তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৯
রাফিয়া জান্নাত রিফা
চারিদিক ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন।রাত তার সমস্ত নিঃশব্দ ভয়াবহতা নিয়ে নেমে এসেছে এই নির্জন অরণ্যে। জঙ্গলের গভীরে একটি ফাঁকা প্রান্তর সেখানে হালকা, নিভু নিভু আলো ছড়িয়ে আছে।, চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা শব্দ, মাঝে মাঝে শুকনো পাতার খসখসে আওয়াজ চলছে।একটু দূরেই চোখে পড়ে পোড়া একটি বাড়ি। ইটগুলো খসে পড়ার উপক্রম , দেয়ালজুড়ে নীলচে স্যাঁতস্যাঁতে দাগ। বাড়িটির চারপাশে জঙ্গল ঘিরে রেখেছে তাকে বুনো গাছ,কাঁটাঝোপ আর অচেনা গন্ধে মিশে আছে এক অজানা ভয়ের ছায়া।সব মিলিয়ে পরিবেশটি গুমোট, গা ছমছম করা যেন নিস্তব্ধতার বুক চিরে যেকোনো মুহূর্তে কোনো অদৃশ্য আতঙ্কের জন্ম হবে।
শুকনো পাতাগুলো রক্তে ভেজা, তাজা তাজা রক্ত, নিঃশব্দে গড়িয়ে মিশে যাচ্ছে শুকনো পাতার নিচে। বাতাসে ছড়িয়ে আছে ধোঁয়া, লোহা আর পচা গন্ধের ঘন মিশ্রণ।
ফাঁকা সেই আলোর পরিধিতে বসে আছে দির্শক প্রধান মুখে মাস্ক,হাতে হ্যান্ড গোল্সফ,।চোখে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর মনোযোগ। তার হাতে সূক্ষ্ম ধারালো ছুরি, যার আগা রক্তে চকচক করছে। নিস্তেজ, প্রাণহীন মানবদেহটি তার সামনে পড়ে আছে পেটে বহুবার ছুরির আঘাত, বুকে বাম পাশে রিভলভারের গুলির দাগ। নিস্তেজ দেহ থেকে কিডনি, লিভার বের করে আলাদা করা হয়েছে,সচ্ছ কাঁচের বাক্সে সংরক্ষিত তা।
দির্শক প্রধান ঝুঁকে ধীরে, মগ্নতার সঙ্গে কানের লতির একাংশ কেটে নিল। টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়া রক্তের ফোঁটাগুলো সে রুব্রিক কন্টেনার এ সংগ্রহ করে, একটি স্বচ্ছ বাক্স রাখছে,। মাঝে মাঝে সে সেই রক্তের গন্ধ শুঁকে তৃপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছে।তারপর সে মৃতদেহটির পাঁচ আঙুলের দিকে হাত বাড়াল, আঙ্গুলের মাথা গুলো এক এক কেটে একই ভাবে রক্ত নিতে লাগলো এবং বাক্স রাখলো। পায়ের আঙ্গুলী গুলো ও কেটে রক্ত সংগ্রহ করলো। সর্বশেষে মৃতদেহের হাতে রগে ইনজেকশন পুশ করে রক্ত শুষে নিতে লাগলো, অনেক ক্ষন যাবৎ সেভাবেই রক্ত কন্টেনারে নিল।
দির্শকের পাশে লম্বা লম্বি ভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখা গেল সেই জোয়ান ছেলেটিকে,নাম নিথেক্স। এতক্ষন যাবৎ দির্শকের করা কাজকে খুবই মনোযোগ সহকারে দেখলো।দির্শকের কাজ শেষ তাই মাথা চাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো, রক্ত বাক্সটি নিথেক্সের হাতে দিয়ে বলে,,
__ এটাকে জায়গা মতো পাঠিয়ে দে,আর এই বাস্টার্ডের লাস টা সরা।আই ক্যান নট টেইক ইট,ক্লিন আপ?
নিথেক্স বলে,,,
__ ভাই ওর পরিবার..
__ ভালো কোন অ্যাপার্টমেন্টে থাকা খাওয়ার জায়গা করিয়ে দে,এই ব্যাক্তির সকল কু কর্ম সম্পর্কে তাদের জানিয়ে দে।
__ আচ্ছা ভাই?
দির্শক আবার বলে উঠে,,
__ নেক্সাট ভিক্টিমের খোঁজ অব্যাহত রাখ, তাড়াতাড়ি খবর চাই।আর হ্যাঁ,যে লোক গুলো বন্দি আছে তাদের খাবার দিবি।
__ আচ্ছা ভাই?
দির্শক যাওয়ার জন্য দুই পা এগিয়ে আবার বলে,,
__ তুই খেয়েছিস?
নিথেক্সের চোখ পানিতে ছলছল করে উঠলো,,,
__ না ভাই,আগের মতো করে আর খেয়ে শান্তি পাই না তাই ইচ্ছে ও করে না,সব গুলোকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত শান্তিতে দুটো ভাত ও গিলতে পারবো না,খুব কষ্ট হয় ভাত গিলতে।
দির্শক হকচকিয়ে উঠলো বেশ রাগ দেখিয়েই বলল,,
__ যাহ এক্ষুনি খেয়ে আসবি,ইটস মাই ওডার,রাইট নাউ।
নিথেক্স মাথা নুইয়ে বলে,,,
__ আচ্ছা ভাই।
দির্শক আবার চলে যাওয়ার উদ্বেগ হলে,নিথেক্স মাথা উঁচিয়ে বলে,,
__ ভাই,,,
দির্শক নিথেক্সের দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ বল?
