তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩১
রাফিয়া জান্নাত রিফা
গাড়ির ভেতর এক বড় ঝড় হচ্ছে। আলবান আর ইতির তর্কে চারদিক গরম হয়ে উঠেছে। আলবানের চোখে দপদপে অভিমান, তার মতে সেই আকস্মিক বিয়েটাই এখন বাস্তবরুপে আসবে, অস্বীকারের উপায় নেই। অপরদিকে ইতি কঠিন পাথর একদম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, সে কোনোভাবেই এই বিয়েকে মানে না। সেই নিয়ে দু’জনের কথার ঘা-ঘা-ঘর্ষণে গাড়ির বাস।
ভাগ্য ভাল, আজ গাড়িটা চালাচ্ছে ড্রাইভার, আর তার পাশে নিশ্চুপ দির্শক বসে আছে। তাদের পিছনের সিটে বসে আছে আলবান, ইতি আর বিথী।আলবান তপ্ত, ইতি কঠোর, আর তাদের মাঝে আবদ্ধ হয়ে থাকা নীরবতা ক্রমে ক্রমে ধারালো হয়ে উঠছে।
এদিকে বিথী এই ঝগড়ার তোড়ে কান দু’খানা চেপে ধরে রেখেছে। মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। গাছের সারি পেছনে ছুটে যাচ্ছে।
__ তোকে এ বিয়ে মানতেই হবে?
ঝগড়া করে হলেও ইতিকে বোঝাতে চাইছে আলবান ,কিন্তু ইতি উল্টোটাই বুঝছে।আলবানের কথায় মুখ বাঁকিয়ে ইতি বলে,,
__ মানি না আপনাকে স্বামী হিসাবে।
ইতি আমতা আমতা করে আবার বলে,,
__ আপনাকে আমি ভাইয়ের চোখে দেখি।
রাগে তেড়ে উঠলো আলবান মেজাজ টাও চরম আসমানে উঠেছে দাঁত কটমট করে আলবান বলে,,
__ তোকে আমি বিয়েটা মানতে বলছি, স্বামী মানতে কখন বললাম।
আলবান মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে আবার বলে,,
__ ইহহহ যে মেয়ে স্বামীর চুল টানে কামড় দে তাকে বউ মানতে আমার বয়েই গেছে,সর ভাগ,কালনাগিনী।
এরই মাঝে বিথী রেগে মেগে চিৎকার করে বলে,,
__ দুষ্শমন স্যার।
দির্শক চমকে বিথীর দিকে তাকালো ও বলল,,
__ কি হয়েছে?
বিথী ফের চিৎকার করে বলে,,
__ আমরা কোথায়?
__ বাংলাদেশের এক কোনায়।
__ মজা একদমই করবে না,আমি সিরিয়াস।
__ এই তো এসে গেছি মার্কেটে।
__ তাড়াতাড়ি করুন।
এর মাঝেই অনেক বার দির্শক ও বিথীর চোখাচোখি হলো,এটাতেও বড্ড বিরক্ত বিথী,আর এদিকে আলবান ও ইতির ননস্টপ ঝগড়া কান পুরোই ঝালাপালা করে দিচ্ছে।
ইতি ও আলবানের ঝগড়া এখনো থামেনি ইতি মতে,,
__ আমি আপনাকে পুলিশে দিবো, আমাকে বাল্যবিবাহ করার জন্য।
আলবানের নির্বিকার জাবাব,,
__ বিয়েটা না মানলে আবার ধরে বেঁধে বিয়ে করবো?
ইতি আলবানকে আর কিছু না বলে রেগে মেগে দির্শকে বলে,,
__ দুষ্শমন স্যার গাড়ি থামান।
গাড়ি থেমেও যায় কারণ তারা তাদের গন্তব্য এসে গেছে ,গাড়ি থেকে নামার জন্য আলবানকে তাড়া দেয় ইতি,,
__ নামেন গাড়ি থেকে।
বিরক্তি নিয়ে বিথী বলে,,,
__ কই যাবি তুই?
__ পুলিশের কাছে।
__ এ্যাঁ
আলবান বলে,,
__ মানে।
__ বাল্যবিবাহের কেস করতে গেলাম।
এই বলে ইতি গাড়ি থেকে নেমেই হনহনিয়ে চলতে লাগলো,পিছে পিছে ইতি,ইতি, আবার কাল নাগিনি বলে আলবান ও চলতে লাগলো।
