Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৩

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৩

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৩
DRM Shohag

প্রায় ২০ মিনিট আগে আকাশ হসপিটসলে এসে পৌঁছেছে। আকাশ হসপিটাল আসার পর পর-ই নিয়াজ আকাশসহ অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করে। সেসহ আরও দু’জন সিনিয়র সার্জারী ডক্টর আকাশের অপারেশন করবে। স্ট্রেচারে করে আকাশকে নিয়ে দু’জন নার্সসহ নিয়াজ মাত্র অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করেছে। ভেতরে আগে থেকেই সিনিয়র দু’জন সার্জন আছে, যারা সবকিছু প্রস্তুত করে রেখে অপেক্ষা করছিল আকাশের জন্য।

আকাশকে ওটি বেডে শোয়ানো হয়। এরপর নিয়াজ আকাশকে অজ্ঞানের জন্য সিরিঞ্জে ঔষধ ভরতে ব্যস্ত হয়। আকাশ নির্জীব হয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে। বাকি দু’জন ডক্টর টুকটুক করে শব্দ করে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে আকাশের দিকে আসতে নেয়, তখনই পিছন থেকে মুখোশ পড়া অধীর পর পর দু’জন ডক্টরের মুখ চেপে দু’জনের পেটেই চা’কু ঢুকিয়ে দেয়। লোকদু’টো বিন্দুমাত্র শব্দ করতে পারলো না। অধীরের কাছে কি ছিল কে জানে, ডক্টর দু’টো মুহূর্তেই নির্জীব দেহ নিয়ে শব্দহীন ঢলে পড়ে যায় মেঝেতে। যার ফলে আকাশ আর নিয়াজ একটুও শব্দ পেল না।
এদিকে অধীর নিয়াজকে টার্গেট করল। নিয়াজ আকাশের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আকাশকে অজ্ঞান এর ইনজেকশন পুশ করার জন্য। আকাশ চোখ মেলে তাকিয়েছে। চোখেমুখে মলিনতার ছাপ।

নিয়াজ তার কাজে ব্য’ঘাত পেয়ে বিরক্ত হয়ে সিরিঞ্জ বদলানোর জন্য বামদিকে সরে যায়। এদিকে অধীর তখনই নিয়াজের পিছন থেকে নিয়াজের পিঠ বরাবর চা’কু গেড়ে দেয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগ করে। কিন্তু নিয়াজ সামনে থেকে সরে যাওয়ায় অধীরের লক্ষবস্তু মিস হয়। সে আকাশের উপর উল্টে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। তবে ডান হাতের চা’কুটি আকাশ মুখ বরাবর একদম গেড়ে দেয়ার মতো পজিশন হয়ে যায়। অধীর দক্ষ হাতে তার হাতের গতিবিধি সামলে নেয়। নয়তো ছু’রিটি একদম আকাশের মুখ বরাবর লাগতো।

আকাশ চোখ মেলে ছিল বিধায় ঘটনাটি সে পুরোপুরি দেখতে পায়। অধীর আর আকাশের দৃষ্টি বিনিময় হয়। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় তার উপর ঝুঁকে পড়া সাদা মণির চোখের দিকে। আকাশের এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, লোকটি তাকেই মা’রতে এসেছে। কিন্তু তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে অধীর দ্রুত আকাশের উপর থেকে উঠে দাঁড়ায়। নিয়াজ সিরিঞ্জের দিকে তাকিয়ে থেকেই মাত্র অধীরের সামনে দাঁড়িয়েছে। তখনই অধীর তার ডান হাতের চা’কু চোখের পলকে নিয়াজের পেটে ঢুকিয়ে দেয়। হঠাৎ কি হলো নিয়াজ বুঝতে পারলো না। এদিকে অধীর খুব দ্রুত হাতে টানা সাতবার নিয়াজের পেটে চা’কু ঢুকায় আর বের করে। নিয়াজের হাত থেকে সিরিঞ্জ পড়ে যায়। চোখ দু’টো বড় বড় করে তাকায় অধীরের দিকে। হাত থেকে সিরিঞ্জ পড়ে যায়।
অধীরের ভস্ম করা দৃষ্টি নিয়াজের পানে নিবদ্ধ।

এদিকে অধীরকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে আকাশ হতদন্ত হয়ে শোয়া থেকে বসে পড়ে। সে উঠে বসতে বসতে, এটুকুর মাঝেই অধীর নিয়াজকে চা’কু মা’রার কাজটি করে ফেলেছে।
নিয়াজ অধীরের আড়ালে থাকায় আকাশ এখনো দেখতে পায়নি নিয়াজকে। সিরিঞ্জ পড়ার শব্দ কানে আসে আকাশের। সে বা হাতে বা দিকে গায়ের জোরে অধীরের পিঠে একটা ধাক্কা দেয়। আকাশের শক্ত ধাক্কায় অধীর কয়েকপা বাদিকে চলে যায়। আকাশের চোখে দৃশ্যমান হয় নিয়াজের সাদা কাপড় পরা র’ক্তা’ক্ত দেহ। সে চিৎকার করে ওঠে,

“নিয়াজ????”
নিয়াজের ঝাপসা দৃষ্টি আকাশের দিকে। ততক্ষণে সে দাঁড়িয়ে থাকার সক্ষমতা হারিয়েছে। ধীরে ধীরে ঢলে পড়তে নেয়, তার আগেই আকাশ হতদন্ত হয়ে বেড থেকে নেমে নিয়াজের শক্তপোক্ত শরীর ধরে। পুরোপুরি আঁকড়ে ধরতে না পারলেও নিয়াজের ঠাস করে পড়ে যাওয়া থেকে আটকালো। সেসহ নিয়াজকে ধরে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। নিয়াজ জোরেজোরে শ্বাস নিচ্ছে। শ্বাস আটকে আসছে তার। আকাশ নিয়াজের গালে হাত দিয়ে ভাঙা গলায় বলে,

“নিয়াজ? কি হলো তোমার? কি করে হলো? ওই লোকটা তোমার সাথে কেন এমন করল?”
কথাগুলো বলতে বলতে আকাশ ওটি রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। অধীর এখান থেকে চলে গিয়েছে। আকাশের চোখে পড়ল ঘরের এক কোণায় বাকি দু’জন ডক্টরের নিথর শরীর পড়ে আছে। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে বাকহারা হয়ে যায়। কোলের উপর নিয়াজকে ছটফট করতে দেখে আকাশের বুকটা ভার হয়ে আসে। সে চিৎকার করে বলে,
“কু’ত্তার বাচ্চা, পিছন থেকে ছু’রি চালিয়ে কি প্রমাণ করতে চাস? সাহস থাকলে সামনে আয়। আমার বন্ধুকে আ’ঘা’ত করার সাহস তোকে কে দিয়েছে?”
কথাগুলো বলতে বলতে আকাশের গলা ধরে আসে। সে নিয়াজের গালে হাত দিয়ে বলে,
“নিয়াজ বাকি ডক্টররা কোথায়? বলো কোথায়?”
নিয়াজ হাঁপানি রোগী মতো বলে,
“এই হসপিটালে কেউ নেই। সবার হসপিটালে আসতে আসতে আমি বাঁচবো না। তাছাড়া আমাকে অনেকগুলো ছু’রি মে’রেছে। আমার চিকিৎসা করিয়েও কোনো লাভ হবেনা আকাশ।”
আকাশ অসহায় কণ্ঠে বলে,

“এভাবে বলো না৷ কিচ্ছু হবে তোমার। আমি আছি তো।”
কথাটা বলে আকাশ ব্যস্ত হাতে নিয়াজের পকেট থেকে নিয়াজের ফোন বের করে ডক্টরের নাম্বার খুঁজতে থাকে।
এদিকে আকাশের কথা আর কাজে নিয়াজের ব্য’থাতুর মুখে একটুখানি হাসি ফুটল মনে হয়। যা খুবই সূক্ষ্ম। নিয়াজের ব্য’থার আড়ালে সে হাসি লুকিয়ে থাকলো।
আকাশ কাউকে ফোনে না পেয়ে রে’গে ফোন ছুড়ে ফেলে। নিয়াজের শ্বাসকষ্টের পরিমাণ বাড়ে। আকাশ দু’হাত নিয়াজের মুখে রেখে ভাঙা গলায় বলে,

