Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২০

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২০

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২০
DRM Shohag

“হঠাৎ এতো আর্জেন্ট ডাকলি যে?”
জেডির কথায় আকাশের মাঝে তেমন কোনো হেলদোল দেখা গেল না। তার মুখ থমথমে। মুখে রা নেই। একটি ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আছে সে। দৃষ্টি সন্ধ্যার পর পর ধীরনীতে নেমে আসা আন্ধারের দূর অজানায়। নদীর উপর দন্ডায়মান ব্রিজ। শাঁইশাঁই করে ঠান্ডা বাতাস ভেসে এসে আকাশের গা ছুঁয়ে দেয়। আকাশকে চুপ দেখে জেডি এগিয়ে এসে আকাশের পাশে দাঁড়ায়। আকাশকে এতো নিরব দেখে জেডি আকাশের কাঁধে হাত রেখে বলে,
“ঠিক আছিস?”

আকাশ ঘাড় বাঁকিয়ে জেডির দিকে তাকায়। দৃষ্টিজোড়া বড্ড অশান্ত তবে আকাশ একদম শান্ত। চোখদুটোয় হালকা লালিত ভাব৷ ডান হাতে ধরে রাখা অধীরের হুডি জেডির দিকে বাড়িয়ে দেয়। আকাশের বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে চেয়ে জেডির ভ্রু কুঁচকে যায়। আকাশের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে হুডি’টি তার হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে আকাশের দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায়। আকাশ মৃদুস্বরে বলে,
“এই হুডির মালিককে আমার লাগবে। যেখান থেকে পারিস খুঁজে এনে দে।”
জেডি বেশ কিছুক্ষণ আকাশের দিকে চেয়ে রইল। এরপর হঠাৎ-ই ফিক করে হেসে দেয়। হাসতে হাসতে হেলে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। বা হাতে ব্রিজের রেলিং আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। আকাশের কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে ওঠে। জেডির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সোজাদিকে দূর অজানায় রাখে।
জেডি বহুক’ষ্টে নিজেকে সামলায়। হাসি আটকে বলে,

“দ্য গ্যাট এভি, যে আমার ছায়াটা পর্যন্ত মাড়াতো না, সে আমার কাছে হেল্প চাইছে? ভাবা যায়?”
আকাশ বিরক্ত হয়ে জেডির হাত থেকে হুডি’টি কেড়ে নিতে গেলে জেডি তার হাত বা দিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। ডান হাতে আকাশের গাল টেনে হেসে বলে,
“সো সুইট অফ ইউ, মাই এভিজান। এতো রা’গ করলে চলে? যখন আমার এভিজান নিজে থেকে আমার কাছে হেল্প চাইছে, আমি কি তাকে হেল্প না করে পারি?”
আকাশ বা হাতে জেডির হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়। জায়গাটি প্রস্থান করার উদ্দেশ্যে উল্টোপথে এগোলে জেডি দ্রুত উল্টোদিকে ফিরে তাকায়। আকাশের দিকে চেয়ে মলিন হেসে বলে,
“এভি, তোর শুধু প্রয়োজনের সময়ই আমায় কেন মনে পড়ে?”
জেডির কথায় আকাশের পা থেমে যায়৷ বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে শক্ত গলায় বলে,

“যার যেমন কর্ম, তার তেমন ফল।”
জেডি সাথে সাথে বলে,
“বিলিভ মি এভি, আমি তোর বাবাকে কখনো মা’র’তে চাইনি।”
আকাশ ছোট করে করে বলে, “জানি।”
জেডি অবাক হয়ে বলে,
“জানিস? তাহলে তুই আমার সাথে….
আকাশ জেডির দিকে ফিরে জেডিকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে শক্ত গলায় বলে,
“প্রয়োজন শেষে কেউ একজন আমাকে পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিল। আমার প্রয়োজন এতোটাই শেষ হয়ে গিয়েছিল যে, তার এই বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার সময়টুকু হয়নি। আমি ম’রে গেছি নাকি বেঁচে আছি সেই খোঁজটা পর্যন্ত নেয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি।”

আকাশ থেমে যায়। কণ্ঠ কাঁপছে তার। জেডি ঢোক গিলল। ঝাপসা দৃষ্টি আকাশের দিকে। ধরা গলায় বলে,
“তুই-ও তো আমার একটা খোঁজ নিতে পারতি এভি।”
আকাশ বিদ্রূপ স্বরে বলে,
“ততদিনে আমার প্রিয়জনের তালিকা থেকে জ্যাক কে’টে গিয়েছিল।”
জেডি ঢোক গিলে বলে,
“আর কখনো সেই তালিকায় অ্যাড হতে পারবো না?”
আকাশের শক্ত কণ্ঠ, “নো।”
জেডির মুখ আরও মলিন হয়। আকাশ আর এখানে দাঁড়ালো না। দ্রুতপায়ে জায়গাটি প্রস্থানের জন্য পা বাড়ায়। জেডি আকাশের দিকে ঝাপসা চোখে চেয়ে বিড়বিড় করে, “অথচ কথা ছিল, আমার প্রিয়জনের তালিকা থেকে তোর মুছে যাওয়ার।”

ঘড়ির কাটা রাত ৮ টার ঘরে।
আকাশ সৃজনকে শহরের মাঝে তার একটি দেতলা বাড়িতে রেখে গিয়েছিল তার কাজ সারতে। যদিও এই বাড়িটি সেই জঙ্গলের মাঝে বাড়িটির মতো প্রায়ভেট নয়, তবে এখানেও যথেষ্ট সিকিউরিটি ছিল। আকাশ তার সব কাজ একটু গুছিয়ে, সবশেষে জেডির সাথে দেখা করে কিছুক্ষণ আগে আকাশ তার সেই বাড়িটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু সে সেই বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারেনি। কারণ তার গার্ডদের জায়গায় সে অন্যলোকদের দেখতে পায়। যাদের পরনে অন্যপোষাক। আর বাড়ির ভেতর থেকে সৃজনের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। আকাশ পায়ের নিচের জমিন কেঁপে ওঠে। মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, কয়েক সেকেন্ডের মাথায় বাড়ির ভেতর থেকে সৃজনের ডেড বডি বের হয়ে আসবে। কারণ ততক্ষণে সবকিছু আকাশের হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আকাশকে হারিয়ে যাওয়া এক অসহায় পথিকের মতো লাগে।