যাওয়ার সময় চিৎকার করে ইতি বিথীকে বলল,,
__ নিধির জিনিস গুলো কিনে নে তুই,আজ হ এসপার আর না হয় ওসপার করে তবেই বাড়ি ফিরবো আমি?
বিথী ও দির্শক হা হয়ে তাদের যাওয়া দেখতে লাগলো,দির্শকের বরাবরই আলবান ও ইতির এমন ঝগড়া খুবই ভালো লাগে, কিন্তু এদিকে বিথীর তা একদমই অসহ্যকর ব্যাপার।দির্শক বিথীর দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ চলো তবে আমরা যাই।
__ হ্যাঁ চলুন।
রাস্তার ওপারে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শপিং কমপ্লেক্স আজ যেতে হবে সেখানেই। কিন্তু বিথীর এক পুরোনো দুর্বলতা আজ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। সে একা রাস্তা পার হতে পারে না, কোনোদিনই পারেনি। যখনই রাস্তা পার হওয়ার সময় আসে, ইতি আর নিধি দু’জনেই তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে, ওদের মুঠোর ভরসাতেই বিথী সাহস পায় পা বাড়াতে।কিন্তু আজ কেউ নেই।না ইতি, না নিধি।বিথীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা কেঁপে উঠল। মনটা হু হু করে খারাপ হয়ে গেল, আর সেই সঙ্গে এক ধরনের অস্বস্তি তাকে গ্রাস করল। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, এখন কী করবে। চারদিকে ব্যস্ত গাড়ির শব্দ।কিছুতেই সাহস কুলিয়ে উঠতে পারছে না বিথী।তখনি দির্শক তার দিকে একটা চিকন সরু চ্যালা কাঠ এগিয়ে দিয়ে বলে,,
__ ধরো।
বিথী একটু ধরাবাধায় পড়লো যাকে বলে ইতমস্ত বোধ,দির্শক আবার বলে,,
__ এখানে অসস্থি করার কিছুই নেই।
বিথী তাও ধরার সাহসটাও পেলো না,দির্শক আবার বলে,,
__ এতো ওভারথিন্ক ভালো না,এটা মস্তিষ্ককে অচল করে দেয়।
বিথী আর কিছু না ভেবে একবার দির্শকের চোখে তাকিয়ে কাঠটাকে ধরে নিলো।দির্শক মুচকি হেসে চলতে লাগলো।
রাস্তা পার হলো ঠিকই কিন্তু বিথী নিজেও জানে না যে সে ভয়ের বসে দির্শক হাত কখন ধরেছে।তা বোধ হতেই তড়িৎ বেগে নিজ হাত নিজের কাছেই গুটিয়ে নিলো,তা দেখে যদিও দির্শকের কপালে ভাঁজ পড়লো কিন্তু কিছু একটা ভেবে আবার তা শীতল হলো। অতঃপর দুজনেই চলতে লাগলো শপিং কমপ্লেক্সের ভিতরে।
__ ইতি দাড়া বলছি, দাড়া।
__ দাড়াবো না আমি।
আলবান এক দৌড়ে ইতির হাত ধরে থামিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলে,,
__ ইতি আমার এসব একদম অসহ্য লাগছে।
__ আমার ও।
__ কি চাস তুই।
__ আপাতত নারী হিসাবে আমার বাল্যবিবাহ কেন হলো তারই বিচার চাই,দ্যাট সেট।
__ তো বাল্যবিবাহ করে কি ক্ষতি হয়েছে তোর?
__ অল্প বয়সে মা হয়েছি।
__ কিইই?
ইতি যে ভুল কথা বলছে একজন্য নিজেই দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে চোখ বন্ধ করলো।আলবান মুখে শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে বলে,,
__ তেমন কিছু কি করছি?
আলবানের গ্রাস থেকে এক নিমেষে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ইতি বিরক্তির গুঞ্জনে ভরে পুলিশ স্টেশনের পথে এগিয়ে চলল। পেছনে শব্দহীন ছায়ার মতো আলবানও অনুসরণ করল তাকে কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো প্রশ্ন নয়, শুধু নীরব সঙ্গ।
অদ্ভুত লাগে এখন আলবানের নিজেরই, যে মানুষটা একসময় নিজের সিদ্ধান্তে পাহাড়ের মতো দৃঢ় ছিল, আজ সেই মানুষই হার মানে ইতির একরোখা জেদের সামনে। তার নীরব স্বীকারোক্তির মতো মনে হয় যেন ইতির কাছে পরাজিত হওয়া তাকে কেমন এক মধুর অবিশ্বাসে ডুবিয়ে রাখে।এককথায় যাকে বলে আনবিলিভেবল।
ইতি পুলিশ স্টেশনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার গলায় জমে থাকা উত্তেজনা হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে এলো,,
_পুলিশ! পুলিশ!
সারা ঘর মুহূর্তে স্তব্ধ। কর্তব্যরত ক’জন অফিসার চমকে তার দিকে তাকাল। ইতি সোজা এগিয়ে গেল সামনে থাকা ডেস্কের দিকে। রাগে-চঞ্চলে তার পায়ের শব্দে যেন পুরো স্টেশনটায় ঝঙ্কার উঠল। ডেস্কের সামনে পৌঁছে ধপ করে হাত চাপিয়ে দাঁড়াতেই কাঠের টেবিলটা কেঁপে উঠল। সামনে থাকা লোকটিকে বলতে লাগলো ইতি,,
__ পুলিশ কই, পুলিশকে ডাকেন?
লোক আরামের গদিখানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পুলিশ ইউনিফর্ম ঠিক করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,,
__ চোখ কি মাথায় নিয়ে ঘুরেন, দেখছেন তো পুলিশের ইউনিফর্ম পড়ে আছি।
ইতি পুলিশের ওপর নিচ পরখ করে কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,,
__ ওহহ।তাহলে শুনুন।
__ হ্যাঁ বলুন?
হঠাৎ ইতির চোখ যায় পুলিশের নিচের দিকে তখনি ইতি বলে,,
__ প্যান্ট গতিসীমার নিচে, অনুগ্রহ করে ঠিক করে নিন?
পুলিশ তার প্যান্টের দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ দুঃখিত ইহা আর উপরে উঠবে না।
সন্দিহান কন্ঠে ইতি শুধায়,,
__ কেন?
এই পর্যায়ে পুলিশের খুব রাগ হলো,তাও বলল,,
__ দেখতে পাচ্ছেন না ভুরির কারণে প্যান্টটা নিচে নামানো।
__ ওহহ, শুনুন।
__ হ্যাঁ বলুন।
__ আ কি যেনো বলতে এলাম।
পুলিশ হা হয়ে ইতি পানে চেয়ে রইল, এদিকে চেয়ারে বসে ইতি ভাবতে লাগলো সে কি বলতে এসেছিল,কিছুতেই মনে পড়ছে না।
অবশেষে বহুত কষ্টে মনে পড়লো, ঝটপট পুলিশকে বলল,,
__ তাড়াতাড়ি একটা ডায়রি করুন?
পুলিশকে হা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইতি বলে,,
__ আরে বসুন।
পুলিশ ভুঁড়ি টা বেটা করে বসে পড়লো,,
__ হ্যাঁ বলুন,কি সমস্যা কার নামে মামলা করবেন?
__ বাল্যবিবাহের কেস করবো?
__ ও তাহলে ফোর্স নিয়ে গিয়ে বিয়ে আটকাতে হবে তো?
__ তার কোন দরকার নেই।
__ মানে,সব ক্লিয়ার করে বলুন আমরা সেটার বিরুদ্ধে সোচ্ছারী হবো, একদম কোনো ভয় করবেন না আমরা আছি।
ইতি এবার মনে সাহস যুগিয়ে ব্যঙ্গ কান্না করতে করতে বলে,,
__ আমার বাল্যবিবাহ স্বামীর সাথে হয়েছে স্যার,আমি আমার বাল্যবিবাহের হওয়ার ন্যায় বিচার চাই স্যার।
পুলিশের মাথা চক্কর দিলো,এই মেয়ে বলে কি। পুলিশ বলে,,
__ আপনার বাল্যবিবাহ স্বামীর সাথে।
__ হ্যাঁ।
__ আপনার কত বয়সে বিয়ে হয়েছে?
ইতি মিছে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে,,
__ চার মাস বছর বয়সে স্যার আমার তো শিশু বিবাহ হয়ে গেছে।
__কিইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইই।চার মাস বছর বয়সে মানে।
পুলিশের এমন চিৎকারের কেঁপে উঠল ইতি,বুঝলো যে ভুলভাল বয়সটা বেশিই কম বলে বলছে আবার ভুল ও বলেছে ,সে ক্ষেত্রে আবার ইতি আমতা আমতা করে বলে,,
__ ১৪ ,১৪বছর।
পুলিশ সোচ্চারি ভঙ্গিতে বলে,,,
__ কার এত বড় সাহস কে সে?
ইতি হাসতে হাসতে বলে,,
__ খুব বাজে লোক, আমার পিছু পিছু ফলো করে এসেছেও, নির্লজ্জ একটা লোক, গারদে ঢুকানোর ব্যবস্থা করেন তাড়াতাড়ি।
তখনি সেখানে উপস্থিত হলো আলবান, পুলিশ আলবান কে দেখে হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং বলল,,
__ আপনি এখানে,কোন প্রয়োজন স্যার?
ইতি আলবানকে একবার দেখে পুলিশকে আবার বলে,,
__ স্যার এই লোকটাই আমাকে বাল্যবিবাহ করছে।এনাকে ধরে জেলে ভরে দিন।
পুলিশ একটু ভয় ভয় করে বলে,,
__ এনাকে গ্রেফতার করবো?
__ হ্যাঁ এনিই আমাকে বাল্যবিবাহ করছে?
পুলিশ অনেক সাহস নিয়ে আলবানের কাছে যায়, পকেটে হাত দিয়ে কপাল দশভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ তার কাছে গিয়ে বলে,,
__ স্যার সত্যিই আপনি বাল্যবিবাহ করেছেন?
আলবানের নিরেট জবাব,,
__ হ্যাঁ তো।
__ খুব অন্যায় করেছেন স্যার?
__ আপনিও কি ওর সাথে সেন্সলেজ,ব্রেনলেস, ইডিয়ট হয়ে গেলেন?
__ মোটেও না আমি একজন সৎ পুলিশ এস আই।
কিছু একটা ভেবে আলবান ফের বলে,,
__ আপনার বউ কি এখনো আপনাকে ধোলাই দেয়?
পুলিশ মাথা নিচু করে অসহায় কন্ঠে বলে,,
__ ওই একটু আর কি।
আলবান মুচকি হেসে ফের বলে,,
__ বউয়ের পা না টিপলে মারে বুঝি?
__ মাথাও টিপে দিতে হয়।
কথার মাঝে ইতি ফোঁস করে বলে উঠলো,,,
__ ওই পুলিশ আপনার ফোন আমার হাতে,এখন আমি আপনার বউ কে ফোন দিবো,ও বলবো।
কথা শেষ না করে ইতি শয়তানি হাসি হাসতে লাগলো, পুলিশ হকচকিয়ে বলে,,
__ ক কি বলবে আমার বউকে।
__ বলবো আপনি আমার সাথে প্রেম করছেন।
এস আই ভরকে গেল, ভারাক্রান্ত গলায় ইতিকে বলতে লাগলো,,
__ না না এটা করবেন আমার বউ এমনিতেই আমায় খুব সন্দেহ করে,এখন আপনি এমন কথা বললে এখানে এসেই আমাকে ডিভোর্স পেপার দিয়ে বলবে “এক্ষুনি আমার পঞ্চাশ লাখ টাকা মোহর দে” ইয়া আল্লাহ এত টাকা আমি পাবো কই।আমাকে কি করতে বলুন আমি তাই করে দিচ্ছি,দয়া করুন।
আলবান এবার রাগ দেখিয়ে বলে,,,
__ ইতি এবার বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
আলবান কথাকে পাত্তা না দিয়ে ইতি এসআই কে বলে,,,
__ ওনাকে এক্ষুনি জেলের ভাত খাওয়াবেন,আমাকে বাল্যবিবাহ করার জন্য।
একদিন আলবানের পাহাড়সম দেহের সঙ্গে একটুখানি ধাক্কা খেয়েই এই হতভাগ্য পুলিশ লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল, সেই ঘটনার আতঙ্ক আজও কারও কারও চোখে লুকিয়ে আছে, ইতি, বিথী আর নীধি যেদিন অপহৃত হয়েছিল, সেদিন আলবানের যে তীব্র, অগ্নিদাহ রাগ পুলিশ দেখেছিল তারপর থেকে তারা যেন শীতের রাতে কাঁপতে থাকা প্রদীপের শিখার মতোই ভয়ে থরথর করে।
কিন্তু এ মুহূর্তে ভয়-শঙ্কায় কাজ হবে না। আইন তার পথেই চলবে, আর সেই পথ আজ আলবানকে কারাগারের দিকে টেনে নিয়ে যাবে এমনটিই বিধির বিধান।
উপায়ান্তর না দেখে পুলিশ অবশেষে এগিয়ে এলো। কাঁপা হাতে আলবানের বলিষ্ঠ বাহু চেপে ধরে তারা বলতে লাগল,,