“প্লিজ কিছু বলো নিয়াজ। কি করব আমি? কি করলে তুমি বাঁচবে, বলো?”
নিয়াজের গলা শুকিয়ে আসে। তৃষ্ণার্ত রোগীর ন্যায় ছটফট করে। আকাশ এখানে বসলো না। সে নিয়াজের মাথাটা মেঝেতে রেখে একপ্রকার দৌড়ে ওটি রুম থেকে বেরিয়ে চিৎকার করে বলে,
“নিয়াজকে একজন ছু’রি মে’রেছে। ইমিডিয়েটলি ডক্টরকে নিয়ে এসো। ফাস্ট।”
আকাশের কথা শুনে নার্সগুলো ছুটে আসে। স্তব্ধ হয় সকলেই। তাদের নিয়াজ স্যারকে কে ছু’রি মে’রেছে? তাদের নিয়াজ স্যার তো নিজেই একজন রোগীকে সুস্থ করতে ওটি রুমে গেল। তাহলে কি হলো?
আকাশ কথাগুলো বলে আবারো ছুটে আসে নিয়াজের কাছে। কেউ কেউ ডক্টরকে কল করতে ব্যস্ত হয়৷ কেউ কেউ কলে না পেয়ে নিজেরাই বেরিয়ে যায় ডক্টরকে ডাকতে। আবার কেউ আকাশের পিছু পিছু ওটি রুমে এসে মেঝেতে তাদের স্যারকে র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে আঁতকে ওঠে।
আকাশ নিয়াজের মাথাটা আবারো তার কোলে নিয়ে হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“ওরা ডক্টর আনতে গেছে নিয়াজ। তোমার কিচ্ছু হবে না। একটু ধৈর্য ধর।”
অ’সহ্য ব্য’থায় নিয়াজের দু’চোখের কোণ ঘেঁষে নোনাজল গড়ায়। বহুক’ষ্টে নিজেকে একটুখানি সামলে নিয়াজ ধীরে ধীরে তার কাঁপাতে থাকা দু’হাত এগিয়ে এনে আকাশের বা হাত আঁকড়ে ধরে। আকাশের দিকে ঝাপসা চোখে চেয়ে থেমে থেমে বলতে থাকে,

“জানো আকাশ, গত পাঁচ বছর যাবৎ তোমার বোন শিমুকে খুব ভালোবেসে আসছি। আজো ওকে ভীষণ ভালোবাসি৷ কিন্তু মেয়েটা আমাকে নয়, বায়ানকে ভালোবাসে। শুনেছি, তুমি নাকি শিমুর সাথে বায়ানের বিয়ে ঠিক করেছ। বায়ানও না-কি রাজি হয়েছে। আমি খুব ক’ষ্ট পেয়েছি জানো? ভালোবাসার মানুষকে আরেকজনের সাথে দেখার ক’ষ্ট সব ক’ষ্টকে হার মানায়। তাই হয়ত, আল্লাহ আমাকে সেই ক’ষ্ট থেকে মুক্তি দিতে এই আয়োজন করেছিল। বায়ানকে বলবে, ও যেন শিমুকে খুব ভালো রাখে। শিমু ভালো থাকলেই আমার আর কিছু চাই না। শুধু আফসোস, ওপারেও আমি আমার স্বপ্নের রাণীকে পাবো না।
এটুকু বলে নিয়াজ থামে। ভীষণ ক’ষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে জীবন বের হয়ে যাচ্ছে। আকাশ নিয়াজের মুখে শিমুকে নিয়ে ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনে স্তব্ধ চোখে তাকায়। নিয়াজের ব্য’থাতুর মুখপানে চেয়ে আকাশের চোখের কোণ ভিজে ওঠে। ছেলেটা এতো ক’ষ্ট বুকে পুষে হাসিমুখে তাদের উপকার করে বেড়াতো?
নিয়াজ বহুক’ষ্টে নিজেকে একটুখানি সামলে আবারো ভাঙা গলায় বলে,

সৌম্যকে বলবে, আমি ওকে সবসময় আমার নিজের ছোট ভাই ভেবেছি। ভীষণ ভালোবাসি ওকে। তুমি তো জানো, আমার কোনো বোন নেই। আমি সন্ধ্যাকে নিজের বোনের চেয়ে কখনো কমকিছু ভাবিনি। সন্ধ্যাকে বলবে, সৌম্য’র মতো আমাকেও যেন ওর একটা ভাই ভাবে। সৌম্য’ও যেন তোমার মতো আমাকে ওর বড় ভাই হিসেবে সারাজীবন মনে রাখে।
আমি যেটুকু পেরেছি তোমাদের সবার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। তোমরা আমাকে কখনো ভুলে যেও না আকাশ। সৃজনকে আমার ভালোবাসা, আদর দিও। ওকে অনেকদিন হলো দেখিনা। ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু আমার হাতে ওতো সময় নেই।

গলা বেঁধে আসে নিয়াজের। দু’চোখ বেয়ে নোনাপানি গড়িয়ে পড়ে। শ্বাসক’ষ্টের কঠিন রোগীর মতো বড় করে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। চোখদু’টো টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। নিয়াজসহ আকাশের সারা শরীর লাল র’ক্তে মাখামাখি গিয়েছে। আকাশ বেঁধে আসা গলায় বলে,
“আর একটু অপেক্ষা কর নিয়াজ। ডক্টর আসছে। তোমার কিচ্ছু হবে না।”
নিয়াজ হাঁপাতে হাঁপাতে অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়,
সৃজনকে বলবে, ওর নিয়াজ মামা ওকে ভীষণ ভালোবাসতো। ও জেলি খেতে খুব পছন্দ করে। আমার হয়ে তুমি ওকে জেলি কিনে দিয়ো। বলবে, এটা তার নিয়াজ মামা পাঠিয়েছে। আর আমার বাবা মাকে দেখে রেখো আকাশ। আমি ছাড়া তাদের আপন বলতে তেমন কেউ নেই। আর আর চিন্তা কর না, সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমরা সবাই অনেক সুখী হও। আর আমার জন্য একটু দোয়া……”

নিয়াজ তার সমাপ্ত করতে পারলো না। শরীর একেবারে ছেড়ে দিল। আকাশের ধরে রাখা নিয়াজের দু’হাত ঠাস করে পড়ে যায়। মাথাটা বাদিকে একেবারে ঘুরে যায়। চোখদু’টো চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এতক্ষণ দু’চোখে টইটুম্বুর নোনাজলগুলো বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। নিয়াজকে এভাবে নিস্তেজ হয়ে যেতে দেখে আকাশ স্তব্ধ চোখে তাকায়। দু’হাতে নিয়াজের গাল নাড়ায় আর বলে,
“নিয়াজ? এ্যাই নিয়াজ? নিয়াজ চোখ খোলো। প্লিজ চোখ খোলো।
তখনই হতদন্ত পায়ে ডক্টর ওটি রুমে প্রবেশ করে। ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে আসে নিয়াজের দিকে। নিয়াজকে ধরে বেডে ওঠানোর জন্য। আকাশও হেল্প করতে নেয়। ডক্টর কিছু একটা ভেবে নিয়াজের পিঠের নিচ থেকে ডান হাত সরিয়ে এনে নিয়াজের ঘাড়ের পাশে তর্জনী আঙুল দ্বারা চেক করে। আকাশ ডক্টরের কাজ দেখে ভদ্রলোকের দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায়। ডক্টরটি নিয়াজকে চেক করে আকাশের দিকে চেয়ে ধরা গলায় বলে,
“আমাদের ডক্টর নিয়াজ আর বেঁচে নেই।”

কথাটা শুনে আকাশের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। বিস্ময় চোখে তাকালো নিয়াজের শান্ত হয়ে থাকা মুখের দিকে। আকাশের সাথে বাকিদেরও একই অবস্থা। কেউ কেউ ভেজা চোখে চেয়ে আছে। এই ডক্টর তাদের সাথে খুব সুন্দর করে কথা বলত। তাদের যেকোনো সমস্যা হলেই নিয়াজ সব সমাধান করে দিত। কত এমন হয়েছে, তাদের থেকে কোনো ফিস না নিয়ে তাদের আত্মীয়দের ট্রিটমেন্ট করিয়ে দিয়েছে। এমন মানুষকে কি করে ভুলবে তারা?
আকাশের নির্জীব মনে প্রশ্ন জাগে, কি অপরাধে নিয়াজকে জীবন দিতে হলো? তাকে একটু সাহায্য করতে এসেছিল বলে? তার দুঃখের দিনে পাশে ছিল বলে? তার দুঃখ কমিয়ে দিতে চেয়েছিল বলে? কিন্তু নিয়াজ যে তার দুঃখ কমিয়ে দিতে এসে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান জীবনটাই হারিয়ে ফেললো। আকাশের বুকে ব্য’থা উঠলো। তার জন্য নিয়াজকে জীবন দিতে হলো। তার অপরাধের বোঝা তো কম নেই। আর কত অপরাধের বোঝা বইতে হবে তাকে? সেই হাসিখুশি নিয়াজ আর তাকে সাহায্য করতে আসবে না। আসবে না তাকে দু’টো সাবধানী বাণী শোনাতে। আসবে না তাকে সান্ত্বনা দিতে। সে বারণ করলেও, নিয়াজ তার কথা পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো করে তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে না।

গত দেড়বছর আগে নিয়াজ যখন জানতে পেরেছিল, সেই ছেলে আকাশকে স্মৃতি না ফেরার ঔষধ খাওয়ায়। তখনই সে সূদূর ইংল্যান্ড ছুটে গিয়েছিল আকাশের কাছে। এরপর আকাশকে না জানিয়ে, সেই ঔষধগুলোর জায়গায় অন্য ঔষধ রেখে এসেছিল। ঔষধগুলো দেখতে সেইম ছিল, তাই আকাশ ধরতে পারেনি। এজন্যই তো আকাশের স্মৃতি ফিরেছিল। এই যে নিয়াজ লুকিয়ে লুকিয়ে তার আড়ালে তাকে বিনা স্বার্থে সাহায্য করেছিল। আকাশের বিপদে সেই নিঃস্বার্থ নিয়াজ আর কখনো আকাশের কাছে ছুটে যাবে না।
শিমুর জন্য নিয়াজের অপেক্ষার প্রহরের আজ সমাপ্তি ঘটলো। নিঝুম রাতে, শিমুকে ভেবে কত বুকের ব্য’থা বাড়িয়েছে নিয়াজ। সেই ব্য’থা লুকিয়ে আকাশ, সন্ধ্যা, সৌম্য’র সুখের কথা ভেবেছে। আজ সবকিছুর ইতি ঘটে গেল। ঘটবেই না-ই বা কেন! যে মানুষটা এসব কাজে নিয়োজিত ছিল, সে যে এই দুনিয়ার বুকে আর নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। তার সময় ফুরিয়েছে। চিরতরে হারিয়ে গেছে নিয়াজ নামের এক নিঃস্বার্থ ডক্টর।

আকাশ নিয়াজের র’ক্ত’ক্ত নিথর দেহটার দিকে নির্জীব চোখে চেয়ে আছে। একটু আগেও যে আকাশকে ভরসা দিচ্ছিল, সেই মানুষটা চিরদিনের জন্য ঘুমিয়েছে। আকাশের সহ্য হয়না নিয়াজকে এভাবে শান্ত হয়ে পড়ে থাকতে দেখে। সে ধীরে ধীরে মাথাটা নিচু করে নিয়াজের মাথার সাথে তার কপাল ঠেকিয়ে বিড়বিড়িয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“তুমি আমার ভীষণ আপন নিয়াজ। আমার বিপদের বন্ধু। আমার ভাই। তোমাকে কখনো ভুলবো না। যে আমার ভাইকে মে’রে’ছে। তাকে ক’ঠো’র শা’স্তি না দিয়ে আমি আকাশ ম’র’বো না।”
সারাজীবন বিনাস্বার্থে শুধু মানুষের উপকার করে যাওয়া মানুষটা নিজের জন্য দোয়া চাওয়ার সুযোগটুকুও পেল না। তার আগেই এই সুন্দর দেহ থেকে আত্মাটা বের হয়ে গেল। ছেলেটা না পেল, যৌবনকাল থেকে প্রিয় মানুষটার জন্য অপেক্ষা করা, সেই প্রিয় মানুষটাকে। না পেল সেই প্রিয় নারীর সামান্য একটুখানি ভালোবাসা। উল্টে জেনে গেল, তার স্বপ্নের রাণী অন্যএকজনের হবে। অন্যএকজনের বউ হয়ে বাঁচবে। আর সে সাথে করে নিয়ে গেল শুধু বুকভরা ক’ষ্ট। না পাওয়ার আক্ষেপ, প্রিয় মানুষকে হারিয়ে ফেলার হাহাকার। একেই বুঝি ভাগ্য বলে?

প্রতিটি মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসছে আজানের সুরেলা কণ্ঠ। আকাশ তাদের বাড়ির বাগানে বকুলগাছ তলার নিচে বসে আছে। গাছের সাথে শরীরটা হেলান দিয়ে ডান পা সামান্য উঁচু করে রেখেছে। বা পা মেলে রেখেছে। টকটকে লালিত চোখদু’টোয় বড্ড য’ন্ত্র’ণা করছে। বুকের ব্য’থার থামার নাম নেই। নিয়াজ থাকলে নিশ্চয়ই, তাকে হার্ট চেকআপ করিয়ে নিতে বলত। সে রাজি না হলে নিয়াজ জোর করেই চেক করতো। কিন্তু সেই মানুষটা তো আর এই পৃথিবীতে নেই। এখন এসব করার ডক্টরটাও নেই।
আকাশ হসপিটালে থাকতেই নিয়াজের বাড়ির লোককে খবর দিলে, তার বাবা মা সহ আরও টুকটাক কিছু আত্মীয় ছুটে এসেছে তাদের ছেলের কাছে। কান্নাকাটি করতে করতে নিয়াজকে তাদের বাড়ি নিয়ে গেছে। এরপর আকাশ তার একটি কুঁচকানো শার্ট পরেছে, যার বোতাম উল্টোপাল্টা করে লাগিয়েছে। আকাশের সেদিকে খেয়াল ছিল না। সে তার দুর্বল শরীরটাকে টেনেহিঁচড়ে তার বাড়ি পর্যন্ত এনেছে। তারপর গাড়ি থেকে নেমে এই বাগানটায় এসে বসেছে।
ফজরের আজানের পর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। ধরনীর বুক থেকে একটু একটু করে অন্ধকার মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। তখন হঠাৎ-ই সেখানে আগমণ ঘটে জেডির। সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে আকাশের পাশে বসে। মৃদুস্বরে ডাকে, “এভি?”

