Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৯

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৯

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৯
রাফিয়া জান্নাত রিফা

আলিফা বেগমের ঠোঁটে তখনো কোনো শব্দ নেই, কিন্তু বুকভরা হাহাকারে তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। জীবনে এমন এক সত্যের মুখোমুখি হবেন যে সত্য ভেতর থেকে তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেবে এ কথা তিনি কল্পনাও করেননি। মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমের পরিবেশ বদলে গেল নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
সেই নীরবতা ভেঙে বিথী শান্ত গলায় নাজিম তালুকদার কে বলল ,,
“বাকি কথা পরে শোনা যাবে। এখন চলুন পুলিশ স্টেশনে। সেখানে যাওয়া জরুরি।”
বিথীর এই অস্বাভাবিক শান্তভাব সবার কাছে বিস্ময়কর লাগল। কারণটাও অস্বাভাবিক নয় এই মেয়েটাই তো কিছুক্ষণ আগেও দির্শকের জন্য প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। এবার নাজিম তালুকদার আসামির মতো মিনমিন করে বললেন,

“তুমি যাবে, মামনি?”
বুক সোজা করে বিথী বলল ,,
“হ্যাঁ, যাব। যেতেই হবে। আমি তাকে ভালোবাসি। আইনগতভাবে আমাদের বিয়েও হয়েছে।”
এবার বিথীর বাবা নাঈম তালুকদার রাগ চেপে বললেন ,,,
“এই বিয়ের কোনো প্রমাণ নেই। তাই এই বিয়ে আমি মানি না। একজন আসামিকে বিয়ে করেছ তুমি এটা আমি সমর্থন করি না।”
বিথীর কণ্ঠ আরও দৃঢ় হলো।
“আপনি মানুন বা না মানুন, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। আর আজ দির্শক প্রধান আসামি হয়েছে,খুনি হয়ে,শুধু আপনাদের জন্য, আপনাদের লোভের জন্য।”
হঠাৎ বিথী হো হো করে হেসে উঠল।

“আল্লাহ ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না।”
নাঈম তালুকদার আরও কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু বিথী তাকে থামিয়ে দিল।
“এখন এসব কথা বলার সময় নয়।”
রাগ সংযত রেখে তিনি চুপ করে গেলেন। বিথী নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল, তার পিছু পিছু ছুটল ইতি। ঘরে ঢুকে বিথী আলমারি থেকে কালো বোরকা ও হিজাব বের করে পরতে লাগল। সেই সময় ইতি ঘরে এসে বলল,
“বিথী, আমিও যাব।”
বিথী মৃদু হাসল।
“আমাকে নিয়ে ভয় হচ্ছে? মনে হচ্ছে, বিথী আবার দির্শক স্যারের জন্য পাগলামি করবে?”
ইতি চুপ করে রইল। বিথী আবার বলল,

“পাগলামি তো করবই, ইতি। আমি পাগলামি না করলে তার জন্য আর কে পাগলামো করবে? এই দুনিয়ায় তার জন্য পাগলামি করার কেউ নেই। তাই বিথীই পাগলামি করে। এমনি এমনি করি না ভালোবাসার লোভে করি। আমি ভীষণ লোভী, তাই পাগলামি করি।”
ইতি হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“তোর কি মনে হয় না, তোর এই পাগলামি আমাদের সহ্য হয় না? খুব কষ্ট হয় আমাদের। দেখ, আমার সঙ্গেও তো কম কিছু হচ্ছে না এবার। আমি নিজেকেই চিনতে পারছি না কে আমি? কারণ আমার ও তো পরিচয় নেই,এটুকু বুঝেছি, তোর মা আমার মা নয়, তোর বাবা আমার বাবা নয়, এই পরিবার আমার নয়… তুই আর নিধিই শুধু আমার বোন…”
এরপরের শব্দ উচ্চারণের আগেই বিথী ইতির মুখ চেপে ধরে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“দুনিয়া উল্টে গেলেও তুই আমাদের বোনই থাকবি। ছেড়ে যাওয়ার কথা মাথায় আনবি না। আমরা একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।”
ইতি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। বিথী আবার বলল,
“দেখ, আমাকে নিয়ে তোরা কত ভাবছিস, কষ্ট পাচ্ছিস। কিন্তু দির্শক স্যারের জন্য যে কষ্টটা আমার হচ্ছে, তা তোরা বুঝবি না। প্রতিটি মুহূর্তে তাকে ভাবছি, কাঁদছি। কখনো কখনো নিজেকেই আঘাত করি। ভাবি, কখন, কীভাবে তাকে এতটা ভালোবেসে ফেললাম যে সেই ভালোবাসাই আমাকে স্বার্থপর বানিয়ে দিচ্ছে।”
কথা শেষ হলেই দুজনে ড্রয়িং রুমে আসে, এবং রহনা দেয় থানায়।

