তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৩
রাফিয়া জান্নাত রিফা
বাড়ির তিন কর্তা অফিসে গেছেন। অফিসের যা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ করে তারা রাতে গ্রামের উদ্দেশ্য রহনা দিবে। আলবান, আর্দ্র,দির্শক কেউ আজ কাজে যায় নি মা আলিফা বেগম কড়া আদেশ জারি করেছেন ” আজ কেউ কোথাও যাবে না,আজ সবাই গ্রামের বাড়ি যাব”।
পিকি তো মহা খুশি গ্রামে যাবে বলে। নিঝুম,নিলা বেগম তারাও যাবেন।
আছিয়া বেগম,আলিফা বেগম, সিদ্দিকী বেগম,মিলি বেগম,নিলা বেগম বোরকা পরিধান করছেন।সব গোছগাছ শেষ এখন গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সাথে নিঝুম ও মুহিন।
তিন আলোকছটা এখনো নিজেদের রুম থেকে বের এ হয় নি।এ জন্য ভীষণ রেগে আছেন মা সিদ্দিকী বেগম। এদের নিয়ে এই এক জ্বালা হয়েছে তার। ওদের ই বা কি দোষ তিন বোনেই তো একসাথে রেডি হয় তাও আবার একটা রুমে, আহামরি সাজুগুজু ও করে না তাও কোথাও গেলে তাদেরই লেট হয়।
বিরক্তি রেশ টেনে সিদ্দিকী বেগম বলেন,,,
__ বুবু জান এই মেয়ে গুলো আর ভালো হবে না।আমার আর ভালো লাগে না।সবাই রেডি হয়ে বসে আছি কিন্তু ওরা নেই?কেমনটা লাগে বলো তো?
__ আহ মেজো,লাগুক না একটু সময়।
নিলা বেগম বলেন,,,
__ ভাবি একটা গাড়িতে জায়গায় হবে সবার,আলবান, আর্দ্র,দির্শক ওরা বসবে কোথায়?
আলিফা বেগম গর্ব করে উওর দিলো বোধহয় ,,
__ আমার তিন ছেলেরই বাইক আছে বাইক?ওর ওতেই যাবে?
__ সে কই তোমার তিন ছেলে?
__ তোমরা সবাই গাড়িতে গিয়ে বসো,ওরা আসছে হয়তো।
সবাই গাড়িতে উঠে বসতে লাগলো কিন্তু নিঝুম উঠছে না সে মনে মনে এক প্লান কষলো কোন কিছু একটা করে হলেও আলবানেল সাথে বাইকে যেতে হবে “। গাড়িতে বসে নিলা বেগম গলা উঁচিয়ে নিঝুম কে বলে,,,
__ কি রে আয়?
ভাব ভঙ্গি পরিবর্তন করে নিঝুম বলে,,
__ ইতি, বিথী, নীধি আসুক মা?
__ ওরা আসবে খন।এখন তুই এসে এখানে বস?
__ মা ওরা আসুক না?
মেজাজ দেখিয়ে নিলা বেগম বলেন,,,
__ আমি আসতে বলছি?
মুখ খানা অন্ধকার করে নিলা বেগমের পাশে বসলো নিঝুম।
সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে দৌড়ে নামছে ইতি, নিধি কিন্তু বিথী কে দেখা গেল না। ড্রয়িং রুমে দাড়িয়ে ইতি সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ উফফ বাবা বিথী আসছে না কেন?? কই রে বিথী?নাম তাড়াতাড়ি?
