Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৮

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৮

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৮
রাফিয়া জান্নাত রিফা

নাজিম তালুকদার মস্তক অবনত রেখে বসে আছেন, অন্তরের গভীরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। দির্শকের প্রতি বিথীর গভীর প্রেম পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে বিস্ময়ে মুহ্যমান করে রেখেছে। নাঈম তালুকদার, পিতা হিসেবে মেয়ের এই অদম্য আবেগের সামনে অসহায় বোধ করছেন। পরিবেশ এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ যে, কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারীরাও বিথীকে শাসন করার সাহস পাচ্ছেন না, বিথীকে দুটো থাপ্পর মেরেও বলতে পারছে না “তুই এমন কেন করছিস।”

সবার মনে প্রশ্নের জাল বুনছে – আর্দ্র কে? ইতি কে? দির্শকই বা কে? প্রশ্নগুলোর উত্তর কারও জানা নেই। সোফায় অধিষ্ঠিত নাঈম তালুকদার একবার ভেঙে পড়া নাজিম তালুকদারের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। বিথীর মনে দর্শকের চিন্তা উদিত হতেই তার রাগ অগ্নিশিখার মতো জ্বলে উঠল। সে উচ্চস্বরে বলল, “বিলম্ব করার সময় নেই, দ্রুত বলুন।”
নাজিম তালুকদার চশমাটি চোখ থেকে সরিয়ে বিথীর দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকালেন এবং শান্ত স্বরে বললেন, “প্রথমে বলো, কী জানতে চাও?”
বিথী প্রশ্ন করল, “দির্শক প্রধান কে?”
নাজিম তালুকদার দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “আমার ছেলে, আমার রক্ত।”
এই কয়েকটি শব্দ উপস্থিত সকলের মধ্যে বিদ্যুতের মতো আঘাত করল। সবার চোখ বিস্ময়ে প্রসারিত হলো, কিন্তু কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। বিথী আবার প্রশ্ন করল, “তাহলে দির্শক প্রধানের মা কে,নাম কি?”
নাজিম তালুকদার একবার আলিফা বেগমের দিকে তাকিয়ে এক ঢোঁক গিললেন পরক্ষণে বিথী দিকে তাকিয়ে বলেন,,

“দ্যুতি বার্নি।”
নামটা বলেই জোরে জোরে শ্বাস ছাড়লেন নাজিম তালুকদার, বিথী ফের বলে,,
“ওনি কে হয় আপনার?”
“আমার স্ত্রী।”
উপস্থিত সকলের মস্তিষ্কে যেন বজ্রপাতের আঘাত নেমে এলো। সবাই নিস্তব্ধ মুখে নাজিম তালুকদারের মুখের দিকে তাকিয়ে পরবর্তী শব্দের অপেক্ষায় রইল। বিথী এবার কঠোর স্বরে বলল, “থেমে থেমে বলার কি প্রয়োজন? বলুন সব, বলুন।”
নাজিম তালুকদার বললেন, “আমার স্ত্রী।”

এই দুটি শব্দই আলিফা বেগমকে ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল, মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। নাজিম তালুকদার একবার ভাবলেন আলিফা বেগমের দিকে তাকাবেন, কিন্তু তাকালেন না ভয়ে, অনুশোচনায়, অনুতাপে। কোন মুখে দেখবেন সেই নরম মনের নারীটিকে, যার কাছে স্বামীই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বাসী।
নাজিম তালুকদার বলতে শুরু করলেন, “দ্যূতি বার্নি আমার তৃতীয় স্ত্রী ছিল। আমাদের বিয়ে হয়েছিল ৩০ বছর আগে। দির্শক আমাদেরই সন্তান।
কথা গুলো বলে থামলেন নাজিম তালুকদার,একটা ভয়ের ঢোঁক গিললেন,এমন এক পরিস্থিতিতে যে একদিন তাকে পড়তে তা তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু তখন করার কিছু ছিল না।তার করা পাপ কর্ম আজ খোলাস হতে চলছে এতে বিন্দুমাত্র ভয় লাগছে না ওনার,উনি তো আগে থেকেই এমন পরিস্থিতি নিয়ে আবগত ছিল। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভেবে ফেল বলতে লাগলেন,,,

সেই ঘটনার কথা আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগের। তখন আমার বয়স মাত্র তেইশ। সেই সময়ই আমার বাবা জোরপূর্বক আমাকে আলিফার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করতে উদ্যোগী হন। কিন্তু আমি তখন দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলাম যে, আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি এবং তাকেই বিয়ে করতে চাই। বাবার কাছে বারবার অনুরোধ করেও কোনো সাড়া পাইনি; তিনি আমার অনুভূতি, ইচ্ছা বা ভালোবাসার মূল্য দিতে রাজি ছিলেন না।
আমি তখন গভীরভাবে ভালোবাসতাম রূপসীকে আর্দ্রের মা রূপসী। তার সৌন্দর্য, তার সরলতা, তার আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমাদের সম্পর্ক ছিল গভীর, আন্তরিক এবং বিশ্বাসে পরিপূর্ণ। কিন্তু রূপসী ছিল দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা, আর সেটিই ছিল আমার বাবার প্রধান আপত্তির কারণ।

বাবা যখন আমার ওপর আলিফাকে বিয়ে করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন, তার আগের দিনই আমি সিদ্ধান্ত নিই রূপসীকে নিয়ে চলে যাওয়ার। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উপস্থিতিতে আমি রূপসীকে বিয়ে করি। স্বপ্ন ছিল—নিজেদের মতো করে একটি ছোট সংসার গড়ে তুলব, যেখানে থাকবে ভালোবাসা, শান্তি আর সম্মান। আমরা একটি ছোট ঘরে নতুন জীবন শুরু করি সেই অল্পতেই ছিল আমাদের গভীর সুখ।
কিন্তু ঠিক এক সপ্তাহ পর বাড়ি থেকে একটি চিঠি এলো মা নাকি ভীষণ অসুস্থ। রূপসীর মন সেদিন অজানা আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠেছিল, তবুও আমি তাকে বাড়িতে না নিয়েই মাকে দেখতে রওনা হলাম। আজ বুঝি, সেটিই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

বাড়িতে গিয়ে সবাইকে জানালাম যে আমি রূপসীকে বিয়ে করেছি, কিন্তু কেউ আমার কথাকে গুরুত্ব দিল না। মায়ের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক ছিল তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই সময় বাবাই মায়ের শয্যার সামনে দাঁড়িয়ে আমার পথ রুদ্ধ করলেন এবং বললেন,,,
“তোর মাকে এক শর্তেই হাসপাতালে ভর্তি করতে দেব আমি।”
মায়ের সেই করুণ অবস্থায় আমার যেন চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছিল। হতভম্ব হয়ে আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“কি শর্ত?”
বাবা নির্লিপ্ত স্বরে বললেন,,,
“রহমানের মেয়েকে বিয়ে করতে হবে।”

এই কথা শুনে আমি ক্ষোভে ফেটে পড়ি। বাবার সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। কিন্তু বাবা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। অন্যদিকে মায়ের অসহায় কাতর আহাজারি আমার হৃদয় বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল। আমি মাকে ভীষণ ভালোবাসতাম; তার এই অসহনীয় যন্ত্রণা আমার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। অবশেষে মায়ের কষ্টের কাছে হার মেনে আমি সম্মতি জানালাম হ্যাঁ’ বলে দিলাম। ভেবেছিলাম কিছু সময়ের জন্য হ্যাঁ বলে মাকে সুস্থ করে আমি রুপের কাছে ফিরে যাবো।
কিন্তু আমি জানতাম না, আমার সেই সম্মতির অপেক্ষাতেই সব আয়োজন সম্পন্ন ছিল। সেখানে আগে থেকেই কাজি উপস্থিত ছিলেন, সঙ্গে ছিলেন আলিফা, তার বাবা ও চাচারা। তারা কেউই জানতেন না যে আমি ইতিমধ্যে রূপসীকে বিয়ে করেছি। তাদের কাছে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যেন অসুস্থ মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতেই এই বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বাবার সাজানো সেই পরিস্থিতিতে আমি সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ি। বাধ্য হয়েই সেদিন আলিফাকে বিয়ে করতে হয় আমাকে। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরেই মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি মেলে।
হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসায় মা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। আমি তখন রূপসীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলাম। কিন্তু এবার মা-ই নানা অজুহাত, আবেগ আর কথার জালে আমাকে আটকে রাখলেন। বাড়ি থেকে এক পা-ও বের হতে দিলেন না।
অন্যদিকে রূপসী আমার পথ চেয়ে বসে ছিল। সে জানত না আমার প্রকৃত বাড়ি কোথায়, আর আমি যাওয়ার সময় তাকে বলে এসেছিলাম,,
“আমি না আসা পর্যন্ত তুমি বাড়ি থেকে এক পা-ও নড়বে না।”
রূপসী আমার কথাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করছিল।

এই সময় জোরপূর্বক আমাকে আলিফার সঙ্গে একত্রে রাখা হয়। আগে থেকেই যে আমার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে, সেই কথাটি আলিফাকে বহুবার জানাতে চেয়েও জানাতে পারিনি। আলিফা ছিল তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, আর তাদের বিপুল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী সে। আমিও ছিলাম পরিবারের বড় ছেলে কাঁধে দায়িত্ব ছিল অনেক। নাঈম তখন বেশ বুঝদার হয়ে উঠেছিল, নানা কাজে আমাকে সাহায্যও করত সে ও।
হঠাৎ একদিন আলিফার বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং আমাকে ও আলিফাকে ডেকে পাঠালেন। আমরা তার কাছে গেলাম। সেদিন তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিয়ে শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন,,
“আমার সোনার টুকরা মেয়েটিকে তুমি দেখেশুনে রাখবে, এটাই আমার শেষ চাওয়া।”

এই কথাগুলো বলেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
আলিফার বাবার বিপুল সম্পত্তির পরিমাণ দেখে আমি বিস্মিত হয়ে পড়লাম দুই জেলায় দুটি ধানের মিল, ঢাকায় একটি গার্মেন্টস কারখানা, ভাড়ার জন্য বিশটি ট্রাক, চারটি ইটভাটা,বাজারে বাজারে ভাড়া করা দোকান, গ্রামের একাংশ জমি সব মিলিয়ে বিপুল সম্পদ ছিল। সেই দৃশ্য আমার চোখে লোভের ঝিলিক জাগিয়ে দিল। সম্পত্তির দায়িত্ব সামলাতে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, আর আলিফার প্রতিও যত্ন ও ভালোবাসার ভান করতে লাগলাম,আলিফা অন্তঃসত্ত্বা ও হলো।
এভাবে তিন মাস কেটে গেল। এই তিন মাসে একবারের জন্যও রূপসীর কথা মনে পড়েনি।মনে পড়েনি সে কি অবস্থায় আছে, কেমন করে আছে।

একদিন হঠাৎ রূপসীর কথা মনে পড়তেই আমি তার কাছে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি রূপসী ভীষণ অসুস্থ, এবং সে অন্তঃসত্ত্বা। এই সংবাদে আমার আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমি আনন্দিত হতে পারিনি। বরং অকারণে রাগে অন্ধ হয়ে উঠলাম। মনে হচ্ছিল, যদি আলিফার পরিবারের লোকজন রূপসীর সন্তানসম্ভবা হওয়ার কথা জানতে পারে, তবে আমার হাতে আসা সমস্ত সম্পত্তি হারাতে হতে পারে।
লোভ আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল।
সেদিন আমি রূপসীকে গর্ভপাতের জন্য চাপ দিলাম। কিন্তু সে আমার কোনো কথাই শুনল না। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে আমি তার প্রতি অমানবিক আচরণ করলাম, তাকে মারধর করলাম, এবং রাগের মাথায় তাকে সেখানেই রেখে ফিরে এলাম।

সেই রাগ, অভিমান আর অন্ধত্বের বশে আমি আর রূপসীর খোঁজ নিতে যাইনি। এভাবেই কেটে গেল আরও আট মাস। ১৯৯৭ সালের ১১ই এপ্রিল আলবানের জন্ম হলো। আনন্দে গ্রামজুড়ে মিষ্টি বিলানো হলো। সেই উল্লাসের ভিড়ে রূপসীর কথা একবারের জন্যও মনে পড়েনি।
কিছুদিন পর হঠাৎ খবর এল রূপসী ভীষণ অসুস্থ। সংবাদ পেয়ে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, রূপসী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে। সন্তান সুস্থ আছে, কিন্তু রূপসী আর বেঁচে নেই।
সেদিন আমি ভেঙে পড়েছিলাম। অনেক কেঁদেছিলাম। তবু আমার ভেতরের পৈশাচিকতা পুরোপুরি দূর হয়নি। এবার ভাবনায় পড়ে গেলাম এই নবজাতক শিশুটিকে নিয়ে কী করব? মনে হলো, এ শিশুটি আমার জীবনের সব গোপন সত্যের সাক্ষী হয়ে থাকবে। নিষ্ঠুর এক চিন্তা মাথায় এলো তাকে পরিত্যাগ করব। সেদিন আর্দ্রের জন্ম হলো,,১৯৯৭ সালের ১৫ ইং এপ্রিল তে।

আমি শিশুটিকে নিয়ে আবর্জনার স্তুপের কাছে পর্যন্ত গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পারলাম না। তার ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর হঠাৎ এক অচেনা টান অনুভব করলাম। হয়তো রক্তের সম্পর্ক তখন নিজের অস্তিত্ব জানান দিল। মায়া জেগে উঠল। আমি তাকে ফেলে আসতে পারলাম না।
শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। আলিফার হাতে তুলে দিয়ে বললাম,,
“রাস্তায় আবর্জনার পাশে কুড়িয়ে পেয়েছি।”
আলিফা ছিল অত্যন্ত সরল ও সহৃদয় মানুষ। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নিল, বুকের দুধ খাওয়াতে শুরু করল। সেদিন থেকেই আলবান ও আর্দ্র দুজনকেই সে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিল।
আলিফার সেই অগাধ মমতা, সেই সরল মানবিকতা আমাকে গভীরভাবে বিস্মিত করেছিল। তার প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা জন্ম নিল আমার
কথাগুলো বলেই থেমে গেলেন নাজিম তালুকদার। তাঁর বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল জমে থাকা জল। ঘরের ভেতর এক ধরনের ভারী নীরবতা নেমে এলো নিস্তেজ, চাপা, অস্বস্তিকর।

হঠাৎ পাশের ট্রি-টেবিলের কোণে রাখা ফোনটি বেজে উঠল। তীক্ষ্ণ রিংটোন নিস্তব্ধ ড্রয়িংরুমকে কাঁপিয়ে দিল। মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি সেদিকে গিয়ে থামল। কারও চোখে জল, কারও চোখে ভয়, কারও চোখে অজানা কৌতূহল কিন্তু এই মুহূর্তে সবার মনোযোগ একটাই, বাজতে থাকা ফোন।
কে রিসিভ করবে, এই দ্বিধায় সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। পরিস্থিতির ভার বুঝে আর্দ্র নিজের চোখের জল মুছে এগিয়ে গেল। ধীর হাতে ফোনটি তুলতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,,,
“আমরা থানা থেকে বলছি। নাজিম তালুকদার ও নাঈম তালুকদারকে থানায় আসতে হবে, একটি কেস ফাইল করার জন্য।”
আর্দ্র আর কিছু না বলেই ফোন কেটে দিল। তারপর আলিফা বেগমের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু ভারী কণ্ঠে বলল,,,
“পুলিশ থানায় নাজিম তালুকদার আর নাঈম তালুকদারকে ডেকেছে। কেস ফাইল করবে এবং ওদের কিছু জানারও আছে।”

আর্দ্রর চোখে তখন স্পষ্ট ঘৃণার ছায়া, যা এড়িয়ে গেল না নাজিম তালুকদারের নজর। তবু তিনি এই মুহূর্তে কারও চোখে চোখ রাখতে পারলেন না। দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন মেঝের দিকে।
আলিফা বেগমের মুখভঙ্গি দেখে তাঁর মনের অবস্থা বোঝা গেল না। তবে এ কথা স্পষ্ট ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছে। তাঁর নীরবতা যেন সেই আঘাতেরই সাক্ষ্য বহন করছিল। কোমল মনে গভীর দাগ তৈরি করেছে। আর্দ্রের হুট করে কিছু কথা মনে পড়তেই চোখ ভিজে এলো এবং আলিফা বেগমের কাছে গেলেন,আলিফা বেগম আর্দ্রের উপস্থিত টের পেয়েও তার দৃষ্টি মেঝেতে অটল থাকল, আর্দ্রের অবস্থা সংকটজনক মনে হতেই নিধি তার কাছে এগিয়ে আসলো, আর্দ্রের চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল, এবং বলল,,,

“মা আমি তোমার সন্তান না?”
আর্দ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নাজিম তালুকদারের সামনে দাঁড়াল। নিধিও তার পিছু পিছু এসে পাশে দাঁড়াল। দৃঢ় অথচ কাঁপা কণ্ঠে আর্দ্র প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,,,
“আমার মাকে কে মেরে ফেললেন তাও এভাবে?”
নাজিম তালুকদার মাথা নিচু করে নীরব রইলেন।
আর্দ্রের গলায় যেন কান্না এসে আটকে গেল। নিধি তার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল। আর্দ্র ফিরে তাকাল নিধির দিকে, আকুল স্বরে বলল,,,
“আমি জারজ সন্তান নই, নিধি। আমি বৈধ সন্তান। কিন্তু আমার মা বেঁচে নেই। আর এই নাজিম তালুকদারের কারণেই আমার মা আজ বেঁচে নেই,তাই না।”
নিধির চোখও ভিজে উঠল। সে অনেক চেষ্টা করল আর্দ্রকে শান্ত করতে, কিন্তু আর্দ্র তখন আবেগে ভেঙে পড়েছে।
সে এগিয়ে গেল আলিফা বেগমের দিকে। কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করল,,,

“এত যত্ন করে মানুষ করলে কেন আমাকে, মা? একটু তো কষ্ট দিতেই পারতে! কেন মায়ের অভাব বুঝতে দিলে না? কেন আলবান আর আমার মধ্যে কোনো তফাৎ রাখলে না? কেন সমান করে খেতে দিলে, পড়তে দিলে, খেলনা দিলে?”
আলিফা বেগমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল আর্দ্র,,,
“তোমার গর্ভে কেন আমার জন্ম হলো না, মা?”
শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে সে আবার বলতে লাগল,,
“আমার জন্মদাত্রী মা বেঁচে নেই, মা। তবু কেন তার জন্য এত কষ্ট হচ্ছে না, যতটা কষ্ট হচ্ছে তোমার গর্ভে জন্মাইনি বলে? কেন, মা?”
হঠাৎ তার ভেতর আরও প্রশ্নের ঢেউ উঠল। আরও জোরে কাঁদতে কাঁদতে সে বলতে লাগল,,
“মা গো, আমার জন্মদাত্রী মা আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা গেছে। জানো কেন? সে তো আপেল, কমলা, আঙুর পুষ্টিকর কিছুই খেতে পায়নি। সে খুব গরিব ছিল, মা। আর তার স্বামী তাকে মারধর করেছে, ভালো-মন্দ খাবার কিনে দেয়নি…”
আর্তনাদ করে উঠল আর্দ্র,,

“আহারেয়য়য়য়! কত কষ্ট সহ্য করে আমার জন্মদাত্রী আমাকে জন্ম দিয়ে চলে গেল!”
হঠাৎ চিৎকার করে উঠল সে,,,
“মা! আমি পাপী, মা! আমার জন্যই তুমি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছ, আমাকে পৃথিবীর আলো দেখাতে গিয়ে…”
আর্দ্রের কথাগুলো যেন উপস্থিত সবার হৃদয়ে আঘাত করল। ঘরে নেমে এলো ভারী নীরবতা, আর সেই নীরবতার ভেতরেই একে একে ভেঙে পড়তে লাগল সবাই। নিধি হাউমাউ করে কেঁদে আর্দ্রের পিঠ জড়িয়ে ধরল, যেন তাকে নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে চায়, শান্ত করতে চায় ।
আলবান যে মানুষটিকে সবাই কঠোর, স্থিরচিত্ত বলে জানে তার চোখেও তখন জল টলমল করছে। নাঈম তালুকদার এতদিন এই সত্য জানলেও, আর্দ্রের কণ্ঠে সেই বেদনাময় উচ্চারণ শুনে তিনিও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না; নিঃশব্দে ভেঙে পড়লেন।
বিথী কাঁদছে না। তার চোখ স্থির, মুখ শান্ত। যেন সে অনেক আগেই এই সত্যের আভাস পেয়েছিল, নিজেকে প্রস্তুত করে রেখেছিল এমন এক মুহূর্তের জন্য।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৭

কিন্তু ইতি… ইতি কাঁদছে। ভীষণভাবে কাঁদছে। শুধু আর্দ্রের জন্য নয় নিজের জন্যও। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শঙ্কা, এক অনিশ্চয়তা ঘুরপাক খেতে লাগল। এইসব সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর তার নিজের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন জাগল মনে সে কে? তার মা কে? তার পরিবার কোথায়?
আর্দ্রের আহাজারি শুনে ইতি আতঙ্কিত হয়ে ভাবতে লাগল,এরপর তার পরিচয়ের সত্যও জেনে সে কি তবে পারবে তা সহ্য করতে? নাকি সে ওআর্দ্রের মতোই বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়বে?

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৯