা’প্প’ড় খেয়ে জাবিরের ফর্সা গাল লাল হয়ে উঠেছে৷ সে জাবিরের লালিত ফর্সা হওয়া গালের দিকে আঙুল তাক করে বলে,
“জাবিল মামাল গাল ফুলকো হয়ি গেচে।”
কথাটা বলে মুখে হাত দিয়ে হাসতে থাকে৷ সৃজনের কথা শুনে সবাই জাবিরের দিকে তাকায়। জাবির চোখ ছোট ছোট করে তাকায় সৃজনের দিকে। মা তার উপর কার না কার রা’গ ঝাড়ল। মায়ের লেজ ধরে ছেলেও তার প্রেস্টিজ পাঞ্চার করতে নামছে। কি সাংঘাতিক!
যাবির স্বাভাবিক এর চেয়ে ফর্সা হওয়ায় থা’প্প’ড় খেয়ে গাল লাল হয়ে উঠেছে। জাবিরের অবস্থা সাথে সৃজনের বলার ধরনে সবাই শব্দ করে হেসে ফেলে। জাবির সবার দিকে রে’গে তাকায়। কেউ জাবিরের দৃষ্টি পাত্তা দিল না। সাইফ সন্ধ্যার কোল থেকে সৃজনকে কোলে নিয়ে বলে,
“মামা কি ওই ফুলকো কা’ম’ড়ে খেতে চাও?”
সৃজন মাথা উপরনিচ করে সম্মতি দেয় আর বলে, “হু হু খেতে চাই।”
জাবির চোখ বড় বড় করে তাকায়। মা থা’প্প’ড় মারে, তার ছেলে তার গাল ফুলকো ভেবে খেতে চায়। কি ভয়ানক! সাইফ জাবিরের দিকে এগোনোর আগেই জাবির ডান হাত তার লালিত গালে দিয়ে বা হাত উঁচিয়ে বলে,
“এ্যাই এ্যাই একদম আমার পিছে লাগবিনা খবরদার। সবগুলো আমার শ’ত্রু। আমার দুঃখে তোরা হাসিস। তোদের কপালে খুব দুঃখ আছে বলে দিলাম। শালা বন্ধু নামে শ’ত্রুর দল কোনহানকার!”
সন্ধ্যা হাসি থামায়। আসলেই তখনকার সেই লোকটার রা’গ ঝাড়তে গিয়ে জাবিরকে মা’রা থা’প্প’ড়টা জোরেই হয়ে গেছে। মায়া লাগলো তার। অতঃপর জাবিরের উদ্দেশ্যে বলে,
“বেশি লেগেছে? মলম আনব?”
জাবির কটমট চোখে চেয়ে বলে,
“নাহ্ আরাম লেগেছে।”
সন্ধ্যা হেসে বলে, “তাহলে ওই গালটাও এগিয়ে দে। আরেকটা থা’প্প’ড় দিই।”
জাবির হতাশ হয়। সামনে দিয়ে এক মেয়ে পাস করে যেতে যেতে জাবিরের দিকে তাকায়। জাবিরও তাকায়। আহারে ভার্সিটিতে কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে, কিন্তু তার কপালে একটা মেয়েও জোটেনা। জাবির সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে এসে খুব সিরিয়াস হয়ে বলে,
“বোনটি, মজা বাদ দে। আমাকে একটা গার্লফ্রেন্ড জুটিয়ে দে। এভাবে আর হচ্ছেনা। তুই একটু হেল্প করলেই আমার কপালে একটার পর একটা গার্লফ্রেন্ড জুটে যাবে।”
সন্ধ্যা বিরক্ত হয়। বাদিকে ফিরে সাফাকে দেখে সেদিকে বা হাত পেতে দিয়ে বলে, “সাফা তোর পায়ের একটা জুতো খুলে দে তো।”
বোকাসোকা সাফা শুধু এদের কান্ড দেখছে। মেয়েটা খুব কম কথা বলে।
জাবির সন্ধ্যার দিকে চোখ ছোট ছোট করে বলে, “আমি গার্লফ্রেন্ড চাইলাম। জুতো নয়। তোর কান আছে না গেছে?”
সন্ধ্যা বলে, “আমার কান কানের জায়গায়ই আছে৷ কিন্তু তোর বুদ্ধি ব্রেইন থেকে হাঁটুতে নেমেছে। দু’টো জুতোর বারি খেলেই সব বুদ্ধি হাঁটু থেকে আবার ব্রেইনে উঠে যাবে।”
জাবির অসহায় কণ্ঠে বলে,
“এবার আমি আরও সিইওর হলাম, তুই আসলেই ব্রিটিশ নানি। আমি একটা প্রেম করলে কি হবে রে নানি?”
