Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬১

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬১

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬১
Fatima Fariyal

মীর হাউজে উৎসবের ঢেউ লেগেছে। হাসি-ঠাট্টা, কোলাহল; সব মিলিয়ে অনেকদিন পর বাড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কারণ একটাই, আহাদ আর রিদিতা সহ সবাই আজই ইন্ডিয়া থেকে ফিরে এসেছে। ওদের আসলে আরও সাত দিন থাকার কথা ছিল। কিন্তু রিদিতার শরীরের কথা ভেবে আহাদ এক মুহূর্তও দেরি করতে রাজি নয়। একদিনও না। সে রিদিতাকে নিয়ে সামান্যতম ঝুঁকি নিতে চায়নি। শেষমেশ সবার ইচ্ছে-অনিচ্ছের ঊর্ধ্বে গিয়ে সিদ্ধান্তটা নিতে হয়েছে। নীলা আর শাহীনও তাদের সাথে মীর হাউজেই উঠেছে। আর রিদিতার খবর পেয়ে তার আব্বু-আম্মুও গ্রাম থেকে চলে এসেছেন মেয়েকে একনজর দেখতে। ঈশানী, সুমন, সঙ্গে তানভীরও এসেছে। সব মিলিয়ে বাড়িটা গমগম করছে।

এই ভিড়ের মাঝেই তানভীর কিছুক্ষণ নীলার দিকে চেয়ে রইল। এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস লুকানো চাহনি। তারপর হতভাগার মতো মুখ করে রিদিতার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“আমার কপাল এত পোড়া কেন রে? আমি যেই মেয়ের সাথে সেটেল হতে চাই, সেই মেয়েরই বিয়া হয়ে যায়। এই প্রেমহীন, নিরামিষ জীবন দিয়া আমি কী করমু? আমারে একটু বিষ দে, খাইয়া মইরা যাই।”
রিদিতা চাপা তাছিল্যের হাসি দিয়ে উত্তর দিল,
“তোর কপালে মেয়ে কেন? ওই বিষটাও জুটবে না।”
তানভীর ভুরু কুঁচকে বলল,
“দেখ, খোঁচা দিস না। তুই অসুস্থ বলে ভাবিস না, পার পেয়ে যাবি। তোর পোলাপান দুনিয়ায় আসলে একেকটার হো’গার উপরে থাপ্পড় দিমু।”
রিদিতা চোখ ঘুরিয়ে বলল,

“হুম, আর আহাদ রাজা তোকে ছেড়ে দিবে?”
তানভীর সামান্য নড়েচড়ে আহাদের দিকে তাকাল। তাকিয়েই বুঝে গেল আহাদ যেন আগুন ছুড়ছে চোখ দিয়ে। তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল,
“বাপরে! সত্যি সত্যি শুনে ফেলল নাকি?”
রিদিতা আবার ফিসফিস করে বলল,
“আমি বলব? তুই কী বলেছিস!”
তানভীর মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“এ্যাহ! নিজে পারোছ না, এহন জামাই নিয়া আমার সাথে ঝগড়া করতে নামতে চাস?”
রিদিতার নাকের ডগা ফুলে উঠল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ফরিদা বেগম এসে মেয়ের পাশে বসে পড়লেন। তাতেই তানভীর সরে গেল। ফরিদা বেগম মেয়ের কপালে মাতৃত্বের চুমু এঁকে দিয়ে বললেন,
“আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া। তিনি আমার দোয়া শুনছেন। আমি অনেক খুশি হইছি মা।”
তারেক রায়ান সামনেই বসে মা-মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখ ছলছল করছে। রিদিতা তার আব্বুর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে, প্রশ্ন করল,