কিন্তু হঠাৎ-ই সেখানে জেডির আগমণ ঘটে। পথহারা পথিক প্রাস্তায় প্রিয় কারো খোঁজ পেলে যেমন বুকভরা সাহস পায়। ঠিক তেমনি আকাশ নিজের পাশে জেডিকে দেখে বুকভরে সাহস যোগায়। মুখে প্রিয়জনের তালিকা থেকে অস্বীকার করলেও অন্তর সে কথা কতটুকু মানে? মানলে কি আর এককালের প্রিয় বন্ধুর প্রতি এমন অনুভূতি হতো?
আকাশ সেসব অনুভূতি তোয়াক্কা না করে একাই তার দক্ষহাতে একের পর এক তীব্র বর্ষণের ন্যায় গু’লি চালায় এখানে দন্ডায়মান গার্ড রূপি বাইরের প্রতিটি লোকের উপর। তার কদমে মিশে অসম্ভব দৃঢ়তা আর চোখেমুখে অজস্র রা’গ। বাড়ির ভেতর থেকে এখনো কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। যে আওয়াজ আকাশের কানে সবচেয়ে বেশি অপছন্দের লাগলো। অবাক করার বিষয়, একটি লোক-ও আকাশের দিকে পি’স্ত’ল তাক করেনি। উল্টে তাদের ছেড়ে দেয়ার জন্য রিকুয়েষ্ট করেছে কিন্তু আকাশের কানে কারো আহাজারি, কারো আকুতি ঢোকেনি৷ বরং কানে কাঁটার ন্যায় ফুটছে তার ভীষণ অপছন্দের সুর ‘সৃজনের কান্নার আওয়াজ’।

এতোক্ষণে আকাশ প্রায় দশ মিটারের মতো সামনে এগিয়েছে। এসে দাঁড়িয়েছে বাড়ির দরজার সামনে। পিছনে জেডি অবাকচোখে আকাশকে দেখছে। আকাশকে খু’ন করতে দেখা নতুন, এমন নয়। কিন্তু এভাবে টানা একজনের পর একজনের লা’শ ফেলে দেয়া! জেডির কাছে বিষয়টি চরম বিস্ময়ের হয়ে দাঁড়িয়েছে। আকাশ কার জন্য এতোটা ক্ষেপেছে? কেন? ওই যে ভেতর থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসছে, তার জন্য? কিন্তু কেন? জেডি খেয়াল করল আকাশ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে। জেডি দাঁড়ালো না। সে নিজেও দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার জন্য। এটুকু জায়গায় প্রায় শ’খানেক লোকের নিথর দেহ পড়ে আছে। যেগুলোকে মাড়িয়ে জেডি দ্রুত পা চালালো।

আকাশ তার বাড়িতে প্রবেশ করার পর চেখে পড়ে, বিশাল ডাইনিং স্পেসের মাঝ বরাবর দু’জন লোক এমাথা-ওমাথা করে দাঁড়িয়ে সৃজনকে খেলনার মতো করে খেলছে। এই ধরনের কাজকে আকাশ সৃজনের কাছে খেলা হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, যাতে তার প্রতি সৃজনের যে ভীতি তৈরী হয়েছিল সেটা যেন কে’টে যায়। যাতে আকাশ সফল হয়েছিল-ও। কিন্তু সৃজন এতো দ্রুত এতে খাপ খাওয়াতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, লোকগুলো সৃজনের সাথে মোটেও ভালো আচরণ করেনি, যার ফলে সৃজন প্রচন্ড ভ’য় পাচ্ছে, সাথে অনেকক্ষণ যাবৎ এমন করায় সে বেশ ব্য’থাও পাচ্ছে। আকাশ ভস্ম করে দেয়া দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার সামনের দিকে দাঁড়ানো লোকটির দিকে।
সৃজন যখন আকাশের থেকে উল্টেদিকে ফিরে থাকা লোকটির হাতে আসে, তখনই আকাশ তার বাপাশের টেবিলের উপর রাখা ফলের ঝুড়ির মাঝ থেকে একটি চা’কু বা হাতে তুলে নিয়ে লোকটির ডান চোখ বরাবর একদম গেঁথে দেয়। লোকটি চিৎকার করে ওঠে। ডান হাতে চোখের ভাঁজে গাঁথা চা’কুটি কোনোরকমে আঁকড়ে ধরে। ওদিকে সৃজনকে ধরে রাখা লোকটি আহত লোকটির পানে ভীত চোখে তাকায়। সৃজনের কান্না থেমে যায়। সামনে দাঁড়ানো লোকটির দিকে অবুঝ নয়নে চেয়ে থাকে।
এদিকে আকাশ বড় বড় পা ফেলে চোখের পলকে লোকটির সামনে এসে বা হাতে লোকটির গলা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,

“ওকে টাচ করার সাহস কে দিয়েছে তোদের?”
কথাটা বলতে বলতে আকাশ ডান হাতে লোকটির চোখে গেঁথে যাওয়া চা’কুটি টেনে বের করে, একদম গলার মাঝ বরাবর ঢুকিয়ে দেয়। লোকটির চিৎকার চারিদিকে ছুটে বেড়ায়।
আকাশের দু’চোখে তখনো আ’গু’ন জ্ব’ল’ছে।
হঠাৎ-ই পিছন থেকে সৃজনের ভাঙা গলা ভেসে আসে, “ওকে কি কলচ?”
সৃজনের কণ্ঠ পেতেই আকাশ লোকটিকে ধাক্কা মে’রে সরিয়ে দিয়ে বা পায়ে লোকটির বুক বরাবর একটি জোরেসোরে লাথি মারে। মৃ’তপ্রায় লোকটি কয়েক হাত দূরত্বে গিয়ে পড়ে যায়। এতোক্ষণে হয়তো মা’রা গিয়েছে।
আকাশ ওদিকে তাকায় না। সে তার দিক ফিরিয়ে সৃজনের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ আগে যে চোখে আ’গু’ন জ্ব’ল’ছিল সেই চোখ দু’টো এখন একেবারে শীতল। নিবদ্ধ ছোট্ট কান্নাভেজা সৃজনের পানে।

