Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ১৪

দাহশয্যা পর্ব ১৪

দাহশয্যা পর্ব ১৪
Raiha Zubair Ripti

শ্বশুর বাড়িতে এই প্রথম মেহরিনের সকাল। ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলতেই আকস্মিক রুমাইসাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা ভরকে গেলো। পাশেই বসে থাকা রুমাইসা তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তেই বুকের ভিতরটায় কেমন একটা ধাক্কা লাগলো। নিজের শরীরের দিকে অদৃশ্য এক শঙ্কা নিয়ে চোখ ফেলল সে। শাড়ির আঁচল ঠিকঠাক মতোই আছে কিনা দেখলো, হ্যাঁ, ঠিকই আছে।
তবুও একরকম অস্বস্তি চাপা দিতে শাড়ির আঁচলটায় হাত বুলিয়ে নিলো আর সেই ছুতোয় মুখে আনলো একটা মৃদু হাসি। কণ্ঠটা একটু নিচু রেখে বলল-

– “খুব দেরি করে উঠেছি বোধহয়, তাই না আপু? আসলে বুঝতে পারি নি এত দেরি হবে।
ঘড়ির কাঁটা বলছে তখন মাত্র ৮টা ৫।
রুমাইসা চোখে একরকম নরম প্রশ্রয় নিয়ে বলল-
-” একটুও দেরি হয়নি মেহরিন।
মেহরিন প্রতিত্তোরে কিছু বললো না।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে রুমাইসা আবার বলল-
-“আমি আসায় তোমার ঘুমটা ভেঙে গিয়েছে, তাই না?
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নেড়ে জানালো-
-“না না, আপু।
রুমাইসা ঠোঁটের কোণে একরকম বুঝে ফেলার হাসি এনে বলল-
-“জানি তো।
মেহরিন তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করে বলল-
-“ভুল বুঝছেন আপু।
এই কথাটুকু বলে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো সে। পা দুটো যেন একটু থমকে গেলেও নিজেকে শক্ত করেই আবার বলল-

-“আমাকে রান্নাঘরটা একটু দেখিয়ে দেবে আপু?
রুমাইসা এবার সত্যি সত্যিই খানিকটা চমকে উঠলো। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল-
-“কেনো? চা-কফি খাবে?
মেহরিন শান্তভাবে বলল-
-” না, আসলে এখন তো আমি এ বাড়ির বউ…
রুমাইসা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল-
-” তো?
মেহরিন একটু থেমে গলায় যত্ন এনে বলল-
-” না মানে… সকালের রান্নাটা তো…
রুমাইসা এবার কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে কড়া সুরে বলল-
-” একদমই না। তোমার করতে হবে না এসব। আম্মু বলে দিয়েছে তোমার রান্নাঘরে ঢোকা নিষেধ। রান্নার সব কাজ আম্মু আর বুয়া সামলে নেবে। তুমি খাবে, পড়বে আর ঘুরে বেড়াবে।
মেহরিন মৃদু হাসলো।

-” চিনিয়ে তো দাও আগে রান্নাঘরটা। রান্না করি না করি, সেটা তো পরের ব্যাপার।
রুমাইসা খানিকক্ষণ মেহরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হাত ধরে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে গেলো তাকে।
রান্নাঘরে তখন আফিয়া সুলতানা ব্যস্ত হাতে নাস্তা বানাচ্ছেন। মেহরিনকে দেখে চমৎকার এক গলায় বললেন-
-” এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়লে যে, মেহরিন!
মেহরিন মাথার কাপড়টা খানিকটা টেনে নিয়ে নম্রভাবে জবাব দিল-
-” আমি রোজ এর চেয়েও সকালে উঠি।
আফিয়া সুলতানা বিস্মিত চোখে বললেন-
-” এত সকালে উঠে কী করো?
মেহরিন চোখ নামিয়ে কোমল গলায় বলল-
-” ঘরদুয়ার, বড় উঠান ঝাড়ু দেই। এঁটো থালাবাসন মাজি, আম্মার হাতে হাতে কাজ করি।
আফিয়া সুলতানা হেঁসে ফেললেন,।
-” সব কাজই পারো তাহলে?
-” জ্বি, আম্মা প্রায় সবই শিখিয়েছে।
-” মাশা-আল্লাহ।
তারপর একটু এগিয়ে এসে মেহরিন নিজ থেকেই বলল-
-” আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি?
আফিয়া সুলতানা মমতায় ভরা কণ্ঠে বললেন,