“আব্বু খুশি হয়নি?”
ঈশানী পাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“খুশি হবে না কেন? তুই জানিস, তোর কথা শুনে আব্বু কতক্ষণ কাঁদছে? আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। আর মাহির তো সে কী আনন্দ! নাচতে নাচতে বলছে, ‘আমি খালামনির বেবিদের সাথে কানামাছি খেলব!’”
রিদিতা হেসে উঠল। এই হাসির মাঝেই তার পাশে বসে থাকা আফরোজা শেখ দৃশ্যটা নীরবে দেখছিলেন। ফরিদা বেগম একটু সংকোচ নিয়ে বললেন,
“আপা, আসলে আমরা চাই রিদিতাকে আমাদের সাথে নিয়ে যাইতে। এই সময় মেয়েরা তো বেশিরভাগ বাবার বাড়িতেই থাকে। আপনি যদি অনুমতি দেন…”
রিদিতা যেন বিদ্যুৎ স্পর্শে চমকে উঠল। সে দ্রুত আহাদের দিকে তাকাল। তার চোখের মণি লালচে হয়ে উঠেছে; যেন এখনই বিস্ফোরণ ঘটবে। সে শুকনো একটা ঢোক গিলে বলল,

“আম্মু… তুমি কী বলছো? আমি এই অবস্থায় ভোলা যাবো?”
ফরিদা বেগম শান্ত স্বরে বললেন,
“তোর আব্বুও এটাই চায়। আমরা তো সেই উদ্দেশ্যেই আসছি।”
“কিন্তু আম্মু…”
সে কথা শেষ করার আগেই তারেক রায়ান বললেন,
“তোমার আম্মু ঠিকই বলেছে। তুমি কী যেতে চাও না?”
রিদিতা উত্তর দেয়ার আগেই আফরোজা শেখ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “ভাইজান, আপনারা কি ভাবছেন রিদিতা এখানে অসুখী?”
তারেক রায়ান অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন।

“ছি! ছি! এমনটা কেন ভাববো?”
“তাহলে ওকে নিয়ে যেতে চাইছেন কেন? আমার উপর কী আপনাদের ভরসা নেই? আপনার মেয়েটাকে আমি নিজের মেয়ের চেয়েও কম ভাবি না।”
তারেক রায়ান চুপ করে গেলেন। সত্যিই তো, এরা তার মেয়ের যত্নে কোনো কমতি রাখেনি। রিদিতা উঠে গিয়ে বাবার পাশে বসে অনুনয়ের সুরে বলল,
“আব্বু… আমি জানি তোমরা আমার জন্যই বলছো। আমার কথা ভেবেই বলছো এসব, কিন্তু আমি চাই আমার সন্তানরা তাদের বাবার বাড়িতেই জন্ম নিক।”
তারেক রায়ান মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। ভিতরে ভিতরে তৃপ্ত হলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“ঠিক আছে মা। তুমি যখন এখানেই থাকতে চাও, থাকো। আমরা না হয় মাঝেমধ্যে এসে দেখে যাবো।”
রিদিতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আহাদের দিকে তাকিয়ে দু’চোখ টিপে হাসল। আহাদও তার ভঙ্গি দেখে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে হালিমা বেগম ডাকলেন,
“রিদিতা, একটু এদিকে আয় তো। শুনে যা।”
“আসছি।”
বলে সে উঠতে নিল।
হঠাৎ করেই মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ইদানীং প্রায়ই এমন হচ্ছে। সে নিজেকে সামলাতে চাইল, কিন্তু পা আর শরীর সায় দিল না। পাশেই ছিল আদনান। আহাদ কিছু বোঝার আগেই সে ঝটপট রিদিতাকে ধরে ফেলল। আমজাদ মীর এগিয়ে এসে স্নেহমাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে মা? খুব খারাপ লাগছে?”
রিদিতা কপাল চেপে ধরে না-সূচক মাথা নাড়ল। এমন সময় আহাদ ঈর্ষায় চেঁচিয়ে উঠল,