বিথী ও দৌড়ে দৌড়ে নামতে লাগলো।তিন বোনেই মেরুন রঙের সুক্ষ্ম বুনন করা ভারি তাঁত,গোল কুচি কাঁটা জামা পরিধান করছে।মাথায় কালো রংয়ের হিজাব মোড়ানো,ডান সাইড দিয়ে মেরুন রঙের ওড়না কাঁধ বরাবর ঝুলিয়ে রেখেছে,ওই কাঁধে ছোট পার্স ব্যাগও ঝুলছে। ঠোঁট হালকা গোলাপি লিপস্টিক দিয়েছে,থুথতি বরাবর সার্জিক্যাল মার্ক্স টানটান ভাবে পড়ে আছে। সার্জিক্যাল মার্ক্স পড়ার কারণ একটাই যেবারই গ্রামের যায় সেবারই ধুলো বালি লেগে সর্দি, কাশি শুরু হয়। এজন্য মা সিদ্দিকী বেগম কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন মাক্স না পড়ে বের হবি না।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে হঠাৎ বাম পায়ে মোচড় খেয়ে উল্টো ডান দিকে পড়তে লাগলো বিথী।তখনি শক্ত দুটো হাত বিথীর কোমড় আঁকড়ে ধরল। অকস্মাৎ এমন অবস্থা বিথীর মনে হলো সে শূন্য ঝুলে আছে,হাত দুটো নেতিয়ে পড়েছে। বিথীকে জড়িয়ে রাখা হাত দুটো আরো শক্ত করে টেনে নিলো নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিলো, বিথীর চোখ উল্টিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলো,তাকে বেশ শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরে রেখেছে দির্শক প্রধান।অপলক চোখে তাকিয়ে দেখতে লাগলো দির্শককে।
আজকাল দির্শককে বেশ মনে ধরে বিথীর। সবচেয়ে নজর কেড়েছে দির্শকে বাবরি চুল গুলো।আজকাল দির্শককের গভীর তীক্ষ্ণ সমুদ্রের মতো টেউ খেলানো নীল চোখে ডুবে যেতে মন চায়।বেশ নির্লজ্জ ও হচ্ছে বটে।
বিথী কে ধরার ফলে দির্শকে বেশ ঝুঁকে পড়েছে তাতে দির্শকে গলার চেইনে সিলভার রঙের মাঝখানে ডানা মেলা একটা ঈগল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আকর্ষণ কাড়ছে বেশ।ব্লাক মেটাল ফিনিশিং করা। ঈগলের চোখে রঙিন স্টোন ক্রাশার বসানো যা ঝলঝল করছে।
বিথীর চোখে পড়লো সেটি। মুহূর্তেই বিথীর শরীর ঝাকুনি দিয়ে উঠলো। চোখ তীক্ষ্ণ করে ঈগল পাখিটির চোখ দেখলো,চোখ জলজল করছে সোনালী আভায়। ভয়ংকর লাগলো বিথীর কাছে। সেখান থেকে চোখ সরিয়ে দির্শকের দিকে চোখে চোখ রাখলো।দির্শক ভ্রু নাচালো,,,
__ ফেলে দেই?কি বলো?
বাঁকা হাসি দিয়ে বিথী বলে,,,
__ এর পরিণাম ভয়ংকর হবে দু্ষ্শমন স্যার।
দির্শক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,,
__ আই নো।
এই বলে দির্শক তুলে দ্বার করালো বিথীকে।দার হতেই বিথীর চোখ গেলো চেইনের ঈগল পাখিটির দিকে। চোখে মুখে সন্দেহের ভাঁজ এনে বিথী বলে,,,
__ একটু আগেই চেইনের ঈগল পাখিটির চোখ জোড়া জ্বলছিল।এখন নেই কেনো?
দির্শক চেইনটির দিকে একবার তাকিয়ে প্যান্টের পকেটে হাত গুজে উওর দিলো,,
__ ও আমার হার্টের খবর জানে, আমার হার্ট উইক হলে ওর চোখ জ্বলে ওঠে।
মূহুর্তেই বিথী চোখ মুখ কুঁচকে নিলো, কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই প্রশ্ন করলো,,,