সন্ধ্যা রে’গে বলে,
“নিজেই তো নবাবের মতো বাপের টাকায় খেয়ে বাঁচিস। গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে বাপের ক’ষ্ট করে কামানো টাকা আরেক নারীর পিছে ঢালবি? চাকরি পেয়ে যা ইচ্ছা করিস। এখন আঙ্কেল-আন্টির কথা ভেবে মন দিয়ে পড়। নয়তো তোর হাতখরচ বন্ধ করার ব্যবস্থা করব।”
জাবির অসহায় চোখে তাকায়। সাইফ, সাফা হাসল সন্ধ্যার কথায়। সাইফ, জাবির স্কুল লাইফের ফ্রেন্ড। সন্ধ্যা, লামিয়া কলেজ ফ্রেন্ড। ভার্সিটি এসে তাদের পরিচয় হয়েছে। এদের দুইজোড়া ফ্রেন্ড এর সাথে আবার ক’মাসের মাথায় সাফার সাথে পরিচয় হয়। সাফা মেয়েটি ভীষণ সহজ সরল। কথা খুব কম বলে। অল্প সময় হলেও সবার মাঝে বেশ মজবুত এক ফ্রেন্ডশিপ তৈরী হয়েছে। তার মধ্যে সন্ধ্যাকে তারা ভীষণ সাহসী আর শ’ক্ত মেয়ে হিসেবেই চেনে, অর্থাৎ সাফার একদম উল্টো। লামিয়া একটু চঞ্চল তবে কিছুটা ভীতু টাইপ।
সবার মাঝে সন্ধ্যা তাদের সবাইকে কড়া গাইডলাইন দেয় বলা যায়৷ আর তারা বন্ধুরাও সন্ধ্যার জেদ, কঠোরতার কাছে হার মেনে যায়। তারা বুঝতেও পারে সন্ধ্যা যা বলে ঠিকটাই বলে। প্রথম প্রথম ভার্সিটি এসে কতশত ঝামেলায় পড়েছে তারা। সবসময় সন্ধ্যা সবচেয়ে বেশি সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। বন্ধুদের জন্য কত ঝামেলায় নিজেকে জড়িয়ে অতি বুদ্ধিমত্তার সাথে সব সামলেও নিয়েছে। সকলেই একে-অপরের পাশে থেকেছে সবসময়।
তারা সবাই সন্ধ্যার জীবনকাহিনী জানে। একদম ‘এ টু জেড’ জানে। তারা জানে সন্ধ্যা একসময় সাফার মতোই এক সহজ-সরল বোকা নারী ছিল। যে গ্রাম থেকে শহরে এসে ভীতু নারী হয়ে চলত। কিন্তু মাঝে হাজারটা বিপদ, ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে সন্ধ্যা আজ এইখানে। সত্যি বলতে সাইফ, যাবির, সাফা, লামিয়া সন্ধ্যা সকলেই একে অপরদের বন্ধু হিসেবে পেয়ে নিজেদের ভাগ্যবানের চেয়ে কমকিছু মনে করেনা।
জাবির হতাশ হয়ে দু’হাত জমা করে ক্ষমার ভঙ্গি করে বলে, “দুষ্কিত! দুষ্কিত! থুক্কু দুঃখিত! ক্ষমা হয়ে গেছে, ভুল করে দে বোনটি।”
তখনই লামিয়া দৌড়ে এসে সাফাকে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
“সন্ধ্যা ভুল না করলেও ওর হয়ে আমি ভুল করে দিব। মায়ের হাতের মজাদার খিচুড়ি এনেছি। তোর ভাগেরটা আমি খেয়ে ভুল করে দিব। চলবে দোস্ত?”
জাবির দ্রুত দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“অসম্ভব। আন্টির হাতের খিচুড়ি থেকে আমাকে কিছুতেই বঞ্চিত করতে পারিস না। তুই সন্ধ্যা ব্রিটিশ নানি হতেই পারিস না। তুই হলি বাংলাদেশি নানি। বিউটি আক্তার কিউটি নানি আমার।”
জাবিরের কথা শুনে সন্ধ্যা, লামিয়া দু’জনেই রে’গে তাকায়। সাইফ হাসতে হাসতে জাবিরের দিকে হাত বাড়ালে জাবিরও হাত এগিয়ে দিয়ে একটা তালি দেয়। সাইফ হাসতে হাসতে বলে,
“বিউটি আক্তার কিউটি। নামটা জোশ দোস্ত!”
জাবির সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, “তোর জন্যও নাম ঠিক করব নানি। একটু সময় দে। মারাত্মক নাম চুজ করব৷”
সন্ধ্যা কটমট চোখে চেয়ে বলে,
“যা বুঝলাম, তোর কপালে আজ সিইওর জুতার বারি আছে।”
সাইফের কোলে থাকা সৃজন মুখে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
“যাবিল মামা মায়েল জুতোল বালি কাবে।”
জাবির লামিয়ার ব্যাগ ছোঁ মেরে নিয়ে বলে, “ওহে ব্রিটিশ নানির পোলা, আমি তোল মায়েল জুতোল বালি নয়, তোদের সবার ভাগের খিচুড়ি সব একাই সাবার করব।”
লামিয়া চেঁচিয়ে বলে,
“খবরদার যাবির সব খেলে তোর কপাল ফাটাবো। আন্টি কল করেছিল সন্ধ্যা খায়নি। ব্যাগ দে আমার।”
লামিয়ার কথায় সন্ধ্যা বলে,
“আমি খাবো না। তোরা…..
এটুকু শুনতেই চারপাশ থেকে সকলে সন্ধ্যার দিকে চেপে এসে এমনভাবে তাকালো যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য কিছু শুনে ফেলেছে। সকলে একসঙ্গে বলে,
“কিইইইইইইইইইই?????”
সন্ধ্যা সবার দিকে থতমত খেয়ে তাকায়। বোকাসোকা শান্ত সাফা-ও একই রিয়েকশন দিয়েছে। এদের দেখাদেখি সৃজনটাও মায়ের দিকে জহুরি চোখে চেয়ে আছে। সবার রিয়েকশন দেখে সন্ধ্যার মনে হচ্ছে, সে চুরি করতে গিয়ে ধরা পরেছে।
আসলে লামিয়ার মায়ের হাতের খিচুড়ি সবার ভীষণ পছন্দ। কিন্তু সন্ধ্যার বেশি। কখনো কখনো এমনও হয়েছে সন্ধ্যা সাইফ, যাবিরের ভাগ একাই খেয়ে নিয়েছে। এরপর সাইফ আর যাবিরকে লামিয়া আবার তার বাড়ি নিয়ে যেত মায়ের হাতের খিচুড়ি খাওয়ানোর জন্য। অথচ সেই বলছে, সে নাকি খাবে না।
আসলে সকাল থেকেই আকাশকে মনে করে সন্ধ্যা ভীষণ ডিস্টার্ব ছিল। একটু আগে আকাশের জন্য সৃজনকে ধমক দিয়ে আরও আপসেট হয়। খেতে ভালো লাগছিল না৷ কিন্তু এই খরগোশগুলোর জন্য না খেয়ে থাকতে পারবে না তার জানা আছে।
সকলকে এখনো একইভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সন্ধ্যা বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“কি প্রবলেম তোদের? এখন খাবো না বলেছি। ক্লাস শুরু হওয়ার বেশি টাইম নেই। তাই ক্লাস শেষে খাবো।”
এবার সকলে মুখ গোল করে বলে,
“ওওওওওওও। তাহলে ঠিকআছে।”
লামিয়া জাবিরের হাত থেকে তার ব্যাগ কে’ড়ে নেয়৷ জাবির কিছু বলার আগেই
সন্ধ্যা আশেপাশে তাকিয়ে অরুণকে না দেখে বলে,
“অরুণ ভাইয়া তো এখনো আসল না। সৃজনকে কার কাছে রাখব?”
