দাহশয্যা পর্ব ১২
Raiha Zubair Ripti
সকাল তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ঘরের জানালা দিয়ে একটুখানি মেঘলা আকাশের আলো এসে পড়েছে দেয়ালে। আলোটা শান্ত, কিন্তু ইমনের বুকের ভিতর অশান্তির ঝড়। ঠিক ভোরের দিকে ঘুম ভাঙলো তার। চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরটা যেন বিদ্রোহ করে উঠলো তাপমাত্রাটা যেন অস্বাভাবিক। কপাল ছুঁয়ে বুঝে গেল, জ্বর। মাথা ভার ভার লাগছে। গলা শুকিয়ে কাঠ, শরীর ম্যাজম্যাজে।
ইমন বিছানায় উঠে বসে ঘরের চারদিকে একবার তাকালো। সবকিছু আগের মতোই, তবু মনে হলো যেন কিছু নেই এখানে। এক নিঃশব্দ শুন্যতা চারপাশে। শরীরে তার জ্বর। হুট করে আসা জ্বরের কারন বুঝলো না ইমন। করোনা হলো নাকি আবার? অস্থিরতাটাও কমে নি। এত অস্থির কেনো হলো গতকাল থেকে হৃদয় টা? মনে হচ্ছে কিছু হারাতে যাচ্ছে ইমন। কিন্তু কি হারাবে? সব হারিয়ে তো ইমন এখন গোছানোর পথে৷ ঢাকায় আসার পর দুদিন জুম্মার নামাজ আদায় করেছিল ইমন।
আজানের ধ্বনি কানে যেতেই বুকের ভেতর কেমন একটা আলতো আলো জ্বলে উঠলো। বিছানার ক্লান্তি সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালো সে। ধীর পায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ওজু করলো, ঠান্ডা পানির ছোঁয়ায় গা কেঁপে উঠলো, তবু শান্তি। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে ফজরের নামাজে যখন সিজদাহ দিলো, তখন মনটা একটু যেন হালকা লাগলো।
তবে সবচেয়ে ভারী মুহূর্তটা এল মোনাজাতে। নামাজ শেষে মোনাজাতে যেতেই কেনো জানি অঝোর ধারায় কান্না করে দিলো ইমন৷ কেনো জানে না৷ শুধু মোনাজাতে বলল-
-” হে খোদা এত কষ্ট কেনো হচ্ছে হুট করে? মনে হচ্ছে আমার সবচেয়ে প্রিয় কোনো জিনিস আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার হৃদয় টাতে একটু প্রশান্তি বর্ষণ করো। জীবন টা গুছানোর পথে। আমি যেটা ভাবছি সেটা যেন না হয়। করোনার কবলে যেন আমি না পড়ি৷ আমি ছাড়া আমার পরিবারের কেউ নেই। আমার সব ভালো করে দাও। আমার পরিবারের সবাই যেনো ভালো থাকে। আর মেহরিনও যেন ভালো থাকে। আমার ভালোবাসা কে ভালো রেখো। আর তো কয়টা দিন তারপর নিজের করে নিব তাকে।
ইমন মোনাজাত শেষ করে জায়নামাজে কিছুক্ষণ মাথা ঠেকিয়ে রইলো। পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনে জায়নামাজ গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ইয়াসিনের পরিচিত কোনো ডক্টর কে দেখাতে হবে শরীর টা। করোনা হলে তো আরেক বিপদ। ইমন ঘর ছেড়ে বের হলো। ইয়াসিন ব্রাশ করছে। ইমন কে দেখে কুলি করে বলল-
-” ভাই কিছু লাগবে নি আপনার?
-” হ্যাঁ, তোমার পরিচিত কোনো ডক্টর আছে?
-” হ্যাঁ আছে তো। কেনো কি হইছে আপনার?