নিথেক্স আমতা আমতা করে বলে,,
__ পার্থা বিডি আসছে?
__ হোয়াট?
__ হ্যাঁ ভাই।
__ আসতে নিষেধ করে দে?
__ বলেছি কিন্তু আমার কথাকে কোন পাত্তা দে নি। তুমি বরং ফোন করে বলে দিও।
__ আমি বলতে পাবো না?
__ ভাই ও আসলে কিন্তু অনেক বড় সমস্যা হয়ে যাবে? আমাদের পরিচয় সামনে আসলে, আমাদের সব প্রি-প্লান ভেস্তে যাবে।
দির্শক আর কিছু না বলে গটগট পায়ে প্রস্থান ত্যাগ করে।
রাত ১টা।
তালুকদার মঞ্জিলের বিশাল ফটক পেরিয়ে প্রবেশ করলো দির্শক।একটু আগেই লোডশেডিং হয়েছে।তবু অন্ধকারটা সম্পূর্ণ নয় চাঁদের রুপালি আলো চারদিকে উজ্জ্বল ছড়িয়ে রেখেছে।সব ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে যদিও অস্পষ্ট।
নিজের রুমে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যাবে তখনি মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,,
__ দুষ্শমন স্যার?
পা থেমে গেল দির্শকের। সে পিছন ফিরল। মোমবাতির নরম আলোয় রুপালি বঙয়ের ঝিলিক ছড়িয়ে পড়েছে বিথীর মুখজুড়ে। সেই মুখখানাকে দির্শকের চোখে মনে হলো সদ্য ফুটে ওঠা এক নিষ্পাপ ফুলের মতো নির্মল, কোমল, অদ্ভুত আকর্ষণীয়। মুহূর্তটিতে দির্শক থমকে গেল, চমকে উঠল। মনে হলো সময় স্থির হয়ে গেছে।
বিথী দির্শকের দিকে এগিয়ে এসে দির্শকের উপর নিচ প্ররখ করে বলল,,,
__ এত রাতে কোথা থেকে আসলেন স্যার?
দির্শক গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,,
__ অধিকার বোধ দেখাচ্ছো।
__ বা রে এতে অধিকার বোধের কি আছে, যেকেউই এ প্রশ্ন করতো।
__ তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতাম না।
বিথী বাঁকা হেসে বলে,,
__ কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে,কই গেছিলেন।
মাথার চুল গুলোকে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে দির্শক বলে,,
__ এবার বিশাল অধিকার বোধ ফলাচ্ছো।
বিথী দির্শকের এই কথাকে কোন পাত্তাই দিলো না,আবার বললো,,,
__ আপানার তো এত রাতে কোন কাজ থাকার কথা নয়,তাহলে দেরি হলো কেন,কোন পুরুষ এত রাতে বাড়ি ফেরে,আর এমনিতেও তালুকদার মঞ্জিলে এসব এ্যালাও না।
আবারো বাঁকা হাসি দিয়ে দির্শক বলে,,
__ তোমার কথাগুলো ওয়াইফি ওয়াইফি লাগছে,হোয়াট ইউ নো?
বিথী একটা ভ্রু উপরে উঁচিয়ে তুললো,মনে মনে বলল,,
__ শালা হনুমান রে, স্যার বলে ভালোভাবে কথা বলছি,না হলে কবেই কেল্লা ফতে করে দিতাম,কি বলি আর কি উওর,এই লোক এমন কেন? কিছু তো ব্যাগড়া আছেই?
এবার বলে,,
__ না মানে হ্যাঁ,নাহ ধ্যাত?
__ কী হলো?
__ কিছু না?
__ তোমার বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত বিথী?
__ কেন?
__ তবেই আমায় করা ইফ্টিজিং গুলো বন্ধ হবে?
__ ইফ্টিজিং যদি হয় তবে, ঠিকই আছে?এখন আমার প্রশ্নের জবাব দিন।
__ সে প্রশ্নের উত্তর নেই,।
হঠাৎ বিথী চোখ গেলো দির্শকের হাতের বাহুতে যেখানে রক্ত দেখা যাচ্ছে,সাদা শার্টে রক্ত গুলো স্পট ।মূহুর্তেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল বিথীর,সেদিকে দৃষ্টি রেখেই উবেগ্ন হয়ে বিথী বলে,,,
__ আপনার বাহুতে রক্ত?? কেন? লেগেছে কোথাও?
দির্শকের তাতে কোন হেলদোল দেখা গেল না,সে তো এখনো বিথীর পানেই অপলক চোখে তাকিয়ে আছে, বিথীর দিকে তাকিয়েই বলে,,,
__ ব্লাড মাই ফেভারেট।
মুখ কুঁচকে দির্শকের পানে তাকালো বিথী পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিল দির্শকের থেকে, কিছুক্ষণ মনে মনে কিছু একটা ভেবে বিথী বলল,,,
__ আমার মনে হয় আপনি সাইকোপাথততোররিক।
__ কি কি, আবার বলো।
__ আরে সাইকোপাথততোররিক?
__ নামটা তো সুন্দর?
__ হ্যাঁ।
__ তাহলে আমি সাইকোপ্যাথিক,এটাই বলছো নাকি?
__ হ্যাঁ আপনি সাইকোপাথততোররিক?
এহেন নাম শুনে সত্যিই দির্শকের মাথা ঘুরতে লাগলো,এ কেমন নাম, সুন্দর বাক্যটাকে আজ বিকৃত করেই ছাড়লো বিথী,,
__ এমন নাম শুনার পর আজ থেকে সত্যিই আমি সাইকোপ্যাথিক,তা গ্রহণ করলাম।আম এ সাইকোপ্যাথিক।
কথা খানা বলেই মুচকি হেসে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে দির্শক আবার বলে,,
__ যে নারী চোখে ভাষা ও কথা যুক্তি মেলাতে পারে না,সে আসলেই ব্যর্থ নারী।
তড়াৎ করে বিথীর চোখ বড় বড় হয়ে গেল কথাগুলো কি তাকেই বলল দির্শক? তবে কি নারী হিসাবে তাকে অবমাননা করলো। বিথী গলা উঁচিয়ে জানান দিলো,,
__ ভূলেও নারী সত্তাকে জাগাতে আসবেন না,এতে আপনারই আবার ক্ষতি না হোক।
দির্শকে কানে কথাখান পৌঁছাতেই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতেই বলল,,
__ আলরেডি জাগানোই ছিল।
দির্শকের প্রতি সন্দেহের মাএা তীব্র থেকে তীব্রতর হলো আজ।এই লোকের প্রত্যেক কথায় লুকিয়ে আছে রহস্যময় কথা?কি সে রহস্য?কি সে লুকায়িত সত্য?তা তো উন্মোচন বিথীই করবে?করবেই করবে?এসব এ ভাবতে লাগলো, পরক্ষণেই আবার বললো বিথী,,
