Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৭

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৭

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৭
রাফিয়া জান্নাত রিফা

এক অদ্ভুত আকর্ষণের ঘোরে যেন হারিয়ে গিয়েছিল দির্শক। উনত্রিশ বছরের জীবনে এমন উন্মত্ত টান সে কখনো অনুভব করেনি। সে আর নিজের ভেতরে নেই মত্ত এক অচেনা আবেশে। তার চিন্তা-চেতনা এখন একটিমাত্র বাসনায় ঘুরপাক খাচ্ছে বিথীকে সম্পূর্ণ নিজের করে নেওয়ার নেশায়। বিথী বারবার তাকে থামাতে চাইছে, নিবৃত্ত করতে চাইছে, কিন্তু উন্মত্ত দির্শকের সামনে তার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎই দির্শকের কানে ভেসে উঠল তার মায়ের আর্তচিৎকার যে চিৎকার সে প্রায়ই শুনতে পায়। সেই শব্দ তার কানে শঙ্কাধ্বনির মতো বেজে উঠল। তড়াক করে চোখ মেলে সে গভীর শ্বাস ছাড়ল।
দির্শক বক্ষবন্ধনীতে আবদ্ধ বিথী বিস্মিত চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে দির্শকের চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
লজ্জায় মাথা নিচু করে বিথী আমতা-আমতা করে বলল,

“আ… আমাদের তো এখনো ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বিয়ে হয়নি…”
বিথী একটি মোটা ডালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আর দির্শক তার গায়ের সঙ্গে ঘেঁষে। তারা যে ডালে অবস্থান করছিল, সেটি ছিল যথেষ্ট পুরু ও মজবুত।
বিথীর কথাগুলো দির্শকের কানে পৌঁছাল বটে, কিন্তু তার মন তখনও অন্য এক ঘূর্ণিতে আবর্তিত হচ্ছিল। হঠাৎ যেন কোনো উপলব্ধি তাকে আঘাত করল। সে বিথীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আকুল স্বরে বলতে লাগল,
“আই’ম সরি, বিথী… আই’ম রিয়েলি সরি। আমি এমনটা চাইনি।”
বিথী শুকনো ঢোঁক গিলে নিল। তার সমগ্র শরীর দির্শকের ওপর ভর দিয়ে ছিল মনে হচ্ছিল, সামান্য নড়াচড়াতেই সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে।দির্শকের সে খেয়াল আছে কি না বোঝা গেল না। বিথী পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করে হাত বাড়িয়ে কোনো ডাল খুঁজতে লাগল, যাতে ভর নিতে পারে।
ডাল ভেবে হাত বাড়াতেই সে হঠাৎ হেলে পড়ল। ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল দির্শক ও। মুহূর্তের মধ্যে বিথী নিচের দিকে পড়ে যেতে লাগল।

ভয় আর আতঙ্কে তার কণ্ঠ থেকে তীব্র চিৎকার বেরিয়ে এল।
তৎক্ষণাৎ দির্শক তাকে ধরে নিলো, দির্শকের এক হাত গাছের মোটা ডালে এবং অন্য হাতটি বিথীর হাত ধরে আছে। বিথী শক্ত করে দির্শকের হাত ধরা অবস্থায় নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো, এখন মাটি ছোঁয়া যাবে, কিন্তু গাছ থেকে মাটিতে পড়লে নিশ্চিত কোমড় ভাঙ্গত। তাই দির্শক হাত ছেড়ে বিথী লাফ দিয়ে মাটিতে নামলো, তার পদযুগল মৃদু কম্পিত হলো।
কিছুক্ষণ পর দির্শক ও গাছ থেকে নেমে হতভম্ব হয়ে বিথীর দিকে এসে উদ্বিগ্ন গলায় শুধালো,,,
“তুমি ঠিক আছো তো? লাগে নি তো কোথাও?” তার কণ্ঠে ছিল এক অজানা উদ্বেগ, এক অপরিসীম চিন্তা ।
বিথীকে লজ্জা ঘিরে রেখেছে, দির্শকের মুখ পানে তাকিয়ে কথা বলার জো হলো না,তাও গলার খাদ নামিয়ে বললো,,