সাফা বলে,
“কেউ একজন ক্লাস মিস দিই আজ। অরুণ ভাইয়া মেবি ঘুম থেকে ওঠেনি।
তখনই ফার্স্ট ইয়ারের এক মেয়ে এসে সন্ধ্যাকে সালাম দেয়। সন্ধ্যা সালামের উত্তর নেয়। মেয়েটি বলে,
“আপু সৃজনকে কিছুক্ষণের জন্য নিয়ে যাই? ওইতো আমাদের ফ্রেন্ড। একটু পরেই দিয়ে যাব।”
মেয়েটিকে সন্ধ্যারা খুব ভালো করেই চেনে। এর আগেও সৃজনকে এই মেয়ে সহ আরও অনেকেই নিয়েছে। ফর্সা গুলুমুলু সৃজন সবার চোখে পড়ে। সন্ধ্যা বলে, “আমাদের ক্লাস আছে। তুমি ওকে এক ঘণ্টা তোমার কাছে রাখতে পারবে?”
মেয়েটি আরও খুশি হয়। মাথা নেড়ে বলে, “অবশ্যই আপু।”
সন্ধ্যা সাইফের কোল থেকে সৃজনকে নিয়ে মেয়েটির কোলে দেয়। বলে, “সাবধানে রাখবে কেমন? ছেড়ে দিও না যেন।”
মেয়েটি মাথা নাড়ে। সন্ধ্যা সৃজনের গালে চুমু এঁকে বলে, “আব্বা আপুর কাছে ভদ্র হয়ে থাকবে হু? আমি এসে অনেক চকলেট কিনে দিব।”
সৃজন বুঝদার বাচ্চার ন্যায় মাথা নেড়ে মেয়েটির গলা জড়িয়ে রেখে বলে, “আত্তা আত্তা।”
সন্ধ্যা মেয়েটিকে আবারো বলে,
“ওকে চোখেচোখে রাখবে কেমন?”
পাশে থেকে জাবির বলে,
“মনে হচ্ছে ছেলেকে রেখে বিদেশ যাচ্ছিস। তা কোন দেশে যাচ্ছিস রে? ফ্লাইট কয়টায়? ফিরবি কবে?”
কথাটা শুনতেই সন্ধ্যা জাবিরের দিকে রে’গে তাকায়। জাবির দৌড় দেয়, তার আগেই সন্ধ্যা জাবিরের পিঠে একটা থা’প্প’ড় মে’রে দেয়৷ জাবির দৌড়াতে দৌড়াতে পিছু ফিরে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আজ মা’রছিস মা’র। যেদিন আমার মতো নায়ক থাকবে না। সেদিন তোরা আমি নায়কের অভাবে সিনেমা দেখতে না পেরে বুঝবি আমি সুইট নায়কের অভাব।”
সকলে হতাশ চোখে তাকায় জাবিরের দিকে। এটা শুধরাবার নয়। সৃজন মুখ চেপে হাসতে হাসতে বলে,
“জাবিল মামা মায়েল হাতে মাল কায়। জাবিল মামাল শলম নাই।”
জাবিরের কান্ড সাথে সৃজনের কথায় সবাই শব্দ করে হেসে দেয়। লামিয়া হাসতে হাসতে বলে,
“তোমার জাবির মামা সবার হাতেই উত্তমমাধ্যম খায় আব্বা। কিন্তু ওর একফোঁটা শরম নাই।”
আবারো সকলে হাসল। এরপর সন্ধ্যা মেয়েটিকে আবারো সৃজনকে দেখে রাখতে বলে তারা সকলে ক্লাসের উদ্দেশ্যে এগোয়। মেয়েটিও সৃজনকে নিয়ে তার ফ্রেন্ডদের দিকে এগোয়।
পিছন থেকে জাবির এগিয়ে এসে সকলের সাথে তাল মেলায়। সে সন্ধ্যার পায়ের দিকে খেয়াল করে বলে,
“কি রে সন্ধ্যা তোর পায়ের জুতো কই?”
সন্ধ্যা যেতে যেতে বলে,
“রাস্তায় ওই অ’সভ্য লোকটার দিকে একটা ছুড়ে মেরেছিলাম।”
সন্ধ্যার কথায় সবাই হেসে বাহবা দিয়ে বলে, “বাহ্ বাহ্ আমাদের সাহসী রাণী!”