“রিদি! বাবা!”
আমজাদ মীর পরোয়া করেলেন না। উদ্বিগ্ন হয়ে আদনানকে বললেন,
“আদনান, দেখ তো হঠাৎ কী হলো।”
আদনান উঠতে নিলেই আহাদ চেঁচিয়ে উঠল,
“সিরিয়াস! কোকো!”
মুহূর্তেই দুই কুকুর হাজির। আহাদ লাল বল ছুড়ে দিয়ে আদনানের দিকে ইশারা করল। একরকম লেলিয়ে দেয়া যাকে বলে। আদনান আবার এসব পশু-পাখি দেখলেই পালায়। তার ভাষ্যমতে, এসবের শরীরে জীবাণু থাকে। তাই সে সবসময় এড়িয়ে চলে। এখন কুকুর দুটো তার দিকে এগোতেই সে ধড়ফড় করে উঠে দৌড় দিল। সিরিয়াস আর কোকো তার পিছু নিল। শুরু হলো এক অদ্ভুত দৌড়ঝাঁপ। সবাই একসাথে হেসে উঠল। শেষমেশ আদনান সেন্টার টেবিলের ওপর উঠে দাঁড়াল। হাঁপাতে হাঁপাতে ভাবল, এখানে তার কী দোষ? সে তো শুধু রিদিতাকে পরে যাওয়া থেকে সামলেছে। তবু সব রাগ, ক্ষোভ আর দুর্ভোগ শেষ পর্যন্ত ঘুড়েফিরে তার উপর কেন আসে?

সময় যেন নিঃশব্দে নিজের পথ চলেছে। দেখতে দেখতে পাঁচটা মাস কীভাবে পেরিয়ে গেল, তা কেউ টেরই পেল না। শীতের কুয়াশা ধীরে ধীরে মিলিয়ে প্রকৃতিতে নেমে এসেছে বসন্তের ছোঁয়া। চারপাশে এখন আর হাড় কাঁপানো ঠান্ডা নেই; বরং বাতাসে এক ধরনের কোমলতা। বাইরে মৃদু ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে, যা শরীর ছুঁয়ে মন পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। বাতাসটা মুক্ত, নির্মল, অথচ আহিয়ার বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা একটুও হালকা করতে পারল না।
ঘন অন্ধকার আকাশে দু-একটা তারা ঝিলমিল করে জ্বলছে। তাদের আলো খুব ক্ষীণ, তবুও চোখে পড়ে। বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে আহিয়া অনেকক্ষণ ধরে সেই আকাশের দিকেই তাকিয়ে রইল। চোখে কোনো মুগ্ধতা নেই, নেই বিস্ময়। দৃষ্টিটা শূন্য, ভাবনাগুলো এলোমেলো। এই খোলা আকাশ, মুক্ত বাতাস সবকিছু মিলেও তার মনটাকে শান্ত করতে পারছে না। বরং বুকের গভীরে জমে আছে একরাশ চাপা যন্ত্রণা। যেটা কাউকে বলা যায় না, কাউকে বোঝানোও যায় না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে হঠাৎ কোমল এক আলিঙ্গনে আবদ্ধ হলো তার অস্থির দেহটা। আহিয়া মুহূর্তেই বুঝে গেল কে এসেছে। সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। শুধু চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। কণ্ঠ ভারী হয়ে এল, ভাষা জড়িয়ে গেল অশ্রুর চাপে।

“কেন এসেছেন?” তার কণ্ঠে ক্লান্তি আর অভিমানের মিশেল। “আমি তো বলেছি, আমার থেকে দূরে থাকবেন। তাহলে কেন বারবার একই ভুল করেন? কেন কাছে আসেন? যাবো না আমি আপনার সাথে আপনি… আপনি চলে যান।”
আদনান তার হাতের বাঁধন আরও শক্ত করল। যেন সে জানে, এভাবে না ধরলে আহিয়া আবার নিজেকে গুটিয়ে দূরে সরে যেতে পারবে না। কানের কাছে ঝুঁকে ভাঙা, নরম স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“আর কত, আহি… আর কত শাস্তি দিবি আমাকে? আর কত দূরে দূরে থাকবি আমার কাছ থেকে? তুই কেন বুঝতে চাইছিস না। আমি যা করেছি, সব তোর ভালোর জন্যই করেছি।”
এই কথাগুলো আর ধরে রাখতে পারল না আহিয়া। ঢুকরে কান্না বেরিয়ে এলো। নাক টেনে টেনে বলল,

