শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ৩
রুহানিয়া ইমরোজ
–” আমাদের বিয়ে হবে দু’বছরের চুক্তিতে। আগত সন্তানটা বৈধ হবে। জন্মের পর ছয়মাস তাকে লালন পালন করবেন আপনি এরপর আপনার মুক্তি।
অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে প্রিমা বেশ চমকেছে। একজন এমপির থেকে এমন চুক্তির প্রস্তাব পাওয়া চমকপ্রদ বিষয়ই বটে। আরশিয়ান নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো প্রিমার দিকে। তার থমথমে মুখটা দেখে পুনরায় গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠে,
–” আপনি যদি রাজি না থাকেন দেন অলরাইট। আমার ক্যান্ডিডেটের অভাব হবে না। বেস্ট অফ লাক ফর ইয়্যোর সিস্টার।
প্রিমা ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে। নিজেকে সামলে কোনোমতে বলে,
–” ক্ কিছু কোয়েশ্চন ছিলো আমার। জিজ্ঞেস..
আরশিয়ান কঠোর স্বরে বলে,
–” আমি কাউকে কৈফিয়ত দিই না মিস প্রিমা।
অপমানে চুপসে যায় প্রিমা। সিধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে। একদিকে বোনের চিকিৎসা অন্যদিকে নিজের জীবন। কোনটাকে বেছে নিবে সে? একবার আরশিয়ানকে বলতে মন চাইল,
–” আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিবেন না প্লিজ। আপনারা কত মানুষেরই তো উপকার করেন। আমি সত্যি বলছি, শোধ করে দিবো সমস্ত টাকা ।
কিন্তু কিছু একটা ভেবে চুপ রইল। স্বার্থের দুনিয়ায় কে কার? সবাই তো নিজের লাভে ছুটছে। প্রিমা ভাবল প্রস্তাবটা নাকচ করে দিবে কিন্তু ঠিক সেই সময় মেহরিমার কল আসে।
আরশিয়ান সামনে থাকায় কল ধরে না সে কিন্তু পরক্ষণেই মেসেজের নোটিফিকেশনে ফোন কেঁপে উঠে তার। প্রিমা স্ক্রিনে চোখ বুলাতেই দেখে তাতে লেখা,
–” জানা আপুর মস্তিষ্কে ইন্টার্নাল ব্লিডিং হচ্ছে আপা। ডক্টর বলেছে দু’ঘন্টার মধ্যে অপারেশন না হলে উনাকে বাঁচানো যাবে না। তুমি কোথায়? জলদি আসো প্লিজ…
বাকিটা দেখার আগেই ফোনটা হাত থেকে পড়ে যায় প্রিমার। মাত্র দু’ঘন্টায় কোত্থেকে এত টাকা ম্যানেজ করবে? তাহলে কী জানা কেও হারিয়ে ফেলবে প্রিমা? পুনরায় সাদা কাফনে মোড়ানো আপন জনের লাশ দেখতে হবে তাকে?
কথা গুল ভেবে আতঙ্কে থরথরিয়ে কেঁপে উঠে বেচারি। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে অশ্রুকণা। প্রিমার কন্ডিশন দেখে আরশিয়ান শুধায়,
–” আর ইয়্যু ওকে মিস?
প্রিমা কান্নাভেজা চোখে চট করে তার দিকে তাকায়।কোনো কিছু না ভেবে আঁটকে আসা গলায় বলে,
–” আম্ আমি রাজি আপনার প্রস্তাবে। যা করার জলদিই করুন প্লিজ। আমার বোনের কন্ডিশন খুব বেশিই খারাপ।
বাকিটা আর বলতে পারে না প্রিমা। গলায় কথা আঁটকে আসে । আরশিয়ান তার অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম গলায় বলে,
–” রিল্যাক্স। আমি দেখছি ব্যপারটা৷
প্রিমা জবাব দেয় না। মাথা নুইয়ে ফেলে। চোখের পানি দেখাতে চায় না কাউকে। ওদিকে আরশিয়ান ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজ কাজে। মোটামুটি আধা ঘন্টার মধ্যে একজন কাজি এবং উকিল হাজির হয়।
অফিস-রুমের সাইড সোফায় পাশাপাশি বসে আছে প্রিমা এবং আরশিয়ান। তাদের সামনে বসে কাগজে লেখালেখি করছেন কাজি সাহেব। মাঝেমধ্যে আড় চোখে তাকাচ্ছেন সামনে।
একজন ফেমাস বিজনেসম্যান এবং এমপি এভাবে লুকিয়ে বিয়ে করছে বিষয়টা হজম করতে পারছেন না তিনি। উপরন্তু মেয়েটার অবস্থা কাহিল। অতিরিক্ত কান্নার ফলে চোখমুখ ফুলে আছে৷
চোখের কাজল লেপ্টে বেহাল দশা৷ একদম মূর্তির মতো বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে জোরপূর্বক কেউ ধরে বেঁধে বিয়ে দিচ্ছে তার৷ ওদিকে আরশিয়ানও ভাবলেশহীন। পায়ের উপর পা তুলে বসে ফোন স্ক্রল করছে৷ মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন থাকলেও জানের ভয়ে টু শব্দ করলেন না। কাগজ রেডি করে বললেন,
–” বিয়ে পড়ানোর কার্যক্রম শুরু করবো স্যার?