– -” না না মা,তুমি ওখানটায় বসো। টিভি দেখো। বাড়িটা ঘুরে দেখো। রুমাইসা, মেহরিনকে বাড়িটা ঘুরিয়ে দাও।”
রুমাইসা মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিল।
মেহরিন একটু হাসলো। রুমাইসা বাড়ির প্রতিটা কোনা মেহরিন কে দেখালো। এই সুলতান ভিলায় কে কে থাকে সেটা বলল। এই বাড়িতে তার দাদা আনোয়ার সুলতান, বাবা আমিরুল সুলতান, আর মা আফিয়া সুলতান থাকেন। আর ঢাকায় তার ভাই সোলেমান, চাচা বাশার সুলতান, আর কাজিন এজওয়ান সুলতান থাকে। যে গত বছর এসেছেন দেশে। মেহরিন সব টা শুনলো। করিডরের জানালা দিয়ে বাহিরে তাকাতেই দেখলেন আনোয়ার সুলতান বাগানে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। পাশেই বাশার সুলতান বসে ফোন টিপছে। আনোয়ার সুলতান হাঁক ছেড়ে ডেকে চা চাইলেন। মেহরিন রুমাইসা কে উদ্দেশ্য করে বলল-

-” চা টা আমি দিয়ে আসি? খুব ভালো বানাতে পারি এটা আমি।
রুমাইসা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।কেবলই সে আর মা মেহরিন কে বুঝালো রান্না ঘরে তার যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু মেয়েটা সব ভুলে গেলো!
-” বেশ চলো।আজ তোমার হাতে বানানো চা খাব।
মেহরিনের চোখ মুখে খুশির ঝিলিক দেখা গেলো। রান্না ঘরের সামনে এসে রুমাইসা মাকে বলল-
-” মা দাদাজান চা চাচ্ছে। মেহরিন কে বানাতে দাও।
আফিয়া সুলতান বাঁধা দিয়ে বলল-
-” আমি বানিয়ে দিচ্ছি। মেহরিনের কেনো বানাতে হবে কষ্ট করে।
মেহরিন এগিয়ে গিয়ে চুলোয় পানি বসিয়ে বলল-
-” আমার একটুও কষ্ট হবে না মা। আমি রোজ চা খাই বানিয়ে।
আফিয়া সুলতান মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” তুমি ভিষণ চা প্রিয় তাই না মেহরিন?
মেহরিন টেনে বলল-
-” ভীষণণণ।
পাশ থেকে রুমাইসা বলল-
-” ভাইয়া হেইট চা।
কথাটা মেহরিনের কান অব্দি যেতেই হাত থেমে গেলো।
-” উনি চা খান না?
-” না। ভাইয়া ব্লাক কফি খায় শুধু। চা দেখতে পারে না। চা ভালো লাগে না তার। তার কাছে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর কোনো পানীয় খাবার যদি হয়ে থাকে তাহলে সেটা একমাত্র চা।
মেহরিনের মুখের হাসি টা বাতাসের ন্যায় উড়ে চলে গেল। মেহরিন তো এর বিপরীত। চায়ের প্রতি এমন বাক্য শুনে মন খারাপ হলো।
চা ভালো লাগে না, এই চারটি শব্দে কীভাবে এতটা শূন্যতা থাকতে পারে, সে ভেবে পেল না।
চা তো তার কাছে কখনই নিছক পানীয় ছিল না।
চা মানে তো মেহরিনের কাছে ভোরের নিস্তব্ধতা, বিকেলের একাকিত্ব, রাতের দীর্ঘশ্বাস।
চা মানে বইয়ের পাতা, জানালার ধারে বসে থাকা, কিংবা মনখারাপের দিনে নিজেকে একটু ভালোবাসা।
সে কিছু বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল ফুটন্ত গরম পানির দিকে। যেভাবে কেউ প্রিয় কবিতার ভুল ব্যাখ্যা শুনে চুপ করে থাকে। মেহরিন নিজেই নিজেকেই মনে করিয়ে দিল,সব অনুভব সবার জন্য নয়।
তবু মনটা কেমন খালি খালি লাগল। খুব যত্ন করে চা বানিয়ে দাদা শ্বশুরের কাছে নিয়ে গেলো। মৃদু কন্ঠে বলল-