“আমি কি এখন ভালো আছি না, বলুন?”
আদনান তাকে আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। দুই হাত দিয়ে তার মুখটা ধরে তাক করল নিজের দিকে। চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত স্বরে বলল,
“শোন আহি… যদি তখন আমি তোর অ্যাবরশন না করাতাম, তাহলে আজ তুই আমার সামনে থাকতিস না।”
আহিয়া ফিসফিস করে বলল,
“না থাকলেই তো ভালো হতো,”
আদনানের কণ্ঠ ভারী হয়ে এল,
“আহি! রাগাস না আমাকে। তুই ভালো করেই জানিস, তখন তোর শরীরের অবস্থা কী ছিল। বেবি ক্যারি করা তোর জন্য কতটা রিস্কের ছিল। এক্সিডেন্টালি যা হওয়ার হয়েছিল, কিন্তু তাই বলে আমি তোকে হারিয়ে কাউকে এই পৃথিবীতে আনতে চাইনি। ওই বেবিটাকে জন্ম দিতে গেলে তুইও থাকতিস না, বেবিটাও না। তখন আমার কী হতো, একবার ভেবেছিস?”

আহিয়া সব জানে। সব বোঝে। যুক্তি, বাস্তবতা সবই তার জানা। তবুও কেন জানি এই কঠিন, নির্মম সত্যটা তার হৃদয় মেনে নিতে পারে না। মাত্র নয় সপ্তাহের একটা ভ্রূণ; তবুও তার জন্য বুকের ভেতর এমন এক টান জন্ম নিয়েছে, যা সে নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারে না। একটোপিক প্রেগন্যান্সির কারণে তাকে জোর করেই অ্যাবরশন করাতে হয়েছিল। চিকিৎসার দিক থেকে সেটাই ছিল একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু হৃদয় কি চিকিৎসা বোঝে? হৃদয় তো শুধু শূন্যতাটাই অনুভব করে। আহিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আদনানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আদনান তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। যেন এই আলিঙ্গনেই সব কষ্ট আটকে রাখতে চায়। কপালে, মাথায় একের পর এক চুমু রেখে ধীর স্বরে বলল,
“কেন এত মন খারাপ করছিস আহি? কেন কাঁদছিস? এখন তো তুই পুরোপুরি ঠিক আছিস। আমরা আবার ট্রাই করব। আল্লাহ চাইলে একদিন তুই বাবুর আম্মু হবি, আর আমি বাবুর আব্বু। একবার সমস্যা হয়েছে তো কী হয়েছে? পুরো জীবনটা তো এখনো পড়ে আছে আমাদের সামনে।”

আহিয়া চোখ ভেজা অবস্থাতেই ফিসফিস করে বলল,
“আপনি ইচ্ছে করেই সব করেছেন। আপনি কখনোই বেবি চাইতেন না।”
আদনান জানে, এই কথাগুলো অভিমান থেকে বলা। তবুও সে কোনো প্রতিবাদ করল না। সব অভিযোগ নীরবে নিজের কাঁধে তুলে নিল। আহিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু আদনানের বাহু তাকে আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল।
“এই যন্ত্রণার মধ্যেও আমি তোর সাথে আছি। এই শূন্যতা তোর একার না, আমি থাকব এই শূন্যতার মধ্যে।”