ইতি, বিথী, নিধি, আলবান, আর্দ্র, নাজিম তালুকদার ও নাঈম তালুকদার সকলেই একে একে থানায় উপস্থিত হলো। পরিবেশটা ছিল চাপা উত্তেজনায় ভরা। বিথীর দৃষ্টি অস্থিরভাবে চারদিকে ঘুরছিল; সে শুধু দির্শককে খুঁজছিল, কিন্তু কোথাও তার দেখা মিলল না।
আলবান এগিয়ে গিয়ে একবার পুলিশের কাছে দির্শকের ব্যাপারে জানতে চাইল। কিন্তু পুলিশ কৌশলে প্রশ্নটি এড়িয়ে গেল। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে সে সরাসরি নাজিম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনাকে দির্শক প্রধান কেন মারতে চাইছিল?”
প্রশ্ন শুনে নাজিম তালুকদারের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভয়ে তার চোখ-মুখ শুকিয়ে এলো। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“আমি জানি না।”
পুলিশের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ চলল। অবশেষে কথোপকথন থামতেই উপস্থিত ডাক্তার ভেতর থেকে এসে শান্ত গলায় বললেন,
“এখন আসতে পারেন।”
আর্দ্র দ্রুত জিজ্ঞেস করল ,,,,
“দির্শকের সঙ্গে দেখা করা যাবে?”
ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন,,,
“না, এখন ওনার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়।”
“কেন?”
“পরমিশন নেই।”
ওদিকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিথী ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছিল। দির্শকের সঙ্গে দেখা করার আকাঙ্ক্ষায় তার ধৈর্য ভেঙে পড়েছে। ইতি ও নিধির কোনো কথাই সে আর কানে নিচ্ছে না। হঠাৎই সে এগিয়ে এসে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে কঠোর কণ্ঠে বলল,

“তাড়াতাড়ি বলুন, দির্শক প্রধান কোথায়, বলুন?”
বিথীর তীক্ষ্ণ ভঙ্গি ও উত্তেজিত কণ্ঠে পুলিশ স্পষ্ট বিরক্ত হলো। কঠিন স্বরে বলল,,,
“গলাবাজি করবেন না, খবরদার। আপনার কপাল ভালো যে আমি আপনাকে গ্রেফতার করিনি। না হলে আসামিকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে আপনারও জেল হতো।”
অদ্ভুতভাবে, এই কথায় বিথীর মুখে এক ঝলক হাসি ফুটে উঠল। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,,
“তাহলে আমাকেও জেলে পাঠান। তবে আমাকে দির্শক প্রধানের সঙ্গেই রাখবেন।”
এ কথা বলে সে দু’হাত পুলিশের দিকে বাড়িয়ে দিল।
“এই নিন, গ্রেফতার করুন।”
থানার ভেতরে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। পুলিশ সদস্যদের চোখে স্পষ্ট অবাক ভাব। কিন্তু বিথী যেন আরও অধৈর্য হয়ে উঠল। আবার বলল,
“কী হলো? গ্রেফতার করুন, তাড়াতাড়ি।”
ইতি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিথীর কানে ফিসফিস করে বলল,
“বিথী, এসব কী করছিস তুই? তোর মাথা ঠিক আছে তো?”
বিথী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আমার মাথা একদম ঠিক আছে। তোরা কেউ একটা কথাও বলবি না। চুপ থাক।”
নিধি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। চারপাশের নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে উঠল। বিথী আবার পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কী হলো?”
পুলিশ ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। পরিস্থিতি সামাল দিতে গম্ভীর স্বরে বলল,,,
“আপনি যা করছেন, তা আবেগের বশে। আইন নিয়ে খেলা করার জায়গা এটা নয়। দির্শক প্রধান নিরাপদে আছেন। প্রয়োজন হলে যথাসময়ে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হবে। এখন সবাই যেতে পারেন।”
বিথীর চোখে তখনও অদম্য এক জেদ ভয় আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল,
“আপনি তো একটু আগেই বললেন, আমি আসামিকে পালাতে সাহায্য করে অপরাধ করেছি। তাহলে এখনই আমাকে গ্রেফতার করুন।”
নিধি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রাগ আর উৎকণ্ঠা মিশ্রিত স্বরে সে বলল,,
“চুপ কর, বিথী! চল, বাড়ি যাই। কাল পরিচালক স্যারের সঙ্গে দেখা করতে আসব।”
কিন্তু বিথী নিধির হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিয়ে শান্ত অথচ অনড় স্বরে বলল,
“না। আমি অপরাধ করেছি আর সেই অপরাধের শাস্তি পাওয়াই উচিত। আমাকে গ্রেফতার করাই আপনাদের কর্তব্য।”
পরিস্থিতি ক্রমে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল। পুলিশ কর্মকর্তারা স্পষ্টতই বিরক্ত, তবে তারা নীরবই রইল। এদিকে আলবান ও আর্দ্র এগিয়ে এসে বিথীকে বোঝানোর চেষ্টা করল অনুনয়, যুক্তি, সতর্কতা কিছুই বাদ রইল না। কিন্তু বিথী নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল।
অবশেষে ইতি ও নিধি বাধ্য হয়ে তার হাত ধরে টানতে শুরু করল। তবু বিথী সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বারবার বলছিল,