ঘড়ির কাটা তখন ১১ টার ঘরে৷ ঢাকা ভার্সিটির প্রাঙ্গণে পর পর তিনটি কালো রঙের গাড়ি এসে থামে৷ এর মধ্যে প্রথম গাড়িটি সবচেয়ে বড়, এরপরের দু’টো গাড়ি তুলনামূলক ছোট।
সামনের গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে ড্রাইভার বের হয়ে দ্রুতপায়ে গাড়ির অপরপাশে এসে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে বর্তমানের ইস্ট ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান’ যাকে সকলে এক নাম ‘AV’ বলে চেনে। আরেকটি পরিচয় সে একজন বিজন্যাসম্যান।
আকাশ গাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পরনে সাদা কোর্ট-প্যান্ট। পায়ে সাদা জুতো। মুখে মাস্ক, চোখে সানগ্লাস। আকাশ বা হাতে স্যুট ঠিক করে চারিদিকে চোখ বুলায়৷ ঢাকা ভার্সিটির ভিসি তাকে ইনভাইট করেছে একটি বিশেষ কারণে। অনেক বড় করে আয়োজন অর্থাৎ আকাশকে বরণ করে নেয়ার জন্য অনুষ্ঠান করত। তবে আকাশ নিষেধ করে দিয়েছে৷ বিরক্ত লাগে এসব। আকাশ এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট। সেই হিসেবে স্যারের রিকুয়েস্ট না ফেলে এখানে উপস্থিত হয়েছে একদম সাদামাটাভাবে। ভিসি আকাশের কথা মেনে নিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক রেখেছে। এজন্যই সকলে আকাশকে বাহ্যিকভাবে দেখলেও কেউ চিনল না। সবাই সবার মতো স্বাভাবিকভাবেই সব কাজ করছে।
ওদিকে পিছনের দু’টো গাড়ি থেকে প্রায় ১০ জনের মতো কালো পোষাক পরিহিত লোক বেরিয়ে আসে৷ যারা আকাশের থেকে সামান্য পিছিয়ে দু’পাশে দাঁড়িয়ে যায়। আকাশ সামনে দৃষ্টি স্থির রেখে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। কিছুদূর গিয়ে সন্ধ্যাকে দৃষ্টিগোচর হতেই আকাশের পা থেমে যায়। গম্ভীর স্বরে ডাকে, “হালিম?”
আকাশের ডানপাশে দাঁড়ানো আকাশের ডান হাত বলা যায়, সে সাথে সাথে বলে,
“জ্বি বস!”
আকাশ ডান হাত সামান্য উঁচু করে ইশারা করে আর বলে,
“সব গার্ডদের নিয়ে আমার আশপাশ থেকে বিদায় হ।”
আকাশের কথার উদ্দেশ্য না বুঝলেও অর্থটুকু বুঝে হালিম সবাইকে নিয়ে আকাশের থেকে অনেক দূরে চলে যায়। আকাশের দৃষ্টি শাড়িপরিহিতা সন্ধ্যাতে।
একটি ক্লাস করে সন্ধ্যা আর তার ফ্রেন্ডরা ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। আরও আড়াই ঘণ্টা পর আবার ক্লাস আছে। এখন মাঠের কোথাও বসে সবাই মিলে লামিয়ার মায়ের হাতের খিচুড়ি খাওয়ার প্ল্যান করেছে। সন্ধ্যা আশেপাশে তাকিয়ে সৃজনকে খোঁজে। হঠাৎ-ই একদিক থেকে সৃজনকে নিয়ে যাওয়া সেই মেয়েটি সন্ধ্যার সামনে এসে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আপু আমি অনেক স্যরি! সৃজনকে থার্ড ইয়ারের এক ভাইয়া আমার থেকে নিয়ে গিয়েছে৷ আমাকে জিজ্ঞেস করল, এটা সন্ধ্যার বাচ্চা না? আমি হ্যাঁ বললে সে সৃজনকে চায়৷ আমি দিতে না চাইলে জোর করেই নেয়। আমি অনেক স্যরি আপু!”
ফার্স্টইয়ারের মেয়েটি ভীষণ ভ’য় পাচ্ছে এই ভেবে, সন্ধ্যা রে’গে তাকে অনেক ধমকাধমকি করে কি-না! কিন্তু সন্ধ্যা তেমন কিছুই বলল না। মৃদুস্বরে বলে,
“ইট’স ওকে। সৃজনকে কোথায় নিয়ে গিয়েছে?”
সন্ধ্যার ব্যবহারে মেয়েটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কয়েকজন ছেলের মাঝে একজনের কোলে সৃজন। সন্ধ্যা সেদিকে এগিয়ে যেতে নিলে পিছু পিছু সাইফ, জাবির, লামিয়া, সাফা আসতে নিলে সন্ধ্যা বলে,
“তোরা আসিস না।”
সকলে রে’গে আছে বোঝা যাচ্ছে। জাবির বলে, “যাবো না মানে? ওই রনির কি সাহস দেখ, আমাদের জুনিয়র ভেবে একদিন ওকে আরেকটি একে শায়েস্তা করে। ওর ব্যবস্থা করব আমরা চল। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের ছানাকে নিয়ে গেছে। ওকে তো…..”
সন্ধ্যা জাবিরের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“ওরা মেয়েদের দুর্বল মনে করে। আর এজন্য দুদিন পর পর মেয়েদের পিছু লাগে। ওদের ভুল ধারণাটা ভাঙাতে হবে। চুপচাপ এখানে দাঁড়িয়ে থাক। যখন প্রয়োজন হবে আমি নিজেই ডাকব। মনে হয় না লাগবে কাউকে।”
কথাটা বলে সন্ধ্যা উল্টোদিকে বড় বড় পায়ে এগিয়ে যায়। সন্ধ্যার ফ্রেন্ডরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সাইফ বিড়বিড় করে, “ওকে একদিন বস্তায় ভরে মা’স্তা’নি’গিরি ছাড়াতে হবে মনে হচ্ছে।”
জাবিব বলে, “ঠিক বলছস দোস্ত।”
সাফা ভীতু কণ্ঠে বলে,
“তোদের এই কাজও তো মা’স্তা’নিদের মতো। তোরা এসব করলে আমি কিন্তু তোদের সাথে থাকব না।”
সাইফ আর জাবির বিরক্ত চোখে তাকায়। জাবির কটমট চোখে চেয়ে বলে, “এ্যাই ভীতুর ডিম বেশি ভ’য় পেলে তোকেই আগে বস্তায় ভরবো। এরপর তোর হাসিনা চাচির গড়া পদ্মা সেতুর উপর থেকে ধাক্কা মে’রে পদ্মা নদীতে ফেলে দিয়ে আসব।”
জাবিরের কথায় সাফা ভ’য়-ও পায় আবার চোখমুখ-ও কুঁচকে নেয়। হাসিনা কবে থেকে ওর চাচী হলো? কি আজব কথাবার্তা।
লামিয়া সাফাকে একহাতে জড়িয়ে নিয়ে বলে, “চুপ থাক তো। ও একটু ভীতু বলে তোরা সব সময় সুযোগ নিস। বে’দ্দ’প দু’টো।”
কেউ আর কিছু বলল না। সবাই সন্ধ্যার দিকে চেয়ে আছে।
সন্ধ্যা ছেলেগুলোর সামনে এসে দাঁড়ায়। রনি ছেলেটি বাইকের উপর বসা। সে সন্ধ্যাকে উপর-নীচ পরোখ করে হেসে বলে, “বিপদের সময় বন্ধুরা তোমার সঙ্গ দিল না বুঝি?”