আহাদ সেই কখন থেকে চাদর মুড়িয়ে বসে আছে। পুরোপুরি নয়, এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যেন প্রয়োজনে একটু ফাঁকফোকর দিয়ে তাকানো যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, সে ফাঁকফোকর দিয়ে তাকানোর চেষ্টা করলেই বিপদ। সাথে সাথেই রিদিতার বমির ভাব শুরু হয়ে যায়। ওয়াক্ক, ওয়াক্ক! শুরু করে দেয়। আহাদ বুঝতে পারে না তার সাথেই কেন এমন হয়! আজ তিন দিন ধরে একই কাণ্ড। রিদিতা খাবার খাওয়ার সময় আহাদের মুখ দেখলেই ওয়াক্ক টানে। অথচ এই সাতটা মাসে তো এমন হয়নি। সব ঠিকঠাকই চলছিল। তাহলে হঠাৎ করে এখন কেন? চাদরের নিচে বসেই বিড়বিড় করে উঠল আহাদ,

“এটা আবার কেমন হরমোনাল সমস্যা? আজব! আমার চেহারা কী এতই খারাপ হয়ে গেছে নাকি?”
এই দৃশ্য দেখে হালিমা বেগম আর রিতু নিজেদের ধরে রাখতে পারলেন না দুজনেই হেসে উঠলেন। রিদিতাকে রাতে খাবার খাওয়াতে এসেছেন হালিমা বেগম। এতদিন এই দায়িত্বটা আহাদই সামলেছে। কিন্তু এই তিন দিন ধরে রিদিতা আহাদের সামনে খেতে পারছে না। তাই বাধ্য হয়েই তিনি উপরে উঠে আসছেন। খাবার শেষ হতেই হালিমা বেগম রিতুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“রিতু! এগুলো নিয়ে যা। আমি রিদিতাকে ওষুধ দিয়ে আসছি।”
রিতু ট্রে নিয়ে বেরিয়ে গেল। হালিমা বেগম নিজ হাতে রিদিতাকে ওষুধ খাইয়ে দিলেন। তারপর উঠে যেতে যেতে আহাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন,
“আমি যাচ্ছি। রিদিতার খাওয়া শেষ। এবার চাদর সরাতে পারিস।”
এই বলে তিনি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আহাদ ধীরে ধীরে মুখ থেকে চাদর সরাল। চোখে একরাশ রাগ, অভিমান আর অসহায়ত্ব মিশিয়ে তাকাল রিদিতার দিকে। রিদিতা ঠোঁট ফুলিয়ে একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

আহাদ উঠে তার পাশে এসে বসল। কণ্ঠে রাগ আর অভিমান একসাথে মিশে আছে, “তাকাবো না তো কী করবো?”
রিদিতা একটু বিরক্ত স্বরে বলল,
“আমি করছি নাকি? আপনার বাচ্চারাই এমন করছে।”
আহাদ ফোস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ধীরে ধীরে রিদিতার উদরে হাত রাখল। কণ্ঠে এবার রাগ নেই। শুধু দুশ্চিন্তা,
“রিদি, আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। ওরা এখনই এমন করছে… পৃথিবীতে আসার পরে কী করবে?”
রিদিতা হালকা হেসে ফেলল। আহাদ আরও কিছুক্ষণ ওর পেটে হাত রেখে বসে রইল। কান পেতে বাচ্চাদের নড়াচড়া অনুভব করার চেষ্টা করল। এই সময়টুকুতে সে একদম শান্ত। হঠাৎ রিদিতা ডাকল,
“মন্ত্রীমশাই!”
তখন আহাদ রিদিতার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ রেখেই জবাব দিল,
“হুম।”
“আমাকে নিয়ে বেরোবেন?” রিদিতার কণ্ঠে অনুনয়, “অনেকদিন বাইরে যাই না। আমার রাতের শহরটা একটু ঘুরে দেখতে ইচ্ছা করছে। চলুন না।”
আহাদ বিদ্যুতের গতিতে উঠে বসল। চোখ কপালে তুলে বলল, “মাথা খারাপ? এতদিনেই নিয়ে যাইনি, এখন নিয়ে যাবো? নিজের অবস্থা দেখেছো?”

রিদিতা সাথে সাথে ঠোঁট চেপে ধরল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে রেগে গেছে। কিন্তু আহাদ এমন মানুষ না যে এসব দেখে গলে যাবে। যে মানুষটা তাকে সামান্য নিচতলায় যেতে দেয় না, সে কি তাকে নিয়ে রাতের শহরে ঘুরবে? প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সমস্যা হলো, রিদিতাও এখন হাল ছাড়ার পাত্রী না। ইদানীং সে অদ্ভুত অদ্ভুত বায়না ধরছে। এই তো সেদিন মাঝরাতে হঠাৎ ছাদে যাবে বলে জেদ ধরে বসেছে। শেষমেশ আহাদ ছাদে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আরেকদিন শেষ রাতে পাস্তা খাবে বলে বসল। উপায় না দেখে আহাদ নিজেই ইউটিউব দেখে রান্না করেছিল। ফলাফল খাওয়ার অযোগ্য। পরে হালিমা বেগম উঠে এসে রান্না করে দিয়েছেন। আর আজ? আজ আবার বাইরে যাওয়ার বায়না। রিদিতা গাল ফুলিয়ে বসে আছে। চোখে একরাশ জেদ। শেষমেশ আহাদকে হার মানতেই হলো প্রেয়সীর আবদারের কাছে।

রাত একটা নাগাদ তারা বাইরে বের হলো। শুধু আহাদ আর রিদিতা নয়; সাথে আদনান আর আহিয়াও আছে। আহিয়া ইদানীং মনমরা হয়ে থাকে। তাই আহাদ ইচ্ছা করেই ওদের সাথে নিয়েছে। ভাবছে, পরিবেশ বদলালে হয়তো ওর মনটা একটু ভালো হবে। এতেই শেষ না। শাহীনকেও ফোন করে নীলাকে নিয়ে আসতে বলেছে। সবাই একসাথে থাকলে আহিয়ার মনটা হালকা হবে হয়তো। হয়তো আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

সবাই মিলে রাতের শহরে বেরিয়ে পড়েছে। রাতের নিস্তব্ধতা পুরোপুরি নামেনি। রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা। মাঝেমধ্যে দু-একটা গাড়ি, মোটরসাইকেল কিংবা দূরে হর্নের ক্ষীণ শব্দ কানে আসে। স্ট্রিটলাইটের হলুদ আলো পিচঢালা রাস্তায় লম্বা ছায়া ফেলে রেখেছে। আহাদের গাড়ি ধীর গতিতে এগোচ্ছে। স্টিয়ারিংয়ে দু’হাত শক্ত করে রাখা। চোখ সোজা সামনের রাস্তায়। পাশে বসে রিদিতা জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। শহরের আলো-আঁধারির ভেতর সে কেমন একটা অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজছে। পিছনের গাড়িটায় আদনান, আহিয়া, নীলা আর শাহীন। খুব বেশি দূরত্ব না। তারও পেছনে আরেকটা গাড়ি, আদিলের। বাকিরা জানেনা আদিল ওদের পিছনে আছে। আসলে ওরা বেরোনোর মুহূর্তেই আদিল মূলত পিছু নিয়েছে।

গাড়ি যখন জেনেভা ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছাল, হঠাৎ রিদিতার চোখে পড়ল রাস্তার পাশে দাঁড়ানো একটা ভ্যান। কয়লার আগুনে ভুট্টা পোড়া হচ্ছে। আগুনের লালচে আলোয় ভুট্টাগুলো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। সেই পরিচিত গন্ধটা হাওয়ায় ভেসে এসে নাকে লাগতেই রিদিতার ভেতরে অদ্ভুত এক টান তৈরি হলো। সে হঠাৎ বলে উঠল,
“এখানে গাড়ি থামান। গাড়ি থামান।”
আহাদ সাথে সাথে ব্রেক চাপল। গাড়ি থামতেই সে কপাল কুঁচকে উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করল,
“কী হয়েছে? খারাপ লাগছে? বাসায় ফিরে যাবো?”
রিদিতা মাথা নেড়ে না বলল, “উহুম।”
“তাহলে?”