-” আপনার চা দাদু।
আনোয়ার সুলতান খবরের কাগজের ফাঁকে তাকালো৷ নাতবউ কে দেখে খবরের কাগজ পাশে ভাজ করে চায়ের কাপ টা মেহরিনের হাত থেকে নিয়ে বলল-
-” তুমি কষ্ট করে নিয়ে আসলে কেনো মেহরিন।
কথাটা শেষ করেই চায়ের কাপে চুমুক দিলো আনোয়ার সুলতান। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকের চা টা ভীষণ আলাদা। ভীষণ মজার। মেহরিন বাশার সুলতানের দিকে চা বাড়িয়ে দিলেন। আনোয়ার সুলতান তৃপ্তির সাথে খেয়ে বলল-

-” রহিমার হাতে বানানো চা আজ এত মজা হলো কি করে!
বাড়ির সদর দরজা দিয়ে রুমাইসা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বেড়িয়ে এসে বলল-
-” রহিমা খালা বানায় নি দাদু।
-” তাহলে কে বউমা?
-” না মেহরিন বানিয়েছে। আর চায়ের টেস্ট টা জাস্ট ওয়াও তাই না দাদু?
আনোয়ার সুলতান পুরো চা টা শেষ করে বলল-
-” আসলেই চা-টা দারুন। নাতবউ তুমি তো লোভ লাগিয়ে দিলে। এখন তো রোজ খেতে ইচ্ছে করবে তোমার হাতের চা।
মেহরিন মৃদু হেঁসে বলল-

-” আমি রোজ বানিয়ে খাওয়াবো আপনায়।
আনোয়ার সুলতান হেঁসে বলল-
-” তাহলে তো বেশ ভালোই হয়। রুমাইসা।
-” হুমম দাদু বলো।
-” সোলেমান ফোন করেছিল?
-” না দাদু এখনও করে নি।
-” মেহরিনের সাথে কথা হয় নি?
-” না।
-” আচ্ছা আমি দেখছি। মেহরিন নাতবউ ঘরে যাও। তোমার স্বামী টাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
মেহরিন সম্মতি প্রকাশ করে রুমে আসলো। বাশার সুলতান চায়ের কাপ টা রেখে বলল-
-” সোলেমান বোধহয় ভীষণ ব্যস্ত সেজন্য দিতে পারে নি ফোন বাবা।
-” জীবন টা শুধু রাজনীতি করার জন্য নয়। সোলেমান এখন বিয়ে করেছে৷ তার উচিত বউয়ের জন্য এখন সময় বের করা। বউয়ের খোঁজ খবর নেওয়া। মেয়েটা নেহাত ভালো,শান্তশিষ্ট, নরম বলে চুপ আছে। মেনে নিচ্ছে। বাশার সুলতান তপ্ত শ্বাস ফেললেন। সোলেমানের কাছে যে সবার আগে রাজনীতি তারপর বাকিসব।
নিজের আলিশান বাড়ির বাগানে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলো সোলেমান। হাতে তার ব্লাক কফি। ইব্রাহিম হাসপাতাল থেকে ইমন কে দেখে ফিরেছে। ইব্রাহিম সোলেমানের পাশে বসে সোলেমান কে কিছু ভাবতে দেখে বলল-