__ চলুন স্যার,এছাড়া আমার কোন উপায় নেই।
আলবানের রাগ দপদপ করে উঠলো,,
__ ওই কালনাগিনীর কথা শুনছেন আপনি,কমন সেন্স কই রেখে ঘুরেন।মানছি যখন ওই কালনাগিনীকে বিয়ে করি তখন ছিল ১৪ বছর বয়স ছিল,এক ধরাবাঁধায় বাঁধ্য হয়ে বিয়ে করতে হলো, তারপর দিনই আমি ইউএসএ চলে গেলাম,চার বছর পার আবার এলাম অপ্রত্যাশিত সেই বিয়েকেই প্রাধান্য দিতে কিন্তু এখন কালনাগিনীর নতুন এক রুপ বের হলো সে নাকি আমাকে এখন তার সাথে হওয়া বাল্যবিবাহের শাস্তি দিবে, নংসেন্স।
আলবানের কথায় ইতি মুখ ভেংচিয়ে পুলিশকে বলল,,
__ আপনার বউ কে দিলাম ফোন।
পুলিশ ইতির কঠোর গলাটি শুনেই আর কোনো দেরি করল না। সঙ্গে সঙ্গে একজন হাবিলদারকে ডাক দিল। মুহূর্তের মধ্যেই দুইজন হাবিলদার আলবানের দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরল আলবানের দেহে যেন অগ্নিশিখা ছটফট করছিল, কিন্তু তাও তারা তাকে টেনে নিয়ে গেল লোহার গ্রিলের ভেতর।ধপ করে দরজা বন্ধ, সঙ্গে সশব্দে তালা ঘোরানোর শব্দ,,
ঠাস্!
তালা লাগতেই আলবানের মস্তিষ্কে রাগের দপদপানি যেন চরমে উঠল। লালচে, রক্তবর্ণ চোখে সে তাকিয়ে রইল ইতির দিকে এক দৃষ্টিতে যেন ভস্ম করে দেবে তাকে।
কিন্তু ইতি?এতে ইতিরভ্রূ পর্যন্ত কাঁপল না। যেন এসব তার কাছে প্রতিদিনের ঘটনা।
পুলিশের চেয়ারে পা তুলে, এক পা অন্য পায়ের উপর রেখে, রাজসিক ভঙ্গিতে বসল ইতি চোখে সামান্য ব্যঙ্গ, সামান্য অভিমান।
ওদিকে আলবানের সঙ্গে একই সেলে থাকা মধ্যবয়সী এক পুরুষ, যিনি এতক্ষণ অবাক হয়ে পুরো নাটকটা দেখছিলেন, হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,,
__বাবা রে… ভাইসাহেব, আপনার বউটা তো দেখছি বজ্রপাতের মতো! এত তেজি রে কোথায় পাইলেন?”
আলবান রাগে গজগজ করছে, লোকটার কথার উওর দিলো না,লোকটা আবার অসহায় কন্ঠে বলল,,
__ বউ নামক প্যারার কারণে আজ আমিও জেলে।
আলবান মাথার রগ পর্যন্ত টানটান করে ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। কালো লোহার গ্রিলগুলো দু’হাতে এমন শক্ত করে ধরেছে যে আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে মনে হচ্ছে যেন সারা দুনিয়ার রাগ সেই ঠান্ডা লোহাতেই ঠেসে দিচ্ছে।
হঠাৎ সে আর ধরে রাখতে পারল না। বুকভরা দম নিয়ে গলা ছেড়ে চিৎকার করল,,
__ খুব ভুল করলি ইতি,এর ফল ভালো হবেনা বলে দিলাম।
ইতি আলবানের সেই দগ্ধ করা চিৎকারের দিকে আড়চোখে মাত্র এক ঝলক তাকাল সেই দৃষ্টিতে।
তারপরই আলবান নামের মানুষটা অস্তিত্বহীন মনে করে।ইতি আবার ফোনের স্ক্রিনে চোখ গুঁজে দিল। রিলস চালু করতেই পর্দা জুড়ে নাচ, মজা, ব্যঙ্গ আর ইতি হো হো করে হাসতে লাগল। এমন এক উদ্দাম, গা-ছাড়া হাসি, যেন এখানে কেউ কারো সাথে কোন ঝামেলায় নেই।
হাসিটা এতটাই হঠাৎ আর এত জোরে যে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা হাবিলদার চমকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। আর এসআই-এর মুখে অবাক বিস্ময়ের ভাঁজ, প্রশ্ন জাগলো,এই মেয়েটার মনের তারগুলো কোন দিকে বাঁধা!