__ আপনি তো স্যার মানুষ,তাই আপনি এসব ক্যারি করেন, ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না।
দির্শকের নির্বিকার উওর,,
__ এসব কারো পরিচয় বহন করে না,দৃঢ় ও আত্মিক উদ্দীপনা মাধ্যম বোঝায় মাএ।
দির্শকে এবার হাত জোরা বক্ষে গুজে শীতল চাহনি দিয়ে বিথীর উপর নিচ পরখ করে বললো,,,
__ বোরকা কই?
কথাটা কেমন যেনো ক্রুদ্ধ শুনালো বিথী কানে।
__ মানে?
__ বাংলা বোঝো না? বললাম বোরকা নেই তোমার?
__ হুম আছে?
__ তবে পড়ো নি যে?
__ কেন পড়বো?
__ নিজেকে হেফাজতে রাখার জন্য?
__ নিজের পরিবার সাথে আছে।এদের কাছেই তো সর্ব স্তরের হেফাজতে আছি,তাই নিছোক ভাবে বোরকা পড়বো কেনো।
__ ছেলেদের লোভনীয় দৃষ্টি উপেক্ষা করার জন্য?
__ এর জন্য আলবান ভাই, আর্দ্র ভাই আপনারাই যথেষ্ট নন কি? আপনাদের দ্বারা যদি ওই লোভনীয় দৃষ্টি কে তুলে নেওয়া সম্ভব না হয়, তবে আমি একাই ওই লোভনীয় দৃষ্টি তুলে লুডু লেখার জন্য প্রস্তুত।
দির্শকের কথা খানা বেশ পছন্দ হলো।মুখ উপরে তুলে হো হো করে হেসে উঠলো দির্শকে,,,
__ বড্ড সাহস তোমার বিথী?
__ কোন সন্দেহ?
__ নো ওয়ে? তবে এত সাহস কুলাবে তো?
অলসে ভাব নিয়ে বিথী বলে,,
__ শুধু কুলোবে না ধ্বংস ও করবে?
ইতি,নিধি বিরক্তির সহিত তখন থেকেই এদের কথা শুনেই যাচ্ছে।ইতি ধৈর্যে আর টান দিলো না, হনহনিয়ে বিথীর কাছে গিয়ে বাহুতে থাপ্পড় মেরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,
__ গল্প করতে ধরলে ? মনে থাকে না যে কোন যুগে আছিস,ওরে এ হলো মায়ের মাইর খাওয়ার যুগ, রেগে মেগে আগুন হয়ে আছে মা।চল তাড়াতাড়ি?
এবার দির্শকে দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ দুষ্শমন স্যার আপনার ও বিথীর মতো সমস্যা হচ্ছে দিন দিন?
এই বলে ইতি বিথীর হাত ধরে টানতে টানতে চলে যায়। নিধি যেতে যেতে বিথী কে বলে,,,
__ বাবা গো কি লুমান্টিক কাহানি মে তো মার গই ।
দির্শক থ মেরে কিছুক্ষণ ভাবতে থাকে। সত্যিই আজকাল দির্শককের হার্ট অনেক উইক হয়ে পড়ে বিথী সামনে আসলেই। নিজেকে অনেক বোঝায় বিথীর থেকে দূরে থাকতে কিন্তু তাও নিজের অজান্তেই অনেক কিছু ভাবে ও করে বসে।এই টুকু পিচ্চি মেয়ের চোখে অনেক অনেক ভয়ংকর আগুন দেখে সে।দির্শক সেই আগুনে যে পুড়ে যাচ্ছে তাও বুঝতে পারে ভালো ভাবে। তবুও সেই আগুনেই দগ্ধ হওয়ার তীব্র ইচ্ছা ও আকাংক্ষা জাগে দির্শকের। বরাবরই নিষিদ্ধ জিনিস দিকেই সবারই ঝোঁক, আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছাটাই বেশি থাকে।
মাইক্রো ইউএসবি গাড়ি সেখানে আছিয়া বেগম,আলিফা বেগম, সিদ্দিকী বেগম,মিলি বেগম, নিঝুম, নিখিল, মুহিন, মিশকাত,পিকি বসে।