“আমি ঠিক আছি?”
দির্শক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিথীর মুখ খানা তার হাতের আদলে নিয়ে বলল,,,
“তুমি কি লজ্জা পাচ্ছো বিথী?”
এমন কথায় বিথীর লজ্জা আরো চারগুণ বেড়ে গেল, দৃষ্টি নত করতেও পারছে না আবার দির্শকের দিকে তাকাতেও পারছে না,তাও বহুত কষ্টে বিথী বলল,,
“না।”
“আন এক্সপেক্টলি হয়ে গেছে,আইম সরি।”
বিথী সে প্রসঙ্গ পাল্ট বলল,,
“আমরা এখন কোথায় যাবো সেটা ভাবুন।”
দির্শক হেঁয়ালি করে বলে,,,
“হ্যাঁ, কোথায় যাবো?”
বিথী বিরক্তি চোখে দির্শকের দিকে তাকালো এবং বললো ,,
“হেয়ালি করছেন?”

দির্শক হাসলো এবং বিথী হাত খানা ধরে গাছের পাশে বসলো চাঁদের মুখোমুখি হয়ে,দির্শক বলল,,,
“আমার জীবনে একফালি সুখ হয়ে আশার জন্য অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমায়,এই একফালি সুখেই বিমোহিত আমি।
চাওয়ার মতো আর কিছুই নেই, আমাদের সব হবে শুধু সংসার হবে না।
বিথী বলে,,,
“কিন্তু আমার তো সংসার চাই দুষ্শমন স্যার।”
দির্শক আবার হেসে বলে,,,
“দুষ্শমনদের যে সংসার হয় না উজ্জ্বল নারী।”
বিথী দির্শকের কাঁধে মাথা রাখলো ,,,
“আমার বেলাই কেন দু্ষ্শমন হচ্ছেন আপনি।”
দির্শক নিরব রইল, আলতো করে হাত খানা বিথীর কাঁধে রাখলো সে এবং বিথী দির্শকের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। দুজনেই নিরব হয়ে নিস্তব্ধ রাত উপভোগ করতে লাগল।
এভাবেই কেটে গেলো বেশ সময়, বিথী ভাবতে ভাবতে দির্শকের কাঁধেই ঘুমিয়ে পড়ল, দির্শক বিথীর ঘুমন্ত মুখ খান এবার দেখে আকাশ পানে তাকিয়ে বলল,,,
“চোখ খুলে দেখবে তোমার দুষ্শমন আর নেই।”

তোমার মনের ঘরের দুষ্শমনকে একটু হলেও ঘৃনা করো তুমি,সে তোমার সাথে চরম দুষ্মমন গিরি করেছে, ঘৃনা প্রাপ্য তার।
ফেচেল হাসলো দির্শক,মুখ ঘুরিয়ে বিথীর ঘুমন্ত মুখ খানা দেখতে লাগলো,,,,
“দুষ্শমনে আদর টুকু স্মৃতি হিসাবে রেখো।”
দুষ্শমন তোমাকে অনেক ভালোবাসে, অনেক ভালোবাসে।”
অতঃপর পরিচালক ধীরে ঝুঁকে বিথীর কপালে একটি চুম্বন এঁকে দিলেন। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা অশ্রু বিথীর কপালে এসে থামল। স্নিগ্ধ যত্নে তিনি বিথীর গায়ে ওড়নাটি ভালোভাবে জড়িয়ে দিলেন।
এরপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট ও লাইটার বের করলেন। ঠোঁটে সিগারেট চেপে লাইটারের আগুনে সেটি ধরালেন। ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের দিকে ছেড়ে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর নিম্নস্বরে গুনগুন করে গান ,,,,,,