__ ইহহহ, বালের রহস্য, রহস্য না সাঁই, এই লোকটা আসলেই সাইকোপাতোকরিক,তাতে কোন সন্দেহ নেই।
আবার মনে মনে বিরবির করে বলে,,
__ আচ্ছা সাইকোপাতোকরিক মানেটা যেন কি?
এই বলে এক ধেয়ে তা নিয়ে ভাবতে থাকে কিন্তু, শব্দটার মানে মনে আর পড়ল না, কোথাও একটা পড়েছিল কিন্তু মনে নেই,এটাকি বিথীর দোষ অবশ্যই না,আসলে পড়লেখা করা হয় 2 জিবি ফাস্টে, মুখস্থ করা হয় 4 জিবি স্পিডে, এদিকে সব ভুলে যায় ৬৪ জিবি ব্রেক্যার ব্রেক ফুল হলে বলে “মেমোরি ফুল” এই হলো পড়ালেখা আসল রহস্য ভুলে তো যাবেই,,,
__ যাই সার্চ করে দেখি গে।
এই বলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে চলে গেল নিজের রুমে।
ভোর সকাল~~~৭টা
ইতি, বিথী, নীধি, সুহানা, নিঝুম, মুহিন,পিকি, সুন্দর এখন খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে, হাডুডু প্রতিযোগিতা মাঠে। তিন মহাশয় আলবান, আর্দ্র,দির্শক এখুনি আসলো।ইতি, বিথী, নিধি সঙ্গেই ভ্যাবলা ভাই দাঁড়িয়ে, তিনজনই এখন ভ্যাবলা ভাইকে সুন্দর ইশারা করে সব খেলা সংক্রান্ত সকল বিষয়ে বোঝাচ্ছিল,যেন এরা তিনজনেই ভ্যাবলা ভাইয়ের কোর্স অথচ এরা হাডুডু ক ও জানে না,। ভ্যাবলা ভাইকে এমন ভাবে সব বোঝাচ্ছে, যেন এটিকোন খেলার প্রতিযোগিতা নয়,নাটকের রিহার্সাল চলছে।
একটা ভাব, ভঙ্গির ব্যপার স্যাপার ও আছে না আবার।আলবান, আর্দ্র,দির্শকে দেখে সেই ভাব ভঙ্গি দিগুন মাথা চেড়ে উঠেছে। মাঠের চারদিকে মানুষ কোলাহল চলছে।
খেলা শুরু হলো দুই দলেরই , খোলা মাঠে দুই দল দাঁড়িয়ে আছে, মুখোমুখি। মাঠ চারপাশে সাধারণ দর্শক, শিশুরা পিঠের ওপর , কাঁধের উপর বসে দেখছে। খেলা শুরু হলো দুই দলেরই।মাঠের মাঝখানে হালকা ধুলোমাখা রেখা দেয়া আছে, খেলার সীমানা।টিক ..টিক শব্দ করে খেলোয়াড়রা একে অপরের দিকে ধাবিত হচ্ছে, শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখছে, হাত-পা মিলিয়ে কৌশল ব্যবহার করছে। কেউ পেছনে সরে যাচ্ছে, ভ্যাবলা ভাই সামনের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে তো প্রতিদ্বন্দ্বী রা পিছনে সড়ে যাচ্ছে।
সবাই প্রবল আক্রোশ নিয়ে খেলছে ভ্যাবলা ভাই একজন পা টান মেরে নিয়ন্ত্রণে আনলো এবং কাঁধে নিয়ে ধুপ করে মাটিতে নামিয়ে দিল। দর্শকেরা চিৎকার করছে, মাঠে উত্তেজনার হাহাকার।, ভ্যাবলা ভাই ঘেমে একাকার হয়ে আছে, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ ও নিজস্ব কৌশল বজায় রেখে প্রতিপক্ষকে ফেলে দিতে চেষ্টা করছে সেভাবে ভ্যাবলা ভাইকে দুজন ধরলো পরপর আরো দুইজন ধরলো।
মুহুর্তেই ইতি, বিথী, নীধি হকচকিয়ে উঠালো, হঠাৎ ভ্যাবলা ভাইয়ের কি হলো,এটা ভাবনার কেন্দ্রীয় হলো।
তিন বোনেই ভ্যাবলা ভাই বলে বলে চিৎকার করতে লাগলো, কিন্তু ভ্যাবলা ভাইয়ের কানে সেসব গেল কি? ভ্যাবলা ভাইকে তারা ফেলে দেওয়ার অপপ্রয়াস চেষ্টা চালাচ্ছে। ফাঁকফোকর দিয়ে ভ্যাবলা ভাই তিন তরঙ্গের দিকেই তাকিয়ে আছে। তাদের অস্হিরতা দেখতে পাচ্ছে ভ্যাবলা,প্রবল জোর দিয়ে তাদের সরানোর প্রচেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না, হঠাৎ করে শক্তি কুল দিচ্ছে না ভ্যাবলা ভাইয়ের,এটা ভ্যাবলা ভাই ও বুঝতে পারছে না।
ইতি টের পেল ভ্যাবলা ভাইয়ের অবস্থাটা, খুবই ক্লান্ত মনে হলো ভ্যাবলা ভাইকে, কিন্তু কেন? ভ্যাবলা ভাই ইতি, বিথী, নীধির পানেই অসহায় চোখ তাকিয়ে ছিল,এই যে শুধু ভ্যাবলা ভাইয়ের জয় না,এ জয় তো পুরোটাই ইতি বিথী,নিধির। বিথী ভ্যাবলা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ইশারা ইঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,,
__ জয় যদি না হয়,তবে চলে গেলাম আর আসব না গ্রামে? তুমি কথা রাখছো না কিন্তু?তাই চলেই যাবো,ওঠো ওদের কে এ পিট করে ফেলায় দাও?ওঠো।
ইতি ও ইশারা ইঙ্গিতে কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে বলে,,