-” শরীর টা দেখাতাম,জ্বর আসছে। করোনা হলো কি না আবার।
ইয়াসিন লাফ দিয়ে দূরে সরে বলল-
-” ভাই আগাইয়েন না আর। আপনার থেকে নইলে করোনা ভাইরাস আমার শরীরেও চলে আসবে। আমি এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না। বিয়ে করে মরতে চাই।
-” আমি শিওর না এখনও করোনাই হয়েছে কি না। আচ্ছা আমি আগাবো না। ডক্টরের নম্বর টা দাও আমি টেস্ট করিয়ে আসি।
-” নেন ০১৯৫*****১০। ভালোমতো করাইয়েন টেস্ট। আর ব্রেকফাস্ট করে নেন আগে।
-” নাহ থাক বাহির থেকে করবো। তুমি খেয়ে নিও।
ইমন নম্বর টা ফোনে তুলে ডক্টর কে ফোন করে তার এড্রেস টা জেনে চলে গেলো। মুখে তার মাস্ক। রাস্তার পাশে থাকা স্টল থেকে একটা পা রুটি কিনে চা দিয়ে খেলো। তারপর আবার হাঁটা শুরু করলো। ডক্টরের দেওয়া এড্রেসে এসে সব ধরণের চেক-আপ করলো। রিপোর্ট আসতে দু এক দিন দেরি হবে। ইমন জিজ্ঞেস করলো-
-” করোনা হওয়ার সম্ভাবনা নেই তো?
-” রিপোর্ট দেখে বলতে পারবো। তবে নাও হতে পারে করোনা। একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটারি ইউজ করবেন ঘনঘন। লোকসমাগম এড়িয়ে চলবেন। হাঁচি কাশির সময় হাতের কনুই বা রুমাল ব্যবহার করবেন। ডাবের পানি খাবেন বেশি বেশি।
-” জ্বি ডক্টর। রিপোর্ট নিতে আসবো কবে?
-” আমি আপনাকে ফোন করে জানাব।
-” জ্বি আসছি তাহলে।
ইমন বেরিয়ে আসলো হসপিটাল থেকে। এখন বাজে বেলা সাড়ে দশ টা। ইয়াসিন ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” ইমন ভাই কি বললো ডক্টর?
-” রিপোর্ট দেয় নি।
-” এমনি কিছু বলে নি?
-” না।
-” করোনা হইলে ভাই একটু দূরে দূরে থাইকেন সবার থেকে। জানেন তো ছোঁয়াচে রোগ এটা।
-” আমার মাথাতে আছে সেটা চিন্তা করো না।
-” আপনার বরং রিপোর্ট না আসা অব্দি আর বাহিরে থাকতে হবে না। ঘরেই থাকুন।
ইমন ছোট্ট করে হুমম বলে কেটে দিলো ফোন। করোনা রোগ টা হলে কেমন সবাই দূর দূর করে তাই না? ইমন তপ্ত শ্বাস ফেলে ইব্রাহিমের বাড়িতে থাকা বাগান ঘরে চলে আসলো। ইমন মূলত এখানেই থাকতো ইব্রাহিমের ড্রাইভার হবার পর থেকে। টেবিলের উপর থেকে পানির বোতল নিয়ে ঢকঢক করে পানি টা খেয়ে নিলো। পকেট থেকে ফোন বের করে মাকে কল দিলো। মায়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে খুব। এই ঢাকা শহর ইমনের একদম ভালো লাগে না। সবার ভেতরে নিজেকে একা একা মনে হয়। মনে হয় অন্য গ্রহের প্রাণী সে।
ইতি বেগম মেয়ের সাজ দেখছিলো। ঊর্মি বাজার থেকে কিনে আনা গ্রাউন টা পড়ে সাজতেছে৷ শর্ট কাঁধ ছাড়িয়ে যাওয়া চুল গুলোর কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। মাঝখানে সিঁথি করবে নাকি ক্লিপ দিয়ে আটকাবে। ইতি বেগম সেটা বুঝে বলল-
-” ক্লিপ দিয়ে আঁটকে ছেড়ে দে। সুন্দর লাগবে।
ঊর্মি মায়ের কথা মতন তাই করলো। পাশে ফোন বেজে উঠায় ইতি বেগম চেয়ে দেখলো তার ছেলে ফোন করেছে। ইতি বেগমের মুখে হাসি ফুটলো। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইমনের সালাম ভেসে আসলো। ইতি বেগমের মন টা প্রশান্তি তে ভরে গেলো ছেলের গলা শুনে। ইতি বেগম সালামের জবাব দিয়ে বলল-
-” কেমন আছিস বাপ?
ইমন বিষন্ন স্বরে বলল-
-” আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি মা। তোমরা?
-” আগের তুলনায় ভালো থাকি এখন বাপ। বাড়ি আইবি কবে?
-” ঈদে যদি পারি তাহলে যাব মা।
-” গলার স্বর এমন শোনাচ্ছে কেন ইমন? শরীর ভালো আছে?
ইমনের মন আরো খারাপ হয়ে গেলো। তার মা কেনো বুঝে ফেললো?
-” হ্যাঁ মা ভালো আছে শরীর। ঊর্মি কি করে?
-” ঊর্মি রেডি হচ্ছে।
-” রেডি হচ্ছে কেনো? কোথায় যাচ্ছে নাকি?
-” হ্যাঁ।
-” কোথায়?
-” ঐ তো মে…
-” কি হলো মা তাড়াতাড়ি রেডি হও। বর তো চলে আসবে।
ঊর্মির ডাক শুনে ইতি বেগম পুরো কথাটা আর শেষ করতে পারলো না।
-” ইমন বাপ সাবধানে থাকিস। তুই ছাড়া আমাদের কেউ নেই। বেশি কষ্ট হলে থাকিস না, চলে আসিস বাড়ি।
ইমন স্মিত হাসলো।
-” চিন্তা করো না। আমার কষ্ট হচ্ছে না।
-” রাখছি তাহলে।
-” হুমম আল্লাহ হাফেজ।
ইতি বেগম ফোন কেটে রেডি হলেন। মেহরিন কে আজ লাল টুকটুকে বেনারসি তে সাজানো হয়েছে। হাতে গলায় সুলতান বাড়ির দেওয়া গহনা গুলো। চোখ মুখে হাল্কা প্রসাধনী ব্যবহার করা হয়েছে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলো মোতালেব ভুঁইয়া মেয়েটাকে। মেয়েটা তার বাড়ি ছেড়ে আজ চলে যাবে অন্যের বাড়ি। বাড়ি টা দুই মেয়ে বিহীন ফাঁকা। চোখ তার জলে টইটম্বুর করলো।
মেহরিন পেছন ফিরতেই বাবা কে দেখে এগিয়ে আসলো। পাশ থেকে সেরিন বলল-
-” কেমন লাগছে তোমার মেয়ে কে বাবা?
মোতালেব ভুঁইয়া হেঁসে বলল-
-” পরীর মতো লাগছে আমার মা টা কে।
সুলতান ভিলায় নিজের রুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সোলেমান। নিজেকে দেখছে আয়নায়। সে কোনো বিয়ের শেরওয়ানি পড়ে নি। পড়েছে সাধারণ একটা সিম্পল সাদা পাঞ্জাবি। আজ তার বিয়ে। অন্য এক মেয়েকে সে জীবনে জড়াতে যাচ্ছে। এই জীবনের ভবিষ্যৎ কি সোলেমান জানে না। জানতেও চায় না। নিজেকে শেষ বার দেখলো আয়নায়। চুল গুলো ঠিক করে নিজের প্রতিবিম্বর দিকে তাকিয়ে বলল-
-” কংগ্রাচুলেশনস নওয়াজ সোলেমান সুলতান নিজের সাথে সাথে অন্য একজনেরও জীবন টা নষ্ট করার জন্য।
বাড়ির বাহিরে গাড়িতে বসে আছে সকলে। অপেক্ষা করছে সোলেমানের জন্য। আফিয়া সুলতান বিরক্ত হলো। দেড় টা প্রায় বেজে গেছে। এই ছেলে এত সময় কেনো নিচ্ছে। তখন বলল আসছি আর আসার নাম নেই। গাড়ি থেকে নামার জন্য উদ্যোত হতেই সোলেমান বেরিয়ে আসলে বাড়ি থেকে। দেখে বোঝার উপায় নেই সোলেমান বর,সে বিয়ে করতে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সভায় যাচ্ছে।
গাড়িতে উঠে বসলো সোলেমান। আফিয়া বেগম বলল-
-” এত দেরি করলি কেনো?
-” দেরি হয় নি বেশি। বিয়ে করার নাম করে গলায় কলসি বেঁধে মরতে যাচ্ছি। তার জন্য একটু সময় নিয়ে নিজেকে মানালাম।
-” এসব কোন ধরনের কথা।
-” আমার কথার ধরন এমনই।
আফিয়া বেগম কথা আর বাড়ালেন না। গাড়ি চলতে শুরু করলো।
ঊর্মি এসে থেকে মেহরিন কে দেখে চলছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। মেহরিন লজ্জা পাচ্ছে। ঊর্মির মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
-” কি হয়েছে কি দেখছিস এভাবে?
ঊর্মি মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে বলল-
-” কত সুন্দর লাগছে তোকে জানিস?
-” তোকেও তো কম সুন্দর লাগছে না।
-” তোর থেকে কমই লাগছে সুন্দর। জানিস আমি না একটা ভুল করেছিলাম।
-” কি?
-” যাকে তোর স্বামী ভেবেছিলাম সে তোর স্বামী ছিলো না।
-” মানে?
-” মানে ভুল লোক কে ভেবেছিলাম তোর স্বামী। যাকে ভেবেছিলাম তোর স্বামী সে ভীষণ সুন্দর রে। প্রথম দেখাতেই কিছু ভেবে বসে ছিলাম।
মেহরিন হাসলো।
-” কি ভেবে নিয়েছিলি পাগল? পছন্দ করে ফেলেছিলি?
-” হুমম। অনেক।
-” পাগল মেয়ে।
এরমধ্যে সেহরিন এসে জানালো বর চলে এসেছে। মেহরিনের বুক টা ধকধক করলো। সেরিন ঊর্মি কে মেহরিনের সাথেই থাকতে বলল। বাড়ির সামনে গেট ধরেছে তেহরান,তানভির আর আশপাশের কিছু ছেলেপেলে রা। বাজেট ধরেছে ২০ হাজার। সোলেমান আগেই ইব্রাহিম কে বলে রেখেছে গেটের সামনে কোনো রকমের গ্যাদারিং না করতে৷ যা চেয়েছে তাই যেন দিয়ে দেয়। ইব্রাহিম পকেট থেকে ২০ হাজার বের করে দিতে নিলে রুমাইসা হাত থামিয়ে দিয়ে বলল-
-” এত টাকা কেনো দিবে? মগের মুল্লুক নাকি?
ভীড় ঠেলে এগিয়ে আসলো তেহরান সামনে। রুমাইসার দিকে তাকিয়ে বলল-
-” শুনেছি সুলতান পরিবারের লোকেরা কখনও কার্পণ্য করে না। তাহলে কি এতদিন ধরে ভুল জেনে এসেছি?
রুমাইসা চোখ গরম করে তাকালো তেহরানের দিকে। তেহরান পাত্তা দিলো না। ইব্রাহিম রুমাইসা কে চুপ থাকতে বলে টাকাটা দিয়ে দিলো। তানভীর টাকা টা হাতে নিলো। গেট ছেড়ে দেওয়া হলো।
ঊর্মির লিপস্টিক উঠে গিয়েছে দেখে নতুন করে লিপস্টিক লাগাচ্ছে ঊর্মি। মেহরিনের খুব দেখতে ইচ্ছে করলো তার বরটাকে। সেজন্য জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো।
সবাই ভেতরে ঢুকছে। কিন্তু বরের পোশাকে কাউকে দেখতে পেলো না মেহরিন। সবাই সাদা পাঞ্জাবি পড়া। মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
অথচ মেহরিন সোলেমানের দিকেও তাকিয়েছিল। সেই সবার মাঝে স্বয়ং সোলেমানও ছিলো৷ কিন্তু মেহরিন সে জানে না সেটাই তার না দেখা বর।
মন খারাপ করে চলে আসলো জানালা থেকে।
সোলেমান কে বসানো হয়েছে নিচ তলার একটা ফাঁকা ঘরে। যেটা বরের বসানোর জন্য সাজানো হয়েছে।
আমিরুল সুলতান কথা বলছে মোতালেব ভুঁইয়ার সাথে। আফিয়া সুলতান রুমাইসা কে নিয়ে মেহরিন কে দেখতে আসলো। আফিয়া বেগম প্রশংসা করলো মেহরিনের সাজের। মেহরিন লজ্জায় গুটিয়ে গেলো। রুমাইসা কয়েক টা ছবি তুলে নিলো মেহরিনের সাথে নিজের।
ইব্রাহিম বাড়ির আশপাশ টা দেখছিল৷ সোলেমানের পাশে তার দাদা চাচা আছেন। ইব্রাহিম বেলি ফুলের গাছের কাছে এসে দাঁড়ালো। পকেট থেকে ফোন টা বের করে ইয়াসিন কে ফোন লাগালো। ইয়াসিনের ফোন বাজছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। দশ বারো বার ট্রাই করলো। রিসিভ হলো না। আশ্চর্য ছেলেটা ফোন কেনো রিসিভ করছে না। ইব্রাহিম ইমন কে কল লাগালো। দুপুরের পর ইমনের শরীর আরো খারাপের দিকে গিয়েছিল। ইব্রাহিমের কল পেয়ে ফোন টা কোনো রকমে রিসিভ করে ব্যথাতুর গলায় বলল-
-” জ..জ্বি ভাইয়া বলুন।
-” গলা এমন শোনাচ্ছে কেনো? সব ঠিক আছে?
-” জ্বি। শুধু একটু জ্বর এসেছে।
-” ডক্টর দেখিয়েছো?
-” হুমম।
-” ইয়াসিন কি পাশে আছে? ও ফোন কেনো ধরছে না?
কথাটা বলেই ইয়াসিন মেহরিন দের বাড়ির দিকে তাকালো। জানালায় চোখ যেতেই দেখলো ঊর্মি নামের মেয়েটা সরে গেলো। মেয়েটা কি তাকে দেখছিলো তাকিয়ে? ইব্রাহিম তাকিয়ে রইলো জানালার দিকে। দেখলো ঊর্মি আবার উঁকি দিলো। ইব্রাহিম কে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঊর্মি লজ্জায় সরে আসলো। সানজিদা বেগম জানালেন ঊর্মি কে তার মা খুঁজছে। সেজন্য ঊর্মি বের হলো রুম থেকে।
ফোনের ওপাশ থেকে ইমন বলল-
-” আমি তো ইয়াসিনের ওখানে নেই। আপনার বাগান বাড়িতে। শরীর টা খারাপ দেখে রেস্ট নিচ্ছিলাম।
-” আচ্ছা ঠিক আছে রেস্ট নাও ঠিকমতন।
কথাটা বলেই ইব্রাহিম ফোন টা কেটে পকেটে ভরে পেছন ফিরে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে গেলে সদর দরজার কাছে এসেই ঊর্মির সাথে ধাক্কা খেলো। ঊর্মির পাতলা দেহ এই ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে ইব্রাহিম ধরে ফেলে। ঊর্মি ভয়ে চোখমুখ কুঁচকে ফেলে। ইব্রাহিম তাকালো সেই মুখের দিকে। মিষ্টি কালারের গ্রাউনে হাল্কা সাজ,ছোট চুল গুলো বেবি ক্লিপ দিয়ে আটকানো। একদম কিউট একটা বাচ্চা মনে হলো। ইব্রাহিম ঊর্মি কে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বলল-
-” ঠিক আছো বাচ্চা মেয়ে?
ঊর্মির চোখ বড়বড় হয়ে গেলো। সেদিন ভাবি বললো। আর আজ বাচ্চা মেয়ে বলছে!
-” আমাকে দেখে আপনার বাচ্চা মনে হয়?
-” অবশ্যই বাচ্চা মনে হচ্ছে।
-” কোন দিক দিয়ে?
-” সব দিক দিয়েই।
-” মোটেও না। আমি বড়।
-” কত বড় তুমি?
-” অনেক বড়।
-” বিয়ে হওয়ার মতন বড়?
ঊর্মি থতমত খেয়ে গেলো।
-” আশ্চর্য বিয়ের কথা বলছেন কেনো?
-” তুমি লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখছিলে কেনো আমায়? কি সমস্যা তোমার?