-” কি ভাবছিস?
-” ভাবছি তো অনেক কিছুই। কোনটা রেখে কোনটা বলবো?
-” দিন কে দিন তোর শত্রু বাড়তেই চলছে সোলেমান।
-” বাড়ুক।
-” বাড়ুক মানে! তোর জীবন বিপন্নের দিকে চলে যাচ্ছে।
-” তুই বাঁচায় নিবি তোর জান দিয়ে।
বাঁকা চোখে তাকিয়ে কথাটা বললো সোলেমান। ইব্রাহিম সোলেমানের কাঁধে হাত রেখে বলল-
-” আর আমি মরে যাওয়ার পর বাঁচাবে কে তোরে?
ইব্রাহিমের এমন ইমোশনাল কথাবার্তা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সোলেমান কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল-
-” চিন্তা করিস না,আমার আগে তুই ম’রবি না। ম’রলে আমার পরই ম’রবি তুই। তাই সেন্টি খাস না।
ইব্রাহিম তপ্ত শ্বাস ফেললো। কোনো কথাই সিরিয়াস নেয় না ইব্রাহিমের।
-” তুই কিছু ভুলে যাচ্ছিস সোলেমান।
-” কি ব্রেকফাস্ট? কেবল তো ৯ টা বাজে।
ইব্রাহিম ফের তপ্ত শ্বাস ফেললো৷ সে কি ব্রেকফাস্টের কথা বলেছে?

-” গতকাল কি হয়েছে তোর ভুলে গেছিস?
-” না ভুলি নাই। শো’য়ারের বাচ্চা রা আ’গুন ধরায় দিছিলো ক্লাব ঘরে।
ইব্রাহিম ঠোঁট কামড়ে ধরলো। সব মনে থাকে সোলেমানের শুধু একটা কথা ব্যতিত।
-” আমি ক্লাব ঘরের কথা বলিনি সোলেমান।
-” তাহলে কিসের কথা বলিস?
-” কাল তুই বিয়ে করেছিস, তোর এখন একটা বউ আছে৷ তাকে তুই ওভাবেই ফেলে এসেছিস। তোর কি মাথায় নেই তার কথাটা? মেয়েটার কি হলো তুই চলে আসার পর।
সোলেমানের মনে পড়লো মেহরিনের কথা। গতকাল সে বিয়ে করেছে৷ একটুও মনে ছিলো না খোঁজ খবর নেওয়ার। নিজের এমন উদাসীনতা বুঝতে পেরে তেমন একটা খারাপ লাগলো না। তবে তার উচিত ছিলো খোঁজ নেওয়া। কি করে ভুলে গেলো সে?

-” এতদিন সিঙ্গেল ছিলাম তো। হুট করে যে মিঙ্গেল হয়ে বসে আছি তা মনেই ছিলো না৷ জীবনের ডিভাইস টা আপডেট দিতে হবে রে ইব্রাহিম।
-” ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নে বউয়ের।
সোলেমান বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল-
-” বন্ধুর বউ নিয়ে এতো দরদ কেনো তোর ইব্রাহিম। আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই দেখছি আমার থেকে আমার বউয়ের চিন্তা তোর বেশি হয় ৷ উল্টাপাল্টা কিছু ভাবছিস না তো আবার আমার বউ নিয়ে?
-” আস্তাগফিরুল্লাহ। বন্ধুর বউ আমার মায়ের পেটের বোন৷
-” গুড। যা এখন চোখের সামনে থেকে৷ একা থাকতে দে।
ইব্রাহিম চলে গেলো। মেহরিন কে যে ফোন দিবে মেহরিনের ফোন নম্বর তো নেই। কাকে ফোন দিয়ে খোঁজ নিবে? সোলেমান পকেট থেকে ফোন বের করে রুমাইসা কে ফোন করলো। রুমাইসা নিজের রুমে বসে ফোন স্ক্রোল করছিলো। ভাইয়ের ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি করে রিসিভ করে বলল-

-” আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।
-” ওয়ালাইকুমুস সালাম। কি করছিস?
-” কিছু না। তুমি কি করছো?
-” বসে আছি।
-” কিছু বলবে?
-” হুমমম।
কথাটা বলেই সোলেমান চুপ হয়ে গেলো। রুমাইসা ভাইয়ের নীরবতা একটু হলেও বুঝলো। তাই নিজ থেকেই বলল-
-” ভাইয়া তুমি কিন্তু কাজ টা ঠিক করো নি। মেহরিনের খোঁজ অব্দি নিলে না৷ মেয়েটার সাথে কথা বলো। সে যে তোমার অপেক্ষায় আছে।
লাস্টের কথাটা কেনো যেনো সোলেমানের বুকে গিয়ে লাগলো। অপেক্ষা করছে মেয়েটা তার জন্য!
রুমাইসা ফোনটা নিয়ে মেহরিনের রুমে গেলো। মেহরিন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো রুমাইসা এগিয়ে গিয়ে বলল-
-” মেহরিন ভাইয়া ফোন করেছে কথা বলো।
ফোনটা মেহরিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে আসলো রুমাইসা। মেহরিনের যে হাতে ফোন সেই হাত কাঁপছে। বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম শব্দ করছে। ফোনটা কানে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-

-” আসসালামু আলাইকুম।
মেহরিনের কন্ঠস্বরে সালাম শুনে সোলেমানের হৃদয়ে যেন এক পশলা বসন্ত নেমে এলো। কন্ঠ টা এত মিষ্টি বাচ্চা বাচ্চা কেনো? সোলেমানের চোখ মুখ গম্ভীর তবে গলার স্বর মোলায়েম স্বতঃস্ফূর্ত করে বলল-
-” ওয়ালাইকুমুস সালাম। মেহরিন বলছো?
মেহরিন এই প্রথম তার স্বামীর কন্ঠ শুনলো। হ্যাঁ, এই প্রথম সে শুনলো তার স্বামীর কণ্ঠ। আর শুনেই স্থবির হয়ে গেল। এ যেন কল্পনায় আঁকা এক মুখের সাথে বাস্তবের প্রথম সংযোগ। কন্ঠটা গম্ভীর লাগলেও সোলেমান যখন মেহরিনের নাম ধরে ডাকলো। তখন মেহরিনের হৃৎস্পন্দন টা বোধহয় থেমে গিয়েছিল। তার নামটা ডাকার সেই টোনের মধ্যে কী যে ছিল তা ব্যাখ্যা করা যায় না। মাঝেমাঝে কিছু শব্দ আছে যেগুলো শুধু অনুভব করা যায়, বোঝানো যায় না। মেহরিনের ক্ষেত্রে সেটাই হলো এখন।
মেহরিন শুধু ছোট্ট করে জবাব দিলো-

-” জ্বি।
সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
-” যদিও এটা জিজ্ঞেস করা শোভা পায় না। তারপরও খাতিরেই জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে কেমন আছো?
মেহরিন হালকা হাসলো। ওর ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি কাঁপলো। ভদ্রতা থেকে নয়, বরং এমন এক গম্ভীর কণ্ঠে নরম করে উচ্চারিত প্রশ্নের প্রতি এক চিলতে শ্রদ্ধা থেকে। সে নরম গলায় উত্তর দিলো-
-” জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?
-” হুমম।
ছোট্ট, একেবারে সংক্ষিপ্ত স্বীকারোক্তি। তারপর চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারো মুখে শব্দ নেই। শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ গোনা যাচ্ছে। সোলেমানের কেমন যেন লাগছে এই সময়টা। মেয়েটা এত নীরব কেনো? ওর কোনো দ্বিমত, রাগ, অভিমান,অভিযোগ নেই সোলেমানের উপর?
-” আমার প্রতি তোমার কোনো অভিযোগ নেই মেহরিন?
মেহরিন চকিতে চমকালো। অভিযোগ কেনো থাকবে? মেহরিন তো অভিযোগ করতে জানে না। সে আজ পর্যন্ত কখনও কারো কাছে অভিযোগ করে নি।

-” আপনার প্রতি আমার অভিযোগ কেনো থাকবে? আপনি কোনো দোষ করেছেন?
-” কাল যে ওভাবে চলে…
মেহরিন সম্পূর্ণ করতে দিলো না কথাটা।
-” দরকার ছিলো বলেই চলে যেতে হয়েছে আপনায়। বাবা আমাকে বুঝিয়ে বলেছে সব। আমার আপনাকে নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।
সোলেমানের বুক থেকে যেন কিছু একটা সরে গেলো। হাল্কা খোশমেজাজ লাগলো।
-” অভিযোগ থাকলেও কিছু করার ছিলো না আমার৷ জেনেশুনেই বিয়ে করেছো আমায়।
-” আমি আপনাকে না জেনেই বিয়ে করেছি। এমন কি না দেখেই।
সোলেমানের কপালে ভাজ পড়লো৷ সেদিন কি মেয়েটা তাহলে গাড়ির ভেতরে থাকা সোলেমান কে দেখে নি?
-” আমি তোমার সামনেই ছিলাম মেহরিন৷ তুমি চেয়ে দেখো নি সেদিন৷ যাই হোক নিজের খেয়াল রেখো রাখছি।
মেহরিন সাথে সাথে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলো-

-” ফিরবেন কবে?
-” কেনো অপেক্ষা করছো আমার ফেরার?
-” জ্বি,স্বামীর অপেক্ষায় থাকবে স্ত্রী এটাই তো দুনিয়ায় রীতি।
-” সঠিক তারিখ, সময়,দিন নির্ধারণ করে বলতে পারছি না ফেরার। তবে চেষ্টা করবো শীগ্রই ফেরার।
-” জ্বি। অপেক্ষায় থাকবো আপনার।
সোলেমান নৈঃশব্দ্যে হেসে ফোনটা কেটে দিলো। মেহরিন ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলো। সেদিন সে মেহরিনের সামনেই ছিলো! কিন্তু কোনদিন? মেহরিনের মনে পড়লো না এমন কোনো দিন।
ফোনটা গিয়ে রুমাইসা কে দিয়ে আসলো।
গুলশান ২, নর্ডিক ক্লাব।
রাতের ক্লাবের আলোর ঝলকানিতে এখনো দপদপ করছে ডিজে কাউন্টার।

ক্লাবের শেষ মাথায় বসে আছে এজওয়ান। গ্লাসের ভেতর কালো রঙের তরল Black Russian।
ভদকা আর কফি লিকার মিশিয়ে বানানো এই মদের স্বাদ আজও তার মুখে তিক্ত মনে হয়, অথচ আজ পঞ্চম গ্লাস। চারপাশে হাসি, আলো, মিউজিক, শরীরের লোভ, হাহাকার। ছেলে মেয়ে গুলো ভালোবাসার নামের কাওয়াবাসা আদান-প্রদান করতে ব্যস্ত। ভালোবাসা তার কাছে সস্তা এক নাটক। এজওয়ানের সেসব দেখেও না দেখার ভান করলো। শালার দুনিয়ায় এই মদ ছাড়া শান্তি মেলে না। একঘেয়েমি আর বিষণ্নতা নিয়ে সে আবারও বোতলে চোখ রাখলো। খালি। উঠে গিয়ে কাউন্টারে গেলো, আরেক বোতল নিলো। এবার Chivas Regal 18। বোতল টা নিয়ে পিছু ফিরতেই কারো সাথে ধাক্কা খেলো এজওয়ান। মুখ থেকে বিশ্রী রকমের একটা গালি বের করে বলল-
-” কোন বাল রে ধাক্কা খাওয়ার জন্য আর কিছু পাস নি? আমাকেই চোখে পড়লো শালা?
কথাটা বলেই পাশ ফিরে দেখলো মাক্স পরিহিত এক নারী। এ তো শালা না শালি। এজওয়ান কিছু বলার জন্য উদ্যোত হতে গিয়েও থেমে গেলো নারীর চোখের দিকে তাকিয়ে। ব্রাউন চোখের অধিকারী এই মেয়ে। এই চোখ জোড়া কোথাও দেখেছে এজওয়ান। মনে করার চেষ্টা করলো। হ্যাঁ চট্টগ্রামে দেখেছে। এসব ভাবনার মাঝেই মেয়েটা এজওয়ান কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল-

-” মুখের ভাষা ঠিক করুন মিস্টার। তা না হলে মুখ সেলাই করে রাখুন।
এজওয়ানের টনক নড়ে উঠলো।
-” এই মেয়ে দুদিন তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছে। দুদিনই তুমি আমায় কথা শুনিয়েছো। এত সহস কোথা থেকে পাও হু?
মেয়েটা ড্রিংকসের গ্লাস তুলে বলল-
-” বাহ স্মৃতি শক্তি তো বেশ প্রখর। মুখ না দেখেও চিনে ফেললেন!
-” তোমাকে চেনার জন্য মুখ দেখা জরুরি নয়। চোখ দুটোই যথেষ্ট। তা তুমি আমার পিছন নিচ্ছ নাকি? প্রথমে চট্টগ্রাম তারপর ঢাকা!
মেয়েটা তাচ্ছিল্যের সহিত বলল-
-” হু আর ইউ? আমি কেনো আপনায় ফলো করবো? কি আছে আপনার কাছে যার জন্য আপনার পিছু নিব আমি?
এজওয়ান বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল-
-” কি নেই আমার কাছে? টাকা পয়সা গাড়ি বাড়ি, মেয়েদের ফিদা হওয়ার জন্য সব গুনই আছে।
চোখ টিপে বলল এজওয়ান।
মেয়েটা মুখের মাস্ক খুলে ড্রিংকসে চুমুক লাগিয়ে বলল-

-” কিন্তু আমার তো সেসব নজরে আসলো না। বরং একজন আত্মতৃপ্ত নার্সিসিস্ট ছাড়া কিছুই দেখলাম না।
এজওয়ান কথা না বাড়িয়ে ড্রিংকসের বোতল নিয়ে বের হতে হতে বলল-
-” তাহলে তোমার চোখে সমস্যা আর তা না হলে তুমি ছেলে। সরি ছেলেদের সাথে আমি কথা বলি না।মেয়ে হলে সময় দিতাম তোমায়।
এজওয়ান বাহিরে এসে দাঁড়ালো গাড়ির কাছে। বাহাদুর কোন কোনায় ম’রতে গেছে কে জানে৷ শালায় গাড়ির চাবি টাও নিয়ে গেছে ম’রতে। এজওয়ান গাড়ির সামনে গাড়ির উপরে বসলো। তারপর তারপর সোজা হয়ে শুয়ে পড়লো হাত পা ছড়িয়ে৷ আকাশে আজ অর্ধ চাঁদ আর মিটিমিটি তারা জ্বলছে। নেশাটা একটু চড়েছে আজ হাল্কা মাথায়। আগে তো এমন নেশা হয় নি। এরচেয়ে তো মারাত্মক রকমের নেশা ধরায় এমন মদ খেয়েছে। এজওয়ান মদের বোতলের দিকে তাকালো। কেমন ঝাপ্সা লাগছে সব কিছু। বোতলটায় চুমু খেয়ে এজওয়ান খোশমেজাজে গলা ছেড়ে গাইলো-

গাঁজা খাব আঁটি আঁটি
মদ খাবো বাটি বাটি
ফেন্সি খেলে টাস্কি খেয়ে যাই ও মিরাবাই
গাঁজার নৌকা পাহাড়তলী যায়
আফিম খেলে মাথা ধরে
কোকেনে বুক ধরফড় করে
হিরু খেলে টাস্কি খেয়ে যাই ও মিরাবাই
গাঁজার নৌকা পাহাড়তলী যায়
গানটা গাওয়ার মাঝেই হুট করে পাশ দিয়ে এক মেয়েকে দৌড়ে যেতে দেখলো এজওয়ান। পাশ ফিরে সেই মেয়েটার দৌড়ানো দেখলো। তার পেছন পেছন কয়েকটা ছেলেও দৌড়ালো। এজওয়ান পাত্তা না দিয়ে দু হাত ফের মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলো। আকস্মিক মেয়েলি কন্ঠের চিৎকারে এজওয়ান চোখ মেলে তাকালো। সামনে তাকাতেই দেখলো ব্লাক জিন্স,জ্যাকেট পড়া সেই মেয়েটাকে চারজন ছেলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আর মেয়েটা বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করছে৷ এজওয়ান সেই দৃশ্য টা দেখে বিরক্ত হয়ে বলল-

-” শালির ঘরে শালি আমার সাথে কথা বলার সময় তো ঠিকই চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলিস। এখন নিজের সেফটির জন্য কিছু করতে পারিস না মাতারি। আর জায়গা পেলি না এই শালিরে ধরার জন্য তোরা? আমার সামনেই আসতে হলো?
এজওয়ান হেলেদুলে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। ছেলে গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-
-” ঐ তোরা ওরে ধরে এমন টানাটানি করছিস কেনো? ওয় কি করছে তগো?
ছেলে গুলোর ভেতর থাকা এক ছেলে এগিয়ে এসে এজওয়ান কে ধাক্কা দিয়ে বলল-
-” তোরে বলতে হবে শালা? কে তুই? সামনে থেকে সর।
ধাক্কা টা একদম সহ্য হলো না এজওয়ানের। এগিয়ে এসে সোজা চ’ড় বসিয়ে দিলো ছেলেটার গালে। সেটা দেখে পেছনে থাকা ৩জন ছেলেও চলে আসলো। মারপিট বেশ ভালোই জানে এজওয়ান। তাই ৪ জন কে সামলাতে বেশি সময় লাগলো না। কাত করে রাস্তায় চিৎ করে ফেলিয়ে রাখলো। মেয়েটা পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। এজওয়ান বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ১৩

-” এই মেয়ে ঠিক আছো?
মেয়েটা ছোট্ট করে জবাব দিলো-
-” হুমম।
এজওয়ান সামনে ফিরে চলে যায়। কিছুদূর যেতেই আকস্মিক পেছন থেকে এক আঘাতে এজওয়ান দাঁড়িয়ে যায়। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে পেটের এক সাইড দিয়ে গলগল করে র’ক্ত বের হচ্ছে। পেছন থেকে ঢুকিয়ে দেওয়া ছুরিটা পেটের একেবারে সাইড দিয়ে ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে। একে তো নেশা তার উপর এমন আক্রমণ এজওয়ান পেছন ফিরে একবার মেয়েটার দিকে তাকালো। মেয়েটা দৌড়ে এগিয়ে আসছে এজওয়ানের দিকে। চোখে মুখে কেমন যেনো ভয়। ছেলে ৪ জন পালিয়ে গেলো। এজওয়ান হাঁটু ভেঙে মাটিতে পড়ে গেলো।

দাহশয্যা পর্ব ১৫