__ আমার কান্না পাচ্ছে,ওঠো, ওদের ফেলায় দাও,এমন করো না,ওঠো ভ্যাবলা ভাই ওঠো।
নিধি কিছু বললো না অজান্তেই নিধির চোখ থেকে পানি গড়িয়ে মাটিতে পরলো,সেই পানি ভ্যাবলা ভাইয়ের চোখ এড়ালো না।এই চোখে পানি তীব্র আঘাত করলো ভ্যাবলা ভাই কে।ভ্যাবলা ভাই নিজেকে শক্ত করলো, নিজেকে অনেক বোঝালো যে “নিজের জন্য না হোক ওই তিন কে মেয়ের জন্য হলেও জয়ী হতে হবে। পরক্ষণেই শক্তি সঞ্চয় করে গগন কাঁপানো চিৎকার দিয়ে বাহু উঁচিয়ে সবাইকে এক ধাক্কায় ফেলায় দিলো,সবাই ছিটকে পড়লো মুহুর্তেই। ভ্যাবলা ভাই নিজের দলের কাছে অর্থাৎ নিজের সীমানায় চলে গেল। ভ্যাবলা ভাইকে প্রতিপক্ষ দলের সবাই ধরে ছিল, সেক্ষেত্রেই সবাইকে টাচ করেই হাড়িয়ে দিয়েছে।বিজয়ী হলো ভ্যাবলা ভাইয়ের দলের।মাইকে ঘোষণা করা হলো বিজয়ী ভ্যাবলা ভাইকে।
ইতি, বিথী,নিধি খুশিতে লাফালাফি করছে,এত খুশি লাগছে যা বলার মতো না।
ভ্যাবলা ভাই ইতি,বিথী, নীধি কাছে চলে আসলো,নিধির হাতে পানির বোতল ভ্যাবলা ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলো, ভ্যাবলা হাঁসি দিয়ে পানি নিয়ে মুখ ধৌত করলো। বিথীর হাতে থাকা গ্লুকোজের পানি ভ্যাবলা ভাইয়ের দিকে দিকে ইশারায় বলল,,
__ খেয়ে নেও?
ভ্যাবলা ভাই মুখ অসহায় করে মাথা ও হাত নাড়িয়ে “না না” বলল।
__ আবার কুস্তি খেলা আছে,এটা খেয়ে নাও ক্লান্তি দুর হবে।
ভ্যাবলা ভাই আকাশ পানে তাকিয়ে হো হো হেসে নিল, পরক্ষণে আবার অসহায় মুখে আ উু শব্দ বের করে ইশারায় বললো,,
__ এসব খেলে বমি আসে,খাবো না।
ইতি ভ্যাবলা ভাইয়ের বাহুতে টোকা দিয়ে, ভ্যাবলা ভাই ইতি পানে তাকায়, গামছা দিয়ে ভ্যাবলা ভাইয়ের মুখ মুছে দিলো, অতঃপর দুহাত নিজের কোমড়ে রেখে রাগি চোখে মুখ কুঁচকে ভ্যাবলা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল,,
__ এত না না করছো কোন? আমি কিন্তু খুব রেগে যাচ্ছি,আর একটা কথা ও না বলে তাড়াতাড়ি গ্লুকোজের পানি খেয়ে নাও।
ভ্যাবলা ভাই ঠোঁট উল্টে নিল শিশুদের মতো করে,ভয় পেলো বোধহয়,পরক্ষণেই হাসি দিয়ে বিথী হাত থেকে বোতল টা নিয়ে গ্লুকোজের পানি গুলো ঢোক ঢোক করে খেয়ে নিল।
বরাবরই ভ্যাবলা ভাইয়ের কাছে,ইতি, বিথী, নীধি বোন সমতুল্য।তিন বোনের কাছেও ভাই সমতুল্য। মাঝে মাঝে এই মেয়ে তিনটি ভ্যাবলা ভাইয়ের এতো যত্ন আত্তি করে যে ভ্যাবলা ভাইয়ের কান্না পায়, কাঁদে ও।এই তো তিন বোনেই এক বছর পর পর আসে আর ভ্যাবলা ভাইকে কাঁদিয়ে চলে যায়।
কুস্তি খেলায় ও আমাদের ভ্যাবলা ভাইয়ই জয়ী হলো,এই নিয়ে বাচ্চাদের সাথে সে কি লাফালাফি চলছে ইতি, বিথী, নীধির।সেই অবস্থাতেতেই হঠাৎ নিধির চোখ গেলো অদুরে দাঁড়িয়ে থাকা আর্দ্রের পানে,তাও এক মেয়ের সাথে, মেয়েটা হেসে হেসে কথা বলছে আর্দ্রের সাথে,তাতে আর্দ্র ও তাল মিলাচ্ছে। ব্যাস নিধির মাথায় আগুন ধরে উঠলো, রাগে চোয়াল শক্ত করলো,রাগে দাঁত কটমট করতে লাগলো,প্রবল রাগ নিয়ে আর্দ্রের কাছে যেতে লাগলো ।
আর্দ্র কাছে আসলো নিধি,কথা নেই বার্তা নেই আবারো আর্দ্র ফোনটা হাত থেকে নিয়ে মাটিতে দিল এক আচার, আর্দ্র বড় বড় চোখ করে একবার নিধিকে দেখছে তো একবার মাটিতে পড়ে থাকা ফোনটাকে দেখছে।এবার নিধি মেয়েটার দিকে আগুন চোখে তাকালো, ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল,,
__ লজ্জা করে না পরপুরুষের সাথে কথা কইতে?বুঝি না মনে করেছেন,কি ওনাকে পটানোর ধান্দা করছেন, আপনাকে তো আমি?
এই বলে মেয়েটার দিকে ধেয়ে যায় নিধি তখনি আর্দ্র নিধির দুহাত ধরে আঁটকে ধরে বলে,,
__ আরে কি করছো?থামো?কথাটাতো শুনবে নাকি?
এবার আর্দ্রের দিকে নিধি রাগি চোখে তাকালো, আর্দ্র এমন চোখ দেখে থমথমে খেয়ে গেল,নিধি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,
__ আপনাকে তো পরে দেখছি?
তখনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে একটা সাত বাচ্চা এসে বলে,,
__ মা ওদিকে চলো ওই পুতুলটা নেবো,।
পরক্ষণেই এক পুরুষালী কন্ঠস্বরে মেয়েটা বলল,,,
__ চলো তাড়াতাড়ি মেয়েটা,বায়না করছে?
এমন দৃশ্য দেখে নিধি থমথমে খেয়ে গেল,কি ভেবেছিল আর কি হলো,নিধি শুকনো একটা ঢোঁক গিললো। মেয়েটি উচ্চকিত কন্ঠে বেশ বুক ফুলানো ভাব নিয়ে বলল,,
__ এই যে এটা আমার বর,মানে আমার ব্যক্তিগত একান্ত বর বুঝলে,আমার পার্স ব্যাগটা পড়ে গিয়েছিল,আর সেটাই উনি আমাকে কুড়িয়ে দিলেন। নাহলে কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলা আমার কোন ইচ্ছা নেই। নিজের তো মনে হচ্ছে কোন বর টর নেই,দেখেই বোঝা যাচ্ছে।আবার আমাকে বোঝাতে আসছে।
এই বলে মেয়েটা তার স্বামী, সন্তান কে নিয়ে চলে যায়। এদিকে নিধি ভাবতে ব্যস্ত “তাকে বর না থাকার খোঁটা দিলো মেয়েটা” মানছি নিধি একটু ভুল করেছে তাই বলে এতবড় খোঁটা দিয়ে চলে গেল নিধিকে” বোধগম্যই হচ্ছে না।
আর্দ্র মুখখানাকে অসহায় করে মাটি থেকে ফোনটা তুলে মুছে নিলো,উঠে নিধিকে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি দেখলো নিধি তার সামনে নেই, এদিক ওদিক মুখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল কিন্তু নিধিকে পেন না এবার চোখ আনলো নিচে দিকে,দেখলো মাঠে ঘাসে মুখ গোমড়া করে বসে আছে নিধি।তা দেখে আর্দ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,,
__ আবার কি হলো নিধি?
মুখ ফুলিয়ে রেখেছে নিধি কোন উওর দিলো না, আর্দ্র আবার বলে,,
__ ওখান থেকে উঠো।
তাও উঠলো না নিধি, এবার বিরক্তি প্রকাশ করেই আর্দ্র বলল,,
__ নিধি এবার বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, উঠো বলছি?
নিধি এবার আর্দ্র পানে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,,
__আমি বিয়ে করবো?
আর্দ্র চোখ মুখ কুঁচকে নিলো,,,
__ হোয়াট?
নিধির চোখে পানি টুইটম্বুর হয়ে আছে,,
__ বিয়ে করবো বিয়ে?
আর্দ্র নিধির পাশে বসে বলল,,
__ কি বলছো এসব,মাথা ঠিক আছে তো?
নিধি এবার কেঁদেই দিলো, আর্দ্র হকচকিয়ে গেল, অস্থির হয়ে শুধালো,,
__ ও কি কাঁদছো কেন নিধি?
নাক টেনে টেনে নিধি বলে,,
__ বললাম তো বিয়ে করবো?
আর্দ্র আলতো করে নিধির চোখে পানি মুছে দিয়ে, সন্দিহান কন্ঠে বলল,,
__ কাকে বিয়ে করবে?
নিধি নিরেট কন্ঠে বলে,,
__ বিয়ে তো ছেলেকেই করে,মেয়ে মেয়ে তো আর বিয়ে হয় না নাকি?
আর্দ্র ফিচেল হেসে আবার বলে,,,
__ তা ঠিক,তবে কোন ছেলেকে বিয়ে করবে,কাকে?
নিধি আর আগপাছ কিছু না ভেবে বসা অবস্থাতেই হুট করে আর্দ্রকে জড়িয়ে ধরে বলে,,
__ আপনাকে।
নিধি হঠাৎই স্পর্শে আর্দ্রের শরীরের হিম হয়ে যাওয়াটার অনুভূতি পেল। আর্দ্র, দুই হাত শিহরিত হলেও, নিধিকে আঁকড়ে ধরার সাহস পাচ্ছিল না। হাত দুটো অনবরত কাঁপছিল। হৃদস্পন্দন বেড়ে ধকধক শব্দ করতে লাগল, নিধির কানে স্পষ্ট গন্ধোলো সেই ধকধক শব্দ। আর সেই মুহূর্তে, আর্দ্রের খুশির কথা, অসীম আনন্দের কথা মাথায় ভেসে উঠল ,কিন্তু সে খুশি হতে পারল না। এক অজানা ভয় যেন তার মনে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল।
তখন আর্দ্রের চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল নেমে গেল। হয়তো সেটাই খুশির কান্না। সে আর কিছু ভাবলো না। শুধু মনে হয়েছিল, এখন এই মুহূর্তে নিধিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে। দুই হাত দিয়ে নিধির বুকের চারপাশ আঁকড়ে ধরে বলল, মুখে এক কোমল হাসি নিয়ে,,
__ আমাকে বিয়ে করে কি হবে?
আর্দ্রের বুকে মুখ রেখেই নিধি বলে,,
__ ওই মেয়েটার মতো বলতে পাবো,আপনি আমার একান্ত ব্যক্তিগত বর।
__ যদি মেজো বাবা নাকোচ করে?
__ তাহলে সারাদিন রাত বাবার পা টা ধরে বসে থাকবো আর কেঁদে কুটে বলল, বাবা পাদরো ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে একান্ত ব্যক্তিগত বর করে দাও,বাবা তখন ঠিক মানবে।
আর্দ্র এবার শব্দ করেই হেসে বলল,,,
__ আমি যদি তোমাকে বিয়ে না করি?
__ মরে যাবো?
আর্দ্রের হাঁসি মুখখানা চুপছে গেল, আর্দ্র বুঝতে পারলো যে নিধিও তার প্রেমে গভীর ভাবে পড়ে গেছে, কিন্তু এতটা?এতটা তো আর্দ্র কখনো আশাই করেনি? কিন্তু এখন “মরে যাবো” এই কথাটা নিতে পারছে না আর্দ্র। আর্দ্র বলে,,,
__ এমন কথা আর কখনো বলবে না নিধি,ওকে?
নিধি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। আর্দ্র আবার বললো,,
__ আমার জন্য এত পাগল কবে হলে নিধি?
নিধির নির্বিকার জাবাব,,
__ জাঙ্গিয়া পড়া অবস্থায়?
আর্দ্রের লজ্জা পাওয়ার কথা ছিল বোধহয়, কিন্তু হাঁসি পেলো, আর্দ্র বলল,,
__ চিন্তা নেই বিয়ে শুধু এবং শুধুমাত্র তোমায় করবো, তিন কবুল বলেই হালাল রুপে আমার করবো। কি রাজি তো,পড়ে না বললে আমাকে আর খুঁজে পাবে না কিন্তু।হাওয়া হয়ে যাবো।
__ আমি তো এখুনি কবুল বলতে রাজি?
ফিচেল হেসে আর্দ্র বলল,,,
__ পাগলি মেয়ে,এভাবে কে বিয়ে করে?সবাই কে জানিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে করবো আমরা?
এখন মুখ তুলে আমার থেকে দূরে যাও, এখানে অনেক মানুষ আছে তারা আমাদের আলিঙ্গন দেখছে, আমাদের খারাপ ও ভাবছে।
নিধি নিজের হুসে আসলো আসলেই তো এটা গ্রাম?তড়াৎ করে নিধি আর্দ্রের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ভো এক দৌড় দিল।
আর্দ্র ঘাসেই নিজের গা এলিয়ে দিয়ে,নিধি যাওয়ার পানে এক ধেয়ে চেয়ে রইল,আর বিরবির করে বলল,,
__ পাগলি মেয়ে।
আর্দ্র ঘাসে শুয়ে আকাশ পানে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিধি বাবা এতক্ষণ যাবৎ আর্দ্র ও নিধির আলিঙ্গন দেখলো,মুখ গম্ভীর করে সেখান থেকে চলে গেলেন।
একটু আগেই আলবানের সাথে দির্শক দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু এখন নেই,তা দেখে বিথী দির্শকে খুঁজতে লাগলো।দির্শকে চোখে চোখে রাখতে হবে এটাই কাল সারারাত ভেবেছে বিথী।এই লোকের রহস্য উদঘাটন করতেই হবে।
এদিকে ইতি আলবানের কাছে এসে করুন স্বরে বলল,,
__ দাবালন ভাই?
আলবান তখন চেয়ারে বসে ফোন স্ত্রল করছে ইতির দিকে ঘুরে ভ্রু কুঁচকে বলে,,
__ কি?
__ আপনার বিয়ে করা উচিত?
__ কেনো?
__ না হলে দুদিন পর ইফ্টিজিংয়ের স্বীকার হবেন?
__ তো বিয়ে করে কি হবে?
__ বউ থাকলে আর কেউ তাকানো সাহস করবে না।
__ তা চল।
__ কোথায়?
__ কাজি অফিস।
__ আমি কেন যাবো?
__ তাহলে থাক, আমি না হয় ওই মেয়ে গুলোর ইফ্টিজিংয়ের স্বীকার হই।
__ না, না।ওরা বাজে ভাবে ইফ্টিজিং করে, একদম পা থেকে মাথা পর্যন্ত কামড় দেয়?
__ সমস্যা নেই সব সহ্য করে নিবো?
ইতি বুঝলো সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না আঙ্গুল বেকাতেই হবে,,,
__ আচ্ছা কি আর করার?আমিও তবে যাই ইফ্টিজিংয়ের স্বীকার হয়ে আসি,যাহা উত্তাপ বেড়েছে না,যাই একটু থামিয়ে আসি।
আলবান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে,,
__ এখান থেকে এক নড়লে,পা কেটে রেখে দিবো।
আসলে ভাব নিয়ে ইতি বলে,,
__ আচ্ছা যাবো না? কিন্তু একটা শর্তে।
চোখ মুখ কুঁচকে আলবান বলে,,,
__ কি শর্ত?
তখনি ইতির পিছন থেকে একটা আট বছরের ছেলে বেরিয়ে এসে, সঙ্গে সঙ্গে ইতি বলে,,
__ ওর নাকের সর্দি পরিষ্কার করে দিন?
আলবান ছোট ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখে ছেলেটার নাক ভর্তি সর্দি, ছেলেটাকে দেখেই আলবানের বমি পাচ্ছে,নিরেট স্বরে আলবান বলল,,
__ যা ভাগ পাবো না আমি?
__ ঠিক আছে ওইযে দেখছেন কতগুলো ছেলে দাঁড়িয়ে আমি সেখানে গেলাম,বাই ওরাই না হয় মনুর নাক পরিষ্কার করে দিবে,চল মনু।
এই বলে মনু হাত ধরে চলে যাওয়ার জন্য উদেগ্ন হলেই আলবান ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে,,,
__ আর এক পা ও এগোনোর সাহস দেখালে,তো মরছিস?
ইতি ঘুরে আলবানের দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ তাহলে কাজ করে দিন?
আলবানের রাগে মাথা ফেটে যেতে চাইছিল, কিন্তু কী করা! ইতির জেদ আর তার অটল ইচ্ছার কাছে আলবানের রাগ যেন হালকা ধোঁয়ার মতো ফিকে হয়ে গেল। এই মেয়ে যা বলে, তাই করে।এটাই তার অদ্ভুত শক্তি।আলবান চোখ মুখ কুঁচকে শতশত বিরক্তি নিয়ে প্যান্টের পকেটে থেকে রুমাল বের বরে,মনু কে গম্ভীর কন্ঠে ডাকলো,,
__ এই ছেলে এদিকে এসো?
মনু হাসি দিয়ে আলবানের কাছে গেল, শ্বাস বন্ধ রেখে মনুর নাক পরিষ্কার করে দিলো,মনুর মাথাটা এতো জোরে চেপে ধরেছিল যে মনু ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করতে করতে চলে গেল, এদিকে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগলো আলবান,গা গুলিয়ে আসতে লাগলো,মুখ বমি করার ভঙ্গি ধারন করলো।মনু কান্না করা দেখে ইতি আলবানকে বলে,,
__আপনার ভবিষ্যৎ অন্ধকার দাবানল ভাই?
__ ইতিইইই, তুই চুপ থাক,নাহলে তোকে এখানেই পুঁতে ফেলবো?
ইতি আলবানের অবস্থা দেখে বুঝতে পেল যে তার বমি পাচ্ছে, মুহূর্তেই ইতি চোখ বড়বড় করে বলে,,
__ বমি পাচ্ছে বুঝি?
__ হ্যাঁ?
মুচকি হেসে আবাক হওয়ার ব্যঙ্গ করে ইতি বলে,,
__ ওমা তাই, কংগ্রাচুলেশন আপনি বাবা হতে চলেছেন।যাই বড় মাকে খবরটা দিয়ে আসি।
আলবানের রাগ এবার আরো বেরে হাতে পাশে থাকা চেয়ারটা তুলে ইতির দিকে দৌড়তে লাগলো,ইতি তো কথা খানা বলেই ভো দৌড় মেরেছে,আলবান ইতির পিছনো দৌড়ায় আর বলে,,
__ থাম বলছি থাম?
সুন্দর নিঝুমকে মেলা ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে সুজিয়ে এখন তার সাথে হাঁটছে গ্রামের পথে।সেই কতক্ষণ থেকে হাঁটছে কিন্তু নিঝুম কোন কথাই বলছে না, সুন্দর বারবার কথা বলতে ধরেও বলছে না। সুন্দর ও নিঝুমের পিছনে নিন্দুককে ও দেখা গেল, সুন্দরকে সেফটি দেওয়ার জন্য নিন্দুক ও হাঁটছে আরকি।
হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়লো বট গাছে একটা পাগলি বসে মাটি খুড়ছে।পাগলিটাকে দেখে নিঝুম থেমে গেল কিছুক্ষণ ভাবতে লাগলো, ভেবে সুন্দরের দিকে তাকিয়ে বললো,,
__ আপনাকে এটা কাজ করতে বললে করবেন?
সুন্দর তো এটার জন্যই অপেক্ষায় ছিল,,,
__ হ্যাঁ হ্যাঁ বলো?
ফেচেল হাঁসি দিয়ে নিঝুম বলে,,,
__ ওই পাগলিটাকে প্রপোজ করুন, প্লিজ প্লিজ প্লিজ।
সুন্দরের হা হয়ে চেয়ে রইলো নিঝুমের পানে,এ কেমন কথা? কিছু একটা মনে হতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল সুন্দরের,তারপর মাথা ঝাড়া দিয়ে বট গাছের থাকা পাগলির দিকে তাকালো।পাগলিকে দেখেই চোখ চড়কগাছে উঠে গেল সুন্দরের।মনে মনে বলল,,
__কাম সারছে রে,এই রাস্তায় আসলাম কেন্কা কইরা,ও রে আম্মা এই মাইয়ার সাথে থাইকলে জাহান্নামের রাস্তায় ও চেনা হইয়া যাইবো,এই মাইয়া বলে কি, পাগলিরে প্রপোজ পোজ করমু,তাও আবার এই পাগলিরে। ইচ্ছা করছে এই মাইয়া ১০০ ফুট উপরে তুইলা আচার মারি।
এই রাস্তা দিয়ে সুন্দর যে বারে আসা যাওয়া করে সেই বারেই এই পাগলি সুন্দরকে তাড়া করে,পাগলির ভাষ্যমতে সুন্দর নাকি ওর সোনা স্বামীটা, চুমু খাওয়া জন্য ছুটে আসে। সুন্দর দেয় ভো দৌড়, একদিন তো সুন্দর কে জড়িয়ে ধরে ছিল আর ছাড়ছিলোই না, তারপর তো তিনজনে মিলে টানা হিচড়া করে ছাড়া পেয়েছিল সুন্দর।সেই থেকে আর এই পথে ভুলেও পা মারায় না সুন্দর।
নিঝুম আবার বলে,,,
__ কি হলো?
সুন্দর ভাবনা থেকে বের হলো,জোর জুলুম করে মুখে হাঁসি এনে বলল,,
__ এগুলা কি কও বোইননা আমার?
__ করবেন কি করবেন না?
__ না, এসবে আমার লজ্জা করে?
__ ঠিক আছে আমি চললাম।
এই বলে মুখ ভেংচি কেটে উল্টো পথে চলতে লাগলো নিঝুম, সুন্দর হকচকিয়ে ডেকে বলল,,,
__ ওই শালীর মায়ের মাইয়া থামো,থামো কইতাছি।
নিঝুম থেমে গেল সুন্দরের দিকে আবার এসে বলে,,
__ তাহলে যান গিয়ে, প্রপোজ করুন।
সুন্দর মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলে,,
__ ফুল ছাড়া, কেমনে কি?
__ ওসব কিছু লাগবে না আপনি যান?
সুন্দর পিছন ঘুরে নিন্দুকের পানে তাকালো অসহায় ভাবে, নিন্দুক তো হাসতে হাসতে পড়ে যায় যায় অবস্থা,এতে সুন্দরের খুবই রাগ হলো। নিঝুম আবার বলে,,,
__ কি হলো যান।
সুন্দরের এবার খুব ইচ্ছে করলো এই মেয়েকে লম্বা ভাবে একটা লাথি দিয়ে উড়িয়ে দিতে। পাগলীর দিকে হাঁটা ধরলো সুন্দর। সুন্দর কে দেখেই মধ্য বয়সী পাগলিটা দাঁড়িয়ে লাফালাফি করে হাত তালি দিয়ে বলতে লাগলো,,,
__ সোনা বর,সোনা বর আসছে?
সুন্দরের খুব করে মাটিতে গড়াগড়ি করে কান্না করতে ইচ্ছে করলো, শেষে কিনা পাগলিকে প্রপোজ করতে যাচ্ছে সুন্দর, এটাই বিশ্বাস হচ্ছে না সুন্দরের,পাগলির লাফানো দেখে সুন্দর বলে,,
__ আজ আমাকে খেয়েই ফেলবে রে, আল্লাহ কাউরে পাঠাও এই অধমরে বাঁচানোর লাগি।
বার নিঝুমের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অবশেষে পাগলির কাছে এসেই গেল সুন্দর, হাঁটু গেড়ে বসলো পাগলির সামনে, পাগলি এখনো হাতে তালি দিচ্ছে আর খিলখিল করে হাসছে। কাঁদো কাঁদো অসহায় মুখে সুন্দর বলল,,