কথাটা বলে দুঃখী দুঃখী শব্দ করে। সন্ধ্যা একজন ছেলের কোলে থাকা সৃজনের দিকে তাকায়। সৃজন মায়ের দিকেই চেয়ে আছে। এতক্ষণ ভ’য় পেলেও এখন মাকে দেখে ভ’য় কেটেছে তার। সে আসতে চাইছে মায়ের কাছে। সন্ধ্যা সৃজনের দিকে চেয়ে হেসে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দেখায়। মায়ের ইশারায় সৃজনও হেসে বুড়ো আঙুল দেখায়। অর্থাৎ তারা জিতে গিয়েছে। বাচ্চা ছেলেটি এটাই বুঝল। সন্ধ্যা আর সৃজনের কান্ডে সবার ভ্রু কুঁচকে যায়।
সন্ধ্যা সৃজনের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রনির দিকে চেয়ে উত্তর করে,
“আমি দুর্বল নয়। তাই যেখানেই যাই আপনার মতো দলবল নিয়ে যাইনা।”
কথাটা রনির গায়ে লাগলো ভীষণ। তবে নিজেকে শান্ত করে বলে,
“গতকাল আমার ফ্রেন্ডের গায়ে হাত তুলেছ কোন সাহসে?”
সন্ধ্যা খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেয়,
“সে আমার ফ্রেন্ডকে অযথা উত্যক্ত করেছিল। তাই ছোট্ট শা’স্তি দেয়ার বৃথা চেষ্টা করেছি মাত্র। ইন ফিউচার, পুরোপুরি শা’স্তি দিয়ে দিব বড় ভাই।”
সন্ধ্যার কথায় রনি রা’গে ফেটে পড়ে৷ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“তুমি ভুলে যাচ্ছো, আমরা তোমার সিনিয়র!”
সন্ধ্যা শান্ত কণ্ঠে বলে,
“ভুলিনি৷ বাট আমি সিনিয়র নয়, ভদ্র মানুষদের সম্মান করি। অভদ্রদের নয়।”
কথাটা শুনতেই রনির চোখেমুখে ক্রোধ জমা হয়। বাইকের উপর থেকে উঠে এসে সন্ধ্যার মুখোমুখি দাঁড়ায়। ঘাড় বাঁকা করে বাঁকা হেসে বলে,
“দেখতে খারাপ না। বাট এতোটাও রূপসী নয়। এতো দেমাগ কিসের?”
আকাশ সন্ধ্যাদের থেকে খুব বেশি দূরে নয়, এতক্ষণে এখানকার কাহিনীটুকু বুঝেছে। সৃজনকে দেখে চিনতেও পেরেছে। রাস্তায় বাইকের আয়নায় সন্ধ্যাকে দেখেই এটা বুঝেছিল, এই ছেলেই সন্ধ্যার ছেলে। তাই এখানে সৃজনকে দেখে অবাক হয়নি।
সে দেখতে চাইছিল সন্ধ্যার পদক্ষেপ। কিন্তু ছেলেটির কথায় আকাশের চোখেমুখে স্পষ্ট রা’গ হানা দেয়। দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। সানগ্লাসের আড়ালে চোখদুটো শ’ক্ত হয়ে এসেছে। দু’হাত প্যান্টের পকেটে। বা হাত পকেট থেকে বের করে হাতটি সামান্য উঁচু করে চেইন ঘড়িতে সময় দেখল। ঘড়ির কাটা ঠিক ১১ টা বেজে ১৫ মিনিটে। আকাশ হাত নামিয় নেয়। তাকায় রনি ছেলেটির দিকে। মাস্কের আড়ালে ফর্সা চাপদাঁড়িতে ভর্তি মুখাবয়বে সূক্ষ্ম ক্রুর হাসির রেখা ফুটে ওঠে। বিড়বিড় করে,
“ওয়ান আউয়ার, দ্যাটস অল ইউ’ভ গট।”
সন্ধ্যার চোখমুখ শ’ক্ত। ইচ্ছে করছে একে একটা হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলে ফেলতে। শুধুমাত্র তার ছেলে এদের হাতে বলে নিজেকে শান্ত করে রেখেছে। একদিন তার এই ইচ্ছে ঠিক পূরণ করবে। সে শ’ক্ত গলায় বলে,
“ভদ্রভাবে বলছি, আমার ছেলেকে দিয়ে দিন।”
রনি হেসে বলে,
“অভদ্রভাবে বল দেখি, তারপর ভেবে দেখব।”
সন্ধ্যা রা’গ হয়। সে সৃজনকে এদের কাছে রেখে উল্টাপাল্টা কিছু করবেনা বলেই এসব বলছে সন্ধ্যা খুব ভালো করে জানে। সন্ধ্যা কিছু একটা ভেবে হাসল। অতঃপর রনির দিকে চেয়ে রনির বলা কিছুক্ষণ আগের কথার উত্তরে বলে,
“দেমাগ সবসময় রূপের নয়, গুণেরও হয়। জানেন তো?”
রনি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তার দৃষ্টি ঘুরে যায় তাদের থেকে সামান্য দূরত্বে জুনিয়রদের ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত ছেলেদের দিকে। কিছু একটা ভেবে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বাঁকা হেসে বলে, “ওখানে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। আমার ফ্রেন্ডের ছোড়া বলে একটা ছক্কা মে’রে গুণ বিচার কর তবে! দেখি ছক্কা মা’রতে পারো নাকি আউট হও? কি বল?”