ওদিকে লোহার গ্রিলের আড়ালে দাঁড়ানো আলবান সেই হাসি শুনে যেন আরও উল্কার মতো জ্বলে উঠছে। ইতির প্রতিটি হাসির ঢেউ তার রাগকে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রিলস দেখতে দেখতে এিশ মিনিট পার হতেই হকচকিয়ে ইতি এসআইকে বলল,,
__ ওনার শাস্তি মওকুফ করা হলো, এখন ওনাকে ছেড়ে দিন।
পুলিশ তখন সন্দিহান কন্ঠে বলল,,
__ আমার বউকে…
কথা শেষ হতে না দিয়েই ইতি বিরক্তির সহিত বলে,,
__ আরে হ্যাঁ হ্যাঁ বলবো না,এখন যা বলছি তাই করেন।
হাবিলদার তালা খুলতেই আলবান বাঁধন ছিঁড়ে বেরোনো ঝড় মাথা থেকে পা পর্যন্ত ১০০০ ভোল্টের রাগে জ্বালা ধরেছে। হনহনিয়ে ইতির দিকে এগিয়ে এল সে।
সবকিছু ঘটল এত দ্রুত যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই
ঠাঁসসস!
আলবানের হাত ইতির গালে সপাটে পড়ল।ইতি দুলে উঠল, মাথার ভেতর যেন ভো-ভো করে বাতাস ঘুরতে লাগল। কানে অদ্ভুত টসসসশব্দ বাজতে লাগল, চোখ ঝাপসা,চোখের কোণে পানি জমে উঠল মুহূর্তেই।
ইতি কিছু বলার আগেই, আবার,,
ঠাস্!
আবারো বিপরীত গালে আরেকটা চড়।এইবার মাথাটা আরও বেশি ঘুরে গেল তার।ব্যথায়, অপমানে, শোকে দুই গালে হাত চেপে ইতি সোজা মেঝেতে বসে পড়ল।
তার পুরো দেহ কাঁপছে, গলায় কান্না রুদ্ধ হয়ে আছে। তারপর এক শ্বাসে গলা ফেটে চিৎকার করে এসআই পুলিশকে বলতে লাগলো,,
__ দেখছেন কি?এনাকে আবার নারী নির্যাতনের কেস দিয়ে জেলে ঢুকান।
পুলিশ কিছু বললো না,বলতে চাইলো যে “মেয়েদের গায়ে হাত তোলা বেআইনি”কিন্তু তাও বললো না কেনই বা বলবে কারণ সে ও তো তার বউয়ের মাইর খায়।
আলবান রাগ দেখিয়ে ইতির দিকে ঝুঁকে বলে,,
__ ফাঁক আপ ইয়ুর মেলোড্রামা।
এই বলে ইতির হাত ধরে টেনে তুললো, আক্রোশ নিয়ে সেই হাত চেপে ধরে ইতিকে টানতে টানতে নিয়ে চলতে লাগলো ও বললো,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩০
__ এরপর যেটা হবে সেটা তোর ভাবার বাইরে, কিছু বলছি না বলে,পাখা গজিয়েছে না,দেখ তবে কি করি।
ইতি ভালো করেই বুঝল সে বড় একটা ভুল করেছে।
আলবানকে রাগিয়ে দেওয়া শুধু ক্ষুদ্র খোঁচাই নয়, বরং আগুন জ্বালানো সমান। এখন কি করতে পারে তা ইতির ও ধারনার বাইরে তবে ভয়ংকর কিছু যে তার জন্য অপেক্ষা করছে তা ভালো করেই জানে।এক মুহূর্তে কি হলো তা বলা বাহুল্য ইতির শরীর অনবরত এক অজানা ভয়ে শিটিয়ে আসতে লাগলো।