__ ওই পাগলি তোরে প্রোপোচ করলাম?
নিঝুম হাসতে হাসতে গলা উঁচিয়ে বলল,,,
__ আরে আই লাভ ইউ বলুন?
নিঝুম কথা কানে আসতেই দাঁত কটমট করে মনে মনে বলে,,
__ বালের মাইয়া,ফুংগা দিয়া উইড়া দিমু,চিনোছ আমারে, তোর প্রতি একটু দুর্বলতা আছে বইলা ছাড় দিই,নাইলে দেখতি?
পাগলিকে কিছু বলার আগেই,পাগলি সুন্দরের কলার চেপে দাড়া করিয়ে বলে,,,
__ তুমি আইচো, আইছো তুমি, কতদিন তোমাকে চুম্মা দেই না,আইজ মেলায়য়য় চুমা দিমু তোমারে।
এই বলে শক্ত করে সুন্দরকে জড়িয়ে ধরল পাগলি,এহেন কান্ডে সুন্দর ভয়ে তটস্থ হয়ে গেল,পাগলি গায়ের গন্ধে নাক মুখ কুঁচকে নিলো। জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলো সুন্দর,,,
__ ও আল্লাহ,ও আম্মা বাঁচাও ওও আমারে,মাইরা ফালাইলো গো।
কই রে নিন্দুক বাঁচা রে বাপু।
নিন্দুক নিঝুম দুজনেই হাসতে হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।
বেচারা সুন্দর চুমুর কড়া ঘাতে নুইয়ে পড়েছে,তিন বার জোর জুলুম করে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করায় শার্টের দুই হাতা ছিঁড়ে গিয়েছে।তাও ছাড়ছে না একের পর এক চুমু দিয়েই যাচ্ছে সুন্দরের মুখে । আবার গাঢ় শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে বারবার, কাঁদো কাঁদো স্বরে সুন্দর বললো,,
__ ওরে পাগলি ছাড় রে আমারে অপয়া করিস নে,আমি শুদ্ধ পুরুষ, কলঙ্কিত করিস নে।
কিন্তু কে শুনে কার কথা পাগলি আজ ওর হাড়িয়ে যাওয়া স্বামীকে পেয়েছে বলে কথা,আজ আর ছাড়ছে না পাগলি।
সুন্দরের ঠোঁট,চোখ,নাক,গাল,কান, কপাল হাত সবখানে চুমুতে ভরিয়ে দিল পাগলিটা নিম্ন পক্ষে ১০০ খানা চুমু তো খেয়েছেই। সুন্দরের অবস্থা নাজেহাল। পাগলিটা চুমুই তো খেয়েছে নাকি,এতে শরীর শক্তি না থাকার কি আছে। বেচারা সুন্দরের শরীর নেতিয়ে পড়েছে।এখনো ছাড়ছে না পাগলিটা, চুমুই চুমু দিয়েই যাচ্ছে। নিন্দুক হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে তাও হাসি থামার কোন লক্ষন নেই। নিঝুম পেটে হাত দিয়ে হেসেই যাচ্ছে।
সুন্দরের অবস্থা বেগতিক, নিজেকে নিজেই মনে মনে বলল,,,
__ সুন্দর আজ কেউ তোরে বাঁচাইতে আসইবো না, নিজের সম্মান নিজেকেই বাঁচাইতে হইবো।
পাগলির এমন আষ্টেপৃষ্ঠে সুন্দরকে জরিয়ে ধরেছে যে সুন্দরের নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।যাই হোক এর থেকে রেহাই তো পেতে হবে নাকি।পাগলির কাঁধ ধরে জোরে ধাক্কা দিলো সুন্দর, শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে পাগলি মাটিতে পড়ে গেল।এই সুযোগে সুন্দর দেয় ভো দৌড়ে, এমন দৌড় দেয় যে বারবার পড়ে যেতে ধরেও পড়লো না।আর এক লুঙ্গি এ ও ডিস্টার্ব দিতে লাগলো সুন্দরকে। লুঙ্গি ধরে নিঝুম কে রেখেই ভো দৌড় দেয় সুন্দর। নিঝুম এতে হকচকিয়ে সামনে দিকে তাকালেই দেখলো পাগলিটা তার দিকেই ধেয়ে আসছে। এবার সুন্দরের পিছনে পিছনে নিঝুম ও ভো দৌড় লাগায়।
নিন্দুক এখনো মাটিতে গড়াগড়ি করে হাসছে, শরীরে ধুলো লেগে আছে। নিন্দুক অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে উঠলো উঠে লুঙ্গিটা ঠিকমত পড়ে নিল, পরক্ষণেই সামনে তাকাতেই দেখলো পাগলিটা তার সামনেই দাঁড়িয়ে। নিন্দুক থমকালো, চমকালো চোখ বড় বড় হয়ে গেল,কি করবে বুঝতে পারছে না।পাগলি নিন্দুকের পানে এক ধেয়ে তাকিয়ে আছে।কে জানি নিন্দুককে আবার তার এক্সের মতো লাগছে নাকি। নিন্দুক টানটুন হাঁসি দিয়ে আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৮
__ মা আমার,কেমন আছো,আমি তোমার ছেলে ওই যে কাল মেলাতে হাড়িয়ে গেইলাম, আইচ্ছা মা আসি হ্যাঁ,ভালো থাইকো ।
এই বলে নিন্দুক ও ভো দৌড় দিবে এমন সময় পাগলি নিন্দুকের হাত ধরে জোরে হাঁসতে হাসতে বলে,,,
__ তুই তো বয়ফ্রেন্ড আমার,হাড়াইয়া গেছিলে মেলায়?জান আমার।
এই বলে নিন্দুকেও এঁকের পর এক চুমু দিতে লাগলো। নিন্দুক ও জোর জবরদস্তি করে নিজেকে ছাড়িয়ে মুখ মুছতে মুছতে ভো দৌড় দিলো।