“আমি অপরাধী, ইতি… নিধি, আমাকে ছেড়ে দাও।”
এই মুহূর্তে তার সমস্ত সত্তা জুড়ে একটাই জেদ দির্শকে একবার দেখা। প্রয়োজনে চিরদিনের জন্য কারাগারে যেতেও যদি হয়, তবু সে যাবে,তবে এই মুহূর্তে তাকে দির্শকে দেখতেই হবে।
থানার বারান্দায় তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
বিথীকে কেউ থামাতে পারছে না। সে বারবার পুলিশের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, দৃঢ় অথচ কাঁপা কণ্ঠে বলছে ,,,
“আমাকে গ্রেফতার করুন।”
তার চোখে একরকম উন্মত্ত জেদ, যেন গ্রেফতার হওয়াটাই তার একমাত্র মুক্তি।
বিথীর এই অস্থিরতা দেখে ইন্সপেক্টর মনে মনে তাকে ‘পাগল’ আখ্যা দিলেও, বিষয়টিকে পুরোপুরি হালকাভাবে নিতে পারছেন না। কারণ তার আচরণে উন্মাদনার সঙ্গে এক অদ্ভুত সত্যতার আভাসও রয়েছে।
ইতি, নিধি ও আলবান অনেক চেষ্টাতেই যখন তাকে সামলাতে পারল না, তখন আর্দ্র এগিয়ে এসে শান্ত স্বরে বোঝাতে লাগল ,,,

“বিথী, আর মাত্র তিন দিন পর আদালতে আমাদের পরিচালক আসবেন। সেদিনই দেখা হবে। এখন চলো, বাড়ি যাই।”
কিন্তু বিথী যেন কারও কথাই শুনছে না। তার কানে যুক্তির শব্দ পৌঁছায় না, পৌঁছায় শুধু এক গভীর আবেগের প্রতিধ্বনি।
অন্যদিকে নাঈম তালুকদার রাগে ফুঁসছে। বিথীর এই আচরণে সে অপমানিত, ক্ষুব্ধ এমনকি মুহূর্তে তাকে চড় মারার ইচ্ছেও দমিয়ে রাখতে হচ্ছে। পরিস্থিতি তার হাতের বাইরে, অথচ সে অসহায়।
পুলিশও চরম বিরক্ত ও বিভ্রান্ত। এমন দৃশ্য তারা আগে কখনও দেখেনি কেউ স্বেচ্ছায়, জোর করে হাজতে ঢুকতে চাইছে! মাঝে মাঝে তারা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে; কেউ মাথা চুলকাচ্ছে, কেউ অবিশ্বাসে তাকিয়ে আছে বিথীর দিকে।
বিথীর এই ভালোবাসার উন্মত্ততা প্রথম দিন থেকেই সবাইকে বিস্মিত করে এসেছে। কিন্তু আজ তা যেন সীমা ছাড়িয়েছে।

ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানের মনে কৌতূহল তীব্র হয়ে উঠেছে।দির্শকের অতীতে কী ঘটেছিল?
এই রহস্য উদ্ঘাটনের সংকল্পে তিনি তদন্তে আরও মনোযোগী হয়েছেন ও বেশ। কারণ তার অভিজ্ঞতা বলছে মানুষের আচরণের পেছনে সবসময়ই একটি গল্প থাকে আর সেই গল্পই সত্যের দরজা খুলে দেয়।
বিথী এমন দির্শকের জন্য পাগলের মতো উত্তেজিত দমাতে না পেরে অবশেষে উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই আলবান বিথীর শরীরে ইনজেকশন পুশ করে দেয়, তখন মৃদু চিৎকার করে উঠল বিথী, পরক্ষণেই মাথাটা ঝিম ঝিম করে ঘুরতে শুরু করলো শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলো, গাঁ ছাড়া ভাবে পড়তে লাগলো মাটিতে আদ্র তৎক্ষণাৎ ধরে নিল বিথীকে,কোলে তুলে গাড়ির দিকে নিয়ে এলো,তার সাথে ইতি, নীধি,আলবান, নাজিম,নাঈম তালুকদার এলেন এবং বাড়ির উদ্দেশ্যে রহনা দিলেন।

দুপুরের নরম আলো ছায়া ফেলে রেখেছে বারান্দার মেঝেতে।
এইমাত্র গোসল সেরে ইতি ভেজা চুলের গামছাটা খুলে চুল ঝেড়ে নিল। তারপর গামছাটি বারান্দার রশিতে মেলে দিয়ে রেলিংয়ে ভর করে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি দূরে কোথাও, অথচ চোখের ভেতর জমে আছে অদৃশ্য বিষণ্নতা। মনে হয়, সে নিজেকেই খুঁজছে কোনো উত্তর, কোনো পরিচয়।
ঘরের ভেতরেই ছিল আলবান। অনেকক্ষণ ধরেই সুযোগ খুঁজছিল ইতির সঙ্গে দু’কথা বলার। তাকে বারান্দায় একা দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। পিছন থেকে ইতির কোমর জড়িয়ে ধরতেই ইতি হালকা চমকে উঠল। তবে পরমুহূর্তেই স্পর্শটাকে চিনে নিল এ আলবানেরই ছোঁয়া। তাই আর সরে গেল না।
আলবান ইতির ভেজা চুল সরিয়ে তার কাঁধে থুতনি রাখল। মৃদু হাসিতে বলল,

“স্বামীর ছোঁয়া চিনতে শিখে গেছিস দেখছি?”
ইতি আস্তে উত্তর দিল,
“হুঁ।”
“মন খারাপ?”
“না।”
আলবান কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার জিজ্ঞেস করল,
“আমাকে বলবি না, কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
আলবান একটু দুষ্টুমি মেশানো গলায় বলল,
“তাহলে একটা চুমু দে।”
ইতি বিরক্ত স্বরে বলল,
“ভালো লাগছে না, ছাড়েন।”
“চুমু দিলে ভালো লাগবে।”
“বলছি তো, না।”
“তাহলে এদিকে ঘোর, আমি দিই।”
“না।”
আলবান মৃদু হেসে বলল,

“তুইও দিবি না, আমিও দিবো না এটা কেমন কথা? একজন না একজন তো দিতেই হবে।”
ইতি চুপ রইল। আলবান তার শীতল উন্মুক্ত কাঁধে ঠোঁট ছুঁইয়ে তাকে আলতো টানে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তুই কে, তোর পরিচয় কী এসব নিয়েই মন খারাপ, তাই তো?”
ইতি মাথা নিচু করে রইল। আলবান দু’হাতে তার মুখ তুলে নিল। ইতির চোখ উপচে জল গড়িয়ে পড়ল। আলবান আঙুলের ডগায় সেই অশ্রু মুছে দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।
কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“তোর প্রথম প্রশ্ন তুই কে? তার উত্তর আমি দিই। তুই আমার বৈধ স্ত্রী। এটাই তোর পরিচয়, এটাই তোর মর্যাদা।”
ইতি ভেজা চোখে আলবানের দিকে তাকিয়ে রইল। আলবান তার কপালে আলতো চুমু এঁকে বলল,
“ভালোবাসি তোকে, ইতি। খুব ভালোবাসি। তোকে ছাড়া থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না, কালনাগিনী।”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,