আমি জানি কোনো একদিন
কোনো এক নতুন ভোরে
দেখা হবে আমাদের আবার
এক স্বপ্নের শহরে
আমি জানি কোনো একদিন
কোনো এক নতুন ভোরে
দেখা হবে আমাদের আবার
এক স্বপ্নের শহরে
তোর সাথে ছিল বাকি
কত কথা, বলবো একদিন
একাকী নিজের সাথে
করেছি তোর গল্প সারাদিন
তোর কথা আসে ফিরে ফিরে
পথ হারানোর সব কবিতায়
আমি তোকে নিয়ে যাবো আবার
রূপকথার সেই বাড়িতে
আয় ফিরে
গানটা শেষ করে জোরে একটা শ্বাস ফেলে দির্শক বেশ সময় নিয়ে বললো,,
“ছন্নছাড়া জীবনে তোমার আবির্ভাব
ছিল ঘুমহীন জীবনে ফুলের সৌরভ। ”

সকাল
সূর্যের সোনালী আলোয় ধরনীর বুকে নেমে এসেছে এক অপরূপ দীপ্তি, শীতের হিমেল হাওয়ার পরশে প্রকৃতি যেন স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে, বিথী এক সুন্দর স্বপ্নের সাগরে ভাসছে, তার মুখে ফুটে উঠেছে এক অমলিন হাসি, যেন সে স্বপ্নের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। স্বপ্নে সে গড়ে তুলেছে এক সুন্দর সংসার, ভালোবাসায় ভরা এক ছোট্ট ঘর, যেখানে সুখেরা এসে ভিড় জমায়, প্রেমের পরশে যেখানে সবকিছুই সুন্দর, যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায়, যেখানে হৃদয় কথা বলে।
হঠাৎ, ইতি আর নিধির চিৎকারে তার স্বপ্নে ব্যাঘাত ঘটলো, বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে নিল সে, তার স্বপ্নের জগৎ ভেঙে গেলো, যেন এক অদৃশ্য ঝড় এসে তার স্বপ্নের প্রাসাদ ধ্বংস করে দিয়ে গেলো।একটু পর আবার বিথী মুখ খানা শীতল হলো সে স্বপ্নে আবারো ফেরত যেতে চাইলো কিন্তু আবারো সেই ব্যাঘাত!

এবার গাঁ ঝাঁকিয়ে উঠলো বিথীর, এখন তার স্বপ্নের জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসার পালা,এক অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে এলো বাস্তবের মাটিতে, যেখানে সুন্দর স্বপ্নগুলো ভেঙে গেল, যেখানে বাস্তবের কঠোরতা অপেক্ষা করছে বিথী রং জন্য।চোখ খুলতে না চেয়েও পিটপিট করে চোখ খুলতে লাগলো সে,চোখ হালকা খুলতে মাথা ব্যাথার তোড়ে আবার চোখ খানা বন্ধ করে নিলো,মাথা ব্যাথায় কিছুক্ষণ ঝিম ধরে রইল বিথী কানে কেমন শঙ্কা ধ্বনি একটানা বেজে চলল, প্রচুর বিরক্ত লাগলো বিথীর মাথায় হাত দিতেই বিথী বোধ খসখসে কিছু একটা, বাধ্য হয়ে বিথী পিটপিট করে চোখ জোড়া খুলে নিল,চোখ খোলার সাথেই বিথী মনে হলো তার পৃথিবী যেন চারিদিকে ঘুরছে অনবরত ঘুরছে, বিথী শক্ত করে তার ওড়না খামচে ধরে বড় বড় চোখ করে রইল, হঠাৎ বিথীর চোখের সামনে ইতির কান্নারত মুখ খানা এলো, বিথী অবাক হলো গত রাতের ঘটনা ফ্ল্যাশব্যাক হতে লাগলো,সে তো দির্শকের কাঁধে সুয়ে ছিল তাহলে এখন তালুকদার বাড়িতে কি করছে সে?সে তো দির্শকের সাথে পালিয়েছিল?আর দির্শক কোথায়?
এসব প্রশ্ন বিথী মনে আসতেই তড়াৎ করে উঠে বসে, জোরে জোরে শ্বাস ছাড়তে লাগলো,ইতি,নিধি এসে বিথীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে দুজনেই বলতে লাগলো,,