সন্ধ্যা মোটেও ঘাবড়ালো না। উল্টে সে এই পথেই আসতে চাইছিল। এজন্য দেমাগের কথাটা বলেছে। মাথায় কিছু খেলছে তার। সন্ধ্যা হেসে বলে,
“সিইওর। আপনার বন্ধুরা আমাকে আউট করতে পারবেনা, এটা কনফার্ম। বাট আমি যাস্ট এক ব্যাটে আপনার বন্ধুদের মাঝ থেকে কোনো একজনকে একেবারে দুনিয়া থেকে আউট করে দিতে পারি। শর্ত, এর দায়ভার আমার ঘাড়ে চাপাতে পারবেন না। রাজি?”
রনির চোখেমুখে বিরক্তি। মেয়েটির কথার ধার অনেক বেশি। কি যেন মিশে থাকে প্রতিটি শব্দে। ভ’য় পাওয়ার কথা না থাকলেও কেমন যেন ভ’য় পেয়েই যায়। এসব পাত্তা না দিয়ে সে পিছনে তাকালে সেই ছেলে এগিয়ে আসে যে গতকাল সন্ধ্যার হাতে একটা থা’প্প’ড় খেয়েছিল। বেচারার কান এখনও তালি লেগে আছে মনে হচ্ছে। কিন্তু সে দমল না। আজ সে সন্ধ্যাকে দেখে নিবে। এরপর সে জুনিয়রদের উদ্দেশ্যে বলে, বল আর ব্যাট রেখে জায়গাটি ছেড়ে দিতে।
সন্ধ্যা সৃজনের দিকে চেয়ে একবার হাসল। মায়ের হাসিতে সৃজন আনন্দ পায়। ভ’য় পায়না আর। সে-ও হাসে।
সন্ধ্যা এগিয়ে যায় খেলার স্থানের দিকে। পিছন থেকে রনি বলে,
“আহা! খালি পা কেন? জুতো লাগবে বেইব?”
ততক্ষণে সন্ধ্যা হাতে ব্যাট নিয়ে দাঁড়িয়েছে লাইনে। রনির কথায় সে ব্যাট সামান্য উঁচু করল ছুড়ে মা’রার জন্য। কিন্তু সৃজনের জন্য থেমে গেল। নিজেকে শান্ত করল। অতঃপর হেসে বলে, “আপনাদের মতো একটা অ’সভ্যকে শা’য়েস্তা করতে জুতো খরচ করে ফেলেছি। ওইযে বললাম গুণের দেমাগ আমার।”
কথাটা শুনতে পায় আকাশ। মুখটা থমথমে হয়ে যায়। সন্ধ্যা কথাটা তাকে মিন করে বলেছে বুঝতে অসুবিধা হলো না তার। রা’গ করা উচিৎ হয়ত তার। তবে রা’গল না সে। চোখ বুজে নিজেকে খুব সুন্দরভাবে সামলালো। এরপর চোখ মেলে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে নিজেকে সান্ত্বনা স্বরূপ বিড়বিড় করল,
“ইট’স ওকে।”
এদিকে সন্ধ্যার কথাটা শুনে রনি কটমট চোখে চাইল। এই মেয়ের মুখ হাত সব এতো চলে। একটা বলের বারি খাওয়ানোর পর বাকিসব ব্যবস্থা করবে।
সন্ধ্যা ব্যাট পায়ের সাথে ঠেকিয়ে রেখে পরনের ওড়না গলায় দু’বার প্যাঁচ দেয়। এরপর ব্যাট হাতে নিয়ে তার ফ্রেন্ডদের দিকে তাকায়। কিছু বোঝালো বোধয়। সাইফ আর জাবির-ও বুঝল বোধয়। হাসছে তারা সন্ধ্যার দিকে চেয়ে। সন্ধ্যাও হাসল।
লামিয়া সাফাকে নিয়ে আরাম করে মাঠের মাঝে বসে বলে, “এ্যাই জাবির, সাইফ তোরা যাহ্। আমরা আরাম করি একটু। অনেকদিন পর সন্ধ্যার ছক্কা দেখব, মজাই মজা।”
সাফার চোখেমুখে ভ’য়। লামিয়াকে হাসতে দেখে বলে, “তুই হাসছিস কেন? সন্ধ্যা বিপদে পড়েছে দেখ।”
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বলে,
“আরে সন্ধ্যার জন্য ওরা বিপদে আছে। দেখতে থাক ভীতুর ডিম।”
জাবির আর সাইফ এগিয়ে যায় সৃজনের দিকে। জাবির যেতে যেতে পিছু ফিরে লামিয়ার দিকে চেয়ে বলে, “ওই বাংলাদেশি নানি, খবরদর খিচুড়ির বাটিতে হাত লাগাবিনা। নয়তো তোকে সন্ধ্যার মতো একদম ব্রিটিশ নানির সার্টিফিকেট দিয়ে দিব বলে দিলাম।”
লামিয়া মুখ ভেঙায়। ওর সার্টিফিকেটের ভ’য়ে সে যেন ম’রে যাচ্ছে। সাইফ জাবিরকে টেনে নিয়ে যায় আর বলে, “চুপ কর বে’য়া’দ’ব। মনে হয় জীবনে খাসনি।”
জাবির কিছু বলল না। তাকালো সন্ধ্যার দিকে।
সন্ধ্যা ঘাড়ের ব্যাগ আর হাতের ঘড়ি খুলে লামিয়ার দিকে ছুড়ে মা’রলে পাশ থেকে সাফা ভ’য় পেয়ে নিচু হয়ে যায়। লামিয়া জিনিসগুলো ঠিক কেচ ধরে নেয়। সাফার দিকে চেয়ে হতাশ হলো। তার কপাল এটাই। একসময় সন্ধ্যা এমন ছিল সে ওকে টানত। এখন হয়েছে সাফা৷
সন্ধ্যা হাতে ব্যাট ধরে ব্যাট করার ভঙ্গি করে তীক্ষ্ণ চোখে দেখে নেয় সেই ছেলেটির অবস্থান, যে সৃজনকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে তার সামনে দাঁড়ানো ছেলেটির দিকে তাকায়। যে বল করবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সাইফ জাবির রিল্যাক্স মুডে সৃজনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রনি সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়ের কনফিডেন্স দেখে সে কেমন যেন ঘেমে যাচ্ছে। কি জ্বালা!
আকাশ দু’হাত প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে রেখে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যার প্রতিটি গতিবিধি লক্ষ্য করছে। আশপাশ থেকে আরও অনেকেই তাকিয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে।
তখন-ই ভার্সিটির প্রাঙ্গণে আরও তিনটি কালো গাড়ি প্রবেশ করে। একইভাবে গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ‘জ্যাক ডাল্টন’। যাকে সকলে ‘JD’ নামে চেনে। জেডি ‘সাউথ ইস্ট ইংল্যান্ড’ এর মাফিয়া কিং। তাকেও একই কারণে ভার্সিটির ভিসি এখানে ডেকেছে। তার পরনে কালো কোর্ট-প্যান্ট। তবে মুখে মাস্ক নেই। সে আকাশকে পিছন থেকে দেখেই চিনেছে৷ হাতের ইশারায় গার্ডদের এখানে থামতে বলে সে কিছুটা এগিয়ে যায়। আকাশ কোনদিকে তাকিয়ে আছে খেয়াল করে সেদিকে তাকালে চোখে পড়ে সন্ধ্যার ব্যাটিং করার ব্যাপারটি। সে চিনতে পারল সন্ধ্যাকে। দু’বছর আগেই আকাশ আর সন্ধ্যার যা কাহিনী দেখেছিল সেই হিসেবে। সন্ধ্যার জন্য আকাশ এখানে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পেরে সে কপালে দুআঙুল ঘষে একটু হেসেও ফেলল। সে এগিয়ে এসে আকাশের বা পাশে দাঁড়িয়ে যায়। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় সন্ধ্যার দিকে বল ছুড়তে দেখে।
সন্ধ্যার দিকে ছেলেটি বল ছুড়ে দেয়। ছেলেটি ইচ্ছে করে সন্ধ্যাকে আ’ঘা’ত করতে বলটি ছুড়েছে। সন্ধ্যা ব্যাপারটিতে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ায়নি। বরং সে জানতই এমনটা হবে। সন্ধ্যা ব্যাট দ্বারা খুব দক্ষ হাতে বলটি তার লক্ষ্য অনুযায়ী ছুড়ে দেয়। সবাই তাকায় সন্ধ্যার ছুড়ে দেয়া বলটির দিকে। ক’সেকেন্ডের মাথায় বলটি সেই ছেলেটির ঠিক গোপোনাঙ্গে গিয়ে লাগে। ছেলেটি সর্বশক্তি দিয়ে চিল্লিয়ে ওঠে।
সকলে হতভম্ব হয়ে যায়। জেডি কেশে ওঠে। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। কিছু হবে ভাবছিল। কিন্তু এতোটা আশা করেনি।
ওদিকে রনিসহ সকলে তাদের ফ্রেন্ডের দিকে দৌড় দেয়।
সাইফ, জাবির, লামিয়া শব্দ করে হাসে। তারা জানতো এমনটা হবে। সাফা অবাক হয়ে দেখে সন্ধ্যাকে। এদের সাথে পরিচয়টা অল্পদিনের তো, তাই এখনো অনেককিছু জানা বাকি। কিন্তু তাই বলে…মেয়েটি আর ভাবতেই পারেনা।
এদিকে সন্ধ্যা হাতের ব্যাট ছুড়ে ফেলে ছেলেটির দিকে চেয়ে হাসল। দু’হাত জমা করে দু’বার ঝাড়া দেয়ার ভঙ্গি করে সৃজনের দিকে এগোয়৷
বলের আ’ঘা’ত পেয়ে বেচারা ছেলেটি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেও এবার আর পারল না। হাত ঢিলে হয়ে আসে। সে পড়ে যেতে নেয়। কোলে থাকা সৃজন পড়ে যেতে নেয়। ভ’য় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “মাআআআআ?”
ছেলের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা দৌড় দেয় সেদিকে। সাইফ আর জাবির সৃজনকে ধরতে নেয়, তার আগেই অল্প দূরত্বে দাঁড়ানো আকাশ এগিয়ে এসে সবার আগে বা হাতে সৃজনকে কোলে তুলে নেয়। সৃজন দু’হাতে আকাশের গলা জড়িয়ে ধরে। প্রথমে ওই ছেলেটির চিৎকার এখন পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটিতে সে ভীষণ ভ’য় পেয়েছে। বাচ্চাটির শরীর কাঁপছে মৃদু।
সাইফ, জাবির স্বস্তি পায়, সৃজন পড়ে না যাওয়ায়। ওদিকে সন্ধ্যাও স্বস্তি পায় ছেলেটিকে কেউ ধরে নিয়েছে দেখতে পেয়ে৷ সন্ধ্যা দৌড় থামিয়ে বড় বড় পায়ে আকাশের সামনে এসে দাঁড়ায়। আকাশের চোখমুখ মুখ, মাস্ক আর সানগ্লাসের আড়ালে। তাই সে চিনতে পারলো না। হাঁপানোটা একটু থামলে সন্ধ্যা আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার সুরে বলে,
“আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।”
আকাশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সন্ধ্যার পানে। সন্ধ্যার মুখে ভাইয়া ডাকটি ঠিক তার পছন্দ হলো না।
সন্ধ্যা সৃজনকে নেয়ার জন্য হাত বাড়ায়। আকাশ কিছু একটা ভেবে সূক্ষ্ম হাসে। সে সৃজনকে সন্ধ্যার দিকে বাড়িয়ে না দিয়ে বা হাত ঢিলে করে দেয়। সৃজন পড়ে যেতে নেয়, আবারো চেঁচিয়ে ওঠে। সন্ধ্যা ভ’য় পেয়ে দ্রুত নিচু হয়ে সৃজনকে কোলে তুলে নেয়। সৃজন এবার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। ভ’য় পেয়েছে ভীষণ।
সন্ধ্যা সৃজনকে ধরে নিয়েছে দেখে মাস্কের ভেতর আকাশের হাসির পরিধি দীর্ঘ হয়। সন্ধ্যা সৃজনকে বুকে চেপে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। রে’গে তাকায় আকাশের দিকে। রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আপনার সাহস কি করে হয়, আমার ছেলেকে ফেলার?”