আকাশ জেডির কণ্ঠ শুনলো। তবে কোনো সাড়া দিল না। জেডি ডান পা ভাঁজ করে পুরোপুরি আকাশের দিকে ফিরে বসলো। আবছা আলোয় খুব একটা অস্পষ্ট লাগলো না নির্জীব বসে থাকা আকাশকে। সে আবারো বলে,
“মন খারাপ করিস না। মানুষের হায়াত সারাজীবন থাকে না। হায়াত শেষ হলে তারা পৃথিবী ছাড়বেই। যাদের মধ্যে নিয়াজ একজন।”
আকাশ মলিন হাসে। বলে,
“গত একটাবছর যাবৎ জ্ব’ল’ন্ত চিতায় জ্ব’ল’ছি। না তো আ’গু’ন নিভে যায় আর না তো আমার দ্বারে এসে মৃ’ত্যু হাজির হয়। নিয়াজ আমাকে একটুখানি সুখের দিশা দেয়ার জন্য শেষ চেষ্টা করতে আমাকে সাহায্য করতে গিয়ে তার জীবন বিসর্জন দিল। নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না।”
জেডি বেঝানোর স্বরে বলে,

“এখানে তোর কোনো দোষ নেই। মিথেমিছি এসব ভেবে নিজেকে ক’ষ্ট দিচ্ছিস কেন? এসব চিন্তা বাদ দে।”
আকাশ ভোর-সকালের স্বচ্ছ আকাশের দিকে চেয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“আমার সন্ধ্যামালতী সে। বিয়ের পর তাকে কত ক’ষ্ট দিয়েছিলাম! ভাবতাম মেয়ে মানুষ দিয়ে কি করব আমি? এরা ছেলেদের জন্য উটকো ঝামেলা। কোনোভাবে বিয়ে হয়ে গেলেও এমন উটকো ঝামেলাকে আমি বইতে পারবো না। অথচ লম্বা চুলের অধিকারী, শ্যামলা গড়নের, আমার চোখে চোখ ধাঁধানো সেই রূপসী মেয়েকে ঘিরে কতশত ঘটনা ঘটে গিয়েছে, শুধুমাত্র তার মায়ায় আটকেছি বলে।
এটুকু বলে আকাশ মলিন হাসলো। এরপর আবারো বলে,

একটা সময় ছিল, যখন সন্ধ্যামালতীর কণ্ঠ শোনা হত না। খুব ইচ্ছে করত তার মিষ্টি কণ্ঠ শুনতে, কিন্তু সাহস পেতাম না। কারণ কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাওয়া সন্ধ্যামালতীর গলা অপারেশনে অনেক রিস্ক ছিল। নিয়াজ নিয়েছিল সেই রিস্ক। আমাকে না জানিয়েই ওরা সবাই মিলে আমার সন্ধ্যামালতীর গলা অপারেশন সাকসেস করল। পরে সব জানতে পেরে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। সন্ধ্যামালতীকে যদি হারিয়ে ফেলতাম! কথাটা ভাবলেই বুকটা কেমন হাহাকার করে উঠত। ভীষণ অভিমান হয়েছিল সবার উপর। সবচেয়ে বেশি অভিমান হয়েছিল সন্ধ্যামালতীর উপর। যাকে ছাড়া একেকটা নিঃশ্বাস নেয়ার ক’ষ্টমিশ্রিত স্বাদ আমি নিতে চাইনি। গাঢ় অভিমানকে আকড়ে সন্ধ্যামালতীর কণ্ঠ না শুনেই বাংলাদেশ ছেড়েছিলাম। আমার সন্ধ্যামালতী ছিল নরম, খুব কোমল। যাকে সামান্য স্পর্শ করলেই গলে পানি হয়ে যেত। নাজুক মেয়েটি আমার কাছে ভালোবাসা প্রকাশে ছিল আরও নাজুক। কিন্তু হঠাৎ আমার অভিমানে সেই নাজুক মেয়েটি কি কোমলভাবে পা’গ’লা’মি করত আমার জন্য!

অজান্তেই নিজের মাঝে জমানো সব ভালোবাসা উজার করে মেলে ধরত। কিভাবে অভিমান করে থাকতাম সেই মেয়েটির উপর? নিমিষেই ভেঙে গিয়েছিল অভিমান। মন ভরে দেখতাম আমার জন্য আমার সন্ধ্যামালতীর ভালোবাসা। ছটফটে মন নিয়ে আর টিকতে পারছিলাম না বিদেশের মাটিতে। খুব তৃষ্ণা পাচ্ছিল সন্ধ্যামালতীর সুমিষ্ট কণ্ঠ শুনতে। তাকে জানালাম আমি ফিরছি। খবরটি পেয়ে আমার সন্ধ্যামালতীর সে কি আনন্দ! ওদিকে আমার একটা দিন একযুগ সমান মনে হচ্ছিল। বড্ড ছটফট লাগছিল। এর মধ্যে জেনেছিলাম, আমার সন্ধ্যামালতী আমার বাচ্চার মা হবে। আমি বাবা হব। নিয়াজের মুখে খবরটি পেয়ে কি যে খুশি হয়েছিলাম, তা কখনো পরিমাপ করা যাবে না। রাতটা ছটফট করে কাটিয়ে পরদিন বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। পৌঁছাতে পেরেছিলাম বাংলাদেশে। সন্ধ্যামালতীকে চট্টগ্রামের বাড়িতে থাকতে বলেছিলাম বলে সে সেখানে গিয়েই অপেক্ষা করছিল। একটু পর পর আমাকে টেক্সট করছিল। আমার ছটফটে মন আরও ছটফটে হয়ে ওঠে। ইন্সট্যান্ট হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করলাম। অপেক্ষা করতে পারছিলাম না, কি করতাম? আর তারপর পাখির ন্যায় আকাশপথে ছুটলাম আমার সন্ধ্যামালতীর দিকে। কিন্তু সেদিন ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল না। পারিনি আমার সন্ধ্যামালতীর কাছে পৌঁছাতে। পারিনি আমার সন্ধ্যামালতীর মিষ্টি কণ্ঠ শুনতে। সেই তৃষ্ণার্ত মনের তৃষ্ণা মেটাতে পারিনি। হঠাৎই বাড়ির সামনে গিয়ে হেলিকপ্টারটি ক্র্যাশ করে। এমনি এমনি ক্র্যাশ হয়নি। কেউ করিয়েছে৷”

জেডি জিজ্ঞেস করে, “কে সে?”
আকাশের গলা শক্ত তবে ভাঙা,
“মানুষরূপী এক শু’য়ো’রে’র বাচ্চা।
কথাটা বলে মুহূর্তেই আকাশের মুখটা মলিন হলো। ঢোক গিলে বলে,
“এক্সিডেন্টের কারণে স্মৃতি হারিয়েছিলাম। আর সেই স্মৃতি না ফেরানোর জন্য সে আমায় ঔষধ দিত। কতশত প্ল্যান করে আমার সমন্ধ্যামালতীর সব স্মৃতি মুছে রাখতো। সেই দিনগুলোয় অজান্তেই সন্ধ্যামালতীকে কত যে আ’ঘা’ত করেছি তার হিসাব নেই। যাকে কখনো একটা ফুলের টোকা দেয়ার কথা চিন্তা মাথাতেও আনতাম না। সে আমার কাছে ভালোবাসার আবদার নিয়ে আসতো বলে ওকে কত চড়-থা’প্প’ড় মে’রে’ছি! কু’কু’রের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছি। প্রতিনিয়ত অস্বীকার করেছি। তবুও ও আমার কাছে এসে কেঁদে কেঁদে কত আকুতি করতো। কিন্তু আমি প্রতিবার ওর সাথে একই বিহেব করতাম। একবার তো ওকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বেরই করে দিয়েছিলাম।
আকাশের গলা বেঁধে আসে। চোখদু’টো ঝাপসা হয়ে আসে। বুকটায় খুব অ’সহ্য য’ন্ত্র’ণা হচ্ছে। আকাশ ভাঙা গলায় আবারো বলে,

আমার ছোট ভাই সৌম্যকে মিথ্যা অপরাধের দায়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম। ও বউ নিয়ে ওর স্বপ্নের গ্রামের বাড়িতে ওঠার আগেই সেই বাড়ি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিলাম। ওকে পুরো রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছিলাম। প্রতিনিয়ত ওদের দু’ভাইবোনের সাথে পা’ষ’বিক আচরণ করেছি। অথচ ওরা দু’জন আমার প্রিয় মানুষ। যাদের সবসময় এই দু’হাতে আগলে রাখার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তাদেরকে প্রতিনিয়ত আ’ঘা’ত করে গিয়েছি।
থামলো আকাশ। একবার শ্বাস নিয়ে আবারো বলে,

“গত একবছর আগে হঠাৎ-ই আমার সব মনে পড়ে গেল। যার সম্পূর্ণ ক্রেডিট ছিল নিয়াজের। যেদিন একে একে সব মনে পড়ে গেল সেদিন নিজেকে এক অচেনা রূপে দেখে অবাক হয়েছিলাম। আমার সন্ধ্যামালতী আর সৌম্যকে দেয়া কষ্ট দেয়ার দৃশ্যগুলো একে একে চোখের সামনে ভাসছিল। দমবন্ধ লাগছিল। আমার বাচ্চাটার পৃথিবীতে আসার জন্য আমি প্রথমদিন থেকে প্রহর গুণতাম, তাকে না দেখেই বাংলাদেশ ছেড়েছিলাম। নিজেকে পা’গ’ল পা’গ’ল লাগছিল। বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলাম। দেখেছিলাম নতুন এক সন্ধ্যামালতীকে। আর আমার এক ফোঁটা বীর্য থেকে সৃষ্ট সেই ছোট্ট সৃজনকে। যে আমার সন্ধ্যামালতীর পেটে থাকতে সন্ধ্যামালতীকে দুঃখ ছাড়া আর কিচ্ছু দিইনি। কারো সামনে যাওয়ার সাহস হয়নি। দূর থেকে দেখেছিলাম, আমার র’ক্ত, আমার বাচ্চা ছেলে হয়েছে। চোখদু’টো হুবহু আমার মতো অ্যাম্বার হয়েছে। গায়ের রঙটাও আমার পেয়েছিল। বুকের একপাশে যেমন প্রশান্তি লাগছিল, আরেকপাশে তেমনি ভ’য়া’ন’ক য’ন্ত্র’ণা হচ্ছিল।

বুঝেছিলাম এসবের পিছনে মূল হোতা আছে। যে আমার, আমার সন্ধ্যামালতীর, আর সৌম্য’র সুখ সহ্য করতে পারছিল না। আমি ছক কষা শুরু করলাম। সব মনে পড়ার পরও আমার সন্ধ্যামালতী, আমার বাচ্চার কাছে আসতে না পারার ক’ষ্ট মাত্রাতিরিক্ত ছিল। কিন্তু কি করতাম? আমি আমার সন্ধ্যামালতীদের কাছে ফিরে গেলে, সে আমার সন্ধ্যামালতীর, নয়তো সৌম্য’র নয়তো আমার জানবাচ্চাটার যদি আবারো কোনো ক্ষ’তি করত? গত এক বছরে সৃজনকে যে কতবার বাঁচিয়েছি তাদের দলবলের হাত থেকে। বাঁচিয়েছি সৌম্যকে। এসবের হদিশ কারো কাছে ছিল না। প্রতিদিন সকাল হলে প্রহর গুণতাম কবে সেই লোকটাকে হাতনাদে ধরব আর কবে আমার সন্ধ্যামালতীর সামনে তার শুভ্র-পুরুষ রূপে এসে দাঁড়াবো। দাঁড়াবো আমার সৃজনের বাবা হয়ে। আর আমার একমাত্র ভাই সৌম্য’র বড় ভাই নামক ছায়া হয়ে। প্রহর গুণতে গুণতে বছর ঘুরে এলো কিন্তু আমি পারলাম না সেই কাঙ্ক্ষিত দিনে পৌঁছাতে। গত একটাবছর নিজের দেহটাকে একটা ম’র’দেহ হিসেবে টেনে নিয়ে বেরিয়েছি। দূরে থেকে আমার সন্ধ্যামালতীদের দেখে, তাদের কাছে যেতে না পেরে গলা কাঁটা মুরগির ন্যায় ছটফট করেছি। সেই শরীর নিয়েই টেনে হিঁচড়ে পা’গ’লের মতো ছুটেছি কখনো আমার আমার জানবাচ্চাকে বাঁচাতে, কখনো সৃজন আবার কখনো আমার সন্ধ্যামালতী।

আমার ছোট্ট বাচ্চাটাকে সবচেয়ে বেশি টার্গেট করত। মাঝে মাঝে মনে হতো সেই অজ্ঞাত লোককে খুঁজে বের করার পর,, তাকে আমার কলিজা ছিঁড়ে ওর হাতে তুলে দিব। তবুও যেন ও আমার ওই ফুটফুটে বাচ্চাটার দিকে আর হাত না বাড়ায়।
আকাশের টলমলে চোখ দু’টো স্থির হয়ে আছে। সে ভাঙা গলায় বলে,
আর পারছিলাম না সন্ধ্যামালতীদের থেকে দূরে থাকে। প্ল্যান চেঞ্জ করলাম। শেষবারের মতো আবারো সন্ধ্যামালতীদের আ’ঘা’ত করে বুঝতে চেয়েছিলাম শ’ত্রটা আসলে কার। কিন্তু আমি বরাবরের মতোই ব্যর্থ হই। আমার সৃজনের উপর আবারো আ’ঘা’ত আসে। এবার সামান্য প্রকাশ্যেই তাকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলাম। প্রিয় মানুষগুলোর থেকে দূরে থাকতে থাকতে ক্লান্ত লাগছিল খুব। বারবার ভেঙে যেতে গিয়েও নিজেকে শক্ত করে দাঁড় করিয়েছি। শুধু একটি সমাধানের আশায় চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে থেকেছি। সবশেষে নিয়াজ সমাধানের সবচেয়ে কঠিন উপায় আমার সামনে তুলে ধরল। মেনে নিলাম। নিয়াজকে বললাম, আমার কিছু হলে ও যেন আমার সন্ধ্যামালতীদের পাশে থাকে। নিয়াজ আমায় বুকভরা সাহস দিল। আশ্বাস দিল। বিনাস্বার্থে আমাকে সাহায্য করছিল। কিন্তু সবশেষে সে নিজেই তার জীবন হারালো। আমি সেই হতভাগা যে নিয়াজের উপকার শুধু গ্রহণ করে গেলাম। কিন্তু তার বিপদে পাশে থাকতে পারলাম না।”

আকাশের অসহায় দৃষ্টিজোড়া বড্ড ঝাপসা। দম আটকে আসছে। জেডি বেশ অনেকক্ষণ আগে উঠে দাঁড়িয়েছে। আকাশের দিকে ফিরে আকাশের দিকেই চেয়ে আছে। চোখ দু’টো টকটকে লাল। আকাশ ঘাড় বাঁকিয়ে জেডির দিকে তাকালো। সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে। তাই জেডিকে দেখতে তেমন অস্পষ্ট লাগলো না। আকাশ ধীরে ধীরে তার দুর্বল ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়া শরীরটা জেডির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বসল। মাথা উঁচু করে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“জ্যাক, তোকে যে হুডিটা দিলাম, তুই কি সেই হুডির মালিকের একটুও খোঁজ পেয়েছিলি? আমি শিওর, ওই ছেলেটাই সবকিছুর মূল হোতা। সামান্য একটু ক্লু পেয়ে থাকলেও আমায় বলে দে জ্যাক।”
কথাগুলো বলে আকাশ থামে। প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায় জেডির দিকে। জেডি নির্জীব। আকাশের মুখখানা মলিন হলো। শেষ ভরসা নিয়াজ ছিল, আর তারপর জ্যাক। সবাই ব্যর্থ। তার হাতে আর সত্যিই কোনো উপায় নেই। আকাশের হঠাৎ কি হলো কে জানে! সে দু’হাতের মাঝে মুখ ঠেকিয়ে অতি করুণ সুরে বলতে থাকে,

“আমি আর পারছি না রে। ভীষণ ক্লান্ত আমি। আর পারছি না এভাবে লড়তে। পারছি না আমার ফুলের মতো সন্ধ্যামালতীর থেকে দূরে থাকতে। পারছি না আমার জানবাচ্চাটার কাছে নিজেকে অপরিচিত একজন রূপে হয়ে সেজে রাখতে। নিজের জীবন্ত লা’শ বয়ে নিয়ে যাওয়া আমার কাছে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যামালতী, মা, সৌম্য ওদের ঘৃণা ভরা দৃষ্টি দেখে আমি ভীষণ ক্লান্ত। সৃজনের মুখে আব্বু ডাক শোনার জন্য এই অপেক্ষার প্রহর আর গুণতে পারছিনা আমি। আর কত জ্ব’ল’ন্ত চিতায় জ্ব’ল’ব। কে আমার সাথে এই নোংরা খেলায় নেমেছে? কে আমার জীবনটাকে জ্ব’লি’য়ে পু’ড়ি’য়ে শেষ করে দেয়ার পথে নেমেছে? কে আমার কলিজার মানুষগুলোর দিকে বারবার হাত বাড়িয়ে আমার হাহাকার আরও বাড়াচ্ছে? আমার সাথে তার শ’ত্রু’তা থাকলে আমায় কেন মৃ’ত্যু দিচ্ছে না?”
কথাগুলো বলতে বলতে আকাশের দু’হাত তার চোখের জলে ভিজে যায়। জেডির টকটকে লালিত দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। অস্বাভাবিক বুক ব্য’থায় ছটফটিয়ে ওঠে ছেলেটা। শব্দহীন কান্নারত হাঁটুগেড়ে বসা আকাশের দিকে চেয়ে ভাঙা গলায় বলে,

“কারণ তোর মৃ’ত্যু সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই এভি।”
কথাটা শুনে আকাশের কপালে ভাঁজ পড়ে। মাথা তুলে তাকায় জেডির দিকে। ঝাপসা চোখজোড়া ডলে নেয়। জেডি ঢোক গিলে বলে,
“তোর কখনো মনে হয়নি, লোকগুলো তোকে আর সন্ধ্যাকে কখনো আ’ঘা’ত করেনি কেন?”
আকাশ ঢোক গিলল। সত্যিই তো। লোকগুলোর টার্গেট সে কখনো ছিল না। তার সন্ধ্যামালতী টার্গেট ছিল কি-না এটা সিইওর বুঝতো না। তবে সবচেয়ে বেশি টাগেটে ছিল তার সৃজন আর সৌম্য। আকাশ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। জেডির দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
“তুই কি তার খোঁজ পেয়েছিস জ্যাক?”
জেডি শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“পেয়েছি।”
আকাশ হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“কে সে?”

জেডি দু’পা পেছায়। নির্জীব ঝাপসা চোখদু’টো আবারো ডলে নেয়। দৃষ্টি আকাশের দিকে নিবদ্ধ। পরনের ব্লু কালার হুডি শরীর থেকে খুলে উল্টো করে পরল। হুডির উল্টোপাশ ব্ল্যাক কালার। যেটা জেডির গায়ে খুব সুন্দর ফুটে উঠল। জেডি হুডির টুপি মাথায় তুলে নিল। দু’হাতে দু’চোখের লেন্স খুলে ফেলল। উম্মুক্ত হলো জ্বলজ্বল করা সাদা চোখের মণি দু’টো। পকেট থেকে একটি রুমাল বের মুখ বেঁধে নিল। ছলছল দৃষ্টি এখনো আকাশের পানে। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে জেডির দিকে। অবিকল সেই হুডিওয়ালার মতো দেখতে জেডিকে বাকহারা হয়ে দেখল আকাশ। জেডি উল্টো ঘুরে দাঁড়ালো। আকাশ দেখল হুডির পিঠে সাদা রঙের কালিতে লেখা ‘ADHIR’। নামটি পড়ে আকাশ স্তব্ধ হয়ে যায়।
জেডি আকাশের দিকে ফিরে তাকায়। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আকাশের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। আকাশের চোখে চোখ রেখে ভাঙা গলায় বলে,

“তুই যাকে খুঁজছিস, তার নাম অধীর।”
আকাশ স্তব্ধ দৃষ্টিতে জেডির সাদা চোখের মণির দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করে, “অধীর?”
জেডি ডান হাতে মুখের রুমাল খুলে পকেটে রাখলো। এরপর আকাশের দিকে চেয়ে বলে,
“তুই তো জানতি এভি, আমার আরেকটি নাম অধীর। তবে সেদিন হুডিতে নামের প্রথম অক্ষর দু’টো দেখেও চিনতে পারিস নি কেন?”
আকাশ নির্বাক, নিশ্চুপ, স্তব্ধ হয়ে কেবল জেডিকে দেখে। জেডি প্রাণহীন হেসে বলে,
“আমার চোখের মণি যে সাদা এটাও তো তুই জানতি এভি।”
আকাশ জেডির দিকে নির্জীব দৃষ্টিতে চেয়ে ঢোক গিলে বলে,

“সবই জানতাম আমি। শুধু জানতাম না রাস্তা থেকে তুলে বুকে ঠাই দেয়া প্রিয়, আপন মানুষগুলো পিছন থেকে এতো নিখুঁতভাবে ছু’রি চালাতে পারে।”
জেডির বুকটা হু হু করে উঠল। সে ভাঙা গলায় বলে,
“যদি জানতাম, তোর আরও একবছর আগে স্মৃতি ফিরে এসেছে, তবে তোকে এতোদিন অপেক্ষা করতে হতো না। আমি আরও একবছর আগেই তোর সামনে এসে দাঁড়াতাম।”
আকাশের বুকে প্রচন্ড ব্য’থা শুরু হয়। মনে হচ্ছে শরীরে কেউ ছু’রি দিয়ে অনবরত কেচাচ্ছে। সে ভাঙা গলায় বলে,
“মোমবাতি নিজেই জানতো না, তার বুকের ভেতর জড়িয়ে রাখা সুতোটাই একদিন তাকে শেষ করে দিবে। আমি সেই মোমবাতি, আর সুতোটা তবে তুই। তাইনা জ্যাক?”
জেডি অসহায় কণ্ঠে বলে,

“আমি তোকে ক’ষ্ট দিতে চাইনি এভি।”
কথাটা শুনে আকাশ টলমলে চোখ নিয়ে হঠাৎ-ই শব্দ করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে ডান হাতে জেডির কাঁধ আঁকড়ে ধরে। ওভাবেই পা’গ’লের মতো হাসতে হাসতে বলে,
“জীবন্ত লা’শ বানিয়ে দিয়ে বলছিস, আমাকে ক’ষ্ট দিতে চাস নি। এ বছরের সেরা জোক্স মেবি এটাই হবে।”
এটুকু বলতে বলতে আকাশের হাসি থেমে যায়। সারামুখে তীব্র অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। এগিয়ে এসে ব্যস্ত হাতে জেডির হুডির চেইন খুলে ফেলে। ভেতরের পরনের শার্টের বোতাম একে একে খুলে জেডির ফর্সা শরীর উম্মুক্ত করে দেয়। দু’হাতে জেডির সারা বুক আলতো হাতে বুলিয়ে দেয় আর বলে,
“তোর বডিতে এই দাগগুলো কিভাবে হালকা হয়েছে জানিস জ্যাক? তুই তোর সৎ মায়ের হাতে মা’র খেয়ে যখন আমার কাছে ঘুমাতে আসতি। তুই ঘুমিয়ে গেলে আমি না ঘুমিয়ে তোর সারা শরীরে মলম লাগিয়ে দিতাম। তাই তোর এই দাগগুলো মুছে যাওয়ার পথে।”

কথাগুলো বলে আকাশ দু’পা পিছিয়ে আসে। এরপর তার শার্টের বোতাম দ্রুতহাতে খুলে ফেলে। ডান হাতে আকাশ তার সারাদেহে ছোপ ছোপ কালো পোড়া দাগ সাথে মুখে কয়েকজায়গার পোড়া দাগগুলো দেখায় আর বলে,
“আর এগুলো কিসের দাগ জানিস জ্যাক? যাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে এই বুকে জায়গা দিয়েছিলাম। যাকে আদর, ভালোবাসা দিয়ে নিজের ভাইয়ের জায়গা দিয়েছিলাম। যার সব ব্য’থা, দাগ মুছে দেয়ার জন্য বহুরাত ঘুম কামাই করতাম। সে আমার ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে উপহার স্বরূপ দিয়েছে শুধু দুঃখ, ক’ষ্ট, শতশত ব্য’থা। যা আমাকে জিন্দা লা’শ বানিয়ে দিয়েছে।
এটুকু বলে থামে আকাশ। গলা বেঁধে আসে। ডান হাতে ঝাপসা চোখজোড়া ডলে বলে,
“নিয়াজের জন্য আমি কোনোদিন কিছু করিনি। দু’টো ভালো কথা বলিনি ওর পাশে বসে। অথচ ও আমার জন্য ওর জীবনটাই দিয়ে দিল। আর যাকে আমি এতো ভালোবাসা দিলাম, সে আমাকে এসব কি দিল?
কেন এভাবে প্রতিদান দিলি জ্যাক? তুই আমার সাথে এই নোংরা খেলাটা কিভাবে খেলতে পারলি?”
আকাশের অসহায়ত্বে ঘেরা দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলাতে পারেনা জেডি। ঝাপসা চোখজোড়া সরিয়ে নিয়ে মাথা নিচু করে নেয়। ভাঙা গলায় বলে,

“যদি আমি বলি, তুই কিভাবে পারলি এভি, আমার প্রাণকে আমার থেকে কে’ড়ে নিতে?”
কথাটা শুনে আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়,
“প্রাণ?”
জেডি মাথা উঁচু করে তাকায় আকাশের দিকে। মলিন হেসে বলে,
“আমার প্রাণের কথা তোর মনে আছে এভি? একদিন যাকে আমরা পা’গ’লের মতো দু’জন মিলে খুঁজে বেড়াতাম!”
আকাশের বুকের বা পাশে চিনচিন করে উঠল। চোখেমুখে অজস্র বিস্ময় ফুটে ওঠে। জেডি কেন বলছে, সে জেডির প্রাণকে কে’ড়ে নিয়েছে? জেডি দু’হাতে ঝাপসা চোখজোড়া ডলে আকাশের দিকে চেয়ে বলতে শুরু করে,
“তোর মা আমাকে পছন্দ করত না বলে কত কত মিথ্যে বলেছিল তোকে। তুই কোনো যাচাইবাছাই না করে মায়ের কথা বিশ্বাস করে আমার সাথে কত রিয়েক্ট করেছিলি! আমার সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিলি। তোর চোখ দু’টো আমার পছন্দ বলে, তুই লেন্স পরে চোখ ঢেকে রাখতি। গলায়, হাতে চেইন পছন্দ করতাম বলে সেসব খুলে ছুঁড়ে ফেলেছিলি। আমি তোর অযথা রিয়েক্টে ক’ষ্ট পেলেও কখনো তোকে ভুল বুঝিনি। তোকে মানানোর জন্য কতকিছু করেছিলাম। তুই বারবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলি অথচ আমি থেমে যায়নি। এতো করে বোঝাতে চাইতাম, তোর মা যেগুলো বলেছে ওগুলো মিথ্যে। কিন্তু আমি তোকে বোঝাতে পারিনি। আর না তো তুই বুঝেছিস।
এতোকিছুর মাঝে হুট করেই আমি ভীষণ খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। মানে ভীষণ। বছরের পর বছর যে প্রাণের জন্য আমি অপেক্ষা করেছি, বছরের পর বছর দুই বন্ধু মিলে যে মেয়েকে আমরা খুঁজেছি। তার খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। খুব ভালোভাবে খোঁজ নিয়েছিলাম। সঠিক মানুষকেই খুঁজে পেয়েছিলাম। খুঁজে পেয়েছিলাম আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে।”

সন্ধ্যা নামটি শুনে আকাশ কেঁপে ওঠে। জেডি বুঝতে পেরে বিদ্রূপ হেসে বলে, “মনে হচ্ছে নাম শুনে ভ’য় পেলি? অথচ আমার প্রাণের নাম তো আমি সবার আগে তোকেই বলেছিলাম এভি।”
আকাশ শুকনো ঢোক গিলল। সে শুনেছিল ঠিক। নামটি একেবারে মনে নেই তা না। তবে এতোবছর না শোনায় জেডির প্রাণের নাম সন্ধ্যা এটা খেয়ালে ছিল না।
জেডি বলে,
“আমার সন্ধ্যাপ্রাণের ভাইয়ের নাম ছিল সৌম্য। এই নামটা তোকে বলা হয়নি। আজ বললাম।”
আকাশ জেডির দিকে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। জেডি আবারো বলতে শুরু করে,

“সন্ধ্যা, সৌম্যকে হারিয়ে ফেলার পর মাঝে অনেকগুলো বছর পেরিয়েছিল। চেহারায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। যেটা সৌম্য’র ক্ষেত্রেও এসেছিল। তাই আমাদের ভার্সিটিতে ওকে দেখলেও ঠিক করে চিনতে পারিনি। আগে জানতাম, আমি অধীরের ভালোবাসায় বিরক্ত হয়ে সৌম্য গ্রাম ছেড়েছে। সেই ভাবনা মাথায় আসলে, আমি সৌম্যকে খুঁজে পাওয়ার পরও আমি ওর সামনে অধীরের পরিচয়ে যায়নি। ভীষণ ভ’য় পেতাম। মনে হতো, সৌম্য যদি আমাকে রিজেক্ট করে দেয়। আমি জানতাম সন্ধ্যা খুব ভাই-পা’গ’ল টাইপ মেয়ে। ও বেঁকে গেলে সৌম্যও আর আমাকে দিবে না আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে। এসব বিবেচনা করে আমি ভার্সিটির জেডি হয়েই সৌম্য’র কাছে গিয়েছিলাম। প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আমি তার বোনকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু সৌম্য আমার প্রস্তাবটি শুনে ভীষণ রিয়েক্ট করেছিল। ওর সর্বশেষ কথা ছিল,

‘দরকার পড়লে আমি আমার বোনুকে কখনো বিয়েই দিব না। সারাজীবন আমি পালবো। কিন্তু আপনার মতো মানুষের কাছে আমি আমার বোনুকে দিব না।’
আমি এর প্রেক্ষিতে আর কোনো কথা বলিনি। চুপ ছিলাম। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি নিজের আসল পরিচয় দিব সৌম্যকে। এরপর সৌম্য যা-ই বলুক না কেন! আমি আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে বিয়ে করবোই। আর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি তোর কাছে যাচ্ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, আমি আমার সন্ধ্যাপ্রাণের খোঁজ পেয়েছি, তুই এটা জানলে সব রা’গ, অভিমান ভুলে যাবি। আর তুই সব সামলেও নিবি। তুই সৌম্যকে ম্যানেজ করে নিজে দাঁড়িয়ে আমার আর সন্ধ্যাপ্রাণের বিয়ে দিবি। কারণ এটা তো তোর অনেকগুলোর স্বপ্নের মাঝে একটি অন্যতম স্বপ্ন ছিল।

কিন্তু রাস্তার মাঝপথে খবর পাই, আমার বাবা মা’রা গেছে। খবরটি পেয়ে মনে হলো আমার পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছে। আমি সেখান থেকেই ব্যাক করি এয়ার্পোরটের উদ্দেশ্যে। সেদিনই ইংল্যান্ডের ফ্লাইটে উঠে পড়ি। মাথা কাজ করছিল না। ভেবেছিলাম ইংল্যান্ড গিয়ে তোকে খবর দিব। কিন্তু ইংল্যান্ড গিয়ে জানতে পারি আমার বাবা মা’রা যায়নি৷ সে দিব্যি বেঁচে আছে। হেসেখেলে থাকছে। আমি সৌম্য-সন্ধ্যাদের খোঁজ পেয়েছি জানতে পেরে বাবা আমার সাথে এই গেইম টা খেলেছিল। আমি ভীষণ রে’গে গিয়েছিলাম বাবার উপর। কথা বাড়ছিল, একপর্যায়ে হাতাহাতি পর্যায়ে চলে যায়। আর এক্সিডেন্টলি আমার হাতে বাবার মৃ’ত্যু হয়। যেটা আমার কাছে টোটালি আনএক্সেপেক্টেড ছিল। বাবাকে পছন্দ করতাম না। বাবা আমাকে খুব একটা ভালোবাসতো না জানতাম। কিন্তু বাবার প্রতি আমার মাঝে ভালোবাসা ছিল। আমি তাকে মা’র’তে চাইনি। বাবাকে ওভাবে হারিয়ে আমি দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর আমাকে খু’নের দায়ে জে’লে নিয়ে যাওয়া হয়। বাবার জন্য খুব কাঁদছিলাম, ওদের সবাইকে এতো করে বললাম,

‘আমি আমার বাবার ইচ্ছা করে মা’রিনি। আমাকে ছেড়ে দাও। আমি একবার বাবার লা’শ দেখতে চাই। আমার এক বাংলাদেশি বন্ধুর সাথে কথা বলতে চাই।’
কিন্তু পু’লি’শগুলো শুনলো না আমার কথা। দেখতে দিল না বাবার লা’শ। তোর সাথে একটাবার যোগাযোগ করতে দিল না। আমাকে জে’লে পুড়ে দিল। সেই অন্ধকার কুঠুরিতে বসে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চাতক পাখির ন্যায় তোর অপেক্ষা করেছি। ভেবেছিলাম তুই আমাকে খুঁজে না পেয়ে একবার ইংল্যান্ড আসবি। এখানে এসে আমার বাড়িতে আমার খোঁজ করলে ওরা সবাই তোকে বলবে, আমি জে’লে বন্দি। কিন্তু তুই আসিস নি এভি। ওই অন্ধকার ঘরে বসে আমি কত হাজার কণা অশ্রু বিস্রজন দিয়েছি শুধু তোর অপেক্ষায়, তার হিসেব নেই রে। এমন কোনো দিন নেই পু’লি’শদের জিজ্ঞেস করিনি, কেউ আমার খোঁজ করতে এসেছিল না-কি! কিন্তু প্রতিদিন তাদের উত্তর হত, কেউ আমার খোঁজ করতে আসেনি। মাঝে মাঝে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতাম। তোর জন্য, আমার সন্ধ্যাপ্রাণের জন্য, সৌম্য’র জন্য, বাবার জন্য। দেখতে দেখতে কেটে গেল পুরো চার বছর। এরপর আমার বাবার এক বন্ধু অনেক কসরত করে আমাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নেয়। পুরো চারটে বছর পর সেদিন আমি মুক্ত পাখির ন্যায় উড়তে পেরেছিলাম। ছুটে এসেছিলাম বাংলাদেশে। তোর উপর খুব রা’গ, অভিমান ছিল। কিন্তু ভেবেছিলাম, ওসব মনে রাখবো না। সব মিটিয়ে নিব। দরকার পড়লে আমি নিজেই তোর কাছে ক্ষমা চাইবো। আর তারপর তোকে আমার সন্ধ্যাপ্রাণের কথা জানিয়ে, আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে বিয়ে করব। শুধু এটুকু ভাবনা নিয়ে পা’গ’লের মতো ছুটে এসেছিলাম বাংলাদেশে।

কিন্তু জীবনে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা সেদিনই খেয়েছিলাম। যেদিন আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর বউরূপে দেখেছিলাম। শুধু বউ নয়। শুনেছিলাম আমার সন্ধ্যাপ্রাণের পেটে আমার প্রিয় বন্ধুর ছোট্ট একটি বাচ্চা একটু একটু করে বড় হচ্ছে। দুনিয়া থমকে গিয়েছিল। এতো ক’ষ্ট কোনোদিন হয়নি। যেই সৌম্য একদিন আমাকে কথা দিয়েছিল, সে বেঁচে থাকতে তার বোনুকে আমি ছাড়া অন্যকারো হাতে তুলে দিবে না। সেই সৌম্য নিজের বোনকে ঠিকই আরেকজনের হাতে তুলে দিয়ে নিজেও বিয়ে করে সুখে সংসার করছিল। আর আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু এভি, যে আমার সাথে আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে বিয়ে দেয়ার জন্য নিজেই মরিয়া ছিল, যে আমাকে দুঃখ পেতে দেখে, নিয়ম করে বলত,

‘দেখ জ্যাক, মেয়ে মানুষদের মতো চোখ ভেজাবি না তাও আবার একটা মেয়ের জন্য। আমি তো বলেছি, আমি তোর প্রাণকে খুঁজে বের করে নিজে দাঁড়িয়ে তোদের বিয়ে দিব। এমনিতেও আমার বিয়ে করার শখ নেই। তারপরও যদি আমাকে বিয়ে করতে হয়, তবুও করবনা। যতদিন না তোর প্রাণকে খুঁজে বের করে তোর সাথে মিলিয়ে দিতে পারছি।’
সেই এভি আমাকে দেয়া সব কথা ভুলে গিয়ে বিয়ে করে নিয়েছিল। বাচ্চার বাবাও হতে যাচ্ছিল। আর সেই মেয়েটি অন্যকেউ নয়। আমারই সন্ধ্যাপ্রাণ।”
কথাগুলো বলতে বলতে জেডির দু’চোখবেয়ে অজস্র অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ে। কথাগুলো বলতে বলতেই সে মাটিতে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ে। দু’হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বলে,

“আমার ভালোবাসা, আমার মায়া, আমার প্রাণ। আমি আমার প্রাণকে ছাড়া বাঁচার কথা ভাবতে পরিনা। তুই তো একদিন আমায় কথা দিয়েছিলি, আমার প্রাণকে আমার বুকে তুই নিজ দায়িত্বে ফিরিয়ে দিবি। আজ তবে ওকে আমায় দিয়ে দে এভি। আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোর বাচ্চার গায়ে একটা ফুলের টোকাও দিব না। তুই তোর ৫ বছরের ভালোবাসা ভুলতে পারছিস না। ৫ বছরের মায়া কাটাতে পারছিস না৷ তবে আমি কিভাবে আমার ১৬ বছরের মায়া কাটাবো বল? কিভাবে আমার ১৬ বছরের ভালোবাসার প্রাণকে ভুল যাবো এভি? আমার প্রাণকে আমাকে ভিক্ষা দিয়ে দে।”

কথাগুলো বলতে বলতে জেডি তার দু’হাতের মাঝে মুখ রেখে বাচ্চাদের মতো কেঁদে ওঠে।
আকাশ একেবারে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শরীরটা ভেঙে আসছে মনে হচ্ছে। সারা শরীরে অসহ্য ব্য’থা সাপের বি’ষের ন্যায় ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। চোখ দু’টো টকটকে লাল। সেই টকটকে লালিত দু’চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। বারবার মাথায় বাজছে সে জ্যাকের প্রাণকে বিয়ে করেছিল। যার জন্য জ্যাক কত বালিশ ভিজিয়েছিল। কত ছটফট করেছে, এসবের সাক্ষী তো আকাশ নিজেই। সে তার প্রিয় বন্ধুর ছটফটানি সহ্য করতে না পেরে বলত,
‘তুই দেখে নিস জ্যাক, আমি তোর প্রাণকে খুঁজে বের না করা পর্যন্ত দম নিব না।’

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২২

জ্যাকের প্রাণকে সে খুঁজে তো পেয়েছিল, কিন্তু সে জ্যাককে দেয়া কথা ভেঙে নিজেই জ্যাকের প্রাণকে বিয়ে করে নিয়েছিল। কিন্তু সে তো জানতো না তার সন্ধ্যামালতী জ্যাকের প্রাণ। তার সবচেয়ে প্রিয় নারী, মায়ার নারী, ভালোবাসার নারী তারই প্রিয় বন্ধুর মনের মানুষ। সে কি করে সহ্য করবে এসব?

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৪