“বিথী শান্ত হ,এমন করিস না, শান্ত হ?”
লম্বা শ্বাস নিতে নিতে বিথী বলল,,,,
“দুষ্মম স্যার কোথায়, ইতি? নিধি? আমি এখানে কী করছি?”
নিধি উত্তর দিল,,,,
“দির্শক স্যার তোকে এখানে রেখে চলে গেছেন।”
বিথী উৎকণ্ঠিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,,,,
“কোথায় গেছেন?”
ইতি মৃদু স্বরে বলল,,,,
“পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে।
কথাগুলো বিথীর কানে পৌঁছানো মাত্রই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। শরীর যেন জমে গেল, নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। নিধি কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“তোর কি মনে হয়, বিথী? পাঁচটা খুন করে উনি পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাবেন? কখনো না কোনোদিনও না।
বিথী চিৎকার করে উঠল,
“না, এটা হতে পারে না! আমি তো তাঁর সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলাম তাহলে আমি এখানে কীভাবে এলাম?”
ইতি শান্ত স্বরে বলল,,,,
“দির্শক স্যার তোকে এখানে রেখে গেছেন।”
বিথী আরও উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করল,
“উনি আমাকে ভালোবাসেন উনি নিজেই বলেছেন!”
নিধি দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“ওসবই ছিল অভিনয় নির্মম এক নাটক মাত্র।”
তাদের কথা বিথী বিশ্বাস করতে পারল না। সে খাট থেকে নামার জন্য ছটফট করতে লাগল। কিন্তু ইতি ও নিধি তাকে নামতে দিল না। এতে বিথীর উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল। সে ক্রুদ্ধ স্বরে চিৎকার করে বলল,

“ইতি, আমাকে ছাড়! যেতে দে!”
ইতি রাগ সংযত রেখে বলল,
“কোথায় যাবি তুই?”
বিথী দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল,,,,
“দির্শক স্যারের কাছে।”
ইতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করল,,,
“কোথায় পাবি তাঁকে?”
বিথী হাত-পা ছুঁড়ে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলতে লাগল,
“আমাকে যেতে দে! অনেক হিসাব-নিকাশ বাকি আছে।”
ইতি ও নিধি তাকে ছাড়ল না। শেষমেশ বিথী জোরে ধাক্কা দিয়ে তাদের থেকে নিজেকে মুক্ত করল। ইতি ও নিধি সামান্য হেলে পড়ল। বিথী বিছানা থেকে উঠে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলল। হতভম্ব ইতি ও নিধিও তার পেছনে দৌড়াতে লাগল।

বিথী হনহনিয়ে নাজিম তালুকদারের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার দুই পাল্লা জোরে ঠেলে খুলতেই ‘খটাস’ শব্দে ঘরটি কেঁপে উঠল। সে সময় নাজিম তালুকদার আরামকেদারায় বসে গভীর মনোযোগে কিছু ভাবছিলেন। হঠাৎ এমন শব্দে তিনি আঁতকে উঠে দরজার দিকে তাকালেন।
বিথী দ্রুত পায়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। তাকে স্বাভাবিক লাগল না নাজিম তালুকদারের। তাই তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিথীর মুখোমুখি হয়ে বললেন,
“মা, তুমি…?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই বিথী তার ওড়নার আঁচল থেকে একটি ছুরি বের করল। দৃশ্যটি দেখে নাজিম তালুকদার ভড়কে গেলেন। ঠিক তখনই ইতি ও নিধি ঘরে ঢুকল। তাদের পরপরই হতভম্ব মুখে ঘরে প্রবেশ করলেন আলিফা বেগম ও সিদ্দিকী বেগম।
বিথীর চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে লাল হয়ে উঠেছিল। তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করছিল না সে নিজেই বুঝতে পারছিল না, কী করতে যাচ্ছে। কাঁপা হাতে ছুরিটি নাজিম তালুকদারের মুখোমুখি তুলে ধরতেই তিনি আরও ভড়কে গেলেন। আমতা-আমতা করে বললেন,

“কী… কী করছ, আম্মাজান?”
বিথী গগনবিদারী চিৎকারে বলে উঠল,
“চুপ! ওই মুখে আমাকে একদম ‘আম্মাজান’ বলে ডাকবেন না। ওই ডাকে আপনার আর কোনো অধিকার নেই।”
ইতি বিথীর কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“বিথী, কী ক”
কথা শেষ করতে না দিতেই বিথী লাল চোখে তার দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বলল,,,
“কসম ইতি, আজ যদি নাজিম তালুকদার আর আমার মাঝে একটি প্রাণীও কথা বলিস, তবে আজই এই বিথীর মৃত মুখ দেখতে হবে ।
ইতির মুখের রং বদলে গেল। সে আর কিছু বলতে পারল না; নিঃশব্দে সরে দাঁড়াল।
বিথী আবার নাজিম তালুকদারের দিকে তাকাল তার লালচে চোখদুটি যেন আগুন ছড়াচ্ছে। কর্কশ স্বরে বলল,
“ভয় পাচ্ছেন? কি মনে হচ্ছে যে এই ছুরিটা আপনার গলায় বসিয়ে দেব?”
নাজিম তালুকদারের চোখেমুখে রাগ বা বিরক্তির লেশমাত্র ফুটল না। বরং বিথীর এই অচেনা রূপ দেখে তিনি গভীরভাবে বিচলিত ও বিস্মিত হয়ে পড়লেন। তিনি তো এই বিথীকে চেনেন না। বিথী আবার কঠিন কণ্ঠে বলল,

“কী হলো? কথা বলুন!”
শুকনো ঢোঁক গিলে নাজিম তালুকদার বললেন,
“মা, তুমি শান্ত হও,এমন কেন করছ।”
বিথী গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“না, আমি শান্ত হব না! আমি দির্শক প্রাধানকে চাই যেভাবেই হোক চাই। তাঁকে আমার সামনে আনুন। তাঁর সঙ্গে আপনি কী করেছেন? কেন তিনি পাঁচটা খুন করল? আপনি কীভাবে তাঁর বাবা হন? তাঁর মা কীভাবে মারা গেলেন? উত্তর দিন!”
আবার চিৎকার করে বলল,
“উত্তর দিন! না হলে এই ছুরি দিয়ে নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেব। নাকি আমার জীবনেরও কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে?”
নাজিম তালুকদার হকচকিয়ে বললেন,

“না মা, এমন করো না শান্ত হও।”
কিন্তু বিথী নিজের হাতের শিরায় ছুরির ধার বসিয়ে আবার চিৎকার করল,,,
“উত্তর দিন! নইলে এখানেই নিজেকে শেষ করে দেব!”
ভয়ে নাজিম তালুকদার হাত মুচড়াতে লাগলেন। অধৈর্য বিথী গণনা শুরু করল,,
“এক…”
নাজিম তালুকদার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। বিথী ছুরির চাপ বাড়াল,,,
“দুই…”
তিনি তবু নীরব; কিন্তু ভেতরে ভেতরে আতঙ্কে কাঁপছেন।
বিথী বলল,
“তিন…”
ছুরিটি গভীরভাবে বসাতে উদ্যত হতেই নাজিম তালুকদার দ্রুত এগিয়ে এসে বিথীর হাত চেপে ধরলেন,,,
“বলছি মা, বলছি! তুমি এমন করো না।”
দৃঢ়চেতা মানুষটিও এবার কেঁদে উঠলেন,,,