আহাদের কণ্ঠে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।
রিদিতা আঙুল তুলে রাস্তার পাশে ভ্যানটার দিকে দেখাল।
“আমি ভুট্টা পোড়া খাবো। এনে দিন।”
আহাদ একবার ভ্যানটার দিকে তাকাল। মুখটা শক্ত হয়ে গেল। কর্কশ কণ্ঠে বলল, “এসব আনহেলদি ছাইপাঁশ পোড়া খাবার খেতে হবে না। আমি তোমাকে অন্য কিছু দিচ্ছি।”
রিদিতা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় করে বলল,
“না। আপনার বেবিরা এটাই খাবে।”
আহাদ কপাল চেপে ধরল। সে জানে, এই মুহূর্তে নিষেধ করে কোনো লাভ নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কঠোর স্বরে বলল,

“ঠিক আছে। এখানে চুপচাপ বসে থাকবে। আমি যাবো, নিয়ে আসবো। ওকে?”
রিদিতার মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চোখে খুশির ঝিলিক। আহাদ গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা পার হতে লাগল।
তাদের গাড়ি থামতে দেখে পিছনের গাড়িটাও থামল। শাহীন নেমে পড়ল। আদনান আর আহিয়াও নামল। শুধু নীলা গাড়ির ভেতরেই বসে রইল। শাহীন একটু দ্বিধা নিয়ে জানালার কাছে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি নামবে না?”
নীলার ভেতরটা কেমন সংকুচিত হয়ে এল। ছয় মাসে তাদের সম্পর্কের দূরত্ব কমেনি, বরং অদ্ভুত এক অস্বস্তি জমে আছে। সে নিচু স্বরে বলল,
“হ্যাঁ… না-নামছি।”
শেষমেশ নীলাও নেমে এল। শাহীন সামনে তাকিয়ে কন্ঠ উঁচু করে আহাদকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“ভাই, এখানে দাঁড়িয়েছেন কেন?”

আহাদ ঘুরে ভুট্টার ভ্যানটার দিকে ইশারা করল। ঠিক সেই মুহূর্তে, একটা বিশাল হলুদ ট্রাক, নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে এলোপাথাড়ি ছুটে এল। কারও কিছু বোঝার আগেই বিকট শব্দে সেটা আহাদের গাড়িটাকে ধাক্কা মেরে ধুমড়ে-মুচড়ে কয়েক হাত দূরে ছুড়ে ফেলল। এক সেকেন্ড। একটা মাত্র সেকেন্ড। আহাদ পাথরের মতো জমে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে পুরো দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে আসছে। ট্রাকটা মুহূর্তেই দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। কিন্তু তার পরের দৃশ্যটা ছিল ভয়াবহ। আগুন। আগুনের লেলিহান শিখা মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটাকে গ্রাস করে নিল। ধোঁয়া আর আগুন আকাশের দিকে উঠতে লাগল। বিস্ফোরণের শব্দে বাতাস কেঁপে উঠল। আহাদের বোধ ফিরল। সে পাগলের মতো ছুটে গেল আগুনের দিকে।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬০

“নো! নো নো নো… রিদি… রিদিইইই!”
বুক চিরে বেরিয়ে এল তার আর্তনাদ। আগুনের শিখাগুলো যেন কোনো পৈশাচিক উল্লাসে নাচছে। মৃত্যু নিজেই যেন উল্লাস করছে। আদনান আর শাহীন দৌড়ে এসে পিছন থেকে তাকে ঝাঁপটে ধরল।
“আমাকে ছাড়! ছাড় আমাকে!” আহাদ ছটফট করে চিৎকার করছে, “আমার রিদি পুড়ে যাচ্ছে, শাহীন! ছাড়! ছাড়! রিদি… রিদি… না… না…না..হ!”

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬২