Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ১৩

দাহশয্যা পর্ব ১৩

দাহশয্যা পর্ব ১৩
Raiha Zubair Ripti

রাত ১টা ১৫।
সমস্ত পৃথিবী যেন নিঃশব্দে নিদ্রার চাদরে মোড়া। কৃত্রিম আলোয় আলোচিত কিছু রাস্তা, জানালার পর্দা ছুঁয়ে হালকা আলো এসে পড়ে দেয়ালে,একাকীত্বের রেখা এঁকে যায় নিঃশব্দে।
এই রাতটা মেহরিনের জন্য অন্যরকম হবার কথা ছিল। ভালোবাসার, প্রতীক্ষার, এবং এক নতুন শুরুর সাক্ষী হবার কথা ছিল। অথচ ঘরে শুধু নিঃসঙ্গতা আর এক বোঝা নীরবতা। শ্বশুরবাড়িতে সে এসেছে ঠিক সাড়ে দশটার দিকে, কিন্তু এখনও তার চোখ পড়েনি সদ্য বিবাহিত স্বামীর চোখে। দেখা হয় নি তার মুখটা। ঘড়ির কাঁটা যেন পিষে ফেলছে অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত।

তার হাতের মুঠোয় এখনও ধরা সেই চেক, মোহরানার চেক, যা তার স্বামী রেখে গেছেন।
কি বিচিত্র কপাল তার! কত স্বপ্ন বুকে নিয়ে এসেছিল সে, ভেবে রেখেছিল প্রথম দেখাতেই হয়তো সে তার স্বামীর চোখে খুঁজে পাবে নির্ভরতার আলো। কিন্তু তা তো হলো না। আকস্মিকভাবে কাজি সাহেব বিয়ে পড়িয়ে দোয়া শেষ করার পরই, সেই মানুষটি চলে যায়।
বিয়ে বাড়ির সকলেই এমন ঘটনায় বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের বর বউয়ের মুখ না দেখেই,বউ কে না নিয়েই চলে গেলো এভাবে!

মোতালেব ভুঁইয়া বেশ রুষ্ট ছিলেন এই বিষয় টা নিয়ে। কিন্তু আমিরুল সুলতান কি যেনো বলে বুঝালেন তাকে। মেহরিন তার বরের চলে যাওয়ার খবর শুনে এক প্রকার ঘাবড়ে গিয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য ভেবে নিয়েছিল বিয়েটা কি তাকে জোর করে করানো হয়েছিল? এসব আরো অনেক কল্পনা জল্পনা করছিল মেহরিন তখন।
আফিয়া সুলতান ও ভাবতে পারেন নি তার ছেলেটা এভাবে চলে যাবে। বিয়ের দিনেই কেনো এটা হতে হলো?
এই তো বিয়ের শেষের কথা,,বিয়ে পড়ানো শেষ হতেই দোয়া করা হলো। কাজি সাহেব বললেন ছেলেকে মেয়ের কাছে নিয়ে যেতে। সোলেমান ও দাঁড়িয়েছিল সদ্য বিয়ে করা বউয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। কিন্তু একটা ফোনকল আর তা হতে দিলো না। ইয়াসিনের ফোন এসেছে। ক্লাব ঘরে আগুন লেগেছে আর তার দলের ছেলেপেলে বেশ আহত।
কথাটা শুনেই সোলেমানের মাথা ৪০০ এঙ্গেলে ঘুরে গেলো। পায়ের রক্ত মাথায় উঠলো। বাবার দিকে তাকিয়ে জাস্ট বলল-

-” আই হ্যাভ টু গো টু ঢাকা,রাইট নাও।
ছেলের কথা শুনে হতবিহ্বল হলো আমিরুল সুলতান।
-” ঢাকা যেতে হবে মানে?
-” ক্লাব ঘরে আগুন লেগেছে। ছেলেপেলে আহত। আমাকে যেতেই হবে।
-” কিন্তু মেহরিন…
-” সামলে নাও তোমরা।
কথাটা শেষ করেই সোলেমান দরজা অব্দি গিয়ে কি ভেবে যেনো থেমে গেলো। তারপর পিছু ফিরে এগিয়ে এসে পকেট থেকে চেকের পাতাটা বের করলো। যেটা আসার আগে এনেছিল।
পাতায় টাকার এমাউন্ট লিখে সই করে আমিরুল সুলতানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল-

-” মোহরানার টাকা এটা। মেহরিন কে দিয়ে দিও। শীগ্রই ফিরে আসার চেষ্টা করবো।
সোলেমান ইব্রাহিম কে ইশারায় বেরোতে বলে চলে আসলো।
মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের জামাই চলে গেছে শুনে খুব রেগে গেলেন। এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন আমিরুল সুলতান কে। আমিরুল সুলতান দুঃখ প্রকাশ করে সব টা খুলে বুঝিয়ে বললেন। সব শুনে কিছুটা শান্ত হলো মোতালেব ভুঁইয়া। জেনেশুনেই তো মেয়েকে বিয়ে দিলো এমন ছেলের সাথে। যখন তখন বেরিয়ে যেতে হতে পারে।
মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের কাছে এসে বুঝিয়ে বললেন খুব জরুরি বিধায় সোলেমান কে চলে যেতে হয়েছে।
মেহরিন নীরবে শুনলো। এটা কেনো আজকেই হতে হলো তার সাথে?

জামাই ছাড়া মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি পাঠাতে চাইছিলো না মোতালেব ভুঁইয়া। আফিয়া বেগম জানালেন— ” কাল বা পরশু নিয়ে আসবে মেহরিন কে তিনি। তারপর সোলেমান ফিরলে তখন না হয় দুজনে এক সাথে আসবে।
মোতালেব ভুঁইয়ার প্রস্তাব টা পছন্দ হলো না। কিন্তু সানজিদা বেগমের জন্য মানা করতে পারলেন না। অগ্যত মেহরিন কে স্বামীর বাড়ি পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হলো। মেহরিন আসার সময় খুব কেঁদেছে। মোতালেব ভুঁইয়া কাঁদতে বারন করলেন। বললেন সে গিয়ে নিয়ে আসবে শীগ্রই। সানজিদা বেগম, ঊর্মি, সেরিন সবার চোখে জল।
মেহরিন এই সময়টাতে পেলো না তার প্রিয় মানুষটার শক্ত হাত। যার হাতে তার বাবা মেহরিনের হাত টা দিয়ে বলতো— আমার মেয়েটাকে সুখে রেখো। আমার নয়নের মনি সে। কখনও কষ্ট পেতে দিও না। তার কষ্ট আমি বাবা হয়ে সহ্য করতে পারবো না। কখনও বিরক্ত হলে আমার মেয়েকে আমার বাড়ি পাঠিয়ে দিও,মানা নেই। শুধু কষ্ট দিও না।
অনেক কথাই বলার ছিলো মোতালেব ভুঁইয়ার কিন্তু বলতে পারলো না। আমিরুল সুলতানের হাত ধরে বলল-

-” আমার মেয়েটাকে দেখে রাখবেন। কোনোদিন কোনো ভুল করলে আমায় জানাবেন। কখনও জোরে ধমক দিয়ে কথা বলি নি আমার মেয়ের সাথে। সেখানে কেউ উচ্চ আওয়াজে তার সাথে কথা বললে আমার বুক ফেটে যাবে৷ কখনও আমার মেয়েটাকে আপনাদের বাড়িতে রাখতে না চাইলে আমায় বলবেন আমি নিয়ে চলে আসবো আমার মেয়েকে।
আমিরুল সুলতান আশ্বাস দিয়ে বলল-

-” রুমাইসার মতনই মেহরিন আমার দ্বিতীয় মেয়ে। কোনো অযত্ন তার হবে না।
মেহরিন তখনও কাঁদছিল। বাবার কথা ভেবে,নিজের পাশে তার জীবনের দ্বিতীয় পুরুষ টি নেই ভেবে। সারা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে এসেছে মেহরিন। আফিয়া সুলতান অবশ্য মেহরিন কে সামলিয়েছিলেন গাড়িতে।
গাড়িটা এসে থামলো দোতলা বিশিষ্ট এক আলিসান বাড়ির সামনে। আফিয়া সুলতান গাড়ি থেকে বের হয়ে মেহরিন কে বের হতে বলল। মেহরিন বের হলো গাড়ি থেকে। তার শ্বশুর বাড়িতে পদার্পণ হলো তার স্বামী ব্যতিত,একা।
মেহরিন কে সোজা নিয়ে আসা হয়েছিল সোলেমানের রুমে। মেহরিন আশা করেছিল রুমে অন্তত একটি হলেও তার স্বামীর ছবি দেওয়ালে থাকবে। কিন্তু তার স্বামীর ছবি তো দূরে থাক একটা ঘড়ি অব্দি নেই।

মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেলে বেলকনি থেকে পুরো রুমে চোখ বুলালো। খুবই সুন্দর করে পরিপাটি করে গুছানো। কোনো ফুলে সাজানো হয় নি রুম টা৷ ড্রেসিং টেবিলের দিকে নজর যেতেই দেখলো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পারফিউম সাজানো। ড্রেসিং টেবিলের ওপর সাজানো পারফিউমগুলো মেহরিনের দৃষ্টি টানলো। মেহরিন চেক টা বালিশের নিচে রেখে এগিয়ে গেলো। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পারফিউম । মেহরিন বোতল গুলোর মধ্যে থেকে একটা বোতল হাতে নিয়ে বোতলের গায়ে থাকা নামটা পড়লো, নাম টা হলো শুমুখ। পৃথিবীর সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ পারফিউমের ভেতর থাকা একটি পারফিউম। মেহরিন একটু হাতে স্প্রে করে ঘ্রাণ টা শুঁকলো। মাতাল করে দেওয়ার মতন একটা সুগন্ধ। বোতল টা জায়গা মতন রেখে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখলো। এই চেহারাটা আজ তার চেনা নয়, কিন্তু একেবারেই অচেনাও নয়। নীল রাঙা শাড়িতে,হাতে থাকা চুড়িতে একদম বিবাহিত নারী মনে হচ্ছে। চোখে এক ধরনের মায়া জমেছে, ঠোঁটে লুকানো একরাশ ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তা।

তার বুকের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা হঠাৎ মুখ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো।
এই সাজগোজ, এই ঘর, এই বিছানা সবকিছু পেয়েছে সে। কিন্তু যাকে পাওয়ার কথা ছিল, সেই মানুষটার মুখটা এখনও দেখা হলো না তার।
আচ্ছা সেও কি তাকে দেখেনি? তার লাল শাড়িতে সাজা ঘোমটার আড়ালে থাকা মুখটা?
বিয়ের একদিন না পেরোতেই কত চেঞ্জ নিজের বাহ্যিক রূপের। মেহরিনের কেমন যেন এই সময়টাতে আবার হাসিও পেলো। তার পুরো বিয়ের জার্নিটাই কেমন একটা অদ্ভুত তাই না? মেহরিন লম্বা একটা শ্বাস টেনে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালো। তারপর বিরবির করে বলে উঠল-

-” আপনাকে দেখার তৃষ্ণা কবে মিটাবেন আপনি? আমি আপনাকে দেখতে চাই, আপনাকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে অনুভব করে বুঝতে চাই একটা হালাল স্পর্শ কেমন হয়। আপনার শরীরের ঘ্রাণ শুঁকতে চাই। আপনার চোখে চোখ রেখে বুঝতে চাই স্বামী নামক মানুষ টা কেমন হয়। পরিশেষে আপনার সাথে সারাজীবন কাটাতে চাই। আপনার সদ্য বিয়ে করা বউটার আর্জি যেনো আপনার হৃদয় অব্দি পৌঁছায়।
মেহরিনের নিজের এই অবস্থা দেখে এখন একটা গানই গাইতে ইচ্ছে করছে গলা ছেড়ে—

-“ তোমারে দেখিবার মনে চায়,
দেখা দাও আমায়…
তোমারে দেখিবার মনে চায়।
দেখা দিয়া শান্ত কর,
নইলে আমার প্রাণ যায়…”
ঢাকার ক্লাব ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সোলেমান। ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিভাচ্ছে। এখন ধোঁয়া উঠছে ক্লাব ঘর টা থেকে। ভালোমতই লেগেছিল আগুন টা। ভেতরের সব নথিপত্র আসবাব পুড়ে গেছে।
ইয়াসিন মাথায় চোট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতেও বেশ ব্যথা। সোলেমান ক্লাব ঘরটার দিকে তাকিয়ে বলল-

-” আ’গুন টা লাগলো কি করে?
ইয়াসিন এক ঢোক গিলে বলল-
-” মহসিন আলীর লোকজন বোধহয় লাগিয়েছে ।
সোলেমান রেগে বলল-
-” তোরা থাকতে এটা হলো কি করে? কোন বা’ল ফালাতে গিয়েছিলি?
-” ভাই আমি হসপিটালে গিয়েছিলাম।
-” হসপিটালে কি তোর? বাচ্চা ডেলিভারি করতে গেছিলি তুই?
-” না ভাই। আসলে ইমন ভাই অসুস্থ ছিলো। মাত্রাতিরিক্ত জ্বরের কারনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিল।
-” এই ইমন টা কে? তোর দুলাভাই লাগে? ও অসুস্থ তাতে তোর কি?
পাশ থেকে ইব্রাহিম চমকালো ইমনের কথা শুনে।

-” ইমন হসপিটালে!
সোলেমান বিরক্ত হয়ে বলল-
-” তুই চমকাচ্ছিস কেনো? কে এই ছেলে?
-” আমার ড্রাইভার ছেলেটা। ওর নাম ইমন।
-” ওহ্ বেঁচে আছে?
ইয়াসিন মাথা নত করে বলল-
-” হসপিটালে ভর্তি আছে।
-” তুই না হয় গিয়েছিলি হসপিটালে। আর গুলো কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিল?
-” ভাই ওরা যদি বুঝতো যে আগুন লাগাবে ক্লাব ঘরে তাহলে কি আর বের হতো নাকি ক্লাব ঘর থেকে। ক্লাব ঘরের পাশের রাস্তা টায় কিছু পোলাপান এসে মারামারি করছিলো। লিমনরা তখন ক্লাব ঘরে বসে তাস খেলছিল। আওয়াজ শুনে বের হয়ে ওদের থামাতে গেলে উল্টা ওড়াই ওদের পেটাতে শুরু করে। লিমন ফোন দিয়ে আমায় জানালে আমিও চলে আসি হসপিটাল থেকে। এসে দেখি মারপিট হচ্ছে। আমি এগিয়ে থামাতে আসলে আমায়ও আঘাত করে। এই ঝামেলা চলাকালীন ই হঠাৎ দেখি ক্লাব ঘরে আগুন।

-” তুই বুঝলি কি করে এটা মহসিন আলীর কাজ?
-” ওরা ছাড়া আপনার আর কোনো শত্রু তো নাই যে করবে।
-” তুই জানিস ক’জনের কথা হু? এই কাজ ওরা করে নি।
-” আপনার এটা মনে হলো কেনো ভাই?
-” ওদের বুকে এত সাহস নেই যে এই সময়তে আগুন লাগাবে৷ ওরা ভিতুর দল ওদের কাজ হয় চোরের মতন লুকিয়ে-চুরিয়ে। ওরা করে নি।

-” তাহলে কে করেছে ভাই?
সোলেমান জবাব দিলো না। তবে রাগে চোখ মুখ শক্ত হয়ে আছে। কি ভেবেছে কি এভাবে ক্লাব ঘরে আগুন লাগিয়ে নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলে সোলেমান কে দমিয়ে রাখা যাবে? সোলেমান এত কাঁচা খেলোয়াড় না যে ক্লাব ঘরে সেসব নথিপত্র রেখে দিবে এদের মতন মশাদের পুড়িয়ে ফেলার জন্য।
ধানমন্ডির ২ এ নিজ বাড়ির সোফায় বসে টিভিতে নিউজ দেখছে মহসিন আলী। নিউজে দেখানো হচ্ছে এমপি সোলেমান সুলতানের ক্লাব ঘরে আগুন লাগার দৃশ্য। মহসিন আলী হাসলো। তার ছেলে এত ফাস্ট? কথা তো ছিলো মাঝরাতে করবে।
কথাগুলো ভাবতেই দরজা খোলার আওয়াজ শুনে পেছন ফিরে দেখলো বড় ছেলে শেখর আসছে হেলতে দুলতে। মহসিন আলী প্রাউড ফিল করে বলল-

-” সাব্বাশ মেরা বেটা। আগুন টা বেশ ভালো মতনই লাগিয়েছিলি।
শেখরের কপাল কুঁচকে আসলো।
-” কিসের আগুন?
-” সোলেমানের ক্লাবে।
-” সোলেমানের ক্লাবে? আমি তো কেবল ছেলেদের পাঠালাম আগুন লাগাতে।
-” তাহলে ওরা কি লাগায় নি আগুন?
শেখর পকেট থেকে ফোন দিলো ছেলেদের। জিজ্ঞেস করলো আ’গুন লাগিয়েছে কি না। তারা বলল-” না তারা আগুন লাগায় নি। এখানে এসেই দেখছে অলরেডি আগুন নেভানোর কাজ চলছে।
শেখর চিন্তিত হলো। তারা না করলে এটা কে করেছে? সোলেমানের অন্য কোনো শত্রু নাকি? খোঁজ নিতে হবে৷ কারন শত্রুর শত্রু হয় বন্ধু।
শেখর রুমে আসলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পুরো রুমে চোখ বুলালো। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে তার বিবাহিত বউ প্রেমা। শেখর হাতের কোট টা ছুঁড়ে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যায় প্রেমার দিকে।
প্রেমা জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে জীবনের অংক কষছিল। তার জীবনের অংকের কোনো সমাধানই সে পাচ্ছে না। এসব ভাবার মাঝেই হুট করে পুরুষালী দেহের ছোঁয়া পেতেই শরীর যেন ঝলসে গেলো। এই ছোঁয়া টাকে ভীষণ ঘৃণা করে প্রেমা।
শেখর প্রেমার গলায় নাক ঘষে বলল-

-” কি ভাবছো এখানে দাঁড়িয়ে?
শেখরের ছোঁয়া ঘাড় থেকে নেমে এবার বিভিন্ন জায়গায় বিচরণ করতে লাগলো। প্রেমার দম আঁটকে আসলো। প্রেমার নীরবতা মোটেও পছন্দ হলো না শেখরের। সেজন্য প্রেমা কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে গাল চেপে ধরে বলল-
-” চুপ করে আছিস কেনো? তোর কোন ভা’তারের কথা ভাবছিলি?
প্রেমা ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে ফেললো। শেখরের ভাষার টোন শুনলে মাঝেমধ্যে বমি চলে আসে প্রেমার।
-” লাগছে আমার।
শেখর আরো জোরে চেপে ধরে বলল-
-” লাগার জন্যই ধরেছি। তোর লাং সোলেমান কে নিয়ে ভাবছিলি?
-” ছাড়ুন আমায়। ব্যথা লাগছে আমার।
-” ব্যথা তো পাবি এখন। রুমে চল।
-” কেনো?
-” কেনো জানিস না? বিছানা কাঁপানোর জন্য। চল।
-” আমি অসুস্থ।
-” তাতে আমার কি? আমার তোকে এখনই লাগবে।
শেখর হাত ধরে টানতে শুরু করলো প্রেমাকে। প্রেমার আসলেই আজ শরীর খারাপ। পিরিয়ড শুরু হয়েছে। শেখর হাত ছাড়িয়ে দিয়ে কিছুটা উচ্চ আওয়াজে বলল-

-” বলছি তো শরীর খারাপ আমার। কেনো বুঝছেন না। আমি পারবো না আজ।
এই সামান্য কথা বলাটাই যেন কাল হয়ে দাঁড়ালো প্রেমার। শেখর প্রেমার চুলের মুঠি ধরে রুমের ভেতর নিয়ে এসে ফ্লোরে ফেলে প্যান্টের বেল্ট খুলে পেটাতে শুরু করলো। আর রাগে বলতে লাগলো-
-” তোর তো সবদিনই শরীর খারাপ! যখনই আমার দরকার পরে তখনই এসব অজুহাত বানাস।
পুরো বাড়ি প্রেমার চিৎকারে মুখর হয়ে উঠলো। কেউ আসলো না প্রেমাকে বাঁচাতে। প্রেমা বারবার নিষেধ করলো পেটাতে। কিন্তু শেখর শুনে নি।পাষাণ এক প্রাণী হয়ে উঠেছে সে। প্রেমার এই কাতর মিনতি, কালচে দেহের ব্যথায় ছটফট,কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করলো না।

পেটানো শেষে যখন ক্লান্ত হলো শেখর তারপরই সে প্রেমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। প্রেমার ঋতুমতী দেহ, ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা প্রাণ সবকিছু উপেক্ষা করে তার সাথে জোর করে শারীরিক চাহিদা মেটাতে শুরু করলো। প্রেমা ব্যথায় কাতরাতে লাগলো। প্রেমার ঠোঁট কেঁপে ওঠে, দেহ থরথর করে কাঁপে। চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে চুপচাপ। শরীর আর জোর পায় না। মনে হলো সে মরে যাচ্ছে।

শরীরিক নির্যাতনের কিছুক্ষণ পর, প্রেমার যৌনাঙ্গ দিয়ে ধীরে ধীরে রক্তপাত শুরু হয়। ফ্লোরের এক কোণ রক্তে ভরে যায়। প্রেমা মহান সৃষ্টি কর্তার কাছে নিজের মৃত্যুর আর্জি জানায়। তার মৃত্যু হোক এই নরক যন্ত্রণা থেকে।
দীর্ঘ ২ ঘন্টা শারীরিক নির্যাতনের পর শেখর প্রেমা কে ছেড়ে ওয়াশরুমে গেলো। প্রেমা নীরবে তাকিয়ে রইলো ফ্লোরের দিকে। ওঠার শক্তি টাও পাচ্ছে না। খুব কষ্ট চেষ্টা করে কোনোরকমে উঠে জামাকাপড় গুলো পড়ে নিলো। হাতে মারের দাগ গুলো স্পষ্ট হচ্ছে। প্রেমা খোঁড়াতে খোঁড়াতে দেওয়াল ধরে অন্য রুমে চলে গেলো। এই ঘরটাতে প্রেমা থাকে প্রায় সময়। আলমারি থেকে জামা বের করে ওয়াশরুমে গেলো। পানির ট্যাপ ছেড়ে দিতেই পানি উপর থেকে প্রেমার শরীরে পড়লো। প্রেমার মনে হলো এ যেন পানি না সুঁচ পড়ছে তার শরীরে। ওয়াশরুমে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখলো প্রেমা গালের এক পাশ টা ফুলে গেছে। যৌনাঙ্গ জ্বলে পুড়ে ছারখার হচ্ছে।
প্রেমা নিজের এমন করুন অবস্থা দেখো ডুকরে কেঁদে উঠলো৷ এই কান্না এবার আর বাহিরে যেতে পারলো না। পানির শব্দ আর কান্নার শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো।

এই জীবন থেকে কবে মিলবে মুক্তি? তার যে এ জীবন আর সহে না। আজ খুব মায়ের কথা মনে পড়লো প্রেমার। তার প্রেমা ভালো নেই। সে কি দেখতে পাচ্ছে তা? তার কি বুক ফেটে আসছে মেয়ের এমন অবস্থা দেখে?
প্রেমা অনেক টা সময় ধরে কাঁদলো। তারপর ভেজা জামা বদলে শুকনো জামা পড়ে বাহিরে আসলো। বিছানার উপরে থাকা ফোনটা অন করলো ক’টা বাজে তা দেখার জন্য। কিন্তু তারিখে গিয়ে চোখ আঁটকে গেলো৷ আজ তো সোলেমানের বিয়ে ছিলো। সোলেমান বুঝি তার বিবাহিত বউটাকে নিয়ে এই রাত টা নিজেদের মতন করে কাটাচ্ছে।
প্রেমার বুক ভারী হয়ে আসলো। চোখ জ্বলে টইটম্বুর হলো। এগিয়ে এসে বেলকনিতে দু হাঁটু গেড়ে বসলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে ব্যথাতুর গলায় বলল-

-” প্রথম যেদিন তোমাকে দেখি। সেদিন বুঝতে পারি নি তুমি মানুষটা একদিন আমার না পাওয়ার আক্ষেপে থেকে যাবে। এই তো আজ থেকে বাস্তবে তুমিও অন্য কারো হয়ে গেলে, আর সারাজীবনের জন্য আমার কল্পনাতে থেকে গেলে। জীবনে চলার পথে অনেক কিছুই হারালাম আমি জানো? তার মধ্যে সবচেয়ে পছন্দের মানুষ ছিলে তুমি। আমাদের গল্পটা ছিলো খুব অল্প সময়ের জন্য। তারপরও আমি তোমাকে সারাজীবন মনে রাখবো। তুমি না বরং সুখী হও। একটাই তো জীবন আমি না এদিক-সেদিক করে ঠিক পাড় করে দিব।

দাহশয্যা পর্ব ১২

প্রেমা থেমে গেলো। বুকে হাত চেপে ধরে অসহায়ের মতন করে বলল- ” তারপরও জানো মাঝে মধ্যেই ইচ্ছে করে কাঁচের চুড়ির মতন করে কিছু নিয়মকানুন ভেঙে তোমার কাছে চলে আসি। জানি আগের মতন বাহুতে জড়িয়ে ধরবে না। ভালোও বাসবে না। তারপরও ইচ্ছে করে। ইচ্ছেরা তো আর আমার কথা শুনে না। আচ্ছা তোমার বউ কি জানে? সে আজ তোমারে পাওয়ার সাথে সাথে যে আমার দুনিয়াটাও নিজের নামে করে নিয়ে নিলো। তোমায় একজন পেয়ে জিতলো আর একজন বিভৎস ভাবে হারলো। আমার কি কপাল দেখো। সংসার করি একজনের সাথে অথচ আমার মন মস্তিষ্ক ভাবতে থাকে তোমাকে নিয়ে।

দাহশয্যা পর্ব ১৪