কথাটা শুনে বুক ধড়ফড়িয়ে উঠে প্রিমার। খামচে ধরে টপসের একাংশ। তবে হুট করে আরশিয়ান বলে উঠে,
–” ওয়েট ফর আ সেকেন্ড।
বলেই সে উঠে দাঁড়ায়। কেবিনের সাথে এটাচড রুমের ভেতর থেকে হালকা কারুকাজ করা সাদা একটা শাল এনে প্রিমার মাথায় ঘোমটার মতো করে জড়িয়ে দিয়ে বলে,
–” শুরু করুন…
উপস্থিত সকলেই আরেক দফা অবাক হয়। ওদিকে প্রিমার তো শ্বাস আঁটকে আসে। অথচ আরশিয়ান নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় প্রিমার পাশ ঘেঁষে বসে। নিজেকে সামলে কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করেন।
প্রিমা কবুল বলতে বেশ সময় নেয়। তবে আরশিয়ান সাবলীলভাবে কবুল বলে। বিয়ে পড়ানো শেষ হতেই সকলে আলহামদুলিল্লাহ পড়ে। তবে প্রিমার চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দুফোঁটা অশ্রুজল। এরপর দু’জনে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করে। বিয়ের সকল কার্যক্রম শেষ হতেই আরশিয়ান সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,
–” অসংখ্য ধন্যবাদ শর্ট নোটিসে আসার জন্য। এই বিয়ের বিষয়টা আপাতত গোপন থাকবে। আশা করবো আপনারা এতে ঝামেলা করবেন না। আমার সব চাইতে বড় খারাপ দিক হলো আমি ঝামেলার সমাধান খুজিঁ না জাস্ট গোড়া থেকে উপড়ে ফেলি।
আরশিয়ানের নিরব হুমকিতে ঢোক গিললো তারা। সমস্বরে বলল,
–” বুঝেছি স্যার।
আরও টুকটাক কথাবার্তা শেষে সকলেই বিদায় নিলো। সবাই বেরোতেই প্রিমা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
–” আমায় যেতে হবে..
আরশিয়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
–” কোত্থাও যাবেন না আপনি। আমি দেখছি বিষয়টা।
প্রিমা কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তার আগেই আরশিয়ান বলল,
— ” নো মোর ওয়ার্ডস মিসেস চৌধুরী।
প্রিমা আরেকবার থমকায়৷ আরশিয়ানের সম্বোধনটা শুনে গা হীম হয়ে আসে তার৷ মুখ ফুটে একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না।চুপচাপ বসে পড়ে সোফায়।আরশিয়ান ফারজানার সমস্ত দায়িত্ব ম্যানেজারকে বুঝিয়ে দেয় এবং গম্ভীর স্বরে বলে,
–” মিস ফারজানা কে আমাদের হসপিটালে শিফট করো। এরপর উনাকে সুস্থ করার জন্য যা করা দরকার করো বাট আই ওয়ান্ট হার টোটালি ফিট এন্ড ফাইন। গট ইট?
আরশিয়ান ব্যস্তভঙ্গিতে সামলাচ্ছিল সবটা। প্রিমা নিশ্চুপে অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়ে ছিলো ফ্লোরের দিকে৷ হুট করে হয়ে যাওয়া বিয়েটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে তার।কেমন যেনো অবিশ্বাস্য লাগছে সবকিছু । কথা বলার ফাঁকে প্রিমার দিকটা লক্ষ্য করেছিল আরশিয়ান।
বেচারি শকে আছে বুঝতে পেরে এগিয়ে এসে টেবিল এর উপর থাকা পানির গ্লাস বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। প্রিমা আবারও চমকে তাকায়। আরশিয়ান নরম স্বরে বলে,
–” টেক ইট। ইয়্যু উইল ফিল বেটার।
প্রিমা কাঁপা হাতে নেয় গ্লাসটা। কিছুটা পানিও পান করে। তবে তৃতীয় চুমুক বসাবে এমন সময় হুট করে আরশিয়ান বলে,
–” অল ডান। লেটস গো টু দ্যা বেডরুম মিসেস চৌধুরী।
লাইনটা শুনে জোরেশোরে বিষম খায় প্রিমা৷ মুখের পানি ছিটকে বেরিয়ে এসে আরশিয়ানের বুকে পড়ে। অনবরত কাশতে শুরু করে বেচারি। আরশিয়ান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
–” রিল্যাক্স..
প্রিমা অবুঝ কন্ঠে বলে,
–” রুম্ রুমে যাবো কেনো?
আরশিয়ান চোখ ছোটো-ছোটো করে তাকায় প্রিমার দিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–” ইফ আম নট রং দেন কিছুক্ষণের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন আপনি। এজন্যই আপনাকে হসপিটালে যেতে বারণ করেছি এবং রুমে যাওয়ার কথা বলেছি।
চৌধুরী বাড়িতে কেয়ামত চলছে রীতিমতো। কারণ বাড়ির মেজো ছেলে দ্যা গ্রেট তাজরিয়ান জাওয়াদ চৌধুরী ঘরের দরজা আঁটকে তান্ডব চালাচ্ছে। এমন করার যথেষ্ট কারণও আছে। মাঝ রাস্তায় হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের থেকে থাপ্পড় খেয়েছে। সেটা আবার কেউ একজন ভিডিও করে অনলাইনে ছেড়েছে। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়ে ছুঁয়েছে মিলিয়নের ঘর ।
প্রায় ঘন্টা দুয়েক যাবত চলছে তার ধ্বংসলীলা। ভয়ের চোটে কেউ ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না। তার এসিস্ট্যান্ট তামজিদ হোসেন একটা ফাইল হাতে নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হ’য়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাহিরে। যেন ডাক পড়লেই মুহূর্তের মধ্যে ভেতরে যেতে পারে।
কীভাবে যেনো তামজিদের ভাবনা মিলে গেলো। তাজরিয়ান হুংকার ছেড়ে ডাকলো তাকে। বেচারা তামজিদ ভীত পায়ে প্রবেশ করলো রুমে। ভেতরটা অন্ধকার। হালকা একটা ড্রিম লাইট জ্বলছে জাস্ট। সেই আলোতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে ধ্বংসস্তুপ।
ফাঁকা ঢোক গিলে চারপাশে চোখ ফিরিয়ে স্যার কে খুঁজতে লাগলো তামজিদ। সাবধান পায়ে বেলকনির দিকে এগোতেই দেখলো, একপাশে থাকা সুইমিং পুলের কার্ণিশে চোখ বুঁজে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাজরিয়ান। তামজিদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–” স্যার ডেকেছিলেন..
তাজরিয়ান শীতল কন্ঠে শুধাল,
–” ওই বেয়াদব মেয়ের ডিটেইলস বল।
তামজিদ চট করে ফাইল খুলে বলা শুরু করল,
–” উনার নাম মারজান আইরিন মেহরিমা। বয়স উনিশ বছর দশমাস নয়দিন। *** ইউনিভার্সিটির অনার্স প্রথম বর্ষের স্টুডেন্ট।
তাজরিয়ান গম্ভীর গলায় শুধাল,
শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২
–” ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড?
তামজিদ অসহায় কন্ঠে বলল,
–” উনি এতিম। আপন বলতে দু’জন সিনিয়র আপু আছে যাদের সাথে এতিমখানার মাধ্যমে পরিচয় হয়েছে।
তাজরিয়ান দুপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে রক্তিম চোখে তকায় পানির দিকে। আচমকা হো হো করে হেঁসে উঠে শক্ত গলায় বলে,
–” গেট রেডি ফর দ্যা রিভেঞ্জ তেজস্বিনী!