ঊর্মি জিহ্বা কামড়ে ধরলো। ইশ দেখেই ফেলছে।
-” মোটেও দেখিনি আপনায় লুকিয়ে-চুরিয়ে।
-” ওহ্ রিয়েলি? বাচ্চারা মিথ্যাও বলে।
ঊর্মির রাগ হলো।
-” বাচ্চা বাচ্চা করছেন কেনো? আমি আপনার বাচ্চা নই। অন্যদের বাচ্চা বলেন। আসছি।
ঊর্মি চলে গেলো রেগে। ইব্রাহিম ঊর্মির যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। কি এক আজব কারখানা৷ প্রথম দিন দেখে ভেবেছে গরীব দুস্থ, দ্বিতীয় দিন দেখে বন্ধুর বউ। আর তৃতীয় দিন দেখে জানলো এটা তার বন্ধুর বউ না। চতুর্থ দিন দেখে বাচ্চা বলে দিলো। না জানি পঞ্চম দিন কি বলে বসে ইব্রাহিম।
কাজি সাহেব আসলো আড়াইটার দিকে। দুই পরিবারের নিকট জানতে চাইলো দেনমোহর কত বাঁধবে। মোতালেব ভুঁইয়া বললেন-
-” ছেলের কাছে জিজ্ঞেস করে নিয়ে বাঁধুন।
কাজি সাহেব দেনমোহরের পরিমান নির্ধারণ করার জন্য সোলেমানের কাছে এগিয়ে এসে বলল-
-” নওয়াজ সোলেমান সুলতান সাহেব, আপনি মেহরিন তাবাসসুমকে বিয়ে করছেন। আপনি তার জন্য কত দেনমোহর নির্ধারণ করতে চাচ্ছেন?
সোলেমান কাজির দিকে তাকালো।
-” মেহরিন তো একজন শিক্ষিতা, ভদ্র, সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা,তার সম্মানের কোনো মূল্য টাকায় পরিমাপ করা যায় বলে আমি বিশ্বাস করি না। তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দেনমোহর যেহেতু থাকবে। আমি চাই, আপনি মেয়ের কাছে জিজ্ঞেস করুন,সে তার সম্মানের মূল্য হিসেবে কী চায়? আমি তা দিতে প্রস্তুত। মেয়ের চাওয়া-ই আমার দেনমোহর হবে।
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে আমিরুল সুলতান মুচকি হাসলেন। মোতালেব ভুঁইয়া প্রশান্তি পেলো মেয়ের জামাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে।
কাজী সাহেব মোতাবেক ভুঁইয়া কে নিয়ে মেহরিনের ঘরে আসলো। কাজি কে দেখে মেহরিন নড়েচড়ে বসলো। কাজি জিজ্ঞেস করলো-
-” মেহরিন তাবাসসুম, আপনি কি জানাতে পারেন আপনার জন্য আপনি কত দেনমোহর নির্ধারণ করতে চান?
মেহরিন মায়ের দিকে তাকালো। তার মা পাশে এসে বসলেন। নিচু স্বরে বললেন-
-” তুমি যা চাও দেনমোহরে সেটা নির্দ্বিধায় জানাও কাজি সাহেব কে।
-” কিন্তু মা আমি তো কিছু চাই না। আমি শুধু চাই আমার স্বামী যেন আমৃত্যু আমাকে সম্মান দেয়, আমার পাশে থাকে সব সময়। বাবার পর সে হোক আমার দ্বিতীয় আশ্রয়স্থল।
-” সেটা তো থাকবে। কিন্তু ইসলামে তো একটা নিয়ম আছে। দেনমোহর ধার্য করা হয়।
কাজি জিজ্ঞেস করলো-
-” কি হলো চুপ কেনো?
মেহরিন নম্র সুরে মাথা নত করে বলল-
-” আমার আলাদা করে কোনো মোহরানা ঠিক করার নেই। উনি উনার সাধ্য মতন যেটা দিবে আমি সেটাই মেনে নিব।
মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের দিকে মায়া ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো।
কাজি সাহেব মেহরিনের রুম থেকে আবার সোলেমানের রুমে আসলো। সোলেমানের সামনে বসে বলল-
-” মেয়ে আপনার সামর্থ্য মতন ধার্য করতে বলেছে। তবে..
-” তবে কি?
-” উনি মোহরানার সাথে আরেকটা কথা বলেছেন। আপনি যেন সারাজীবন তাকে সম্মান করেন৷ তার পাশে থাকেন আমৃত্যু।
সোলেমান গম্ভীর গলায় বলল-
-” তাহলে বাঁধেন মোহরানা ২৫ লক্ষ ২০ হাজার। আর আমি সেটা আজই পরিশোধ করে দিব।
কাজি সোলেমানের বলা মতন মোহরানা লিখলো।
তারপর মেয়ের রুমে আসলেন। মেহরিনের সামনে বসে বললেন-
-” মোতালেব ভুঁইয়া ও সানজিদা বেগম দম্পতির কন্যা মেহরিন তাবাসসুম, আপনি কি আমজাদ সুলতান ও মরিয়ম সুলতান দম্পতির পুত্র নওয়াজ সোলেমান সুলতানকে ২৫ লক্ষ ২০ হাজার টাকায় নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করতে সম্মত আছেন?
দেনমোহরের টাকা টা শুনে মেহরিন চমকালো ভিষণ। এত টাকা কেনো নির্ধারণ করেছেন? কাজি ফের জিজ্ঞেস করলো-
-” সম্মত আছেন?
সেরিন ঊর্মি এগিয়ে আসলো। মেহরিনের পাশে বসলো। সেরিন বোনের হাত ধরলো। সানজিদা বেগম ও এগিয়ে আসলেন।
-” ভয় পেও না৷ মস্তিষ্ক শান্ত করে সম্মতি হও।
মেহরিন ধুরু ধুরু বুকে জোরে শ্বাস নিয়ে বলল-
-” জ্বি আমি কবুল করছি।
তিনবার কবুল বললো মেহরিন। কাজী সাহেব এবার ছেলের কাছে গেলেন।
-” নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর থানার অধিবাসী আমজাদ সুলতান ও মরিয়ম সুলতান দম্পতির পুত্র নওয়াজ সোলেমান সুলতান, আপনি কি মোতালেব ভুঁইয়া ও সানজিদা বেগম দম্পতির কন্যা মেহরিন তাবাসসুমকে আপনার করা নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করতে সম্মত আছেন?
সোলেমান সময় ব্যয় না করে বলল-
-” জ্বি আমি কবুল করছি।
পরপর তিনবার বলা হলো এই বাক্য। কাজি সাহেব ঘোষণা করেন-
-” আলহামদুলিল্লাহ। উভয়ের সম্মতিতে এই বিয়ে সম্পন্ন হলো। এখন থেকে আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বৈধ, হালাল ও সম্মানিত বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।
বিয়ের অনুষ্ঠানের আশেপাশে মৃদু হাসির শব্দ, খুশির ফিসফাস, দোয়াভরা কণ্ঠ,সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে উঠলো এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা।
দাহশয্যা পর্ব ১১
মেহরিনের বুকের ধুকপুকটা কেমন যেন থেমে গেল। বহুদিনের অজানা শিহরণ, চাপা উত্তেজনা আর অচেনা দ্বিধার যে ঢেউটা বুকে বাজছিল,তাতে এবার যেন এক নিঃশ্বাসে প্রশান্তির বাতাস বয়ে গেল। এখন সে একজন বিবাহিত। লোকটাকে না দেখেই, তার কন্ঠ না শুনেই সে কবুল করেছে৷ নিজের নামটা বদলাবে কিনা জানে না, কিন্তু পরিচয়ের সবচেয়ে গভীর সংজ্ঞায় আজ নতুন এক ছোঁয়া লেগেছে। তার পাশে এখন একজন মানুষ থাকবে,যার নামের সাথে তার নতুন জীবনের শুরু।
মেহরিন অপেক্ষা করতে লাগলো সেই মানুষটার সাক্ষাৎকারের। দু চোখ ভরে দেখবে সেই মানুষটাকে মেহরিন। এতদিনের তৃষ্ণার্ত সে মিটাবে আজ।