সব থেকে বেশি খুশি পিকি। চোখে মুখে খুশির ঝিলিক উপচে পড়ছে। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক তো আছেই,এক কানে দুল পড়ছে, শার্টের মতো ভারি জেকেট পরিধান করছে শার্টে নানা ধরনের চুপকি বসনো, শার্টের চারপাশে নানান ধরনের রঙিন কাপড়ের তৈরিকৃত ফুল দেখা গেল।এিকনিক ভাবে গলার অর্ধেকংশ দেখা যাচ্ছে। গলায় পাতলা হার ঝুলছে সবার থেকে আলাদা লাগছে পিকিকে। গাড়ির ড্রাইভার বারবার পিছোন ঘুরে পিকি কে দেখছে।
ড্রাইভারের সাথে বসেছে বাগানের মালি,ও মোজাম্মেল চাচা।
মুমিনের পাশে বসে আছে পিকি,এতে মহা বিরক্তিবোধে রয়েছে মুহিন। বারবার কেন এই পিকি মুহিনের আশেপাশে আসে?কেন?কেন?এসব ভেবেই মুহিনের মুখখানা চুপছে যাচ্ছে। এমনিতেই পিকি কে দেখলে মনের সব কষ্ট উতাল পাতাল টেউ খেলা শুরু করে।কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে সেখানেই ঠাঁয় বসে রইল আড়ো চোখ দিয়ে বারবার পিকি দেখছেও। মুহিন ডানপাশে বসেছে মিশকাত,আবার মিশকাতের পাশে নিখিল বসেছে।মুহিনেই মাঝে তাই তার অবস্থাও শোচনীয়,চাপাতু লেগে অসহায় মুখ নিয়ে বসে আছে।পিকি তো পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে।এতে মুহিনের রাগ হলো,,,
__ ওভাবে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছো কেন পিকি ভাই?
পিকি মুহিনের দিকে তাকিয়ে লাল লিপস্টিক মাখা ঠোঁট স্নিগ্ধ ছোঁয়া হাঁসি দিয়ে বলে,,,
__ ব্যাথা লাগে মুহিন??
মুখ কুঁচকে মুহিন বলে,,,
__ কিহহহ
__ একটু একটু জ্বালা ও ব্যাথা করে?
এই মূহুর্তে মুহিন পিকি এই কথার অর্থই বুঝলো না। তবে নিজের মতো করে উল্টো কিছু ভেবে বসলো,ইতমস্ত হয়ে কপালে দিগুন ভাঁজ ফেলে বললো,,,
__ ক কি বলছো? তোমার জ্বলে মানে? কি জ্বলে?কি বোঝাতে চাচ্ছো?
__ আরে চেদিন আমার পশ্চাৎ এ ছ্যাঁকা লাগলো না?সেকানেই জ্বলে,ব্যাথা কলে।
এবার ভালো ভাবে বুঝতে পারলো মুহিন। ছোট করে উওর দিলো,,,
__ ওহহ
নিশ্চুপ থেকে আবার বললো মুহিন,,
__ মলম লাগাও নি?
__ হাত যা না ছেখানে?
মুখে হাত চেপে হাসলো মুহিন।আর কিছু বললো না।
মাইক্রো গাড়িটা লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।ইতি, বিথী, নীধির জায়গা রইল না গাড়িতে। তিনজনই গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইল। সিদ্দিকী বেগম এ নিয়ে মহা ঝামেলায় পড়লেন গাড়ির জানালার কুনুই ভর করে গালে হাত দিয়ে রইলেন।ইতি বলে,,
__ উফফ যাবো কি যাবো না কিছু তো বলো নাকি?
সিদ্দিকী বেগম গম্ভীর কন্ঠে বলেন,,,
__ তোদের যেতে হবে না এখানেই থাক?
সিদ্দিকী বেগমের পাশে বসা আলিফা বেগম বলেন,,,
__ মেজো এমন করে বলছিস কেন? ওরা না হয় আলবান, আর্দ্র, দির্শকের বাইকে করে যাবে?
সিদ্দিকী বেগম আর কিছু বললেন না।আলবান, আর্দ্র,দির্শক গ্যারেজ থেকে নিজেদের বাইট বের করে গেটের সামনে আনলো। তিন জনেই মাথায় হেলমেট পরিধান করলো।
ইতি, বিথী, নীধি দাঁড়িয়ে আছে দেখে আলবান গলা উঁচিয়ে তার মাকে বললো,,,
__ কোন সমস্যা মা?
আলিফা বেগম বলেন,,,
__ ইতি, বিথী, নীধির বসার জায়গা নেই?
__ তবে রেখে যাও ওদের?
__ মজা করিস না তো? তোদের বাইকে করে নিয়ে যা ওদের?
__ কে আমি?
__ সাথে দির্শক, আর্দ্র ও।
__ কোন কাল নাগিনীদের আমি আমার বাইকে তুলতে পাবো না?সাফ সাফ কথা।
এমন কথা শুনে ইতির মেজাজ খানা বেশ বিগড়ে গেল।আলবান কে উদ্দেশ্য করে আলিফা বেগমকে বললেন,,,
__ বড় মা আমি তোমার কোলে বসে যাবো? তাও কোন রাগি চন্ডার সাথে যাবো না?
আলবান রাগে গজগজ করে বলে,,,
__ মা ওকে মুখ সামলিয়ে কথা বলতে বলো,না হলে বাইক থেকে নেমে ওর মুখ ভেঙ্গে দেবো?
ইতি ও রাগ দেখিয়ে বুক ফুলানো ভাব নিয়ে বলে,,,
__ ওই ভয় দেখাতেই পারেন শুধু?
আলবান এবার রাগ দেখিয়ে বাইক থেকে নামার জন্য উদ্বিগ্ন হলেই ইতি ভয়ে শুকনো ঢোঁক গিলে ছটফটিয়ে বলে,,,
__ বড় মা তোমার ছেলেকে আটকাও।
আলিফা বেগম নিজের মাথায় নিজেই চাপ্পর মেড়ে বলে,,,
__ উফফ তোরা থামবি?
__ আলবান তুই কি সত্যিই ইতিকে তোর বাইকে নিবি নাহ?
আলবান মুখটাকে ঘুরিয়ে হেলমেটটা ঠিক করে পড়তে পড়তে বলে,,,
__ তুমি বলছো বলে নিচ্ছি?নাহলে আমার এত ঠেকা বাজে নি?
ইতি ও চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলে,,,
__ আমার ও আপনার গাড়িতে ওঠার কোন শখ নেই?যাবো না আমি আপনার বাইকে?যান।
সিদ্দিকী প্রচুর রেগে ড্রাইভার কে বলে,,,
__ ভাই চলেন তো? এদের নাটক আর ভালো লাগছে না?
কথা অনুযায়ী ড্রাইভার ও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চললো, আলিফা বেগম গাড়ি থেকেই বলে,,,
__ সাবধানে আসবি তোরা?
ইতি গলা উঁচিয়ে কাদো কাঁদো স্বরে তার মাকে বলে,,,
__ হ্যাঁ হ্যাঁ যাও,আমরা তো তোমার মেয়ে নই যে আমাদের জন্য টেনশন করবে। যেদিন আমাদের বিয়ে হয়ে যাবে সেদিন বুঝবে। তিনজনই আর আসবো না ।এ বাড়িতে পা ও মাড়াবো না।হু তখন বুঝবে?
বিথী,নিধি এতক্ষণ যাবৎ ইতির দিকেই তাকিয়ে ছিল,ইতি তাদের দেখে বলে,,,
__ কি হলো দাঁড়িয়ে আছিস কেন,চল?
নিধি তো এক প্রকার দৌড় গিয়ে আর্দ্রের বাইকের পিছনে ভালোভাবে বসলো। আর্দ্র ভ্রু নাচিয়ে বলল,,
__ আমার এখানে আসলে যে?
__ এই বাইকটার কালার ও ডিজাইনটা আমার অনেক পছন্দের?
__ হবেই তো?সে জন্যই যে কেনা?
নিধি খুশি হয়ে বলে,,,
__ আমার জন্য কিনেছেন বুঝি?
প্রানোবন্ত হাঁসি দিয়ে আর্দ্র বলে,,,
__ পছন্দের রং যে তাই?ভালো করে ধরে বসো?
কিছু একটা ভেবে মুচকি হাসলো নিধি ,,,
__ কোথায় হাত দিবো, পেটে নাকি কাঁধে।
__ যেখানে খুশি?
ইতি, বিথী দুজনেই নিধী কান্ড এতক্ষণ যাবৎ দেখে থ লেগে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ নিধি আর আর্দ্রের কথোপকথন শুনলো ,তারপর দুজন দুজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো, দুজনেই দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।
ইতি কিছু একটা ভেবে বিথী কে বলে,,,
__ বিথী তুই দাবালন ভাইয়ের সাথে যা?আমি দুষ্শমন স্যারের সাথে যাই।
বিথীর না বোধক উওর হলেও ইতির কথা মতো আলবানের বাইকের কাছে গেল। এদিকে দির্শকের ইতির কথা মোটেও পছন্দ হয়নি।কিছুটা রাগ নিয়েই দির্শক আমতা আমতা করে বললো,,,
__ ইতি তুমি না হয় আলবানের সাথে যাও?
ইতির নিরেট জবাব,,,
__ ওই লোকের গাঁয়ে গন্ধ স্যার,তাই আমি যাবো না ওনার সাথে?
আলবানের কানে কথা খানা পৌঁছা মাত্র বাইক থেকে নেমে তড়িৎ বেগে ইতি কাছে এসে হাতটা টানতে টানতে আবার বাইকের কাছে নিয়ে গেল। আলবান বিথী কে ঝংকার গলায় বললো,,,
__ তুই দির্শকের সাথে যা?
বিথী টু শব্দটি না করে বাধ্য মেয়ের মত দির্শকের বাইকের দিকে এগোতে লাগলো।এবার জোরে ঝংকার দিয়ে বিথী কে ইতি বললো,,,
__ কোথাও যাবি না বিথী, তুই এই লোকের সাথে যাবি আর আমি দুষ্শমন স্যারের সাথে যাবো।
বিথী আবার থেমে গেলো।আবার আলবান বললো,,,
__ বিথী তুই দির্শকের সাথে যাবি?
আবার ইতি বলে,,,
__ বিথী তুই দাবালন ভাইয়ের সাথে যাবি?
আলবান ইতির হাত আরো জোরে চেপে ধরে রাগে কটমট করে বলে,,
__ বিথী আমার কথা শুনবে?
ইতি ও দমে যাওয়ার মেয়ে না সে ও বেশ রাগ দেখিয়ে বলে,,
__ বিথী আমার কথা শুনবে?
এদের এই কথা চলতেই থাকলো মাঝখানে দির্শক গম্ভীর কন্ঠে বললো,,,
__ বিথী তুমি আমার কথা শুনবে? তুমি আমার দিকে আসো?কাম,কাম।
বিথী ও বেশ বিরক্তি ধরে গেল, অসহায় মুখ খানা আকাশ পানে তুলে বললো,,
__ বিধি তুমি বলে দাও আমি কার ,তিনটে মানুষের একটা নারী সিটের দাবিদার?
দির্শক গলাটাকে আরো গম্ভীর করে চোখ কুচকে রাগি কন্ঠে বলে,,,
__ একটি মানুষেরই থাকবে , এদিকে আসো?আসো বলছি?
বিথী ইতির দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ সরি বনু, তোদের ঝগড়ার মাঝে ডাল মে কুছ কালা হতে চাচ্ছি না।আমি গেলাম দুষ্শমন স্যারের সাথে।
এই বলে বিথী দৌড় গিয়ে দির্শকের বাইকের পিছোনে বসলো।
__ ভালো করে ধরে বসো?
বিথী দু হাত দিয়ে দির্শকে গলা চিপে ধরলো।দির্শক এতে তম্বা খেয়ে গেল,,,
__ ওভাবে গলা চিপে মারতে চাচ্ছো নাকি?
__ আরে না না , এভাবে ধরলে আপনিও পড়বেন না আর আমিও আপনার গলা ছাড়বো না?তাই আমিও সেফ আপনিও সেফ।
__ ধ্যাত,ওভাবে গলা চিপে ধরলে এখুনি আমি মরে যাবো।
__ আরেহ আস্তে ধরবো তো?
__ গলা থেকে হাত নামাও?
__ তাহলে ধরবো কোথায়?
__ পেটে ধরো?
__ আপনার পেটে কাতুকুতু নেই?
__ আছে, কিন্তু অল্প তাই সাবধান ধরবে?
__ না বাবা থাক,আমি আপনার মাথা ধরি তবে?
__ আরে ধ্যাত,?
__ আবার কি হলো?
দির্শক লম্বা শ্বাস ফেলে মনে মনে আওরালো,,
__ উফফ এই মেয়ের সাথে এত যে কেন কথা বাড়াই?
বিথীর হাতটা ধরে নিজের কাঁধে রাখলো দির্শক,,
__ এবার ঠিক আছে?
হঠাৎ এমন স্পর্শে বিথীর শরীর আবারো শিরশির করে উঠলো।
মুখ ফুলিয়ে বুকে হাত গুজে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে ইতি,আলবান বাইকে উঠে বলে,,
__ ওঠ?
__ আপনার গায়ে গন্ধ?
__ মেজাজ খারাপ করিস না ইতি?আয় শুঁকে দেখ তো,দেখি কেমন গন্ধ পাস?Commodity মিনিমালিস্ট ডিজাইন ও ক্লিন পারফিউম ইউজ করি আমি।
__ গায়ে গন্ধ আছে স্বীকার করছেন তবে?
__ ইতিইইইইইই?
__ গন্ধ ডাকার জন্য আবার ব্যান্ডের পারফিউম ইউজ করে,হু।
ওদিক থেকে নিধি গলা উঁচিয়ে বলে,,,
__ বিথী তাড়াতাড়ি ওঠ? যেতে হবে তো?
বাধ্য হয়ে ইতি উঠে বসলো।বসতে আলবানের শরীরের তীব্র ঝাঁঝালো মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে আসলো,চোখ বন্ধ করে ঘ্রাণটি নিলো। শরীরের রন্ধে রন্ধে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করছে যেন। কিন্তু আলবানের শরীর যে সুগন্ধি আছে তা তো আলবানকে বুঝতে দিলে চলবে না।তাই ব্যঙ্গ করে এক হাত দিয়ে নাক চেপে ইতি বলতে লাগলো,,,
__উুয়াক থু, কি বাজে গন্ধ?
আলবানের বাইকের ছোট আয়নাটাতে স্পষ্ট ভাবে দেখতে পেলো একটু আগে বিথী কিভাবে ঘ্রাণটি শুকছিলো,তাই ইতির মুখে বলা এ কথা যে মিথ্যা তা ধরতে সময় লাগলো না আলবানের। মুখে ডেভিল হাসি দিলো,বাইক স্টাট দিতে দিতে মনে মনে বললো,,,
__ এই মেয়ে ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না,ওকে ডোন্ট ওয়ারি আমার কাছে এসেছিস মানে ভাঙ্গতেও হবে মচকাতেও হবে।
গাড়ির স্টাট দিয়ে চলমান হতেই ইতি হুড়মুড়িয়ে আলবানের পেট দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলো।
তিনটি বাইট একসাথেই চললো তাদের নির্দিষ্ট প্রেয়সীদের নিয়ে।
নিধির তো প্রচুর খুশি তার খুবই বড় ইচ্ছে এভাবে বাইকে চড়ে উড়ে বেরানো।আবার ভয় ও লাগছে যদিও বেশি একটি স্পিডে বাইকটি চলছে না তবুও ভয় লাগছে নিধির।মুখটাকে কাচুমাচু করে বলে,,,