ওদিকে যার কোলে সৃজন ছিল, সেই লোক অনেক আগেই সৃজনকে মেঝেতে নামিয়ে দিয়েছে। তার পার্টনারের অবস্থা দেখে সে থরথর করে কাঁপছে। পালানোর জন্য উল্টোদিকে ঘুরতে নেয়, তার আগেই জেডি আকাশের পাশে এসে লোকটির কপাল বরাবর পরপর তিনটে সু’ট করে দেয়। জেডির চোখেমুখে অজস্র ক্রোধ।
গু’লির শব্দ পেয়ে সৃজন ভ’য়ে কেঁপে ওঠে৷ কুঁকড়ে যায় বাচ্চা ছেলেটি। ব্যাপারটি আকাশ খেয়াল করতেই দ্রুত সৃজনের দিকে এগিয়ে আসতে নেয়, কিন্তু সৃজন দু’হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
“কবলদাল তুমি আমাল কাচে আচবানা, বুচ্চো বাতাচ বাবু? আমাকি ইকা ইকা লেকে চলি যায় কালি। পুচা বাতাচ বাবু কুতাকাল।”

সৃজনের কথা শুনে আকাশের পা থেমে যায়। অসহায় দৃষ্টি সৃজনের পানিতে টইটুম্বুর সোনালি চোখজোড়ায়। আকাশ ঢোক গিলে বলে, “স্যরি!”
সৃজন স্যরি শব্দটার মানে বোঝে। কেউ ভুল করলে তখন সে স্যরি বলে। কিন্তু সে আকাশের বলা এইটুকু শব্দতে ভিজল না। আকাশ সৃজনকে চুপ দেখে আবারও সৃজনের দিকে এগোতে নিলে সৃজন চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। আকাশ দ্রুত পা বাড়াতে নেয়, তার আগেই সৃজন তার শরীর শ’ক্ত করে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলে,
“তুমি আমাল কাচে আচবানা বুলচি। আমি মা কাচে যাবু। তুমি আমাকে মা কাচে নিয়ি যাও না। কালি আমাকে লেকে চলি যাও। ও লোক কুব পুচা। কালি আমাকি মাল দিচে। তুমি আচোনি। আমি একানে এত্তু ব’য় পেয়েচিলাম।
শেষ কথাটা বলতে বলতে সৃজন তার ডান হাত বুকের কাছে রেখে ইশারায় দেখায়৷ এরপর বলে,
পুচা বাতাচ বাবু কুতাকাল।”

সৃজনের কথা শুনে আকাশের বুকে চিনচিন ব্য’থা হয়। বাচ্চাটির প্রতিটি কথায় কত অভিমান মিশে আছে। ঠিক যেমন মায়ের থেকে কাঙ্ক্ষিত কিছু না পেলে মায়ের উপর অভিমান করে এতো এতো অভিযোগ দেয়। তেমনি যেন আকাশের প্রতিও ছোট্ট সৃজন সেই একই অনুভূতি প্রকাশ করল। ছোট্ট সৃজন বিপদে পড়লে আকাশকে স্মরণ করে কথাটা ভেবে আকাশের অদ্ভুদ এক অনুভূতি হয়। সে কেমন করে যেন সৃজনের দিকে চেয়ে থাকে। সৃজন তার ছোট্ট ছোট্ট দু’হাতে চোখ মুছে আর আদোআদো ভাঙা গলায় বলে,
“মা-ও আল আচে না৷ চবাই কালি পুচা অয়ে যাচ্চে।”

সৃজনের কথাটা শুনে আকাশ চোখ বুজল। দু’টো শুকনো ঢোক গিলল বেশ কসরত করে। দু’বার বড় করে শ্বাস টেনে নিজেকে স্বাভাবিক করল। এরপর আকাশ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই হাঁটুগেড়ে বসে সৃজন বরাবর বসে। তবে তাদের মাঝে যথেষ্ট দূরত্ব। আকাশকে নিচু হতে দেখে সৃজন আবারো চেঁচিয়ে বলে,
“তুমি আবাল আমাল কাচে আচ্চো? তোমাকে মাল দিব।”
কথাটা বলতে বলতে সৃজন ডান হাত তুলে আকাশকে মা’রা’র ভঙ্গি করে। আকাশ মৃদুস্বরে বলে,
“তুমি আমার উপর রা’গ করেছ আব্বু?”
সৃজন উপরনিচ মাথা নাড়িয়ে বলে,
“হু হু, তোমাল উপল কুব লাগ কলচি আমি।”

আকাশ মৃদু হাসে। দু’হাত তুলে আকাশ তার দু’কান ধরে অনুতপ্ত স্বরে বলে, “অ্যা’ম স্যরি আব্বু!”
আকাশের এহেন কাজ আর কথায় সৃজন বোধয় একটু নরম হলো। তার মনে পড়ল, সে মায়ের উপর রা’গ করলে, তার মা-ও তাকে এভাবে স্যরি বলত। সৃজনের অবাক চোখে তাকায় আকাশকে কান ধরতে দেখে। তা কেন যেন হাসি পেলে। চোখে জল নিয়েই বাচ্চা ছেলেটি হেসে দিয়ে বলে,
“বাতাচ বাবু কান দুলচে। কান দুলচে।”

কথাটা বলে আবারো হাসতে লাগলো। সৃজনের হাসিতে আকাশ বিন্দুমাত্র ল’জ্জা পেল না, আর না তো সে তার কান থেকে হাত সরালো। উল্টে সৃজনের হাসিতে আকাশের মুখে প্রশান্তিময় এক চিলতে হাসি ফুটল।
আকাশের থেকে সামান্য পিছনে দাঁড়ানো জেডি বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। এটা আকাশ? সে তো আকাশকে টোটালি চিনতে পারছে না। প্রথমত, আকাশ একটা বাচ্চা ছেলের জন্য ঠিক কতগুলো মানুষকে টানা নৃশংসভাবে হ’ত্যা করল। দ্বিতীয়ত, সেই মাফিয়া আকাশ এই বাচ্চাটার সামনে বসে নিজেকে পুরো যোকার বানিয়ে ফেললো৷ জেডির এই মুহূর্তে মনে হলো, সৃজনের চেয়ে আকাশ আরও ছোট। সে কেবল বাকহারা হয়ে আকাশকে দেখছে।

এদিকে আকাশ হাস্যজ্জ্বল সৃজনের দিকে চেয়ে আবারো বলে,
“তোমাকে অনেকগুলো চকলেট আর জেলি কিনে দিব।”
সৃজনের চোখমুখ চকচক করে ওঠে। সে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“সুত্তি বুলচ?”
আকাশ ছোট করে বলে, “হুম সত্যি।
কথাটা বলে আকাশ তার দু’কান থেকে হাত নামিয়ে সৃজনের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
এবার এসো।”
সৃজন মানলো। সে এক দৌড়ে এসে আকাশের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দু’হাতে আকাশের গলা জড়িয়ে ধরে। আকাশ তার বুকে আগলে নেয় ছোট্ট সৃজনকে। প্রশান্তির শ্বাস নেয় বুক ভরে। সৃজনের মাথায় চুমু খায় দু’টো। এরপর সৃজনকে কোলে নিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। উল্টো ঘুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে সামনে জেডিকে দেখে আকাশের পা থেমে যায়।

জেডি এখনো আকাশের দিকে বিস্মিত নয়নে চেয়ে আছে। তার ভাবনায় চলছে বিদেশ থেকে ফেরার পর গত কয়েকদিন আকাশের কার্যকলাপ নিয়ে। আকাশের যেকোনো কাজেই যেন এই বাচ্চা অ্যাড হয়ে যাচ্ছে। একটু আগে তো সে নিজের চোখেই দেখল আকাশের বিহেভিয়ার। অতঃপর জেডি ভ্রু কুঁচকে বলে,
“শুধুমাত্র এই বাচ্চা ছেলেটির জন্য আজকেই তুই শ’খানেক খু’ন করেছিস এভি। বাকিদিন তো বাদ-ই দিলাম।”
আকাশ থমথমে মুখে তাকায় জেডির পানে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। অনেক কিছু ভাবলো মনে হলো। এরপর গলা ঝেড়ে বলে,

“আরও হাজারখানেক খু’ন করতে পারবো শুধুমাত্র এই বাচ্চার জন্য। তাছাড়া আমি ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন সেদিনই ত্যাগ করেছি, যেদিন জেনেছি আমার বাচ্চাকে লা’শ বানানোর জন্য হাজারটা খু’নি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। আমি ভালো মানুষ হলে আমার বাচ্চা এতোদিনে খু’ন হয়ে যেত। তাই নিজেই খু’নি হয়ে গেলাম। আমি ভালো মানুষ হতে না পারলেও ভালো বাবা হতে একবিন্দু কার্পণ্য করিনি। তবে প্রশংসা কুড়াতে ব্যর্থ হয়েছি।”
কথাটা বলে আকাশ থামলো। চোখেমুখসহ, কণ্ঠে তীব্র অসহায়ত্বের ছাপ। তবে তা বেশিক্ষণ চেহারায় স্থায়ী হতে দিল না। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বিরক্তিসূচক একটি শব্দ করল আকাশ। কথাগুলো বলে ফেলার কারণে বড্ড বিরক্ত হলো আকাশ৷ সে জেডিকে পাস করে আবারো হাঁটতে শুরু করে। সৃজন জেডির দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে,
“অলুণ বলিচে, ও জেলি।”

সৃজনের কথা জেডি আর আকাশের কানে গেলে, তারা কোনো রিয়েকশন দিল না।
জেডি তো থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মস্তিষ্ক অকেজ লাগছে। আকাশ এসব কি বলে গেল? ওর বাচ্চা মানে? আর ওর বাচ্চার জন্য খু’নি প্রস্তুত করে রেখেছে। এসবের মানেই বা কি? জেডি দ্রুত উল্টোদিকে ফিরে বিস্ময় কণ্ঠে আওড়ায়,
“এমনভাবে বলছিস যেন বাচ্চাটি তোর।”
আকাশ পায়ের গতি থামায় না। তবে শব্দ করে হেসে ওঠে। আকাশকে হাসতে দেখে সৃজন অবুঝ গলায় বলে, “তুমি হাসচ কেনু?”
আকাশ সৃজনের দিকে তাকায়। হাসি থেমে যায় তার। সৃজনের দিকে চেয়ে জেডির উদ্দেশ্যে বলে,
“আর ক’দিন পর সৃজনের মাকে বিয়ে করব, সে হিসেবে ও তো আমার বাচ্চা-ই হলো। সিম্পল!”
জেডি কনফিউজড হয়ে গেল। কথাটা আকাশের বলা কথার সাথে সামান্য মিললো তবে পুরোপুরি নয়। কিন্তু জেডি বেশ কনফিউজড হয়েছে৷ আকাশ হাঁটতে হাঁটতে একবার ঘাড় বাঁকিয়ে জেডির দিকে তাকালো। ঠোঁট বাঁকালো সামান্য। মানুষকে কনফিউশানে ফেলতে ইদানীং বেশ ভালোই লাগে।

একটি অন্ধকার ঘরের কোণায় বসে আছে অধীর। মাঝে অনেকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে অধীরের পার্সোনাল ডক্টর। যার কপালে অসংখ্য ভাঁজ। কারণ আছে অবশ্যই৷ সন্ধ্যার আগে আগে অধীর সৌম্য’র হাতে একটা গু’লি করেছে। তার জানা মতে, অধীর সৌম্য’র শুধু হাতে নয়, বুকে গু’লি করার ইচ্ছা নিজের মাঝে পোষণ করে। কিন্তু আজ দেখছে, অধীর সৌম্য’র সামান্য হাতে গু’লি করার পর থেকেই কেমন যেন নিরব হয়ে গিয়েছে৷ খবরও নিয়েছে সৌম্য’র অবস্থার ব্যাপারে। এমনকি তাকে এখানে ডেকেছেই সৌম্য’র চিকিৎসা করার জন্য। অধীরের প্ল্যান ছিল, প্রয়োজন হলে অধীর ডক্টরকে সৌম্য’র কাছে নিয়ে গিয়ে সৌম্য’র চিকিৎসা করাবে৷ কিন্তু তার আগেই খবর পেয়েছে সৌম্য’র চিকিৎসা করানো হয়েছে। এজন্য তাকে আর প্রয়েজন হয়নি। কিন্তু ভদ্রলোক অবাক হচ্ছে শ’ত্রুর প্রতি অধীরের এমন কনসার্ন দেখে। সে নিজেকে দমাতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করে,

“সৌম্যকে আ’ঘা’ত করতে আপনার অনেক ক’ষ্ট হয় তাই না?”
লোকটির কথায় অধীরের চোখেমুখে পূর্বের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রেখেছে ছেলেটা। ওভাবেই বেঁধে আসা গলায় বলে,
“হয় তো! একসময়ের ছোট ভাই যে আমার! কিন্তু ও আমাকে ভীষণ ক’ষ্ট দিয়েছে, আমার প্রাণকে কে’ড়ে নিয়েছে আমার থেকে। শুধু ওর পায়ে ধরা বাকি ছিল, সেটাও করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও আমাকে ফিরিয়ে দিল। আর তারপর আমার প্রাণকে দিয়ে দিল আরেকজনকে।
ছাড়বো না ওকে আমি। ছাড়বো না।”
লাস্ট কথাটায় তীব্র ক্রোধ ফুটে ওঠে। ধীরে ধীরে শান্ত হয় অধীর। চোখের পর্দায় কিছু স্মৃতি ভেসে ওঠে,
‘সৌম্য থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরে, হাতে একটি পাতিল আর বরশি নিয়ে দৌড়ে এসে বলে, “অধীর ভাইয়া মাছ ধরতে যাবেন?”

অধীরের পরনে সাহেবদের মতো শার্ট, প্যান্ট। দেখে বোঝা যায়, সে শহরের ছেলে। গ্রামে ঘুরতে এসেছে। সৌম্য’র থেকে ক’বছরের বড় হবে। অধীর আফসোস করে বলে,
“আমি তো মাছ ধরতে পারিনা সৌম্য। তাছাড়া এটা মেবি বোরিং কাজ। আমার তো ক্রিকেট খেলতে ভালো লাগে। খেলবে?”
সৌম্য হেসে বলে,
“ক্রিকেট আরেকদিন খেলব। মাছ ধরতে যে মজা, এটা আপনি অন্যকোনো কাজে খুঁজে পাবেন না। মায়ের হাতে কত মার খেয়েছি। তবুও এটা ছাড়িনা। বুঝেন তাহলে! আসেন আজ আপনাকে মাছ ধরা শিখাই।”
কথাটা বলতে বলতে সৌম্য অধীরের হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় পুকুরের দিকে। অধীর বলে, “সন্ধ্যাকেও ডেকে নাও।”

“মাছ দেখার জন্য বোনু পুকুড় পাড়েই বসে আছে।”
কথাটা শুনে অধীরের মুখ উজ্জ্বল হয়। এবার সে আগের চেয়েও জোরে পা চালিয়ে বলে,
“আচ্ছা দ্রুত চলো। লেট হচ্ছে তো!”
কিছুদূর যেতেই সৌম্য ইটের সাথে বেঁধে উল্টে পড়ে যায়। সৌম্য’র পায়ের সাথে বেঁধে অধীরও উল্টে পড়ে যায়। হঠাৎ কি হলো কেউ বুঝল না। অধীর, সৌম্য দু’জনেই দ্রুত উঠে বসে। অধীর ডান হাতে ব্য’থা পেয়ে বা হাতে ডান হাত আঁকড়ে ধরে। সৌম্য’র দিকে চেয়ে বলে,
“সৌম্য তুমি কি অনেক ব্য’থা পেয়েছ?”

সৌম্য পায়ে বেশ ভালোই ব্য’থা পেয়েছে। কিন্তু সে ওসব গায়ে না মেখে হেসে বলে, “একটু ব্য’থা পাইছি। কিন্তু আমার গায়ে এসব লাগে না। আপনার হাতে কি হইছে অধীর ভাইয়া? দেখি?”
কথাটা বলতে বলতে অধীরের ডান হাত সৌম্য তার দু’হাতের মাঝে নিয়ে দেখল, অধীরের একটি আঙুল থেকে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সৌম্য বিচলিত কণ্ঠে বলে, “ইয়া আল্লাহ্! আপনার তো হাত কে’টে গেছে অধীর ভাইয়া! র’ক্ত বেরোচ্ছে। দুইমিনিট বসুন। আমি এক্ষুনি আসছি।”
এটুকু বলেই সৌম্য তার পায়ের ব্য’থা তোয়াক্কা না করে এক দৌড়ে জঙ্গলের দিকে ছুটল। অধীর ডাক দেয়ার সুযোগ টুকুও পেল না। এক মিনিটের মাথায় সৌম্য আবারও দৌড়ে এসে অধীরের পাশে বসে। মুখের ভিতর থেকে চিবানো ঘাস বের করলে অধীর মুখ কুঁচকে বলে,

“এসব কি করছ সৌম্য?”
সৌম্য তার মুখের চিবানো ঘাস অধীরের কা’টা জায়গায় লাগিয়ে দিতে দিতে বলে,
“এটা ওষুধের মতো কাজ করে। দেখবেন একটু পরেই আপনার র’ক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। এটা আমাদের গ্রামের হাতুড়ে চিকিৎসা।”
অধীর চুপ করে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পর সে খেয়াল করে দেখে, সত্যি সত্যিই তার র’ক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বেখেয়ালে অধীরের হাত সৌম্য’র পায়ে লাগলে সৌম্য মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে। অধীর অনুতপ্ত স্বরে বলে,
“স্যরি স্যরি! তুমি কি পায়ে অনেক ব্য’থা পেয়েছ সৌম্য?”
সৌম্য হেসে বলে,

“না না। ওই একটু। তেমন কিছু না।”
অধীর ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তুমি পায়ে বেশ ভালোই ব্য’থা পেয়েছ, আমি বুঝেছি। তবুও এভাবে দৌড়ে গেলে কেন?”
ছোট সৌম্য সহজ কথায় উত্তর দেয়,
“আমি আপনাকে আমার বড় ভাই মানি। আপনি অসুস্থ হইছেন না? তাই আগে আপনাকে সুস্থ করলাম।”

সৌম্য’র বলা শেষ কথাটা বারবার কানে বাজে অধীরের। সেই সৌম্য, যে একসময় তাকে বড় ভাই মানতো। তাকে কতশত কথা দিয়েছিল। সৌম্য তাকে দেয়া সব কথা ভুলে গেছে। তার প্রাণকে কে’ড়ে নিয়েছে তার থেকে। কথাগুলো ভেবে অধীরের বন্ধ ডান চোখের কোণ ঘেষে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে।

ঘড়ির কাঁটা রাত ১০ টার ঘরে। সৌম্য তার বাড়ির কাছাকাছি একটি ফাঁকা রাস্তার পাশে বসে আছে। বিকালে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, তখন হাতে গু’লি লাগলো। সব বাজার পড়ে গেল। এরপর থেকে সৌম্য আর বাড়ি ফেরেনি। বাড়ি গিয়ে ইরাবতীকে কি রাঁধতে বলবে সেটাই ভাবছে। তার ইরাবতী তো এখন একা নয়। তার মাঝে আরেকটি ছোট্ট প্রাণ আছে। কিন্তু সৌম্য তাদের খেয়াল রাখতে পারছে না। তার তো পকেট ভর্তি তো দূর, পকেটের এক কোণায়ও টাকা নেই যেটা দিয়ে তার ইরাবতীর পেট ভরাবে। বিয়ের আগে বোনুকে নিয়ে এভাবে খাবারের আশায় বসে বসে কতশত রাত পার করতো। আর এখন তার ইরাবতীকে নিয়েও একই জীবন। আল্লাহ তাকে বেছে বেছে এক বিচিত্র ভাগ্য নিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিল। যে ভাগ্যে সুখের দেখা মেলে না। কথাগুলো ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেললে।
ডান হাতে ব্যান্ডেজের দিকে একবার তাকালো সৌম্য। সে যেখানে গু’লি খেয়েছিল সেখানে কোথা থেকে যেন নিয়াজ ভাইয়া চলে আসে। এরপর নিয়াজ একপ্রকার জোর করেই তাকে হসপিটাল নিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে গু’লি বের করে দেয়। সৌম্যকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চাইলে সৌম্য আসেনি নিয়াজের গাড়িতে। অনেকটা পথ। সে হেঁটে হেঁটে এতোদূর এসে এই রাস্তার পাশে বসে আছে। বাড়ির পথে দৃষ্টি দিলেই মনে পড়ছে সেই ভাবনা৷ যে ভাবনায় ছিল, সে তার বাড়ি গিয়েই বলবে,

‘ইরাবতী, আজ তোমার পছন্দের খাবার রান্না করব আমি। তুমি তৃপ্তি করে খাবে, কেমন?’
কিন্তু কথাগুলো বলার জন্য আর তেমন সিচুয়েশন থাকেনি। সেসব খাবার এক রাস্তায় পড়ে অ’খাদ্যে পরিণত হয়েছে। আজও ইরাবতীকে সেই আলু সিদ্ধ দিয়ে মোটা চালের ভাত খেতে হবে। সৌম্য’র কেন যেন দমবন্ধ লাগলো। মলিন মুখে চেয়ে রইল দূর অজানায়।
সৌম্য’র পকেটে ফোন ভাইব্রেট হয়। ইতোমধ্যে ইরা বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছে। সৌম্য ধরে বলেছে, ‘সে ব্যস্ত আছে, ফিরতে লেট হবে।’
সৌম্য ভাবে এবারও ইরা কল করেছে৷ সে পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল তাকে সন্ধ্যা কল করেছে৷ সৌম্য’র কাপালে ভাঁজ পড়ে। সে নিয়াজকে বলোছিল, তার হাতে গু’লি লাগার ব্যাপারটি যেন সন্ধ্যাকে না জানানো হয়। নিয়াজ তাকে বলেছে, চিন্তা না করতে৷ সে বলবেনা। সৌম্য এসব চিন্তা রেখে কল রিসিভ করে কানে ধরে। ওপাশ থেকে সন্ধ্যা বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“ভাইয়া তোমার সাথে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে আমার।”
সৌম্য’র মনে হলো, সন্ধ্যার গলা বসে গেছে। সে ভ্রু কুঁচকে বলে,
“হ্যাঁ বল। কিন্তু তোর গলা এরকম শোনাচ্ছে কেন বোনু? তুই ঠিক আছিস তো?”
সন্ধ্যা চুপ থাকলো। আকাশ চলে যাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যে তার কাঁদতে কাঁদতেই কে’টে গেছে। সে কেন কেঁদেছে জানে না। কিন্তু তার মনে হচ্ছে আকাশের সব মনে পড়েছে। আকাশের কার্যকলাপ তো তাই বলে দেয়। কিন্তু মাঝে মাঝে আবার আকাশ সব ভুলে গেছে এমন বিহেব কেন করে, সেটাও বুঝে পায় না। অর্থাৎ সন্ধ্যা কনফিউজড। আপাতত সন্ধ্যা এসব ভাবনা চাপা দিল। তার সাথে সেই অধীরের মতো লোকটির সাক্ষাৎ হওয়ার ব্যাপারটি হঠাৎ মাথায় আসতেই সৌম্যকে কল করেছে এ নিয়ে কিছু বলার জন্য। অতঃপর সন্ধ্যা নিজেকে সামলে বলে,
“তেমন কিছু না ভাইয়া। একটু স্বর্দি লেগেছে। এসব বাদ দাও। তুমি আমাকে এটা বলো তো, অধীর ভাইয়া কি সত্যিই মা’রা গেছে ভাইয়া?”

এতোগুলো বছর পর সন্ধ্যার মুখে অধীর নামটা শুনে সৌম্য কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসলো। বুকে চিনচিন ব্য’থা শুরু হলো। যার পরিমাণ ক্রমশ বাড়তে লাগলো। সৌম্যকে চুপ দেখে সন্ধ্যা ডাকে, “ভাইয়া?”
সৌম্য ঢোক গিলল। কথা বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। সন্ধ্যা আরও দু’বার ডাকলো। সৌম্যকে নিরব হয়ে যেতে দেখে সন্ধ্যা একটুও অবাক হলো না। অধীর ভাইয়া তার আর তার সৌম্য ভাইয়ার জীবনের অনেক বড় ইমোশোন। তবে সৌম্য’র ক্ষেত্রে সেটা অনেকটাই বেশি, সন্ধ্যা এটা জানে।
সৌম্য নিজেকে সামলে থেমে থেমে বলে, “অধীর ভাইয়া ম’রে গেছে রে বোনু। সেই কবেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু যাওয়ার আগে কতো ভালোবাসা দিয়ে গেছে আমাদের! মা নেই ভাবলে যতটা ক’ষ্ট হয়, ততটাই ক’ষ্ট হয় অধীর ভাইয়া নেই ভাবলে।”

কথাগুলো বলতে বলতে সৌম্য’র গলা বেঁধে আসে। সন্ধ্যার চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে। সে তো অতটাও বড় ছিল না। তবুও অধীর ভাইয়ার জন্য অনেক কেঁদেছিল। আর তার সৌম্য ভাইয়া! অধীর ভাইয়ার মৃ’ত্যুর সংবাদ পেয়ে সে যে কত কেঁদেছিল সে কথা তাদের গ্রামের প্রতিটি মানুষ-ই হয়ত বলতে পারবে। ছোট্ট সন্ধ্যা প্রথমবার তার ভাইকে ওভাবে কাঁদতে দেখে এক পর্যায়ে নিজেই কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল। অবাক হয়ে দেখছিল সেই দৃশ্য।
সৌম্য ভাঙা গলায় বলে,

“আমি অধীর ভাইয়ার লা’শ দেখেছিলাম বোনু। ছোট বেলায় এক ভাইয়ের দাফন দেখেছি। আর বড় হয়ে আরেক ভাইকে বদলে যেতে দেখেছি। আমার ভাগ্যে হারানোর তালিকা অনেক বড়।”
সন্ধ্যা ফোঁপায়। তার কাছে এসবের উত্তর নেই। আকাশ তার সৌম্য ভাইয়াকে সবচেয়ে বেশি ক’ষ্ট দিয়েছে৷ অভাগা দু’ভাইবোনকে ক’ষ্ট দিতে আকাশ কতই না প্ল্যান সাজিয়েছে। সৌম্য কিছু বলতে চেয়েও পারেনা। কল কে’টে দেয়।
ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া দূর অজানায় রাখে। সেই অধীরের বলা কিছু কথা কানের কাছে বাজে,
“সৌম্য তুমি কোনো চিন্তা কর না। তোমার মা বকতে থাকুক। আমি দু’টো ব্যবসা চালাবো। একটা তোমার আর একটা আমার। তুমি মনের সুখে মাছ মা’র’বে৷ তোমার স্বপ্নের কাজ করবে। অবশ্যই পড়াশোনা করবে। তবে চাকরি বা ব্যবসা কোনোটাই করতে হবে না।”
সৌম্য হেসে বলেছিল,

“তাহলে আমি কি খাবো অধীর ভাইয়া? শুধু মাছ খেয়ে তো জীবন চলবে না। টাকাও লাগবে।”
অধীর সৌম্য’র গাল টেনে হেসে বলেছিল,
“তুমি আমার ছোট ভাই না? বড় ভাই থাকতে ছোট ভাইদের এতো টেনশন করতে নেই। আমি তোমার নামে যে ব্যবসা চালাবো, সেটার মালিক কাগজে-কলমে তুমিই থাকবে।”
অধীরের কথা শুনে সৌম্য হাসতে হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছিল। সেদিন অধীর সৌম্য’র গালে ঠাস করে একটা থা’প্প’ড় মে’রে রে’গে বলেছিল,

“আমি মিথ্যা বলিনা সৌম্য। একদিন এটা প্রুভ করেই ছাড়বো। তুমি আমার ইমোশোন নিয়ে মজা করলে মে’রে একেবারে ভর্তা বানাবো তোমাকে।”
সৌম্য গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে অধীরকে দেখছিল সেদিন। একটা কথাও বলেনি৷
পুরোনো দিনের সেই কথোপকথনগুলো ভেবে সৌম্য’র চোখের কোণে পানি জমে। তার মন বলে,, আকাশ এতোটা বদলে গেলেও, অধীর ভাইয়া বেঁচে থাকলে সৌম্যকে এতো দুঃখ ছুঁতে পারতো না। অন্তত ভালোবাসা দিয়ে ঘেরাও করে রাখতো। কিন্তু পোড়া কপাল তার আর তার বোনুর! এতো ভালোবাসা, এতো সুখ তাদের কপালে নেই।

সৌম্য কল কা’টার পর থেকে সন্ধ্যা ফোঁপায়। হাতের ফোন রেখে উল্টো ঘুরতে নিলে হাতের সাথে একটি ছোট্ট কাগজ বাঁধে। সন্ধ্যা কাগজটি হাতে নিয়ে ছুড়ে ফেলতে গিয়েও থেমে যায়। ঝাপসা চোখে তাকায় কাগজটির দিকে। কপালে ভাঁজ পড়ে মেয়েটির। সন্ধ্যা বা হাতে ঝাপসা চোখজোড়া মুছে কাগজটি তুলে সামনে ধরে। হাতে নিয়ে বুঝতে পারে এটা একটি খাম। ভেতরে কিছু আছে বলে মনে হয়। সন্ধ্যা খামের ভেতর থেকে ছোট্ট একটি চিরকুট বের করে। এরপর কাঁপা হাতে চিরকুটের ভাঁজ খুলে চোখ বুলায়। যেখানে কালো কালিতে লেখা,
“গভীর সমুদ্রে হারিয়ে গিয়েছিলাম। ভাগ্যের জোরে সমুদ্রের পাড়ে ফিরে আসতে পেরেছি। ততদিনে আমার সন্ধ্যামালতী ভীষণ বাজেভাবে বদলে গেছে। আহ ভাগ্য!”

লেখাটি পড়ে সন্ধ্যার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চিনচিন ব্য’থা করে ওঠে। দৃষ্টিতে বিস্ময় ভর করে। দু’হাত থরথর করে কাঁপছে। এই লেখা যে আকাশের। সন্ধ্যা এই হাতের লেখা কি করে ভুলবে? কখন যে দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে সন্ধ্যা নিজেও বুঝতে পারেনা। এটা কেন লিখেছে আকাশ? আকাশ তাকে ‘আমার সন্ধ্যামালতী’ বলে সম্মোধন করেছে। ঠিক কতগুলো বছর পর এই সম্মোধন সন্ধ্যা অনুভব করল। সন্ধ্যার হাত থেকে চিরকুটটি পড়ে যায়। দু’হাতের মাঝে মুখ ঠেকিয়ে এক পর্যায়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গিয়েছে তার। কিন্তু থামার নাম নেই। তার আকাশের সব মনে পড়েছে। এজন্য সে তাকে আলতা পরিয়ে দিয়েছে। তাকে আ’ঘা’ত করতে ভুলে গিয়েছে। তাকে সন্ধ্যামালতী বলে সম্মোধয় করেছে। সন্ধ্যা কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করে,
“আমার শুভ্র-পুরুষ।”

রাত তখন প্রায় ১২ টা।
নিয়াজ হসপিটাল থেকে বেরোনোর জন্য তার রুম থেকে মাত্র বেরিয়েছে। সামনে আকাশকে দেখে তার পা থেমে যায়। আকাশের চোখমুখ শুকনো। সে আশেপাশে তাকালো বেশ কয়েকবার। এরপর নিয়াজের দিকে চেয়ে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“সৌম্য’র কি অবস্থা নিয়াজ?”
নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। এই আকাশকে একটু বেশিই অদ্ভুদ লাগছে। সৌম্যকে কে গু’লি করেছে সে জানেনা। তবে আকাশ-ই তাকে ইনফর্ম করেছিল সৌম্য’র চিকিৎসা করাতে। আর এখন এতো রাতে তার খোঁজ নিতেও চলে এসেছে। নিয়াজ থমথমে কণ্ঠে বলে,
“আকাশ তুমি কি জানো, তোমাকে কেউ স্মৃতি না ফেরার ঔষধ দিত?”
নিয়াজের কথা শুনে আকাশ ঢোক গিলল। নিজেকে সামলে খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর করল, “জানি।”
নিয়াজ অবাক হলো। তবে বিচলিত হলো না। মৃদু হেসে বলে,

“তোমার যে স্মৃতি ফিরেছে, এটা কিন্তু আমি ধরতে পেরেছি আকাশ। কিন্তু কিভাবে ফিরেছে এটা তুমি জানো না, আমি জানি৷ তবে তোমার স্মৃতি ফেরার ডেট তুমি জানো, আমি জানিনা।”
কথাগুলো শুনে আকাশ বিভ্রান্ত হলো। দৃষ্টি এলোমেলো হলো। নিয়াজের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো কয়েক পা। এদিক-ওদিক হাঁটলো কিছুক্ষণ। এরপর নিয়াজের দিকে চেয়ে মৃদুস্বরে বলে, “থ্যাংক্স আ লট।”
নিয়াজ অবাক হয়ে বলে,
“যাহ্ ধরে ফেললে?”
আকাশ বাঁকা হেসে বলে,
“মাফিয়া বলে কথা। ”

নিয়াজ চেয়ে রইল আকাশের দিকে। সন্ধ্যার সাথে পরিচয় হওয়ার পর যে আকাশ ছিল, সেই আকাশের সাথে এই আকাশের হুবহু মিল নেই। সত্যিই নেই৷ দেখতেও যেমন তফাৎ, কথা বলার ভঙ্গিতেও তফাৎ। আচার-আচরণে তো আরও অনেক বেশি তফাৎ। নিয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“সত্যি বলতে, সৌম্য’র শরীর বেশ ভালো আছে। কিন্তু ওর মনে অনেক ক্ষ’ত। যার কারণ কেবলমাত্র তুমি।”
কথাটা শুনে আকাশের মুখ মলিন হয়। দৃষ্টি নিচু তার। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ একজায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। এরপর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে একটি চেয়ারে বসে। দু’হাত হাঁটুতে ভর করে রেখে মাথা নিচু করে রাখে।
নিয়াজ এগিয়ে এসে আকাশের পাশে বসে। জিজ্ঞেস করে,
“কেন এসব করছ?”
আকাশ নিয়াজের কথার উত্তর করল না। দু’হাত তুলে কপালে ঠেকিয়ে রেখে অসহায়ত্বে ঘেরা কণ্ঠে বলে,
“জানি না, সে কে? সে আসলে কার শ’ত্রু তাও জানি না। শুধু জানি, সে কল্পনাতীত চতুর। আর আমি বড্ড ক্লান্ত। ভীষণ ক্লান্ত আমি।”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯ (২)

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে আকাশের কণ্ঠ কাঁপলো। সন্ধ্যার শেষবার কান্নামিশ্রিত ডাক কানের কাছে বেজে উঠল, ‘শুনুন?’। কিন্তু আকাশ কি সুন্দর উপেক্ষা করে চলে এসেছিল। এটাই তো তার কাজ।
আকাশ সাদা মেঝের টাইলসে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে নিজের উপর বিদ্রূপ হাসলো। দৃষ্টি ঝাপসা। সেই ঝাপসা দৃষ্টিতে সন্ধ্যার শত শত দিনের কান্না মিশ্রিত মুখের ছবি ভাসছে। বিড়বিড় করে,
“এমন ভাগ্য আল্লাহ কাউকে না দিক, যে ভাগ্যে প্রধান কাজ হিসেবে বরাদ্দ থাকে, প্রিয় মানুষদের উপেক্ষা করার প্রতিযোগিতা।”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২১