কথাটা বলতে বলতে সন্ধ্যা তার ডান হাতে আকাশের বুকে গায়ের জোরে একটা ধাক্কা দেয়। এতক্ষণ ব্যাট করা, দৌড়ানো, সৃজনকে পড়তে দেখে আগলে নেয়া সবমিলিয়ে সন্ধ্যার শরীরটাও কাঁপছে। ফলস্বরূপ আকাশকে ধাক্কা দিয়ে, সে নিজেই এক পা পিছিয়ে যায়। আকাশ বোধয় মজা পেল। দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে দাঁড়ায়। সন্ধ্যা মানল না। সে এগিয়ে এসে আকাশের কোর্ট শ’ক্ত করে ধরে ফুঁসতে ফু্ঁসতে বলে,
“আপনাকে দেখে নিব অ’সভ্য লোক।”
আকাশ কিছুই বলল না। মাস্কের আড়ালে শুধু সন্ধ্যাকে দেখে গেল। সৃজন মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশের চোখে খুব সুন্দর একটি সানগ্লাস দেখে ভেজা চোখে চেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
“মা চানকিলাচ (সানগ্লাস) নিব।”
ছেলের কথা সন্ধ্যা বুঝতে পারল। আকাশের সানগ্লাস দেখে কথাটা বলেছে বুঝলও। সন্ধ্যা আকাশের কোর্ট থেকে হাত সরিয়ে আকাশের চোখ থেকে সানগ্লাস ছিনিয়ে নেয়ার মতো করে খুলে নিয়ে উল্টো ঘুরে সামনে এগোতে এগোতে সানগ্লাসটি সৃজনের চোখে পরিয়ে দেয় আর শ’ক্ত গলায় বলে,
“সানগ্লাসটি আমার ছেলের পছন্দ হয়েছে। তাছাড়া আমার ছেলেকে ফেলে দেয়ার জরিমানা এটা।”
সন্ধ্যা সানগ্লাস খুলে নিয়ে আকাশের চোখের দিকে একবার তাকালেই হয়ত সে আকাশকে চিনতে পারত। কিন্তু তাকালো না। অ’সভ্য লোকটার সামনে আর দাঁড়াতে ইচ্ছে করেনি তার।
সৃজন পছন্দের সানগ্লাস পেয়ে ভীষণ খুশি। চোখে সানগ্লাস পরে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসে। ওদিকে সাইফ আর জাবির আরেকদিক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যাদের দিকে এগোয়। জাবির মাথায় হাত দিয়ে বলে,
“নানি তো নয়, যেন সোনায় মোড়ানো ১ হাজার কোটি আনি!”
সন্ধ্যার কথায় আর কাজে আকাশের মাঝে আহামরি ভাবান্তর বোঝা গেল না। সে কেবল চেয়ে রইল। দৃষ্টি সন্ধ্যা হাঁটু বরাবর দুলতে থাকা লম্বা বেনুনিতে। ঠোঁট বাঁকিয়ে সামান্য হেসে আওড়ায়,
“নাইস লুক!”
ততক্ষণে জেডি আকাশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আকাশের বলা কথাটি শুনতেও পেয়েছে। সে পিছন দিয়ে আকাশের কাঁধের উপর হাত রেখে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে হেসে বলে,
“পুরনো প্রেম জেগে উঠেছে এভিজান? গুড গুড। বাট রিমেম্বার দ্যট, মেয়েটি বিবাহিত প্লাস এক বাচ্চার মা।”
জেডির কথায় আকাশের চোখেমুখে বিরক্তি দেখা দেয়। মনে হলো, এই কথাটা সে শুনতে চায়না। অ’সহ্য রকম বিরক্ত লাগে এটা ভাবলেই৷ ঘাড় ফিরিয়ে জেডির দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁতে বলে, “আই নো। আমাকে মনে করাতে হবেনা।”
সৃজন মায়ের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে সামনে তাকায়। দৃষ্টি জেডির দিকে। হঠাৎ-ই শব্দ করে বলে ওঠে,
“জেলি।”
শব্দটি শুনে জেডি আর আকাশ দু’জনেই সৃজনের দিকে তাকায়। ভ্রু কুঁচকে যায় দু’জনের।
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১২
অরুণ একপ্রকার দৌড়ে সন্ধ্যার দিকে আসছিল। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে৷ সন্ধ্যা খুব রা’গ করে দেরি করলে। সৃজনকে অন্যের কাছে রেখে ভরসা পায় না। সে জেডিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সৃজনের বলা জেলি শব্দটা শুনে থেমে যায়। সৃজনের দৃষ্টি অনুসরণ করে বাদিকে ঘাড় বাঁকালে একদম তার পাশে জেডিকে দেখে অবাক হয়। মাথাটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে আকাশের চোখ দেখে বুঝল জেডির পাশে ওটা আকাশ। সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় জেনেছে জেডি আর আকাশ গতকাল বাংলাদেশে ফিরেছে। এজন্য এদের বাংলাদেশে দেখে অবাক হলো না। অবাক হলো এদের ঢাকা ভার্সিটি দেখে। তবে সে সৃজনের বলা জেলি কথাটার উত্তর দিতে জেডির ঘাড়ের উপর হাত রেখে বলে,
“জেলি শব্দটা তোকেই বলেছে। জেডি শব্দটা ওর জন্য কঠিন। নিজের নামের এতো সুন্দর রূপ কেমন লাগলো বাবু? ক্রেডিট কিন্তু আমার।”