__ পাদরো ভাই আমার খুব ভয় করছে?
__ আমি থাকতেও ভয়?
কথাটাতে অনেক অনেক বেশি আচ্ছাস পেলো বোধহয় নিধি, নিজেকে বেশ শক্ত ও করলো,,
__ তাও একটু একটু করছে?
__ভয় নেই আমি আছি?আগে কখনো বাইকে উঠোনি তাই এতো ভয় করছে, কিছুক্ষণ পর আর ভয় করবে না। আমাকে ভালো করে ধরে বসো?
নিধি এবার বেশ শক্ত করে দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলো আর্দ্রেকে ,দুটো শরীরে এক ইঞ্চি ও ফারাক থাকলো না। এমন হুটহাট স্পর্শে আর্দ্র কেমন যেনো নুইয়ে পড়তে ইচ্ছে করলো।বুকের ধুকপুক শব্দটা বিকট শব্দে রুপান্তর হলো। শরীরের রক্ত সঞ্চালন ও যেন বন্ধ, আর্দ্রের সময় থমকে গেলো। আগের তুলনায় আরো শক্ত করে বাইকের হ্যান্ডেলটা চেপে ধরলো, বাইকের গতি কন্ট্রোলে রাখলো।নিজেকে অনেক কষ্টে সংযত রেখে মুচকি হেসে বললো,,
__ যেভাবে ধরলে,এখন তো আমারই ভয় করছে?
__ কেন?
__ গলে যাচ্ছি যে?
__ ও মা কি ভাবে?
__ ও তুমি বুঝবে না?
__ আচ্ছা তবে ছেড়ে দেই?
__ খবরদার না,যেভাবে ধরছো ওভাবেই ধরে থাকো এক চুল ও নড়বে না।
__ আচ্ছা।
বিথী দির্শকের থেকে দুরে সরেই বসেছে ,যত হোক স্যার বলে কথা গাঁয়ে সাথে গাঁ লাগলে ব্যাপারটা কেমন হয়ে যায় না।এসব ভেবেই একটু দুরে সরে আসে বিথী। এদিকে দির্শক কম প্রচেষ্টা আর করছে না নিধিকে নিজের কাছে আনায়। যেখানেই বিট দেখছে সেখানে বাইক জোরে ঝটকা মারছে, কিন্তু নিধি এক চুল পরিমান ও নড়ে বসলো না সেখানেই ঠাঁয় বসে রইল। আবার ও রাস্তার বিটে কারণে বেশ জোরে বাইক ঝাকুনি দিয়ে উঠলো, এবার শরীরে ভারসাম্য হারিয়ে আগা মাথা কিছু না ভেবে দুইহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলো দির্শকে,চোখ বন্ধ করে দির্শকের পিটে মুখ গুঁজে নিলো।ভয়ে তটস্থ হলো মুখ দিয়ে স্পষ্ট স্বরে বের হলো,,,
__ ইন্না লিল্লাহ। আল্লাহ রহমতে করো, এই যাএায় বাঁচিয়ে দিও,এই লোক তো বাইকে নয় উরন্ত প্লেন মনে করে চালাচ্ছে। আল্লাহ।
দির্শক তৃপ্তির হাসি হাসলো যে হাসি হেলমেটের ভিতরে চাপা পড়লো।বাইক চলন্ত অবস্থায় নিজের কন্ট্রোলে রেখে বললো,,,
__ বিথীকে ভয় একদম মানায় না?
বিথি দির্শকের পিট থেকে আলগোছে মুখ তুলে বলে,,
__ মরণ ভয় কে না পায়।
__ তোমার সাথে সাহসটাই যায়?
__ সব সময় বা জায়গায় সাহস মানায় না?
__ তা ঠিক।
__ হ্যাঁ?দয়া করে এখন আস্তে বাইক চালান?
__ তাহলে যেভাবে ধরছো ওভাবেই ধরে থাকো?
__ এভাবে ধরলে দু’জনেই পড়ে যেতে পারি,আমি বরং আপনার গলাটাই ধরি?
__ এ এই একদম না,জিবনে এখনো অনেক কিছু করা বাকি তাতেই মরতে চাই না?
__ আরে মরবেন না তো?
__ যেটি বলি সেটাই করো, যেভাবে ধরে আছো ওভাবে থাকো?
আর কিছু বললো না বিথী চুপচাপ ওভাবেই ধরে বসলো।দির্শক বিথীর এই স্পর্শকে বেশ উপভোগ করতে লাগলো।দির্শক মনে মনে বললো,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১২
__ একবার হলেও মন বাসনা পূর্ণতা পাওয়া উচিত,তবে তোমার ক্ষেত্রে মন বাসনা একবার না হোক হাজার বার হোক যদিও অপূর্ণতা, তথাকথিত বিরোধী হয়েই বাঁচতে হবে, অনীহা ভাবে হলেও যেটা তুমি চাও।
কথাটা কঠিন থেকে কঠিন্যতম ছিলো।যার মানে পরিষ্কার ছিলো না।যার মানে সবাই বুঝবেও না।