“তোমরা তিনজনই আমার দুর্বলতা, আম্মাজান। তোমাদের কিছু হলে আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না। ছুরিটা ফেলে দাও মা, ফেলে দাও।”
বিথী উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে কাঁদতে লাগল,
“নাটক করবেন না আর। আপনার নাটকের দিন শেষ। এবার বলুন ইতি কে? দির্শক কে? আর্দ্র কে?”
সে ইতির কাছে গিয়ে তার হাত ধরে ঝাঁকাতে লাগল,
“ইতি, কে তুই?”
ইতি হতভম্ব। বিথী এবার সিদ্দিকী বেগমের কাছে গিয়ে বলল,
“মা ও মা, বল ইতি কে?”
এরপর সদ্য ঘরে ঢোকা আলবান ও আর্দ্রের দিকে ফিরে বলল,,,
“আলবান ভাই, আপনার বাবাকে প্রশ্ন করুন ইতি কে? আর্দ্র কে? প্রশ্ন করুন!”
বিথী আবার ইতির দিকে ফিরে বলল,

“এত কিছুর মাঝে কাল আমাদের জন্মদিন ছিল তা তো ভুলেই গেছি! কাল সকালে নাজিম তালুকদার তোর কাছ থেকে কীসের সই নিল? প্রতি জন্মদিনে কেন সই নেয় তোর থেকে তা জিজ্ঞেস কর!”
নাজিম তালুকদার ভয়ে কাঁপতে লাগলেন।
ইতির ভেতরেও প্রশ্নের ঝড় উঠতে লাগল।
ওপাশ থেকে আলিফা বেগম কঠোর কণ্ঠে বললেন,
“আল্লাহর ওয়াস্তে বলুন কী হয়েছে? বলুন!”
আর্দ্র বলল,,,
“এখন আপনাকে ‘বাবা’ বলতে দ্বিধা হচ্ছে।”
আলবান বলল,,,,
“আমি এমন নাজিম তালুকদারকে চিনি না। এ যেন এক কাপুরুষের ছদ্মবেশ। এ আমার বাবা হতে পারে না।”
নিধি কাঁদতে কাঁদতে বলল,,,,,

“যে তালুকদার বাড়িতে হাসি-খুশিতে বড় হলাম, সেই বাড়িতেই এত রহস্য, এত মুখোশ কখনো ভাবিনি। দাদু ঠিকই বলতেন, দিঘির পানি উপর থেকে স্বচ্ছ দেখায়, ভেতরের ঘোলাটে অংশ আমরা দেখতে পাই না।”
ইতি সিদ্দিকী বেগমের কাছে এসে ঠোঁট চেপে কান্না আটকে বলল,,,,
“মা, আমি কি তোমার মেয়ে নই? আমি কতবার বলেছি বিথী, নিধি যদি জমজ হয়, আমি কেন আলাদা দেখতে? তুমি এড়িয়ে গেছ, ধমক দিয়ে চুপ করিয়েছ। আমার আচরণে কি কখনো মনে হয়নি।
আমি কে? কেন আমি ওই দুঃস্বপ্ন দেখি? কেন আমাকে বারবার মারার চেষ্টা হয়? জন্মদিনে বাবা আর বড় বাবা কীসের সই নেন?”
সিদ্দিকী বেগম ইতিকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বললেন,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৬

“তুই আমার মেয়ে এটাই তোর পরিচয়।”
ইতি ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। সিদ্দিকী বেগম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। ইতি এবার নাজিম তালুকদারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল,
“কী হলো, বড় বাবা? এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? উত্তর দিন। কথা বলুন।”
নাজিম তালুকদার কিছুক্ষণ চুপ করে আলিফা বেগমের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আলিফা বেগমও স্বামীর মুখের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। তিনি যেন ভাবছেন স্বামীর কোন রূপের সঙ্গে এখন তাঁর পরিচয় ঘটতে চলেছে। এই ভাবনাই তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৮