“জানিস, বিথীর ভালোবাসাটাকে আমি সম্মান করি। ওর ভালোবাসা হয়তো অনেকের চোখে বাড়াবাড়ি, কিন্তু কাউকে যদি ভালোবাসতেই হয়, তবে বিথীর মতো বাড়াবাড়ি করেই ভালোবাসা উচিত। যখন ভাবি, বিথীর সেই পাগলামিটুকু ওর প্রিয় মানুষটাকে হাড়ানোর জন্য,তখন আমি ফিল করি, তোর জন্য আমিও ঠিক ততটাই পাগল। তুই না থাকলে আমি নিঃশ্বাসহীন হয়ে মরে যাবো, ইতি। তুই আমার জীবনের অপরিহার্য সত্য।”
বারান্দার নীরব বাতাসে তখন আর কোনো প্রশ্ন নেই শুধু দু’টি মানুষের উষ্ণ আলিঙ্গন, আর অব্যক্ত ভালোবাসার ।
চুপচাপ অনেকটা সময় কেটে গেল, তবুও ইতি মুখ খুলল না। তবে আলবান বুঝতে পারল ইতি কাঁদছে। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই অসহায় কান্না সে সহ্য করতে পারে না।
হঠাৎ ফুঁপিয়ে ওঠা কণ্ঠে ইতি বলল,

“আমার মা কে, আলবান ভাই? আমার জন্মদাত্রী মা যদি বেঁচে না থাকে, তাহলে আমিও কি আর্দ্র ভাইয়ের মতো কাঁদবো, আহাজারি করবো? আমার তো এখন থেকেই সেই কষ্ট হচ্ছে। বড় বাবা এমন কেন করেছেন? এই বাড়ির অংশ না হয়ে থাকার আফসোস কেন আমাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে? যদি সিদ্দিকী বেগম আমার জন্মদাত্রী মা না হন, তবে এতদিনের বিশ্বাসগুলো কী ছিল? আজ এ কেমন অন্ধকার নেমে এলো সবার জীবনে? আমাদের তো হাসিখুশি একটা পরিবার ছিল…সেটা কোথায় আজ”
ইতির প্রতিটি শব্দ যেন তীক্ষ্ণ তীরের মতো বিদ্ধ করল আলবানের হৃদয়। সে কিছুক্ষণ নির্বাক রইল কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। শুধু আরও শক্ত করে ইতিকে জড়িয়ে ধরল।
ধীরে, কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল,
“এই প্রশ্নগুলোর জবাব অবশ্যই দিতে হবে নাজিম তালুকদারকে। কিন্তু তার আগে তুই আমাকে একটা কথা দে।”
ইতি চোখ মুছে তাকাল,

“কী কথা?”
“পরিস্থিতি যেমনই হোক, তুই আমাকে ছেড়ে যাবি
না।”
ইতি ডুকরে উঠে বলল,
“আপনাকে ছাড়া আর কোথায়ই বা যাবো আমি? আপনাকে ছাড়া থাকবোই বা কী করে, দাবালন ভাই…”
আলবান মৃদু হাসল। কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে ইতির পেটে আলতো চিমটি কেটে বলল,
“চল, তোকে একটু আদর করি।”
ইতির ভ্রু কুঁচকে গেল।
“এই জন্যই আপনার সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলতে আসি না।”
সে সরে যেতে চাইল, কিন্তু আলবানের হাতের বাঁধন আলগা হলো না।

“এমন করছিস কেন? আদরই তো করবো। একটু কাছে এলেই এমন চেঁচিয়ে উঠিস কেন? দেখ, বিয়ের এতদিন হয়ে গেল, অথচ আমাদের বাসরই হলো না। চল না, আজ অন্তত বাসরটা সেড়ে ফেলি”
ইতি চুপ করে রইল, তবে তার অস্বস্তি স্পষ্ট। আলবান আর রসিকতা করল না। তার কণ্ঠের সুর বদলে গেল। ইতিকে কোলে তুলে বিছানার দিকে নিয়ে গেল, কিন্তু আগের চঞ্চলতা আর ছিল না।
ইতিকে বিছানায় শুয়ে দিলো আলবান, অতঃপর তার হাত দুটো আলতো করে নিজের হাতে নিল চেপে ধরল, তার কপালে একটি নরম চুমু রেখে বলল,নেশালো কন্ঠে বলল,,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৮

“শোন,এখন যা হবে সবটাই সহ্য করার দায়িত্ব তোর।”
ইতির বুক টা ধক ধক শব্দ করতে লাগলো, আলবান তা বুঝতে বাঁকা হাসলো, অতঃপর নিজ কাজে মনোনিবেশ করলো সে,আজ কিছুতেই ইতিকে ছাড়ছে না সে।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫০